সূর্যের কিরণে আলোকিত সকালের পরিবেশ। প্রিয়ন্তী সিড়ি দিয়ে দৌড়ে নিচে এসে টেবিলে বসলো। মায়ের রাগী চেহারা দেখে আদুরে গলায় বলল,
"ওমা! রেগে আছো কেনও? একটু লেট হয়ে গেছে। কাল থেকে আর হবে না। প্রমিজ!"
মেয়ের বাচ্চাসূলভ কথা শুনে বৃষ্টির রাগ পড়ে গেলো। সামান্য হেসে মেয়ের প্লেটে পরোটা তুলে দিলো। অত:পর বললেন,
"পিয়াস, তুমি কি আজ অফিস যাবে?"
পিয়াস ডানে-বামে মাথা নেড়ে বলল,
"না, মা। আজ বাসায়ই থাকবো।"
প্রিয়ন্তী খুশি হয়ে বলল,
"তাহলে আজ কোথাও থেকে ঘুরে আসি ভাইয়া?"
বৃষ্টি বললেন,
"তুই থাম তো! একদিন বাসায় থাকবে। কই একটু রেস্ট নিবে, উনার হয়েছে ঘুরতে যাওয়ার শখ! টইটই করা ছাড়া কোনো কাজ আছে তোর? কমপক্ষে ভাইটাকে শান্তি দে!"
মায়ের কথা শুনে প্রিয়ন্তী চুপ হয়ে গেলো। পিয়াস বলল,
"আজ তাহলে থাক। কিছুদিন পর আয়মান আসবে লন্ডন থেকে। আমি এয়ারপোর্ট যাবো ওর সাথে দেখা করতে। সেদিন তোকে নিয়ে যাবো।"
তৌহিদ হঠাৎ খাওয়া বন্ধ করে বলল,
"প্রিয়ন্তী কোথাও যাবে না। বিশেষ করে ব্যাপারটা যদি খান পরিবারের কোনো সদস্যের সাথে দেখা করার মতো হয়! তোমাকেও আমি বারণ করতাম পিয়াস। কিন্তু বড় হয়েছো, নিজের মর্জিমতো চলো। বন্ধুকে তুমি ছাড়বেই না। যাও তুমি। তবে প্রিয়ন্তী যাবে না।"
কথাটা বলে দ্রুত খাওয়া শেষ করে টেবিল ছাড়লেন তৌহিদ। বৃষ্টিও গেলো তার পিছু পিছু। প্রিয়ন্তী এখনও অবাক চোখে তাকিয়ে আছে। আয়মানের সাথে দেখা করার কথা শুনেই বাবার কঠোর হয়ে যাওয়ার কারণটা তার বোধগম্য হয় নি। কিন্তু সে জানে কাউকে জিজ্ঞেস করেও এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পাবে না। তাই দীর্ঘশ্বাস ফেলে খাওয়ায় মন দিলো সে।
*******
আজ প্রিয়ার গায়ে হলুদ। উত্তেজনায় সকালের নাস্তাটা অব্দি ঠিকঠাক খায় নি সারা-সায়মা। কিন্তু ভাইয়ের অনুমতিবিহীন রওনা করতে পারছে না ওই বাড়িতে। আয়ান সেই সকালে নাস্তা খেয়ে রুমে গিয়ে ল্যাপটপে অফিসের কাজ করছে। এজন্য সারা-সায়মা বিরক্ত করার সাহস পায় নি।
১০ টা নাগাদ আয়ান ল্যাপটপ ছেড়ে নিচে নেমে এলো। ড্রইংরুমের সোফায় বসে বোনদের উসখুস করতে দেখে ভ্রু কুঁচকে বলল,
"কি হয়েছে?"
সায়মা বলল,
"ভাইয়া, আজ প্রিয়ার হলুদ। আমরা এখন যাই?"
"হলুদ? হলুদের অনুষ্ঠান তো রাতে হওয়ার কথা। এখনই কেনও যাওয়া লাগবে?"
"মূল অনুষ্ঠান রাতে হলে কি হবে? আয়োজন তো সকাল থেকেই হবে না? এখনই যাই না ভাইয়া, প্লিজ!"
সায়মার ফোন ছিলো সারার হঠাৎ। হঠাৎ নোটিফিকেশনের শব্দে সারা মেসেজে ঢুকলো। পরপর উৎফুল্ল গলায় বলল,
"প্রিয়া আপুর হবু বরের পিক দিয়েছে। দেখো আপু। সামির ভাইয়া কি হ্যান্ডসাম!"
