বিকেল চারটার কিছু বেশি। রোদের উত্তাপ মিইয়ে এসেছে। এহেন নরম রোদেও দৌড়ে আসার ফলে ঘেমে গেছে আনুসা। লিফটে দাঁড়িয়ে হাঁপাচ্ছে একপ্রকার।
শায়রার সাথে হসপিটাল যাবে বলে কোচিং থেকে দ্রুত ছুটি নিয়ে বাড়ি ফিরেছে সে। লিফট থেকে নেমে রুমে ঢুকতেই ডাইনিং টেবিল ভর্তি হরেক রকম মিষ্টির বাক্স দেখে ভড়কে গেলো মেয়েটা। হতভম্বতার সুরে চেঁচালো,
"একি? এত মিষ্টি কিসের? কে আনলো?"
আকস্মিক ছেলের এই কান্ডে মালেকা বেগম ও ফজল সাহেবও ভড়কেছেন। ঘটনা বুঝতে মুখ চাওয়াচাওয়ি করছেন একে-অপরের। মেয়ের প্রশ্নের জবাবে মালেকা বেগম বললেন,
"কি জানি, বাবা? হঠাৎ করেই এতগুলো মিষ্টি নিয়ে হাজির হলো তোর ভাই। লিটন ভাই তিনবার উঠা-নামা করে সব মিষ্টি ঘরে দিয়ে গেছে।"
আনুসা আশ্চর্যান্বিত হয়ে মুখ ফঁসকে বলে ফেলল,
"ভাবি প্রেগন্যান্ট এটা ভাইয়ার কানে গেলো কি করে?"
ছেলে দিয়েছে এক চমক, এরপর মেয়ের কথায় পেলেন আরেক চমক। ফজল সাহেব হতভম্ব হয়ে বললেন,
"কি বললি তুই?"
*********
কান্না চাপতে গিয়ে শায়রা রীতিমতো ফোঁপাচ্ছে। কোথায় ভেবেছিলো, ও আজ প্রেগন্যান্সির কথা বলে ফাইজানকে সারপ্রাইজ দিবে! এদিকে ফাইজান ওকে সারপ্রাইজ দিয়ে রেখে দিয়েছে৷ ডিভোর্সের কথা শুনেই কোনোকিছু বলার মতো বোধশক্তি হারিয়ে বসে আছে শায়রা। ফাইজানের হাতের কাগজটা দেখার মতো সাহসও তার হচ্ছে না। ঘামছে নিরন্তর।
অবশেষে ফাইজানই বলল,
"কাগজটা খুলে দেখবি না?"
শায়রা পুনরায় শুকনো ঢোক গিলে সাহস সঞ্চয় করে বলল,
"খুলে দাও তুমি। আমি সা...সাইন করে দিবো।"
ফাইজান জোরপূর্বক শায়রার হাতে কাগজটা ধরিয়ে দিয়ে বলল,
"তুই খুল। আমি কলম নিয়ে আসছি।"
বলল ঠিকই, তবে বসা থেকে উঠলো না ফাইজান। অধীর আগ্রহে চেয়ে রইলো শায়রার মুখপানে। মেয়েটা ঘাবড়ে গেছে ভীষণ। কাগজ ধরে রাখা হাতটা কাঁপছে বিরামহীন। সেরকম কম্পিত হস্তেই কাগজের ভাজ মেলল সে। সঙ্গে সঙ্গে ভয়াবহ চমকে লাফিয়ে উঠলো। এ কি?
সেটা কোনো ডিভোর্সের কাগজ নয়। স্বচ্ছ এক সাদা কাগজ। যেটায় বড়বড় অক্ষরে লেখা,
❝Congratulations, The MOTHER of my CHILD.❞
শায়রা স্তব্ধ হয়ে কাগজটার দিকে চেয়ে রইলো কিয়ৎক্ষণ। বেশ সময় লাগিয়ে ধাতস্থ হয়ে৷ শুধালো,
"এটা তো... তুমি..."
ফাইজান তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে মেকি রাগ প্রদর্শন করে বলল,
"হ্যাঁ আমি! তুই কি ভেবেছিলি, আমাকে না বললে আমি জানবোই না তোর এই কীর্তি? কেমন মানুষ তুই? বাচ্চার কথা বাচ্চার বাবাকেই জানাতে চাচ্ছিলি না? ছিহ, কেমন স্বার্থপর বউ আমার!"
