"আমি এই বিয়েটা করতে চাইছি না।"
"আয়ান, আমি বুঝতে পারছি না আয়েশা কোনদিক থেকে খারাপ? দেখতে সুন্দর, শিক্ষিত ও অবস্থাপন্ন পরিবারের মেয়ে। তাহলে কেনও বিয়েটা করবি না?"
উঁচু গলায় কথাগুলো বলে থামলো পারভিন খান। মায়ের কথা শুনে আয়ান শান্ত অথচ কঠোর গলায় বলল,
"তোমরা চাইছো আমি এই বিয়েটা করি? তাহলে ঠিক আছে। তোমাদের যেমন ইচ্ছে।"
আঞ্জুম খান খুশি হয়ে বললেন,
"তাহলে দাদু, বিয়ের কথা পাকা করে ফেলি?"
আয়ান বিরক্ত হয়ে বলল,
"শুধুমাত্র হ্যাঁ করেছি এখনই বিয়ে? আয়মান যতদিন পর্যন্ত না লন্ডন থেকে আসছে ততদিন বিয়ে হচ্ছে না।"
"ভাইকে ছাড়া বিয়েও করবি না? এখন বলছিস এই কথা। যখন আয়মান এসে পড়বে তখন বলবি, ওর বউ খুঁজো। দুই ভাই একসাথে বিয়ে করবো।"
আয়ান নিরুদ্বেগ হয়ে বলল,
"সেটা ও আসলেই দেখা যাবে।"
পারভিন খান আবারও বললেন,
"আমি যে আয়েশার মা-কে কথা দিয়ে ফেলেছি। কমপক্ষে এনগেজমেন্টটা করে রাখ। আয়মান আসলে না হয় বউ তুলবো।"
আয়ান কিছুক্ষণ বাক-বিতণ্ডা করে শেষ পর্যন্ত মা আর দাদির কথায় রাজি হলো।
সে রাজি হতেই তার বোন সায়মা উৎফুল্ল হয়ে বলল,
"তাহলে তো মনে হচ্ছে সিরিয়ালে দুইটা বিয়ে খেতে পারবো। প্রিয়া আর ভাইয়ার বিয়ে!"
বোনের উৎফুল্লতা দেখে আয়ান মৃদু হাসলো। এই বোনদের খুশির জন্য সে পুরো দুনিয়া হাজির করতে পারে!
*****
বিলাসবহুল এক ডুপ্লেক্স বাড়ির সদর দরজার পাশের দেয়ালের নেমপ্লেটে সুন্দর করে উল্লেখ করা "খান নিবাস"। ভালোবাসা ও বহু যত্নে গড়া এই বাড়িতে বসবাস করে একটি সুখী পরিবার। হাসি-খুশি এই পরিবারের হাসির আড়ালেও থাকে অতীতের লুকানো ব্যাথা। সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে মায়েরা এমন হাজারো ব্যাথা সহাস্যে পাড়ি দিতে পারে।
আঞ্জুম খানের দুই ছেলে ও এক মেয়ে। ছেলে জুনাইদ খান ও ফারদিন খান। মেয়ে আরিশা খানম। আরিশার দু'বছর আগে ডিভোর্স হয়েছে এবং সে এক ছেলে সমেত মায়ের বাড়িতেই রয়েছে। জুনাইদ খান ও পারভিন খানের দুই ছেলে এক মেয়ে। ছেলে আয়ান আহমেদ খান ও আয়মান আহমেদ খান। আয়ান বর্তমানে পারিবারিক ব্যবসায় হাত দিয়েছে ও আয়মাম লন্ডনে আছে। মেয়ে সায়মা খান। আঞ্জুমের ছোট ছেলে ফারদিন ও নাসরিন খানের এক ছেলে ও এক মেয়ে। ছেলে ফারহান আহমেদ খান ও মেয়ে সারা খান। সায়মা অনার্স থার্ড ইয়ার ও সারা ইন্টার ফার্স্ট ইয়ারে অধ্যায়নরত আছে। এক বছর আগেই সায়মার বিয়ে হয়েছে এবং তার স্বামী ইটালি থাকে। এজন্যই সে বাবার বাড়িতে থেকেই পড়াশোনা করছে। বাবার বাড়িটাতে ঠিকই রয়েছে তবে বাবাবিহীন। জুনাইদ খান কিছুবছর আগেই স্ত্রী সন্তান রেখে পরপারে গত হয়েছেন। তবে থেকেই পরিবারের সম্পূর্ণ দায়িত্ব বহন করেছেন তার ছোট ভাই ফারদিন। দায়িত্ব সমূহ ছেলেদের হাতে হস্তান্তর করেই তিনি মুক্ত হবেন!
