হৃদয়ের রঙিন ক্যানভাস

পর্ব - ৩০

🟢

শায়রাকে ইচ্ছেমতো কতক্ষণ জ্বালিয়ে রুম থেকে বের হলো ফাইজান। মালেকা বেগম ততক্ষণে নাস্তা সাজিয়ে ফেলেছেন। ফাইজানকে দেখে মুগ্ধ হয়ে ধীরকন্ঠে বললেন,

"মা-শা-আল্লাহ! কি সুন্দর লাগছে আমার ছেলেটাকে! কারো নজর না লাগুক।"

ভদ্রমহিলা ছেলের পরিবর্তনে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছেন। মনে হচ্ছে এখনই কেঁদে ফেলবেন। এমনিতেই তিনি বেশ নরম মনের মানুষ!

শায়রা ফুপুর প্রতিক্রিয়া দেখে বিড়বিড়িয়ে বলল,

"ফুপা ঠিকই বলে। ফুপ্পিই বেশি আদরে একে মাথায় তুলে বিগড়ে ফেলেছে। আর এখন ভুগতে হচ্ছে আমাকে!"

ফাইজান দু'জনের কথাই শুনলো। কিন্তু বিপরীতে বলল না কিছু। যথার্থ ভাব-গাম্ভীর্যতা বজায় রেখে বসলো চেয়ারে। মালেকা বেগম শায়রাকে বললেন,

"তুই দেখ, ওর কি কি লাগে! আমি তোর ফুপাকে নাস্তাটা দিয়ে আসছি।"

শায়রা মাথা নাড়তেই তিনি দ্রুত চলে গেলেন। পরপর শায়রা এসে বসলো ফাইজানের পাশের চেয়ারে। কর্কশ স্বরে বলল,

"কি কি লাগবে, বলুন। আপনার সেবা করার আদেশ দিয়ে গিয়েছেন আমার শাশুড়ীমা।"

ফাইজান ভ্রুযুগল কুঁচকে চাইল ওর দিকে। বলল,

"এভাবে বলিস না, কষ্ট লাগে। কষ্ট লাগলে আমার পাকস্থলীতে ব্যাথা হয়।"

শায়রা হতভম্ব হয়ে গেলো এহেন কথা শুনে। চোখ পিটপিট করে বলল,

"ব্যাথা পাকস্থলীতে হয়? সিরিয়াসলি?"

ফাইজান গুরুগম্ভীর ভঙ্গিমায় বলল,

"হ্যাঁ। তোর রসকষহীন কথা-বার্তা শুনলে আমার পাকস্থলীতে ব্যাথা হয়। সত্যি বলছি!"

শায়রা বুঝলো ফাইজান মজা করে কথাটা বলেছে। কিন্তু ওর কাছে ব্যাপারটা খুব বেশি হাস্যকর মনে হলো না। অবলীলায় বলে দিলো,

"নষ্ট পাকস্থলী তোমার। এজন্যই ব্যাথা হয়। আমার আর দোষ কি?"

ফাইজান বলল,

"ভুল তথ্য। আমার শরীরের সবকিছু ফিটফাট আছে। আচ্ছা যাই হোক, যেটা বলতে চাচ্ছিলাম! মা একটু আগে কি বলে গেলো, শুনেছিস?"

শায়রা জেনেও না জানার ভান ধরলো। টেবিলের উপর রাখা দু'হাতে ভর দিয়ে আগ্রহী হয়ে এগিয়ে এসে বলল,

"শুনি নি তো! কি বলেছে?"

ফাইজান দুঃখ পাওয়ার নাটকীয় ভঙ্গিমা করে বলল,

"মা বলেছে, তার ছেলের উপর যেন কারো নজর না লাগুক। কিন্তু মা কি আর জানে, তার আদরের ভাতিজি আগেই নজর লাগিয়ে বসে আছে!"

কপালে হাত পড়লো শায়রার। হতাশ হয়ে বসে রইলো কিছুক্ষণ। এরপর বিরক্তিসমেত বলল,

"কি শুরু করেছো তুমি? একটু পরপর কথায় কথায় আমাকে খোঁচা না মারলে কি পেটে খাবার ঢুকছে না? মাথা ব্যাথা না করিয়ে, চুপচাপ খাওয়া শেষ করো।"

ফাইজান ঠোঁট উল্টালো। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

"উচিত কথার ভাত নেই।"

শায়রা কটমটিয়ে বলল,

"ভাত নেই, পরোটা আছে। সেটা খেয়েই উদ্ধার করো আমাকে!"