শায়রা কি করবে, কি বলবে, কিছুই বুঝতে পারছে না। ইতস্ততায় দু'হাতের তালু একত্রিত করে মোচড়ামুচড়ি করছে শুধু। কিছুক্ষণ আমতা-আমতা করে বলল,
"তোমাকে আমি কি বলবো? আমি নিজেই তো এখনো নিশ্চিত না!"
ফাইজান গভীর আত্মবিশ্বাসী কন্ঠে বলল,
"তুই নিশ্চিত না হলেও আমি শতভাগ নিশ্চিত।"
বলেই টেবিলের উপর থেকে রিপোর্টটা উঠিয়ে এনে শায়রার হাতে দিলো। শায়রা বিস্ময়ে বিস্ফারিত নয়নে চেয়ে শুধালো,
"তুমি কি করে জানলে?"
ফাইজান উত্তরে বলল,
"কালকে তোকে আর আনুসাকে আমি হসপিটালের বাইরে দেখেছিলাম। তাতেই আমার সন্দেহ হয়েছিলো এমন কিছু। এরপর কাল তুই ঘুমিয়ে যাওয়ার পর খুঁজে রিসিটটা বের করেছি। ওখানে লেখা ছিলো প্রেগন্যান্সি টেস্টের কথা। তারপর আজ আমিই গিয়েছিলাম রিপোর্ট নিতে। রিসিট দেখিয়ে রিপোর্টটাও আমিই নিয়ে এসেছি। তোদের আর কষ্ট করে যাওয়া লাগবে না।"
বলতে বলতে পকেট থেকে রিসিটটাও বের করে শায়রার হাতে দিলো। শায়রা সবকিছু দেখে হতভম্ব। বলল,
"তাহলে এতকিছু বললে না কেন আমাকে?"
ফাইজান রহস্যময় হাসি দিয়ে বলল,
"বুঝেছিলাম তুই আমাকে সারপ্রাইজ দিতে চাইছিস। ভাবলাম আমিই সারপ্রাইজটা দিয়ে দেই। তুই শুরুতে কি ভেবেছিলি? ছয় মাসের মাথায় আমি তোর হাতে ডিভোর্স পেপার ধরিয়ে দিবো। কিন্তু আমি তো দিলাম একটা ছোট্ট বেবির সুখবর। হয়েছে না তোর ভাবনা থেকে ভিন্ন কিছু?"
আনন্দের উত্তাল জোয়ারে নিজেকে সামলানো মুশকিল হচ্ছে শায়রার। আনন্দগুলো অশ্রুরূপে বেরিয়ে আসতে চাইছে চোখের কার্ণিশ বেয়ে। সেটাকে আটকাতেই বোধহয় মাথা নিচু করলো শায়রা। ঠোঁট চেপে মাথা নাড়লো শুধু। কান্না আটকাতে ব্যর্থ মেয়েটা ফুঁপিয়ে বলে উঠলো,
"আমি কখনো ভাবি নি ছয় মাসের মধ্যে আমাদের এলোমেলো সম্পর্কটা এত সুন্দর ভবিষ্যতের মুখ দেখবে। ঠিক কি কি শব্দ ব্যবহার করলে আমি এই মুহুর্তে নিজের অনুভূতিগুলো তোমার কাছে ব্যক্ত করতে পারবো?"
ফাইজান শায়রার একদম কাছাকাছি এসে বসলো। দু'হাতের আঁজলায় ওর গোলগাল মুখশ্রীটা ধারন করে নরম সুরে বলল,
"বলতে হবে না। তোর চোখগুলোই আমাকে তোর সব মনের কথা স্পষ্টভাবে বলে দিচ্ছে।"
শায়রা এবার আর নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করলো না। স্বশব্দে কেঁদে আছড়ে পড়লো ফাইজানের বুকে। একাধারে অনেকটা সময় কান্না করে ভিজিয়ে ফেলল ফাইজানের শার্টখানা। তবুও ফাইজান ওকে সরালো না। জড়িয়ে ধরে রাখলো শক্ত করে।
আচমকা দরজার কাছে মেয়েলী কন্ঠের খুঁক খুঁক কাশির শব্দে দু'জন একে-অপরকে ছেড়ে খানিকটা দূরত্বে সরে গেলো। আনুসা এলো ভেতরে। মুচকি হেসে বলল,
"সব খুশি কি দু'জনে একাই ইঞ্জয় করবে? কিছু আমাদের সাথে শেয়ার করা উচিত না?"
