হৃদয়ের রঙিন ক্যানভাস

পর্ব - ২৫

🟢

"মাননীয়া আটার বস্তা, অনুগ্রহ করে আমার উপর থেকে উঠবেন আপনি? তাহলে আপনার স্বামী ধন্য হবে।"

ফাইজানের এহেন কথায় ঘুম ভেঙে তড়াক করে লাফিয়ে উঠে বসলো শায়রা৷ ক্ষি*প্ত দৃষ্টিতে ফাইজানের দিক চেয়ে ঝাঁ*ঝ মেশানো স্বরে বলল,

"আমি আটার বস্তা? এই আটার বস্তাকে কারণে অকারণে কোলে নিয়ে ঘুরার বেলায় কি হয় তোমার? খুব কষ্ট হয় নিশ্চিত!"

ফাইজান নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল,

"আশ্চর্য! কষ্ট কেন হবে? তুই কি আমাকে দুর্বল মনে করিস? আমি খুব স্ট্রং। তোর মতো দু-একটা আটার বস্তা, আলুর বস্তা নিতে আমার সমস্যা হয় না।"

রেগে-মেগে ভেঙচি কাটলো শায়রা৷ ফাইজানকে নকল করে বলল,

"আমি খুব স্ট্রং! আমি ঘুমালে উনার কাছে ভারী লাগে আবার স্ট্রং! নাটক দেখানোর জায়গা পায় না।"

ফাইজান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে বসলো,

"নাটক দেখানোর জায়গা আর পাই কই? সময়ই বা কই পাই? তোর নাটক দেখে দেখেই তো জীবন পার হচ্ছে।"

শায়রা কটমট করে বলল,

"আমি নাটক করি?"

ফাইজানের মুখভঙ্গি খুবই সিরিয়াস। দেখে বুঝার উপায় নেই শায়রার কথা-বার্তায় ও মজা পাচ্ছে। ঘড়ির কাঁটা আরও পাঁচ মিনিট এগিয়ে যেতেই টনক নড়লো ওর। শায়রাকে বলল,

"সাতটার বেশি বাজে, শায়ু। তুই এখনো আমার রুমে বসে আমার সাথে ঝগড়াই কর। এর মধ্যে আনুসা আর আম্মু উঠে যাবে। তারপর ওরা জানবে, তুই কাল আমার সাথে ছিলি। ভালো হবে না?"

শায়রা এতক্ষণে একবারও ঘড়ির দিকে তাকায় নি। এখন ফাইজান বলতেই বিষয়টা খেয়াল হলো ওর। সঙ্গে সঙ্গে নেমে পড়লো বিছানা থেকে। নিজের দেরি হওয়ার রা*গটাও ঝাড়লো ফাইজানের উপরে। বলল,

"এতক্ষণে এই কথা মনে এসেছে তোমার? আরেকটু আগে ডাকলে কি হতো?"

ফাইজান বুকে হাত দিয়ে বলল,

"তুই যেভাবে বুকে চাপা দিয়ে রেখেছিলি তাতে এমনিতেই দম আটকে যাওয়ার জোগাড় ছিলো। বহুত কসরত করে ডাকতে হয়েছে তোকে। সাধে কি আর আটার বস্তা বলেছি তোকে?"

শায়রা হাতের কাছে কুশনটা পেয়ে ওটাই ছুড়ে মারলো ফাইজানের মুখ বরাবর। তাড়াহুড়োর মধ্যে বলল,

"এখন শুধু দেরি হয়ে গেছে বলে বেঁচে গেলে তুমি! নাহলে তোমাকে যে কি করতাম!"

ফাইজান তৎপর বলল,

"কি করতি? কালকে রাতের মতো আরেকটা কামড় দিতি?"

শায়রা দরজা খুলে বের হওয়ার আগমুহুর্তে বলল,

"চুপ করো৷ তোমার সাথে এই বিষয়ে ঝ*গড়া করার মতো সময় নেই। টাটা।"

বলেই রুম থেকে বের হয়ে গেলো শায়রা। দৌড়ে আনুসার রুমে ঢুকবে কি, তার আগেই রান্নাঘর থেকে টুংটাং হাড়ি-পাতিল নড়াচড়ার শব্দ ভেসে এলো। অর্থাৎ মালেকা বেগম উঠে পড়েছেন নাস্তা বানাতে।

