হৃদয়ের রঙিন ক্যানভাস

পর্ব - ২২

🟢

খুঁকখুঁক কাশির শব্দে সৎবিৎ ফিরলো দু'জনের। সামনে তাকিয়ে আশাকে দেখেই ফাইজান শায়রার হাত ছেড়ে দিলো৷ আকস্মিক এই অবস্থায় থতমত খেয়ে গেছে উভয়েই। আশা নিজেও মাথা নিচু করে রেখেছে ভুল সময়ে আগমনের দোষে। মিনমিনিয়ে বলল,

"সরি, আসলে আমি ভুল সময়ে এসে পড়েছি। আপনাদের যেতে দেরি হচ্ছিলো তাই ভাবলাম ডেকে নিয়ে আসি।"

শায়রা ততক্ষণে ফাইজানের থেকে যথেষ্ট দূরত্বে সরে গেছে। ফাইজান একবার ওর দিক তাকিয়ে আশাকে উদ্দেশ্য করে বলল,

"ইট'স ওকে। আমরা এখনই যাচ্ছিলাম ভেতরে। চলুন।"

বলে নিজেই সবার আগে সামনে থেকে সরে গেলো৷ আশা নিজেই যে ইতস্ততার মধ্যে পড়েছে সেটা কাটাতেই বোধহয় ফাইজানের আগে আগে চলে যাওয়া৷ এরপরই আশা এগিয়ে এলো শায়রার কাছে। সামনে তাকিয়ে যখন বুঝলো ফাইজানের কান অব্দি কথা পৌঁছাবে না তখনই বলল,

"এসব কি চলছিলো, হ্যাঁ? তোদের মধ্যে নাকি কিছু ঠিকঠাক নেই, আবার রোমান্সটা তো ঠিকই চলছে!"

শায়রা 'চ' সূচক শব্দ করে বলল,

"এরকম কিছুই না, আশা। এখানে রোমান্সের কি দেখলি তুই? জামাই পেয়েছিস বলে কি এখন সবকিছুর মধ্যে রোমান্টিকতা খুঁজে পাস নাকি?"

আশা ভেঙচি কেটে বলল,

"হ্যাঁ হ্যাঁ, এখন তো এরকম কত বাহানাই দেবে তুমি! রোমান্স চলছিলো কি চলছিলো না সেটা নিজ চোখে দেখেছি আমি। তাও আবার পাবলিক প্লেসে! ঘরে কি হয় সেসব কি আমরা জানি? আমাদের যা বলা হয় তাই বিশ্বাস করে বসে থাকি। এখন থেকে তোকে বিশ্বাস করা যাবে না দেখছি!"

শায়রা চোখ রাঙিয়ে চাইল আশার দিকে। চাপা স্বরে ধ*মক দিলো,

"সোজা হাঁট! উল্টোপাল্টা কথা বলবি তো নিয়ে ড্রেনে ফেলে দিয়ে আসবো।"

আশা হেসে উত্তর দিলো,

"আমার কথা তুই ড্রেনে ফেলে দিবি? কথা কি ড্রেনে ফেলা যায় নাকি?"

শায়রা কটমট করে বলল,

"কথা না ফেলা যাক। তোকে তো ফেলা যাবে নাকি? ওটাই করবো আমি।"

চুপ করে গেলো আশা। মনে মনে বিশাল দোটানায় পড়লো কার প্রতি দুঃখ প্রকাশ করা উচিত এটা নিয়ে৷ প্রথমদিন যখন শায়রা ফাইজানের মানিব্যাগ নিয়ে ভেগেছিলো, ওইদিন আফসোস হয়েছে ফাইজানের জন্য। কেমন বউ পেয়েছে বেচারা?

এরপর যখন ওদের মধ্যে ঝগড়া হলো, তাদের সম্পর্কটা অনিশ্চয়তায় আটকে রয়েছে জানতে পেরেছিলো, তখন আফসোস লেগেছে শায়রার জন্য। মেয়েটার জীবনটা বোধহয় গেলো!