ফাইজান ও শায়রা একে-অপরের সাথে দৃষ্টি বিনিময় করে মাথা নাড়লো। আনুসা আগে-ভাগেই শায়রাকে নিয়ে বের হলো রুম থেকে। তাদের গমনপথে চেয়ে প্রলম্বিত শ্বাস ফেলল ফাইজান। প্রশান্তির শীতল হাওয়ায় ছেঁয়ে গেছে মন। যেখানে শায়রার মতো মনখোলা মানুষটাই মা হওয়ার খুশিতে নিজের অনুভূতির সাজানো প্রকাশ করতে পারছে না, সেখানে ফাইজানের মতো চাপা স্বভাবের মানুষের পক্ষে তো খুশিটা ব্যক্ত করা আরও বেশিই মুশকিল। তবে তার মন ও মস্তিষ্ক জানে, সে ঠিক কতটা খুশি! একটা ছোট্ট অতিথির আগমন ঘটবে তাদের টোনাটুনির সংসারে। একটু বড় হলেই কথা বলা শিখবে। এরপর ফাইজান অফিস থেকে ফিরলেই আধো-আধো বুলিতে "বাবা" ডেকে কোলে চড়ে বসবে। এইতো বউ-বাচ্চা মিলিয়ে এসবেই তো একজন পুরুষ পরিপূর্ণ!
ফাইজান বেরিয়ে আসতেই মা-বাবা তাকে জেরা করতে ধরলো। ফাইজানও বাধ্য ছেলের মতো সব প্রশ্নের জবাব দিলো। রিপোর্টের সাথেই নিশ্চিত করলো তাদের বাচ্চার খবরও। এরপর আর ঘরের লোকের খুশি দেখে কে? হুলস্থূল পড়ে গেলো সঙ্গে সঙ্গে। মালেকা বেগম দাদী হওয়ার খুশিতে এক মুহুর্ত দেরি না করে বেরিয়ে পড়লেন পুরো বিল্ডিং-এ মিষ্টি বিলি করতে। ফজল সাহেব সিলেটে ফোন করলেন খুশির খবর জানাতে। আলাপচক্রে বলে বসলেন,
"আফজাল ভাই, ওদের বিয়ের অনুষ্ঠানটা কি বড় করে এখনই করে ফেলবো? মানে বলতে চাইছিলাম বছরখানেক বাদে করলে ওদের বাচ্চাটাও মা-বাবার বিয়ে খাওয়ার সুযোগ পেয়ে যাবে। এরচেয়ে ভালো আগেই করে ফেলি।"
এ কথায় একদফা হাসাহাসি হলো দু'পরিবারে। দ্বীতি বেগম মেয়ের সাথে কথা বলতে চাইলেন। সেই সুযোগও দেয়া হলো তাকে। মেয়েকে অনেক বুঝিয়ে-সুঝিয়ে তারা জানালেন, কিছুদিনের মধ্যেই আবার ঢাকা আসবেন। মেয়েকে দেখে অনুষ্ঠানের দিন-তারিখও ফাইনাল করে যাবেন।
সবাই নিজেদের খুশি-আনন্দ উপভোগ করতে ব্যস্ত। শায়রা চুপচাপ দাঁড়িয়ে ওদের কান্ড দেখছে। সকলের খুশির উসিলা ও নিজেই ভেবে পুলকিত হচ্ছে তনু-মন। অব্যক্ত অনুভূতি তোলপাড় চালাচ্ছে হৃৎপিণ্ডে।
এমনসময় ফাইজান ধীরপায়ে হেঁটে এসে দাঁড়ালো শায়রার পাশে। পাঁচ ফিট দশ ইঞ্চি লম্বা-চওড়া দেহের পাশে শায়রাকে নিতান্তই ছোট-খাটো লাগে। গোলগাল হওয়ার কারণে বাচ্চা-বাচ্চা একটা ভাব আছে মুখশ্রীতে। আঁখিকোণের আনন্দঅশ্রুগুলো ঝিলিক দিচ্ছে খানিক বাদে বাদেই।
ফাইজান কিছুক্ষণ নীরবে মুগ্ধতা বিলালো। এরপর দু'হাত পেছনে গুজে শায়রার কানের কাছে ঝুঁকে এলো। ফিসফিসিয়ে বলল,
"ভীষণ টেনশনে আছি, বুঝেছিস?"
