স্নিগ্ধ প্রেমের মায়া

পর্ব - ৩৭

🟢

সূর্য ঠিক মাথার উপরে। তীব্র কিরণ ছড়াচ্ছে সবখানে। কুয়াশার দেখা নেই কোথাও। আয়মান দ্রুত প্রিয়ন্তীকে নিয়ে যেই হসপিটাল সামনে পেয়েছে সেটাতেই গিয়েছে। প্রিয়ন্তীর অবস্থা অনেক গুরুতর। মাথা ফেঁটে রাস্তা ভেসে গিয়েছে রক্তে। এরপর গাড়িতেও রক্তের বন্যা বয়ে গেছে। প্রচুর পরিমাণে রক্তক্ষরণ হয়েছে তার। সে জ্ঞান হারিয়ে চোখ বুজেছে বেশ অনেকক্ষণ আগে। হসপিটালে এডমিট করার পর আয়মান সাইডে সরে এসে সবার আগে ফোন করলো আয়ানকে। রিসিভ করতেই বলল,

"ভাইয়া..!"

কন্ঠস্বর তার কাতরতাপূর্ণ। নিশ্বাস নিতেও ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। ভাইয়ের কন্ঠ শুনে ঘাবড়ে গেলো আয়ান। জিজ্ঞেস করলো,

"আয়মান, কি হয়েছে? সব ঠিক আছে?"

আয়মান হতাশ কন্ঠে বলল,

"কিচ্ছু ঠিক নেই, ভাইয়া! প্রিয়ন্তী এক্সিডেন্ট করেছে। ওর অবস্থা অনেক সিরিয়াস!"

হতবিহ্বল হয়ে কথা হারিয়ে ফেলল আয়ান। স্বান্ত্বনা দেয়ার ভাষা খুঁজে পেলো না এক মুহুর্তের জন্য। কিছুক্ষণ নীরবতা পালন করে বলল,

"তুই টেনশন করিস না। ও একদম ঠিক হয়ে যাবে। আমরা এখনই আসছি হসপিটাল!"

আয়মান নাম বলল হসপিটালের। আয়ান কল কেটে নিচে নেমে প্রিয়াকে ডাক দিলো। বিনা বাক্যব্যয়ে ওকে টেনে নিয়ে গেলো গাড়ি অব্দি। প্রিয়া বারবার জিজ্ঞেস করেও কোনো উত্তর পেলো না। গাড়িতে বসার পর আয়ান বলল,

"প্রিয়ন্তী এক্সিডেন্ট করেছে। আমরা হসপিটাল যাচ্ছি।"

প্রিয়া হতবাক হয়ে বলল,

"এক্সিডেন্ট? কেমন আছে ও?"

আয়ান বলল,

"জানি না। হসপিটাল গেলেই দেখতে পারবো।"

********

আয়ানের কল কাটার পর আয়মানের মনে পড়লো পিয়াসের কথা। কল করার জন্য ওর নম্বরটা বের করা মাত্রই ডক্টর এসে হাজির হলো তার সম্মুখে। আয়মান উত্তেজিত হয়ে জিজ্ঞেস করলো,

"ডক্টর, প্রিয়ন্তী কেমন আছে?"

ডক্টর দৃষ্টি নত করে বলল,

"সরি, মিস্টার খান। আমরা কিছুই বলতে পারছি না। অনেক বেশি রক্তক্ষরণ হয়েছে। শরীর অনেক দুর্বল উনার। এছাড়া হৃৎস্পন্দন চলছে খুবই ধীরগতিতে। সম্ভাবনা খুবই কম।"

হতাশা চতুর্দিক থেকে ঘিরে ধরলো আয়মানকে। আটকে-আটকে বলল,

"কিচ্ছু হবে না। আপনারা চেষ্টা করতে থাকুন।"

ডক্টর বলল,

"আমরা চেষ্টা চালাচ্ছি। এরপর বাকিটা আল্লাহর হাতে। উনার ব্লাড প্রয়োজন। এ নেগেটিভ ব্লাড। জোগাড় করে রাখবেন।"

আয়মান বলল,

"এ নেগেটিভ ব্লাড? ব্লাড ব্যাংকে নেই?"

"এ নেগেটিভ ব্লাড গ্রুপ রেয়ার। খুব সহজে পাওয়া যায় না। হসপিটালের ব্লাড ব্যাংক থেকে এক ব্যাগ সংগ্রহ করেছি। আরও প্রয়োজন।"

আয়মান বিধ্বস্ত অবস্থায় বসে পড়লো সিটে। উত্তর দেয়ার কিছু খুঁজে পেলো না। ভাবতে লাগলো এ নেগেটিভ ব্লাড গ্রুপ কোথায় পাবে? তার পরিবারের কারো ব্লাড ম্যাচ করবে না। তাহলে কোথায় পাবে?