আবার এই মুহুর্তে যখন শায়রার কথা শুনলো, মনে হচ্ছে আসল বেচারা ফাইজান। ওর জন্যই সমবেদনা হওয়া উচিত।

একেকসময় একেক ভাবনায় নিজেই হাবুডুবু খাচ্ছে আশা। বুঝতে পারছে না, এটা তার মুডসুইং? নাকি সব দোষ ফাইজান ও শায়রার?

***********

শপিংমলে ঘুরার পুরো সময়টা ফাইজান শায়রার সাথে সাথে ছিলো। এক মুহুর্তের জন্যও চোখের আড়াল করে নি। দূর থেকে দেখে যে কেউ ভাববে, আহা স্বামী-স্ত্রীর কি ভালোবাসা! অথচ হাড়ির খবর? সেটা জানে ক'জন?

শপিং শেষ করে একটা রেস্টুরেন্টে ঢুকেছিলো সবাই। খাওয়া-দাওয়া করে এরপর বিদায়ের পালা। ফাইজান বাইকে উঠে শায়রাকেও বলল পেছনে উঠতে। কিন্তু মেয়ে এখনো কথা বলায় ব্যস্ত। আর ফাহিম হা করে কথা গিলছে ওর৷ এই দৃশ্য বেশিক্ষণ সহ্য হলো ফাইজানের। ধৈর্যের বেড়িবাঁধ ভাঙতেই ক্ষ্যাপাটে গলায় বলল,

"শায়রা, তুই কি বাসায় যাবি নাকি এখানেই দাঁড়িয়ে সারারাত গল্প করবি?"

আচমকা ওর কন্ঠস্বরে এমন পরিবর্তনে চমকে পেছনে ফিরলো শায়রা। ফাইজানের মুখটার দিকে তাকাতেই আন্দাজ করলো ও রেগে আছে। কিন্তু কারণ? সেটা শায়রার মাথায় ঢুকলো না। বোকার মতো তাকালো সবার দিকে। একে একে প্রত্যেকের উপর থেকে নজর ঘুরিয়ে ফাহিমের চোখে চোখ পড়তেই কারণটা পরিষ্কার ধরা দিলো তার কাছে। মনের কোণে ভাবনা এলো, তাহলে কি ফাইজান জেলাস ফিল করছে?

পরপর আশা বলল,

"আচ্ছা শায়রা, তাহলে তুই বাসায় যা। আমরাও যাই।"

মাথা নেড়ে বাইকে উঠে গেলো শায়রা। ফাইজান সৌজন্যেমূলক একটা কথাও বলল না আর। বাইক ছুটালো পিচঢালা রাস্তায়৷ বাইকটা চোখের সামনে থেকে মিলিয়ে যেতেই ফরহাদ গাড়িতে উঠতে উঠতে আশাকে বলল,

"তোমার ফ্রেন্ডের হাসবেন্ড ওকে খুব চোখে চোখে রাখে, তাই না?"

আশা সম্মতি জানিয়ে বলল,

"হ্যাঁ। জানেন, যেদিন আমাদের বাড়িতে সারাদিন ছিলো ওইদিন শায়রা ভাইয়াকে কিছু বলে আসে নি। আবার ফোনও ছিলো সুইচড অফ। এজন্য বকাও খেয়েছে বেচারী।"

ফরহাদ বলল,

"স্বাভাবিক। শায়রার উচিত ছিলো ফাইজানকে বলা। ও নিশ্চয়ই অনেক টেনশনে ছিলো।"

আশা হা-বোধক ইশারায় মাথা নাড়লো শুধু।

*********

রাতের রাস্তা একদম জ্যাম-জটবিহীন। গাড়ি কম থাকায় বাইকে বসে হাওয়া খেতে ভালোই লাগছে শায়রার। তবে এত সুন্দর মুহুর্তে চুপচাপ থাকাটা মনোঃপুত হচ্ছে না তার। তাই বসে বসে ভাবলো কি বিষয়ে কথা শুরু করা যায়। এরপরই মস্তিষ্কে হানা দিলো একটু আগের ঘটনা। ফাহিমকে ওর দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে রেগে গিয়েছিলো ফাইজান। এর পেছনে আদ্যো জেলাসিই ছিলো তো?

