হৃদয়ের রঙিন ক্যানভাস

পর্ব - ২৮

🟢

ফাইজানের কথায় ঘরের মধ্যে ছোট-খাটো ব*জ্রপাত হলো যেন। পরমুহূর্তেই আবার কয়েক সেকেন্ডের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেলো সবকিছু৷ প্রত্যেকের মনেই সন্দেহ, যা শুনেছে তা আদ্যো সত্যি? নাকি ভুল শুনছে?

সকলের প্রতিক্রিয়া দেখে ফাইজান বুঝলো সে অনাকাঙ্ক্ষিত একটা কথা বলে বসেছে। তাদের নিশ্চিত করতে ফাইজান গলা খ্যাঁকাড়ি দিয়ে বলল,

"আমি সত্যিই বলছি। কাল থেকে আমি অফিস জয়েন করবো।"

ফজল সাহেব ধাতস্থ হয়ে সন্দেহ সমেত শুধালেন,

"তুমি আসলেই কাল মিটিং এটেন্ড করবে, ফাইজান? একরাতে পারবে সব ম্যানেজ করতে?"

ফাইজান নির্বিঘ্নে বলল,

"জানি না পারবো কি না! তবে আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো।"

পাশ থেকে শায়রা প্রশ্ন করলো,

"ভেবে বলছো তো? হঠাৎ করে ধরলেই পারবে, এতটাও ইজি না কিন্তু!"

ফাইজান বলল,

"কোনোকিছুই শুরুতে ইজি হয় না। চেষ্টা করতে হয়। আমিও চেষ্টা করলাম। আর তুই..হেল্প করবি আমায়। তুই তো আবার আমার চেয়েও বেশি ব্রিলিয়ান্ট।"

ছেলের ভাব গতির এরুপ পরিবর্তন দেখে এখনো চমক সামলাতে পারছেন না মা-বাবা। উভয়েই মুখ দেখাদেখি করলেন একে অপরের। অতঃপর ফজল সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,

"আচ্ছা। আমি শফিককে বলছি তোমাকে ইমেইলগুলো পাঠিয়ে দিতে। মাত্র একরাতে প্রিপারেশন নিতে হবে কিন্তু! কালকের ডিলটা খুবই ইম্পর্ট্যান্ট। খুব ভরসা করে তোমার হাতে দিচ্ছি। আশা করি আমার ভরসার মান রাখবে।"

"হু।"

ছোট্ট এক শব্দে উত্তর দিলো ফাইজান। এরপর চলে গেলো নিজের রুমে।

********

ফাইজানের ছন্নছাড়া জীবনে অভ্যস্ত হওয়ার পর থেকেই বাবার সাথে তার সম্পর্কটা কেমন মলিন হয়ে গেছে। দরকার ছাড়া কোনো বাক্যবিনিময় তাদের মধ্যে হয়-ই না বলতে গেলে। অনেকদিন বুঝিয়ে সুঝিয়ে ছেলেকে সুপথে ফেরানোর চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছিলেন ফজল সাহেব। অনেক বুঝিয়েছিলেন বিজন্যাসের হাল ধরার জন্য। তার বয়স হয়েছে, এজন্য চেয়েছিলেন ছেলের হাতে দায়িত্ব অর্পণ করে একটু নিশ্চিত হবেন। কিন্তু নাছোড়বান্দা ছেলে কোনোভাবেই বিজন্যাসে ঢুকতে রাজি হয় নি। এই নিয়ে কথা কা*টাকা*টিও হয়েছে বাবা-ছেলের মধ্যে। এরপর থেকেই ছেলের সাথে দূরত্ব বেড়েছে তার।

কিন্তু আচমকা তার এই এ*ক্সিডেন্ট যে ছেলের মধ্যে আমূল পরিবর্তন এনে দিবে এটা কস্মিনকালেও ভাবেননি ফজল সাহেব৷ যদি জানতেন তার এরুপ শারিরীক অসুস্থতা দিয়ে ফাইজানকে ইমোশনাল ব্ল্যা*কমেইল করা যাবে, তাহলে বহু পূর্বেই স্বেচ্ছায় এ*ক্সিডেন্ট ঘটাতেন। তবে যাক, দেরি করে হলেও অসুস্থতার বাহানায় ছেলে বিজন্যাসে তো ঢুকছে। ফাইজান একবার বিজন্যাসে ঢুকে গেলে দু'মাস কি, জীবনের বাকি দিনগুলো রেস্টেই কাটানোর ফন্দি করে বসেছেন ফজল আহমেদ।

