স্নিগ্ধ প্রেমের মায়া

পর্ব - ৪৩

🟢

সন্ধ্যা নেমেছে বেশ কিছুক্ষণ৷ তারা ঝলমল আকাশে উঁকি দিচ্ছে চাঁদ। ধীরে ধীরে ঘনিয়ে এসেছে বিদায়ের প্রহর। বৃষ্টি কোনোদিনও আশা করে নি, উনি প্রিয়াকে খুঁজে পাবে। কিংবা দু'জন মেয়েকে একইসাথে বিদায় দিতে হবে। প্রিয়ন্তীকে ছোটবেলা থেকে বড় করেছে। তাকে যতটুকু কাছে পাওয়া হয়েছে, প্রিয়াকে তার একাংশও পান নি। তবুও ওর প্রতি ভীষণরকম টান অনুভব করেন তিনি। যতটা ভালোবাসা প্রিয়ন্তীর জন্য অনুভূত হয়, ঠিক ততটাই প্রিয়ার জন্যও। হতে পারে তিনি ওকে জন্ম দেন নি, তবুও মেয়ের থেকে কমকিছু ভাবেন নি। তাই হয়তো বিদায়ের সময়ও অন্তরটা ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে তার!

কোটর ধরে উঁপচে আসা জলগুলো বহু কষ্টে সামলাচ্ছেন উনি। ভেতরকার ঝড় সামলে উপরে হাসি হাসি ভাব ধরে রেখেছেন। বিদায় মুহুর্তে দুই ভাইকে বললেন,

"দুই বোনকে নিয়ে যেতে এসেছিলাম আমি। তবে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে দু'জনকেই তোমাদের হাতে তুলে দিয়ে যাচ্ছি। খেয়াল রেখো ওদের।"

স্বজনী প্রিয়াকে জড়িয়ে ধরে বলল,

"কান্নাকাটি করার প্রয়োজন নেই। নতুন জীবন হাসি-খুশিভাবে শুরু করো। যেনও সারাজীবন এইভাবেই হাসি-খুশি থাকতে পারো!"

প্রিয়া চোখ বন্ধ করে চোখের পানি আটকালো। বলল,

"ভাবি, তুমি জানো? আমি কোনোদিন ভাবি নি তোমার মতো মিষ্টি একটা ভাবি পাওয়াও আমার কপালে থাকবে!"

স্বজনী বলল,

"এখন ভাবা-ভাবি বাদ! এখন স্বচক্ষে দেখে নাও। আর শুনো, এখন যাচ্ছো ভালো কথা! তবে জলদিই আমাদের ঢাকা যেও কিন্তু। আমি অপেক্ষায় থাকবো!"

আয়ান ওদের পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই এসব দেখছিলো। স্বজনীর কথার জবাবে বলল,

"দাওয়াত দেয়া লাগবে না। ও দু'দিন পর এমনিই লাফাতে লাফাতে চলে যাবে।"

প্রিয়া বলল,

"আমি লাফাতে লাফাতে যাই, নাকি হাঁটতে হাঁটতে যাই এটা আমার ব্যাপার। আপনাকে নিবো না।"

আয়ান মুখ ভার করে বলল,

"আমার শশুড়বাড়ি যাবে, আর আমাকেই নিবে না? এটা কি ঠিক?"

"হ্যাঁ ঠিক।"

*****

প্রিয়ন্তী এখনও স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এইভাবে বিয়েটা হয়ে যাবে ও ভাবে নি। তবুও মেনে নিতে হচ্ছে৷ কালকের পরিবর্তে আজই সব ছেড়ে যেতে হবে!

বিদায়ের পরমুহূর্তেই হৈ-হুল্লোড়ে মেতে থাকা পুরো বাড়ি শান্ত হয়ে গেলো। গত এক সপ্তাহ পুরো বাড়ি ভরা মনে হচ্ছিলো। আর আজ শুধু দুইজন মানুষের অনুপস্থিতিতে ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। একইসাথে দুইজনের বিদায় হয়ে গেলো। প্রিয়াকে এমনসময় সবাই খুঁজে পেলো, যখন ওকে খুব বেশিদিন নিজেদের কাছে রাখার মতো সুযোগও পেলো না!

