হৃদয়ের রঙিন ক্যানভাস

পর্ব - ৩৩

🟢

রোদ ঝলমলে সকালের মিষ্টি রোদ্দুর জানালার ফাঁক গলে পড়ছে বিছানায়। সময় গড়িয়ে তখন বেলা নয়টা। ফাইজানের বুকে মাথা রেখে নিশ্চিন্তের ঘুম ঘুমাচ্ছে শায়রা। রোদ্র ব্যাঘাত ঘটালো তার নিদ্রায়। চোখে-মুখ ছুঁয়ে দিতেই আধোঘুমে চোখ মেলে চাইলো ও। অপূর্ণ তন্দ্রার ফলে ইচ্ছা করলো না বিছানা ছেড়ে উঠতে। তবে মুহুর্তের মাঝে দেয়ালঘড়ির দিকে চোখ পড়তেই নিদ্রা যেন তল্পিতল্পা গুটিয়ে পালালো৷ কাঁথাটা গায়ে জড়িয়ে বিছানায় উঠে বসলো শায়রা৷ চোখ বড়বড় করে বলল,

"হায় আল্লাহ! নয়টা বাজিয়ে ফেলেছি আজ। সবাই কি ভাববে?"

ভাবনার মধ্যেই নজর পড়লো ফাইজানের উপরে। ছেলেটা বেঘোর ঘুমে তলিয়ে। এক ঝটকায় শায়রার সব রাগ ঠিকড়ে পড়লো ফাইজানের উপর। কটমট করে বলল,

"সব ওর দোষ! ওর জন্যই রাত্রে ঘুমও হয়নি আর সকালে উঠতেও লেট করেছি। ছাড়বো না আমি ওকে।"

রাগ থাকলেও এখন চুল ছিড়ে সেটা প্রকাশ করার মতো সময় অবশিষ্ট নেই। জলদি গিয়ে ফ্রেশ হওয়া প্রয়োজন। তাই সময় নষ্ট না করে নেমে পড়লো বিছানা থেকে। পরপর ওয়ার্ড্রব থেকে কাপড়-চোপড় নিয়ে ঢুকে গেলো ওয়াশরুমে।

********

দীর্ঘ আধা ঘন্টা পার করে চুল মুছতে মুছতে বের হলো শায়রা। অতঃপর তোয়ালেটা বারান্দায় শুকিয়ে দিয়ে ফিরে এলো ড্রেসিং টেবিলের কাছে। গতকাল বিকেলে হেয়ার ড্রায়ারটা এই রুমে এনে চুল শুকিয়েছিলো বিধায় আজ কোনো ঝামেলায় পড়তে হয়নি। শায়রা দ্রুত চুল শুকিয়ে নিয়ে চুলগুলোকে হাতখোঁপা করে নিয়েছে৷ নতুবা বড়দের সামনে সকাল সকাল ভেজা চুলে যাওয়ার মতো লজ্জাজনক কাজ ওর দ্বারা হবে না।

প্রস্তুত হয়ে রুম থেকে বের হতে যাবে তার আগে পুনরায় মনে পড়লো ফাইজানের কথা৷ ওর প্রশান্তির ঘুমে ডুবে থাকা চেহারার দিক চেয়ে ফুঁসে ওঠে ভাবলো,

"আমার ঘুম নষ্ট করে, উনি কি শান্তির ঘুম ঘুমাচ্ছে! ওর ঘুম আমি ছুটাচ্ছি।"

বলতে বলতে এগিয়ে গেলো টেবিলে রাখা পানিভর্তি জগের দিকে। পরমুহূর্তে মনে হলো, এই পানি দিয়ে কি কাজ হবে? এরচেয়ে ফ্রিজ থেকে আনা ঠান্ডা-ঠান্ডা পানি ঢালাই শ্রেয়।

অতঃপর আর অপেক্ষা নয়! ছুটে রুম থেকে বেরিয়ে হাজির হলো রান্নাঘরে। মালেকা বেগম ও দ্বীতি বেগম ওকে ছুটে আসতে দেখে অবাক হলেন। জিজ্ঞেস করলো,

"কি ব্যাপার? সকাল সকাল দৌড়াদৌড়ি করছিস কেন?"

শায়রা মেকি হেসে জবাব দিলো,

"তেমন কিছু না৷ সরি, আজ উঠতে অনেক লেট হয়ে গেছে।"

মালেকা বেগম বললেন,

"তোর সকাল সকাল ওঠা না ওঠা দিয়ে কি হবে? আজ তো ভার্সিটি নেই যে ভোরে উঠতে হবে। ফাইজান কই? ওর তো অফিস আছে। যাবে না?"