শায়রা চোখ ছোট ছোট করে চাইল ফাইজানের দিকে। কৌতুহলী কন্ঠে শুধালো,
"কি নিয়ে?"
ফাইজান চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল,
"আমি যতদূর জানি, বেবি হওয়ার আগে মেয়েরা আরও মুটিয়ে যায়। আর তুই তো আগে থেকেই মুটকি। পরে বেশি মোটা হয়ে গেলে যদি আমার কোলে নিতে সমস্যা হয়?"
অভিমানে গাল ফুলালো শায়রা। বলল,
"কোলে নিতে বলেছে কে? নিবে না। তাহলেই তো সব সমস্যার সমাধান।"
ফাইজান এক ভ্রু উঁচিয়ে বলল,
"আমার বউ, আমি কোলে নিবো। তোর পারমিশন নিতে হবে কেন?"
শায়রা মুখ বাঁকিয়ে বিরক্তির ভাব দেখিয়ে বলল,
"তো আবার এত কথা বলছো কেন?
আচ্ছা শুনো, তুমি ওসময় ডিভোর্সের নাটকটা করলে কেন? যদি দুঃখে আমার হার্ট ফেইল হয়ে যেত?"
ফাইজান অবাক হওয়ার ভান ধরে বলল,
"ওরে বাবা! আমাকে হারানোর এত্ত ভয়?"
শায়রা অবলীলায় বলল,
"তো হবে না? তোমাকে হারালে আমি দিন-রাত কাকে জ্বালাতাম আর কার সাথে ঝগড়া করতাম?"
********
সেদিন রাত্রে সকলের আনন্দ বিলাস করে ঘুমাতে যেতে যেতে অনেকটা দেরি হলো। শায়রা রুমে ঢুকেছে বারোটার কিছু পরে। এসে দেখলো ফাইজান খাটের উপর ল্যাপটপ খুলে বসেছে। অকস্মাৎ এক উদ্ভট চিন্তার উৎপত্তি হলো তার মাথায়। দরজা লক করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো সেখানেই।
কয়েক মুহুর্তেও শায়রার নড়নচড়ন না দেখে ফাইজান প্রশ্ন করলো,
"কি হলো? ওভাবে ওখানে দাঁড়িয়ে আছিস কেন?"
শায়রা দু'হাত বাড়িয়ে ফট করে বলে বসলো,
"কোলে নাও।"
ফাইজান হতভম্ব হয়ে চাইল ওর দিকে। তৎক্ষনাৎ শায়রা আবারও বলল,
"আমি না, তোমার বেবি কোলে উঠতে চাইছে।"
কপালে হাত পড়লো ফাইজানের। বউয়ের বাচ্চামো দেখে বেচারা কূল হারা নাবিক। বেশ বুঝতে পারছে, এখন এই বাচ্চার নাম করে মেয়েটা হাজার যন্ত্রণা দিবে আর ওকে মাথা পেতে নিতে হবে। এছাড়া কোনো উপায় নেই।
অগত্যা কাজ ফেলে উঠে গিয়ে শায়রাকে কোলে নিয়ে বিছানায় এনে শোয়ালো। অতঃপর প্রত্যেক দিনকার ন্যায় চুমু খেলো কপালের মাঝখানে। ফাইজান উঠতে যাবে, এমন সময় শায়রা ওর কলার টেনে পুনরায় আগের জায়গায় এনে আঙুল দিয়ে নিজের ডান গালটা দেখিয়ে দিলো, "অর্থাৎ এখানেও চুমু দাও।"
ফাইজান স্মিত হেসে শায়রার আবদার পুরণ করলো। পরপর বাম গালটাও। তৎপর শায়রা বলল,
"হ্যাঁ, এবার যেতে পারো।"
ফাইজান দুষ্টুমিভরা কন্ঠে বলল,
"শায়ু, এরকম ভালোবাসা আদায় করে নেয়ার কাজটা তুই বিয়ের পরপরই করে ফেললে বাবা হওয়ার সুখবরটা বোধহয় আরও কয়েকদিন আগেই পেয়ে যেতাম!"