********

মেয়ের বাড়ি যতটা নিস্তব্ধ, ছেলের বাড়ি ঠিক ততটাই উৎফুল্ল। ঘরের কোনা কোনা পরিপূর্ণ সবার হাসির শব্দে। পারভীন তো খুশিতে আত্মহারা। তাদের বিয়েটা শুধু দুই যুগলের মিলন ছিলো না, বরং দু'টো পরিবারের বহু বছরের শত্রুতার সমাপ্তি ছিলো। এই জিনিসটার খুশি হয়তো একটু বেশিই। নাসরিন নিজের ছেলে হারালেও দু'টো ছেলে রয়েছে তার। তিনি ভীষণ খুশি একইসাথে দুই ছেলের বউ পেয়ে!

কিছুক্ষণ আগেই ওরা এসে পৌঁছেছে বাড়িতে। প্রিয়ার জন্য নতুন না, তবে প্রিয়ন্তীর জন্য আজ সবকিছু নতুন মনে হচ্ছে! প্রিয়াও বিয়ের আগে এই বাড়িতে আসা-যাওয়া করেছে। তারপর যখন বউ হয়ে এই বাড়িতে এলো তখনকার অভ্যর্থনাটা অন্যরকম ছিলো। আজ প্রিয়ন্তীর ক্ষেত্রেও তাই হচ্ছে। সবার আন্তরিকতায় ভিতরকার অস্থিরতা স্বস্থিতে রুপ নিলো। আকস্মিক ঘটনা ভুলে মেনে নিলো সব।

প্রিয়ন্তীর অস্থিরতা কমলেও, অস্থিরতা কমে নি আয়মানের। সোফায় বসে অস্থির ভঙ্গিতে পা নাড়াচ্ছে, আর আশেপাশে তাকিয়ে খুঁজে ফিরছে সারা-সায়মাকে।

কিছুক্ষণ পর দুইজনকে ড্রইংরুমে আসতে দেখা গেলো। আয়মান দু'জনকে দেখেই ইশারায় কাছে ডাকলো। ওরা আয়মানের সামনে আসার পর আয়মান বেশ সাবধান সায়মার কানে কানে জিজ্ঞেস করলো,

"বাসর ঘর সাজিয়েছিস?"

সায়মার হাসিহাসি মুখের হাসিটা দপ করে নিভে গেলো। সে আয়মানের দিক তাকিয়ে ভীষণ গম্ভীর ভঙ্গিতে বলল,

"তোমার বাসর ঘর কেনও সাজাবো? আজ আয়ান ভাইয়া আর প্রিয়ার বিয়ে ছিলো। আমাদের কাজ ছিলো শুধু ওদের বাসর ঘর সাজানো। তোমার বাসর ঘর সাজানো লাগবে এমন কোনো কথা তো ছিলো না!"

আয়মান গুরুতর ভঙ্গিতে বলল,

"মানে কি? আমার বাসর ঘর সাজাবি না? বিয়ে তো আমি করলাম! ভাইয়ার বিয়ে তো আগেই হয়েছে। আমাদের বিয়ে প্রথমবার হয়েছে, তাই আমাদের বাসর ঘর সাজানোটা বেশি দরকার ছিলো।"

সারা মশা তাড়ানোর ভঙ্গিতে হাত নেড়ে বলল,

"ওটা তো আমাদের সাথে কথা হয় নি। আমাদের সাথে যেটা কথা হয়েছিলো ওইটাই করেছি। তোমার আজ বিয়ে করার কথা ছিলো না। আর আমাদেরও আজকে তোমার বাসরঘর সাজানোর দায়িত্ব দেয়া হয় নি। তাই আমরাও সাজাই নি!"

আয়ান সোফার আরেক সাইডে বসা ছিলো। ওদের আলাপচারিতা দেখে এগিয়ে আসলো আয়মানের দিকে। তাদের কথা শুনার জন্য কান পাঁততেই আয়মান চাঁপা স্বরে বলল,

"আমার বিয়ের কথা ছিলো না, তাই কেউ বাসর ঘর সাজানোর কথা বলে নি। কিন্তু বিয়ে তো হয়েছে তাই না?"

সায়মা বিশ্বজয়ীর ভঙ্গিতে হাততালি দিয়ে বলল,

"সেটাই তো কথা! বিয়ে করার কথা ছিলো কাল। আর তুমি একটা দিন ওয়েট করতে পারো নি? আজকেই বিয়ে করে বউ নিয়ে চলে আসলে? একদিন অপেক্ষা করলে কি হতো? কমপক্ষে আমরা দুইদিন ইঞ্জয় করতে পারতাম!"

আয়মান বিড়বিড়িয়ে বলল,

"তোদের ইঞ্জয়ের জন্য আমি বসে থাকি!"

