আদ্রের সম্মোহীনি

পর্ব - ১৯

🟢

(জানালার থাইগ্লাস ভেদ করে আসা কিছু অবাদ্ধ আলোকরশ্মি চোখে পরতেই পিটপিট করে চোখ খুললো সানি।কানে ভেসে এলো মানুষের কলকলে আওয়াজ।একটু বিরক্ত হলেও পরক্ষনে নিজেকে নিজেই বুঝ দিয়ে বললো,,,বিয়ে বাড়ি,,এমন তো হবেই।,,,,,খেয়াল করলো সে নিজের বিছানায় ঠিক মতো শুয়ে আছে।গায়ে কম্বল জরানো।এখন ফেব্রুয়ারীর প্রথম দিক।তাই শীত এখনো বিদ্দমান। হঠাৎ তার মনে পরলো কাল রাতে তো আদ্র তার কাছে ছিলো।,,,সানি বুঝলো সে উঠে গেছে।সানি উঠে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নিলো।তার সাথে সাথে গোসলও করে নিলো।ওয়াশরুম হতে বের হতেই দেখে যে আদ্র তার খাটের উপর বসে ফোন গুতাচ্ছে।সানিকে দেখেই মুখে হাসির রেখা টেনে বললো...)

আদ্র-গুড মর্নিং মাই কিউটি ডল।

সানি-গ্ গুড মর্নিং।

আদ্র-ঘুম ঠিক মতো হলো??

সানি-হুম,,আপনি নিচে যাননি যে??আয়ন্তি আপুকে তো নিয়ে যাবে তাইনা??

(আদ্র এবার ফোন পকেটে রেখে সানির সামনে এসে দাড়ালো।)

আদ্র-তোমার আপুকে সেই সকাল ৭ টায় নিয়ে গেছে।

সানি-কি!!!এখন কয়টা বাজে??

আদ্র-বেশি নাহ,,মাত্র ৯ঃ১৩ বাজলো।

সানি-কিহ!!আমি স্কুলে যাবো কখন??

আদ্র-স্কুল??

সানি-হ্যা স্কুল।আজ কতদিন যাচ্ছি না।ভেবেছি আজ স্কুলে যাবো।কিন্তু আজও সেই দেরি হয়ে গেলো।

আদ্র-পরশুর আগে কোনো স্কুল না।,,,ডল,,তোমাকে আমি এবার সত্যিই পেটাবো।কতবার বললাম শাওয়ারের পরে ঠিক মতো চুলগুলো মুছতে।না,,মহারানিতো কথা শুনার পাত্রীই নয়।

(এসব বলতে বলতে আদ্র বারান্দা থেকে টাওয়াল এনে আলতো করে সানির চুল মুছতে লাগলো।এরপর চিরুনি নিয়ে সানির চুল আচড়ে দিলো।সব শেষে সানিকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে আলতো হাতে সানির মুখটা তুলে কপালে একটা গভীর কিস করলো।এতে সানি কিছুই বললো না।কেন যেন তার আদ্রের এই ছোট ছোট কেয়ার গুলো অন্নেক ভালো লাগে।তাই সে বাধা দেয় না।,,,,,কপাল থেকে মুখ নামিয়ে মুচকি হেসে আদ্র বললো...)

আদ্র-এখন চলো।নিচে সবাই আছে।আর তোমার মামনী তোমাকে খুজছে।উনি তো জানেই না তার আদরের মেয়ে কাল সারারাত নিজে না ঘুমিয়ে আমাকে ঘুম পারিয়েছে।তাই উঠতে দেরি হয়ে গেছে।,,,সত্যিই কি তুমি আমায় ঘুম পারিয়েছো??

সানি-আ্ আমি তো চেয়েছিলাম।কিন্তু কখন যে আমার ঘুম চলে এলো বুঝতেই পারিনি।

(আদ্র এবার একগাল হেসে দিয়ে আলতো করে সানির গাল টেনে দিলো।)

আদ্র-হয়েছে,,,আর বলতে হবে না।এবার নিচে চলো।

সানি-হুম

(আদ্র সানির হাত নজের হাতের মুঠোতে বন্ধি করে নিচের দিকে হাটা শুরু করলো।তাদের নামতে দেখে আরিফা হাসি মুখে বললো...)

