হৃদয়ের রঙিন ক্যানভাস

পর্ব - ২৭

🟢

"কই ছিলি এতক্ষণ দু'জনে?"

ফাইজান ও শায়রা কেবিনে ঢুকতেই মালেকা বেগম সন্দিহান দৃষ্টিতে চেয়ে প্রশ্নটা করে বসলেন ওদের। জবাবে ফাইজান জানালো,

"খেতে গিয়েছিলাম, মা।"

আনুসা মুখ ভার করে বলল,

"দু'জনে একাই? আমাকে তো নিলে না।"

ফাইজান আস্তে করে বলল,

"কাবাবে হাড্ডি কে-ই বা নিতে চায়?"

বাক্যখানা কর্ণগোচর হতেই চোখ বড় বড় করে ওর দিকে চাইল শায়রা। কনুই দিয়ে খোঁচা মেরে ইশারায় বুঝালো, মুখে লাগাম টানতে। ফলস্বরূপ চুপ হয়ে গেলো ফাইজান। মালেকা বেগম যদিও অবাক হয়েছেন ছেলের পরিবর্তনে তবে মুখে প্রকাশ করলেন না। স্বাভাবিক মেনে বললেন,

"ভালো করেছিস। এখন শোন, ডক্টরের সাথে কথা বলেছিস? কখন যেতে পারবো আমরা?"

ফাইজান বলল,

"বিকেলে যেতে পারবো৷"

সারাদিন হসপিটালে থেকে বিকেলের দিকে যাওয়ার তোড়জোড় শুরু হলো তাদের। ডক্টর প্রেসক্রিপশনে কতগুলো ঔষধ লিখে দিলেন এবং বারবার করে সাবধান করে দিলেন যেন ফজল সাহেবকে কোনোপ্রকার প্রেশার না দেয়া হয়। কমপক্ষে আগামী দু'মাস সম্পূর্ণ বেডরেস্ট। কোনো কাজ করতে দেয়া যাবে না৷

অন্যদিকে ডক্টরের উপদেশ শুনে শুনে মহাবিরক্ত হচ্ছেন ফজল সাহেব৷ মনে মনে বলছেন,

"একে তো হাতটা গলায় ঝুলিয়ে দিয়েছে, শান্তিতে নড়াচড়াও করতে পারছি না। আবার বলে বেডরেস্ট। এরচেয়ে ভালো আমাকে চেয়ারের সাথে হাত-পা বেঁধে আটকে রাখুক। অন্তত মনকে স্বান্ত্বনা দিতে পারবো, কিডন্যাপ হয়েছি বলে নড়তে পারছি না। সুস্থ-সবল মানুষটাকে এরাই হাজারটা আদেশ-উপদেশ দিয়ে অর্ধম*রা বানিয়ে রাখে।"

এরপর মোটামুটি বুঝিয়ে বাসায় এনে বিছানায় শোয়ানো গেলো তাকে। ফ্রেশ হয়ে একটু রেস্ট নিয়ে রান্নাঘরে ঢুকলেন মালেকা বেগম৷ শায়রা গেলো তার পিছু পিছু কাজে সাহায্য করতে। রান্নাঘরে ঢুকে বলল,

"ফুপ্পি, আমিও হেল্প করি তোমার। তাহলে তাড়াতাড়ি সব হয়ে যাবে।"

খানিকটা বিস্মিত হলেন মালেকা বেগম। কেননা শায়রা সাধারণত রান্নাঘরে ঢুকে না। আবার মালেকা বেগমও তাকে এ নিয়ে কিছু বলেন না৷ যদি মনে করে, বাড়ির বউ হয়েছে বলে সব চাপিয়ে দিচ্ছে?

তাই আজ হঠাৎ শায়রার আগমনে একটু ভড়কানো স্বাভাবিক। ভদ্রমহিলা শুধালেন,

"তুই করবি? কি ব্যাপার, আম্মাজান? আপনি তো এমনিতে আসেন না। আজ হঠাৎ?"

লজ্জা পেলো শায়রা। এখন সবাইকে কে বুঝাবে ওর মধ্যে বউ-বউ একটা অনুভূতি মাথাচাড়া দিতে শুরু করেছে! বিয়ের একমাসেও মনে হয় নি ও বাড়ির বউ। ফুপুর বাড়ি মনে করে থেকেছে এতদিন। কিন্তু এখন কেন যেন শশুড়বাড়ি শশুড়বাড়ি মনে হচ্ছে। নিজেকে মনে হচ্ছে বাড়ির বউ। এজন্য আগ বাড়িয়ে রান্নাঘরে ঢোকা। মনের এসব গোপন কথা কি আর সবাইকে জানানো যায়?