পায়ের গতি কমালো শায়রা। শুকনো ঢোক গিলে চেষ্টা করলো পা টিপে টিপে নিঃশব্দে আনুসার রুমে ঢুকে যাওয়ার৷ কিন্তু আজ বোধহয় তার ভাগ্য কোনোভাবেই সহায় হলো না। শায়রার আগে আনুসাই দরজা খুলে বের হতে উদ্যত হলো, তৎক্ষনাৎ পাথরমূর্তি বনে থাকা শায়রাকে দেখে ও নিজেও থেমে গেলো।

বলা বাহুল্য, ঘটনা বুঝতে দেরি হলো না আনুসার৷ ফাইজানের রুমের দরজা খোলা আর ঠিক তার সামনে শায়রাকে দেখে এক মুহুর্তেই যা বুঝার বুঝে নিলো ও৷ এরপর দরজার একপাশে সরে দাঁড়িয়ে বলল,

"যাও রুমে।"

মহা ফ্যাসাদে পড়ে শায়রা মেকি হেসে ভেতরে ঢুকে পড়লো। মনে মনে একপ্রস্থ বকাবকি চলল ফাইজানকে৷ প্রথমত ও নিজেই কাল শায়রাকে জোর করে নিয়ে গেছে। আবার সকালেও সময়মতো ডেকে দিতে পারে নি৷ তাই ধরা পড়ার পেছনে সম্পূর্ণ দায়ভার ফাইজানের৷

শায়রার ভাবনার মাঝে আনুসা নিজেও রুমে ঢুকে দরজা ঠেলে দিলো যেন বাইরে শব্দ না যায়৷ নিশ্চিত হয়েই ঘুরে শায়রার উদ্দেশ্যে বলল,

"এসব কি, হ্যাঁ? তুমি রাতে ভাইয়ার রুমে ছিলে? এসব কি ডেইলি চলে? মানে রাতে আমি ঘুমানোর পর তুমি ওই রুমে চলে যাও আর সকালে আমি উঠার আগেই এসে পড়ো? হায় আল্লাহ! আজ নিজচোখে না দেখলে তো বিশ্বাসই করতাম না। কিন্তু এতসব নাটকের দরকার কি? আরে ভাই, তোমরা তো হাসবেন্ড-ওয়াইফ। এক রুমে থাকলে কেউ কি তোমাদের কিছু বলবে যে এতসব নাটক করলে দু'জনে?"

অতিরিক্ত উত্তেজিত হয়ে শায়রাকে বলার সুযোগ না দিয়েই একনাগাড়ে নিজের কথাগুলো উগড়ে দিলো আনুসা৷ শায়রা ওর সব কথা শুনে মহাবিরক্ত ভঙ্গিতে বলল,

"সবসময় এত বেশি বুঝিস কেন তুই? ভাইয়ের অভ্যাস, তাই তো? কিন্তু সবসময় এরকম বেশি ভাবা ঠিক না৷ আমার ঠেকা পড়েছে নাকি তোর ভাইয়ের কাছে যাবো? আমি তো জাস্ট একটু আগে উঠেই ওই রুমে গিয়েছিলাম।"

শেষের ডাহা মিথ্যে কথাটা একটু থেমে-থেমে উচ্চারণ করলো শায়রা৷ তবে আনুসার ভাব-সাব দেখে মনে হলো না, ও সেটা বিশ্বাস করেছে৷ এখনো তার দৃষ্টিতে সমূহ সন্দেহ। বলল,

"সিরিয়াসলি? তুমি বললে আর আমি বিশ্বাস করে নিলাম? আচ্ছা যাও, নিলাম৷ কিন্তু কেন গিয়েছিলে ওটা বলো।"

তৎক্ষনাৎ ওই মুহুর্তটায় কোনো উত্তর দিতে পারলো না শায়রা। কিয়ৎক্ষণ ভেবে উত্তর সাজাতে হলো তাকে। এতেই সন্দেহ আরও প্রবল হলো আনুসার৷ সে কিছু বলার জন্য মুখ খুলতেই শায়রা আরেকটা মিথ্যা কথা বলে বসলো,

"আরেহ, ও সকালবেলা ঘুমিয়ে থাকে না? তাই ভেবেছিলাম পানি ঢেলে একটু জ্বালিয়ে আসবো। কিন্তু গিয়ে দেখি ও উঠে পড়েছে৷ তাই ফেরত চলে আসলাম।"

আনুসা শায়রার বানানো কথাগুলোর এক বিন্দুও বিশ্বাস করলো না। কারণ মুখে এক কথা বললেও শায়রার ভাব-সাব বলে দিচ্ছে সে যে মিথ্যা বলছে৷ মেয়েটা হতাশ ভঙ্গিতে মাথা নাড়তে নাড়তে বলল,

"মিথ্যা বলার কি প্রয়োজন, সেটাই বুঝতে পারছি না!"

