স্নিগ্ধ প্রেমের মায়া

পর্ব - ১০

🟢

শিশিরভেজা গাছের পাতাও বাতাসে অল্প অল্প নড়ছে। রাত বেড়ে চলেছে সময়ের নিজস্ব গতিতে। রুমের জানলা বন্ধ থাকায় সেই শীতল বাতাস ঘরে প্রবেশ করছে না।

আয়ান নিজের মতো বলেই যাচ্ছে। এই সময়টুকুতে সে বিছানার দিকে এক পলকও তাকায় নি। তাকালে হয়তো নিস্তেজ প্রিয়াকে দেখতে পেতো। কথা শেষে আয়ান যখন পিছে ঘুরলো তখন প্রিয়াকে বিছানায় এলোমেলো ভাবে শুয়ে থাকা দেখলো। ভ্রু কুঁচকে ভাবলো,

"মেয়েটা কি ঘুমিয়ে গেলো? নাকি সত্যি প্রকাশ হয়ে যাচ্ছে বলে ঘুমানোর ভান ধরেছে?"

আয়ান নি:শব্দে এগিয়ে গেলো বিছানার কাছে। প্রিয়ার পাশে বসে আস্তে করে ডাকলো,

"প্রিয়া।"

কিন্তু প্রিয়ার মধ্যে কোনো হেলদোল নেই। সে সেভাবেই শুয়ে আছে। আয়ান এবার কিছুটা ঘাবড়ে গেলো। প্রিয়ার গাল চাপড়ে উঁচু আওয়াজে ডাকলো,

"প্রিয়া!"

এবারও প্রিয়ার মধ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই দেখে আয়ান বুঝতে পারলো ও অজ্ঞান হয়ে গেছে। এত রাতে কি করবে ভেবে কিছুটা বিচলিত হয়ে পড়লো। একবার চিন্তা করলো বাসার কাউকে ডাকবে কিন্তু বিয়ের প্রথম রাতেই অজ্ঞান হয়ে গেছে শুনলে কি ভাববে সবাই? এই ভেবে ভাবনা বাতিল করলো আয়ান। নিজেই ওকে ঠিকঠাক বালিশে শুইয়ে দিলো। কম্বল টেনে ঢেকে দিলো ওর সমস্ত শরীর। তারপর গ্লাস থেকে পানির ছিঁটা দিলো ওর মুখে। সাথে আস্তে আস্তে ডাক দিয়ে জ্ঞান ফিরানোর চেষ্টা করলো।

খানিকবাদেই চোখ পিটপিট করে সামনে তাকালো প্রিয়া। হঠাৎ জ্ঞান ফেরায় শূণ্য মস্তিষ্কে কিছু প্রবেশ করলো না। পরপর আয়ানকে ওর এতটা কাছে দেখেই ধড়ফড়িয়ে উঠে বসলো ও। আমতা আমতা করে বলল,

"আপনি? আপনি এখানে কি করছেন? আমার সামনে কি করছেন?"

প্রিয়ার একের পর এক প্রশ্নে আয়ান প্রচন্ড বিরক্ত হলো। ধমক দিয়ে বলল,

"চুপ করবে তুমি? মুখটা চলতে শুরু করলে থামার কোনো নাম নেই। আমার রুম আমি থাকবো না তো কি অন্য কেউ থাকবে?"

প্রিয়া যেনও আকাশ থেকে পড়লো। বলল,

"আপনার রুম, আপনি থাকবেন ভালো কথা। আমি কেনও আপনার রুমে আছি? ওহ! ভালো কথা মনে পড়েছে। আপনি তো আমাকে তুলে এনেছিলেন। এই, আমি আপনার মতো গন্ডারের সাথে শুতে পারবো না। চলে গেলাম এই রুম থেকে!"

