স্নিগ্ধ প্রেমের মায়া

পর্ব - ৩

🟢

মাইশার কথা শুনে আয়ান কিছু সময়ের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেলো। মস্তিষ্কে ঘুরছে প্রিয়ার ভাবনা,

"সামির বিবাহিত ও এক বাচ্চার বাবা হয়েও আবার বিয়ে করছে? একসাথে দুটো মেয়ের জীবন নষ্ট করতে চাইছে ও! আমি থাকতে এটা হতে দিবো না।"

আয়ানকে চুপ হয়ে যেতে দেখে মাইশা খানিকটা ভরকে গেলো। জিজ্ঞেস করলো,

"কিছু হয়েছে ভাইয়া?"

আয়ান নিজেকে ধাতস্থ করে হেসে বলল,

"না, না। কিছু হয় নি। তা আপনারা হঠাৎ ফুল ফ্যামিলি এখানে?"

মাইশা বলল,

"বাইরে লাঞ্চ করতে এসেছিলাম সবাই। এরপর আমার বাবার বাড়িতে যাবো।"

আয়ান কিছু একটা সন্দেহ করে বলল,

"হঠাৎ বাবার বাড়ি যাচ্ছেন?"

"সামির ব্যবসার কাজে এক সপ্তাহের জন্য বাইরে যাবে। এজন্যই আমাকে ওখানে রেখে যাবে।"

এবার পুরো ঘটনাটাই আয়ানের মাথায় ঢুকলো। মিথ্যে কথা বলে বউকে বাবার বাড়ি পাঠিয়ে আরেকটা বিয়ে করছে। হায়রে বোকা মেয়ে! সামির যে ওকে বাবার বাড়ি পাঠিয়ে ওর সতীন আনার প্রস্তুতি নিচ্ছে সেটা তার সম্পূর্ণ অজানা।

আয়ান মাইশার পিছে তাকিয়ে সামিরকে আসতে দেখে দ্রুত সেখান থেকে সরে পড়লো। গাড়ি ঘুরিয়ে নিলো প্রিয়াদের বাসার উদ্দেশ্যে। অফিসের কাজের থেকেও এখন প্রিয়ার বিয়ে আটকানো জরুরি কাজ। হোক অপছন্দের মানুষ তাই বলে একটি পুরুষের জন্য দুটো নারীর জীবন নষ্ট হতে দেয়া যাবে না!

*******

প্রিয়ার বাড়ির সামনে এসে গাড়ি থেকে নামলো আয়ান। ছোট একটি একতলা বাড়ি। যেটা বর্তমানে বিয়ের আমেজে পুরোটাই সাজানো রয়েছে। আয়ান অস্থির ভঙ্গিতে কলিংবেল চাপলো। ভেতর থেকে দরজা খুললো হেনা বেগম। আয়ানকে দেখে মুখে হাসি ফুটিয়ে বলল,

"আরে, খান সাহেব যে আমার বাড়িতে। হঠাৎ কি মনে করে আমার বাড়িতে আপনার পদধূলি পড়লো? আসুন আসুন ভিতরে আসুন। শারমিন, খান সাহেবের জন্য চা-নাস্তার ব্যবস্থা করো।"

আয়ান তাকে বাঁধা দিয়ে বলল,

"আমি এখানে চা-নাস্তা খেতে আসি নি, আন্টি। আমি এখানে এসেছি সামির সম্পর্কে কিছু বলতে।"

"সেটা কি এভাবে বাইরে দাঁড়িয়েই বলবেন? ভেতরে আসুন না। প্রথমবার আমাদের বাড়িতে এসেছেন, বাইরে দাঁড়িয়ে আপ্যায়ন করবো নাকি?"

হেনা বেগমের তেল মারা কথায় আয়ান বিরক্ত হলো। ইচ্ছে করলো সেখান থেকে চলে যেতে। কিন্তু ভেতরকার বিবেকবোধ তাকে টেনে ধরে রাখলো প্রিয়ার জীবন বাঁচাতে। সে বিরক্ত ভঙ্গিতে উত্তর দিলো,

"আমি এখানে আপনার আপ্যায়ন নিতে আসি নি। গুরুত্বপূর্ণ একটা কথা বলতে এসেছি সেটা বলেই চলে যাবো।"

অগত্যা হেনা বেগম বললেন,

"ঠিক আছে বলুন।"