এতকিছু বলেও আনুসাকে বিশ্বাস করাতে পারছে না দেখে একপর্যায়ে রেগে গেলো শায়রা৷ জেদের বশে বলে বসলো আরেকটা ভুল কথা,

"তোর কেন মনে হচ্ছে আমি মিথ্যা বলছি? তোর ভাই কি তোকে কানে কানে বলে গিয়েছে ও কাল রাতে এসে আমাকে নিজের কাছে নিয়ে যাবে? এজন্যই তুই নিশ্চিত আর আমার কথা বিশ্বাস করছিস না।"

মুখ ফঁসকে কি বলে ফেলেছে সেটা খেয়াল হতেই একহাতে নিজের মুখ চেপে ধরলো শায়রা৷ আনুসা পুরোটা শুনে মিটিমিটি হাসলো। এক ভ্রু উঁচিয়ে বলল,

"ভাইয়া কাল রাতে এসে নিয়ে গেছে? বাব্বাহ! কি প্রেম-ভালোবাসা! আজকাল দেখছি বউকে চোখে হারায়। অথচ আমাদের সামনে স্বীকার করলে বুঝি মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে।"

মুখ থেকে হাত নামিয়ে ফেলল শায়রা। ধরা পড়ায় চোরের মতো মাথা নামিয়ে ফেলেছে৷ আনুসার কথার জবাবে মিনমিনিয়ে বলল,

"তুই যেরকম ভাবছিস সেরকম না, আনুসা৷ আমরা কাল রাতে ঝগড়াই করেছি শুধু। তুই আবার এসব ফুপা-ফুপ্পির সামনে গিয়ে বলিস না। ভীষণ লজ্জার ব্যাপার হবে!"

আনুসা মুচকি মুচকি হেসে বলল,

"বলবো না, বলছো? এত খুশি নিজের মধ্যে চেপে রাখা সম্ভব? তাও তুমি যখন বলছো, চেষ্টা করে দেখবো। কিন্তু ভাইয়া নিজে ঢোল পিটিয়ে বললে আমার দোষ নেই। তার মুখ আবার বেশিই পাতলা।"

শায়রা বিড়বিড়িয়ে বলল,

"সেটা তো এখন হাড়ে-হাড়ে টের পাচ্ছি আমি।"

*********

আনুসা নিজের কথা রেখেছে৷ সে মালেকা বেগমের সামনে এসব বিষয়ে একটা কথাও তুলে নি। প্রত্যেকদিনকার মতো তারা দু'জনে একসাথে এসে বসেছে ডাইনিং টেবিলে। মালেকা বেগম ওদের দু'জনকে দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে ছেলের রুমের দরজার দিকে তাকালেন৷ আফসোস হয় ভীষণ। একেকবার শায়রার দিকে তাকালে রাগ হয় নিজেদের উপর। ঠিক কোন বুদ্ধিতে মেয়েটার জীবন নষ্ট করলেন তারা? তাদের ছেলে কি আদ্যো কোনোদিন ছন্নছাড়া জীবন ছেড়ে বউয়ের দিকে মনোযোগ দিবে? আদ্যো কোনোদিন বাঁধা পড়বে সংসারের জালে?

তিনি খুব করে চাইলেন কোনো একটা মিরাক্কেল হোক। যেন তার ছেলে নিজেকে বদলে ফেলতে বাধ্য হয়। হবে কি সেরকম কিছু?

ডাইনিং টেবিলের প্রস্থের সাইডের দুটো চেয়ারে শায়রা ও আনুসা বসেছে। মালেকা বেগম নাস্তা সাজিয়ে দেয়ার পর দু'জনে খাচ্ছে ও ফুসুরফাসুর করছে। কিছুক্ষণ বাদে নিজের রুম থেকে বের হলো ফাইজানও৷ আজ উনার পড়নের শার্টের বোতাম ঠিকঠাক লাগানো। কলারটা দিয়ে ভালোভাবে ঢেকে রেখেছে নিজের গলা৷ ওকে এরকম ফর্মাল পোশাকে দেখে কিছু সময়ের হা করে চেয়ে রইলেন মালেকা বেগম। মনে মনে ভাবলেন,

"এ আজ সুন্দর করে শার্ট পড়লো কি করে? মাঝ দিয়ে তো আবার উচ্ছন্নে যাচ্ছিলো৷ এখন কি হুশ আসছে নাকি?"