সায়মা এখনও ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে অনুমতির অপেক্ষায়। কিন্তু আয়ানের সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। সারার মুখে সামিরের কথা শুনেই বলল,
"দেখি তো তোদের তারছিড়া বান্ধবির জামাইকে।"
সারা চুপচাপ ভাইয়ের হাতে ফোন তুলে দিলেও সায়মা চুপ রইলো না। বলল,
"আমার বান্ধবিকে তারছিড়া মনে হচ্ছে তোমার? তোমার কপালেই তারছিড়া বউ জুটবে, দেখো!"
আয়ান ফোনের দিকে তাকিয়ে উদ্বেগহীন জবাব দিলো,
"শকুনের দোয়ায় গরু মরে না।"
সায়মা উত্তেজিত হয়ে কিছু বলতে চাইলো কিন্তু তার আগেই আয়ান ফোন হাতে ধরিয়ে বলা শুরু করলো,
"ঠিকভাবে যাবি। সাবধানে থাকবি। আর ফোন সাথে সাথে রাখবি যেনও আমি কল করলেই তোদের পাই। কোনো প্রবলেম হলে অবশ্যই সাথে সাথে আমাকে জানাবি।"
ভাইয়ের কথা শুয়ে সারা-সায়মা মাথা দুলিয়ে সায় জানালো। পরপর সব গুছিয়ে বেরিয়ে গেলো প্রিয়ার বাসায় উদ্দেশ্যে।
*******
"প্রিয়ু, কই তুই? আমরা এসে পড়েছি।"
সায়মার কন্ঠ পেয়ে হেনা বেগম রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। সারা-সায়মাকে দেখে খুশি হয়ে বললেন,
"এসে পরেছো তোমরা? প্রিয়া ছাদে আছে। দাঁড়াও, আমি ডেকে নিয়ে আসছি।"
সায়মা বাঁধা দিয়ে বলল,
"তার প্রয়োজন নেই আন্টি। আমরাই যাচ্ছি ছাদে।"
******
এক বাড়িতে জন্মগ্রহণ করে অন্য বাড়িতে চলে যাওয়াই মেয়েদের জীবন। প্রিয়াও শেষবারের মতো মন ভরে উপভোগ করতে চাইছে নিজের বাড়ির ছাদে কাটানো প্রত্যেক সকাল। দোলনায় বসে খুব মনোযোগ সহকারে দেখে চলেছে ছাদের প্রত্যেকটা কোণা। তখনই এসে ডাক দিলো সায়মা। সায়মার ডাকে পিছন ফিরলো প্রিয়া। মুচকি হেসে সম্ভাষণ জানালো,
"গুড মর্নিং! এসে পড়েছিস তোরা?"
সায়মা প্রতিত্তোর না করে প্রিয়ার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। প্রিয়ার পড়নে গোলাপী রঙের থ্রি-পিস। বাতাসে এলোমেলো চুল, একটু পরপর হাত দিয়ে ঠিক করছে। সকালের মিষ্টি রোদে মেয়েটাকে অসম্ভব সুন্দর লাগছে! তার মুখশ্রীর বিশেষ এক আকর্ষণ তার টানা-টানা ডাগড় দুই চোখ। মনে হবে সেই চোখের মধ্যেই মায়ার এক আস্ত খাল ঢুকে আছে!
প্রিয়া তার সামনে এসে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
"কিছু ভালো লাগছে না, জানিস? কেনও চলে যেতে হবে তোদের ছেড়ে? এই তোরাই তো ছিলি আমার আপনজন। তোদের না দেখে কি করে থাকবো আমি?"
"আমাদের না দেখে থাকবি কেনও? যখন আমাদের কথা মনে পড়বে জাস্ট টুকুস করে এসে পড়বি। ভাইয়াকে বললেই নিয়ে এসে পড়বে।"
প্রিয়া গাল ফুলিয়ে বলল,
"হ্যাঁ আনবেই তো। আমার হবু হাসবেন্ড অনেক ভালো। বলেছেই আমি যা চাইবো তাই করবে। কি সুন্দর সবার সাথে হাসিমুখে কথা বলে। আর তোর ভাই একটা আছে! জন্মের খাটাশ! মুখ দেখলে মনে হবে কেউ জোর করে নিমপাতা বেঁটে খাইয়ে দিয়েছে।"
প্রিয়ার কথা শুনে সারা, সায়মা দু'জনেই ফিঁক করে হেসে ফেলল। সায়মা বলল,
" বুঝলাম বরের প্রশংসা করবি। তাই বলে আমার ভাইটার এইভাবে দুর্নাম করবি?"