প্রিয়ার বিয়ের কথা উঠতেই পারভিন সায়মাকে জিজ্ঞেস করলো,
" আগামী পরশু তো প্রিয়ার বিয়ে। ওর মাকে বলিস কোনো দরকার লাগলে আমাদের বলতে। বাবা ছাড়াই মেয়েটাকে মানুষ করেছে। সঠিকভাবে পাত্রস্থ করতে পারলেই তো আপা দুশ্চিন্তামুক্ত!"
সায়মা ঘাড় দুলিয়ে বলল,
"প্রিয়াদের তো খুব বেশি আত্মীয়-স্বজন নেই। তাই আন্টি ছোট করেই অনুষ্ঠান করবে। আর শুনেছি সামির ভাইয়া অনেক ভালো। এখন শুধু ও সুখী থাকলেই হলো।"
আঞ্জুম খান বললেন,
"সেটাই তো আমাদের সবার চাওয়া।"
প্রিয়াকে নিয়ে সবার মাতামাতি দেখে আয়ান বিরক্ত হলো। অধিক চঞ্চল আর সবসময় বকবক করা মেয়েটাকে গুরুগম্ভীর আয়ানের একদমই পছন্দ নয়। সে যতবারই এই মেয়েটাকে দেখেছে তার এটাই মনে হয়েছে এই মেয়েটা প্রয়োজনের অতিরিক্ত কথা বলে। অথচ এই মেয়েটাকেই তার দুইটা বোন এত্ত পছন্দ করে। একে পেলে মনে হয় আকাশের চাঁদ পেয়ে গেছে তারা!
তাদের আলোচনায় বিরক্ত হয়ে আয়ান উঠে নিজের রুমে চলে গেলো। রুমে গিয়ে কল করলো আয়মানকে। সে ফোন ধরে বলল,
"আয়ান ভাই! আমি এখনই তোমাকে ফোন করতে যাচ্ছিলাম। আর তুমিই করে ফেললে। এবার বলো ওখানের কি খবর?"
আয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
"আর বলিস না ভাই! সবাই আমার বিয়ের পিছনে হাত ধুয়ে পড়ে আছে। কিন্তু আমি..."
আয়মান আয়ানকে কথা সম্পূর্ণ করতে না দিয়ে নিজেই বলা শুরু করলো,
"তুমি বিয়ে করবে? দেখো ভাই, আমি আসার আগে কোনো বিয়ে না। আমি আসার আগেই যদি তুমি বিয়ে করে ফেলো তাহলে আমি ওই বিয়ে মানি না। ছোট ভাই না মানলে বড় ভাইয়ের বিয়ে গ্রহণযোগ্য না।"
"শাট আপ আয়মান। আমি বিয়েটাই তো করতে চাইছি না। আমার তো কোনো মেয়েকেই পছন্দ না।"
আয়মান অবাক হওয়ার ভান করে বলল,
"মেয়ে পছন্দ হবে আর তোমার? তাহলে বোধহয় সূর্য পশ্চিম দিকে উঠবে। এরচেয়ে ভালো আমি দাদি আর আম্মুকে বলবো তোমায় জোর করে ধরে বিয়ে দিয়ে দিতে!"
আয়ান কটমট করে বলল,
"কই ভাবলাম নিচে বিয়ের আলাপের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে তোর সাথে কথা বলবো। আর তুইও শুরু করেছিস বিয়ে বিয়ে!"
"বিয়ে বিয়ে করবো না তাহলে? ভাবি লাগবে না আমাদের?"
********
"চৌধুরী নিবাস"
বিশাল এক ডুপ্লেক্স বাড়ি। এর প্রত্যেক কোণায় রুচিশীলতার ছাপ স্পষ্ট। বাড়ির সামনের প্রাঙ্গণেও গাছ-পালার সমাহার। বেশিরভাগই ফুলগাছ। সাড়ি বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকা ফুলের গাছগুলোকে দেখলেই বোঝা যায় বাড়ির মালকিনের ফুল ভীষণ পছন্দ!