শায়রা জানালো,

"বলল তো, দেরি করে গেলেও নাকি সমস্যা হবে না। তাই এখনো ঘুমুচ্ছে।"

বলে এগিয়ে গেলো ফ্রিজের কাছে। ফ্রিজ খুলে বের করে আনলো বড়সড় একটা ঠান্ডা পানির বোতল। এরপর আবার দৌড় নিজের রুমে।

শায়রা পা টিপে টিপে হাজির হলো ফাইজানের কাছে। অতঃপর মুচকি হাসি দিয়ে বোতলের ছিপি খুলে বরফঠান্ডা পানিগুলো ঢেলে দিলো ফাইজানের মুখে৷

ধড়ফড় করে লাফিয়ে উঠে বসলো ফাইজান। আকস্মিক কান্ডটায় হতবিহ্বল হয়ে বসে আছে। শায়রা ওর অবস্থা দেখে হাসিতে ফেটে পড়ছে। কিয়ৎক্ষণ বাদে বহু কষ্টে হাসি থামিয়ে বলল,

"আমার ঘুম নষ্ট করে তুমি শান্তিতে ঘুমাবে? এটা তো আমি হতে দিবো না!"

ততক্ষণে ধাতস্থ হয়ে ওর দিকে ভ্রুযুগল কুঁচকে তাকিয়েছে ফাইজান। হাতের নাগালে পেতেই শায়রার হাতে টান বসালো ও। নিজের কোলে বসিয়ে জড়িয়ে ধরে বলল,

"তাই বলে ফ্রিজ থেকে এনে ঠান্ডা পানি ঢালবি? এখন যদি জ্বর-টর এসে পড়ে, তাহলে কিন্তু তোকেই সেবা করতে হবে।"

বলতে বলতে চুমু বসালো ঘাড়ে। শায়রা মোচড়ামুচড়ি করে বলল,

"এহহহ, শখ কত! আমি পারবো না অত সেবা করতে। এখন ছাড়ো আমায়। দরজা খোলা, কেউ এসে পড়বে।"

ফাইজান বিরক্ত ভঙ্গিমায় বলল,

"দরজা চাপানো আছে। এমনিতেই কে আসে আমার রুমে?"

শায়রা হতভম্ব হয়ে বলল,

"তাই বলে দরজা খোলা রেখেই শুরু হয়ে যাবে? ছাড়ো আমায়। দেখো, দশটা বেজে গেছে।"

অগত্যা শায়রাকে ছেড়ে দিলো ফাইজান। বলল,

"আচ্ছা যা, ছেড়ে দিলাম। গিয়ে আমার জন্য নাস্তা রেডি কর। আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি।"

শায়রা ভেঙচি কেটে বলল,

"এসেছে আমার নবাব! এখন নাস্তাও রেডি করে দিতে হবে?"

ফাইজান ধমকের সুরে বলল,

"গেলি তুই? নাকি আমি আবার......"

শায়রা ওকে মাঝপথে থামিয়ে হড়বড় করে বলল,

"না না, দরকার নেই। আমি যাচ্ছি।"

বলেই দ্রতগতিতে বের হলো রুম থেকে।

সকালের নাস্তার পরপরই আফজাল সাহেব ও দ্বীতি বেগম রওনা করেছেন সিলেটের পথে। যাওয়ার আগে নিশ্চিন্ত হয়েছেন মেয়ের সুখী সংসার দেখে। বুকের উপর থেকে আশঙ্কার এক ভারী বোঝা নেমে গেছে। খুশিমনে ফিরে গেছেন নিজেদের বাড়িতে। মালেকা বেগম তাদের যাওয়ার আগে দুপুরের খাবারও রান্না করে প্যাকেট করে দিয়ে দিয়েছেন যেন গিয়ে আর ঝামেলা না পোহানো লাগে। আর ফাইজান তাদের গাড়িতে উঠিয়ে দিয়ে চলে গেছে অফিসে।