আরিফা-মামনি,,,ঘুম হলো ঠিক মতো?

সানি-আসলে মামনি,,,একটু দেরি হয়ে গেলো।সরি।

আরিফা-বাআআবা,,,মেয়ে দেখি সরিও বলে।এতে ভুলের কি আছে শুনি??আর আমার মেয়ে চাইলে ৯টা কেন,,বেলা ২টা পর্যন্ত ঘুমালেও কেউ কিচ্ছি বলবে না।,,,

সানি-তুমি এত ভালো কেন মামনি??

আরিফা-দেখ মামনি,,,আজ কিছুক্ষণ আগেই বুকে পাথর চেপে আমি আমার বড় মেয়েকে বিদায় দিয়েছি।আমার এখন আর কি আছে তোরা ছাড়া??আমার সেই মেয়ের অভাবতো তুই পুরন করবিরে পাগলি।আর আমি কোথায় ভালো বল??আমি তো তোর কোনো খেয়ালই রাখিনা।তা না হলে কালকের মতো ঘটনা ঘটতো??আমি একদম পচা।

সানি-ক্ কালকে,,,,

আরিফা-হ্যা,,,কাল কি হয়েছিলো??আদ্র তো কিছুই বললো না।এখন বলতো।

সানি-ক্ কা্লকে তো...

আদ্র-আসলে মাম্মাম জিমানরা একটু ভয় দেখিয়েছিলো।তাই জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে।

আরিফা-সেকিরে,,ভয় দেখালো বলে জ্ঞান হারালো??এই সামান্য ব্যপারে..... আমার তো মনে হয় আরো বড় কিছু..

সফিক-আহ আরিফা,,তুমি তো জানোই আমার মামনির শরীর ভালো না।তাই একটু উইক থাকায় জ্ঞান হারিয়েছে।,,,তা মামনি এখন কেমন লাগছে??

সানি-ভালো আঙ্কেল

সফিক-ভালো বললে তো হবেনা মামনি।আমি যে তোর উপর রেগে আছি সে খেয়াল আছে??

সানি-ক্ কেন আঙ্কেল??আমি কি করেছি??

সফিক-তুই নিজেই আন্দাজ কর।কি করেছিস তুই??

(সফিকের কথায় সানি ভাবতে লাগলো,যে কি করেছে সে।,,,সানির এমন ভাবান্তর মুখ দেখে আদ্র মুচকি হেসে বললো...)

আদ্র-ডল,,আমি কিন্তু বুঝে গেছি বাবাই কেন তোমার উপর রেগে আছে।তুমি চাইলে আমি হেল্প করতে পারি।

সানি-কি বলুন প্লিজ।

আদ্র-কারন এই যে তুমি বাবাইকে আঙ্কেল বলে ডাকছো।এম আই রাইট বাবাই??

সফিক-ইয়েস মাই সন।

আরিফা-এই কথা??দেখো মেয়েটা কেমন ভাবনার রাজ্যে চলে গিয়েছিলো।

সানি-আমি তোমাকে তো আঙ্কেল বলেই ডাকি।

রফিক-আরে মামনি,,তুই ববাবিকে মামনি ডাকিস।তাই এবার থেকে ভাইয়াকেও বাবাই বলে ডাকবি।

সানি-কি!!!

(সফিক এবার সানির সামনে এসে তা মাথায় হাত রেখে বললো...)

সফিক-হ্যা রে মামনি।আমি তোর মুখ থেকে বাবাই ডাক শুনতে চাই।যেমনটা আদ্র আর অন্তি বলে,,ঠিক তেমন??