গত কিছুক্ষণ যাবত রুমে একা-একা বসে এসবই ভাবছিলেন ফজল সাহেব। এরপর মালেকা বেগম ফলের প্লেট হাতে রুমে ঢুকলেন। গিয়ে বসলেন বিছানায়, ফজল সাহেবের পাশে। হাসিমুখে বললেন,

"ছেলেটা বোধহয় একটু একটু করে দায়িত্ব বুঝতে শুরু করেছে।"

ফজল সাহেব গর্বের সহিত বললেন,

"হ্যাঁ, বুঝতে তো হবেই। আমি তোমাকে আগেই বলেছিলাম না, বিয়ে দিয়ে ওর মাথায় সংসারজ্ঞান, দায়িত্ববোধ ঢুকাতে পারলেই তোমার ছেলে লাইনে আসবে। দেখলে তো? আমার কথা অক্ষরে অক্ষরে ফলে গেলো।"

মালেকা বেগমের হাসি চওড়া হলো এ-কথা শুনে। বললেন,

"তোমার মনে হয় এত সহজ? ডক্টর বারবার বলে দিয়েছে তোমাকে বেডরেস্টে রাখতে। ফাইজানের কানের সামনে চৌদ্দবার করে বলেছে, তোমাকে কোনোপ্রকার প্রেশার দেয়া যাবে না। এজন্যই ছেলেটা অফিসে ঢুকছে। দু'মাস পর তুমি অফিস গেলেই ও বে-লাইন হয়ে যাবে।"

ফজল সাহেব চতুর হেসে বললেন,

"ও ধুরন্ধর হলে, আমিও ওর বাপ। একবার শুধু বিজন্যাসে ঢুকুক। আমিও দেখবো ও কিভাবে আবার দায়িত্ব ছেড়ে দেয়! ওর দুর্বলতা আমার অসুস্থতা, তাই তো? এই অসুস্থতার ভান ধরে এমন কলকাঠি নাড়বো, দু'মাস কি আগামী বিশবছরেও ফাইজান বিজন্যাস থেকে বেরোতে পারবে না!"

মালেকা বেগম হাসতে হাসতে বললেন,

"তোমরা পারোও!"

**********

ফাইজান-শায়রা সেই কখন এসে ঢুকেছে নিজেদের রুমে। ঘন্টার কাঁটা বারোটার ঘর পেরিয়ে এখন একটা ছুঁইছুঁই। শফিক সাহেব ফজল আহমেদের কথামতো গুরুত্বপূর্ণ ফাইলগুলো মেইল করে ফাইজানের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছে। ফাইজান ল্যাপটপ খুলে সেগুলোই বসে বসে দেখছে। তীক্ষ্ণ মনোযোগ তার কাজের মধ্যে।

এরমধ্যে পাশে বসা শায়রা কয়েকবার হাই তুলে ফেলল। শেষমেশ ঘুমে আর টিকতে না পেরে বলল,

"তুমি কি এখন সারারাত বসে বসে এগুলোই দেখবে?"

ফাইজান ল্যাপটপে সমস্ত মনোনিবেশ রেখে বলল,

"সব ভালোভাবে গুছিয়ে না নেয়া পর্যন্ত বসেই থাকতে হবে। কালকে ফার্স্ট ডে। আমি চাচ্ছি না কোনো ভেজাল হোক।"

শায়রা একহাতে চোখ ডলতে ডলতে বলল,

"বাব্বাহ! বিজন্যাস নিয়ে এত সিরিয়াস হয়ে যাচ্ছো? এত ভালো হলে কবে থেকে?"

