হৃদয়ের রঙিন ক্যানভাস

পর্ব - ২৬

🟢

রাত্রি এগারোটার কিছু আগে হসপিটালে এসে পৌঁছালো সকলে। এ*ক্সিডেন্টের কথা শোনার পর থেকেই মালেকা বেগম ও আনুসা লাগাতার কান্না করেই যাচ্ছে। শায়রা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে ওদের বুঝিয়ে শান্ত রাখার। মেয়েটা ঠান্ডা মাথায় পরিস্থিতি সামাল দিতে বেশ পটু। ঠিক এই কারণেই ফাইজান একটু নিশ্চিত হয়ে হসপিটালে খোঁজ-খবর নিতে পারছে। আজ শায়রা না থাকলে দু'দিক সামাল দিতে হিমশিম খেতে হতো তাকে। এখন মা-বোনকে শায়রার দায়িত্বে রেখে খোঁজ নিতে গিয়েছে, কোন কেবিনে আছে তার বাবা।

খোঁজ পাওয়া গেলো দ্রুতই। তৎক্ষনাৎ সবাই হাজির হলো কেবিনের সামনে৷ প্রথমেই দেখা হলো সেই লোকটার সাথে যিনি ফোন করেছিলেন। ফাইজান গিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করতেই ভদ্রলোক জানালেন,

"হ্যাঁ, আমিই ফোন করেছিলাম আপনাকে। আর আপনার বাবাকে হসপিটালেও আমিই নিয়ে এসেছি।"

পরপর ফাইজান জিজ্ঞেস করলো,

"কিভাবে হলো এতকিছু?"

তিনি জবাব দিলেন,

"রিকশায় বাসায় যাচ্ছিলেন তিনি। হঠাৎ পেছন থেকে একটা গাড়ির ধাক্কা লাগায় রিকশা উলটে পড়েছেন। রিকশাওয়ালার খুব বেশি ক্ষ*তি হয়নি। তবে আপনার বাবার ক্ষ*তিটা একটু বেশিই হয়েছে। মাথা ফে*টে অনেক র*ক্ত গিয়েছে এবং বাম হাতটায় বোধহয় মারাত্মক চো*ট পেয়েছেন। "

শায়রা দু'জনকে বসিয়েছে পাশের চেয়ারগুলোতে। এরপর এসে দাঁড়ালো ফাইজানের পাশে। ওর কাঁধে হাত রেখে ভরসা যুগিয়ে বলল,

"টেনশন করো না। কিচ্ছু হবে না ফুপার। এখন তুমি ভেঙে পড়লে বাকিদের সামলাবে কি করে?"

শায়রার দিক তাকিয়ে মাথা নাড়লো ফাইজান। অতঃপর ঘুরে জিজ্ঞেস করলো,

"ডক্টর বলেছে কিছু?"

"কিছুই বলে নি এখনো। বের হলেই জানা যাবে অবস্থা।"

অপেক্ষার প্রহর সবসময়ই বেশ দীর্ঘ হয়। ঘড়ির কাঁটা ঘুরে ঠিক যেন কচ্ছপের গতিতে৷ আজকের সময়টা এর যথোপযুক্ত প্রমাণ৷ ফাইজান কিছুক্ষণ পরপর ফোনের স্ক্রিন চালু করছে আর টাইম দেখছে৷

প্রায় আধা ঘন্টা পর কেবিন থেকে বেরিয়ে আসলেন ডক্টর। অজ্ঞাত লোকটা পরিচয় করিয়ে দিলেন ফাইজানের সাথে,

"স্যার, ইনি হচ্ছেন পেশেন্টের ছেলে। উনার ফুল ফ্যামিলি এসে পড়েছে। এখন আশা করি আর আমার দরকার নেই। আমি কি এবার যেতে পারি?"

চিকিৎসক সম্মতি দিতেই বেরিয়ে গেলেন তিনি। পরমুহূর্তেই ফাইজান জিজ্ঞেস করলো,

"স্যার, আমার বাবা কেমন আছে এখন? খুব বেশি ক্ষ*তি হয় নি তো?"

তিনি কিয়ৎক্ষণ সময় নিয়ে বললেন,

"দেখুন, রাস্তার উপরে পড়েছে তাই এই যাত্রায় তেমন ক্ষ*তি হয়নি। আপাতদৃষ্টিতে যদি বলি মাথা ফে*টে র*ক্তক্ষরণের কারণে মনে হয়েছে কেসটা সিরিয়াস। আমরা ব্যান্ডেজ করে দিয়েছি সেখানে। আর বা'হাতে অল্প ফ্র‍্যাকচার হয়েছে৷ চিকিৎসা চলমান। আশা করছি কাল-পরশুর মধ্যে আপনারা রোগীকে বাসায় নিতে পারবেন।"

এতক্ষণে সস্থির নিশ্বাস ছাড়লো সকলে। শায়রা অস্থিরচিত্তে জিজ্ঞেস করলো,

"টেনশনের কোনো কিছু নেই তো?"