হঠাৎ আয়মানের মনে পড়লো প্রিয়ন্তী পিয়াসের বোন। তার মানে, তাদের ব্লাড গ্রুপ ম্যাচ করার সম্ভাবনা আছে। এসব ভেবে দ্রুত কল লাগালো পিয়াসকে। পিয়াস রিসিভ করে বলল,

"হ্যাঁ আয়মান বল। এনগেজমেন্টের পর তো আর কলই করলি না। এতদিন পর মনে পড়লো আমাকে?"

আয়মান বলল,

"ফালতু কথা বলার সময় আমার হাতে নেই পিয়াস। আমি খুব জরুরি কথা বলতে ফোন দিয়েছি।"

আয়মানের গুরুতর কন্ঠস্বর শুনে পিয়াস গম্ভীর ভঙ্গিতে বলল,

"কি হয়েছে?"

আয়মান বলল,

"আমার এনগেজমেন্ট প্রিয়ন্তীর সাথে হয়েছে। আর আমরা দুইজন একে অপরকে ভালোবাসি। কিন্তু আমাদের পরিবার কোনোদিনও আমাদের মেনে নিবে না।"

মুহুর্তেই ফ্যাকাসে রঙ ধারন করলো পিয়াসের মুখশ্রী। কেঁপে উঠলো ফোন ধরে রাখা হাতটাও। ঢোক গিলে বলল,

"তুই প্রিয়ন্তীকে ভালোবাসিস?"

আয়মান স্বীকারোক্তি দিলো,

"হ্যাঁ। ভীষণ ভালোবাসি ওকে। তাই কোনোভাবেই ওকে হারাতে পারবো না। দুনিয়ার সাথে লড়তে পারবো। কিন্তু মৃত্যুর সাথে কিভাবে লড়বো?"

পিয়াস ইতিমধ্যেই ঘাবড়ে গেছে আয়মানের ভালোবাসার কথা শুনে। শেষে মৃত্যুর কথা শুনে তার পরিমান আরও বৃদ্ধি পেলো। বলল,

"মৃত্যুর সাথে লড়বি মানে?"

আয়মান থমথমে কন্ঠে বলল,

"প্রিয়ন্তী এক্সিডেন্ট করেছে। ভয়ংকর এক্সিডেন্ট। মৃত্যুর সাথে লড়ছে ও। ওকে বলবি, আমাকে যেনও ছেড়ে না যায়?"

পিয়াস কম্পনরত অবস্থায় বসে পড়লো চেয়ারে। হাত-পা বিবশ হয়ে আসছে তার। কোনোরকম জিজ্ঞেস করলো,

"কোন হসপিটালে আছিস তোরা?"

আয়মান হসপিটালের নাম বলে, বলল,

"দ্রুত আয়, প্লিজ!"

পিয়াস বলল,

"এখনই রওনা দিচ্ছি আমি।"

পিয়াস স্বজনীকে কল করে বের হতে বলল। মা-বাবাকে কিছু না জানিয়েই দু'জন বের হলো চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে।

*******

কেটে গেছে বেশ কিছুক্ষণ। আয়মান এখনও বিধ্বস্ত অবস্থায় কপালে দু'হাত চেপে ধরে বসে আছে চেয়ারে। মাথা নিচু করে, চোখ বন্ধ অবস্থায় ব্যর্থ চেষ্টা করছে নিজেকে সামলানোর। তবুও বারবার মনের মাঝে ভেসে উঠছে প্রিয়ন্তীর সাথে কাটানো প্রত্যেকটা মুহুর্ত। কারণে-অকারণে ঝগড়া করা। নাতাশার নাম শুনলেই রেগে ফুলে যাওয়া। আনারকলি, আনারকলি করে ওকে রাগানো। প্রত্যেকটা মুহুর্ত মনে পড়ার সাথে সাথে কেঁপে উঠছে পুরো শরীর। হুশে আসলো কাঁধে কারো হাতের স্পর্শ পেয়ে।

ধুপধাপ উঠে দাঁড়ালো চেয়ার ছেড়ে। আয়ানকে দেখে বলল,

"ভাইয়া, তুমি এসে পড়েছো?"