বাড়ির বাসিন্দা তৌহিদ চৌধুরী ও বৃষ্টি চৌধুরীর এক ছেলে এক মেয়ে। ছেলে পিয়াস চৌধুরী ও পুত্রবধূ স্বজনী। একটি মেয়ে প্রিয়ন্তী চৌধুরী। সে এই বছর অনার্স ফার্স্ট ইয়ারে ভর্তি হয়েছে। এই তাদের ছোট্ট পরিবার।
কিন্তু এই পরিবারও একসময় পরিপূর্ণ ছিলো। তৌহিদ চৌধুরীর বড় ভাই তৌসিফ চৌধুরী ও ভাবি ফারিয়া চৌধুরী। তাদের ঘরে ছোট্ট এক পরী। আজ থেকে একুশ বছর আগে কার এক্সিডেন্টে তৌসিফ ও ফারিয়া মারা যায়। তবে সেই এক্সিডেন্টে কোনো এক বছর বয়সী শিশুর মৃতদেহ পাওয়া যায় নি। সেই ধাক্কা সহ্য করতে না পেরে তৌহিদের মা তৎক্ষণাৎ স্ট্রোক করে। এভাবেই গোছানো পরিবারটা হুট করেই ভেঙে যায়। আর তাদের সেই ছোট্ট মেয়েটিও তখন থেকেই নিখোঁজ। কেউ আর তার সঠিক খোঁজ পায় নি।
"স্বজনী, প্রিয়ন্তী উঠেছে ঘুম থেকে?"
শাশুড়ীর প্রশ্নের জবাবে স্বজনী বলল,
"না, মা। ও এখনও ঘুমাচ্ছে।"
বৃষ্টি চৌধুরী টেবিলে নাস্তা পরিবেশন করতে করতে রাগান্বিত কন্ঠে বলল,
"এই মেয়ে কবে একটু সুধরাবে? কোনোদিনই না। আর শুধরাবেই বা কেনো? বাবা-ভাই তো মাথায় তুলে রেখেছে উনাকে।"
শাশুড়ীর কথা শুনে স্বজনী দ্রুত উপরে উঠে গেলো প্রিয়ন্তীকে ডাকতে। তৌহিদ চৌধুরী মুখের উপর খবরের কাগজ রেখে পড়ছে। তিনি খবরের কাগজ পড়া ছাড়াই মূলত মুখ ঢাকার কাজে এটাকে ব্যবহার করছেন। সকাল সকাল বউয়ের ঝাড়ি শুনে মুখে হাসি আসা সমূহ বিপদের লক্ষ্মণ!
এতক্ষণে পিয়াস বাড়িতে প্রবেশ করলো। মাকে রাগে গজগজ করতে দেখে ঠান্ডা গলায় প্রশ্ন করলো,
"রেগে আছো কেনও মা? কিছু কি হয়েছে?"
"কিছু না হওয়ার মতো কথা? সবাই উঠে কই কই চলে যাচ্ছে, আর তোর বোন এখনও ঘুম থেকেই উঠলো না।"
পিয়াস বলল,
"ঘুমাচ্ছে ঘুমাক। আজ তো ভার্সিটি বন্ধই।"
"ভার্সিটি? ভার্সিটি এই মেয়ে ঘুমিয়ে ঘুমিয়েই পার করুক।"
পিয়াস মা-কে ঠান্ডা করতে বলল,
"রেগে যাচ্ছো কেনও? স্বজনী গিয়েছে তো ডাকতে। উঠলে চলে আসবে।"
******
স্বজনী রুমে প্রবেশ করে জানলার পর্দা সরিয়ে ফেলল। আলো সোজা পড়লো প্রিয়ন্তীর মুখশ্রীতে। রোদের আলোয় সেই মায়াময় মুখশ্রী যেনও এক রোদ্রময়ী!
স্বজনী ডাকলো তাকে,
"প্রিয়ন্তী, উঠো। মা ডাকছে।"
প্রিয়ন্তী আধো ঘুমে পাশ ফিরলো। সেভাবেই বলল,
"আরেকটু ঘুমাই ভাবি। একটু পর উঠবো।"
স্বজনী চোখ পাকিয়ে বলল,
"উঠলে তুমি? মা রাগারাগি করছে আর তোমার উঠার নাম নেই?"
এবার প্রিয়ন্তী উঠে বসলো। মাথার নিচের বালিশটা কোলে নিয়ে ঘুমঘুম চোখে তাকালো স্বজনীর দিকে। তারপর দুষ্টুমীভরা কন্ঠে বলে উঠল,
"ভাইয়ার সাথে ঝগড়া করেছো নাকি? তার রাগ কি আমার উপর ঝাড়ছো, ভাবি?"