কিছুক্ষণ খোঁজার পর ওয়ার্ড্রবের উপরে ফাইজান নিজের মানিব্যাগটা খুঁজে পেলো। এরপর শায়রার দিক ঘুরে কটমটিয়ে বলল,
"তুই আনিস নি, তাই না? তাহলে এটা এখানে এলো কি করে?"
শায়রা নিষ্পাপ ভঙ্গিতে ঘাড় উঁচালো। ঠোঁট উলটে বলল,
"আমি কি করে জানবো?"
ফাইজান একইরকম ভঙ্গিতে বলল,
"তুই জানবি কি করে? এর তো ঠ্যাং আছে, তাই হেঁটে হেঁটে চলে এসেছে।"
শায়রা জবাব দিলো,
"তোমার মানিব্যাগ, তুমিই জানো এর ঠ্যাং আছে নাকি মাথা আছে! আমি কি করে জানবো?"
ফাইজান অতিষ্ঠ ভঙ্গিতে মাথা নাড়লো। মেজাজ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টায় বলল,
"নাটক বন্ধ কর, মুটকি। তুই ফুচকার বিল আমার ঘাড়ে চাপিয়ে মানিব্যাগ নিয়ে এসেছিস কেন?"
শায়রা ঘনঘন মাথা নেড়ে বলল,
"মানিব্যাগ বোধহয় তুমিই ভুলে বাড়িতে রেখে গিয়েছিলে। শুধু শুধু আমাকে দো*ষারোপ করছো কেন?"
"এত নাটক কোত্থেকে শিখেছিস তুই?"
ফাইজান থামলো একটু। পরপর শায়রার পাশ কাটিয়ে রুম থেকে বের হতে হতে চেঁচাল,
"আম্মু, আম্মু শুনে যাও।"
ফাইজানের ডাক শুনে ত্রস্থ রান্নাঘর থেকে বের হলো মালেকা বেগম। তিনি ঘাবড়ে গিয়ে শুধালেন,
"কি হয়েছে? আবার চেঁচাচ্ছিস কেন?"
ফাইজান ভণিতাহীন সাফ-সাফ উত্তর জানালো,
"প্রথমত সংসারের ধরা-বাঁধা জীবন আমার জন্য নয়। আমি কখনো দায়িত্ব, সংসার এসবে জড়াতে চাইনি। তোমরা জোর করে বিয়েটা করতে বাধ্য করছো। কিন্তু.. কিন্তু..
আমার পক্ষে তোমার ভাতিজির সাথে সংসার করা সম্ভব নয়। আমি আগেও বলেছি, আবার বলছি, ওকে বলে দিবে আমার থেকে দুরত্ব বজায় রেখে চলতে। ও আমাদের বাড়িতে থাকুক, আমার কোনো সমস্যা নেই। শুধু আমার লাইফে বা'হাত ঢুকাতে পারবে না। নাহলে এর ফল ভালো হবে না বলে দিচ্ছি!"
ছু*রির ন্যায় তীক্ষ্ণ ধা*রালো কথাগুলো শায়রার হৃৎপিণ্ড বরাবর গভীরভাবে আঁচড় কাটলো। এক মুহুর্তে মস্তিষ্কে এক অনুভূতি সূক্ষ্মভাবে প্রবেশ করলো, সে ফাইজানের জীবনে একটা উঁটকো আপদ ব্যতীত কিছু নয়। খানিক পূর্বেই মনের গহীনে উদয় হওয়া ভালোলাগার কিছু অনুভূতি বাষ্পীভূতের ন্যায় উড়ে গেলো নিমিষেই। পাথুরে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে শুধু শুনে গেলো ফাইজানের কথা।
আচমকা এমন কঠিন কথাগুলো হজম হলো না উপস্থিত মা-মেয়ের। ভড়কে গেছে আনুসা, ভড়কে গেছেন মালেকা বেগম। শায়রার দিক তাকিয়ে ওর শুকনো মুখখানা দেখে ঢোক গিললেন তিনি। বললেন,
"এসব কি বলছিস, ফাইজান? ও তোর বউ হয়। তোর জীবনে ওর দখলদারিত্ব থাকবে না তো কার থাকবে?"