*********

ফজল সাহেব বহুকাল আগে ছেলের নামে একটা ও মেয়ের নামে একটা ব্যাংক একাউন্ট করেছিলেন৷ অল্প অল্প করে তাতে বেশ ভালো এমাউন্টের টাকাই জমেছিলো। এরপর একদম পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়াই ছেলের বিয়ে দিলেন বেকার অবস্থায়। এমন সময় দেনমোহরের টাকা পরিশোধ করা ফাইজানের পক্ষে সম্ভবপর ছিলো না। তাই চিন্তা-ভাবনা করে ফাইজানের নামে জমানো টাকাগুলোই দেনমোহর হিসেবে দিয়ে দেয়া হয়েছে শায়রাকে। যেটা অনেকদিন পর্যন্ত জমা ছিলো শায়রার ব্যাংক একাউন্টেই।

অতঃপর ফাইজানের হুট করে বিজন্যাসে হাত দেয়ায় হু-হু করে উন্নতি আসতে শুরু করলো। অল্প কিছুদিনেই ফাইজান এই কাজে বেশ মজা পেতে শুরু করলো। বউ-সংসার-বিজন্যাস, সব মিলিয়ে এক নতুন স্বাদ পেতে শুরু করলো জীবনের। উদ্ধার করলো জীবনের এক অন্যরকম অর্থ। ছেলের হাতে সম্পূর্ণ বিজন্যাস দিয়ে দেয়ার পরও ফাইজান লাভের অংশটুকু বাবার কাছেই জমা রাখলো। এতে করে মাসশেষে বেশ ভালো এমাউন্টের টাকা ফজল সাহেব তুলে দিলেন ছেলের হাতে। প্রথম ইনকাম দিয়ে আনা জিনিসের ভাগ হলো পুরো পরিবারে। মায়ের জন্য দামী একটা শাড়ি, বাবার জন্য পাঞ্জাবি ও বোনের জন্য থ্রি-পিস। শপিং করে নিয়ে এলো বর-বউ দু'জন মিলে। কিন্তু শায়রা জানলোই না, এর ফাঁকে যে সবচেয়ে দামী উপহারটা তার নামে বরাদ্ধ হয়ে গেছে।

টের পেলো যখন ফাইজান রাতে ওকে ছোট্ট একটা হীরে বসানো নাকফুল উপহার হিসেবে দিলো। যেটার কথা শুধুমাত্র শায়রা বাদে ঘরের বাকি সবাই জানতো। শুনে বিস্ময়ের তোঁপে যেন কথাই বলতে ভুলে গেলো শায়রা।

দুয়েকমাস পেরোতেই ফাইজান অনুভব করলো ছোট বিজন্যাসটাকে আরেকটু বড় করতে আরও কিছু টাকার প্রয়োজন৷ কিন্তু সে টাকা আসবে কোথা থেকে? নিজের এই প্ল্যানিং এর কথা শায়রাকে জানাতেই কাবিনের টাকাগুলো দিয়ে দিতে চাইলো শায়রা।

ফাইজান নাকচ করে দিলো প্রথমেই,

"দেনমোহরের টাকা স্ত্রীর অধিকার। আর একভাবে বলতে গেলে বিয়ের সময় আমি পুরোপুরি বেকার ছিলাম। তাও যে আমার নামে জমানো টাকাগুলো দেনমোহর হিসেবে পরিশোধ করা হয়েছে, সেটাই তো বেশি! সেগুলো আবার আমি নিবো কোন আক্কেলে?"

শায়রা ফাইজানের হাত চেপে ধরে বলল,

"সেটাই তো! তুমি বেকার থাকার পরও যে দেনমোহরের টাকা দেয়া হয়েছে, সেটা কেন আমি নিয়ে রেখে দিবো? তুমি এগুলো বিজন্যাসে ইনভেস্ট করো। লাভ হলে এরকম কত আমাকে দিতে পারবে। সেটাও নিজের ইনকাম থেকে।"

ফাইজান শান্ত দৃষ্টিতে চাইল শায়রার দিকে। মেয়েটার ভাব-সাবে কোনো দ্বিধাবোধ নেই। যা আছে, তা হলো দু'চোখে সুন্দর ভবিষ্যতের আপামর সপ্ন। শুধুমাত্র ফাইজানকে বিশ্বাস করে নিজের ভবিষ্যতের জন্য রাখা সঞ্চয়গুলোও তুলে দিতে দু'বার ভাবছে না!

দীর্ঘশ্বাস ফেলল ফাইজান। শায়রার হাতের উপর কোমল স্পর্শ বুলিয়ে বলল,

"ভবিষ্যতের চিন্তা হয় না? আমাকে বিশ্বাস করে যে সব উজাড় করে দিচ্ছিস?"