শায়রা ক্ষে*পে যাচ্ছে বুঝতে পেরে চুপ হয়ে গেলো ফাইজান। অফিসের প্রথমদিন বাসা থেকে বের হওয়ার আগেই বউকে রাগিয়ে বের হতে চাচ্ছে না ও। নাহলে বউয়ের অভিশাপে সারাদিনের শান্তি বিনষ্ট হয়ে যেতে পারে! কি দরকার অত রিস্ক নেয়ার? সকালের জন্য এতটুকু ডোজই ঠিক আছে। বাকিটুক রাতে এসে পূরণ করা যাবে।

খাওয়া শেষে ফজল সাহেব একবার ছেলেকে রুমে ডাকলেন। ফাইজান ভেতরে যেতেই আরেকবার সব গুছিয়ে বলে দিলেন। ফাইজান নীরবে মাথা নাড়লো শুধু। এরপর বেরিয়ে গেলো রুম থেকে।

ফাইজান ফ্ল্যাটের দরজার কাছে এসে জুতো পড়তে শুরু করলো। শায়রা চুপচাপ দাঁড়িয়ে ওর কার্যকলাপ দেখছে। আর মালেকা বেগমে এসেছেন ছেলেকে বিদায় দেয়ার জন্য। ফাইজান "আসছি।"

বলে বের হতেই মালেকা বেগম খুশিমনে চলে গেলেন রান্নাঘরে। শায়রা দরজা আটকে ভেতরে যাবে, তার আগেই পুনরায় দরজায় ঠক-ঠকের শব্দ৷ খুব সুস্থির ও ধীর শব্দ। কাছাকাছি না থাকলে শোনা যাবে না এতটাই আস্তে টোকা দেয়া হয়েছে।

এর ফলে শায়রা একটু ঘাবড়ে গেলো। খুব সাহস সঞ্চয় করে দরজা খুলতেই ফাইজানকে দেখে বলল,

"তুমি? আবার ভুলে কিছু ফেলে গিয়েছো নাকি?"

ফাইজান তাড়াহুড়ো করে বলল,

"হ্যাঁ, অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটা কাজ বাকি রেখে গেছি।"

শায়রা ইতি-উতি তাকিয়ে বলল,

"কি কাজ বাকি?"

চকিতে ফাইজান দু'হাতে শায়রার কপোলদ্বয় স্পর্শ করে নিজের দিকে ঘুরালো৷ অতঃপর কাছে টেনে অধরের উষ্ণস্পর্শ বসালো শায়রার কপালের ঠিক মাঝ-বরাবর। ইতস্ততা-বিহীন ভীষণ সাবলীল সে স্পর্শ।

জীবনের প্রথম চুম্বনের আবেশে স্তব্ধ হয়ে রইলো শায়রা৷ ফাইজান ওকে ছেড়ে পিছিয়ে এলো কিছুটা। লম্বা শ্বাস নিয়ে বলল,

"সকাল থেকে খুব খাটিয়েছি, তাই না? তুই নিজের দায়িত্ব পালন করলি আর আমি করবো না? উহু, তা তো হবে না। প্রত্যেক সকালের এই চুমুটা বরাদ্দ থাকলো শুধু তোর জন্য!"

বলেই আর অপেক্ষা করলো না ফাইজান। সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে গেলো দ্রুত। পেছনে রেখে গেলো হতচকিত, হতবিহ্বল শায়রাকে।

রান্নাঘরে কিছু একটা পড়ে যাওয়ার শব্দ পেতেই সৎবিৎ ফিরলো শায়রার। চমকে উঠে দ্রুত দরজা লাগিয়ে ফেলল। ঘুরে নিজের রুমে যাবে তার আগেই দেখলো আনুসা নিজের রুমের দরজার পাশে দেয়ালে হেলান দিয়ে মুচকি মুচকি হাসছে। থতমত খেয়ে গেলো শায়রা। জিজ্ঞেস করলো,

"তুই এখানে?"