প্রিয়ার অবিরাম বকবকানিতে আয়ানের বিরক্তি আকাশচুম্বী। কোনোমতো রাগ কন্ট্রোল করে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

"একবার বলেছি না চুপ করতে? মুখটা বন্ধ করবে নাকি স্কচটেপ এনে তোমার মুখে লাগাতে হবে?"

আয়ানের রাগ বুঝতে পেরে প্রিয়া মিইয়ে গেলো। মাথা নিচু করে বলল,

"চুপ আছি তো আমি। তাও বকছেন কেনও?"

আয়ান কটমট করে বলল,

"কোন দুঃখে যে তোমার জ্ঞান ফেরাতে গিয়েছিলাম সেটাই আমার মাথায় আসছে না! এতক্ষণ তো দিব্যি সব ঠান্ডা ছিলো। আর জ্ঞান ফিরতেই শুরু করেছো? লিসেন, এটা আমার রুম। আমি কোথায় যাবো না। আর তুমিও এই রুমের বাইরে যাবে না। চুপচাপ এখানেই ঘুমাও।"

প্রিয়া বিড়বিড় করে বলল,

"অসম্ভব! আমি মানুষ হয়ে আস্ত এক নিমগাছের সাথে কি করে শুবো?"

আস্তে করে বললেও কথাটা ঠিকই আয়ানের কানে পৌঁছেছে। এমন অদ্ভুত উপমা শুনে মস্তিষ্ক তেঁতে গিয়েছে প্রিয়ার উপর। কিন্তু কিছু বলল না। জানে এখন কিছু বলা মানেই প্রিয়ার মুখ খোলার আরেকটা সুযোগ করে দেয়া। আয়ান আবারও সেই সুযোগ দেওয়ার মতো ভুল করবে না। তাই কথা না বাড়িয়ে প্রিয়ার পাশে শুয়ে পড়লো। কম্বলটা গায়ে টেনে নিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বলল,

"ঘুমালে ঘুমাও। আর না ঘুমালে রাত জেগে মশা তাড়াও। সরি, আমার রুমে তো আবার মশা নেই। তুমি বারান্দায় গিয়ে বাইরের মশাগুলো মারতে পারো। তবে তোমার জন্য আলাদা খাট কিংবা আলাদা রুম, কোনোটারই ব্যবস্থা করতে পারবো না আমি। আমার রুমে, আমার খাটে, আমার সাথেই তোমাকে ঘুমাতে হবে। আর ভয়ের কিছু নেই। আমার নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ আছে।"

বলে আয়ান পাশ ফিরে শুয়ে পড়লো। প্রিয়া উপায়ান্তর না দেখে মাঝে কোলবালিশ রেখে শুয়ে পড়লো। বিড়বিড় করে আওড়ালো,

"যেই না এক মানুষ, তার আবার নিয়ন্ত্রণ! অনুভূতি থাকলে না নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন আসবে? এমন নিমগাছের আবার অনুভূতি হয় নাকি?"

*******

ভোরের আকাশে সূর্য উঁকি দিচ্ছে অনেকক্ষণ। কিন্তু কুয়াশার চাঁদরে আবৃত সকালে কিছুটা দূরের জিনিসও দেখা যাচ্ছে না। প্রিয়ার ঘুম ভাঙলো একদম সকালে। আয়ান তখনও গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। প্রিয়া আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসলো বিছানায়। একবার ভেবে নিলো রাতে আয়ানের বলা কথাগুলো। পরপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো আয়ানের উপরে। বিয়ে হয়েছে গোটা একটাদিন হয়ে গেলেও আয়ানকে ভালোভাবে দেখা হয় নি। যে মানুষটা ওর স্বামী তাকে একটু ভালোভাবে দেখার অধিকার তো তারও আছে! জানে কিছু ভুল বোঝাবুঝির জন্য আয়ান ওকে ঘৃণা করছে। কিন্তু যেদিন জানবে প্রিয়া নির্দোষ ছিলো, সেদিন কি ওকে মেনে নিবে না? আয়ান যেদিন সত্যিটা জানতে পারবে সেদিন কি সব ঠিক হবে না? সে কি পাবে না সপ্নের মতো সেই সংসার? কিন্তু সংসারটা যে আয়ানের সাথে হবে এটা একদমই ভাবে নি কখনো! ভাববে কি করে? আয়ানের গম্ভীর স্বভাবের জন্য যে একদমই পছন্দ ছিলো না ওকে। কিন্তু এখন যে নব্য অনুভূতির প্রজাপতিরা ডানা মেলতে শুরু করেছে। এটাই কি তবে পবিত্র সম্পর্কের টান?