শায়রা বললো না কিছুই। প্রতিত্তোরে লজ্জামাখা হাসি উপহার দিয়ে আলতো স্পর্শে জড়িয়ে ধরলো ফাইজানকে।
***********
সিলেটের বাড়িতে এক রৌদ্রজ্বল সকাল। বাড়ির প্রাঙ্গণে ছুটোছুটি করছে তিন বছরের একটি ছোট বাচ্চা মেয়ে। তার পেছনে ছুটতে ছুটতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে এক যুবতী।
সময় গড়িয়ে আরও চারটা বছর। ইতিমধ্যে বদলে গেছে জীবনের অনেকগুলো পাতা। ফাইজান ও শায়রার মেয়ে হয়েছে একটা। বয়স তিন বছর চার মাস। দু'জনের নামের সাথে মিলিয়ে নাম রাখা হয়েছে ফারিশা আহমেদ। গায়ের রঙ পেয়েছে মায়ের, মুখের আদলটা পেয়েছে বাবার। আর দুরন্তপনার স্বভাবটা যেন পুরোপুরির মাতৃসূত্রে প্রাপ্য!
বহুদিন পর নানুবাড়ি বেড়াতে এসেছে সকলে। আফজাল সাহেবের বাড়ির প্রাঙ্গণের খোলা জায়গাটা পেয়ে ইচ্ছেমতো ছুটোছুটি করছে ফারিশা। শায়রা আনুসার দায়িত্বে ওকে রেখে গিয়েছে ভেতরে। তাতেই ফারিশার ফুপুর নাজেহাল অবস্থা।
আজ থেকে দু'বছর আগে বিয়ে হয়েছে আনুসার। ফলাফল নিজের একমাত্র ভাতিজির সাথে প্রতিদিন সময় কাটানোর সুযোগই হয় না তার। শশুড়বাড়ি নিয়েই ব্যস্ত থাকা হয়। তবুও এর ফাঁকে ফাঁকে সুযোগ পেলেই আনুসার স্বামী ওকে বাবার বাড়িতে নিয়ে এসে পড়ে। যত যাই হোক, বন্ধুর বোন বলে কথা!
আনুসার বিয়ে হয়েছে ফাইজানের কাছের বন্ধু রিজভীর সাথে। পছন্দটা ছিলো আগে থেকেই। শুধু বন্ধুত্বের খাতিরে এতদিনেও মুখ ফুটে একটা শব্দও উচ্চারণ করেনি সে। কিন্তু হঠাৎ করেই আনুসার বিয়ের কথা শুনে আর নিজেকে সামলাতে পারে নি। বন্ধুর কাছে স্বীকার করেছে নিজের পছন্দের কথা।
প্রথম তো ফাইজান বেশ ভাব ধরেছিলো, এমন লুকোচুরি খেলা মানুষের কাছে বোন দিবে না বলে। যে মানুষ বন্ধুর থেকে কথা লুকায়, সে বউয়ের থেকে লুকাবে না এর কি নিশ্চয়তা? এই এক পছন্দের খাতিরে সম্মন্ধীর হাতে বেশ ঘোল খেতে হয়েছে বেচারা রিজভীকে। মাঝ দিয়ে ফাইজান প্রশ্ন করে বসেছিলো,
"শা*লা, এজন্যই তুই আমার সামনে সবসময় বউপাগল হওয়ার ভান ধরতি? এজন্যই সবসময় বলতি, তুই বিয়ের পর বউপাগল হবি, বউয়ের আঁচল ছাড়বি না, আরও কত কি! যেন আমার মনে হয় এমন ছেলের কাছে আমার বোন সুখে থাকবে। শা*লা ভন্ড কোথাকার, আমি তো বুঝিই নি তোর পেটে-পেটে এতকিছু!"