ফাইজান ফটাফট বলল,

"শুধু বাবার অসুস্থতার জন্য। ডক্টর কি বলল, শুনিস নি? এখন এসব প্রেশার দেয়া ঠিক হবে না। এজন্যই অফিস জয়েন করছি। নাহলে কে যায় এসব প্যারা মাথায় নিতে? বাবা সুস্থ হয়ে গেলেই আমার ছুটি।"

শায়রা চোখ থেকে হাত নামালো। ঘুমে জর্জরিত চক্ষুদ্বয় লাইটের আলোতে খুলে রাখতে বেগ পেতে হচ্ছে তাকে। ফল্পস্বরূপ নাক-মুখ কুঁচকে আছে তার। ওমন বিরক্তিসমেত বলল,

"বাবা সুস্থ হলেই ছুটি? তারপর বাকি জীবন কি করবে? রাস্তায়-রাস্তায় ঘোড়া চড়িয়ে বেড়াবে?"

ফাইজান অবলীলায় বলল,

"ছুটি বলেছি। একেবারে ছুটি তা তো বলিনি! আমার বাচ্চা-কাচ্চার ভবিষ্যতের জন্য হলেও বিজন্যাস হোক, জব হোক, কিছু তো একটা করতেই হবে।"

শায়রার ঘুমটুকু বিনষ্ট করার জন্য এ-কথাই যথেষ্ট ছিলো। চক্ষুদ্বয় প্রকট করে তাকিয়েছে মেয়েটা৷ থতমত খেয়ে বলল,

"এখানে বাচ্চা-কাচ্চা আবার কোত্থেকে এলো?"

এতক্ষণে ফাইজানের নজর সরলো ল্যাপটপের উপর থেকে। কেমন অদ্ভুত, নেশাক্ত দৃষ্টিতে চাইল শায়রার দিকে। বিছানার মধ্যে দু'জন দু-পাশে বসা। মাঝে অনেকটা জায়গা-ই খালি। ফাইজান ঠোঁট কামড়ে হেসে মধ্যকার সেই খালি জায়গাটুকু দেখিয়ে বলল,

"তোর আর আমার মাঝে অনেকটা জায়গা ফাঁকা আছে। দুরত্বও আছে বেশ। দু'জনের এই দুরত্বটুকু মিটিয়ে ফেললেই বিছানার ফাঁকা জায়গায়টায় বাচ্চা-কাচ্চা দিয়ে পরিপূর্ণ হতে সময় লাগবে না!"

শায়রার চোখের পাতায় যতটুক ঘুম বাকি ছিলো, তাও পড়ি-মরি করে ছুটে পালালো। কথার ইঙ্গিতে হাত-পা ঠান্ডা হয়ে এলো শায়রার। লজ্জা ও ইতস্ততায় তড়াক করে লাফিয়ে নেমে পড়লো বিছানা থেকে। আমতা-আমতা করে বলল,

"তু..তুমি তোমার কাজ করো। আমি ঘুমাতে যাচ্ছি।"

ফাইজান ভ্রু উঁচিয়ে তীক্ষ্ণ নজরে শায়রাকে পরখ করে বলল,

"বিছানা রেখে কই যাবি ঘুমাতে?"

শায়রা একইরকম ভঙ্গিতে উত্তর দিলো,

"কই আবার? আনুসার রুমে। আমি যাই, টাটা।"

বলেই আর কোনোকিছুর অপেক্ষা না করে ছুট। ফাইজান শব্দহীন হাসলো ওর গমনপথে চেয়ে।

********

আনুসার রুমে ঢুকেই জোরে-শোরে দরজা বন্ধ করে ফেলল শায়রা৷ শব্দ পেয়ে ঘুম ভেঙে লাফ দিয়ে উঠে বসলো আনুসা। ঘাবড়ে গিয়ে বলল,

"কি হয়েছে? বাড়িতে চোর-ডাকাত ঢুকেছে নাকি? এত জোরে দরজা লাগালে কেন?"

