সূর্যের এক ফালি কিরণে ঝলমল করছে ছাদের একাংশ। ছাদের চারপাশেও ছড়িয়ে আছে বিভিন্ন রকম ফুলের টব। রঙিন ফুলগুলোর উপর প্রজাপতিদের ডানা মেলে উড়াউড়ি মনোযোগ দিয়ে দেখছে প্রিয়ন্তী। স্তব্ধ দুপুরে সে নিজেও স্তব্ধ হয়ে বসে রয়েছে দোলনায়।
স্বজনী এসে হঠাৎ বসলো প্রিয়ন্তীর পাশে। মুখে হাসির রেখা টেনে বলল,
"কি হয়েছে ননদিনী? কি এমন ভাবছো এত মনোযোগ দিয়ে?"
প্রিয়ন্তী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
"কিছু না ভাবি।"
সবসময়ের হাসি-খুশি ও উচ্ছলতায় পরিপূর্ণ মেয়েটির হঠাৎ এই সরল উত্তর মেনে নিতে পারলো না স্বজনী। কারণটা কিছুটা হলেও সে আঁচ করতে পারছে। তবুও ওকে স্বাভাবিক করতে দুষ্টুমী করে বলল,
"হঠাৎ এত আনমনা যে? প্রেমে ট্রেমে পড়লে নাকি প্রিয়ু?"
প্রিয়ন্তী দুপাশে মাথা নাড়িয়ে বলল,
"প্রেমের মানুষটাই যে জীবনে আসছে না ভাবি!"
স্বজনী মুচকি হেসে বলল,
"চিন্তা করো না। আসবে খুব জলদি! আর খুব জলদি আরেকজনও আসবে। আমার দেবর।"
"আমি জানি ভাবি। একটা কথা জানো? ভাইয়ার আরও অনেক বন্ধু ছিলো। তারা আমাদের বাসায়ও এসেছে। কিন্তু আয়মান ভাইয়া, ভাইয়ার বেস্ট ফ্রেন্ড হওয়ার পরও কোনোদিন আমাদের বাড়ির চৌকাঠ মারায়নি। কেনও? শুধুই আব্বুর অপছন্দ বলে? আর যদি সেটাই হয়ে থাকে তো আব্বুর এত অপছন্দ কেনও? কই, ভাইয়ার অন্য ফ্রেন্ডরা এলে তো কখনো এমন করে না!"
"তা আমার ননদিনীর মনে বুঝি তাকে নিয়ে খুব কৌতুহল?"
প্রিয়ন্তী স্বজনীর দিকে তাকিয়ে বলল,
"একটা কথা জানো ভাবি?"
স্বজনী কৌতুহলের সহিত শুধালো,
"কী?"
প্রিয়ন্তী হতাশ শ্বাস ফেলে আকাশের দিকে তাকিয়ে আনমনা হয়ে বলল,
"নিষিদ্ধ জিনিসে মানুষের আকর্ষণ বেশিই হয়!"
স্বজনী এক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে প্রিয়ন্তীর দিকে। তার হঠাৎ এমন গুরুগম্ভীর কথাটা অবাক করার মতো। সেভাবে তাকিয়েই শুধালো,
"তোমারও বুঝি সেরকম হচ্ছে?"
প্রিয়ন্তী উঠে দাঁড়ালো দোলনা থেকে। হেটে গেলো ছাদের কার্ণিশ পর্যন্ত। দৃষ্টি থমকে আছে আকাশের দিকে। বলল,
"খান বাড়ি ও তার প্রত্যেকটা সদস্য এক একটা রহস্য আমার জন্য। কি এমন কারণ আব্বুর এমন বিদ্বেষের?"
*******
আয়ানের প্রথম কথা শুনে সায়মা সস্থির নিশ্বাস ফেললেও শেষের কথাটা শুনে হকচকিয়ে উঠলো। কয়েকবার পল্লব ঝাঁপটে অস্ফুটস্বরে আওড়ালো,
"কাজী অফিস?"
"হ্যাঁ কাজি অফিস। তুই দশ মিনিট ওয়েট কর। আমার ম্যানেজার দুই লক্ষ টাকা নিয়ে এখনই যাচ্ছে ওই বাড়িতে।"
বলে আয়ান আর উত্তরের অপেক্ষা না করে ফোন কেটে দিলো। সায়মা কাজি অফিসের কথায় হতভম্ব হয়ে এখনও মূর্তির মতো স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে। সচল মস্তিষ্ক জানান দিচ্ছে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার। সে যা ভাবছে আদ্যো কি তা সত্যি হবে?