শায়রা ঠোঁটে হাসি টেনে আমতা-আমতা করে বলল,

"আরেহ, তেমন কোনো ব্যাপার না ফুপ্পি। তুমিও তো বাইরে থেকেই এসেছো। টায়ার্ড নিশ্চয়ই? তাই ভাবলাম আমি গিয়ে সাহায্য করে দিলে জলদি জলদি হয়ে যাবে। এছাড়া আর কোনো কারণ নেই।"

মালেকা বেগম বাঁধা দিয়ে বললেন,

"থাক, তোদের এত চিন্তা করতে হবে না। শুধু এক পদই তো রান্না করবো। সময় লাগবে না৷ আমি করে নিতে পারবো।"

শায়রা না-সূচক ইশারায় মাথা নেড়ে বলল,

"সমস্যা নেই, ফুপ্পি৷ আমি হেল্প করি না!"

এমনসময় গোসল সেরে মাথা মুছতে মুছতে রুম থেকে বেরিয়েছে ফাইজান। পড়নে শুধু একটা কালোরঙা ট্রাউজার আর গলায় তোয়ালে ঝুলানো। সারাদিন হসপিটালে ছুটোছুটিতে বাসায় এসে গোসলটা না করলে শান্তি পেতো না একদমই৷ এখন শান্তিমতো রুম থেকে বেরোতেই ওদের কথার আওয়াজ পেয়ে এগিয়ে এলো রান্নাঘরের দিকে। উভয়ের আলাপের শেষাংশ শুনেই বলল,

"ও হেল্প করতে চাইছে, তাহলে করতে দাও না! না করছো কেন? শিখতে হবে না?"

ছেলের একেকটা কথায় তার প্রতি সন্দেহ বেড়েই যাচ্ছে মালেকা বেগমের। এবারও তর্ক ফেলে ভ্রু কুঁচকে চাইলেন ছেলের দিকে। বললেন,

"শিখতে হবে? কারণ?"

ফাইজান নির্বিঘ্নে বলল,

"এটার কারণ লাগে আবার? মামিই তো বলেছিলো এই অকর্মা নাকি কোনো কাজ জানে না। তুমি যেন ওকে নিজের মতো শিখিয়ে নাও। তাহলে এখন যখন শিখতেই চাইছে তাহলে মানা করছো কেন?"

এতক্ষণ শান্তভাবে থাকলেও আচমকা ক্ষে*পে উঠলো শায়রা। রান্নার খুন্তি হাতে তুলে চেঁচিয়ে বলল,

"তুমি কি এখন এখানে আমাকে খোঁচা মারতে এসেছো? আমি অকর্মা? আর নিজে কত কাজের?"

ফাইজান চমকে গিয়ে এক কদম পিছিয়ে বলল,

"এমা! তুই খুন্তি তুলেছিস কেন? মারবি নাকি?"

শায়রা ক্ষিপ্ত বেগে বলল,

"হ্যাঁ। তুমি এক্ষুনি বের হও রান্নাঘর থেকে! নাহলে চুলোয় খুন্তি গরম করে তারপর তোমার গায়ে লাগাবো!"

মালেকা বেগম যাও একটু আশা করেন ওদের মধ্যে সব স্বাভাবিক হওয়ার, ঠিক সেই মুহুর্তে ওদের মধ্যে হওয়া এমন যুদ্ধ দেখে হতাশ হতে হয় তাকে। এবারেও ব্যতিক্রম হলো না। ভদ্রমহিলা অতিষ্ঠ ভঙ্গিতে বললেন,

"থামবি তোরা? ঝগড়ার জন্য স্থান-কাল-পাত্রভেদ কোনোটাই লাগে না তোদের? আর ফাইজান, তুই যা এখন এখান থেকে।"

ফাইজান অবাক হওয়ার ভান করে বলল,

"ও আমাকে খুন্তি দিয়ে ভয় দেখানোর পর তুমি আমায় চলে যেতে বলছো, আম্মু? এর কতটা খারাপ ইফেক্ট পড়বে তুমি জানো? তোমার গুনধর ভাতিজি সবজায়গায় রটাবে, ফাইজান আহমেদ বউয়ের হাতের খুন্তিকে ভয় পায়।

অসম্ভব! আমি এইভাবে আমার ইজ্জত পানিতে মিশে যেতে দিতে পারি না!"