ফাইজানের কাঠ-খোট্টা জবাব,
"আমি ওকে শখ করে বউ বানিয়ে আনি নি যে ওকে মাথায় তুলে রাখবো। তোমাদের মন চাইলে তোমরা রাখো! আমার উপর জোর-জবরদস্তি করে কোনো লাভ হবে না।"
নিজের মনের কথাগুলো উগলে দিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলো ফাইজান। কিন্তু তার কথাতে যে কারো উপর খুব বাজেভাবে প্রভাব পড়েছে সেটা দেখার ফুরসত তার নেই। কিংবা ফুরসত থাকলেও সেসব জানার আগ্রহ নেই। নিজের ছন্নছাড়া একান্ত জীবনেই সে বেশ ভালো আছে। কি দরকার অন্যের কথা ভাবতে যেয়ে নিজের শান্তি নষ্ট করার?
দুম করে দরজা আটকানোর শব্দ পেতেই মৃদু কেঁপে উঠলো শায়রা। নিজের হুশে আসতেই এলোমেলো পল্লব ঝাঁপটালো আশেপাশে তাকিয়ে। মালেকা বেগম এগিয়ে এলেন ওর দিকে। চেহারায় তার অনুতপ্ততার ছাপ স্পষ্ট। মন-প্রাণ আজ একই স্লোগানে মুখরিত,
"ফাইজানের সাথে মেয়েটার বিয়ে দিয়ে ভুল করে ফেলেন নি তো? তার ছেলের জন্য শায়রার জীবন নষ্ট হলে নিজেকে কোনোদিন ক্ষমা করতে পারবেন না তিনি। তার ছেলে কি কোনোদিনও নরম হবে না? কোনোদিনও স্বাভাবিক হবে না তাদের সম্পর্ক?"
মনের কথাগুলো মনে চেপেই ভদ্রমহিলা শায়রার উদ্দেশ্যে বললেন,
"মন খারাপ করিস না, মা। আমার ছেলেটা এমনই। রাগ করলে কি থেকে কি বলে বসে কোনো হুশ থাকে না ওর। ওর কথা একদম সিরিয়াস নিবি না।"
শায়রা মলিন হেসে উত্তর দিলো,
"মানুষ অধিকাংশ সময় রেগে থাকলেই সত্যি কথা বলে ফেলে।"
দীর্ঘশ্বাস ফেললেন মালেকা বেগম। কিছু বলার বা স্বান্ত্বনা দেয়ার ভাষা খুঁজে পেলেন না ওই মুহুর্তে। শায়রা তৎক্ষণাৎ কিছুই হয় নি এমন একটা ভাব করে বলল,
"ফুপ্পি, খুব ক্ষিদে পেয়েছে। খাবার বাড়ো, আমি চুলটা মুছেই আসছি।"
বলেই ঢুকে গেলো আনুসার রুমে। এরপর মালেকা বেগমও গেলেন রান্নাঘরে। আনুসা গেলো শায়রার পেছন পেছন। রুমে ঢোকার পর শায়রার মনের অবস্থা বুঝতে পেরে আনুসা এগিয়ে এসেছিলো একটু স্বান্ত্বনা দিতে। বিপরীতে শুনলো লম্বা-চওড়া এক ঝাড়ি,
"হয়েছে শান্তি? কাল তো বড় জোর করছিলি, ভাইয়ার রুমে যাও। ভাইয়ার রুমে যাও। ওইটাই এখন থেকে তোমার রুম। এখন শান্তি মিলেছে তোর? আর বলবি কোনোদিন ওর রুমে যেতে? তোর রুমে থাকছিলাম বলে তোর খুব সমস্যা হচ্ছিলো বুঝি? সমস্যা হলে বলে দে, আমি বাসা থেকেই বেরিয়ে যাবো। তখন আর কারো আমাকে সহ্য করতে হবে না।"
কান্না আটকানোর তুমুল প্রচেষ্টাটা ধরা পড়ে গেলো আনুসার কাছে। তবে প্রকাশ করলো না সেটা। শুধু শুনে গেলো শায়রার তেজ দেখানো কথাগুলো। এখনো নিজেকে কতটা কঠোর রেখেছে মেয়েটা।
আনুসা হতাশ শ্বাস ফেলে বলল,
"দরকার নেই আর ভাইয়ার রুমে যাওয়ার। তুমি আমার রুমেই থাকবে, আমার কাছে। আমার ভাইয়ের বউ পছন্দ না হলেও আমার কাছে আমার ভাবি খুবই পছন্দের। ও থাকুক নিজের মতো৷ ও কোনোদিন আমাদের কথার মূল্য দিয়েছে? সবসময় চলেছে নিজের মতো ছন্নছাড়া জীবনে। আমরা আর ওর কথাই বলবো না৷ কে ফাইজান? চিনি না তাকে!"
আনুসার কথাগুলো শুনে মৃদু হাসলো শায়রা৷ উত্তরে বলল না কিছু। কিংবা খুঁজে পেলো না কিছু বলার!