সারা সায়মাকে জিজ্ঞেস করলো,
"কি হলো আপু? কিছু বলছো না যে। ভাইয়া কি বলল? টাকাটা দিবে?"
সায়মা নিজেকে স্বাভাবিক করে বলল,
"ভাইয়া বলল টাকাটা পাঠিয়ে দিচ্ছে।"
"তাহলে তো হয়েই গেলো। আর কিসের দুশ্চিন্তা করছো তুমি?"
"ভাইয়া টাকাটা দিয়ে কাজী অফিস যেতে বলেছে।"
সারা অবাক হয়ে বলল,
"হঠাৎ কাজী অফিস কেনও?"
সায়মা বিরক্ত হয়ে বলল,
"আমি যদি জানতাম তবে আর দুশ্চিন্তা করতাম নাকি? ভাইয়া তো কিছু না বলেই কল কেটে দিলো।"
ঠিক দশ মিনিটে ম্যানেজার এসে টাকা সায়মার হাতে তুলে দিলো।
******
সায়মা রুমে ঢুকে সেই দুই লক্ষ টাকা সামিরের মুখে ছুড়ে মারলো। খুব রেগে বলল,
"পেয়ে গেছেন আপনার দুই লক্ষ টাকা? এবার আপনার ওই নোংরা মুখ দিয়ে দ্বিতীয়বার প্রিয়ার নাম নিবেন না।"
সামিরের রাগ হলেও সে কিছু না বলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলো। যথেষ্ট অপমান হয়েছে। এখন আর কথা বাড়িয়ে নতুন করে অপমানিত হতে চায় না।
ওরা বেরিয়ে যেতেই হেনা বেগম সায়মাকে কিছু বলতে চাইলেন। কিন্তু সায়মা তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
"আপনার থেকে আমি এটা আশা করি নি আন্টি। ছোট থেকে একা প্রিয়াকে মানুষ করেছেন, এজন্য আপনার প্রতি আমার আলাদা একটা সম্মান ছিলো। কিন্তু আজ যখন আপনি শুধু কিছু টাকার বিনিময়ে প্রিয়ার জীবনটা শেষ করে দিতে যাচ্ছিলেন, আমার মন থেকে আপনার জন্য সেই সম্মানটুকু শেষ হয়ে গেছে। প্রিয়া আজ বাড়ি ছেড়েছে। ওর সাথে আমার দেখা হলে আমি শুধু একটা কথাই বলবো, আপনার কাছে যেনও ফিরে না আসে! কিছু টাকার বিনিময়ে ওর জীবনের বলি'টা না চড়ালেও পারতেন!"
সায়মা তাকে আর কিছু বলার সুযোগ দিলো না। সারাকে নিয়ে বেরিয়ে গেলো বাড়ি থেকে। দ্রুত গিয়ে সিএনজি ধরলো কাজী অফিসে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। উত্তেজনায় ধৈর্য ধরে বসতেও পারছে না। ওর ধারনা যদি সত্যি হয় তবে ওর থেকে বেশি খুশি কেউ হবে না। কেউ না!
*******
সায়মা সিএনজি থেকে নেমে আয়ানের গাড়ি দেখতে পেলো কাজী অফিসের সামনে। সে ও সাহিদ গাড়ির সাইডে দাঁড়িয়ে গম্ভীরভাবে কিছু নিয়ে কথা বলছে। সায়মা ভাইকে পরখ করে ফট করে বলে বসলো,
"ভাইয়ার সাথে প্রিয়াকে দারুণ মানাবে!"
"কিন্তু আপু, প্রিয়া আপুকেই তো দেখছি না আশেপাশে। তোমার ধারণা যদি সত্যি না হয়?"
"উফফ সারা! তুই কি বোকা নাকি? প্রিয়া তো ভাইয়াকে পছন্দই করে না। সেখানে ভাইয়ার সাথে পালিয়ে আসবে নাকি? নিশ্চিত ভাইয়া তুলে নিয়ে এসেছে! আমাদের ভাই বলে কথা!"
সারা বুঝার ভঙ্গিতে বলল,
"আমাদের ভাই বলে বিয়ে বাড়ি থেকে বউ তুলে কাজী অফিস নিয়ে এসে পড়েছে বিয়ে করার জন্য!"
সায়মা উৎফুল্ল হয়ে বলল,
"হ্যাঁ। আর আমাদেরও ডেকেছে বিয়ের পর বউ নিয়ে বাড়ি যাওয়ার জন্য। দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে যায়েঙ্গে!"
