প্রিয়ার ভীত মুখশ্রী দেখেও আয়ানের মধ্যে কোনো ভাবাবেগ হলো না। সে চোয়াল শক্ত করে এখনও ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। প্রিয়া আবারও বলল,
"আপনি এখানে কেনও এসেছেন? অচেনা একটা মেয়ের ঘরে এভাবে না জানিয়ে ঢুকতে লজ্জা করলো না? এখনই বের হন আমার ঘর থেকে।"
আয়ান দাঁতে দাঁত চেপে উত্তর দিলো,
"একা যেতে আসি নি আমি। তোমাকে নিয়ে যেতে এসেছি।"
আয়ানের কথায় প্রিয়া আরও ঘাবড়ে গেলো। আয়ানের মতিগতি কোনোভাবেই তার মাথায় ঢুকছে না। জিজ্ঞেস করলো,
"আমাকে নিয়ে যেতে এসেছেন মানে? আপনি নিয়ে যেতে চাইলেই আমি যাবো? আমি এখনই সবাইকে গিয়ে বলবো আপনি আমাকে তুলে নিয়ে যেতে চাইছেন।"
বলেই প্রিয়া হাটা দিলো দরজার দিকে। কিন্তু রুম থেকে বের হতে পারলো না। থেমে গেলো আয়ানের গুরুগম্ভীর স্বর পেয়ে।
"লোক জড়ো করতে চাইছো? করতেই পারো। ডেকে দেখাও তোমার ব্যক্তিগত রুমে অন্য এক পুরুষ ঢুকে আছে। এরপর যা হবে তার জন্য আমাকে দায়ী করতে পারবে না।"
আয়ানের কথা শুনে প্রিয়া টলমলো চোখে পিছে ফিরলো। মায়াময় চোখ দুটোতে উঁপচে পড়ছে জল। স্বল্প সময়ে সেই জল কোঁটর ছাড়ালো। কিন্তু আয়ানের ওর উপর কোনো মায়া হলো না। নির্দয়ের মতো হাসি হাসছে সে। মনে হচ্ছে প্রিয়ার চোখের জল তাকে তৃপ্তি দিচ্ছে!
প্রিয়া বুঝতে পেরেছে আয়ান তাকে তুলে নিয়ে যাবে। আর ও না গেলে সকলের সামনে ওর সম্মানহানি করবে। কিন্তু আয়ানের এই কাজের পেছনের কারণ সে খুঁজে পাচ্ছে না। কিসের প্রতিশোধ নিচ্ছে সে? যেখানে আয়ানের সাথে কোনো কথাই হয় নি সেখানে শত্রুতার তো কোনো কারণই নেই! মনে মনে হাজারো ভাবনা ভাবলেও মুখ ফুটে একটা শব্দও বের করতে পারছে না প্রিয়া।
আয়ান ওকে চুপচাপ দাঁড়িয়ে কাঁদতে দেখে ওর কাছে এগিয়ে গেলো। হুট করেই প্রিয়ার চোখের কার্ণিশ বেয়ে গড়িয়ে পড়া জলটুকু মুছে ফেলল। তারপর বলল,
"তোমার এই মূল্যহীন চোখের জলে আয়ান আহমেদ খান কোনোদিন গলবে না। তাই শুধু শুধু চোখের জল অপচয় করে কোনো লাভ নেই।"
প্রিয়ার চোখের পানি তবুও বাঁধ মানছে না। শেষ চেষ্টা করে বলল,
"দেখুন, আপনার কোনো হুমকিকে আমি ভয় পাই না। আপনি এখনই আমার রুম থেকে বের হবেন। নাহলে একদম ভালো হবে না, খান সাহেব!"
"রুম থেকে বের হবো তবে তোমাকে নিয়েই।"
প্রিয়া দু'পা পিছিয়ে গিয়ে বলল,
"আমি যাবো না আপনার সাথে। আমি তো এটাই বুঝতে পারছি না, আপনি আমার রুমে কিভাবে ঢুকেছেন?"