শায়রা হাতের খুন্তিটা পাশে রেখে দিয়ে বলল,

"রেখে দিয়েছি। আর কেউ তোমার নামে কিচ্ছু রটনা করবে না। এবার বের হও এখান থেকে। উদ্ধার করো আমাকে।"

ফাইজান তিক্ত স্বরে জানালো,

"আমার ঠেকা পড়েনি তোকে উদ্ধার করার। আমার বাপের বাড়ি, আমার মায়ের রান্নাঘর, আমি যাবো না এখান থেকে। তোর মন চাইলে তুই যা।"

শায়রাও গেলো না, ফাইজানও গেলো না। মাঝদিয়ে মালেকা বেগম নিজেই বিরক্ত হয়ে চলে গেলেন রান্নাঘর থেকে। গিয়ে বসে পড়লেই ডাইনিং টেবিলের চেয়ারে।

তিনি শতভাগ নিশ্চিত এই সময়ে আর কোনো কাজ হবে না। ওরা ঝগড়া শেষ করে রান্নাঘর থেকে বেরুলেই রান্নায় হাত দেবেন তিনি।

মালেকা বেগম যাওয়ার পর শায়রা আবার খুন্তি তুলল। রাগান্বিত স্বরে বলল,

"দেখলে? তোমার নটাংকির জন্য ফুপ্পিই চলে গেলো। এখন তুমি রান্না করো বসে বসে।"

ফাইজান ভ্রুযুগল কুঁচকে বলল,

"এ কেমন কথা? আমি রান্না-বান্না জানি নাকি? এসব কাজ তোর। তুই কর।"

শায়রা চেতে-টেতে একাকার হয়ে বলল,

"তাহলে তুমি যাও রান্নাঘর থেকে। তারপর আমি রান্না করবো।"

ফাইজান হার মেনে নিয়ে বলল,

"আচ্ছা আচ্ছা যাচ্ছি। এমনিতেও রান্নাঘরে বসে থাকার শখ আমার নেই৷ এসেছিলাম তো, তোরা কি করছিস সেটা দেখতে। কিন্তু তুই তো..."

কথার মাঝপথে থেমে যাওয়ায় কৌতুহলী হয়ে ঘুরলো শায়রা। ভ্রু নাচিয়ে শুধালো,

"আমি তো কি?"

ফাইজান ওর পাশাপাশি এসে দাঁড়ালো। কন্ঠস্বর বেশ নামিয়ে বলল,

"তুই যে এমন ন*ষ্ট চোখে তাকাবি আমার দিকে, সেটা তো ভাবি নি! ছিহ, শায়ু। দিলি তো এই সন্ধ্যা রাতে আমার ইজ্জতটা মে*রে!"

হতভম্বতায় বিস্ফারিত নেত্রে কিয়ৎক্ষণ হা করে চেয়ে রইলো শায়রা। পরপর ঢোক গিলে বলল,

"কি..কি বলছো এগুলো? ন*ষ্ট চোখে তাকিয়েছি মানে? এসব কেমন কথা?"

ফাইজান ঘুরে একবার দেখে নিলো কেউ আশেপাশে আছে কি না! পরমুহূর্তেই শায়রার কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বলল,

"আমি খালি গায়ে এসেছি বলে আমার উপর কুনজর দিবি? বুঝি, বুঝি, সব বুঝি! কুনজর না পড়লে গায়ে খুন্তি দিয়ে ছ্যাঁ*কা দেয়ার কথা বলতি না৷ ছিহ, শায়ু! মানছি আমি তো হাসবেন্ড হই। তাই বলে যেখানে-সেখানে আমার উপর নজর খারাপ করাটা কি ঠিক? একটু তো কন্ট্রোল কর!"

