শুক্রবার। সাপ্তাহিক ছুটির দিন। সকলে বাসায় থাকলে এমনিতেই উৎসব উৎসব একটা ভাব থাকে বাড়িতে। উপরন্তু ফাইজানদের বাড়িতে আজ মেহমান আসছে। তাই ব্যস্ততা যেন একটু বেশিই। শায়রা সকাল থেকেই ভীষণ আনন্দিত, অনেকগুলো দিন পর মা-বাবাকে দেখবে বলে। তার হিসেবে, মা-বাবা প্রথমবার মেয়ের শশুড়বাড়িতে আসছে। তাই শায়রার খুব শখ হয়েছে আজকে ও নিজেই সবকিছু করবে। ফুপু ওরফে শাশুড়ীকে রান্না-বান্নার দায়িত্ব দেয়া হবে না।
যদিও পুরোটা একা সামলানো তার জন্য কঠিন হবে, তবুও শায়রা হার মানার মেয়ে নয়। চেষ্টার কোনো ত্রুটি ও রাখবে না। সকাল সকাল ঘর-বাড়ি গুছিয়ে রেখে একটু বেলা করেই ঢুকলো রান্না করতে। যেন দুপুরবেলায় খাবার গরম-গরম থাকে। বউয়ের এমন গভীর আত্মবিশ্বাস দেখেও ভরসা করতে পারছে না ফাইজান। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছে ও নিজে শায়রার সাথে সাথে থাকবে।
বাবা অসুস্থ থাকায় আজকের সম্পূর্ণ বাজারও করেছে ফাইজান। রান্নার সময় শায়রার সাথে সাথে ও নিজে ঢুকেছে রান্নাঘরে। এরপর দাঁড়িয়ে দেখেছে বউয়ের রান্না। আর শায়রা একটু পর পর হুকুম করেছে, এটা দাও ওটা দাও। ফাইজান কোনো উচ্চবাচ্য না করে সাহায্য করেছে বউয়ের কাজে।
**********
দুপুর একটা নাগাদ আনুসার ফোনে কল আসলো তার বান্ধবীর। সে দু'দিন আগে আনুসার থেকে কোনো এক বিষয়ের নোটস নিয়েছিলো, ওটাই ফেরত দিতে এসেছে। তাড়া থাকায় উপরে উঠতে পারবে না তাই আনুসাকে নিচে ডেকেছে। আনুসাও পাঁচ মিনিটের জন্য দরজা খোলা রেখেই নিচে চলে গেলো।
ঠিক সেই সময়টাতেই এসে পৌঁছালেন আফজাল সাহেব ও দ্বীতি বেগম। আনুসা তখন বাড়ি থেকে খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকায় তাদের দেখতে পায়নি। তারাও আনুসাকে লক্ষ করে নি। চলে গেছে উপরে। দরজা খোলা পেয়েছে বিধায় আর কলিংবেলও চাপতে হয়নি। ঢুকে গেছে ভেতরে।
মালেকা বেগম ও ফজল সাহেব তখন নিজের রুমে। রান্নাঘর থেকে ফাইজান ও শায়রার কন্ঠস্বর পাওয়া যাচ্ছে। দু'জনের মিশন রান্না-বান্না তখন শেষ পর্যায়ে। গরুর মাংসটা শুধু চুলায় বসানো। ওটা নিয়েই বোধহয় কথা কা*টাকা*টি হচ্ছে দু'জনের।
আফজাল সাহেব ভেতরে ঢুকেই বোনের নাম ধরে হাঁক ছুড়তে নিয়েছিলেন। কিন্তু দ্বীতি বেগম ইশারায় থামতে বললেন তাকে। আফজাল সাহেব ঘটনা বুঝতে না পেরে ইশারাতেই শুধালো, কি হয়েছে?
দ্বীতি বেগম উত্তর দিলেন না। নিঃশব্দে এগিয়ে গেলেন রান্নাঘরের দিকে। ইচ্ছে হয়েছে, মেয়ে কেমন আছে সেটা স্বচক্ষে দেখা! এরচেয়ে ভালো সুযোগ আর দ্বিতীয়টা হবে না!