"এক তলার বারান্দা দিয়ে রুমে ঢোকা অসম্ভব ব্যাপার নয়। আবার তোমায় নিয়ে বেরিয়ে যাওয়াও অসম্ভব নয়।"
প্রিয়া গলায় জোর আনার চেষ্টা করে বলল,
"একবার বলেছি যাবো না তো যাবো না।"
আয়ান আর কিছু না বলে প্রিয়ার মুখ চেপে ধরলো। প্রিয়া কিছুক্ষণ নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে নিস্তেজ হয়ে পড়লো। অত:পর আয়ান প্রিয়াকে তুলে নিয়ে পিছন দিক দিয়ে বেরিয়ে গেলো। গাড়িতে বসিয়ে নিজেও বসলো তার পাশে।
আয়ানের এতক্ষণের কাজে সাহায্য করেছে তার বন্ধু সাহিদ। সাহিদের সাহায্যেই আয়ান প্রিয়াকে শেষ পর্যন্ত নিয়ে আসতে পেরেছে। কিন্তু আসার আগে প্রিয়ার ড্রেসিং টেবিলের উপর একটা চিরকুট ফেলে আসতে ভুলে নি।
প্রিয়ার হাতের লেখা নকল করে চিরকুটটা লিখতেও আয়ানকে কম ঝামেলা পোহাতে হয় নি। সায়মার বান্ধবি হওয়ার সুবাদে তাদের মধ্যে নোট প্রায়ই আদান-প্রদান হয়। কাল সারা-সায়মা হলুদের অনুষ্ঠানে এই বাড়িতেই ছিলো। সেসময় আয়ান সায়মার রুম তছনছ করে ফেলেছে শুধু প্রিয়ার হাতের লেখা নোট খুঁজতে। শেষ পর্যন্ত তাকে নিরাশ হতে হয় নি। এরপর হাতের লেখা নকল করার জন্য তো সাহিদ ছিলোই!
আয়ান গাড়িতে বসার পর সাহিদ এসে বসলো ড্রাইভিং সিটে। পরপর আয়ান তাকে নির্দেশ দিলো,
"কাজি অফিসে চল।"
সাহিদ অবাক হয়ে বলল,
"এত তাড়াহুড়ো ভাই তোর? এখনই বিয়ে?"
আয়ান বিরক্ত হয়ে বলল,
"কথা না বাড়িয়ে চল। এই মেয়ে একবার হুশে আসলে ওর মুখ ননস্টপ চলতে থাকবে। বিরক্তিকর একটা মেয়ে!"
"অন্যের সংসার বাঁচাতে শেষে নিজের অপছন্দের মেয়ে বিয়ে করবি?"
আয়ান সাহিদের কথায় কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
"পছন্দের মেয়ে আদ্যো কেউ হবে কি না, আমি জানি না। এমনিতেও আয়েশার সাথে আমার বিয়ে ঠিক করেছে আমি তাকেও পছন্দ করি না। তাই পছন্দ-অপছন্দ না ভেবে ফরজ কাজ করতে হয় বলেই করে ফেলি বিয়েটা!"
আয়ানের কথায় সাহিদ মাথা দুলিয়ে সায় দিলো। তারপর উত্তেজিত হয়ে বলল,
"কিন্তু দোস্ত, বিয়ে করতে হলে তো কমপক্ষে দুইজন সাক্ষী লাগবে। একজন আমি। আরেকজন কে?"
সাহিদ যতটা উত্তেজিত আয়ান ততটাই শান্ত। সিটে গা এলিয়ে দিয়ে নিরুৎসাহিত হয়ে বলল,
"সায়মাকে ডেকে নিবো।"
*******
বিয়ে বাড়িতে ছোট-খাটো বিষয় নিয়ে ঝামেলা হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। সেরকমই হঠাৎ বাইরে থেকে এক লোক এসে ডেকোরেশন নিয়ে অভিযোগ করলো। বিয়ে বাড়ির মানুষের ভিড়ে লোকটাকে ঠিক-ঠাক না চিনলেও অভিযোগটাকে আমলে নিলো। এজন্যই হঠাৎ এই জটলা।
ঝামেলা শেষে সারা-সায়মা রুমে ঢুকে প্রিয়াকে খুঁজে পেলো না। হঠাৎ এইভাবে তার হাওয়া হয়ে যাওয়া নিয়ে তারা অনেকটাই ঘাবড়ে গেলো। তারপর সাত-পাঁচ না ভেবে হেনা বেগমকে রুমে ডেকে সমস্ত ঘটনা জানালো।
হঠাৎ সারার চোখে পড়লো ড্রেসিং টেবিলের উপর রাখা চিরকুটটা। কিছু একটা আন্দাজ করে সে চিরকুটটা খুলে পড়া শুরু করলো,
"অনেক ভেবে দেখলাম বিবাহিত এক নারীর সংসারে তৃতীয় ব্যক্তি হয়ে যাওয়াটা ঠিক হবে না। সামির বিবাহিত ও ওর একটি মেয়েও আছে। এজন্যই আজ এই বিয়েটা ভেঙে আমি চলে যাচ্ছি।"
বিস্ময়তার আতিশয্যে সারার হাত থেকে চিরকুটটা টুপ করে পড়ে গেলো। হতবিহ্বলতায় প্রশ্ন করলো,
"সামির বিবাহিত!"