আনুসা ঠোঁট চেপে হেসে বলল,

"সরি। ভুল সময়ে এসে পড়েছিলাম।"

ভীষণ লজ্জাজনক পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে গেলো শায়রা। আমতা-আমতা করে বলল,

"কিছু দেখেছিস?"

আনুসা একইরকম ভঙ্গিতে বলল,

"না। চোখ বন্ধ করে নিয়েছিলাম।"

**********

অফিসে যাওয়ার পর একবারও ফোন করেনি ফাইজান। সকাল এগারোটা থেকে মিটিং শুরু হতেই ঘরের লোকের টেনশন যেন মাত্রা ছাড়ালো। ব্যবসা-বাণিজ্যে আনারী ফাইজান কিভাবে সব সামলাবে, সেটা ভেবেই কূল হারাচ্ছে তারা। এর-উপর প্রথমদিনেই মিটিং।

দুপুরদিকে ঠিকঠাক খাওয়া-দাওয়াও হলো না তাদের। শুধুমাত্র অসুস্থ মানুষটাকে সময়মতো খাইয়ে ঔষধ খাইয়ে দিয়েছেন৷ বিকালদিকে শায়রা ফোন করছিলো তার মায়ের কাছে৷ বলেছে ফুপার এ*ক্সিডেন্টের কথাও। এরপর দ্বীতি মালেকা বেগমের সাথে কথা-বার্তা বলে জানিয়েছেন, আগামী পরশু, অর্থাৎ শুক্রবারেই ঢাকায় আসছেন তারা।

সন্ধ্যা ছয়টা নাগাদ বাড়ি ফিরলো ফাইজান। মালেকা বেগম তখন নিজের রুমে। আনুসা ও শায়রা ড্রইংরুমে বসেই কথা বলছিলো কোনো একটা ব্যাপারে। এমনসময় কলিংবেলের শব্দ পেয়ে দ্রুত উঠে গেলো শায়রা। ফাইজান এসেছে ভেবেই উৎফুল্লতা সমেত দরজা খুলল গিয়ে। এরপর কোনোপ্রকার সম্ভাষণ ছাড়াই দু'হাত কোমড়ে রেখে ঝাড়ি মারলো,

"সারাদিন কি এতই ব্যস্ত ছিলে যে বাসায় একটা ফোনও করা গেলো না? জানো না, আমরা সবাই যে টেনশনে থাকবো? আমি দু'বার ফোন করলাম সেটাও ধরলে না। একটা কল করলে কি হতো?"

কন্ঠস্বরে তার অভিমানের সুর। ফাইজান নিষ্পলক কয়েক মুহুর্ত মুগ্ধ চোখে দেখলো শায়রাকে। ভাব-সাবে তাকে ঠিক পাক্কা গিন্নির মতো লাগছে।

ফাইজান আচমকাই বাক্য-ব্যয়হীন শায়রাকে দু'হাতে কোমড় প্যাঁচিয়ে শূন্যে তুলে ফেলল। আঁতকে উঠলো শায়রা। ভয় পেয়ে বাহুদ্বয় ফাইজানের কাঁধে রেখে বলল,

"কি করছো কি? পড়ে যাবো তো আমি!"

কে শুনে কার কথা? খুশির আতিশয্যে কিছুক্ষণ শূন্যে ঘুরিয়ে ফাইজান নামালো ওকে কোল থেকে। পরমুহূর্তে শায়রার দুই গাল টেনে দিয়ে বলল,

"মিটিং-টা সাকসেসফুল হয়েছে, শায়ু! এটার জন্য আমি খুব খুব খুব খুশি! এই খুশিটা আমি ফোনে শেয়ার করে মজা নষ্ট করতে চাইনি। তাই ভাবলাম একেবারে বাসায় গিয়েই নিউজটা দিবো।"

শায়রা কিয়ৎক্ষণ আগের অভিমান ভুলে আনন্দিত হয়ে বলল,

"সত্যি? তুমি পেরেছো! তার মানে তুমি শুধু গু*ন্ডামি না, অন্যান্য কাজও পারো।"

ফাইজান ভেবেছিলো শায়রা খুশিতে হয়তো লাফালাফি করবে। লাফালাফি না করলেও খুশি হবে অন্তত। হয়েছেও সেটা। কিন্তু এরূপ মুহুর্তেও খোঁচা মারাটা সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ছিলো ফাইজানের। কিন্তু কি করার? এটা যেন তাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে গেছে!