তিনি উঁকি মারলেন রান্নাঘরে। শায়রা ও ফাইজান উল্টোদিকে ঘুরে দাঁড়ানো। ফলাফল, কেউই দ্বীতি বেগমের উপস্থিতি টের পেলো না। জারি রাখলো নিজেদের তর্ক। ভদ্রমহিলা দেখলেন নিজের মেয়ের অন্যরকম রূপ। ওড়না গায়ে জড়ানো অবস্থায় কোমড়ে প্যাঁচিয়ে রাখা, ঠিক একজন পাক্কা সংসারী গৃহিনী। চুলগুলো হাতখোঁপা করা এবং সামনের ছোট চুলগুলো বেরিয়ে আছে।
ফাইজান সবে গরম কড়াই থেকে এক টুকরো মাংস তুলে পুরোটা মুখে ঢুকিয়েছে ওমনি চেঁচালো শায়রা,
"এইই, তুমি সব আগেই খেয়ে ফেলছো কেন? এটা কিন্তু ঠিক না!"
ফাইজান আঙুল চেটেপুটে খেয়ে বলল,
"টেস্ট করছিলাম, কেমন রান্না করিস তুই! খাওয়ার যোগ্য হয়েছে কি না তাই দেখছিলাম। নাহলে তো মামা-মামির জন্য আগেই বাইরে থেকে খাবার অর্ডার করে রাখতে হবে।"
শায়রা গাল ফুলিয়ে বলল,
"আমি এতও খারাপ রান্না করি না যে কেউ খেতে পারবে না। শুধু শুধু বাহানাবাজি করে খাওয়া বন্ধ করে। একা একাই খেয়ে নিচ্ছে?"
ফাইজান ভ্রু উঁচালো। বলল,
"তাহলে তোকে দিয়ে খাওয়া উচিত?"
শায়রা খুন্তি নাড়তে নাড়তে বলল,
"অবশ্যই। তুমি জানো না, শেয়ারিং ইজ কেয়ারিং?"
ফাইজান আরেক টুকরো মাংস উঠাতে উঠাতে বলল,
"তাহলে আরেকটা সুযোগ!"
বলেই নিজে আগে কামড় দিয়ে অর্ধেকটা খেলো। বাকি অর্ধেকটা এগিয়ে দিলো শায়রার দিকে। খাওয়ার সময় ছোট চুলগুলো সামনে এসে পড়ায় ফাইজান সেগুলো সরিয়ে শায়রার কানের পিঠে গুজে দিলো। শায়রা মাত্র কামড় বসাতে যাবে তার আগেই সরিয়ে ফেলল ফাইজান। শায়রা রেগে-মেগে বলল,
"এসব কি হচ্ছে?"
ফাইজান হেসে বলল,
"কিছু না। ধর।"
ছোট একটুখানি দৃশ্য। তাতেই প্রশান্তিতে কানায়-কানায়ভরে গেলো দ্বীতি বেগমের অন্তর৷ প্রলম্বিত শ্বাস ফেলে ভাবলেন, নাহ! মেয়েটাকে কোনো ভুল মানুষের হাতে তুলে দেন নি। মেয়ে সুখেই থাকবে।
"ভাইয়া, তুমি? এসে পড়েছো? কখন এসে পৌঁছালে? একটু ডাক তো দিতে পারতে আমাকে!"
রুম থেকে বেরিয়েই ভাই ও ভাবিকে সামনে দেখে উৎফুল্ল হয়ে এক নিশ্বাসে এতগুলো প্রশ্ন করে বসলো মালেকা বেগম৷ শব্দ পেয়ে ফাইজান-শায়রাও বেরিয়ে এলো। তৎক্ষনাৎ দ্বীতি বেগম মিটিমিটি হেসে উত্তর দিলেন,
"মাত্রই এসেছি আমরা। তারপর এদের শব্দ পেয়ে বুঝলাম দু'জনেই রান্নাঘরে। তা ননদিনী, ওদের এমন শখ উঠলে রান্নাঘর আস্ত থাকে তো? নাকি ভূমিকম্প, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা সব একেবারে হয়ে যায়?"