প্রিয়া এক দৃষ্টিতে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে আয়ানকে। ঘুমের মধ্যে এলোমেলো চুলে কপাল ঢেকে রয়েছে। গালভর্তি চাপদাড়ি। জোড়া ভ্রুর নিচে চোখগুলো দেখে প্রিয়া অবাক স্বরে আওড়ালো,

"ওমা! এর চোখগুলো কি ছোট ছোট! আমার মতো বড় বড় চোখের মেয়ের কি না ছোট চোখওয়ালা জামাই জুটলো?"

ঘুমন্ত অবস্থায় ভীষণ নিষ্পাপ দেখাচ্ছে আয়ানের মুখশ্রী। প্রিয়া চোখ ফিরিয়ে নিলো আয়ানের দিক থেকে। অন্যদিকে তাকিয়ে মুখ বেঁকিয়ে বলল,

"একে দেখে কোন হত*চ্ছাড়া বলবে রাতে আমাকে এত ধমকা-ধমকি করেছে? সারাদিন ঘরের মানুষের সামনে আমার বউ, আমার বউ করে লজ্জায় ফেলেছে। আর রাতে এসে কথা শুনিয়ে দিলো? পল্টিবাজ লোক কোথাকার!"

ভাবতে ভাবতে প্রিয়া উঠে পড়লো বিছানা থেকে। ঠিকঠাক ঘুম না হওয়ায় মাথাটা ভার ভার লাগছে। এজন্য গোসলের সিদ্ধান্ত নিলো। সায়মা অলরেডি কাল কিছু ড্রেস আয়ানের আলমারিতে রেখে গিয়েছে। প্রিয়া সেখান থেকে ড্রেস নিতে গিয়েই দেখলো সব শাড়ি। নতুন ড্রেস না থাকায় সব শাড়িই আলমারিতে ঢুকিয়ে রেখে গিয়েছে। প্রিয়া বাধ্য হয়ে আকাশী রঙের একটা শাড়ি নিয়েই ঢুকলো ওয়াশরুমে।

প্রিয়া শাওয়ার নিয়ে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়েই দেখলো আয়ান খাটের এক সাইডে মুখ অন্ধকার করে বসে আছে। প্রিয়া বের হতেই আয়ান ওর দিকে তাকালো। অবচেতন মন জানান দিলো, শুভ্রপরী আকাশের রঙ ধারন করেছে আজ। কিন্তু আয়ান সেসবে পাত্তা দিলো না।

প্রিয়া জানে আয়ান ওর দিকে ঘুরেও তাকাবে না। তাই কোনোরুপ অস্বস্তি ছাড়াই বারান্দায় টাওয়েল শুকিয়ে এসে আয়ানের সামনা-সামনি বসলো। ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো,

"সকালে তো আকাশেও অন্ধকার কেটে আলোর দেখা পাওয়া যায়। তাহলে আপনি কেনও সকাল সকাল মুখ অন্ধকার করে বসে আছেন?"

আয়ান প্রিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,

"সকাল সকাল গোসল করে কি প্রমাণ করতে চাইছো? আমরা সত্যি সত্যি স্বামী-স্ত্রী? সকাল সকাল গোসল করে সবার সামনে ঘুরে বেড়ালে সবাই কি ভাববে, ভেবেছো?"