কথাগুলো বলেই হনহন করে চলে গেলো সেখান থেকে। ভাবখানা এমন দেখালো যে শায়রার কাজে সে ভীষণ লজ্জা পেয়েছে, বিব্রত হয়েছে। অথচ শায়রা জানে, এগুলো সব ফাইজানের ফাজলামি। তাকে ইচ্ছে করে লজ্জায় ফেলার কোনো রাস্তাই বাকি রাখছে না সে। মেয়েটা এখনো স্তব্ধ, হতবিহ্বল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ভাষা হারিয়ে ফেলেছে কোনো শব্দ উচ্চারণের। মন-মস্তিষ্ক নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ চালাচ্ছে,

"এ কেমন পরিবর্তন হলো? এই পরিবর্তন কি আদ্যো সে চেয়েছিলো? এমন উদ্ভট জিনিস সব তার সাথেই কেন হচ্ছে? আগে মনে হতো, এই বিগড়ানো ছেলেটার সাথে সংসার করা সম্ভব নয়। এখন মনে হচ্ছে, এই লাগামহীন ছেলেটার সাথে সংসার করা একদমই অসম্ভব!"

ফাইজান চলে যাওয়ার পর রান্নাঘরে এলেন মালেকা বেগম। শায়রাকে ওরকম চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে জিজ্ঞেস করলেন,

"একটু আগে তো তুমুল ঝগড়া চলছিলো। এখন কি এমন বললি যে ছেলেটা চুপচাপ চলে গেলো?"

শায়রা স্তব্ধ দাঁড়িয়ে থেকে বিড়বিড়িয়ে আওড়ালো,

"আমি কিছু বলার সুযোগ পেলাম কই? নিজেই তো সব বলল আর আমার উপর মিথ্যে কতগুলো অপবাদ দিয়ে চলে গেলো।"

কথাগুলো মালেকা বেগমের কর্ণগোচর হয়নি। তিনি সবে কাজে হাত লাগিয়েছেন। পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন,

"কিরে? কিছু বলছিস না যে?"

নড়ে-চড়ে উঠলো শায়রা। মাথা নেড়ে বলল,

"কিছু না। চলো কাজগুলো শেষ করে ফেলি।"

*********

ফজল সাহেবের বিছানা থেকে প্রয়োজন ব্যতীত নামা-ই নিষেধ করে দিয়েছে বাড়ির লোকজন। তারা খাবারটা অব্দি ঘরে নিয়ে গিয়েছে। মালেকা বেগম খাবার খাইয়ে দেয়ার পর শায়রা নিয়মমতো সবগুলো ঔষধ খাইয়ে নিশ্চিত হয়েছে। এরপর নিজেরা ডাইনিং টেবিলে বসেছে রাতের খাবার খেতে।

শায়রা এসেছে সবার শেষ। এসে দেখলো মালেকা বেগম ও আনুসা পাশাপাশি চেয়ারে বসেছে। ফাইজানের পাশের চেয়ারটা খালি আছে। এছাড়া আরও দু'টো চেয়ার খালি। শায়রা ভেবে দেখলো, ফাইজানের সাথে বসা ওর জন্য একদমই নিরাপদ না। উপরে-উপরে ভদ্র সেজে এই ছেলে যে তলে-তলে কি, সেটা একটু হলেও আন্দাজ করতে পেরেছে শায়রা। তাই ওর সাথে বসার প্রশ্নই আসে না। শায়রা অন্যপাশে ঘুরে ফাইজানের থেকে দূরত্ব বজায় রেখে অন্য চেয়ারটায় বসতে যাবে, তার আগেই ফাইজান ইশারায় ওকে নিজের পাশের চেয়ারে বসতে বলল।

এক মুহুর্তের জন্য ঘাবড়ালো শায়রা। মাথা নেড়ে না বোঝালো। লাভ হলো না। ফাইজান আরও চোখ রাঙিয়ে বোঝালো, পাশে না বসলে খবর আছে!

অগত্যা হতাশ হয়ে ফাইজানের পাশেই বাধ্যতামূলক বসতে হলো শায়রাকে। খেতে বসেও মুখটাকে প্যাঁচার মতো করে রাখলো।

মাঝপথে মালেকা বেগম জিজ্ঞেস করলেন,

"ফাইজান, আজকে খাবার কেমন হয়েছে বাবা?"

ফাইজান ছোট্ট শব্দে উত্তর দিলো,

"ভালোই।"

আনুসা খুব আগ্রহী হয়ে শুধালো,

"শুধু ভালো? নাকি খুব টেস্টি ভালো?"

ফাইজান ওর দিক চোখ ছোট ছোট করে তাকাতেই কথাখানা শুধরে নিয়ে বলল,

"মানে খাবার মজা হয়েছে কি না, সেটা জিজ্ঞেস করলাম!"

ফাইজান চোখ নামালো। নিজের প্লেটের দিকে তাকিয়ে জবাব দিলো,

"মজাই হয়েছে।"

মালেকা বেগম খুব খুশি হয়ে বললেন,

"আজকের রান্না কিন্তু শায়রা করেছে! আমি শুধু দেখিয়ে দিয়েছি।"

ফাইজান সঙ্গে সঙ্গে কথা ঘুরিয়ে নিলো,

"এজন্যই তো বলি খাবারের টেস্ট এত বিকট হয়েছে কেন? ওকে ভালো করে রান্না শিখিও তো আম্মু৷ যেন খাওয়ার যোগ্য হয়।"

আনুসার থেকে বেশি আগ্রহী ছিলো শায়রা। খুব ইচ্ছে ছিলো, আজ হয়তো ফাইজানের মুখে নিজের প্রশংসা শুনবে। কিন্তু ছেলেটা ওর মনের কথা বুঝলে তো? মেয়েটার কৌতুহলে জ্বলজ্বল করা মুখটায় আচমকা অন্ধকার নেমে এলো। মুখ গোমড়া করে বলল,

"তাহলে খাচ্ছো কেন? আমার রাতের রান্না যখন এতই খারাপ, তাহলে না খেলেই তো হয়।"

ফাইজান খাওয়া থামিয়ে তাকালো শায়রার দিকে। স্পষ্ট বুঝলো ওর মন খারাপ হয়েছে। সে স্মিত হেসে বলল,

"তোকে কাল যা বললাম, আজই তা ভুলে গেলি? স্মৃতিশক্তি এত খারাপ হলে চলবে কি করে?"

শায়রা কথার অর্থটা তাৎক্ষণিক ধরতে পারলো না। মস্তিষ্কে কথাটা ঢুকলো তখন, যখন ফাইজান আনুসাকে আরেকটু তরকারি দেয়ার আদেশ দিলো। আনুসা তাতে খুব উৎফুল্ল হয়ে সাথে সাথে বলে ফেলল,

"ভাইয়া! মানুষ কিন্তু ডাবল খাবার তখনই নেয়, যখন খাবারটা তার কাছে খুব মজা লাগে। এম আই রাইট?"

ফাইজান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

"হ্যাঁ, তুই বুঝিস। এখন যার বুঝার সে বুঝলেই হয়!"

শায়রার মুখের উজ্জ্বল হাসিটা ফিরে এলো হঠাৎ। তবুও অভিমানের ভান ধরে বলল,

"ফুপ্পি, আমি আজকের পর থেকে রান্না করলে তোমার ছেলের জন্য রান্না করবো না। কারণ, আমার রান্না তো মজা হয় না। ওকে বলে দিও বাইরে থেকে খেয়ে নিতে।"

শায়রা ভাবলো কিছু একটা, হলো আরেকটা। ফাইজান ওর ভাবনার থেকে আরও দু'ধাপ এগিয়ে চড়া গলায় ধমক ছুড়লো,

"ফুপা-ফুপ্পি কি হ্যাঁ? শশুড়-শাশুড়িকে কে ফুপা-ফুপ্পি ডাকে? মা-বাবা ডাকার অভ্যাস করতে পারিস না?"

এই ধমক শুনে শায়রা যতটুক না অবাক হয়েছে, তারচেয়ে কয়েকগুন বেশি বিস্মিত হয়েছেন মালেকা বেগম। রীতিমতো কাশি উঠে গেছে ভদ্রমহিলার। শায়রা ব্যতিব্যস্ত হয়ে তৎপর পানি এগিয়ে বলল,

"খাওয়ার সময় তাড়াহুড়ো করো না। এই নাও, পানি খাও ফু.."

এতটুক বলতেই একটু আগে ফাইজানের দেয়া ধমকটা মনে পড়ে গেলো শায়রার। তাই মাঝপথে বিরতি দিয়ে ধীরে-সুস্থে উচ্চারণ করলো,

"পানি খাও, মা।"

ভদ্রমহিলা খুশিতে স্বশব্দে কয়েকবার "আলহামদুলিল্লাহ" পড়ে ফেললেন। পারলে এখনই কেঁদে ফেলতেন। নিজেকে বহু চেষ্টায় সামলিয়ে ছেলেকে বললেন,

"এত চমক একবারে দিস না, বাবা। পরে হার্ট ফেইল করে আমিই হসপিটালে চলে যাবো।"