মালেকা বেগম প্রশস্ত হেসে বললেন,
"ওমন ঝড়-টড় রোজই হয়। তুমি বাদ দাও তো ভাবি। এসে বসো।"
বাপের আদরের মেয়ে সবার আগে বাপের কাছেই ছুটে গেছে। মা-বাবাকে পেয়ে এতটাই খুশি হয়েছে যে একটু আগের মায়ের বলা কথাটাতেও বিশেষ পাত্তা দিলো না। ড্রইংরুমে বসে জুড়ে দিলো হাজাররকম গল্প। ভুলেই বসলো, রান্নাঘরে চুলোয় বসানো তরকারির কথা। পরে মালেকা বেগম গিয়ে তরকারি নামালেন।
ফাইজান সালাম দিয়ে এক-আধটা কথা বলেই সরে গেছে সেখান থেকে। এরমধ্যে আনুসাও চলে এসেছে বাইরে থেকে। ওদের সাথে কুশল বিনিময় শেষে আফজাল সাহেব বললেন,
"যাকে দেখার জন্য এতদূর থেকে এলাম, সে কই? দুলাভাই..সরি বেয়াই কই?"
আনুসা জানালো,
"বাবা রুমে। বেড রেস্টে থাকতে বলেছে বলে আমরা বেশি বাইরে যেতে দেই না। রুমেই চলেন, মামা।"
তারা যেতে নিয়েছেন এমনসময় মালেকা বেগম ডাইনিং টেবিলের উপর রাখা এতগুলো ফলের বড়বড় ঠোঙা দেখে বিরক্তিসমেত বলল,
"এতকিছু আবার কি দরকার ছিলো ভাইয়া? তোমাদের কে বলেছিলো এত ভেজাল করতে?"
আফজাল সাহেব বললেন,
"মেয়ের শশুড় অসুস্থ হয়েছে। একটা দায়িত্ব আছে না আমার? পরে তোরা বলবি, কোথায় ছেলে বিয়ে দিলাম! ছেলের শশুড়-শাশুড়ি কিপ্টে!"
প্রতিত্তোরে মালেকা বেগম আর বলার মত কিছু খুঁজে পেলেন না। তাদের সাথে ঢুকলেন নিজের রুমে। এরপর কথা-বার্তা, কুশল বিনিময়, এক্সিডেন্ট কিভাবে হলো এরকম আলাপে চলে গেলো অনেকটা সময়।
**********
মা-বাবাকে পেয়ে সব ভুলে বসেছে শায়রা। ফাইজানকে পাত্তাই দিচ্ছে একদম। আর ফাইজান এসব দেখে দেখে ফুঁসছে। আবার নিজেও এসে ওদের সাথে যোগ দিতে পারছে না। বড়দের সাথে মিলে এরূপ আড্ডাবাজি ওর স্বভাববিরুদ্ধ। তাই অল্প-স্বল্প কথাবার্তা বলে আবার চলে যাচ্ছে।
এভাবেই চলে গেলো অনেকটা সময়। মা-বাবার সাথে কথা বলতে বলতেই বেলা পার করে ফেলেছে শায়রা। এরপর মালেকা বেগমের ধমক খেয়ে উঠে, গেলো গোসল করতে।
দুপুরে খেতে বসতেও অনেকটা লেট হলো ওদের। প্রথম লোকমা খেয়েই আফজাল সাহেব বিস্ময়ের সাথে বললেন,
"বাহ! আমার মেয়ে যে এত ভালো রান্না পারে, আমি তো জানতামই না!"
শায়রা উৎফুল্ল হয়ে বলল,
"সত্যি বলছো? আসলেই মজা হয়েছে?"
আফজাল সাহেব বললেন,
"অবশ্যই। অনেক মজা হয়েছে! আমি তো ভাই আজ দু'প্লেট পোলাও খাবো। আমার মেয়ের হাতের রান্না বলে কথা!"