"দুর্নামের কি আছে? সত্যি কথাই তো বলেছি। এই তোর ভাইয়ের জন্যই তোদের বাসায় আমি সহজে যাই না। আমাকে দেখলেই ভাবটা এমন করবে যেনও তেতুলগাছের তিনটা পেত্নী একসাথে তার ঘাড়ে চড়ে বসে আছে!"
******
দুপুর একটা। নব্য শীতের দেখা মেলেছে শহরজুড়ে। আজ ছুটির দিন হওয়া সত্ত্বেও আয়ান বাড়িতে থাকতে পারে নি। কাজ পড়ে যাওয়ায় এই ভর দুপুরেই রওনা করতে হয়েছে অফিসের উদ্দেশ্যে। হোয়াইট টি-শার্টের উপর কালো জ্যাকেট পড়নে। হঠাৎ ট্রাফিকের কারণে মাঝপথেই আটকে পড়লো আয়ানের গাড়ি। আয়ান বিরক্তিতে নাক-মুখ কুঁচকালো। কিন্তু এখন এইভাবে বসে থাকা ছাড়া কোনো উপায় নেই!
কিছু সেকেন্ডের ব্যবধানে আয়ানের গাড়ির পাশে এসে দাঁড়ালো আরেকটা গাড়ি। গ্লাস খোলা থাকার ফলে ভিতরের মানুষগুলোর চেহারা দেখা যাচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই আয়ানের চোখ পড়লো সেদিকে। পরক্ষণেই দৃষ্টি ফিরিয়ে নিতেই মস্তিষ্কে হানা দিলো অনাকাঙ্ক্ষিত চিত্র!
পাশে তাকিয়েই নিজের ধারনাকে সত্যি হতে দেখলো আয়ান। হ্যাঁ, কোনো ভুল নেই। ড্রাইভিং সিটে বসে রয়েছে সামির। আজ সকালেই সামিরের ছবি দেখেছে আয়ান। তাই ভুল হওয়ার কোনো প্রশ্নই আসে না। তার পাশের সিটেই বসে রয়েছে ২৪/২৫ বছর বয়সী এক রমণী। হাসিমুখেই বাক্যালাপ চলছে তাদের মধ্যে।
১০ মিনিটের মাথায় ট্রাফিক ছেড়ে দিলো। আয়ানের পাশে থাকা গাড়িটা ধোঁয়া উড়িয়ে বেরিয়ে গেলো তার পাশ থেকে। কিছু একটা ভেবে আয়ানও পিছু নিলো গাড়িটার।
কিছুক্ষণ পর গাড়িটা এসে থামলো এক রেস্টুরেন্টের সামনে। গাড়ি থেকে নেমে এলো সেই রমণী। কোলে তার দুই কি তিন বছরের একটি বাচ্চা মেয়ে। এই দৃশ্য দেখে আয়ান কিছুখনের জন্য থমকে গেলো। মনে মনে ভাবছে,
এরা কি তবে সামিরের স্ত্রী-সন্তান? স্ত্রী-সন্তান থাকতেও সে প্রিয়াকে বিয়ে করছে?"
নেতিবাচক চিন্তা ঝেড়ে ফেলে আয়ান গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ালো। সামির গিয়েছে গাড়ি পার্ক করতে। আয়ান সেই সুযোগটাই কাজে লাগাতে চাইলো। সোজা গিয়ে ওই মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করলো,
"আরে ভাবি, আপনি সামিরের ওয়াইফ না? আর এ কে? আমার ভাতিজি বুঝি?"
মেয়েটি হতভম্ব হয়ে আয়ানের দিকে ফিরলো। আপাদমস্তক দেখেও তাকে চিনতে পারার কোনো লক্ষ্মণ দেখা গেলো না। তবুও কথার ধরনে মনে হচ্ছে সে সামিরের ফ্রেন্ড হবে। তাই মুচকি হেসে জবাব দিলো,
"জি ভাইয়া। আমি সামিরের ওয়াইফ মাইশা। আর এ আমাদের মেয়ে সিহা।"