আয়ানের হৃৎপিন্ডটা হঠাৎ মোচড় দিয়ে উঠলো ছোট ভাইয়ের এই বিধ্বস্ত অবস্থা দেখে। দু কাঁধে হাত রেখে স্বান্ত্বনার সুরে বলল,

"নিজেকে সামলা, আয়মান। কিচ্ছু হবে না প্রিয়ন্তীর।"

আয়মান কপালের ঘাম মুছে বলল,

"অনেক বেশি রক্তক্ষরণ হয়েছে ভাইয়া। আমার গাড়িটা অব্দি রক্তে ভরে গেছে। ডক্টর বলেছে রক্ত লাগবে। কিন্তু এ নেগেটিভ ব্লাড পাবো কই?"

কথা বলতে বলতে বারবার কন্ঠ ভিজে যাচ্ছে তার। প্রিয়া ওর কথা শুনে বলল,

"এ নেগেটিভ ব্লাড লাগবে? আমার তো এ নেগেটিভ। আমি দিবো প্রিয়ন্তীকে ব্লাড।"

এই কথায় আয়মান একদিকে চিন্তামুক্ত হলেও অন্যদিকে আরেকটা ভয় চেপে বসলো মস্তিষ্কে। এক দুশ্চিন্তা কমার আগেই আরেকটা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। এদিকে প্রিয়ার ব্লাড গ্রুপ ম্যাচের কথা শোনার সাথে সাথে আয়ান ডক্টরের কাছে নিয়ে গেলো প্রিয়াকে। ডক্টর প্রিয়াকে নিয়ে যেতে চাইলো ব্লাড টেস্ট করতে।

আয়ান এর মধ্যে প্রিয়ার সাথে যেতে চাইলো। পরমুহুর্তে আবার মন বলল এই মুহুর্তে তার ভাইয়ের কাছে থাকা উচিত। বিশাল এক দ্বিধাদ্বন্দে ডুবে দিশা হারিয়ে বসলো। প্রিয়া বুঝলো ওর মনের অবস্থা। উদ্ধার করলো এই দ্বিধাদ্বন্দ্ব থেকে। আয়ানের হাত ধরে আশ্বস্ত করে বলল,

"আমি বাচ্চা নই যে ব্লাড নিলে ভয় পাবো। আপনি আয়মানের কাছে যান।"

আয়ান প্রিয়ার হাতের উপর হাত রাখলো। পরপর মাথা নাড়িয়ে চলে গেলো সেখান থেকে।

এদিকে আয়মানের অবস্থা আরও নাজেহাল। এতক্ষণ প্রিয়ন্তীর চিন্তায় ডুবে থাকায় ভেবেও দেখে নি ওর শেষ ইচ্ছের কথাটা। এখন প্রিয়া আর প্রিয়ন্তীর ব্লাড গ্রুপ ম্যাচের কথাটাই গভীরভাবে ভাবাচ্ছে। ক্ষুরধার মস্তিষ্ক বুঝতে দেরি করে নি, কেনও প্রিয়ন্তী বলেছে ওর পরিবার যেনও আয়ান-প্রিয়াকে আলাদা না করে। আয়মান এটাও জানে প্রিয়া হেনা বেগমের পালক মেয়ে। তাহলে কি প্রিয়াই প্রিয়ন্তীর বোন?

আয়ান এসে ডাকতেই সৎবিৎ ফিরলো আয়মানের। আয়ান জিজ্ঞেস করলো,

"ওর পরিবারকে খবর দিয়েছিস?"

আয়মান শান্ত স্বরে বলল,

"হু। ঢাকা থেকে আসছে ওরা। সময় লাগবে।"

আয়ান বলল,

"যাক, ভালো করেছিস। এইসময় পরিবারকে সবার আগে দরকার।"

আয়মান উপর-নীচ মাথা ঝাঁকালো। বিড়বিড় করে বলল,

"শুধু পরিবার এসে ওকে আমার থেকে কেড়ে না নিয়ে গেলেই হয়!"

*******

ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম বেশ অনেকটা দূরের পথ। তাই দেরিও হলো বেশ। পড়ন্ত বিকেলে এসে হাজির হলো পিয়াস-স্বজনী। বাসায় কিছুই বলে নি প্রিয়ন্তীর কথা। শুধু তারা দু'জন শোনামাত্রই ছুটে এসেছে চট্টগ্রাম।

কেবিনে রয়েছে প্রিয়ন্তী। অজ্ঞান অবস্থায়। হাতে ক্যানোলা লাগানো। শরীরের বিভিন্ন জায়গায় আঘাতের উপর ব্যান্ডেজ করা। সবসময়ের চঞ্চল মেয়েটা নিথর হয়ে পড়ে রয়েছে হসপিটালের বেডে। ডক্টর জানিয়ে দিয়েছে

"জ্ঞান না ফেরা অব্দি নিশ্চিত হয়ে কিছুই বলা যাবে না। আর জ্ঞান কখন ফিরবে এটা কেউ জানে না!"