"উহুম, উহুম!"

আনুসার শব্দ পেয়ে উভয়েরই খেয়ালে আসলো ড্রইংরুমে তারা দু'জন ব্যতীত অন্য কেউও আছে। ততক্ষণে মালেকা বেগমও চলে এসেছেন ছেলের গলার স্বর শুনে। তিনি এসেই অস্থিরচিত্তে বললেন,

"তোর বাবার কাছে কিন্তু খুব গর্ব করেছি, আমার ছেলে পারবেই। তুই সব ঠিকঠাক পেরেছিস তো বাবা?"

শায়রা বলল,

"হ্যাঁ, তোমার ছেলে তো পারবেই। সবজান্তা শমশের কি না!"

মালেকা বেগম উত্তরের আশায় চাইলেন ফাইজানের দিকে। ফাইজান তাকে আশ্বস্ত করে বলল,

"হ্যাঁ মা, পেরেছি। বাবাকে গিয়ে বলো তার মিটিং সাকসেসফুল হয়েছে।"

ভদ্রমহিলা সশব্দে আলহামদুলিল্লাহ পড়লেন দুইবার। এরপর ছুটে গেলেন স্বামীকে খবরটা জানাতে। ফাইজান তৎক্ষনাৎ শায়রার কানের কাছে ঝুঁকে এসে বলল,

"সবজান্তা শমসের বলে কি বুঝাতে চাইলি তুই?"

শায়রা প্রতিত্তোরে বলল,

"এই যে, রাস্তায় মা*রপি*ট থেকে শুরু করে বিজন্যাস মিটিং এটেন্ড পর্যন্ত সফর। সবটা পেরেছো বলেই সবজান্তা শমসের বলেছি।"

ফাইজান ফিসফিসিয়ে বলল,

"এই খুশিতে তোর উচিত আজ রাতে আমাকে একটা চুমু দেয়া। একটা না, কয়েকটা! আর কতদিন এভাবে সন্ন্যাসী বানিয়ে রাখবি আমাকে?"

ফাইজানের কথাখানা শুনেও শায়রা বিশেষ প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করে নি। দ্রুত পালিয়ে বেঁচেছে সেখান থেকে। বলা বাহুল্য, ফাইজান কি বলতে চেয়েছে সেটা সম্পূর্ণ স্পষ্ট শায়রার কাছে৷ তাই তো লজ্জায় পড়েছে আরও বেশি। সরাসরি চোখে চোখ মেলানোও যেন এক দুঃসহ অনুভূতি!

ফাইজান ফ্রেশ হয়ে নিজের বাবার রুমে গেলো দেখা করতে। ফজল সাহেব যদিও আজকের ব্যাপারটা নিয়ে খুবই খুশি, তবুও ছেলের সামনে কঠোরতা ধরে রাখলেন নিজের। গম্ভীর কন্ঠে প্রশ্ন করলেন একেকটা। ফাইজানও তার প্রশ্নের মাপা উত্তর দিলো। অতিরিক্ত একটা কথাও বলল না।

জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ছেলেকে ছুটি দিলেন ফজল আহমেদ। ফাইজান বেরিয়ে শায়রার খোঁজে তাকালো এদিক-ওদিক। আনুসার রুম থেকে ওর কন্ঠস্বর পেয়ে বুঝলো, মেয়েটা ওখানেই ঘাপটি মে*রে বসে আছে। যেন ওয়াদা করেছে, সে আজ ফাইজানের মুখদর্শনই করবে না।

ফোঁস শব্দে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো ছেলেটা। নিজমনে বলল,

"কি একটা কথা বললাম, তাতেই লজ্জা পেয়ে আমার থেকে পালিয়ে পালিয়ে বেরাচ্ছে! এই মেয়ে এত লজ্জাশীল হয়ে গেলো কবে থেকে?"