চিকিৎসক বললেন,

"একদমই না৷ তবে হ্যাঁ, আপনাদের মাথায় রাখতে হবে উনার বয়স হয়েছে। তার উপর এ*ক্সিডেন্টে মাথায় ও হাতে ব্যাথা পেয়েছে৷ এই মুহুর্তে উনাকে কোনোপ্রকার টেনশন বা প্রেশার দেয়া যাবে না। এবং মিনিমাম এক থেকে দেড় মাস বেড রেস্টে রাখতে হবে। ভালোমতো চেকআপের পর আমি কিছু ঔষধ লিখে দিবো। সব ঠিকঠাক চললে উনি সুস্থ হয়ে যাবেন, ইন শা আল্লাহ!"

ফাইজান জিজ্ঞেস করলো,

"মাথা ফেটে র*ক্তক্ষরণ কি বেশিই হয়েছে, ডক্টর? র*ক্ত দেয়া লাগবে নাকি?"

ডক্টর বললেন,

"হ্যাঁ, রক্ত তো দিতে হয়েছে। অবস্থা সিরিয়াস ছিলো তাই আমরা ব্লাডব্যাংক থেকে এক ব্যাগ র*ক্ত নিয়ে দিয়েছি। রোগীর সাথে যে লোকটা এসেছিলেন উনিও বলেছিলেন পেশেন্ট বাচাতে ব্লাডব্যাংক থেকেই রক্ত নিতে৷

হসপিটালের সম্পূর্ণ খরচের রিসিট আপনাকে দেয়া হবে।"

"আচ্ছা, এখন ঠিক কি অবস্থায় আছে বাবা?"

তিনি আশ্বস্ত করে বললেন,

"আলহামদুলিল্লাহ, ভালোই। কিছু টেস্ট করতে হবে। হাতের ফ্র‍্যাকচার হিসেবে তো চিকিৎসা করতে হবে আমাদের! ওটা হয়ে গেলেই আপনারা নিয়ে যেতে পারবেন। আপাতত পেশেন্টের সাথে শুধু একজন থাকুন। বাকিরা বাসায় চলে যেতে পারেন।"

ডক্টর বেশ অনেকটা সময় নিয়ে ওদের সাথে কথা বলেছেন। সবিস্তারে সবকিছু বর্ণনা করে চলে গেলেন নিজের কাজে। সবার মনে খানিক স্বস্তি আসলেও পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারছে না কেউ-ই। যতক্ষণ ফজল সাহেবের দেখা না পাওয়া যাবে ততক্ষণ শান্তি হবে না কারোই।

কান্নাকাটি থেমেছে দুই মা-মেয়ের। শায়রা ওদের বুঝাচ্ছে, সব ঠিক আছে। কালই ফজল সাহেব বাসায় যেতে পারবেন। তবুও তাদের মন মানছে না বাড়ি যাওয়ার জন্য। ফাইজান শান্ত স্বরে বলল,

"এখানে ভীড় করে থাকলে কি বাবা সুস্থ হয়ে যাবে, মা? এরচেয়ে ভালো বাসায় চলো। কাল না হয় আবার আসবে।"

মালেকা বেগম শুধালেন,

"তুইও যাবি? তাহলে ওর সাথে থাকবে কে? আমি থাকি, তোরা বাসায় যা।"

ফাইজান বলল,

"আমি এই রাতে তোমাকে একা ফেলে বাসায় চলে যাবো? এতটাও পাগল হইনি এখনো। তোমাদের বাসায় দিয়ে এসে তারপর আমিই থাকবো এখানে।"

শায়রা বলল,

"যাবে আবার আসবে? ডাবল খাটুনি হয়ে গেলো না? দরকার কি? আমরা একটা সিএনজি করে চলে যেতে পারবো।"

ফাইজান ঝাড়ি মারলো তৎক্ষনাৎ,

"তোর মাথা খারাপ? আমি তোদের সবাইকে রাত্রি বারোটায় একা ছেড়ে দিবো? কি পেয়েছিস আমাকে সবাই মিলে?