সিএনজি থেকে নেমে আয়ানকে দেখেই সায়মার হাজারো কাহিনি বানানো শেষ। অথচ এখনও ভাড়াটা দেয় নি। সিএনজি ড্রাইভারও শেষে না পেরে বিরক্ত হয়ে বলল,
"মা, ভাড়াটা দিয়ে আপনারা ভাইয়ের বউ নেয়ার চিন্তা কইরেন।"
সায়মার খেয়াল হলো সে বেশি উত্তেজনায় ভাড়াটাও দিতে ভুলে গেছে। দাঁতে জিভ কেটে সে দ্রুত ভাড়া পরিশোধ করলো। পরপর এগিয়ে গেলো ভাইয়ের দিকে।
সায়মার ডাকে আয়ান পিছু ফিরলো। তার চোখে-মুখে ফুঁটে আছে স্পষ্ট বিরক্তি। কপালে ভাঁজ ফেলে বলল,
"এতক্ষণে তোর আসার সময় হয়েছে সায়মা?"
সায়মা নিষ্পাপ স্বরে জানালো,
"আমার দোষ নেই ভাইয়া! ওইখানে সব সামলে আসতেই দেরি হয়ে গেলো। এবার বলো কাজী অফিসে কেনও এলাম? কার বিয়ে?"
আয়ান স্বাভাবিকভাবে বলল,
"আমার।"
বিয়ের কথা বলার সময় ভাইয়ের ভাব-ভঙ্গি দেখে সারা-সায়মা হতাশ। মানুষ নিজের বিয়ের কথা বলতে অল্প হলেও লজ্জা পায়। অথচ ভাইয়ের মুখে তো লজ্জা পাওয়ার কোনো লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না। মনে হচ্ছে দৈনন্দিন অফিসের কাজের মতোই একটা ব্যাপার!
হতাশা চেপে রেখে সায়মা উত্তেজিত হয়ে শুধালো,
"তোমার বিয়ে? বিয়ে করবে তুমি? কাকে ভাইয়া?"
"গাড়ির ভিতরে আছে। দেখে নে।"
সায়মা গাড়ির দরজা খুলে ভিতরে তাকালো। বউয়ের মুখটা থেকে ভিতরকার চাপা উত্তেজনা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। যেকোনো মুহুর্তে ও খুশিতে লাফিয়ে উঠবে। অস্থির ভঙ্গিতে বলল,
"প্রিয়াকে বিয়ে করবে তুমি? আগে কেনও বলো নি ওকে তোমার পছন্দ? তাহলে নির্দ্বিধায় কোনো ঝামেলা ছাড়া ওকে ভাবি বানিয়ে আনতাম। আর তুমি কি করলে? এইভাবে বিয়ের আগমুহুর্তে মেয়েটাকে তুলে আনলে?"
আয়ান মুচকি হেসে বলল,
"সারপ্রাইজ। এইভাবে বিয়ে করার মজাই আলাদা। একটা এডভেঞ্চার টাইপ ফিলিংস! ওর জ্ঞান ফিরিয়ে ভিতরে নিয়ে যা। আমি আসছি।"
সারা-সায়মা মাথা দুলিয়ে সায় জানালো। তারপর কাজে লেগে পড়লো।
ওদের কাজে লাগিয়ে আয়ান সরে পড়লো। কিছুটা দূরে এসে কল করলো হেনা বেগমকে। রিসিভ করতেই কোনো প্রকার সম্ভাষণ ছাড়াই বলল,
"আপনার মেয়েকে আমি তুলে নিয়ে এসেছি। ওকে এই মুহুর্তে আমি বিয়ে করতে যাচ্ছি। ও বিয়ের সময় হয়তো না করতে পারে। তখন আমি আপনাকে কল দিবো। তাই আগেই বলে রাখছি কি করতে হবে। ও কল দিলে ওকে বলবেন আমাকে বিয়েটা করে ফেলতে। আমি অলরেডি দুই লক্ষ টাকা দিয়েছি। প্রিয়াকে এই কথাটা বলার বিনিময়ে আরও তিন লক্ষ টাকা দিবো। মোট পাঁচ লক্ষ টাকা। আশা করি, এবার মেয়েকে আমার হাতে তুলে দিতে আপনার কোনো সমস্যা নেই।"
হেনা বেগম কিছুক্ষণ ভেবে রাজি হয়ে গেলেন। প্রথমত সামির বিবাহিত হওয়ার পরও দুই লক্ষ টাকা দিয়েছে। সেইখানে আয়ান দিচ্ছে পাঁচ লক্ষ টাকা। আর সায়মার পরিবারে মেয়ের সুখের গ্যারান্টি তো নিশ্চিত। এ যেনও মেঘ না চাইতেই জল!