***********
সেদিন রাত্রে শায়রা আর ফাইজানের সামনেই পড়ে নি। ফাইজান বাড়িতে আসার আগেই খেয়ে-দেয়ে আনুসার রুমে ঢুকে গেছে। রুমের দরজা ঠেলে দেওয়া, সাথে পর্দাও টানা। সুতরাং ভেতরে দেখার উপায়ও নেই। নিত্যদিনের অভ্যাসমতো শায়রাকে চোখের সামনে ঘুরঘুর করতে না দেখে, ওর কন্ঠস্বর না শুনে রীতিমতো ওর ঝগড়াগুলোকে মিস করতে শুরু করলো ফাইজান। খেতে বসেও কয়েকবার তাকালো আনুসার রুমের দরজার দিকে। বিধিবাম! মেয়ে তার সামনেই এলো না।
ঘরে উপস্থিত প্রত্যেকের মুখ থমথম করছে৷ কারো মুখেই হাসি নেই। তাদের আচরণে মনে হচ্ছে ফাইজান অচেনা কেউ। তাকে খাওয়ানো দায়িত্ব বলে শুধু কোনোরকম খাবার বেড়ে দিয়ে কেউ আর ঘুরেও তাকায় নি। দায়িত্ব পালন করে ঘরে গিয়ে দোর দিয়েছে।
ফাইজান অবাক চোখে দেখে গেলো সকলের কর্মকান্ড। তবে বিশেষ পাত্তা দিলো না৷ খেয়ে-দেয়ে উঠে বেসিনে প্লেট রেখে চলে গেলো নিজের রুমে। কিন্তু দরজা আটকালো না। ভাবলো, শায়রা হয়তো একটু পরেই এসে রুমে ঢুকবে।
ঘড়ির কাঁটা টিকটিক শব্দ করে বারোটার ঘর পেরিয়ে গেলো। আস্তে-আস্তে নিভে গেলো বাড়ির সবগুলো বাতি৷ দরজা লক হয়েছে আনুসার রুমের৷ সেই মুহুর্তে ফাইজান টের পেলো যেই মেয়েটা গতকাল তার রুমে হুলস্থুল করেছে, সে আজ আসবে না। বরাবরের ন্যায় নীরব থেকে যাবে তার ঘরখানা।
*********
পরদিন সকালে ফাইজানের ঘুম ভাঙলো দেরিতে। বাইরে থেকে তখন খানিক বাদে বাদে শোনা যাচ্ছে রিকশার টুং-টাং শব্দ। জানালা গলে ঘরে আসছে রোদ। ফাইজান আড়মোড়া ভেঙে বিছানা ছাড়লো৷ ফ্রেশ হয়ে যতক্ষণে বাইরে আসলো ততক্ষণে শায়রার কোনো খোঁজ নেই।
ফাইজান গতকালকের মতো আজও ডাইনিং টেবিলে বসে আশে-পাশে তাকালো শায়রার খোঁজে। সে নেই কোথাও। খাওয়া শেষ করে উঠেও ফাইজান যখন শায়রাকে দেখতে পেলো না তখন ইতস্ততা ঝেড়ে ফেলে তার মাকে জিজ্ঞেস করলো,
"শায়রা কই? ওকে কি ভার্সিটি নিয়ে যেতে হবে?"
মালেকা বেগম থমথমে কন্ঠে বললেন,
"তোর কিছু করা লাগবে না। ও নিজেই চলে গেছে।"
এর বিপরীতে আর কিছু বলার খুঁজে পেলো না ফাইজান।
"ওহহ আচ্ছা।"
বলে নিজেও বের হলো বাসা থেকে।
***********
সকালবেলায় সূর্যের তাপের খুব বেশি প্রখরতা নেই। রোদ মাথার উপর থাকার পরও দিব্যি আরামে পথ চলা যাচ্ছে। মাঝেমধ্যে বিরক্ত করে যাচ্ছে গাড়ির হর্ণের শব্দ। মৃদু বাতাসে নড়ছে গাছের পত্রপল্লব। এসবে বিন্দুমাত্র মনোযোগ নেই শায়রার। সে সোজা পথের দিকে তাকিয়েই হেঁটে যাচ্ছে গন্তব্যহীন পথিকের মতো।
মাঝপথেই হাতে টান পড়তে সৎবিৎ ফিরলো শায়রার৷ ঘুরে আশাকে দেখতে পেয়ে জিজ্ঞেস করলো,
"আরে, তুই? সকাল সকাল জরুরি তলব করলি কেন?"