শোন, আমি কারো মতামত জানতে চাই নি। বলেছি তোদের বাসায় দিয়ে আসবো, ব্যস কথা শেষ।"

ওর ঝাড়ির পর আর কেউ কিছু বলে সময় নষ্ট করলো না। যাওয়ার আগে একবার দেখে গেলো ফজল সাহেবকে। ডক্টর ও নার্স সাথে আছে দেখে স্বস্তিসহকারে বাকিদের নিয়ে রওনা দিলো ফাইজান। রাতের রাস্তা ফাঁকা থাকার কারণে সময় বেশি লাগলো না। ওদেরকে বাড়ির গেট অব্দি পৌঁছে দিয়ে ফাইজানের হসপিটালে পৌঁছাতে পৌঁছাতে বেজে গেলো দেড়টা। এরপর বাবার খেয়াল রাখার চক্করে নির্ঘুম কাটাতে হলো গোটা রাত্রি।

*********

বাড়ি ফিরে ড্রইংরুমে সবে বসেছে মালেকা বেগম। পাশে শায়রা বসতেই ওর হাত ধরে আকুতিভরা স্বরে বললেন,

"তোর ফুপা ঠিক হয়ে যাবে তো? কাল বাড়িতে আসবে তো? আমার কিন্তু খুব টেনশন হচ্ছে!"

শায়রা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

"ফুপ্পি, তুমি একটু বেশিই টেনশন করছো। ডক্টর কি বলল শুনো নি? চিন্তার কোনো কারণ নেই। কাল সবগুলো টেস্ট ঠিকঠাক হয়ে গেলেই ফুপা চলে আসতে পারবে। আর আমরা শুধু রাতের জন্য বাসায় এসেছি। কাল সকাল সকাল উঠেই আবার হসপিটালে চলে যাবো? ঠিক আছে?"

সম্মতির সুরে মাথা নাড়লেন ভদ্রমহিলা। অতঃপর শায়রা বলল,

"আচ্ছা, তাহলে তুমি বসো। আমি তোমাদের জন্য খাবার নিয়ে আসি?"

মালেকা বেগম নাকচ করলেন সঙ্গে সঙ্গে,

"না রে, মা। খাবার নামবে না গলা দিয়ে।"

শায়রা বলল,

"এসব বললে হবে নাকি? খাবার খেতে হবে না? দেখো, ডক্টর কিন্তু বলেই দিয়েছে ফুপাকে বেড রেস্টে রাখতে হবে। এর মানে বুঝো? খুব খেয়াল রাখতে হবে কিন্তু! এরজন্য প্রয়োজন স্ট্রং থাকা। এখন তোমরা যদি খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে নিজেরাই অসুস্থ হয়ে যাও, তাহলে কার খেয়াল কে রাখবে শুনি?"

মেয়েটার মুরব্বিদের মতো সাবধানবানী শুনে এহেন পরিস্থিতিতেও স্মিত হাসলেন মালেকা বেগম। প্রতিত্তোরে বলতে চাইলেন কিছু তবে তার আগেই শায়রা মুখ খুলল পুনরায়,

"আমি কারো কোনো বাহানা শুনতে চাইছি না। খাবার বেড়ে নিয়ে আসছি, দুজনেই খাবে বলে দিলাম! আমি খাইয়ে দিবো। এবার ঠিক আছে?"

এরপর আর কারো কথা শুনার জন্যই থামলো না শায়রা। নিজ দায়িত্বে গিয়ে প্লেটে করে খাবার নিয়ে এলো। এহেন অবস্থায় সবার উপর কি যাচ্ছে, সেটা স্পষ্ট জানে শায়রা। এমনকি ও নিজেও দুশ্চিন্তায় আছে এসব নিয়ে৷ কিন্তু মন শক্ত করে সামাল তো দিতেই হবে সবকিছু! ভেঙে পড়া মানেই হেরে যাওয়া। তাই যতকিছুই হয়ে যাক, পরিস্থিতি তাদের সামাল দিতেই হবে!

খাবার আনার পর দু'চার লোকমা মাত্র মুখে তুলল দু'জনে। এর বেশি আর জোর করতে পারলো না শায়রা। মালেকা বেগম কয়েকবার শায়রাকে খাওয়ার কথা বলতেই ও জানালো,

"তোমরা খেয়ে নাও। পরে সব গুছিয়ে আমি খেয়ে নিবো।"

সেটাই মেনে নিয়ে খেয়ে উঠে পড়লেন মালেকা বেগম। শায়রা উনাকে রুমে নিয়ে প্রেশারের ঔষধের সাথে একটা ঘুমের ঔষধও দিলো যেন দুশ্চিন্তায় রাত না জাগে। আদর্শ বউয়ের মতো দায়িত্ব পালন শেষে ফিরে এলো ড্রইংরুমে। সোফায় বসতেই আনুসা জিজ্ঞেস করলো,

"আমাদের খাওয়া শেষ হলে নাকি তুমি খাবে? এখনো খাচ্ছো না যে?"