সেটা নিশ্চিত হতে শায়রা সিদ্ধান্ত নিলো ফাইজানকে আরেকটু খোঁচানোর। গলা খ্যাঁকাড়ি দিয়ে বলল,

"ফাহিম ছেলেটা অনেক সুইট তাই না?"

কিছুক্ষণ পূর্বের দৃশ্য কল্পনা করে ফাইজানের মেজাজ তখনও চটে আছে। শায়রার কথাটা যেন আগুনে ঘি ঢাললো। ফাইজান থমথমে স্বরে বলল,

"আমার জানামতে ফাহিম তোর থেকে বড়। তাই ওর নাম ধরে ডাকাটা তোর মুখে শোভা পাচ্ছে না। ভাইয়া ডাকবি।"

শায়রা অবাক হওয়ার ভান করে বলল,

"ভাইয়া ডাকবো? কিন্তু কেন? আমি...."

ফাইজান দাঁতে দাঁত পিষে বলল,

"মাঝরাস্তায় যদি বাইক এক্সিডেন্টে হসপিটালে যেতে না চাস, তাহলে চুপচাপ বসে থাক। বেহুদা আমার মেজাজ গরম করলে আমি তোকে বাইক থেকে ফেলে একাই বাসায় চলে যাবো। সুতরাং চুপ।"

দমে গেলো মেয়েটা। যত যাই হোক, প্রাণের ভয় তো সবারই আছে। আবার ফাইজান যেই স্পিডে বাইক চালাচ্ছে তাতে মাঝরাস্তায় ওকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলে বাঁচার সম্ভাবনা ক্ষীণ। তাই চুপ থাকাই শ্রেয়। কিন্তু কথাগুলো না বলেও শায়রা থাকতে পারছে না। তাই বেশ মিনমিনিয়ে বলল,

"আমাকে একটু শান্তিতে কথাও বলতে দেবে না তুমি?"

ফাইজান বলল,

"বাসায় গিয়ে বলিস। সব শুনবো।"

অগত্যা চুপ করে গেলো শায়রা। অপেক্ষা করতে লাগলো কতক্ষণে বাসায় পৌঁছাবে!

*********

বাইরে থেকে খেয়ে আসায় বাসায় এসে আর খাওয়ার ঝামেলা রইলো না তাদের। বাকিরা ইতিমধ্যেই খেয়ে যার যার রুমে ঢুকে গেছে। ফাইজান ও শায়রা আসায় বেরিয়েছিলো মালেকা বেগম ও আনুসা। ফাইজান নিজের রুমে চলে যাওয়ার পর তারা তিনজন আনুসার রুমে ছিলো অনেকক্ষণ। শায়রা নিজের জন্য কিনে আনা ড্রেস ও অন্যান্য জিনিসপত্র খুলে খুলে দেখিয়েছে৷ সারা সন্ধ্যার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছে।

আধা ঘন্টা পরে রাত্রি প্রায় সাড়ে এগারোটায় মালেকা বেগম চলে গেলেন ঘুমাতে। সব গুছিয়ে রেখে শায়রা ও আনুসাও প্রস্তুতি নিলো ঘুমানোর। রুমের লাইট অফ করে পাশাপাশি শুয়ে পড়লো দু'জন।

অন্যদিকে ফাইজান অপেক্ষা করছে শায়রা ফ্রি হলে ওকে ডাকবে নিজের রুমে৷ কিন্তু আনুসার রুমের দরজা বন্ধের শব্দ পেতেই টনক নড়লো ছেলেটার। বুঝলো প্রতিদিনকার মতো আজও শায়রা আনুসার সাথেই ঘুমাবে। পরমুহূর্তেই আবার ভাবলো,