শায়রা নির্দ্বিধায় বলল,

"চিন্তা হবে কেন? তুমি আছো না?"

একটু থেমে আবার বলল,

"এই বাউন্ডুলে শুনো, আমার টাকাটা নিতে তোমার বেশি সমস্যা হলে তুমি আমাকে বিজন্যাসে পার্টনার হিসেবে নিতে পারো। অর্ধেক তোমার, অর্ধেক আমার। ভালো হবে না?"

ফাইজান বিনিময়ে মুচকি হেসে মাথা নাড়লো শুধু। কারণ সে জানে, এগুলো শায়রার দুষ্টুমি ছাড়া কিছুই না।

পরবর্তী বিনিয়োগে সত্যি সত্যিই লাভের মুখ দেখলো তাদের কোম্পানি। ছোট থেকে বেশ বড় হতে শুরু করলো ধীরে-ধীরে। ইতিমধ্যেই সব দায়-দায়িত্ব ফাইজানের ঘাড়ে চাপিয়ে আরামে বাড়িতে বসে পড়েছেন ফজল সাহেব। তন্মধ্যে বিরক্তির সূক্ষ্ম ভাজ পড়লো ছেলের মাস্টার্সের ফাইনাল পরীক্ষা শুরু হওয়ায়। উপায়ান্তর না পেয়ে মাঝেমধ্যে অফিসে যেতে হলো তাকে। তবে পুরোটাই ছিলো গা-ছাড়া ভাবে। পরীক্ষার ফাঁকে ফাঁকে সামলেছে ফাইজানই।

***********

মাঝ দিয়ে সময় গড়িয়েছে প্রায় পাঁচ মাস। পরীক্ষা শেষে ফাইজান দুনিয়াদারী ভুলে ঢুকে পড়েছে বিজন্যাসে৷ ফজল সাহেব পুরোদস্তুর অবসর নিয়ে বসেছেন। এখন জীবনের বাকি দিনগুলো নাতি-নাতনি নিয়ে হৈ-হল্লা করে কাটিয়ে দেয়ার প্রবল ইচ্ছা তার। এখন শুধু সুখবরের অপেক্ষায় দিন গুনছেন।

রিজভী, শুভ, আহাদ ওরাও বিভিন্ন চাকরীতে ঢুকেছে পরীক্ষার পর।

শায়রার সপ্ন পূরণ হয়েছে। যেমন ছোট, সাধারন একটা সংসারের সপ্ন প্রত্যেকটা মেয়ে দেখে, ঠিক সেরকমই সপ্ন ছিলো শায়রার। যেটা পূরণ হয়ে গেছে। নিজের দেনমোহরের টাকাটাও ফাইজানের হাতে তুলে দিয়েছিলো শুধু নিজেদের সুন্দর ভবিষ্যতের কথা ভেবে। ফাইজান নিরাশ করে নি তাকে। উন্নতির প্রত্যেকটা ধাপে ধাপে মনে রেখেছে বউকে। অল্প-স্বল্প করে পরিশোধ করছে টাকাটাও। সাথে উপহার তো আছেই। গতমাসেও দু'টো স্বর্ণের চুড়ি বানিয়ে দিয়েছে সবসময় পড়ার জন্য।

যেভাবে অনিশ্চয়তা নিয়ে শুরু হয়েছিলো তাদের বিবাহিত জীবন, তাতে কেউ কোনোদিন কল্পনা করতে পারেনি শেষটা এত সুন্দর হতে পারে! প্রথম প্রথম শায়রা খুব দুষতো নিজের ভাগ্যকে। এখন তো নির্দ্বিধায় নিজেকে সেরা সৌভাগ্যবতী নারীদের একজন ঘোষণা করতে পারবে। ক'জনের কপালে জোটে এরকম বর, যার মধ্যে যত্নশীলতা ও ভালোবাসার এক ফোঁটাও কমতি নেই?