শায়রা ভণিতাহীন সহজ স্বীকারোক্তি দিলো,

"তোর ভাইয়াও তো কিছু খায় নি। আমি কিভাবে খেতে পারি?"

আনুসা অবাক হলো। বিস্মিত স্বরে বলল,

"কিছুদিন আগেও দু'জন এমন ভাব করতে যেন কেউ কাউকে চিনোই না। আর এখন? অল্পদিনেই এত পরিবর্তন!"

শায়রা মৃদু হেসে বলল,

"হয়তো আল্লাহ চেয়েছিলেন এই পরিবর্তনটাই। এজন্য হয়েছে। যাই হোক, তুই গিয়ে ঘুমা। আমি সকালে হসপিটালে যাওয়ার আগে ডেকে দিবো।"

************

আর্ম স্লিং-এর সাহায্যে গলায় ঝোলানো হাতটা দেখে যারপরনাই বিরক্ত হচ্ছেন ফজল আহমেদ। উনার কুঁচকানো কপালটাই বলে দিচ্ছে, পারলে এক্ষুনি এই আপদটাকে ডাস্টবিনে ছুড়ে ফেলতেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত পারছেন না। তার হাতটাকে এমনভাবে প্যাকেট করে রাখা হয়েছে যেন ফ্রিজে রাখা মাছের পোটলা। এসব কি মানা যায়?

দশটা নাগাদ হসপিটালে এসে পৌঁছালো সকলে। মালেকা বেগম সবার আগে কেবিনে ঢুকে বেডের পাশের চেয়ারটায় বসেই কান্না জুড়ে দিলেন,

"এতকিছু কিভাবে হয়ে গেলো? রাস্তা-ঘাটে এক্সিডেন্ট কত ভয়ংকর একটা ব্যাপার। তুমি একটু দেখে চলতে পারো না?"

ফজল সাহেব বললেন,

"আরে বাবা, আমি তো রিকশায় বসে ছিলাম। রিকশা উলটে গেলে আমার কি দোষ? যা হয়েছে বাদ দাও। কান্নাকাটি করো না। আমি ঠিক আছি এখন।"

ভদ্রমহিলা কাঁদো কাঁদো স্বরে বললেন,

"হ্যাঁ, কত ঠিক আছো দেখাই যাচ্ছে! মাথায় ব্যান্ডেজ, হাতে ব্যান্ডেজ আবার বলছে উনি ঠিক আছে।"

ফাইজান ও শায়রা কেবিনের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে৷ ভেতরের পরিস্থিতি দেখে ফাইজান বলল,

"বাবাকে বলেছে বেশি প্রেশার না দিতে। আর মা বাবার সামনেই কান্নাকাটি করছে।"

শায়রা চাপা স্বরে বলল,

"ফুপার এই অবস্থা দেখে ফুপ্পি ইমোশনাল হয়ে গেছে। ইমোশন বুঝো তুমি? ওহহো, ওসব তো ভালো জিনিস। তুমি বুঝবে কি করে?"

ফাইজান ভাব নিয়ে বলল,

"তো ভালো জিনিস তো ভালো মানুষেরাই বুঝবে। নাকি তুই বুঝবি? তুই যদি বুঝতি, তাহলে তো হয়েছিলোই!"

শায়রা অতিষ্ঠ ভঙ্গিতে মুখ বাঁকালো। বলল,

"হয়েছে! রাতে খেয়েছিলে কি না সেটা বলো!"

ফাইজান জানালো,

"না। এরকম অবস্থায় খাওয়া যায় নাকি? রাতেও খাই নি আর সকালে এখন পর্যন্ত সুযোগ পেলাম কই? মা আর আনুসা খেয়েছে?"

ফাইজান নিজের মা-বোনের কথা জিজ্ঞেস করেছে কিন্তু শায়রার কথা জিজ্ঞেস করে নি বলে মন খারাপ হলো শায়রার। ফাইজানের কথা ভেবে যে শায়রা সারারাত না খেয়ে বসে থাকবে, এটা কি ফাইজান ভাবেই নি? নাকি ওকে এতই পাথরমানবী ভেবেছে যে এমন অবস্থায় শায়রা কোনোকিছুর পরোয়া না করে নিজের খাওয়ার চিন্তাই আগে করবে?