সবশেষে একেবারে রাত্রি দশটায় খাবার টেবিলে বাধ্য হয়ে ফাইজানের সামনে পড়লো শায়রা। তাতেও চুপচাপ মাথা নিচু করে বসে রইলো। তাকালোও না ফাইজানের দিকে। খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে ফাইজান তাকিয়ে তাকিয়ে কয়েকবার লক্ষ করেছে, তার বউয়ের এই শান্ত-শিষ্ট রুপটাকে।

খাওয়া শেষে ফাইজান আর এক মুহুর্ত নষ্ট করলো না। নিজের রুমে গিয়ে গা এলিয়ে দিলো বিছানায়। প্রথমবারের মতো এত লম্বা সময় ডিউটি করে আসার ক্লান্তিতে পেয়ে বসেছে তাকে। এখন শুধু বিছানা আর বালিশ নৃত্য করছে চোখের সামনে৷

********

পেরিয়ে গেছে আরও আধা ঘন্টা। খাওয়া-দাওয়া শেষে শায়রা ফুপুর সাথে সাথে সবকিছু গুছিয়ে রেখেছে। এরপর রান্নাঘরের লাইট অফ করে মালেকা বেগম নিজের রুমে গিয়ে দোর দিয়েছেন। এবার শায়রার পালা আসতেই, দ্বিধাদ্বন্দে ভুগতে শুরু করলো মেয়েটা।

এক-পা, দু-পা করে ফাইজানের রুমে সামনে হাজির হলো শায়রা। ফাইজান বিছানার একপাশে, অর্থাৎ নিজের জায়গায় ঘুমিয়েছে। রুমের দরজা মেলে দেয়া, এবং লাইটটাও জ্বালানো। এই সবকিছু ইশারা করছে, ফাইজানের আদেশ- শায়রাকে এখানেই থাকতে হবে। কিন্তু ওর মন মানলে তো? কোনো এক কারণে ভীষণরকম জড়তা আষ্টেপৃষ্ঠে ঘিরে রেখেছে শায়রাকে৷

কিছুক্ষণ ভাবতেই নিজের করণীয় খুঁজে ফেলল শায়রা। রুমের লাইট অফ করে দরজা টেনে স্বস্তিসমেত পা বাড়ালো আনুসার রুমের দিকে।

বিধিবাম! আনুসা জায়গা দিলো না ওকে। শায়রাকে নিজের রুমের দরজা বাইরে রেখেই ভ্রু নাচিয়ে বলল,

"আমার রুমে কি, হ্যাঁ? নিজের রুমে যাও।"

শায়রা নিজের পুরানো ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইলের বুদ্ধি প্রয়োগ করতে চাইলো। চোখে-মুখে অসহায় ভাব ফুটিয়ে বলল,

"এখন তোর রুমে জায়গা হবে না আমার? তাহলে কই ঘুমাবো আমি? কিচেনে?"

আনুসা বলল,

"কেন গো? তোমার নিজের রুম আছে না? সেখানে যাও। আমার রুমে থেকে লাভ কি? শুধু-শুধু মাঝরাতে দু'জনে নাটক করে আমার ঘুমটা নষ্ট করে যাও। তাই নিজের রুমে যাওয়াই ভালো।"

শায়রা কিয়ৎক্ষণ চুপ থেকে ভেবে দেখলো, আনুসার কথায় কোনো ভুল নেই। এই রুমে থেকে লাভ কি হয়? মধ্যরাত্রিতে ফাইজানের ঘুম ভাঙলে ঠিক এসে শায়রাকে নিয়ে যাবে। মাঝ দিয়ে কেবল ঘুম নষ্টের কারবার। এরচেয়ে ওই রুমে থেকেই শ্রেয়।

ওর ভাবনার মাঝেই রুমের দরজা দুম করে আটকে দিলো আনুসা। ভেতর থেকে দুষ্টুমির সুরে বলল,

"বর-বউ ঝগড়া লাগলে নিজেদের মধ্যে মিটমাট করে নিও। ডেইলি ডেইলি রাত্রিবেলা আমার ঘুম নষ্ট করো না।"

অগত্যা ফাইজানের রুমেই ঢুকতে হলো শায়রাকে। দরজা আটকে এসে বিছানায় বসলো সে। ফাইজানের দিক তাকিয়ে ভালোমতো পরখ করে দেখলো ঘুমিয়েছে কী-না! ঘুমন্ত অবস্থা নিশ্চিত হতেই স্বস্তি পেলো শায়রা।

ভাগ্যিশ ঘুমিয়ে গিয়েছে। নাহলে এই বন্ধ রুমে রাত-বিরেতে চুমু-টুমু আবদার করে বসলে ও কি করতো?