ইঙ্গিতপূর্ণ কথায় প্রিয়ার চোখ ছানাবড়া। অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সে আয়ানের দিকে। আয়ানের মুখে এমনকিছু শুনবে এটা কোনোদিনও আশা করে নি। শেষে কি না গোসলটা নিয়েও খোঁটা দিলো! তাও কি ভয়ংকর ভাষায়!

প্রিয়াকে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থাকতে দেখে আয়ান বিরক্ত কন্ঠে বলল,

"আমার কি শিং গজিয়েছে যে এভাবে আমার দিকে তাকিয়ে আছো? নাকি জীবনে প্রথমবার দেখছো?"

প্রিয়া নজর সরিয়ে ফেলল আয়ানের উপর থেকে। নাক-মুখ কুঁচকে বলল,

"ছিহ! কি ভাষা! কিসব বলে যাচ্ছেন আপনি?"

আয়ান নিরুদ্বেগ উত্তর দিলো,

"যা সত্যি তাই তো বলেছি। সবার সামনে এটাই কি প্রমাণ করতে চাইলে তুমি? যাক, ভালো সিদ্ধান্ত। কমপক্ষে এতটুকু তো বুঝেছো তোমার আমার মধ্যে যা আছে তা শুধুই এই চার দেয়ালের মাঝে। এর বাইরে সবাই জানবে তুমি আমার স্ত্রী। আর আমাদের মধ্যে সব স্বাভাবিক!"

পুরো কথা বুঝতে পেরে লজ্জায় পড়ে গেলো প্রিয়া। তাও আয়ান বলেই যাচ্ছে। শেষে সইতে না পেরে প্রিয়া চেঁচিয়ে উঠলো,

"চুপ করুন আপনি! কিসব আবোল-তাবোল বকে যাচ্ছেন? আমি এমন কিছু ভেবে গোসল করি নি। বাড়ি যাবো বলে গোসল করেছি! আর আপনি কি ভাবলেন? ছিহ!"

আয়ান বলল,

"আশ্চর্য! ছি ছি করার কি আছে? স্বাভাবিক কথাই তো বলেছি। আর বাড়ি যাবে সেটা আগে বললেই হতো। যেও তোমার বাড়ি। প্রয়োজনে সায়মাকে নিয়ে যেও। তবে আমাকে নিয়ে যাওয়ার চিন্তা করো না।"

প্রিয়া বিড়বিড় করে বলল,

"আপনাকে নিয়ে যেতেও চাই না। যুদ্ধটা ওখানেই শেষ করবো আজ।"

উত্তর না পেয়ে আয়ান আবারও বলল,

"শুনেছো কি বলেছি?"

বলতে বলতে আয়ান বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। প্রিয়া মাথা নাড়িয়ে আস্তে করে বলল,

"হু। কিন্তু একটা কথা ছিলো.."

"ভণিতা না করে কি বলার সোজাসুজি বলে ফেলবে।"

প্রিয়া নিজেও উঠে দাঁড়ালো। ভণিতাহীন বলল,

"আমি সায়মাকেও নিবো না। একাই যাবো ওই বাড়িতে। আমার জিনিসপত্রগুলো নিয়ে আসার জন্য।"

আয়ান বলল,

"ঠিক আছে। তাহলে গাড়ি নিয়ে যেও। ড্রাইভারকে বলে দিবো তোমায় নিয়ে যেতে।"

বলে আয়ান চলে গেলো সেখান থেকে। প্রিয়া দাঁড়িয়ে থেকে ভাবলো,

"জিনিসপত্র তো আনবোই। আর বোঝা-পড়া করে আসবো সবকিছুর। কেনও নিলো মা, আমার জীবন ধ্বং*স করার পদক্ষেপ?"

স্নিগ্ধ প্রেমের মায়া গল্পটি তিয়াশা চৌধুরী-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক ও রোমান্টিক থ্রিলার গল্প