আর কেউ না বুঝলেও শায়রা ঠিকই বুঝলো ফাইজানের এইভাবে গলা ঢেকে শার্ট পড়ার কারণ৷ এ যে তারই দেয়া কামড়ের ফলাফল বুঝতে বিলম্ব হলো না শায়রার৷ বসে বসে দোয়া প্রার্থনা করতে থাকলো যেন কারো সামনে না পড়ে যায়!

বিধিবাম! আজ সকাল থেকে একটা চাওয়াও পূরণ হচ্ছে না শায়রার। সবকিছু উল্টেপাল্টে যাচ্ছে। এবারেও তাই হলো৷ খাওয়ার মাঝে শার্টের কলার নড়ে-চড়ে গেলো। আর কামড়ের দাগটা পড়লো তো পড়লো আনুসার চোখেই৷ মেয়েটা সবেমাত্র পানি মুখে দিয়েছিলো৷ ফলে রীতিমতো কাশি উঠে গেলো তার৷ ফাইজান খাওয়া থামিয়ে ওর দিক চেয়ে গমগমে স্বরে বলল,

"পানি খেতে গেলেও কাশি উঠে যায় তোর? একটু রিল্যাক্স হ। আরেকটু পানি দেবো?"

আনুসা একবার ওর দিকে আরেকবার শায়রার দিক চেয়ে টেবিলের দিকে তাকালো। আস্তে-ধীরে বলল,

"রিল্যাক্স? হ্যাঁ, রিল্যাক্স রিল্যাক্স৷ জীবনে চলার পথে অনেক বিস্ময়কর জিনিসই হবে৷ কিন্তু আমি আর অবাক হবো না। সব অবাক আজ একেবারে হয়ে যাচ্ছি। কোনোসময় যে ধাক্কা সামলাতে না পেরে অজ্ঞান হয়ে যাবো, কে জানে!"

ফাইজান বলল,

"কি বিড়বিড় করছিস? ঠিক আছিস তুই?"

আনুসা উপর-নীচ মাথা নেড়ে বলল,

"হ্যাঁ, ঠিক আছি আমি। এভ্রিথিং ইজ ওকে। আমার খাওয়া শেষ। এবার আমি উঠি, হ্যাঁ?"

বলেই উঠে গেলো মেয়েটা। মালেকা বেগম তখন নিজের রুমে। ফজল সাহেব উঠে অফিস যাওয়ার জন্য রেডি হচ্ছেন। আর মালেকা বেগম তাকে এটা-সেটা এগিয়ে সাহায্য করছেন।

আনুসা উঠে যাওয়ার পর ফাইজান পুনরায় খাওয়ায় মনোযোগ দিলো। কে কি দেখলো, ভাবলো, এসবে সে ভ্রুক্ষেপহীন। কিন্তু শায়রা চেয়েও পারছে না। ক্ষণে ক্ষণে নিজের কপাল চাপড়াতে ইচ্ছে করছে তার। ভাবছে,

"কোন আক্কেলে কাল রাগারাগি করে এই অঘটনটা ঘটাতে গিয়েছিলাম আমি? ওর তো কোনো চিন্তা-ভাবনাই নেই। মাঝ দিয়ে ঝামেলায় পড়েছি আমি। কেন যে এই ভুলটা করলাম!"

এমনসময় ফাইজান বলল,

"এই মুটকি, পানি দে।"

শায়রা পানির জগ এগিয়ে দিয়ে বলল,

"এখন কি নিজের পানিটাও ঢেলে খেতে ভুলে গেছো? আমাকে করে দিতে হবে?"

ফাইজান ভ্রু কুঁচকে ওর দিক চেয়ে বলল,

"একটা গ্লাস পানি চেয়েছি বলে এভাবে খোঁটা দিচ্ছিস আমাকে? ভবিষ্যতে যদি খাবার বেড়ে দিতে বলি, তাহলে তো আরও দ্বিগুন কথা শুনাবি৷ বাচ্চা-কাচ্চা পালতে দিলে তিনগুন। আর..."

শায়রা বিরক্তিতে 'চ' সূচক শব্দ করে বলল,

"আহ, থামো তুমি! এসব ফাও প্যাঁচাল আর ভালো লাগছে না আমার। দিচ্ছি পানি।"

বলতে বলতে জগ থেকে গ্লাসে পানি ঢেলে দিলো। এরপর গ্লাসটা ফাইজানের দিকে এগিয়ে দিয়ে ইতস্তত করে চাপা স্বরে বলল,

"দেখো বাউন্ডুলে, শার্ট দিয়ে গলা ভালোভাবে ঢেকে রাখো প্লিজ।"

ফাইজান আগ্রহী হয়ে শায়রার দিকে তাকিয়ে তারই মতো নিচু আওয়াজে নিরুদ্বেগ স্বরে বলল,

"কেন? তুই তো কামড় দিয়েছিসই এজন্য যেন ভার্সিটির সব মেয়েরা বুঝে আমি বিবাহিত৷ তাহলে আর কেউ আমার দিকে নজর দিবে না। তোর কুচুটে বুদ্ধি আমি বুঝি না ভেবেছিস? হিং*সুটে মহিলা কোথাকার!"