রিজভী অপরাধীর মতো মুখখানা বানিয়ে জবাব দিয়েছিলো,
"দেখ ভাই, অনেক আশা নিয়ে তোর কাছে তোর বোনটাকে চেয়েছি। ফিরিয়ে দিস না। আমি বিয়ের পর আসলেই বউপাগল হয়ে থাকবো, সত্যি বলছি! বিশ্বাস না হলে বোনকে বিয়ে দিয়েই দেখ!"
ফাইজান তাতেও কি এত সহজে মানে? কয়েকদিন অব্দি ইচ্ছামতো নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরিয়ে তারপর রাজি হয়েছে। মা-বাবাও রাজি কেননা রিজভী ততদিনে ভালো পজিশনে চাকরি পেয়ে সেটেলড। পরিবারও ভালো। সব মিলিয়ে ভেজালের ইতি ঘটলো বলে!
ঝামেলা যেন শেষ হতে হতেও হলো না! মাঝ দিয়ে বেঁকে বসলো আনুসা নিজেই। একসময় রিজভীও ভার্সিটির গুন্ডা টাইপ ছেলে ছিলো। এরকম ছেলেকে বিয়ে করতে একদম নারাজ সে। তারপর শায়রা বুঝিয়ে-সুঝিয়ে নিমরাজী করে আনুসাকে বসালো বিয়ের পিড়িতে।
যুক্তি একটাই, শায়রা নিজেও তো ভার্সিটির ওরকম এক বাউন্ডুলে ছেলেকেই বিয়ে করেছিলো। বেকার, ছন্নছাড়া অবস্থায় হাত ধরার পর ধীরে-ধীরে পরিবর্তন এসেছে ফাইজানের। অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ থেকেই আজ তারা এক বাচ্চার বাবা-মা। সেক্ষেত্রে আনুসার জন্য প্লাস পয়েন্ট হলো, রিজভী বিয়ের আগেই নিজেকে শুধরেছে।
এবারও ঘটনা ঘটলো ফাইজান-শায়রার মতো। দু'মাস যেতে না যেতেই রিজভীর ভালোবাসার মুগ্ধ হয়ে গলে গেলো আনুসা। মন-প্রাণ উজাড় করে ভালোবাসতে শুরু করলো। এরপরের কাহিনিটা সবার জানা!
*********
অনেকক্ষণ ছুটোছুটির পর ছোট্ট ছোট্ট হাতে ভিন্ন ভিন্ন রঙের কয়েকটা ফুল পেয়ে একটু শান্ত হলো ফারিশা। এরপর ফুপুর কোলে চড়ে ফুলগুলোকে নেড়ে-চেড়ে দেখতে দেখতে ফিরে এলো বাড়ির ভেতর। শায়রাকে দেখেই লাফিয়ে ফুপুর কোল থেকে নেমে ছুটে গেলো মায়ের কাছে। কামিজ টেনে শায়রার দৃষ্টি আকর্ষণ করে হাতের ফুলগুলো দেখিয়ে বলল,
"মাম্মি, মাম্মি, দেকো কত্তুগুলু ফুল! ইটা লেড, ইটা ইয়ুলো, ইটা পিংক।"
শায়রা ঝুঁকে বসে বলল,
"হ্যাঁ, মাম্মাম দেখেছি।"
ফারিশা বাবার খোঁজে ইতি-উতি তাকিয়ে বলল,
"পাপা কুই?"