**********

গত এক সপ্তাহ ধরে ফাইজানের ব্যস্ততা বোধহয় বেড়েছে। ঠিকঠাক সময় দিতে পারছে না শায়রাকে। এতেই গাল ফুলিয়ে বসে আছে মেয়েটা। আগে বেশ বুঝদার ছিলো। কিন্তু ফাইজান লক্ষ করছে ইদানীং শায়রা বাচ্চাদের মতো অবুঝ আচরণও করে বসে।

নিজের পরিবর্তন নিজের কাছেও লক্ষণীয় শায়রার। শারীরিক পরিবর্তনটাও বেশ ভালোই নজরে এসেছে ওর। ফাইজানকে বলবে কি বলবে না ভেবে ভীষণ দ্বিধাদ্বন্দেও ভুগেছে কয়েকদিন। পরে শেয়ার করেছে আশার সাথে। অতঃপর আশা পরামর্শ দিয়েছে প্রেগন্যান্সি টেস্টের।

আশার কথা শুনে বিপুল আকাঙ্খা নিয়ে সেদিন বিকেলেই আনুসাকে নিয়ে হসপিটালে হাজির হয়েছে শায়রা। রিপোর্ট পেতে খানিকটা দেরি হবে বিধায় সেদিন বাড়িতে চলে এলো দু'জন। রিকশায় বসে শায়রা আনুসাকে বলল,

'বাসায় গিয়েই লাফাতে লাফাতে সবাইকে বলে দিস না আমরা হসপিটালে কেন এসেছিলাম! পরে নেগেটিভ আসলে সবার আশাভঙ্গ হবে। এরচেয়ে চুপচাপ থাকবি। কাল রিপোর্ট এলে যদি দেখি পজিটিভ, তাহলে আমি তোর ভাইয়াকে সারপ্রাইজ দিবো। আগ বাড়িয়ে কিছু বলবি না।"

আনুসা বলল,

"আচ্ছা আচ্ছা, ঠিক আছে। যেমন আপনার ইচ্ছে, ভাবি। ফুপু হওয়ার খুশি দিচ্ছেন, আপনার এমন ছোট-খাটো আবদার তো মানতেই পারি।"

********

রাত্রির খাওয়া-দাওয়া শেষে সবাই যে যার রুমে। ফাইজান আজ খাওয়া-দাওয়ার পর আবার বেরিয়ে বন্ধুদের সাথে এক ঘন্টা আড্ডা দিয়ে এসেছে। আজকাল সবাই নিজের নিজের কাজে ব্যস্ত থাকায় সময় বের করা বেশ দুঃসাধ্য ব্যাপার। তাই একটু সুযোগ হলেই আড্ডা দিয়ে নিজেদের হালকা করে নেয়।

এগারোটার কিছু আগে বাড়িতে ফিরেছে ফাইজান। গেট খুলে দিয়েছিলো আনুসা। এরপর ফাইজান রুমে এসে দেখলো শায়রা মুখ গোমড়া করে খাটের ঠিক মাঝখানে বসে আছে। তৎক্ষনাৎ থমথমে স্বরে বলল,

"মুখটাকে এমন পেঁচার মতো বানিয়ে রেখেছিস কেন?"

শায়রা ভেঙচি কেটে বলল,

"পেঁচার মতো বানাই আর কাকের মতো বানাই, তাতে তোমার কি? তুমি তো আজকাল আমাকে পাত্তাই দাও না।"

শায়রার অগোচরে খানিক হেসে নিলো ফাইজান। এরপর পুনরায় ওর দিক ফিরলো গম্ভীর মুখে। বলল,

"এসব নাটক বন্ধ কর, মুটকি। অনেক রাত হয়েছে, এখন ঘুমাবো।"

বলেই শার্ট খুলতে উদ্যত হলো। শায়রা আড়চোখে ওর উদোম গায়ের দিকে তাকিয়ে নাটকীয় ভঙ্গিমায় বলল,

❝ওরে কালাচান, তোমার লাগি মন করে আনচান..!❞

এহেন কথা, সাথে শায়রার নিষ্পাপ দৃষ্টির দিকে চেয়ে হাসি চাপা কষ্টসাধ্য হলো ফাইজানের। তবুও নিজেকে সামলে গমগমে স্বরে ধমক ছুড়লো,

❝চুপ কর, মুটকি। তোর এসব ঢং দেখার সময় এখন আমার নেই।❞

শায়রা সঙ্গে সঙ্গে আঙুল উঁচিয়ে বলল,

❝ওয়, মিস্টার বাউন্ডুলে! এই ঠে*ঙা ঘরের বউকে না দেখিয়ে নিজের আড্ডাবাজিকে দেখাও। কাজে দিবে!❞

ফাইজান বুঝলো, শায়রা রেগেছে আজকে আড্ডা দিতে যাওয়ার জন্য। কিন্তু এতে রাগ করার কারণ খুঁজে পাচ্ছে না ফাইজান। গিয়েছেই আজ দু'সপ্তাহ পর। এরকম হলে শায়রা কখনোই রাগ দেখায় না। আজ দেখাচ্ছে বোধহয় মুড সুইং এর কারণে। ফাইজান ঝাড়ি মেরে বলল,