শায়রা খুশি হয়ে বলল,
"আমি ভাবিই নি আসলেই মজা হবে! ফার্স্ট টাইম এতকিছু রান্না করেছি তো। টেনশনে ছিলাম অনেক।"
মালেকা বেগম বললেন,
"হয়েছে। এবার নাচানাচি বন্ধ করে নিজেও খেতে বস। এমনিতেই অনেক দেরি করে ফেলেছিস।"
ফুপুর কথা শুনে শায়রা খাওয়া শুরু করলো। ওর পাশেই বসেছে ফাইজান। খাওয়ার মাঝে শায়রা লক্ষ করে দেখলো, সবাই নিজের মতো খাওয়ায় ব্যস্ত। কারোই এদিকে নজর নেই। সেই সুযোগটা কাজে লাগিয়ে সে ফাইজানের কানের কাছে ঝুঁকে খুব ধীর আওয়াজে বলল,
"দেখলে, বাবা কেমন প্রশংসা করলো? তুমি তো একটুও করো না।"
ফাইজান খাওয়া থামিয়ে নিজেও ওর মতো ফিসফিসে কন্ঠে বলল,
"আচ্ছা, প্রশংসা লাগবে? করতে পারি, তবে একটা শর্ত আছে।"
শায়রা বিস্মিত হয়ে শুধালো,
"কি শর্ত?"
ফাইজান মুচকি হেসে বলল,
"ওইদিন রাতের মতো একটা সুইট সুইট চুমু খেতে হবে। রাজি?"
লজ্জায় কান গরম হয়ে উঠলো শায়রার। মাথা নিচু করে ফেলল সাথে সাথে। নিজের ভুলের জন্য নিজেকে কষে চড় মারতে ইচ্ছে করলো ওর। বিড়বিড়িয়ে বলল,
"ছিহ, কিসব উদ্ভট শর্ত দেয়! আমি যে কেন যাই ওকে কিছু বলতে। ওর কথা-বার্তায় লাগাম নেই, এটা কেন ভুলে যাই বারবার?"
শায়রাকে চুপ থাকতে দেখে খাওয়ায় মনোযোগ দিলো ফাইজান। এসব নিয়ে কথা বাড়ালো না আর।
********
অনেকটা দূরের পথ পেরিয়ে এসেছেন আফজাল সাহেব ও দ্বীতি বেগম। তাই একদিনে ওদের যেতে দিতে চাইলেন না বাড়ির লোক। জোর করে রেখে দিলেন একরাতের জন্য৷ রাতের খাওয়া-দাওয়া শেষে গেস্টরুমে বিছানা গুছিয়ে দিয়ে এলেন তিনি।
বিছানায় আধশোয়া হয়ে দ্বীতি বেগম বললেন,
"তোমার মেয়ে আজ আমাদের আসার কথা শুনে প্রথমবার এত রান্নার দায়িত্ব নিয়েছে। শখ লেগেছিলো, নিজের হাতে আমাদের রান্না করে খাওয়াবে। তোমার বোন তো বলে দেয়ই না।"
আফজাল সাহেব শুধালেন,
"এসব কে বলল তোমায়? শায়রা?"
দ্বীতি বেগম জবাবে বললেন,
"হ্যাঁ। ওর থেকেই শুনলাম। রান্না করতে গেলে নাকি বকা দিয়ে পড়তে পাঠিয়ে দেয়। বুঝলে, আমার এখন মনে হচ্ছে মেয়ের জীবন নিয়ে কোনো ভুল সিদ্ধান্ত আমরা নেই নি। প্রথমে ফাইজানের সাথে বিয়ের ব্যাপারটা নিয়ে আমি খুব দ্বিধাদ্বন্দে ছিলাম।
মেয়েটা সুখী হবে তো?