শায়রা উত্তর দেয়ার অবস্থাতে নেই৷ হৃৎস্পন্দন এখনো অস্বাভাবিক গতিতে চলছে। হাত-পা বরফ-শীতল হয়ে মনে হচ্ছে এখনি জমে যাবে৷ শ্রবণেন্দ্রিয়ে এখনো লাগাতার বেজে চলেছে ফাইজানের বলা কথাটা। আর লজ্জায় রক্তিম হচ্ছে তার গোলগাল কপোল।

আনুসা উঠে এসে হাত রাখলো শায়রার কাঁধে। সঙ্গে সঙ্গে পিছু ঘুরলো শায়রা৷ নিজেকে স্বাভাবিক রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে বলল,

"তুই ঘুমাস নি? এত রাতে জেগে আছিস যে?"

আনুসা শান্ত স্বরে বলল,

"ঘুমিয়েই তো গিয়েছিলাম। কিন্তু তোমার গেট লাগানোর শব্দে ঘুম ভেঙে গেছে। এমন করলে কেন? কিছু হয়েছে?"

শায়রা না-বোধক ইশারায় মাথা নাড়লো। তবে মনে মনে বলল,

"হয়েছে তো অনেককিছুই। সেসব কি মুখে বলা সম্ভব? আমি তো আর তোর ভাইয়ের মতো লজ্জা-শরম বিক্রি করে আসিনি।"

আনুসা বলল,

"শুধু শুধুই ঘুমটা ভাঙালে। আমি আরও ভেবেছি বাসায় চোর ঢুকেছে বুঝি!"

হাসলো শায়রা। টেনে-হিঁচড়ে আনা হাসি যাকে বলে। বলল,

"সরি, বেশিই জোরে শব্দ করেছি। যা তুই ঘুমা।"

আনুসা বলল,

"হ্যাঁ যাচ্ছি। একটু ওয়াশরুম থেকে আসি।"

শায়রা দরজা ভিড়িয়েছে ঠিকই তবে লক করতে ভুলে গেছে। আনুসা ওয়াশরুমে ঢুকতেই নিজের এই ভুলটা ধরা দিলো তার চোখের সামনে। ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে। ফাইজান এসে পড়েছে ভেতরে। সে একদম শায়রার কাছাকাছি এসে চাপা স্বরে বলল,

"তুই আমার রুম থেকে পালিয়ে এলি কেন? তোকে না বলেছি, এখন থেকে আর আনুসার রুমে থাকা লাগবে না। আমাদের রুমে থাকবি।"

শায়রা উত্তর দেয়ার আগে ভয়ে-ভয়ে তাকালো ওয়াশরুমের দরজা থেকে। এই মুহুর্তে আনুসা বেরিয়ে ওদেরকে একসাথে দেখে ফেললেই ব্যাপারটা শায়রার জন্য লজ্জার হবে। কিন্তু ফাইজানের এসব নিয়ে মাথাব্যাথা নেই। সে উত্তরের আশায় তাকিয়ে আছে শায়রার দিকে।

শায়রা এক নজর ওদিকে তাকিয়ে ফাইজানের দিক ফিরে বলল,

"দেখো, তুমি তো কাজে ব্যস্ত আছো। তাই ভাবলাম, আমি আনুসার রুমেই ঘুমাই। এখন তুমি যাও!"

ফাইজান ভ্রুযুগল কুঁচকে বলল,

"সিরিয়াসলি? কাজে ব্যস্ত আছি বলে চলে এসেছিস? তার মানে কাজ ফেলে তোকে টাইম দিচ্ছি না বলে চলে এলি? আরেহ, শায়ু! কাজ তো শেষের পথে। এরপর পুরো রাত টাইম দিবো। চল।"

শায়রা ত্রস্থ মাথা নেড়ে হড়বড় করে বলল,

"না না, দরকার নেই আমার টাইম। তুমি যাও।"

ফাইজান বলল,

"একা একা যাওয়ার জন্য আসিনি তো। তোকে নিয়ে যেতে এসেছি। না গেলে সেদিনের মতো জোর করে নিয়ে যাবো। সিম্পল হিসাব।"

বলতে দেরি, তবে শায়রাকে কোলে তুলতে এক মুহুর্ত দেরি নয়। শায়রা আঁতকে উঠল প্রথমে। পরপর নার্ভাসনেসে কাঁদোকাঁদো হয়ে বলল,

"এ কি অবস্থা! তুমি কথায় কথায় আমাকে কোলে তুলো কেন? আবার মোটা নিয়ে অভিযোগ করো।"