"এতদিন যখন আনুসার রুমে ঘুমিয়েছে তাহলে আমি কিভাবে আশা করলাম, আজ আমার রুমে আসবে? কোনো কারণ আছে আসার? নেই। তাহলে আমি এত বেশি বেশি ভাবছি কেন? আর সারাক্ষণ শায়রার কথাই ভাবছি কেন? আমার মনে হয় এখন এসব ভাবনা বাদ দিয়ে আমার ঘুমাতে যাওয়া উচিত।"

খালি বিছানায় কিছুক্ষণ এপাশ-ওপাশ করে উঠে বসলো ফাইজান। মনে মনে বলল,

"আসার সময় বাইকে শায়রা ফাহিমের ব্যাপারে কিছু বলছিলো। আমি বলেছিলাম বাসায় আসার পর বলতে। কিন্তু ও তো কিছু বলল না! কি বলতে চাইছিলো ওইসময়?"

দুশ্চিন্তা করার মতো আরেকটা বিষয়বস্তু দাপাদাপি করতে শুরু করলো মস্তিষ্কের ভেতর। ফাইজান ভেবে-চিন্তে সিদ্ধান্ত নিলো শায়রাকে মেসেজ দেয়ার৷ কিন্তু মেসেজ সিনও হলো না, রিপ্লাইও এলো না। প্রায় দশমিনিট অপেক্ষা করে ফাইজান তাকালো ঘড়ির দিকে। ঘন্টার কাঁটা ততক্ষণে বারোটার ঘর পেরিয়েছে। আনুসা এতক্ষণে ঘুমিয়ে গেছে নিশ্চয়ই?

চোরের মতো পা টিপে টিপে নিজের রুম থেকে বের হলো ফাইজান। অতঃপর সোজা হাজির আনুসার রুমের সামনে। কয়েকবার নক করতেই শায়রা দরজা খুলল। ফাইজানকে দেখে চাপা স্বরে বলল,

"এত রাতে তুমি এখানে কি করছো? তাও এমন চোরের মতো এসে দরজায় ঘনঘন নক করেই যাচ্ছো! আনুসা ঘুম থেকে উঠে গেলে?"

ফাইজান সস্থির নিশ্বাস ফেলে বলল,

"আনুসা ঘুমিয়ে গেছে তাহলে!"

শায়রা রুমের ভেতরে তাকিয়ে একবার ভালো করে আনুসাকে পরখ করে নিশ্চিতভাবে বলল,

"হ্যাঁ, ও ঘুমিয়ে গেছে। এখন বলো, তোমার এত রাতে কি দরকার?"

ফাইজান সোজাসাপটা প্রস্তাব রাখলো,

"আমার রুমে চল, বলছি।"

শায়রা তৎক্ষনাৎ নাকচ করে দিলো,

"না। যাবো না আমি। যা বলার এখানেই বলো।"

"আচ্ছা, এখানেই বলবি তাহলে তুই?"

ফাইজানের নিজের রুমে ডাকার কান্ডটায় ভড়কে গেছে শায়রা। কিন্তু মুখে সেটা প্রকাশ করছে না। চেহারায় ধরে রেখেছে কঠোরভাব। সে ঢোক গিলে বলল,

"হ্যাঁ। যা কথা হবে, এখানেই।"

ফাইজান আর কথা প্যাঁচালো না। প্রশ্ন করলো,

"ওইসময় বাইকে তুই ফাহিমের ব্যাপারে কি বলতে চাচ্ছিলি আমাকে?"

দ্বিতীয় দফায় আরও দ্বিগুন ভড়কে গেলো শায়রা এই প্রশ্ন শুনে। এত রাতে শুধুমাত্র এই কথা জিজ্ঞেস করতে ফাইজান আনুসার রুমে চলে আসবে এটা ও কস্মিনকালেও ভাবে নি। মনে হচ্ছে আজ সকাল থেকে দুনিয়ার যত আজব আজব জিনিস তার সাথে হয়ে যাচ্ছে৷ কালে কালে যে আর কি দেখতে হবে কে জানে?