এরকম একটা প্রশ্ন দিনরাত মাথায় ঘুরতো। কিন্তু আজ ওকে ফাইজানের সাথে হাসি-খুশি থাকতে দেখে সব দ্বিধাদ্বন্দ্ব দূর হয়ে গেছে। এখন শুধু দোয়া করি, ওরা সারাজীবন এভাবেই থাকুক।"
স্মিত হাসলেন আফজাল সাহেব। বললেন,
"আমি তো আগেই বলেছিলাম। বাবা হয়ে কি মেয়ের খারাপ চাইবো, বলো?"
************
শায়রা ড্রেসিংটেবিলের সামনে বসে চুল আঁচড়াচ্ছে। ফাইজান বারান্দায় দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছিলো রিজভীর সাথে। মাত্র কল কেটে রুমে ঢুকলো ও। ফোনটা টেবিলের উপর রাখতেই দেখলো সেখানে একটা আপেল রাখা। তাও দু'কামড় খেয়েই রেখে দিয়েছে।
ফাইজান আপেলটা হাতে নিয়ে ধপ করে বসে পড়লো চেয়ারে। ভ্রু কুঁচকে সেটাকে পরখ করতে করতে আচমকা এক প্রশ্নের উদ্ভব হলো তার মাথায়। মনের কথা উগলে দিলো শায়রার কাছে,
"অসুস্থ মানুষকে দেখতে আসলে যে-কেউ ফল-মূলই নিয়ে আসে। কিন্তু কথা হচ্ছে, সর্বপ্রথম এই রীতিটা আবিষ্কার কে করেছে ভাই?"
চিরুনি থেমে গেলো শায়রার। এহেন প্রশ্নে বিরক্ত হয়ে অদ্ভুত দৃষ্টিতে ঘুরে চাইল ফাইজানের দিকে। গুরুগম্ভীর স্বরে বলল,
"মুঘল সম্রাট ফাইজান আহমেদ।"
ফাইজানের নজর আপেল থেকে সরে গিয়ে পড়লো শায়রার উপর। বুঝতে পারলো না, এমন ফানি একটা ডায়লগ দেয়ার সময় শায়রা এত সিরিয়াস কেন হয়ে আছে?
পরমুহূর্তে আবার সে নিজেই সিরিয়াস ভঙ্গিমায় বলে বসলো,
"উহু। আবিষ্কার করেছে মুঘল সম্রাট ফাইজান আহমেদের একমাত্র বেগম শায়রা আহমেদ।"
শায়রা অতিষ্ঠ হয়ে বলল,
"হয়েছে তোমার? হলে গিয়ে ঘুমাও এখন। কাল অফিস নেই তোমার? সকালে যেতে হবে না?"
ফাইজান মাথা নেড়ে বলল,
"তেমন ইম্পর্ট্যান্ট কাজ নেই। দেরি করে গেলেও হবে।"
শায়রা একপাশে ঘাড় এলিয়ে বলল,
"আচ্ছা। তাহলে তুমি বসে বসে মশা মারো। আমি ঘুমাই।"
বলেই বিছানায় চলে গেলো। নিজের জায়গায় শুয়ে কাঁথা টেনে নিয়ে চোখ বুজলো। অন্যদিকে ফাইজান চোখ ছোট ছোট করে কিয়ৎক্ষণ দেখে গেলো ওর কাহিনি। এরপর লাইট অফ করে নিজেও এসে শুয়ে পড়লো বিছানায়।
অতিবাহিত হয়েছে আরও কিছুটা সময়৷ গতদিনগুলোর মতো ফাইজান আজ শায়রাকে বুকে নিয়ে শোয় নি। এতেই বিশাল মেজাজ খারাপ হলো শায়রার। চিন্তা করলো, ঘুরে দেখবে ফাইজান ঘুমিয়ে পড়েছে কি না!
যেই ভাবা সেই কাজ। চক্ষুদ্বয় খুলে যেই একটু একটু করে ঘুরে তাকাবে ফাইজানের দিকে ওমনেই তার দৃষ্টির সামনে পড়ে থতমত খেয়ে গেলো নিজেই। আমতা-আমতা করে বলল,
"তুমি এখনো জেগে?"