সানি-কেন?? কেন তোমরা আমাকে নিজের এতো কাছে টানছো???আমি তো এতগুলো বছর ধরে শিখে আসছি,,কিভাবে মা-বাবা ছাড়া থাকা যায়।শিখেছি কি,,আমাকে শিখতে হয়েছে।আমি তো শিখে গেছি কিভাবে অপমান আর অবহেলা নিয়ে বেচে থাকা যায়।তাহলে কেন তোমরা আবার আমার সেই মনোবল হারাচ্ছো??আমি একবার সহ্য করা শিখেছি।আর পারবো না,,,,আমি আর পারবো না আমার কছের মানুষগুলো কে হারাতে।সত্যিই আমি আর সহ্য করতে পারবো না।

(এসব বলতে বলতে সানি অধরঝরে কাদছে।সে হাটু ভেঙে ফ্লোরে বসে পরে।আদ্রের বুকে তীরের মতো বিধছে সানির কান্না আর কথা গুলো।আদ্র তারাহুরো করে বসে সানিকে নিজের বুকে জরিয়ে নিলো।,,)

আদ্র-(আমার এই মাসুম পুতুলটা এইটুকু বয়সে কত কি সহ্য করেছে।আমি জানি পুতুল,,তুমি উপরে যতই হাসি খুশি দেখাওনা কেন,,,ভেতরটা তোমার পুরে যাচ্ছে তোমার মা বাবা হারানোর শোকে।তবে আর নয়,,আমি আর কষ্ট পেতে দেবোনা তোমায়।আমার এই কাজে সবাই যে হেল্প করবে তা আমি ভাবিনি। তুমি আবার একটা পরিবার পাবে।তোমার সেই আগের মা বাবাকে আনতে না পারলেও আমি তোমাকে তাদের মতোই কাউকে দিয়েছি।হ্যা,,আমার মা বাবা তোমাকে নিজের মেয়ের স্থান দিয়েছে।ওরাই তোমার মা বাবা।আর এটাই তোমার পরিবার।)(মনে মনে)

আদ্র-ডল,,,কাদেনা,,,আর নয়।অনেক হয়েছে।

(সফিক আস্তে করে বসে সানির চোখ মুছে দিলো।তারপর আবার মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বললো....)

সফিক-মামনি,,,আমি জানি,,তুই ছোট থেকে কতটা স্ট্রাগল করে বেচে আছিস।তোর এই স্ট্রাগলের প্রতিদান হিসেবে তোর সত্যিকারের মা বাবাকে ফিরিয়ে দিতে না পারলেও আমি পারবো তোকে আমার মেয়ের অধিকার দিতে।তোকে আর কিচ্ছু হারাতে দেবোনা।এইটুকু ভরসা রাখবি না আমাদের উপর???

(কাদতে কাদতে সানি মাথা উপর নিচ করে।তা দেখে আবার সবার মুখে একটু হাসির ঝলক দেখা দেয়।)

সফিক-তাহলে ডাক না আমাট বাবাই বলে।বলনা আমি তোর কে হই???

সানি-ব্ বাবাই।

(সফিকের হাসির রেখাটা আরো অধিক চওড়া হয়ে যায়।খুশিতে তার চোখ থেকে দুফোটা পানি গড়িয়ে পরে।আরিফার চোখেও পানি।আবার মুখে হাসি।এযে খুশি অশ্রু। আরিফা চোখের জল মুছে বলে উঠে...)

আরিফা-বলি,, বাবা মেয়ে কি সারাদিন এভাবেই কেদে যাবে??মেয়েটা যে এখনো কিচ্ছু খায়নি সেই খেয়ালকি বাবার আছে??

সফিক-ও হ্যা,,,আর কাদেনা মামনি।এবার থাম।

সানি-তুমিও কান্না থামাও বাবাই।

(সফিক তারাতারি করে চোখের জল মুছে ফেললো।)

সফিক-আমার মেয়ে বলেছে,,আমি কি করে কান্না নাথামাই।,,,এই দেখ,, আমি আর কাদছি না।এখন চলতো,, খেয়ে নিবি আয়।আজ আমি আমার ছোট্ট মেয়েকে নিজ হাতে খাইয়ে দিবো।আয় মা।

(আদ্র সানিকে বসা থেকে উঠতে সাহায্য করলো।তারপর সবাই মিলে টেবিলে বসলো।সানির একপাশে সফিক আর এক পাশে আদ্র বসেছে।কথা মতো সফিক সানিকে খাইয়ে দিতে লাগলো।,,,,)

রফিক-তা আদ্র,,,আজকে তোদের সারাদিনের প্ল্যানিং কি??