সারা-সায়মা ওর কথা পরিষ্কার শুনতে পায় নি। সারা ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো,

"কি বললে?"

আয়মান ফটাফট বলে দিলো,

"বললাম বাসর ঘর সাজাবি? নাকি আমার বাসর ঘর সাজাতে আমাকেই যেতে হবে?"

থতমত খেয়ে চুপ হয়ে গেলো সায়মা। ওকে চুপ দেখে মুখ খুলল আয়ান। বলল,

"আরে ভাই, শুধু শুধু ঝামেলা করছিস কেনও? কত রেকর্ড করাবি ওকে দিয়ে? একে তো বড় ভাইয়ের বিয়েতে গিয়ে, বড় ভাইয়ের শালিকাকেই বিয়ে করে নিয়ে এসে পড়েছে। এটা একটা রেকর্ড। এখন নিজের বাসর ঘর নিজে সাজালে আরেকটা রেকর্ড হবে, ওইটাই চাস তোরা?"

সায়মা মুখ বেঁকিয়ে বলল,

"থাক, থাক! ওটার আর দরকার নেই। আমরাই যাচ্ছি!"

*******

আয়মান ওর কথা রেখেছে। প্রিয়ন্তীর চলে যাওয়ার আগের রাত্রে বলেছিলো, গেস্টরুমে ওইটা প্রিয়ন্তীর শেষ রাত। পরবর্তী রাতটা ওর রুমে হবে।" সেই কথা সত্যি হয়েছে। সেইদিনের পর প্রিয়ন্তী আজকের রাতেই এই বাড়িতে থাকবে। তাও আয়মানের রুমে, ওর বউ হয়ে।

সাজানো গোছানো রুমটা ফুল দিয়ে পরিপূর্ণ দেখে দুষ্টু বুদ্ধি খেলে গেলো প্রিয়ন্তীর মাথায়। ভাবলো সব উলটপালট করে ফুল-টুল পরিষ্কার করে ফেলবে। আর আয়মান আসলে বলবে,

"আপনিই তো এরকম অগোছালো পছন্দ করেন না। আপনার প্রয়োজন নিট এন্ড ক্লিন! আমিও রুমের সব ফুল সরিয়ে নিট এন্ড ক্লিন করে ফেলেছি।"

খালি রুমে নিজের ভাবনায় একা একাই হাসলো প্রিয়ন্তী। পরমুহূর্তেই বাতিল করলো ওই ভাবনা। বেচারা এত শখ করে একদিন আগেই অধৈর্য হয়ে বিয়ে করে এনেছে। এখন সব নষ্ট করে দিলে কেমন হবে?

একটা সপ্ন ঠিকঠাক রাখলে আরেকটা ঠিকই বাতিল হলো। সারাদিনের এত ধকলের পর প্রিয়ন্তীর আর ধৈর্যে কুলালো না, লেহেঙ্গাটা পড়ে থাকা। আয়মান আসার আগেই চেঞ্জ করে থ্রি-পিস পড়ে বিছানায় এসে পড়েছে। ঘুমাতে যাবে তার আগ-মুহুর্তেই ঢুকলো আয়মান। দরজা আটকে পিছন ফিরে প্রিয়ন্তীকে দেখেই এক প্রকার চেঁচিয়ে উঠলো আয়মান,

"একি!!"

প্রিয়ন্তী ওর চিৎকার শুনে বিছানা থেকে নেমে এসে ওর সামনে দাঁড়ালো। বিরক্ত কন্ঠে বলল,

"সমস্যা কি? চেঁচাচ্ছেন কেনও? এভাবে রুমে ঢুকেই চেঁচালে তো মানুষ ভাববে বাসর ঘরেই আপনার বউ আপনাকে পিটাচ্ছে। আমাকে খারাপ করতে চাইছেন?"

আয়মান ওর প্রশ্ন অগ্রাহ্য করে বলল,

"তোমার লেহেঙ্গা কই?"

প্রিয়ন্তী অবাক হয়ে বলল,

"এখন আমার লেহেঙ্গা দিয়ে কি করবেন?"

আয়মান হতাশ কন্ঠে বলল,

"তুমি সব চেঞ্জ করে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছো? আরেহ, আজকে আমাদের বাসর রাত। তোমার উচিত ছিলো মাথায় লম্বা ঘোমটা টেনে খাটের মাঝখানে বসে আমার জন্য অপেক্ষা করা। আমি এসে সেই ঘোমটা তুলতাম। আর তুমি কি করলে?"