আশা ওর প্রশ্নকে অগ্রাহ্য করে বলল,
"রাস্তায় এমন বেখেয়ালী হয়ে হাঁটছিস কেন? মরে-টরে গেলে কি হবে? নিজের বিয়ের দাওয়াত তো দিলি না৷ আমার বিয়েটাও কি খাবি না?"
শায়রা মূলত আজ সকাল সকাল বেরিয়েছে আশার জন্যই। হঠাৎ আয়োজন হয়েছে, তাকে আজ পাত্রপক্ষ দেখতে আসছে। এমন একটি দিনে শায়রাকে ছাড়া নিজেকে অসম্পূর্ণ মনে হতো আশার। এজন্য সকাল সকাল ডেকে পাঠিয়েছে নিজ বাড়িতে৷ এমনকি ওকে নিতে নিজেই মাঝপথ অব্দি হেঁটে চলে এসেছে।
আশা শায়রার ঘরের কাহিনি কিছুই জানে না। সে নিজের বিয়ের ব্যাপারটা নিয়ে খুবই উৎফুল্ল। কাল থেকে পরিবারের মধ্যে কি কি কথা হয়েছে, সেসবই বর্ণনা করছে শায়রাকে।
স্মিত হাসলো মেয়েটা। নিজের মনের কথাগুলো চাপা দিলো ভেতরেই। আশার সাথে সাথে নিজেও তাল দিয়ে হাসি-মজা করতে লাগলো। বুঝতে পারলো, কত সপ্ন মেয়েটার বিয়ে নিয়ে! কত খুশি সে! নিজের মন খারাপের গল্প বলে তার খুশিতে পানি ঢেলে দেয়ার মতো বান্ধবি শায়রা নয়। তাই তো আশার প্রত্যেকটা কথা শুনতে লাগলো মনোযোগ দিয়ে।
কিছু সময় পর আশার বাড়িতে এসে পৌঁছালো তারা দু'জনে। দু'রুমের ছোট্ট একটা ফ্ল্যাট তাদের। একটা রুমে আশার মা-বাবা থাকে এবং অন্যরুমে আশা ও তার ছোট বোন ইশা। আশার মায়ের সাথে কিছুক্ষণ কথা বলে তাদের রুমেই ঢুকলো আশা ও শায়রা৷
কিছুক্ষণ কথা বলতেই আচমকা কল এলো শায়রার নাম্বারে। সে ব্যাগ থেকে ফোন বের করতেই দেখলো তার মায়ের কল। রিসিভ করলো তৎক্ষণাৎ। বেশ কিছুক্ষণ কথা হলো দ্বীতি বেগমের সাথে। শায়রা তার সাথেও হাসিমুখে কথা বলল। যেন তার মা-ও কিছু টের না পায়। বলল, সে আশার বাড়িতে আছে। বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত হবে।
মায়ের সাথে কথা শেষ হতেই শায়রা লক্ষ্য করলো তার ফোনের চার্জ একদম শেষ। কাল রাতে এতকিছু হওয়ার পর খেয়াল ছিলো না ফোন চার্জে দেয়ার কথা। ফলাফল কিছুক্ষণেই ফোনের ব্যাটারি ডাউন হয়ে গেলো। শায়রা ভেবে দেখলো, ফাইজান সারাদিনেও ওর কোনো খোঁজ নিবে না। তাই ফোন চার্জে দেয়ার কোনোপ্রকার তাড়া অনুভব করলো না। সুইচড অফ অবস্থাতেই রেখে দিলো ব্যাগে।
তাদের কথা-বার্তার মাঝে হঠাৎ শায়রা বলে উঠলো,
"আশা, আমাকে কয়টা টিউশন খুঁজে দিতে পারবি?"
আলাপের মাঝে এ কথা শুনে ভড়কালো আশা। ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
"তুই বড়লোক বাপের একমাত্র বেটি! তুই করবি টিউশন?"
শায়রা মহা-বিরক্ত ভঙ্গিতে নাক-মুখ কুঁচকে বলল,
"বড়লোক বাপের একমাত্র মেয়ে হলে টিউশন করা যায় না? এটা কোথায় লেখা আছে?"
আশা বলল,
"আঙ্কেল জানলে তার মেয়ে-জামাইকে কেলাবে। সাথে আমাকেও।"
শায়রা বিপরীতে বলল,
"জানবে না৷ তুই পারলে খুঁজে দিস। বাকিটুক আমি ম্যানেজ করে নিবো।"
************
ফাইজান ভার্সিটির সামনে পৌঁছাতেই রিজভী লক্ষ্য করলো, সে আজ একাই এসেছে। আজকে সাথে শায়রা নেই। ফাইজান বাইক রেখে ওদের কাছে আসতেই আহাদ জিজ্ঞেস করলো,
"আজ একা যে? ভাবি কই?"