অনেকগুলো দিন পর আজ শায়রা ফাইজানের সাথে ভার্সিটি এসেছে। তার বাইক থেমেছে ভার্সিটির মূল ফটকের বাইরে। তৎক্ষনাৎ শায়রা বাইক থেকে নেমে সতর্কবানী শুনালো পুনরায়,

"ভদ্রতা বজায় রাখবে। লোকের সামনে আমাকে বেইজ্জত করো না।"

ফাইজান ভ্রু উঁচিয়ে বলল,

"কি বলতে চাচ্ছিস তুই?"

শায়রা বিরক্ত হয়ে কটমট করে বলল,

"তুমি ভালো করেই জানো আমি কি বলতে চাচ্ছি। নাটক করো না।"

ফাইজান নিষ্পাপ স্বরে বলল,

"নাটক-ফাটক আমি করতে পারি না৷ ওসব তোর কাজ। এই যে, এখনও নাটক করছিস। যা বলার সরাসরি বলে দিলেই হয়। এত প্যাঁচানোর কি দরকার?"

শায়রা ভেঙচি কেটে বলল,

"আমি তোমার মত নির্লজ্জ না। যাও, যা মন চায় তা করো। আমার সাথে কথা বলবে না।"

বলেই হনহন করে চলে গেলো সেখান থেকে। আর ফাইজান চলে আসলো বন্ধুদের কাছে৷

রিজভী, আহাদ ও শুভ এতক্ষণ দূর থেকে পরখ করছিলো তাদের। এতদিন পর ওদের একসাথে দেখে অন্যরকম প্রশান্তি পেলো তারাও। যাক, অবশেষে দু'জনের মিল তো হচ্ছে!

ফাইজান ওদের কাছাকাছি আসতেই প্রথম খোঁচাটা মারলো আহাদ,

"কি ব্যাপার? আজ দেখছি নবাব আর বেগম একসাথে। সব ঠিকঠাক চলছে নাকি?"

ফাইজান থমথমে কন্ঠে বলল,

"ভুল ছিলো কবে?"

শুভ বলল,

"এতদিন ছিলো। এখন লাইনে এসেছিস। এই উপলক্ষে আমাদের একটা ট্রিট দে।"

আকস্মিক অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু একটা রিজভীর চোখে পড়তেই চমকে উঠলো ছেলেটা। বিস্ময়ের সহিত জিজ্ঞেস করলো,

"ফাইজান, আমরা কি চাচু হতে যাচ্ছি?"

অসময়ে এহেন প্রশ্নে রেগে গেলো ফাইজান। ক্ষে*পে গিয়ে বলল,

"কিসব আজগুবি কথা বলছিস? মানে, একটা টাইম টেবিল তো আছে নাকি কথার? জাস্ট আমাদের মধ্যে সবকিছু নরমাল হচ্ছে। আই সেইড, নরমাল হচ্ছে। সবকিছু নরমাল হয়ে যায় নি যে এখনই বাচ্চা নিয়ে নিবো! মাথা-টাথা ঠিক আছে তোদের? চাচু হওয়ার জন্য এত লাফালাফি করছিস কেন?"

রিজভী থতমত খেয়ে বলল,

"কিন্তু আমার তো মনে হলো সব নরমাল হয়ে গেছে। এজন্যই ভাবলাম, হয়তো.."

এমনসময় ফাইজান লক্ষ্য করলো রিজভীর চোখ পড়েছে ওর গলার দিকে৷ বুঝে গেলো ওর এমন প্রশ্ন করার কারণ। সঙ্গে সঙ্গে কলার ঠিকঠাক করে ফেলল ফাইজান৷ শক্ত কন্ঠে বলল,

"সবদিকে নজর দিতে নেই৷ সিঙ্গেল আছিস সিঙ্গেলের মতো থাক। বিবাহিতদের টপিকে নাক গলাবি না৷ এসব বেয়াদবী।"

রিজভী হতাশ ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে বলল,

"আজ সিঙ্গেল বলে এইভাবে অপমান করলি! দেখিস, একদিন আমিও বিয়ে করবো৷ তারপর তোদের কাউকে আর চিনবো না।"

ফাইজান বিরস মুখে বলল,

"বেশি আশা করছিস দেখেই এখনো বিয়ে হচ্ছে না। দেখিস আবার চল্লিশ বছরে না বিয়েটা হয়!"