শায়রা জবাবে বলল,
"পাপা বাইরে, আম্মু। একটু পরেই চলে আসবে।"
ফারিশা কপালে ভাজ ফেলে বলল,
"পাপাকে দাকো, আমি ফুল দেকাবো।"
ডাকতে হলো না। তার আগেই দোরগোড়ায় হাজির হলো ফাইজান ও রিজভী। ফারিশা এক মুহুর্ত দেরি না করে ছুটে গেলো বাবার কোলে চড়তে। ফাইজান কোলে নিতেই অবিকল আগের মতোই বর্ণনা করতে শুরু করলো প্রত্যেকটা ফুলের রঙ।
মেয়েকে কোলে নিয়ে মনোযোগ সহকারে তার কথা শুনতে শুনতে সোফায় এসে বসলো ফাইজান। সঙ্গে রিজভীও বক্তৃতা শুনছে ফারিশার।
বাড়িতে আজ রান্না-বান্নার এলাহী কান্ড। মেয়ের জামাই ও ভাগ্নির জামাই দু'জনেই একসাথে এসেছে। আপ্যায়নের কমতি রাখবেন না আফজাল সাহেব। মাঝেসাঝে অসুস্থ মনোয়ারা বেগমও রান্নাঘরে উঁকিঝুঁকি মেরে দেখে যাচ্ছে কাজ কতদূর!
এই মনোয়ারা বেগমের অসুস্থতার জের ধরে আজ থেকে পাঁচ বছর আগে ফাইজান ও শায়রার বিয়ে হয়েছিলো। তাও দু'জনের অমতে। সেদিন তার শেষ শখ পূরণে ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠা মানুষগুলোর সামনে আল্লাহর রহমতে আজও তিনি দিব্যি বেঁচে আছেন। ওদিন শখ করে ফাইজান-শায়রার বিয়ে দেয়ার কথা বলেছিলেন বলেই তো আজ ওদের ওতটুক বাচ্চা মেয়ের সাথে আমোদ-প্রমোদ করার সুযোগ পাচ্ছেন। ভাগ্যিশ, বিয়েটা হয়েছিলো!
**********
ফাইজান বারান্দায় একটা চেয়ারে বসে বাইরের দৃশ্য দেখছে। ফারিশাকে ঘুম পাড়িয়ে রেখে শায়রাও গেলো সেখানে। পেছন থেকে ফাইজানের গলা জড়িয়ে ধরে আদুরে গলায় বলল,
"তোমার মেয়ে ঘুমিয়ে গেছে। তুমি ঘুমাতে যাবে না? নাকি সারারাত বারান্দার বসে থাকবে?"
ফাইজান শায়রার হাত ছাড়িয়ে উঠে দাঁড়ালো চেয়ার ছেড়ে। তাকে কাছাকাছি টেনে দাঁড় করালো বারান্দার রেলিঙের ধারে। বলল,
'তোর মনে আছে, আমাদের বিয়ের দিনের কথা? সেদিন রাতে রুমে বসে বিয়ে থেকে বাঁচার জন্য পালানোর প্ল্যান করেছিলাম আমরা। তারপর ছাদে গিয়ে তো..."
ফাইজানের অর্ধপূর্ণ কথা সম্পন্ন করলো শায়রা,
"তারপর দু'জনেই ছাদে হাজির হলাম। আবারও ঝগড়া লাগলো। আর বাড়ির সবাই জেগে উঠলো। এন্ড আমাদের পালানো ক্যান্সেল।"
ফাইজান বিপরীতে বলল,
"সেদিন পালিয়ে গেলে জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অর্থটা বোধহয় আমার অচেনাই থেকে যেত!"
শায়রা মুচকি হেসে বলল,
"পালাতে কিভাবে? আমরা না হয় এই বিয়ের থেকে পালাতাম। কিন্তু আমাদের ভাগ্যের থেকে? আল্লাহর লিখন জুড়ে দিয়েছে আমাদের। সেটা থেকে কি পালানো সম্ভব? দাদির অসুস্থতা তো একটা উসিলা মাত্র!"
ফাইজান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
"ঠিক বলেছিস। আমার জীবনটা বোধহয় তোর সাথেই জুড়ে ছিলো। তাই তোর কাছেই জীবনের নতুন অর্থ উদ্ধার করেছি আমি। এই দেখ, আমি রাত্রে অফিস থেকে ফিরলে তুই সঙ্গে সঙ্গে সব কাজ ফেলে ছুটে আমার কাছে আসিস। আমার মেয়েটা আধো বুলিতে "পাপা" ডেকে কোলে চড়ে বসে, তখন মনে হয় আমি আসলেই পরিপূর্ণ! এর জন্য বিশাল এক ক্রেডিট আমি তোকে দিবো।"
শায়রা দু'হাত ভাজ করে বুকে গুজে ভাব দেখিয়ে বলল,
"হ্যাঁ, দাও ক্রেডিট। ভালো কাজের ক্রেডিট নেওয়ার জন্য আমি সর্বদা প্রস্তুত।"
ফাইজান আচমকা শায়রার কোমড় চেয়ে কাছে আনলো। নাকের ডগায় নিজের নাক ঘঁষে বলল,
"ক্রেডিটের বদলে কয়েকটা চুমু দিলে চলবে?"