মন খারাপ হলেও মুখে প্রকাশ করলো না শায়রা। থমথমে স্বরে জবাব দিলো শুধু,

"রাতে জোর করে একটু খাইয়েছিলাম দু'জনকে। সকালেও একই অবস্থা। তাও জোর-জবরদস্তি করে কিছুটা হলেও খাওয়াতে পেরেছি।"

ফাইজান বলল,

"গুড। এবার চল তুই আর আমি খেয়ে আসি।"

শায়রা বিস্মিত হয়ে বলল,

"আমি?"

"হ্যাঁ, তুই। কারণ তুই যে সারারাত কিছু খাস নি, সেটা আমি জানি। দায়িত্ব পালন করে নিজের খাওয়া-দাওয়া ভুলে বসেছিস। চল, এখন খাবি।"

বলেই ফাইজান শায়রার ডান হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে গেলো সেখান থেকে৷

মাঝে-সাঝে আশাতীত কিছু ঘটনা ঘটে গেলে মানুষ প্রতিক্রিয়া দিতে ভুলে বসে। মস্তিষ্ক সময় নেয় স্বাভাবিক হতে। কয়েকদিনে একের পর চমকে সব উলটপালট হয়ে যাচ্ছে শায়রার। বিক্ষিপ্ত মন মাঝেমাঝেই জানতে চায়, যা হচ্ছে তা সত্য? নাকি মনের ভ্রম? তৎপর মস্তিষ্ক জানান দেয়, ঘটনা সত্য। ভ্রমের অবস্থান নেই সেখানে।

পাশাপাশি হেঁটে যাচ্ছে ফাইজান ও শায়রা। এখানটায় মানুষের ভীড় কিছু কম। এমনসময় শায়রা ফাইজানকে জিজ্ঞেস করলো,

"সারারাত খাও নি, ঘুমাও নি, ক্লান্ত লাগছে না তোমার? ক্ষুধা তো লেগেছে নির্ঘাত। জানো, আমি কখনোই এত লম্বা সময় না খেয়ে থাকতে পারি না।"

ফাইজান বলল,

"আই নো। তুই না খেয়ে একদমই থাকতে পারিস না। তাও গতকাল আমার কথা ভেবে, শুধুমাত্র আমার জন্য না খেয়ে বসেছিলি। এই কাজের জন্য তুই আমার পক্ষ থেকে একটা চুমু ডিজার্ভ করিস।"

থতমত খেয়ে গেলো শায়রা। চোখ ফিরিয়ে নিলো ফাইজানের উপর থেকে। অন্যদিকে তাকিয়ে ইতস্তত করে বলল,

"রাস্তা-ঘাটে এসব কি বলছো? মাথা ঠিক আছে তোমার? আজকাল মুখের লাগাম হারিয়ে ফেলছো তুমি।"

ফাইজান ওর কথাকে অগ্রাহ্য করে বলল,

"একটু আগে জিজ্ঞেস করছিলি, ক্ষুধা লেগেছে কি না, ক্লান্ত লাগছে কি না? হ্যাঁ লাগছে। তবে তুই চুমু দিলে সব ঠিক হয়ে যাবে। দিবি?"

শায়রা বিস্ময়ের আতিশয্যে কি থেকে কি বলবে, ভাষা হারিয়ে ফেলছে। ফাইজানের থেকে নিজের হাত ছাড়ানোর চেষ্টায় ব্যস্ত থেকে বলল,

"তুমি ছাড়ো আমাকে। আমি ফুপ্পির কাছে যাবো। গিয়ে বলবো, উনার ছেলে পুরোপুরি পাগল হয়ে গেছে। ছাড়োওও!"

ফাইজান ধমকের সুরে বলল,

"মাকে গিয়ে বলবি ? পাগল তো তাহলে তুই! এসব বিষয় মা-কে বলার?"

"নিজে পাগলের মতো কথা বলে আবার আমাকে পাগল বলছো? তুমি তো..."

ফাইজান ভ্রু কুঁচকে বলল,

"বউকে চুমু খাওয়ার মতো স্বাভাবিক কথাটা তোর কাছে পাগলের মতো মনে হচ্ছে?"

শায়রা সঙ্গে সঙ্গে বলল,

"হ্যাঁ অবশ্যই। রাস্তা-ঘাটে এসব বলা পাগলেরই কারবার।"

ফাইজান শায়রার টেনশন বাড়িয়ে দিতে বলল,

"নো টেনশন। রাস্তায় কিছু করবো না। তবে বাসায় গিয়ে সব আদায় করে নিবো। এখন চল, আগে খেয়ে আসি। আমার বউটা আবার না খেয়ে একদমই থাকতে পারে না।"

হৃদয়ের রঙিন ক্যানভাস পর্ব ২৬ গল্পের ছবি