গায়ে কাঁথা টেনে নিয়ে বালিশে মাথা রেখে চোখ বুজলো শায়রা। কিছুক্ষণ এপাশ-ওপাশ করে ঘুমানোর চেষ্টায় বিফল হয়ে আধশোয়া হয়ে বিছানায় হেলান দিয়ে বসলো। আচমকাই দৃষ্টি গেলো ফাইজানের উপর।

উপুড় হয়ে নিদ্রায় মগ্ন ফাইজান৷ গায়ে ট্রাউজার আর টি-শার্ট। মাথার চুলগুলো এলোমেলো হয়ে কপাল ঢেকে রয়েছে।

শায়রা বেশ অনেকক্ষণ অকারণেই চেয়ে রইলো ওর দিকে। হঠাৎ কোনো এক অদম্য আকর্ষণে ওর হাতটা চলে গেলো ফাইজানের চুলের ভাজে। কিছু মুহুর্ত মাথায় হাত বুলিয়ে অনেকটা কাছে ঝুঁকে এলো শায়রা।

মস্তিষ্ক হার মেনেছে মনের কাছে। শায়রা শুধুমাত্র মনের কথাই শুনছে। মুহুর্তটায় যেন শায়রা নিজের মধ্যে নেই। প্রবল অনুভূতির খপ্পরে পড়ে দূরত্ব কমিয়ে কাছে ঘেঁষেছে। কর্ণকুহরে বারবার প্রতিধ্বনিত হচ্ছে সাঁঝবেলায় ফাইজানের বলা কথাটা।

"এর জন্য তোর উচিত আমাকে একটা চুমু দেয়া।"

কি থেকে কি হলো! চুলের ভাজে হাত বুলানোর ফাঁকে কখন যে নিজের অজান্তেই ফাইজানের গালে চুমু খেয়ে বসেছে, তা টেরই পেলো না শায়রা। খেয়াল আসতেই চোখ বড়বড় হয়ে গেলো তার। ত্রস্থবেগে মাথাটা উঠিয়ে ফেলল তৎক্ষণাৎ। ভাবলো,

"হায় আল্লাহ! আমি ওকে সত্যি সত্যি চুমু দিয়ে দিয়েছি?"

নিজের কীর্তিতে নিজেই হতভম্ব শায়রা। এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না, অদম্য অনুভূতির তালে তালে ফাইজানের গালে চুমু খেয়ে বসেছে। নিশ্চিত হতে পূর্ণবার চাইল ফাইজানের দিকে। ওর গালে এখনো শায়রার ঠোঁটের লিপগ্লসের হালকা গোলাপী আভাটা স্পষ্ট।

লজ্জা আর অস্বস্তিতে একপ্রস্থ গুটিয়ে গেলো শায়রা। পারছে না শুধু, এই অঘটনের জন্য নিজেকে নিজে চ*ড় মা*রতে। কত বড় পাগল হলে ফাইজানের পাগলামীকে দ্বিগুন প্রশ্রয় দিতে ও নিজে সেধে চুমু খায়? সে তো সৌভাগ্য যে ফাইজান ঘুমিয়ে আছে। জেগে থাকলে কত যে কথা শুনতে হতো শায়রাকে!

কথাটা ভেবেই অল্প হলেও স্বস্তি আসলো শায়রার মনে। লম্বা শ্বাস নিয়ে ধাতস্থ করলো নিজেকে। এরপর সরে যাওয়ার জন্য যেই ফাইজানের চুল থেকে হাত উঠালো, তৎপর ওকে অবাক করে দিয়ে হাত চেপে ধরলো ফাইজান। ঘুম জড়ানো কন্ঠে বলল,

"একটা চুমুতে আমার হয়নি। আরও লাগবে।"

বিশাল এক হা হয়ে গেলো শায়রার মুখখানা। বিস্ময়ে বিষ্ফারিত তার নেত্রদ্বয়। কৌতুহলের চূড়া থেকে মুখ ফঁসকে প্রশ্ন করে বসলো,

"তুমি ঘুমাও নি?"