❝এই মুটকি, আমাকে বাউন্ডুলে বাউন্ডুলে ডাকবি না একদম! এখন ভালো হয়ে গেছি আমি।❞

শায়রা প্রতিত্তোরে বলল,

❝তাহলে আমাকেও মুটকি ডাকবে না! মানি আমার স্বাস্থ্য একটু ভালো। তাই বলে মুটকি ডাকবে? আমি মুটকি হলে, আমাকে কোলে তোলার অপরাধে এতদিনে কোমড় ভেঙে হসপিটালে থাকতে!❞

ফাইজান প্রলম্বিত শ্বাস ফেলে বলল,

"তোকে কোলে তোলার মতো এনার্জি আমার আছে, মুটকি। কোমড় ভাঙতে যাবে কেন? যত্তসব আজগুবি প্যাচাল।"

শায়রা বাচ্চাদের মতো বলল,

"হ্যাঁ হ্যাঁ, এখন তো আমার কথা আজগুবিই লাগবে। নিজে কারণে-অকারণে কোলে নেয়ার বেলায় কিছু না।"

শায়রা কি থেকে কি মিলালো, কিছুই মাথায় ঢুকলো না ফাইজানের। শুধু বুঝলো এখন ওর মাথা গরম করানো উচিত হবে না। তাই দ্রুত লাইট অফ করে বিছানায় এসে শায়রাকে জড়িয়ে ধরে বলল,

"হয়েছে, বাকি রাগারাগি কাল করিস। এখন ঘুমা।"

শায়রা এরপরও বকবক করলো কিছুক্ষণ। ফাইজান শায়রার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে শুনে গেলো সবটা। একসময় ঘুমিয়ে পড়লো শায়রা।

ঘড়ির কাঁটা ঠিক বারোটার ঘরে পৌঁছাতেই শায়রার কপাল থেকে চুলগুলো সরিয়ে সেখানে চুমু খেলো ফাইজান। মৃদু স্বরে বলল,

"হ্যাপি সিক্স মান্থ এনিভার্সারি, বউ।"

**********

টেস্টের রিপোর্ট দেখার উত্তেজনায় শায়রা ভুলেই বসেছে নিজেদের বিয়ের ছয় মাস পরিপূর্ণ হওয়ার কথা।

আনুসা গিয়েছে কোচিং এ। আর শায়রা তার অপেক্ষায় বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে। আনুসা আসলেই দু'জনে বের হবে হসপিটালের উদ্দেশ্যে৷

শায়রাকে অবাক করে দিয়ে অসময়ে বাড়িতে হাজির হলো ফাইজান। রুমের বাহির থেকে ওর কন্ঠস্বর পেয়েই দু'পা তুলে খাটের উপর বসে পড়লো। উদ্দেশ্য, রুমে ঢুকলে আরেকদফা রাগ দেখাবে।

তৎক্ষনাৎ ফাইজান হন্তদন্ত হয়ে রুমে ঢুকলো। হাতে একটা কাগজ মুড়ানো। ত্রস্থ এসে বসলো শায়রার মুখোমুখি। অপরাধীর ন্যায় বলল,

"শায়রা, তোকে কিছু বলার ছিলো।"

শায়রা ঘাবড়ে গেছে ফাইজানের মুখশ্রী ও কথা বলার ভাব-ভঙ্গি দেখে। সে ফাইজানের হাতের কাগজটার দিক ইশারা করে শুধালো,

"এটা কিসের কাগজ?"

ফাইজান সময় নিলো খানিক। অতঃপর বেশ গুছিয়ে বলল,

"শায়রা, তুই আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলি না ডিভোর্সের কথা? বিয়ের ছ'মাস পর ডিভোর্স দেয়া যায়। আর আজ আমাদের বিয়ের ছয় মাস হয়ে গেছে।"

চমকে গেলো শায়রা। এমন একটা কথা ও কস্মিনকালেও আশা করে নি। ঘাবড়ে গিয়ে হৃৎস্পন্দনের গতি অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পেয়েছে। ঢোক গিলে আটকে আটকে বলল,

"তার মানে তুমি আমাকে ডিভোর্স দিবে? আর এটা ডিভোর্স পেপার?!"

হৃদয়ের রঙিন ক্যানভাস পর্ব ৩৩ গল্পের ছবি