শায়রা মাথাটা পিছিয়ে নিলো তৎপর। চোখ বড়বড় করে বলল,
"খোলা বারান্দায় এসব কি অ*সভ্যতা হচ্ছে, হ্যাঁ? চুমু-টুমু লাগবে না আমার।"
ফাইজান বলল,
"অবশ্যই লাগবে। তবে সেটা বদ্ধ রুমে গিয়ে পরিশোধ করবো।"
বলিষ্ঠ বাহুদ্বয়ের মাঝে পিষ্ট হয়ে শায়রা ছটফটিয়ে বলল,
"আমি বিয়ের আগে কখনো ভাবি নি, তুমি এত্ত অ*সভ্য হবে!"
ফাইজান সাবলীল ভঙ্গিমায় বলল,
"একটু অ*সভ্য না হলে তিন বছরের এই সাইনবোর্ডটা হতো কি করে, বল?"
শায়রা নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টায় মগ্ন থেকে বলল,
"আমি তোমার এসব আলাপ শুনতে আসি নি। ঘুমাতে যেতে বলছি, ঘুমাতে যাও।"
ফাইজান প্রলম্বিত শ্বাস ফেলে বলল,
"যাবো তো। তার আগে যে কথাটা না বললেই নয়..."
শায়রা ভ্রু নাচিয়ে শুধালো,
"কি?"
ফাইজান সময় নিলো খানিক। মুহুর্তটায় অপলক চেয়ে রইলো ঠিক শায়রার চোখের দিকে। দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলিয়ে অপূর্ব বাক্যে স্বীকারোক্তি দিলো,
❝তুই আমার জীবনের সেই বিশেষ মানুষ যে আসার পর আমার জীবনটা ভিন্নরকম রঙ পেয়েছে।
আমার ছন্নছাড়া জীবনটা গোছানোর কারিগর তুই।
আমার বেরঙ জীবনে রঙধনুর সাত রঙ তুই।
আমার জীবনের পাতার সাদামাটা ক্যানভাসকে রঙিন ফুলে রাঙানোর মানুষ তুই।
সবশেষে, আমার একমাত্র বউ এবং আমার বাচ্চার মা তুই।❞
শায়রা পলকহীন চেয়ে রইলো পুরোটা সময়। ফাইজানের বলা প্রত্যেকটা বাক্যে প্রেমের আকুল নিবেদন খুঁজে পেলো ও। মনোবাসনা হলো নিজেরও একটু প্রেম নিবেদনের। সুযোগ হেলায় না হারিয়ে বিপরীতে শায়রাও বললো,
❝তুমিবিহীন আমার জীবনটাও খুব সাদামাটাই। হয়তো তোমাকে জ্বালাই খুব! কিন্তু ভালোবাসি অনেক বেশি। প্রেম-প্রেম অনুভূতির সাথে পরিচয় কিন্তু তোমার কারণেই হয়েছিলো। আমার হৃদয়ের ক্যানভাসে সর্বপ্রথম তোমার ছবিটাই এঁকেছিলাম। যেটা এখনো চিররঙিন।❞
জীবনের হাজারো ব্যস্ততার ভীড়ে এক টুকরো সময়েও প্রেমবিলাস করতে ভুলে না ফাইজান-শায়রা। বিয়ের এতদিনেও যে প্রেম ফিঁকে পড়ে নি কোনোদিন। আর না তো কভু পড়বে! চিরসজীব এক ঝগড়ুটে জুটির গল্পে রেষারেষির মাঝের অনবদ্য প্রেমটা হারিয়ে যাওয়ার নয়। একে-অপরের নাম যেন চিরস্থায়ী হয়ে আছে দুজনের হৃদয়ের রঙিন ক্যানভাস-এ।