ফাইজান ভ্রু-জোড়া ঘুচিয়ে বলল,

"ঘুমিয়েছিলাম। এখন তুই মাঝরাতে আমার ইজ্জতের উপর হা*মলা করলে আর ঘুম হবে কি করে? অবলা ছেলের ঘুমের সুযোগ নিয়ে চুমু-টুমু দিয়ে বসিস। এসব কি ঠিক?"

শায়রা থতমত খেয়ে ঢোক গিলল। মস্তিষ্ক হাতড়ে ফিরলো উত্তরের খোঁজে। আটকে-আটকে বলল,

"কিসব বলছো এগুলো? ঘুমের ঘোরে সপ্ন দেখেছো নাকি? আমি কেন তোমাকে চুমু দিতে যাবো?"

ফাইজান বড়সড় হাই তুলে উঠে বসলো। বলল,

"দিলি তো একটু আগে। আমি দেখলাম তো!"

শায়রা হাতে ভর দিয়ে একটু পিছিয়ে গিয়ে বলল,

"বললাম না, সপ্ন দেখেছো! এসব উল্টোপাল্টা সপ্ন দেখা বাদ দিয়ে ঘুমাও। কাজে লাগবে।"

ফাইজান নাছোড়বান্দা। সে আবারও বলল,

"তাহলে চুমু দিয়ে ঘুম ভাঙালি কেন?"

শায়রা পারে না নিজের বোকামীর জন্য এখনই কেঁদে ফেলে! কেমন অদ্ভুত এক অনুভূতির সংস্পর্শে হাঁসফাঁস করছে ও। হৃৎপিণ্ডে দামামা পিটছে জোর শব্দে। কোনোরূপ উচ্চারণ করলো,

"আমি কিছু করি নি। সপ্ন দেখে ঘুম ভেঙেছে তোমার। আবার ঘুমাও।"

ততক্ষণে ঘুম ছুটে গেছে ফাইজানের। সে এখন ব্যস্ত শায়রাকে জ্বালাতন করতে। এমনিতেই সন্ধ্যা থেকে পালিয়ে বেরিয়েছে। এই শোধটাও তোলা বাকি।

কিছু একটা মনে পড়ার ভঙ্গিতে ফাইজান বলল,

"কিন্তু তোর তো একটা চুমু দেয়ার কথা ছিলো। সেটা? আমি নিবো না?"

আকাশ থেকে পড়লো শায়রা। হতবিহ্বল হয়ে বলল,

"চুমু দেয়ার কথা ছিলো? কখন? কোন সময়?"

ফাইজান অবলীলায় বলল,

"এখন, এই সময়। দে, ফটাফট!"

শায়রা লজ্জা পেয়ে অন্যদিকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে বলল,

"আমি পারবো না।"

ফাইজান শায়রার কথা শুনলো না। হাত রাখলো তার থুতনিতে। মুখটা নিজের দিকে ঘুরিয়ে দূরত্ব ঘুচিয়ে কাছাকাছি বসলো। অতঃপর বৃদ্ধাঙ্গুলি দ্বারা শায়রার ওষ্ঠ স্পর্শ করে নরম সুরে বলল,

"জাস্ট ওয়ান কিস, প্লিজ!"

ভীষণ কাতরতা পূর্ণ সে কন্ঠস্বর। না করার সাধ্য হলো না শায়রার। কম্পনরত আঁখি পল্লব বুজে ফেলল নিমিষে। শুকনো ঢোক গিলল কেবল। তার নীরবতাকেই সম্মতি ধরে নিয়ে আগানোর সাহস করলো ফাইজান। দু'হাতের তালুর মাঝে নিলো শায়রার মুখশ্রী। পরপর তীরবেগে ছুটে এসে সদর্পে ওষ্ঠের ভাজে মিলিয়ে নিলো প্রেয়সীর ওষ্ঠাধর।

সময়ে সময়ে শায়রার দু'হাত কখন ফাইজানের চুলের মাঝে ডুবেছে! উভয়ের হৃৎপিণ্ডের গতি সমান তালে বৃদ্ধি পাচ্ছে। কোনোকিছুতেই ধ্যান-জ্ঞান নেই তাদের। তারা শুধুই অনুভব করছে অপর মানুষটার উপস্থিতি।