"আন্টি, আপনি প্রিয়ার ভালো চাইলে এই বিয়েটা ভেঙে দিন। সামির বিবাহিত আর ওর একটা মেয়েও আছে। ওর সাথে বিয়ে দিয়ে প্রিয়ার জীবনটা নষ্ট করবেন না।"

এক নিশ্বাসে কথাগুলো বলে থামলো আয়ান। প্রতিক্রিয়া দেখতে তাকালো হেনা বেগমের দিকে। কিন্তু তার নিরুদ্বেগ ভাব-ভঙ্গি দেখে ভরকে গেলো । ভাবলো হয়তো বড় একটা শক পেয়ে স্তব্ধ হয়ে গেছে, যেমনটা সে হয়েছিলো কিছুক্ষণ আগে।

কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে হেনা বেগম বললেন,

"তো?"

এত কথার বিপরীতে এই স্বল্প উত্তরটা শুনে আয়ান ভ্রু কুঁচকে বলল,

"তো মানে?"

"সামির বিবাহিত ওর বাচ্চা আছে তো কি হয়েছে? ওর টাকার অভাব আছে নাকি? ও নি:সন্দেহে আমার মেয়েকে সুখে রাখবো। আর বড় কথা, প্রিয়াকে বিয়ে করার জন্য সামির দুই লক্ষ টাকা দিয়েছে।"

হেনা বেগমের কথা শুনে আয়ান স্তব্ধ হয়ে পড়লো। লোকমুখে হেনা বেগমকে লোভী হিসেবে অনেকবার শুনেছিলো। কিন্তু তাই বলে নিজের মেয়ের জীবনটা পর্যন্ত নষ্ট করে দিবে? ওহ হ্যাঁ, নিজের মেয়ে হলে অন্য কথা ছিলো। মেয়েটা তো পালক!

আয়ান রাগে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

"আপনি দুই লক্ষ টাকার জন্য প্রিয়াকে সতীনের সংসারে দিবেন? প্রিয়া কোথায় আমি ওর সাথে কথা বলবো।"

একটু আগেই হেনা বেগম আয়ানকে আপ্যায়ন করতে চাইছিলেন। কিন্তু যখন আয়ান প্রিয়ার সাথে দেখা করতে চাইলো তিনি বাঁধা দিলেন। স্বাভাবিকভাবে বললেন,

"প্রিয়াও জানে এই কথা। ও সব জেনেশুনেই বিয়ে করছে।"

আয়ানকে আটকে দেয়ার জন্য এই কথাটুকুই যথেষ্ট ছিলো। সে থেমে থেমে জিজ্ঞেস করলো,

"প্রিয়া জেনে-বুঝে আরেকটা মেয়ের সংসারে তৃতীয় ব্যক্তি হতে চাইছে?"

হেনা বেগম বিরক্ত হয়ে বললেন,

"তৃতীয় ব্যক্তি বলছেন কেনও খান সাহেব? সামিরের দ্বিতীয় বউ হচ্ছে। আর যেখানে মেয়েটা আমার সেখানে আপনার সমস্যা হওয়ার তো কোনো কারণ আমি দেখছি না। মানছি আপনারা এই এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তি। তাই বলে কি অন্যের ব্যক্তি-স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করবেন?"

আয়ান হেনা বেগমের কথার কোনো উত্তর দিলো না। ধুপধাপ পা ফেলে বেরিয়ে গেলো সেই বাড়ির চৌকাঠ পেরিয়ে। গাড়িতে বসে রাগে বিক্ষিপ্ত মস্তিষ্ক নিয়েই ড্রাইভ করতে শুরু করলো।

******

আয়ানকে অসময়ে বাড়ি ফিরতে দেখে অবাক হলেন পারভিন খান। পরপর ছেলের রাগে লালিত মুখশ্রী দেখে খানিকটা ঘাবড়ে গেলেন। খুঁজে পেলেন না ছেলের হঠাৎ এমন রেগে যাওয়ার কারণ। তবে ছেলের ভয়ংকর রাগ সম্পর্কে আন্দাজ আছে তার। তাই ঠান্ডা স্বরে জিজ্ঞেস করলেন,

"কি হয়েছে বাবা? হঠাৎ এত রেগে আছো যে? কোনো সমস্যা?"