শায়রা সময় নিয়ে উত্তর সাজালো মনে মনে। ফাইজান অধৈর্য হয়ে পুনরায় জিজ্ঞেস করতে যাবে, ঠিক তার আগমুহূর্তে বলল,

"তেমন কিছু না। এই টপিকে আমি আর কথা বলতে চাচ্ছি না।"

"কিন্তু আমি শুনতে চাচ্ছি। তুই বলবি?"

শায়রা চোখ ছোট ছোট করে চেয়ে বলল,

"আমি বলবো না, তাও তুমি শুনবে?জোর-জবরদস্তি নাকি?"

ফাইজান জোর গলায় বলল,

"তুই যা মনে করিস তাই। এখন বল।"

শায়রা বলল,

"রাত্রিবেলা ঘুম রেখে, দরজার সামনে দাঁড়িয়ে তোমার সাথে ঝগড়া করার মুড নেই আমার। আনুসা ঘুমাচ্ছে, ওর ঘুম নষ্ট হবে।"

ফাইজান সরলমনে বলে ফেলল,

"এজন্যই বললাম আমার রুমে চল। আমাদের ঘুম নষ্ট হলেও আনুসার ঘুমটা নষ্ট হবে না।"

আকস্মিক এরূপ কথার ভার সামলাতে পারলো না শায়রা। বিষম লেগে গেলো ওর৷ লম্বা লম্বা শ্বাস নিয়ে বলল,

"কিসব বলছো এগুলো! তোমার মাথাটা কি পুরোপুরি গেছে? আনুসা এসব শুনে ফেললে কি ভাবতো, বলো তো?"

ফাইজান 'চ' সূচক শব্দ করে বলল,

"লোকের ভাবাভাবি বাদ দে। তুই যাবি কি না বল? আনুসা ঘুমাচ্ছে। ও শুনবেও না, দেখবেও না, জানবেও না।"

শায়রা না করে দিলো সরাসরি। বলল,

"আমি যাবো না তোমার গোয়ালঘরে। তুমিই যাও। আর ওই।ফাহিম নামক টপিকে আর একটা কথাও বলবো না। কি করবে, করে নাও গিয়ে!"

ফাইজান ভ্রু উঁচিয়ে বলল,

"আর ইউ সিউর?"

শায়রা বলে দিলো, "হুম।"

সঙ্গে সঙ্গে ফাইজান শায়রার হাত টেনে বাইরে আনলো। আনুসার রুমের দরজাটা টেনে লাগিয়ে দিলো। এরপর কোনো আগামবার্তা ছাড়াই কোলে তুলে ফেলল শায়রাকে।

অকস্মাৎ এই কান্ডে মাথা ঘুরে যাওয়ার জোগাড় শায়রার। চোখদু'টো বড়বড় হয়ে গেছে বেচারীর। সম্পূর্ণরূপে হতভম্ব হয়ে বলল,

"এটা কি করছো তুমি? কোল থেকে নামাও আমাকে।"

ফাইজান হেঁটে নিজের রুমের পথে যেতে যেতে বলল,

"নামানোর জন্য কোলে তুলেছি নাকি?"

মালেকা বেগম ও ফজল সাহেবের রুমের কাছে আসতেই শায়রা তেজ দেখিয়ে বলল,

"আমি কোল থেকে নামাতে বলেছি। নাহলে এই মুহুর্তে চিৎকার করে ঘরের মানুষ এক করে দিবো, বলে দিলাম! ফুপা-ফুপ্পি দেখবে তুমি রাত-বিরেতে উঠে কিসব অসভ্যতা করো।"

ফাইজান ওর হুমকিকে কোনো পাত্তাই দিলো না। বিরস মুখে বলল,

"দে চিৎকার। তুই ভুলে গেছিস ওরাই জোর করে আমাদের বিয়ে দিয়েছে। তাই আমার মনে হয় এই রাতে উনারা এত সুন্দর দৃশ্য দেখলে খুব খুশিই হবেন। আনন্দিত হয়ে বলবেন,

'আলহামদুলিল্লাহ! জলদিই দাদা-দাদি হতে যাচ্ছি।' ব্যাপারটা ভালো হবে না শায়রা?"