দীর্ঘ চুম্বনের মুহুর্ত শেষে শায়রাকে ছেড়ে সরলো ফাইজান। সে এখনো শায়রার মুখটা নিজের হাতের আঁজলায় রেখেছে। ইতিমধ্যে যথাসম্ভব মাথা নিচু করে ফেলেছে শায়রা। চিবুক ঠেকেছে গলার সাথে। ঠোঁটজোড়া তিরতির করে কাঁপছে এখনো।

ফাইজান কিছু একটা বলতে চাইল শায়রাকে উদ্দেশ্য করে। তার আগেই তাদের অনুভূতিতে এক বালতি পানি ঢেলে তীক্ষ্ণ চিৎকারের শব্দ ভেসে এলো ফজল সাহেবের রুম থেকে। ফাইজান ঘাবড়ে গিয়ে বলল,

"কি হলো আবার!"

মাথা তুলেছে শায়রা। অসুস্থ মানুষের চিৎকারের শব্দ শুনে ভয় হয়েছে দ্বিগুন। হড়বড় করে বলল,

"বাবার চিৎকার। ব্যাথা-ট্যাথা পেলো নাকি?"

সঙ্গে সঙ্গে বিছানা থেকে নেমে পড়লো দু'জন৷ বের হলো রুম থেকে। ততক্ষণে ঘরের মানুষ জড়ো হয়েছে। কিছুক্ষণের মাঝেই জানা গেলো, বাথরুম থেকে বের হওয়ার সময় ভাঙা হাতে অল্প চোট লাগায় ভদ্রলোক এমন বিকট চিৎকার ছুড়েছেন। নচেৎ সবার ঘুম থেকে উঠে আসার মতো সিরিয়াস কিছুই নয়। এমনকি রাত-বিরেতে এত জোরে চিৎকার করার মতোও কিছু হয়নি। মূলত তিনি ভয় পেয়েই অঘটনটা ঘটিয়ে ফেলেছে।

ঘরভর্তি মানুষের মাঝে ফজল সাহেব সহজ-সরল চেহারা বানিয়ে বিছানায় বসে আছে। খানিক বাদে একটু ঠান্ডা হতেই গলা খ্যাঁকাড়ি দিয়ে বললেন,

"আমার কিছু হয় নি। ঠিক আছি আমি। তোমরা সব ঘুমাতে যেতে পারো।"

তৎপর বাধ্য মেয়েদের মতো মাথা নেড়ে শায়রা ও আনুসা দু'জনেই চলে গেলো। ফাইজান আরও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলো সেখানে। দু'মিনিট অতিবাহিত হওয়ার পর ফজল সাহেব ফাইজানকে বললেন,

"এখনো দাঁড়িয়ে আছো যে? ঘুমাতে যাবে না?"

ফাইজান সাফ-সাফ বলল,

"ঘুমাতে গেলেই যদি আবার চিৎকার দাও? এজন্য আগে-ভাগে প্রস্তুতি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি।"

ফজল সাহেব ছেলের মুখের উপর কঠোর স্বরে বললেন,

"এত উপকারের দরকার নেই আমার। এমনিতেই যথেষ্ট উপকার করেছো।"

"সেম টু ইউ।"

বলেই চলে গেলো ফাইজান। ফজল সাহেব অবাক হয়ে বললেন,

"আমি ওর উপকার করেছি? কোন উপকারের কথা বলল ও?"

*********

ফাইজান নিজের রুম ঢুকে দেখলো শায়রা ততক্ষণে ঘুমে বিভোর। আদ্যো ঘুমিয়েছে নাকি ফাইজানের থেকে বাঁচার বাহানা, বোঝা গেলো না পরিষ্কার। তবে ফাইজান আর বিরক্ত করলো না ওকে। লাইট অফ করে ড্রিম লাইট জ্বালিয়ে চলে আসলো বিছানায়। অতঃপর শায়রার বালিশ, কাঁথা সব ঠিকঠাক করে ওর কপালে চুমু খেয়ে ঘুমাতে গেলো নিজেও।

হৃদয়ের রঙিন ক্যানভাস পর্ব ৩০ গল্পের ছবি