ফাইজানের শায়রার মুখের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসে কন্ঠে ধমক ছুড়লো,

"চুপ। চেঁচিয়ে মহল্লাবাসীকে জানানোর দরকার নেই, আমি তোকে কোলে তুলেছি। এবার চল, বাকি হিসাব পরে হবে।"

এরপর দ্রুত পা ফেলে চলে গেলো আনুসার রুম থেকে। আনুসা ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে দেখলো রুমের দরজা খোলা, আর শায়রা লাপাত্তা। ঘটনা আন্দাজ করে মেয়েটা নিজমনে বলল,

"আবার যদি ভাইয়ার কাছেই যাওয়ার ছিলো তো মাঝরাতে এসে আমার ঘুমটা ভাঙানোর কোনো মানে হয়? আশ্চর্য!"

*******

ফাইজান নিজের রুমে ঢুকে শায়রাকে বিছানার উপর রেখে নাটক করে বলল,

"কোমড়টা গেলো আমার। এই মুটকি, তুই খাওয়া কমাতে পারিস না? দিনে দিনে আরও বেশি ভারী হয়ে যাচ্ছিস।"

শায়রা গাল ফুলিয়ে বলল,

"আমি কি একবারো বলেছি তোমাকে, যে আমাকে কোলে নাও? তুমিই তো এমন করো৷ এটা কেমন অভ্যাস?"

ফাইজান নাটকীয় ভঙ্গিমা ছাড়লো। শক্ত কন্ঠে বলল,

"আমার কি দোষ? তুইই তো আমার কথা শুনিস না।"

শায়রা তীক্ষ্ণ স্বরে বলল,

"কথা না শুনলে কোলে তুলতে হয়, এটা কেমন নিয়ম? এইসব আজব নিয়ম আমি মানি না। কোলে তুলবে, আবার মোটা, ভারী বলে খোঁটা দিবে। আবার নিজেই খাওয়াবে। আমি যে রাতে জাগলে কিংবা ঘুম ভাঙলে উঠে কিছু না কিছু খাই, এই অভ্যাসটাও জানো? এজন্য সব আনুসার রুমে জমা দিয়ে রেখেছিলে, তাই না? আনুসা সব বলেছে আমাকে। যদি নিজেই আমার স্বভাব প্রশ্রয় দাও, তাহলে পরে আবার মুটকি মুটকি বলো কেন?"

শায়রা মাঝেমধ্যে ভেবে পায় না ফাইজানের এরুপ দু'মুখী আচরণের কারণ৷ নিজেই ওর সব স্বভাব প্রশ্রয় দেবে, আবার নিজেই নাটক করবে। তাই আজ না পেরে সরাসরি প্রশ্ন করে বসেছে। ফাইজান ওর কথার জবাবে বলল,

"আমি তোকে বেশি-বেশি খাওয়াতে চাই, যেন তুই সবসময় এমন মুটকি থাকিস। যদি খাওয়া-দাওয়া কমিয়ে স্লিম হয়ে গেলি তো আমি মুটকি ডাকবো কাকে?"

কথার পিঠে এহেন উত্তরটার জন্য একদমই প্রস্তুত ছিলো না শায়রা। বিস্ময়ে রীতিমতো হা হয়ে গেলো মেয়েটা। কিয়ৎক্ষণ সময় নিয়ে নিজেকে ধাতস্থ করে বলল,

"এটা আবার কেমন যুক্তি? শুধুমাত্র এই নামে ডাকবে বলে তুমি চাও আমি বেশি বেশি খাই? শুধুমাত্র একটা ডাকনামের জন্য?"

ফাইজান গুরুগম্ভীর ভঙ্গিমায় বলল,

"অবশ্যই। তুই যদি খাওয়া-দাওয়া কমিয়ে চিকন হয়ে যাস, তাহলে তো আমি আর তোকে মুটকি ডাকতে পারবো না। ব্যাপারটা খুবই সিরিয়াস এবং ভয়ংকর। তাই তুই বেশি বেশিই খা। আমি না হয় একটু সমস্যা ফেস করলাম!"