**********

ফাইজান আজ ভদ্র ছেলের মতো রাত আটটার আগেই বাড়ি ফিরেছে৷ এরপর নিজের রুমে গিয়ে কতক্ষন পায়চারী করে আবার বেরিয়েছে শায়রার খোঁজে। আনুসা তখন মালেকা বেগমের রুমে গিয়েছে কোনো এক কাজে৷ আর শায়রা আনুসার রুমে খাটের উপর বসে কোলে বালিশ নিয়ে তার উপর বই রেখে পড়ছে৷ ওর পড়ায় ব্যাঘাত ঘটাতে চলে এলো ফাইজান৷ সামনে গিয়ে ধুপ করে বইটা বন্ধ করে বলল,

"এত পড়াশোনা করে কি হবে? যেখানে পরীক্ষার আগের রাতে পড়লেই পাশ করা যায়, সেখানে সারাবছর কষ্ট করার কি দরকার? আমি তো না পড়েও পাশ করি।"

শায়রা বলল,

"ওটাকে পাশ বলে? টেনেটুনে ক্লাস পেরোনো বলে, বুঝতে পেরেছো? আমি তোমার মতো ব্যাকব্যাঞ্চার স্টুডেন্ট না।"

ফাইজান আয়েশ করে আনুসার খাটের উপর বসে বলল,

"শুন, হাসবেন্ড-ওয়াইফের মধ্যে একজন হয় টপার, আরেকজন হয় ব্যাকব্যাঞ্চার৷ এখন আমি ব্যাকব্যাঞ্চার ছিলাম বলেই তোর মতো টপার বউ পেয়েছি৷ যদি টপার হতাম, তাহলে বউ পেতাম ব্যাকব্যাঞ্চার। তাই যেটা হয়েছে সেটাই ভালো।"

এমন অদ্ভুত যুক্তি শুনে মাথা গরম হয়ে গেলো শায়রার। এখন এর বিপরীতে কিছু বলা মানেই তর্ক বাড়ানো। এই বিপদে শায়রা একদমই গেলো না৷ বলল,

"দেখো, তুমি নিজের রুমে যাও। আমাকে পড়তে দাও, প্লিজ। যথেষ্ট জ্বালিয়েছো কাল রাত থেকে। এখন অন্তত শান্তি দাও।"

ফাইজান বলল,

"আচ্ছা দিবো শান্তি। তবে শর্ত আছে?"

শায়রা মুখখানা কাঁদো কাঁদো করে বলল,

"আবার কি শর্ত?"

ফাইজান ভণিতা না করে সরাসরি বলল,

"রাতে আমার রুমে চলে আসবি৷ আমি আনুসার সামনে তোকে জোর করে নিয়ে গেলে ব্যাপারটা ভালো হবে না।"

শায়রা উচু আওয়াজে বলল,

"অসম্ভব! কালকে জোর করে আটকে রেখেছিলে বলে আজও যাবো তোমার গোয়ালঘরে? একদম না।"

ফাইজান 'চ' সূচক শব্দ করে বলল,

"ঘর গুছিয়ে রাখার দায়িত্ব ঘরের বউয়ের হয়, স্বামীর না। তাহলে আমার ঘর যদি গোয়ালঘরের মতো হয়ে থাকে, সেটায় দোষ কার? আমার না তোর?"

শায়রা কিয়ৎক্ষণ চুপ থেকে হিসাব মিলিয়ে বলল,

"দোষ আমার?

এই ওয়েট! তুমি সবসময় এমন উল্টোপাল্টা যুক্তি দিয়ে আমাকে কেন ফাঁসাতে চাও? এটা ঠিক না। তোমার রুম, তুমি গুছাবে।"

ফাইজান বলল,

"আমার একার রুম? রুমটা তো এখন থেকে তোরও। তাই গুছিয়ে রাখার দায়িত্বও তোর।"

এই পর্যায়ে স্বল্প বিরতি নিলো ফাইজান। পরপর শায়রার এক হাত নিজের দু'হাতের মুঠোয় পুরে কোমল গলায় বলল,

"শায়ু, তুই ভালো করেই জানিস আমি একদমই গোছানো স্বভাবের মানুষ নই। এলোমেলো, ছন্নছাড়া একটা জীবন আমার৷ নিজের ঘর গুছিয়ে রাখা অনেক দূরের বিষয়, আমি তো নিজের অনুভূতিগুলোও কাউকে গুছিয়ে বলতে পারি না৷ এই কারণেই হয়তো আমার ঘরের প্রত্যেকটা মানুষ- মা, বাবা, আনুসা.. প্রত্যেকেই মনে করে আমার জীবনে তাদের কোনো মূল্য নেই৷

তোকেও বলতে পারবো কি না, জানি না!