আদ্র-তোমরা কি অফিস যাবে আজ??

রিসব-ভাই,,,আমি সব কাজ শেষ করে আসছি।আর আজ ৪টা মিটিং আছে।সবগুলো ভিডিও কন্ফারেন্সে করে দিয়েছি।আমি আজ রিলেক্সে থাকতে চাই।তুই ওগুলো বাড়িতে বসে হ্যান্ডেল করে নিস।,,,,

সেলিম-তাহলে আর অফিসে গিয়ে কি করবো।,,,

রফিক-হুম,,,ম্যানেজারকে বলে দি,, সব কিছু সামলে নিতে।

আদ্র-ওকেয় গুড।

আয়শা-বলছি যে,,কালতো আবার ওবাদড়িতে রিসেপশন।তো নিয়ম অনুযায়ী এবাড়ি থেকে তো তত্ত্বের ট্রে নিয়ে হবে।আমি কি স্টাফদেরকে বলে দেবো ট্রে সাজানোর জন্য কাউকে আনতে??

আদ্র-আমি বলে দেবো।

সানি-ট্রে সাজানো জন্য বাইরে থেকে লোক আনার কি আছে।সবাই মিলে করলে হয় না??

শিরিন-আমরাতো কখনো সাজাইনি।তাই ওসব ধারনা নেই।

সানি-তো কি হয়েছে এবার সাজাবে।আচ্ছা,,আমি সাজাবো।তোমরা আমাকে হেল্প করে।কি করবে তো নাকি??

বন্যা-রাজি হয়ে যাও।সানিপু অনেক ভালো ট্রে সাজাতে পারে।আমার আপুর বিয়েতে ওই সাজিয়েছে।

আরিফা-হ্যা,,,সৌরভের রিসেপশানের তত্তের ট্রে আমি দেখেছি।অনেক ভালো হয়েছিলো।,,,,ওগুলো তাহলে আমার মেয়েই সাজিয়েছে।

বন্যা-হ্যা,,আন্টি,,ওসব তোমার মেয়েই সাজিয়েছে।

রফিক-তাহলে আর কি,, বড়বোনের বিয়ের তত্তও তাহলে মামনিই সাজাবে।

আদ্র-সবার আগে আমার ডলের সেপটি।ডল,,তুমি এই শরীর নিয়ে করতে পারবে তো??

সানি-আরে পারবো আমি।কিচ্ছু হবে না।আর আমি কি একা নাকি,,সবাই থাকছে তো।আর আপনি থাকবেন না??

আদ্র-(ওরে আমার পাগলি,,,তুমি যেখানে থাকবে সেখানে আমি কি করে না থাকি)(মনে মনে)

আদ্র-ঠিক নেই।

শারমায়া-আমি কিন্তু আছি

রুসা-আমিও আছি।

সায়মান-আমরা কি বানের জলে ভেসে এসেছি নাকি??কিরে রিসবের বাচ্চা,,থাকবি তো নাকি??

রিসব-হ্যা,,,হ্যা,,,কেন নয়।

বন্যা-আমাকে কি বাদ দিচ্ছো নাকি।

আরিফা-তোরা ছোটরা করিস।আমরা এর মধ্যে নাই গেলাম।

আয়শা-হ্যা৷, তাই ভালো।

(সবাই মিলে ঠিক করলো কাজটা সন্ধ্যায় শুরু করবে।আর সেটা হবে বাড়ির ছাদে।,,,তখনই বিহান,জিমান আর সিমন রুম থেকেম বেরোতে বেরোতে বললো...)

বিহান-আমরা কি থাকতে পারবো না নাকি

জিমান-হ্যা,,আমরাও হেল্প করবো।

সায়মান-ইয়েস ব্রো।তোমরা না থাকলে আসর জমবে কিকরে???তোমাদের তো থাকতেই হবে।

রুসা-তাহলে হয়ে যাক আজ সফর ইন ছাদ ওন রাত।

(রুসার কথা শুনে সবাই হেসে দিলো।,,, এভাবেই হাসি ঠাট্টার মধ্যে দিয়ে তারা সকালের নাস্তা শেষ করলো।,,,,,)

আদ্রের সম্মোহীনি পর্ব ১৯