প্রিয়ন্তী অদ্ভুত দৃষ্টিতে আয়মানের দিক চেয়ে আছে, যেনও কোনো অন্য গ্রহের প্রাণী দেখে ফেলেছে। সেরকম অদ্ভুতভাবেই বলল,

"আপনার কি এটাকে সিনেমা মনে হচ্ছে? সিনেমা-সিরিয়ালের মতো ঘোমটা টেনে বসে থাকতে হবে এটা কোথায় লেখা আছে?"

আয়মান বলল,

"সিনেমা বলে নয়! বাস্তবেও তো ঘোমটা টেনে বসা যায়, নাকি?"

প্রিয়ন্তী ওর কথা উড়িয়ে দিয়ে বলল,

"আরেহ, ওসব সিনেমাতে হয়! বাস্তবেও হয় নাকি?"

আয়মান ভ্রু-তে প্রগাঢ় ভাজ ফেলে বলল,

"বাস্তবে বাসর ঘরে কি হয়, সেটা তুমি কিভাবে জানবে? বাস্তবে তো কখনো বাসর করো নি। আজকেই ফার্স্ট!"

লজ্জার রক্তিম আভা ফুটে উঠলো প্রিয়ন্তীর গালে। লজ্জা লুকাতে আয়মানকে একটা ঝাঁড়ি মেরে বলল,

"এসব কথা বন্ধ করুন তো! একে তো এখনই বিয়ে করো বলে, আগামীকালকের বিয়ে আজকেই করে নিলেন। এখন এসে শুরু করেছেন নিজের নির্লজ্জ মার্কা কথাবার্তা। পারলে কারো থেকে ধার করে হলেও কিছু লজ্জা নিয়েন।"

বলেই প্রিয়ন্তী ঘুরে হাঁটা লাগালো। ওর পিছু পিছু আয়মানও গেলো। প্রিয়ন্তী খাটে বসতেই আয়মান ওর মুখোমুখি বসে গাঢ় স্বরে বলল,

"ওসব আমি নিতে পারবো না। তবে তোমাকে নির্লজ্জতা ধার দিতে পারি। আমার একটু উপকার হবে। নিবে তুমি?"

প্রিয়ন্তী মুখের উপর বলে দিলো,

"ওসব আমি নিতে পারবো না। আপনি যদি লজ্জা না নিতে পারেন তবে আমি কেনও নির্লজ্জতা নিতে যাবো?"

আয়মান উত্তর দেয়ার আগেই প্রিয়ন্তী অন্যদিকে তাকিয়ে বলা শুরু করলো,

"মানুষ কতটা নির্লজ্জ হলে নিজের নির্লজ্জতা ধার দেয়ার কথা ভাবে? আবার ওসব ফালতু জিনিস নাকি মানুষে নিবে!"

আয়মান প্রতিত্তোর না করে বলল,

"চুপ করবে তুমি?"

প্রিয়ন্তী সরাসরি ওর দিক চেয়ে বলল,

"না করবো না। আপনার সমস্যা?"

"হ্যাঁ, অনেক সমস্যা।"

"আপনার সমস্যা থাকলে তো একদমই চুপ করবো না।"

আয়মান মাথা নিচু করে স্বল্প হাসলো। অত:পর জবাব দিলো,

"চুপ করতে না চাইলে আমি চুপ করাতে জানি।"

প্রিয়ন্তী তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ওর দিক চেয়ে বলল,

"আপনি আমাকে চুপ করাবেন? বললেই হলো? আমাকে চুপ করাবে এমন কেউ পয়দা হয় নি!"

আয়মান ভ্রু উঁচিয়ে বলল,

"সিরিয়াসলি বলছি। তুমি দেখতে চাও?"

প্রিয়ন্তী ভেঙচি কেটে বলল,

"কি করবেন? মুখে স্কচটেপ লাগাবেন নাকি?"

আয়মান মুচকি হেসে বলল,

"না। এখনই দেখাচ্ছি!"