কথাগুলো সায়মার কানে পৌছাতেই তার কথা থেমে গেলো। অবাক চোখে সারার দিকে তাকিয়ে বলল,
"কি বললি?"
সারা এখনও স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হেনা বেগম সত্যিটা বেরিয়ে যাওয়ায় কাচুমাচু করছেন। ভেবে রেখেছেন এখন এমন একটা ভাব করবেন যেনও তিনি কিছুই জানেন না।
সারার পায়ের কাছে পড়ে থাকা চিরকুটটা হাতে তুলে নিলো সায়মা। পুরোটা পড়ে সে নিজেও বাকরুদ্ধ। তবুও নিজেকে ধাতস্থ করে রাগান্বিত কন্ঠে হেনা বেগমকে জিজ্ঞেস করলো,
"সামির বিবাহিত। ওর একটা বাচ্চাও আছে। আর আপনি না জেনে-বুঝে প্রিয়াকে তার সাথে বিয়ে দিতে চাইছিলেন?"
হেনা বেগম কান্নার অভিনয় করে বললেন,
"আমি তো জানতাম না সামির বিবাহিত! আমার মেয়েটা কই গেলো? এবার আমি ওকে ছাড়া কি করে থাকবো?"
হেনা বেগমের কান্নাকেও সায়মা বিশেষ পাত্তা দিলো না। বরযাত্রী আসার সময় হয়েছে। সে প্রস্তুতি নিলো কিছু কড়া অপমানের।
*******
না। বরযাত্রী খুব বেশি সংখ্যক মানুষ নয়। শুধু সামির ও তার মা-খালা, ও অল্প কিছু মানুষ। সামির বিবাহিত কথাটা বিয়ে বাড়ির সবার কানে পৌছে গেছে। বিয়েটা হবে না জেনে একে একে সবাই বাড়ি ছেড়েছে। সায়মা খুব বুদ্ধিমত্তার সাথে পরিস্থিতি সামলেছে। শুধু সামির বিবাহিত কথাটাই জানিয়েছে সবাইকে। প্রিয়া যে নিজের রুম থেকে হাওয়া সেটা কাউকে জানায় নি। এমনকি কাউকে ওই রুমেও ঢুকতে দেয় নি। সবাই চলে যাওয়ার পর সায়মা থমথমে মুখে অপেক্ষা করছিলো বরযাত্রীদের।
অবশেষে তার অপেক্ষার সমাপ্তি ঘটিয়ে এলো সামির ও তার মা-খালা। সায়মা এতক্ষণের থমথমে মুখে হঠাৎ হাসি ফুটিয়ে তুললো। সাদরে আপ্যায়ণ করে বসালো ড্রইং রুমের সোফায়। সামিরের মা যখন বলল,
"বউ কোথায়? নিয়ে আসুন তাকে।"
সায়মা হাসিমুখে জবাব দিলো,
"বউ? সামির ভাইয়ার বউকে খুঁজছেন? সে তো বোধহয় আপনাদের বাড়িতেই আছে। নাকি মায়ের বাড়িতে রেখে এসেছেন, মিস্টার সামির?"