আমার জীবনটা গুছিয়ে দেয়ার দায়িত্ব যেমন মা-বাবা তোকেই দিয়েছে, সেভাবে আমার অগোছালো কথাগুলো গুছিয়ে নিজ থেকে বুঝে নেওয়ার দায়িত্বও একান্ত তোর।"

অনুভূতির পঙক্তিমালা আর ফাইজানের মুখে বলার প্রয়োজন হলো না৷ ওর চোখে তাকিয়েই শায়রা পড়ে ফেলতে পারলো অনেককিছু৷ বুঝে নিলো হাজারো না বলা কথা৷ একটা অনুভূতি তীব্রভাবে নাড়া নিলো অন্তর৷

"হাজার অগোছালো হলেও, মানুষটা তার।"

কিছু মুহুর্ত এভাবে পার হওয়ার পর শায়রা ফাইজানের থেকে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিলো। আশেপাশে তাকিয়ে এলোমেলো পল্লব ঝাপটে বলল,

"ঠিক আছে। গুছিয়ে নিবো সব। তবে আমারও একটা শর্ত আছে।"

ফাইজান কৌতুহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলো,

"কি সেটা?"

শায়রা জবাবে বলল,

"আমার কাজে হেল্প করতে হবে৷ আমি যেভাবে শিখিয়ে দিবো ওভাবেই করবে। পারবে তো?"

ফাইজান বেশ ভাব নিয়ে বলল,

"এ আর এমন কি? দেখিয়ে দিলে সব পারবো।"

শায়রা মুচকি হেসে বলল,

"আচ্ছা যাও তাহলে। আমি বই-টই গুছিয়ে রেখে আসছি।"

এটা বলার পর ফাইজান উঠে চলে গেলো নিজের রুমে। কিছুক্ষণের মধ্যে শায়রাও সব গুছিয়ে রেখে চলে গেলো নিজেদের ছোট্ট মহলটা মনমতো সাজিয়ে নিতে।

ফাইজানের রুম থেকে শব্দ পেয়েই মালেকা বেগম ও আনুসা চলে এলো কি হচ্ছে সেটা দেখতে৷ দেখার সঙ্গে সঙ্গে তো মালেকা বেগমের চক্ষু চড়কগাছ! দু'জনের এমন উন্নতি হঠাৎ করে দেখে চমক সামলাতে পারলেন না। বলে ফেললেন,

"আনুসা রে, আমি কি ঠিক দেখছি মা? নাকি বয়স হচ্ছে দেখে ভ্রমে ধরেছে?"

আনুসা হেসে জবাব দিলো,

"তুমি ঠিকই দেখছো, মা৷ তোমার ছেলে আর ছেলের বউ নিজেদের মধ্যে মানিয়ে নিতে শিখে গেছে।"

ভদ্রমহিলা আবেগাপ্লুত হয়ে বললেন,

"আলহামদুলিল্লাহ! কারো নজর না লাগুক ওদের উপর। মনে হচ্ছে, আল্লাহ সহায় হয়েছে আমাদের উপর। হয়তো..হয়তো কোনো ভুল হয় নি আমাদের দ্বারা।"

ফাইজান ও শায়রাকে ওরা ছেড়ে দিয়েছে নিজের মতো। ওদের ঘর ওরা নিজেরাই গুছিয়ে নিক। দেখা যাচ্ছে শায়রা কাজের ফাঁকে ফাইজানকে যেভাবে যেটা করতে বলছে, ফাইজানও সেভাবেই গুছিয়ে রাখছে। রুমটা সম্পূর্ণ ঠিকঠাক করতে অনেকটা সময় লাগছে তাদের।

ইতিমধ্যে ঘড়ির কাঁটা পেরিয়েছে সাড়ে নয়টার ঘর। প্রতিদিন এই সময়ের মধ্যেই ফজল সাহেব বাড়িতে এসে পড়েন৷ কিন্তু কোনো এক অজ্ঞাত কারণে আজ দেরি হচ্ছে তার৷ কলও ঢুকছে না ফোনে। ফলাফল সময়ের সাথে সাথে দুশ্চিন্তা বেড়েই যাচ্ছে মা-মেয়ের৷ ধৈর্য ধরতে না পেরে শেষমেশ ফাইজানকে ডাকলেন মালেকা বেগম। বললেন,