প্রিয়ন্তী উত্তরে কিছু বলতে গিয়েও বাধ্য হলো থেমে যেতে। আয়মান সত্যি সত্যি ওকে চুপ করিয়ে দিয়েছে। নিজ ওষ্ঠ দ্বারা চেপে ধরেছে ওর অধরদ্বয়। বিস্ময়ে কয়েকবার পল্লব ঝাপটে চোখ বন্ধ করে ফেলল প্রিয়ন্তী৷ হৃৎপিণ্ড অস্বাভাবিক ভাবে লাফাচ্ছে, যেনও এক্ষুণি বেরিয়ে আসবে বাইরে। আয়মান প্রিয়ন্তীর কোমড় চেঁপে কাছে আনলো। বাধা দেয়ার প্রচেষ্টা প্রিয়ন্তী করে নি। ওর হাত চলে গেছে আয়মানের চুলের ভাজে। আলতো হাতে খামচে ধরেছে সেথায়। আস্তে-আস্তে কাছে আসতে শুরু করলো দুইজন। অনেকটা কাছে। একে-অপরের হৃৎস্পন্দন পুরোপুরি উপলব্ধি করার মতো কাছে। স্বস্তি ছেড়ে অস্থিরতা ঘিরে ধরলো দু'টো মানুষের মনে!

********

মধ্যরাতে ঘুম ভেঙেছে স্বজনীর। উঠে দেখলো পিয়াস পাশে নেই। রুমের আশ-পাশ তাকিয়ে উঠে বসলো বিছানায়। কোথাও নেই সে! ঘুমে ঢুলুঢুলু চোখ ডলে ঘুম হটানোর চেষ্টা করলো স্বজনী। বারান্দার দরজার দিকে তাকিয়ে দেখলো, দরজা খোলা। পিয়াস সেখানে আছে ভেবে সেও বিছানা ছেড়ে বারান্দায় গিয়ে উপস্থিত হলো। হাই তুলতে তুলতে বলল,

"এত রাতে তুমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছো? ঘুমাচ্ছো না কেনও?"

পিয়াস স্বজনীর উপস্থিতি টের পেয়ে ওর দিক ঘুরে দাঁড়ালো। বলল,

"আমি তো মাত্রই এসে একটু দাঁড়ালাম। তুমি ঘুম থেকে উঠে এলে কেনও?"

স্বজনী বলল,

"তোমাকে পাশে না দেখেই তো উঠে এলাম। ঘুমাবে না? নাকি এখানে দাঁড়িয়েই বোনদের কথা ভাববে?"

পিয়াস চমকিত হয়ে বলল,

"তোমাকে কে বলল আমি ওদের কথা ভাবছি?"

স্বজনী বলল,

"এক বছর, তোমার সংসার করছি। এতটুক চিনবো না?"

পিয়াস মুচকি হেসে ওকে কাছে টেনে নিলো। বলল,

"হ্যাঁ তাই তো! আমার বউ তো আমাকে রন্ধ্রে রন্ধ্রে চিনে। শুধু মেয়েদের দেখলে জেলাসিতে উল্টোপাল্টা বলা শুরু করে, তাই না?"

ঘুম ছুটে গেছে স্বজনীর। এখন খোলা বারান্দার রাতের হিমেল বাতাসে অনুভব করছে মুহূর্তটুকু। বলল,

"কি ভাবছিলে ওদের কথা? কিভাবে সব হয়ে গেলো? নাকি ঢাকা পৌঁছে ওদের আর পাবে না, এই কথা?"

পিয়াস বলল,

"উহু। আমাদের বাড়িতে ওদের না পাওয়ার বিষয়টা নিয়ে আমার কোনো আফসোস থাকবে না। আমার বিশ্বাস আমার বোনেরা সঠিক জীবনসঙ্গী খুঁজে পেয়েছে। ওরা সুখে থাকলে, এর থেকে বেশি আর কি চাওয়ার থাকে আমার?"

স্বজনী সন্দেহী হয়ে বলল,

"সত্যিই এটা ভাবছো না? তাহলে কি ভাবছো?"

পিয়াস দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

"যা হয়ে গেলো তাই ভাবছি। যেদিন থেকে জানতে পেরেছি প্রিয়া আয়ান ভাইয়ার বউ হয়েছে, আমার একটাই চাওয়া ছিলো। দুই পরিবারের শত্রুতা যেনও শেষ হয়ে যায়। যখন জানলাম আয়মান প্রিয়ন্তীকে ভালোবাসে, তখনও চেয়েছি যেনও সব ঠিক হয়ে যায়। ওদের কারো জীবনে যেনও অতীতের ছায়া কোনো অন্ধকার না নিয়ে আসে! আমার চাওয়া পূরণ হয়েছে। এখন আর একটাই চাওয়া, ওরা সুখে থাকুক।"

স্বজনীও তাল মিলিয়ে বলল,

"হ্যাঁ, আমারও!"