ফাইজান একহাতের কনুই ভাজ করে বিছানার উপর রেখে তাতে ভর দিয়ে তাকিয়ে ছিলো শায়রার দিকেই৷ ওর প্রশ্নের জবাবে বলল,
"ঘুমানোর কথা তো তোর। তাহলে এখন এভাবে চোরের মতো আমার দিকে তাকাচ্ছিলি কেন?"
শায়রা ইতস্তত করে বলল,
"তেমন কিছুই না। আমি তো দেখছিলাম তুমি ঘুমিয়ে গেছো কি না!"
ফাইজান ভ্রু উঁচিয়ে বলল,
"তা আমার ঘুমানো আর জেগে থাকা দিয়ে তোর কি কাজ? জেগে থাকলে রোমান্স করবি নাকি?"
শায়রা ত্রস্থ মাথা নেড়ে বলল,
"না না। ঘুমাবো আমি। গুড নাইট।"
বলেই ঘুরতে যাবে তার আগেই ফাইজান শক্ত করে ধরলো শায়রার বাহু। টান দিয়ে নিজের একদম কাছাকাছি এনে গভীর স্বরে বলল,
"কিন্তু আমার তোকে ঘুমাতে দিতে ইচ্ছে করছে না।"
ঘাবড়ে গেলো শায়রা। নিঃশ্বাসটা গলার কাছে আটকে গেলো তার। মুহুর্তের মাঝে গলবিল শুকিয়ে মরুভূমি হয়ে এলো। কোনোরূপ ঢোক গিলে জিজ্ঞেস করলো,
"তো..তো কি করবে?"
ফাইজান শায়রার শ্বাস নেয়া আরও মুশকিল করে দিতে মুখ গুজলো শায়রার ঘাড়ে। চুমু দিয়ে বলল,
"নিজের বিবাহিত ব্যাচেলর জীবনের ইতি ঘটাবো। আজ মানা করিস না, প্লিজ।"
চমকে গেলো শায়রা। এতদ্রুত সব হয়ে যাবে, সেটা ভাবেইনি ও। মানা করবে কি? বাঁধা দেয়ার মতো অবস্থাতেই তো নেই। কাঁথা সরিয়ে ফাইজানের হাত পৌঁছে গেছে শায়রার কোমড়ে। অন্যরকম স্পর্শের অনুভূতিতে কেঁপে কেঁপে উঠছে শায়রা। এক হাতে নিজের পড়নের জামা খামচে ধরে চোখ বুজে ফেলেছে। তিরতির করে কাঁপছে ওষ্ঠদ্বয়।
তৎক্ষনাৎ ফাইজান আবার বলল,
"চুপচাপ আছিস! মৌনতাকেই সম্মতির লক্ষ্মণ ধরে নিবো কি?"
অনুভূতির উত্তাল সাগরে খেঁই হারাচ্ছে শায়রা। গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে নিঃশ্বাস। মুখ থেকে অস্ফুট উচ্চারণে বেরিয়ে এলো,
"হু।"
ব্যস, আর কি লাগে? অনুমতি পেতেই শায়রাকে আরও কাছে টানলো ফাইজান। একে-অন্যতে মিশে যাওয়ার মতো কাছে। কয়েক মুহুর্তে ওষ্ঠপুট শায়রার ঘাড় থেকে উঠে এলো মুখশ্রীতে। কপালে, দু'চোখের বন্ধ পাতায়, দুটো গালে চুমু একে থেমে গেলো অল্প সময়ের জন্য।
দু'জনেরই শ্বাস-প্রশ্বাস তীব্র গতিতে ছুটছে। ফাইজান নিষ্পলক কয়েক মুহুর্ত চেয়ে রইলো শায়রার দিকে। প্রেয়সীর কম্পনরত ওষ্ঠযুগলে চেয়ে পিছিয়ে যাওয়ার ইচ্ছে, প্রচেষ্টা কোনোটাই রইলো না আর। রইলো শুধু একে-অন্যের সর্বোচ্চ কাছাকাছি যাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা।