জোর হাওয়ায় দুলছে জানালার পর্দা৷ ফাঁকে ফাঁকে প্রবেশ করছে সূর্যের আলো। খানিক বাদে বাদেই চোখে তীব্র আলোর ছঁটা পড়তেই চোখ মেললো শায়রা৷ চোখ ডলতে ডলতে আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসলো বিছানায়। পাশে তাকিয়ে লক্ষ্য করলো ফাইজান এখনো গভীর নিদ্রায় ডুবে।
শায়রা সারারাত ফাইজানের বুকেই মাথা রেখে ঘুমিয়েছে। কোনোভাবে আজও ফাইজান আগে উঠলে ওদিনের মতোই কথা শুনাতো। ভাগ্যিশ আজ শায়রাই আগে ঘুম থেকে উঠেছে।
কথাটা খেয়ালে আসতেই মুচকি হাসলো শায়রা। ঝুঁকে এসে ফাইজানের এলোমেলো চুলগুলোতে হাত বুলিয়ে আস্তে করে বলল,
"এর চেহারা দেখলে কে বলবে, দিনে এতগুলো উল্টোপাল্টা কথা ও-ই বলে আমাকে?"
অতঃপর দেয়ালঘড়িতে তাকিয়ে দেখলো সাড়ে সাতটা বাজছে। দেখেই শায়রা আলতো স্পর্শে ধাক্কা দিলো ফাইজানকে,
"এই বাউন্ডুলে, উঠো ঘুম থেকে। সকাল হয়ে গেছে।"
ওর ডাকে ফাইজানের ঘুম ভাঙলেও চোখ খুলে চাইল না। আঁখিদ্বয় বন্ধ রেখেই কপালে বিস্তর ভাজ ফেলে বলল,
"তোকে একবার শিখিয়েছি না, কিভাবে সকালে ডেকে দিতে হয়? কয়দিনেই আবার ভুলে গেছিস?"
শায়রা চুপ হয়ে গেলো। মস্তিষ্ক হাতড়ে খুঁজে বের করার চেষ্টা করলো, ফাইজান কোনদিনের কথা বলছে? কিছুক্ষণ ভাবতেই ওদের বিয়ের পরদিনের কথা মনে পড়ে গেলো। সাথে মনে পড়লো ফাইজানের উপদেশও।
সঙ্গে সঙ্গে বিরক্তিভাব প্রকাশ করে শায়রা বলল,
"আদিখ্যেতা! ওরকম চা বানিয়ে এনে ভালোবেসে ডেকে উঠাতে পারবো না আমি। ভালোভাবে ডাকছি, উঠলে উঠো। না উঠলে কিভাবে পানি ঢেলে উঠাতে হয়, তা আমার জানা আছে।"
শায়রার থেকেও দ্বিগুন বিরক্ত হয়ে উঠে বসলো ফাইজান। তীক্ষ্ণ স্বরে বলল,
"ওসব ভালো কাজ তোর দ্বারা কোনোদিনও যে হবে না, তা আমার জানাই আছে। পারিসই তো ওই সারাদিন চিল্লাতে। ভাঙা রেডিও কোথাকার!"
শায়রা বিদ্যুৎবেগে বিছানা থেকে নেমে পড়লো। রুম থেকে বের হওয়ার আগে বলল,
"সকাল সকাল তোমার সাথে ঝগড়া করে মুড খারাপ করতে চাইছি না।
মানে, কি আর বলবো! একটাদিনও যদি ঝগড়া ছাড়া সকাল শুরু করে, তাহলে বোধহয় উনার জীবন-যৌবন অশুদ্ধ হয়ে যাবে।"
ফাইজান বিপরীতে উঁচু আওয়াজে প্রতিবাদ করলো,
"মুখ সামলে কথা বল! যৌবনের উপর আঙুল তুলিস না। বিয়ের এতদিন পরেও আমার যৌবন সম্পূর্ণ শুদ্ধ আছে।"
শায়রা কটমট করে বলল,
"ছিহ, অসভ্য! খালি উল্টোপাল্টা কথা।"
বলেই দুম করে দরজা টেনে বের হলো। জোরে-শোরে শব্দ হলো একটা। ফলে ডাইনিং টেবিলের কাছে কাজে ব্যস্ত থাকা মালেকা বেগমও ঘুরে তাকালেন। তৎপর শায়রাকে দেখলেন ফাইজানের রুম থেকে বেরিয়ে এখানেই আসছে, এলোমেলো চুলগুলো হাতখোঁপা করতে করতে।
ভদ্রমহিলা এতদিন শায়রাকে আনুসার রুমেই থাকতে দেখেছেন। আজকের ঘটনায় খানিক থতমত খেলেন বটে। তবে বলার মতো কিছু খুঁজে পেলেন না। শায়রা নিজেই এসে বলল,
"ফুপ্পি, আনুসা উঠে নি? কলেজ যাবে না?"
মালেকা বেগম ধাতস্থ হয়ে বললেন,
"যাবে মনে হয়। তুই যাবি না ভার্সিটি?"
শায়রা উত্তরে বলল,
"না। ভাবছি আজ বাড়িতেই থাকবো। তোমার বাউন্ডুলে ছেলে আবার অফিস যাচ্ছে। তোমার টেনশন হচ্ছে না, কি থেকে কি করবে? আমার তো প্রচুর টেনশন হচ্ছে! ভাবছি, অফিসে প্রথমদিন গিয়েই যদি সবার উপর ঝাড়াঝাড়ি শুরু করে তাহলে কি হবে?"
মালেকা বেগম স্মিত হেসে বললেন,
"সব টেনশন ছেলের বউকে দিয়ে নিজে নিশ্চিত থাকবো বলেই তো ছেলের বিয়ে দিয়েছি। তাই এখন আর আমার টেনশন নেই। যাই হোক, ও উঠেছে?"
শায়রা বলল,
"হ্যাঁ, ডেকে দিয়ে এসেছি। ফ্রেশ হয়ে বের হবে মনে হয়। আচ্ছা শুনো, মা অথবা বাবা, কেউ ফোন করেছিলো গতকাল?"
মালেকা বেগম জানালেন,
"না রে। আমিই ভেবেছিলাম ফোন করবো। কিন্তু কাল হসপিটাল, বাসা ছুটোছুটি করে আর সময় পেলাম কই? আজ ফোন করবো।"
শায়রা সম্মতিসূচক ইশারায় মাথা নাড়লো। মনে মনে ভাবলো, আজ ও নিজেই ফোন করে এ*ক্সিডেন্টের কথাটা জানিয়ে দিবে। দেখতে আসার একটা দায়িত্ব আছে না?
এমনসময় আনুসাও বের হলো রুম থেকে। দেখেই বুঝা যাচ্ছে, মাত্রই ঘুম ভেঙেছে তার। চোখ ডলতে ডলতে এসে বসলো চেয়ারে। মালেকা বেগম জিজ্ঞেস করলেন,
"নবাবজাদির মতো যে এসে বসে পড়লি, কলেজে কে যাবে?"
আনুসা হাই তুলে বলল,
"যাবো না আজ। ভালো লাগছে না।"
মালেকা বেগম বললেন,
"বাহ! কেউ কলেজ যাবে না, ভার্সিটি যাবে না। আজ সব বাসায় বসে মশা মারবে বুঝি?"
আনুসা প্রতিত্তোরে বলল,
"আরে মা, আমাদের কথা বাদ দাও। ভাইয়া যে অফিস যাচ্ছে সেটার কথাই ভাবো। সবচেয়ে ইম্পর্ট্যান্ট ব্যাপার এটাই। তাই ভাইয়ার নাস্তা রেডি করো।"
খানিক বিরতি নিয়ে আবারও চেঁচালো আনুসা,
"ভাবিইইইই!"
আকস্মিক চিৎকারে চমকে উঠলো শায়রা। ভড়কে গিয়ে বলল,
"কি হয়েছে? এভাবে চিল্লাচ্ছিস কেন?"
আনুসা বোকার মতো দাঁত কেলিয়ে বলল,
"না, তেমন কিছু না। ভাবি ডাকার অভ্যাস করছিলাম আরকি। কাল দেখলে না, তুমি আম্মুকে ফুপ্পি ডেকেছিলে বলে ভাইয়া কেমন চে*তে গেলো তোমার উপর? এখন আমি তোমাকে আপু বললে যদি আমার উপরও রেগে যায়? তাই আগে-ভাগেই অভ্যাস শুধরে নেয়ার চেষ্টা করছি।"
কপাল চাপড়ালো শায়রা। মালেকা বেগম ওর কথায় হাসতে হাসতে চলে গেলো রান্নাঘরে। এর পরপরই আনুসা উঠে শায়রার পাশে দাঁড়িয়ে কানে-কানে বলল,
"কাল রাতে আমার রুমে গিয়েছিলে কি করতে?"
শায়রা অদ্ভুত দৃষ্টিতে আনুসার দিক চেয়ে বলল,
"এমনিই গিয়েছিলাম। কোনো সমস্যা?"
আনুসা চোখ ছোট-ছোট করে পরবর্তী প্রশ্ন ছুড়লো,
"সেই তো আবার ভাইয়ার রুমেই গেলে। তাহলে আমার ঘুম ভাঙানোর কারণ কি? সেটা জানতে পারি?"
থতমত খেয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিলো শায়রা। কিছুক্ষণ আমতা-আমতা করে বলার মতো কিছু খুঁজে না পেয়ে বাহানা দিলো,
"আমি ফ্রেশ হয়ে আসি।"
বলেই হাঁটা দিলো রুমের দিকে। একপ্রকার পালিয়ে বাঁচলো বলা চলে। কিন্তু রুমে আর কতক্ষণই বসে থাকবে? ফাইজানের জন্য কি সেই সুযোগও হবে তার?
অফিস যাবে বিধায় সকাল-সকাল গোসল সেরে নিয়েছে ফাইজান। সে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়েই হাঁক-ডাক শুরু করেছে শায়রার নাম ধরে। এরপর আর রুমে বসে থাকা হলো না শায়রার। চলে আসতে হলো ফাইজানের রুমে। ভেতরে ঢুকেই তিক্ত স্বরে চেঁচিয়ে বলল,
"কি হয়েছে কি? ওমন ষাঁড়ের মতো চিল্লাচ্ছো কেন? আমি কানে শুনতে পাই। বয়রা নই।"
ফাইজান নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল,
"ওহ আচ্ছা। শুনতে পাস তাহলে? এতক্ষণেও শুনছিস না দেখে ভাবলাম আবার কানে সমস্যা-টমস্যা দেখা দিলো নাকি!"
শায়রা ক্ষিপ্ত স্বরে বলল,
"এখনো সমস্যা হয় নি। কিন্তু তুমি রোজ কানের কাছে এভাবে চেঁচাতে থাকলে নির্ঘাত কানটা যাবে আমার!"
ফাইজানের খুবই সিরিয়াস হয়ে বলল,
"সরি, আমার বাচ্চা-কাচ্চার জন্য বয়রা মা নিবো না আমি।"
শায়রা ত্যক্তবিরক্ত হয়ে নিজমনে বলল,
"উফফ! যন্ত্রণা!"
অতঃপর গলা খ্যাঁকাড়ি দিয়ে সাবলীলভাবে বলল,
"এসব ডায়লগ ছেড়ে কেন ডেকেছো ওটা বলো।"
ফাইজান বলল,
"আমি অফিস যাচ্ছি। তোর মনে হয় না, এই সময়টায় তোর অনেকগুলো দায়িত্ব আছে? আমাকে সবকিছু গুছিয়ে দেয়া তোর দায়িত্ব না?"
শায়রা তাচ্ছিল্যসূচক ভাব-ভঙ্গি প্রকাশ করে বলল,
"এহহহ! এসেছে আমার মহারাজ! যাচ্ছে বিশ্বজয় করতে, তাই আমি উনার ঢাল-ত*লোয়ার রেডি করে দিবো। এখন কি বলবে জামা-কাপড়ও পড়িয়ে দিতে হবে?"
ফাইজান একপেশে, মিটিমিটি হেসে বলল,
"খারাপ হবে না। ট্রাই করতে পারিস!"
শায়রা লজ্জা পাওয়ার বদলে ঝা*ড়ি মারলো,
"চুপ থাকো! ইদানীং বেশিই অ*ভদ্র হয়ে যাচ্ছো তুমি। মুখে আটকায় না কিছু, তাইনা?"
ফাইজান আচমকা কথা-বার্তাহীন শায়রার খুব কাছে এগিয়ে গেলো। ভড়কে গেলো মেয়েটা। কয়েককদম পিছিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে পা সরাতেই ফাইজান দু'হাতে শায়রার কোমড় স্পর্শ করে কাছে টেনে নিলো। ঘাঁড়ে মুখ গুজে ফিসফিসে স্বরে বলল,
"বউয়ের সামনে কিছু বলতে গেলে লজ্জা পেতে হয় না। নাহলে বউয়ের লজ্জায় লাল টুকটুকে হয়ে যাওয়া মুখখানা দেখার সুযোগ মিস হয়ে যেতে পারে!"
হঠাৎ এমন কাছে টেনে নেয়া এবং এরূপ কথার ফলাফল হিসেবে কিছুক্ষণের জন্য শায়রার শ্বাসরুদ্ধ হয়ে এলো। ছটফটিয়ে উঠলো ফাইজানের থেকে ছাড়া পাওয়ার জন্য। ফাইজানের বলা বাক্যের সত্যতা বোঝাতেই হয়তো লাজে রক্তিম বর্ণ ধারন করতে শুরু করলো শায়রার কপোলদ্বয়। সে কাঁপা-কাঁপা কন্ঠে বলল,
"কি করছো এসব? রুমের দরজা খোলা আছে। ছাড়ো আমাকে।"
অল্প কিছু শব্দ উচ্চারণ করতে গিয়ে বারকয়েক থামতে হলো তাকে। নিশ্বাসের গতি জোরালো হচ্ছে অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শে। বুজে যাচ্ছে নেঁতিয়ে পড়া ফুলের মতো। ফাইজানের সেসবে পাত্তা নেই। এখনও ঘাঁড়ে মুখ গুজে আছে। এরপর হঠাৎ-ই কোনো পূর্বাভাস ব্যতীত শায়রার ঘাঁড়ে কামড় বসিয়ে দিলো ফাইজান।
ব্যাথা পেয়ে মৃদু আর্তনাদ করে উঠলো মেয়েটা। সঙ্গে সঙ্গে ওকে ছেড়ে দূরে সরে দাঁড়ালো ফাইজান৷ বিশাল কার্য উদ্ধার করেছে এমন একটা ভাব করে গা-ঝাড়া দিয়ে বলল,
"তুই ওইদিন আমাকে কামড় দিয়েছিলি, আজকে আমি তোকে দিয়েছি। হিসাব বরাবর। আমার প্র*তিশোধ নেয়া শেষ।"
হতভম্ব হয়ে গেলো শায়রা। অনুভূতি সব উঁবে গেলো কর্পূরের ন্যায়। কিয়ৎক্ষণ নিরব থেকে অবিশ্বাস্য স্বরে জানতে চাইলো,
"তুমি শুধু ওইদিনের প্র*তিশোধ নেয়ার জন্য এমন করলে?"
ফাইজান ঘাঁড় উঁচিয়ে নিরুদ্বেগ ভাব দেখিয়ে বলল,
"অবশ্যই। এছাড়া আর কোনো কারণ থাকতে পারে নাকি?"