হেনা বেগম রাজি হতেই আয়ান কল কেটে দিলো। ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠলো চতুরতার একপেশে মিটিমিটি হাসি!
******
আয়ান যা ধারনা করেছিলো তার ব্যতিক্রম হয় নি। প্রিয়া একদমই রাজি না এই বিয়েটা করতে। সায়মা বুঝিয়েও রাজি করাতে পারছে না। সায়মার বক্তব্য তার ভাই প্রিয়াকে ভালোবাসে। কিন্তু আজ প্রিয়া আয়ানের দৃষ্টিতে ক্রোধ ও ঘৃণা ছাড়া ভালোবাসার ছিটেফোঁটাও দেখে নি!
আয়ান কথা বলা শেষে এগিয়ে এলো গাড়ির কাছে। কন্ঠ যথাসম্ভব কঠিন করে বলল,
"ওকে ভিতরে নিয়ে যাস নি? জলদি ভিতরে নিয়ে যা। কাজী অপেক্ষা করছে।"
এসময় হঠাৎ কোত্থেকে প্রিয়ার তেজ ফিরে এলো। গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ালো আয়ানের একদম মুখোমুখি। কাট-কাট উত্তর দিলো,
"আমি আপনাকে বিয়ে করবো না। এভাবে তুলে এনে আপনি আমার মা-কে অসম্মান করেছেন। আমি কোনোভাবেই আপনাকে বিয়ে করবো না।"
আয়ানের মুখশ্রীতে উদ্বিগ্নতার চিহ্ন মাত্র নেই। তার তীর্যক চাহনি প্রিয়াকে উপর-নীচ ভালো করে পরখ করছে। অপছন্দের মানুষ হলেও আয়ান মানতে বাধ্য প্রিয়া অসম্ভব সুন্দরী! হয়তো এই রূপের মোহে পড়েই সামির বউ-বাচ্চা রেখে প্রিয়াকে দ্বিতীয় বউ করতে উঠে-পড়ে লেগেছিলো।
আয়ানের তীক্ষ্ম চাহনির পর্যবেক্ষণে প্রিয়া কেঁপে উঠলো। ভীষণ অস্বস্তিতে এলোমেলো পলক ফেলল আশেপাশে। তার অস্বস্তি বুঝতে পেরে আয়ান চোখ ফিরিয়ে নিলো। ভাবলো, রুপে পরিপূর্ণ থাকলেও এই মেয়ে তার ভালোবাসার যোগ্য নয়!
আয়ান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
"তোমার মা এই বিয়েতে রাজি আছে। বিশ্বাস না হলে কথা বলে নাও।"
প্রিয়া অবাক চোখে তাকালো আয়ানের দিকে। চোখেমুখে লেপ্টে আছে অবিশ্বাস। আয়ান কিছু না বলে হেনা বেগমকে কল করলো। অত:পর ফোনটা ধরিয়ে দিলো প্রিয়ার হাতে।
প্রিয়া ফোনটা কানে লাগাতেই হেনা বেগম বলতে শুরু করলেন,
"মা, সামিরের সাথে তোর বিয়েটা ভেঙে গেছে। এখন বাড়ি আসলে আশেপাশের মানুষ তোকে প্রচুর কথা শোনাবে। সবচেয়ে ভালো হবে তুই খান সাহেবকে বিয়েটা করে নে। উনি তোকে খুব সুখে রাখবে।"
প্রিয়া আর কিছু শুনলো না। ফোনটা এগিয়ে দিলো আয়ানের দিকে। আয়ান এখনও তার দিকে তাকিয়ে। আয়ানের চোখে থাকা তাচ্ছিল্য ও ঘৃণার দৃষ্টির সাথে প্রিয়া ' সুখ ' শব্দটার কোনো মিল পেলো না। তবুও মায়ের কথা শুনেই কোটরভর্তি অশ্রুসমেত রাজি হয়ে গেলো বিয়েতে।
একটা সাক্ষর আর একটি শব্দকে তিনবার উচ্চারণ। জীবনকে সম্পূর্ণ সমপর্ণ করলো অন্য কারো হাতে। দু'জনেই নিজের জীবনকে জড়িয়ে ফেলল সম্পূর্ণ অপছন্দের মানুষটির সাথে। কাবিননামায় সাক্ষর করার সময় প্রিয়ার চোখের এক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়লো সেখানে। তবুও আয়ানের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। প্রিয়াকে কাঁদতে দেখেই তৃপ্তি পাচ্ছে ও!
অজানা পথে পা বাড়ালো অপছন্দের মানুষটির সাথে। এই অজানা পথের অজানা ভবিষ্যৎ কতদূর নিবে তাদের?