*********

রাত্রি এগারোটা নাগাদ ফজল সাহেবের ফোনে কল এসেছে ম্যানেজার শফিক সাহেবের। কাল সকাল এগারোটায় খুব গুরুত্বপূর্ণ মিটিং আছে। এই বিজন্যাস মিটিংটায় ডিল হাতছাড়া হয়ে গেলে তিন লক্ষ টাকার লোকসান হয়ে যাবে। তাই ভদ্রলোক কিছুতেই মিটিং ছাড়তে চাইছেন না। এদিকে বেডরেস্টের বাহানায় বাড়ির লোক তাকে বিছানায় শুইয়ে রেখেছে। মালেকা বেগমের সামনে জেদ ধরেও লাভ হলো না। তার একটাই কথা,

"টাকা গেলে টাকা আসবে। আগে মানুষের জীবন আর সুস্থতা। এই অবস্থায় তিনি কোনো খামখেয়ালী করতে পারবেন না।"

হাল ছাড়লেন না ফজল সাহেব। হতাশ কন্ঠে বললেন,

"পুরো সংসারের দায়িত্বটা আমার উপর। আমি কিভাবে সব ভুলে দু'মাস বিছানায় শুয়ে থাকবো? এমনিতে দুইদিন হসপিটালে থেকেই কতগুলো টাকা খরচ হয়েছে। এখন যদি আমি বাড়িতে বসে থাকি তাহলে চলবে কি করে বলো? ছেলেটা তো এখনো এসব দায়িত্ব নিতে শিখে নি। কিভাবে সব চলবে?"

মালেকা বেগম বললেন,

"চলবে। হয়তো লস হবে অনেক কিন্তু আল্লাহ চালিয়ে নিবে ঠিকই। তোমার সুস্থতা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।"

নাছোড়বান্দা ফজল সাহেব বললেন,

"তুমি বুঝতে পারছো না, ফাইজানের আম্মু। আমি দুইমাস বাসায় বসে থাকলে আমার পুরো বিজন্যাস ডুবে যাবে। বাড়িতে বসে থাকা পুরোই অসম্ভব।"

"কি নিয়ে কথা হচ্ছে?"

তাদের কথার মাঝে রুমে ঢুকলো ফাইজান। তার পিছুপিছু এসে পড়েছে শায়রাও।

সে এসেছিলো বাবার খবর নিতে। তখনই দু'জনকে বেশ সিরিয়াস ভঙ্গিমায় আলাপ করতে দেখে প্রশ্নটা করে ফেলল। মালেকা বেগম তৎক্ষনাৎ উত্তর দিলেন,

"তোর বাবা কাল অফিস যেতে চাইছে। কি বলে মিটিং আছে, না গেলে অনেক টাকার লস হয়ে যাবে! তিনি বেড রেস্টে থাকতেই পারবেন না কারণ তার বিজন্যাস ডুবে যাবে। তাকে কিভাবে বুঝাই বল?"

ফজল সাহেব বললেন,

"তোমার মা-কে একটু বুঝাও ফাইজান। আমি বাড়িতে বসে থাকলে চলবে না। কালকের মিটিংটা এটেন্ড করতেই হবে আমার।"

ফাইজান জিজ্ঞেস করলো,

"মিটিং-টা বেশিই গুরুত্বপূর্ণ, বাবা?"

ফজল সাহেব গুরুগম্ভীর স্বরে বললেন,

"অবশ্যই। এই ডিলটা হাতছাড়া হয়ে গেলে প্রায় তিনলক্ষ টাকা লস হয়ে যাবে আমাদের। আমি দু'মাস বাসায় বসে থাকলে এরকম আরও কত লস হবে, সেটা তোমার মা বুঝতেই পারছে না! তাই আমি ভেবেছি আমি কাল থেকেই অফিস জয়েন করবো।"

এই মুহুর্তে সবাইকে অবাক করে দিয়ে ফাইজান বলল,

"তোমার অফিসে যেতে হবে না। ডক্টর বলেছে তোমার বেডরেস্ট প্রয়োজন। তুমি রেস্ট করো। কাল থেকে অফিস জয়েন করবো আমি। মিটিং-টাও আমিই এটেন্ড করবো। শুধু তুমি সব বুঝিয়ে দিলেই হবে।"

হৃদয়ের রঙিন ক্যানভাস পর্ব ২৭ গল্পের ছবি