এ কথা শুনে শায়রার রাগ হলো ভীষণ! ওর গলুমলু গালদু'টো এতক্ষণ লজ্জায় লাল হয়েছিলো, এখন হয়েছে রাগে। ওর সাধ্যে কুলালে এতক্ষণে নিশ্চিত ফাইজানকে তুলে আছাড় মারতো।
সে রীতিমতো ফুঁসে ওঠে বলল,
"তুমি একটা ধান্দাবাজ, পাজি লোক! শুধুমাত্র প্র*তিশোধ নেয়ার জন্য তুমি এমন করলে? আমার যে আরেকটু হলে দম আটকে যাচ্ছিলো, সে বেলা? অবশ্য তাতে তোমার কী-ই বা আসে যায়?"
ফাইজান আঁতকে উঠার ভান করে বলল,
"এত রেগে যাচ্ছিস কেন, শায়ু? আমি তো আস্তেই কামড় দিয়েছি। তুই তো পুরো দাগ বসিয়ে দিয়েছিলি! তখন কি আমি এমন করেছিলাম?"
শায়রা তেঁতে উঠে বলল,
"এখন পুরোনো কথা টেনে লাভ হবে না। কান খুলে শুনে রাখো! দ্বিতীয়বার আমার কাছে আসার চেষ্টা করলে, কে*টে টুকরো টুকরো করে ফেলবো!"
এহেন ছোট-খাটো হুমকিতে ভয় পাওয়ার বান্দা ফাইজান নয়। বরঞ্চ শায়রাকে জ্বালাতে পেরে বেশ মজা উপভোগ করছে ও। শায়রাকে রেগে-মেগে ফুলতে দেখাটা ওর কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরতম দৃশ্যগুলোর মধ্যে একটি। আর রাগের কারণ যদি ফাইজান নিজেই হয়, তাহলে তো কোনো কথাই নেই!
মনের সেই উৎফুল্ল ভাবটা ভেতরেই চাপা দিলো ফাইজান। উপর-উপর বেশ চিন্তিত ভাব দেখিয়ে বলল,
"টেনশনের ব্যাপার! কাছে গেলেই যদি টুকরো করার হুমকি দেয়, তাহলে যে জীবনে কত-শতবার টুকরো টুকরো হতে হবে, কে জানে!"
শায়রা উত্তরে বলল না কিছু। গাল ফুলিয়ে বসে রইলো খাটের উপর। ফাইজানও আর না খুঁচিয়ে নিজ থেকে শার্ট-প্যান্ট বের করে তৈরী হয়ে নিলো। ব্ল্যাক প্যান্ট, হোয়াইট শার্ট। শ্যামবর্ণের উপর সাদা রঙটা মানিয়েছে বেশ।
ফাইজান টাইটা ইচ্ছে করেই খাটে ফেলে রেখে শার্টের উপর শুধু কোটটা পড়লো। চুলগুলো জেল দিয়ে ব্যাকব্রাশ করে রাখলো। পুরোপুরি ফর্মাল পোশাক।
শায়রা এতদিন ফাইজানকে প্যান্ট, শার্ট পড়া অবস্থাতেই বেশি দেখেছে। সেই শার্টেরও বেশিরভাগ সময় উপরের বোতামগুলো খোলাই থাকতো। চুলে তো বোধহয় সপ্তাহেও চিরুনী লাগাতো না। সেই এলোমেলো ছেলেটাকে হঠাৎ সম্পূর্ণ পরিপাটি অবস্থায় দেখে ভয়ংকর মুগ্ধতা ঘিরে ধরলো শায়রাকে। না চাইতেও কয়েকবার আড়চোখে চাইল ফাইজানের দিকে। হৃৎস্পন্দন বোধহয় মাঝে মিস হয়েছে কয়েকটা। অতঃপর আবারও চলছে নিজস্ব গতির চেয়ে একটু বেশিই দ্রুত।
ঢোক গিলল শায়রা। চাইলেও নিজের নজরটাকে অন্যদিকে ফিরিয়ে রাখতে পারছে না৷ মস্তিষ্ক বলছে,
"একটু আগে ও তোর সাথে ঝ*গড়া করেছে। ওর দিকে ভুলেও তাকাবি না।"
মন বলছে, "একটু তাকালে সমস্যা কি? নিজের একমাত্র বরের দিকেই তো তাকাচ্ছে। কোনো পরপুরুষ তো নয়। তাহলে সমস্যা কোথায়?"