********

ভোরের সূর্য উঠেছে। এ যেনও এক নতুন ভোর, নতুন সকাল। কারো নতুন জীবনের শুভ সূচনা। সংসার জীবনের প্রথম দিন। একটু একটু আলো ছড়িয়ে সূর্য তার উপস্থিতি জানান দিচ্ছে। পর্দার ফাঁক গলে অল্প আলো ঘরে প্রবেশ করতেই ঘুম ভাঙলো আয়ানের। চোখ খুলে দেখলো প্রিয়া ওকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরে গভীর ঘুমে তলিয়ে। ওর ঘুমন্ত মুখটা দেখে আয়ান আর ওকে উঠানোর ইচ্ছা করলো না। খুব সন্তপর্ণে ওকে বিছানায় শুইয়ে নিজে গেলো ফ্রেশ হতে।

সকালের সূর্যটা ভীষণ সুন্দর। কেমন রক্তিম আভা ছড়াচ্ছে পূর্বের আকাশে। পরিবেশটা খুবই নির্মল। কোনো চিৎকার চেঁচামেচি নেই। সব চুপচাপ। শুধু পাখিদের মধুর কলতান শোনা যাচ্ছে এখন। এমন একটা সকাল উপভোগ করার সুযোগ মিস করলো না আয়ান। উঠে চলে এলো ছাদে।

আয়ান ছাদে আসার কিছুক্ষণ পরেই প্রিয়াও এসে পড়লো। ঘুম ভাঙার পর আয়ানকে পাশে পায় নি। উঠেই ফ্রেশ হতে গিয়েছে। এরপর ফ্রেশ হয়ে এসেই চলে এসেছে ছাদে। চুপিচুপি এসে আয়ানের পিছনে দাঁড়িয়ে বলল,

"আপনি সকাল সকাল ছাদে এসে পড়েছেন?"

আয়ান নিঝুম ছাদে হঠাৎ প্রিয়ার শব্দ পেয়ে অবাক হয়ে ঘুরলো। বলল,

"ঘুম শেষ? তুমিও চলে এলে ছাদে?"

প্রিয়া হেসে বলল,

"হ্যাঁ, আপনি যেখানে আমিও সেখানে।"

আয়ান বলল,

"বেশ ভালো থিওরি। সবসময় মেনে চলবে কিন্তু!"

প্রিয়া ওর কথা না শুনে মুগ্ধ দৃষ্টিতে পূর্বের আকাশের দিকে চেয়ে আছে। সেরকম চেয়েই কন্ঠে মুগ্ধতা ঢেলে বলল,

"সূর্যটা কত সুন্দর লাগছে দেখেছেন?"

আয়ান সূর্যের দিকে তাকায় নি। প্রিয়ার দিকে তাকিয়েই বলল,

"হ্যাঁ, অনেক সুন্দর লাগছে। তাই তো দেখার জন্য সকাল সকাল ছাদে চলে এলাম!"

প্রিয়া বলল,

"আমাকে ডাকলেন না কেনও তাহলে? একসাথে সকাল দেখতাম। একসাথে সূর্যোদয় দেখতাম।"

আয়ান নিজের হাতের মুঠোয় নিলো প্রিয়ার দু'হাত। প্রিয়া মুখ ঘুরিয়ে তাকালো আয়ানের দিকে। আয়ান গাম্ভীর্যপুর্ণ কন্ঠে একরাশ ভালোবাসা মিশিয়ে বলল,

"আসলেই তোমাকে ডাকা উচিত ছিলো। কিন্তু না ডাকার পরও তুমি চলে এসেছো। কেনও জানো? মনের টানে। একসাথে সকাল দেখার এই সুন্দর মুহুর্ত পূর্ণ করার জন্য। শুধু আজকের এই সকাল নয়, জীবনের প্রত্যেকটা সকাল তোমার সাথেই শুরু করতে চাই। তোমার সাথে নতুন জীবন শুরু করেছি। আমার এই নতুন জীবনের প্রত্যেকটা দিন তোমার সাথেই কাটুক। সারাজীবন এভাবেই আমার সঙ্গে থেকো। জীবনের শেষ সকালটাও তোমাকে পাশে চাই। তোমার 'স্নিগ্ধ প্রেমের মায়া'-য় জড়িয়ে জীবনের শেষ সূর্যোদয়টা অব্দি দেখতে চাই।"

স্নিগ্ধ প্রেমের মায়া গল্পটি তিয়াশা চৌধুরী-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক ও রোমান্টিক থ্রিলার গল্প