সায়মার এহেন জবাবে তিনজনই হতবাক হয়ে গেলো। তাদের এমন মুখশ্রী দেখে সায়মা হাসলো। পরপর অবাক হওয়ার ভান করে বলল,
"কি হলো? কিছু বলছেন না যে? আবার মেরে কোথায় পুঁতে রেখে এসেছেন নাকি?"
এবার সামিরের মা রেগে বলল,
"এসব কি বলছো তুমি? আমার ছেলে বিয়ে করতে এসেছে। অপমান হতে নয়।"
সায়মা তাচ্ছিল্য করে বলল,
"অপমান? যেই মানুষ ঘরে বউ-বাচ্চা রেখে আরেকজনকে বিয়ে করতে আসে সে আদ্যো সম্মানের যোগ্য?"
সামির আমতা-আমতা করে বলল,
"কিসব বলছো তুমি? আমার বউ-বাচ্চা কোথেকে এলো?"
"সেটাও ভুলে গেছেন? শুনুন মিস্টার, অপমানের এখনও কিছুই করি নি আমি। আমি অপমান শুরু করলে আশেপাশে আপনার সম্মানের স ও খুঁজে পাবেন না। আমরা আপনার কাছে প্রিয়াকে বিয়ে দিবো না। এই মুহুর্তে এই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান।"
সামির রেগে উঠে দাঁড়ালো। বলল,
"বিয়ে দিবেন না মানে? প্রিয়াকে বিয়ে করার জন্য আমি দুই লক্ষ টাকা দিয়েছি!"
সায়মা বিস্মিত হয়ে বলল,
"দুই লক্ষ টাকা দিয়েছেন মানে? এই মেয়েটা কি বাজারে কিনতে পাওয়া জিনিস যে আপনি দুই লক্ষ টাকার বিনিময়ে কিনে নিবেন?"
সামির হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে বলল,
"যার মেয়ে তাকেই জিজ্ঞেস করো সে কি! প্রিয়াকে না পেলে আমার দুই লক্ষ টাকা দিয়ে দাও।"
এতক্ষণে পুরো ঘটনা সায়মার বোধগম্য হলো। বুঝতে পারলো হেনা বেগমের কান্নাটা ছিলো অভিনয়ের। সে ঘৃণিত দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো হেনা বেগমের উপর। তারপর ধুপধাপ পা ফেলে রুমের বাইরে চলে গেলো। সারাও গেলো তার পিছু পিছু।
সায়মা নিজের ভিতরকার ক্রোধ দমন করার চেষ্টা করছে। এই মুহুর্তে আয়ানের সাহায্য নেয়া ছাড়া কিছুই করার নেই। সারা এসে দাঁড়ালো তার পাশে। অত:পর জিজ্ঞেস করলো,
"কি করবো এখন আপু? দুই লক্ষ টাকা কি করে ফেরত দিবো?"
"এই বিপদ থেকে শুধুমাত্র আয়ান ভাইয়াই বাঁচাতে পারে।"
সায়মা আয়ানকে ফোন দিলো। কিছুক্ষণ বাদেই রিসিভ হলো সেই ফোন। আয়ান বোনের ফোন দেখে মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করলো,
"কেমন খাচ্ছিস বিয়ে?"
সায়মা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
বিয়েটা ভেঙে গেছে ভাইয়া। কিন্তু এই মুহুর্তে দুই লক্ষ টাকা দরকার আমার। দিতে পারবে প্লিজ?"
আয়ান এই ফোন কলটার জন্যই প্রস্তুত ছিলো। জানতো সায়মা এই কাজটাই করবে। এজন্য দুইলক্ষ টাকাও প্রস্তুত রেখেছে। বলল,
"বিয়ে ভাঙার জন্য দুই লক্ষ টাকা? আমি তো জানতাম, বিয়ে হলে যৌতুক নেয়। সামির কি বিয়ে ছাড়াই যৌতুক নিচ্ছে?"
সায়মা বলল,
"ভাইয়া, সে অনেক কাহিনি! এখন প্লিজ টাকাটা পাঠাও। আমি পুরোটা তোমায় পরে বুঝিয়ে বলব।"
আয়ান বলল,
"ওকে! দিবো আমি দুই লক্ষ টাকা। তুই ওখানের ঝামেলা শেষ করে এসে পড়বি কাজী অফিস!"