আসল বিপদের ব্যাপার হলো শায়রা মস্তিষ্কের কথা রাখতে পারছে না। মন ও নজর বারবার ঘুরে-ঘুরে দেখছে ফাইজানকে। মুগ্ধতায় ডুবে যাওয়া মেয়েটাকে আরেকবার ভড়কে দেয়ার প্রস্তুতি নিয়ে ফাইজান বলল,
"আগেই বলেছিলাম তোর নজরে সমস্যা আছে। দেখ, এখনো আবার এইভাবে তাকাচ্ছিস! তোর বিরুদ্ধে তো ইভটিজিং এর মামলা করা উচিত। কিরকম চোখ দিয়ে গিলে খাচ্ছে দেখো!"
হতবিহ্বল হয়ে পড়লো শায়রা। বিস্মিত স্বরে বলল,
"আমার নজরে সমস্যা?"
"অবশ্যই সমস্যা। নাহলে আমার দিকে এভাবে তাকাবি কেন?"
ফাইজান নিজের কথায় অটুট। শায়রা বলল,
"তাহলে আমি চলে যাই রুম থেকে। তুমিই থাকো।"
ফাইজান বলল,
"হ্যাঁ, এখন আমি কাজ দিবো তো! তাই তুই আগেই পালাবি। বুঝি আমি!"
শায়রা মহাবিরক্ত হয়ে উঁচু আওয়াজে বলল,
"তাহলে করবো কি আমি? বসে থাকলে দোষ, চলে গেলে দোষ, আমার জীবনে সব দোষই দোষ! এত দোষ জি বাংলা, স্টার জলসার সিরিয়ালের শাশুড়ীরাও ধরে না, যত তুমি ধরো। অসহ্যকর!"
ফাইজান ঠোঁট উলটে বলল,
"অসহ্য লাগলেও কিছু করার নেই। সহ্য করতে হবে। এবার টাইটা পড়া এসে।"
শায়রা কপালে ভাজ ফেলে বলল,
"সব কাজ নিজে করেছো, টাইটা নিজে পড়তে পারছো না?"
ফাইজান শক্ত কন্ঠে বলল,
"না পারছি না। এটা তোর কাজ। জলদি কর!"
শায়রা আর না করলো না। জানে না করলেই আরও ক্যাঁচাল বাজবে। কিন্তু এই নাছোড়বান্দা ছেলে ঠিকই শেষপর্যন্ত নিজের কাজ আদায় করবে। তাই ভালোয় ভালোয় সব শেষ করে অফিসে পাঠানোই উত্তম।
শায়রা এগিয়ে গিয়ে সুন্দর করে টাইটা বেঁধে দিলো। এরপর ফাইজানের হুকুমমতো ঘড়িটাও পড়িয়ে দিলো। যদিও মুখশ্রীতে যথাসম্ভব বিরক্তির ভাব ফুঁটিয়ে রেখেছে, কিন্তু সত্যিকার অর্থে এই কাজগুলোতে অন্যরকম প্রশান্তি কাজ করছে তার মনে।
বর অফিস যাচ্ছে, আর বউ নিজে তাকে তৈরী হতে সাহায্য করছে। বিবাহিত জীবনের অন্যতম একটা সুন্দর মুহুর্ত বোধহয় এটাই। কতজন পারে এই ছোট-ছোট বিষয়গুলো খুব মন দিয়ে উপভোগ করতে?