শায়রা রে*গে-মেগে বালিশ তুলে দুমদাম কয়টা মা*র বসালো ফাইজানের বাহুতে। ফুঁসে ওঠে বলল,

"তুমি কোলে নিবে না আমাকে। কোলে নাও আর এইরকম খোঁটা দাও। তুমি একটা...."

বেশ কিছুক্ষণ চেষ্টার পর শায়রার হাতের বালিশটা কেঁড়ে নিতে সক্ষম হলো ফাইজান। সস্থির নিশ্বাস নিয়ে বলল,

"আপাতত বেঁচে গেছি। মুটকি, তুই থাম।"

রাগ শান্ত হতেই থামলো শায়রা। হাত-পা গুটিয়ে চুপচাপ বসে রইলো খাটে। ফাইজান উঠে দরজা লক করে, লাইট অফ করে ফিরে এলো নিজের জায়গায়৷ ল্যাপটপটা নিতে নিতে বলল,

আর একটু কাজ বাকি আছে, ওটা শেষ করে নেই। তারপর ঘুমাবো। কাল অফিসের ফার্স্ট ডে, তার উপর প্রথমবারের মতো মিটিং এটেন্ড করবো। ভালো ঘুম না হলে সব গুবলেট হয়ে যেতে পারে। তাই আর জ্বালাতন করিস না আমাকে।"

শায়রা মুখ ভেঙচি দিয়ে বলল,

"জ্বালাতন কে কাকে করে, সেটা দেখাই যায়। শুধু শুধু সব দোষ আমাকে দেয়া হয়।"

ফাইজান আর একটা কথাও বাড়ালো না। চুপচাপ সবটা কাজ শেষ করে বেডসাইডের টেবিলে ল্যাপটপটা রেখে দিলো।

ততক্ষণে রাত্রি প্রায় দু'টো। শায়রা বসেছিলো ফাইজানের কাজ শেষ হওয়ার অপেক্ষায়। ফাইজান বিছানায় শুতেই গতদিনের মতো মাঝে কোলবালিশ রেখে দিলো ও। সাবধানের মা*র নেই! ফাইজানের কথা-বার্তা আজকাল শায়রার কাছে মোটেও সুবিধার ঠেকছে না।

শায়রা মাঝে বালিশ দেয়ার পরও একদম সাইড চেপে শুয়ে পড়লো। ফাইজান এসব কর্মকান্ড দেখে বলল,

"জি বাংলা সিরিয়ালের নাটক লাগিয়ে রেখেছিস কেন? তোর মনে হয় মাঝে বালিশ-টালিশ দিলেই কাজ হবে? এটা যেকোনো মুহূর্তে সরিয়ে ফেলা যাবে। নেহাৎ আমি ভালো মানুষ। নাহলে...."

শায়রা অতিষ্ঠ হয়ে দু'হাতে কান চেপে ধরে বলল,

"চুপ করবে তুমি? এতদিন তো আমি তোমাকে মুখই খুলতে দেখতাম না। বাড়িতে আসলে তো মনে হয় বোবা হয়ে যেতে। আর আজকাল? এত ডায়লগবাজি কোথা থেকে শিখছো?"

ফাইজান সাবলীলভাবে বলল,

"ওকে, চুপ করবো। তুই এই বালিশগুলো সরিয়ে ফেল, তাহলেই আমি চুপ করে ঘুমিয়ে যাবে। এই অশান্তি নিয়ে আমার ঘুম আসবে না।"

অগত্যা! শায়রা বাধ্য হয়ে সরিয়ে ফেলল বালিশটুকু। এরপর দু'জন ঘুমাতে গেলো নিজের জায়গায়৷ এক মিনিট, দুই মিনিট, তিন মিনিট...

এমন করে বোধহয় দশ মিনিট অব্দি গেলো। এরপরই শায়রা ত্রস্থবেগে মাথা রাখলো ফাইজানের বুকে। নিজের পেলব হাতখানা বাড়িয়ে ফাইজানকে জড়িয়ে ধরে বেশ আদুরে গলায় বলল,

"এভাবে ঘুম আসছে না। জড়িয়ে ধরো আমাকে।"

হৃদয়ের রঙিন ক্যানভাস পর্ব ২৮ গল্পের ছবি