আয়ান বহু কষ্টে নিজের ভিতরকার রাগটাকে দমন করলো। মায়ের সামনে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করে বলল,

"কিছু না মা। আমার টায়ার্ড লাগছে। রুমে গেলাম।"

বলেই উত্তরের অপেক্ষা না করে হনহন করে হাটা ধরলো সিড়ির দিকে। রুমে ঢুকেই দড়াম করে দরজা বন্ধ করে দিলো আয়ান। পড়নের জ্যাকেট খুলে ছুড়ে ফেললো বিছানায়। রাগ ও দুশ্চিন্তায় কপালের শিরা-উপশিরা ফুলে উঠেছে। প্রিয়ার উপর রাগ উঠলেও খারাপ লাগছে মাইশার জন্য। নিজের স্বামীকে কতটা বিশ্বাস করে মেয়েটা। আর স্বামী সেই বিশ্বাসের ফল দিচ্ছে আরেকটি মেয়েকে বিয়ে করে! ঘরে ছোট্ট একটা মেয়ে। এই মেয়েটার কথাও একবার মনে এলো না সামিরের?

মনে আসবেই বা কি করে? সব জেনেশুনে যদি একটি মেয়ে অর্থলোভে আরেকটি মেয়ের সংসার ন*ষ্ট করতে উঠে-পড়ে লাগে তবে ছেলেটাকে কি একা দো*ষী সাব্যস্ত করা যাবে?

এতক্ষণ মাইশা ও সিহার কথা মনে করে আয়ানের যে খারাপ লাগা ছিলো সেটা হঠাৎ উঁবে গিয়ে ভর করলো রাগের পাহাড়! আর তার সমস্ত রাগ শুধুমাত্র প্রিয়ার উপর। আপনমনে বলল,

"এতোদিন তো তুমি শুধু আমার অপছন্দের তালিকায় ছিলে। এখন ঘৃণা করা মানুষের তালিকায় চলে গেলে। টাকার লোভ এতটাই যে অন্য মেয়ের সংসার ভাঙতেও দ্বিধা করলে না? শুধু টাকাই দরকার তো তোমার? পাবে সেটা! তবে অন্যের সংসার ভেঙে নয়। টাকা তুমি পাবে, তবে ভালোবাসার অভাবে মরবে তুমি!"

বলেই আয়ান ক্রু*র হাসি হাসলো।

*******

বিয়ে পড়ানোর সময় নির্ধারণ করা হয়েছে দুপুরে। অল্পসংখ্যক মানুষ বেশ ভালোভাবেই আয়োজন করা হয়েছে বিয়ের। সারা-সায়মা প্রিয়াকে সাজাচ্ছে। টুকটুকে লাল বেনারসীতে লাগছে সদ্য ফোঁটা লাল গোলাপ।

হঠাৎ বাইরে হইচই-এর শব্দ পেয়ে সারা, সায়মা প্রিয়াকে একা রেখেই রুমের বাইরে চলে গেলো। এবং প্রিয়াকে সাবধান করে গেলো যেনও বর আসার আগ পর্যন্ত সে রুমের বাইরে না বের হয়।

প্রিয়া একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আয়নার দিকে তাকালো। মেয়েদের বিয়ে করার থেকে বউ সাজার শখটাই বেশি থাকে। প্রিয়ারও হয়েছে একই অবস্থা! এজন্যই নিজেকে বেশ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে নিচ থেকে উপর পর্যন্ত দেখছে।

হঠাৎ আয়নায় কারো প্রতিবিম্ব লক্ষ করতেই বসা থেকে দাঁড়িয়ে পড়লো সে। ঘাবড়ে গিয়ে বক্ষস্পন্দন চলতে লাগলো জোড়ালোভাবে। পিছে ফিরে আয়ানের রাগ ও তাচ্ছিল্য মিশ্রিত দৃষ্টির সামনে পড়লো প্রিয়া। সায়মার বাসায় গেলে শুধু কয়েকবার আয়ানের সাথে দেখা হয়েছে। কিন্তু কখনো কথা হয় নি। তাই আজ আয়ানের হঠাৎ আগমনের কারণ তার ঠিক বোধগম্য হচ্ছে না। তার উপর কেউ যদি দেখে কনে তার ব্যক্তিগত রুমে কোনো ছেলের সাথে আছে তাহলে নিশ্চিত এই মুহুর্তে একটা কে*লেঙ্কারি হয়ে যাবে।

প্রিয়া ভয় পেয়ে কাঁপা কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,

"আ..আপনি?"

স্নিগ্ধ প্রেমের মায়া গল্পটি তিয়াশা চৌধুরী-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক ও রোমান্টিক থ্রিলার গল্প