"বাবা, একটু অফিসে ফোন করে দেখ তো তোর বাবা এখনো সেখানে আছে কি না? ওর তো সাধারণত এত দেরি হয় না। হলেও ফোন করে জানিয়ে দেয়। আজ কোনো খোঁজই নেই। আবার কলও ঢুকছে না।"

ফাইজান মায়ের কথামতো সঙ্গে সঙ্গে ফোন করলো অফিসের ম্যানেজারের নাম্বারে। রিসিভ হতেই লোকটা লম্বা-চওড়া সালাম দিয়ে বলল,

"স্যার আপনি? আজ কি মনে করে?"

ফাইজান বলল,

"হ্যাঁ, আমিই। বাবা কই? এখনো কি অফিসেই আছেন?"

ম্যানেজার শফিক জানালেন, ফজল সাহেব অফিসে নেই। তিনি প্রতিদিনকার সময় অর্থাৎ আটটা বাজেই বেরিয়ে গেছেন। তাহলে আটকা পড়লো কোথায়? জ্যামে পড়ে নি তো?

মালেকা বেগম এসব শুনলে বেশি টেনশনে পড়ে যাবে ভেবেই ফাইজান সত্যিটা বলল না। কথা ঘুরিয়ে বলল,

"বাবা একটা কাজে আটকে গিয়েছিলো। অফিস থেকে বেরিয়েছেই নাকি কিছুক্ষণ আগে। চলে আসবে। তুমি টেনশন করো না। রুমে গিয়ে শুয়ে থাকো।"

একটু স্বস্তি নিয়ে রুমে গেলেন মালেকা বেগম। ফাইজান উনার সাথে সাথে আনুসাকেও পাঠিয়ে দিলো। আর তারা দুইজন ফিরে আসলো নিজের রুমে। ফাইজানের চিন্তিত মুখখানা দেখেই শায়রা আন্দাজ করে ফেলেছে ও মিথ্যে বলেছে। তাই রুমে ঢুকার সাথে সাথে জিজ্ঞেস করলো,

"কি হয়েছে? ফুপা কই?"

ফাইজান খাটে বসে বলল,

"জানি না। উনি তো বললেন প্রতিদিনের সময়েই বেরিয়েছে। তাহলে কই আছে এখন?"

শায়রা ফাইজানের গা ঘেঁষে বসে হাত রাখলো ফাইজানের ঘাড়ে। ওকে আশ্বস্ত করে বলল,

"কিচ্ছু হবে না। দেখবে, জলদিই চলে আসবে।"

ফাইজান ঘুরে তাকালো ওর দিকে। উপর-নীচ মাথা নেড়ে বলল,

"হুম। আশা করি, সব ঠিকঠাকই থাকবে।"

ফাইজান ও শায়রার চিন্তাকে ভুল প্রমাণিত করতেই হয়তো আচমকা বেজে উঠলো ফাইজানের ফোনটা৷ সে পকেট থেকে ফোন বের করেই দেখতে পেলো ফজল সাহেবের নাম্বার৷ খানিকটা স্বস্তি পেলো দু'জনেই। কল রিসিভ করে বলল,

"হ্যাঁ, বাবা। কই তুমি?"

তৎক্ষনাৎ ফাইজানকে অবাক করে দিয়ে অপরপাশ থেকে ভেসে এলো অচেনা এক কন্ঠস্বর৷ তিনি জিজ্ঞেস করছেন,

"আপনি কি ফজল আহমেদের ছেলে বলছেন?"

ফাইজান একবারের জন্য তাকালো শায়রার দিকে। শায়রা ইশারায় জিজ্ঞেস করলো, কি বলছে? পরমুহূর্তে ফাইজান কান থেকে ফোন নামিয়ে লাউড স্পিকারে দিলো। এরপর বলল,

"জি, আমি উনার ছেলে বলছি। কিন্তু আপনি কে? আর বাবার নাম্বার আপনার কাছে কেন?"

অপরপ্রান্ত থেকে লোকটা বলল,

"ফজল সাহেবের বাটন ফোনের কললিস্টের টপে আপনার নাম্বারটাই ছিলো, তাই আপনাকেই কল করলাম।

আপনার বাবার এ*ক্সি*ডেন্ট হয়েছে। অবস্থা ভীষণ শোচনীয়। যত দ্রুত সম্ভব আপনারা হসপিটালে চলে আসুন।"

হৃদয়ের রঙিন ক্যানভাস পর্ব ২৫ গল্পের ছবি