ফাইজান উত্তর দিলো,
"ও আমার আগেই ভার্সিটিতে এসে পড়েছে। ক্লাসে আছে বোধহয়।"
ফাইজানের ভাব-সাবে উপস্থিত প্রত্যেকে সন্দেহ করলো কিছু একটা। সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় করলো একে-অপরের সাথে। এরপর জানালো,
"কিন্তু আমরা তো ভাবিকে আসতে দেখলাম না।"
ফাইজান ঝট করে ঘুরে চাইল শুভর দিকে। খানিক ঘাবড়ে গিয়ে বলল,
"কি বলছিস? ও এসেছে ভার্সিটিতে। হয়তো..হয়তো তোদের চোখে পড়ে নি।"
রিজভী ঠোঁট উল্টালো। বলল,
"কি জানি? আমরা দেখি নি, সেটাই বললাম।"
অজানা আশঙ্কায় ঘামের চিকন রেখা দেখা গেলো ফাইজানের কপালে৷ গলবিল অব্দি শুকিয়ে কাঠ-কাঠ। কিছু একটা চিন্তা করে বলল,
"তোরা একটু দাঁড়া, আমি ওর ক্লাসরুমে দেখে আসি।"
বলেই ওদের উত্তরেরও অপেক্ষা করলো না। ছুট লাগালো ভবনের দিকে। তৎপর নিজের ভেতরকার অস্থির অবস্থা টের পেলো স্পষ্ট।
কয়েক মুহুর্তের ব্যবধানে ফাইজান হাজির হলো শায়রার ক্লাসরুমে। আশে-পাশে ভালোভাবে চোখ বুলিয়ে দেখলো ক্লাসে অনেকেই উপস্থিত আছে, কিন্তু নেই শায়রা। এরমধ্যে ফাইজানের সামনে হাজির হলো একজন মেয়ে। ফাইজান এর আগেও তাকে শায়রার সাথে দেখেছে। তাই কালবিলম্ব না করে ওকেই জিজ্ঞেস করলো,
"শায়রা কোথায়?"
মেয়েটি উত্তর দিলো,
"শায়রা তো আজ আসে নি।"
এক বাক্যের উত্তরটায় ফাইজানের মস্তিষ্কে থাকা দুশ্চিন্তার পারদ তড়তড় করে বৃদ্ধি পেলো। মস্তিষ্কের অজানা স্বত্ত্বা চেঁচিয়ে বলল,
"কাল রাতে তুমি ওকে যথেষ্ট কথা শুনিয়েছো! ভালো হয়েছে, চলে গেছে। এবার শান্তিতে থাকবে।"
মস্তিষ্ক এক কথা বললেও মনে ভিন্ন কিছু। সচেতন স্বত্ত্বাটা একবারেই ধরে নিয়েছে শায়রা কালকের ঘটনার কারণেই এভাবে হারিয়ে গেছে। কিন্তু মন সে কথা মানতে নারাজ। মন বারবার তাগিদ জানাচ্ছে শায়রাকে খুঁজে বের করার।
ফাইজান ভবন থেকে বেরিয়ে মাঠের মধ্যে দ্রুত গতিতে হেঁটে যাচ্ছিলো বন্ধুদের দিকে। তাদেরকে কিছু বলতে হলো না। ফাইজানের মুখ দেখেই ওরা যা আন্দাজ করার, করে নিলো। আহাদ শান্ত কন্ঠে বলল,
"টেনশন করিস না। আছে হয়তো ফ্রেন্ডদের সাথে কোথাও! কল করে দেখ।"
আহাদের কথা শেষ হওয়ার আগেই ফাইজান কল করলো শায়রার নাম্বারে। পরমুহূর্তেই এক নারী কন্ঠ মিষ্টি করে জানালো,
"আপনি যেই নাম্বারে কল করেছেন সেটি এই মুহুর্তে বন্ধ আছে..."
মনের অবস্থা তখন তার বিধ্বস্ত। হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন হচ্ছে দ্রুত। আচমকাই একটা ভাবনা হানা দিলো মস্তিষ্কে,
"শায়রা কখনোই ফোন সুইচড অফ করে বসে থাকে না। আজকেই এমন হচ্ছে! মেয়েটা ঠিক আছে তো? কোথাও কোনো বি*পদে পড়ে যায় নি তো?"