ফাইজান যে এরকম কথা বলতে পারে, এটা শায়রার ভাবনারও বাইরে ছিলো। তার মুখখানা বড়সড় হা হয়ে রয়েছে। একের পর এক ধাক্কাগুলো সামলাতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে ওর। বিস্ময়ের আতিশয্যে কিয়ৎক্ষণ সময় পার হতেই শায়রা টের পেলো ফাইজান নিজের রুমে ঢুকে গেছে৷ পা দিয়ে ঠেলে দরজায় আটকে দিচ্ছে। তৎপর শায়রা আঁতকে উঠে বলল,

"নামাও আমাকে। আমি আনুসার রুমে যাবো। তোমার গোয়ালঘরে থাকবো না। নামাওওওও আমাকে!"

ফাইজান নিরুদ্বেগ ভঙ্গিতে বলল,

"আচ্ছা, তাহলে গোয়ালঘরে থাকা লাগবে না। তুই আমার কোলেই থাক৷"

শায়রা ঘনঘন মাথা নেড়ে চেঁচিয়ে উঠলো,

"না! কোলেও থাকবো না। নামাও আমাকে।"

ফাইজান মহাবিরক্ত হয়ে বলল,

"অদ্ভুত মেয়েজাতি তোরা! বিয়ের দিন তো ঠিকই পায়ে ব্যাথা পাওয়ার বাহানায় আমার কোলে চড়ে চড়ে খুব শখ করে ঘুরলি। আর আজ কোলেও থাকতে চাইছিস না। দুইদিন দুইরকম মনের ইচ্ছা। সমস্যা কি তোর? তুই চাচ্ছিস তোকে নিচে ফেলে দেই আমি? ওইদিন খাটের উপর ফেলেছিলাম বলে ব্যাথা পাস নি। আজ বেশি চেঁচামেচি করবি তো সোজা ফ্লোরে ফেলবো। তুই ভালো করেই জানিস আমার মধ্যে মায়া-দয়া কম।"

শায়রা জানে, ফাইজান যা বলে তাই করে। যেহেতু বলেছে নিচে ফেলবে তার মানে নিচেই ফেলবে। মেয়েটা ভয়ে ভয়ে তাকালো ফ্লোরের দিকে। নাহ, এই ছ'ফুট ষাঁড়ের কোল থেকে সোজা ফ্লোরে পড়লে কোমড় আস্ত বাঁচার কোনো চান্স নেই। তার মানে ফাইজানের কথা শুনতেই হবে। তাই বলে শায়রা ওর কোলে চড়ে সারারাত বসে থাকবে?

অসম্ভব! ভয়-ডর দূরে ঠেলে আবার নামার জন্য ছটফট শুরু করলো শায়রা। ফাইজানও কম যায় না। নিজের কথামতো শায়রাকে ভয় দেখানোর জন্য ফ্লোরে ফেলে দেয়ার ভান করে হাত আলগা করে দিলো। কিন্তু পুরোপুরি ভর ছাড়লো না।

ফলাফল শায়রা ভয় পেয়ে চিৎকার করে গলা জড়িয়ে ধরলো ফাইজানের। খুব শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ঘাড়ে মুখ গুজে দিলো। ভয়ে চোখদু'টোও বন্ধ করে নিয়েছে৷ বিড়বিড়িয়ে বলছে,

'ফ্লোরে ফেলো না। কোমড় আস্ত থাকবে না আমার। শুনবো, শুনবো আমি, তোমার সব কথাই শুনবো!"

হৃদয়ের রঙিন ক্যানভাস পর্ব ২২ গল্পের ছবি