প্রিয়া চেয়ার টেনে বসে আছে প্রিয়ন্তীর বেডের পাশে। জানলার সাইডে দাঁড়ানো আয়মান ও তার পাশে আয়ান। তখন হঠাৎ ঝড়ের গতিতে দরজা খোলার শব্দ হলো। সবার দৃষ্টি ঘুরে গেলো দরজার দিকে। হাঁপাতে হাঁপাতে ভিতরে ঢুকলো পিয়াস। বিছানায় আদরের ছোট বোনের করুণ দৃশ্য দেখে হৃদয় কেঁপে উঠলো। মুখ থেকে ছোটখাটো একটা আর্তচিৎকার বেরিয়ে এলো,

"প্রিয়ু!"

টলোমলো পায়ে ভিতরে ঢুকে সোজা এসে বসলো প্রিয়ন্তীর পাশে। কাঁপা হাতে ওর গাল স্পর্শ করে বলল,

"প্রিয়ু, চোখ খোল। দেখ, ভাইয়া এসে গেছি। একটু তাকা বনু!"

পিছু পিছু ঢুকলো স্বজনীও। পিয়াসের পাশে এসে দাঁড়িয়ে বলল,

"শান্ত হও। কিছু হবে না প্রিয়ন্তীর। ও ঠিক হয়ে যাবে।"

আয়ান অবাক বিস্ময়ে দেখে যাচ্ছে এই দৃশ্য। যখন বুঝে গেলো যে প্রিয়ন্তী পিয়াসের বোন, তখন আয়মান-প্রিয়ন্তীর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের আশংকায় হতবিহ্বল হয়ে পড়লো। আড়চোখে তাকালো আয়মানের দিকে। কিন্তু সে একদম নিরুদ্বেগ। আয়ান ওকে আস্তে করে ধাক্কা দিয়ে বলল,

"আয়মান, প্রিয়ন্তী পিয়াসের বোন। এবার কি হবে?"

আয়মান অভিব্যক্তিহীন জবাব দিলো,

"আমি জানি না।"

স্বজনীর বোঝানোর পর পিয়াস উঠে পড়লো প্রিয়ন্তীর পাশ থেকে। আয়মানের কাছে এসে ওকে বোঝাতে চেষ্টা করলো,

"আয়মান, আসলে.."

আয়মান কিচ্ছু শুনলো না। খপ করে চেপে ধরলো পিয়াসের শার্টের কলার। চোখে তার ক্রোধের আগুন৷ প্রিয়া এহেন কান্ড দেখে চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে। স্বজনী বিস্ময়ে মুখে হাত চাপা দিয়েছে। শুধু সোজা দাঁড়িয়ে আয়ান। কারণ ও জানে, আয়মানের রাগটা পুরোটাই যৌক্তিক।

পিয়াস হঠাৎ আক্রমণে হতভম্ব। প্রতিক্রিয়াবিহীন চাইল আয়মানের মুখের দিকে৷ ওর চোখের দিকে তাকিয়ে স্পষ্ট দেখতে পেলো তীব্র ঘৃণার ছাপ। এতে আরও ভেঙে-চুরে গেলো ছেলেটা। বোন তো মৃত্যুর সাথে লড়াই করছেই! এখন বোধহয় বেস্ট ফ্রেন্ডটাকেও হারাতে হবে!

আয়মান রাগে হিসহিসিয়ে বলল,

"হয়ে গেছে তোর? বন্ধুত্বের নাম করে এইভাবে শত্রুতার প্রতিশোধ নিবি এটা আমি কোনোদিনও ভাবি নি, পিয়াস!"

পিয়াস বুঝলো আয়মানের রাগটা। নিজে চাইলো শান্তভাবে ওকে বুঝাতে। কিন্তু আয়মান নারাজ। সে পিয়াসের কলার ছেড়ে ধাক্কা দিলো তাকে। আঙুল তুলে আবারও বলল,

"নাতাশার কথা বলছিলাম তাই না? তুই তো নাতাশার থেকেও বেশি ভয়ংকর প্রতিশোধ নিলি আমার থেকে। আরেহ, নাতাশা তো সরাসরি ছু*রি বসিয়ে মারতে চেয়েছে আমাকে। আর তুই তো বন্ধুত্বের নাম করে আমার পিঠে ছু*রি ঢুকিয়েছিস!"

পিয়াস টের পেলো আয়মান ওকে ভুল বুঝেছে। সাথে সাথে অশ্রুসজল হয়ে উঠলো চোখ। সব শত্রুতা দূরে সরিয়ে এতগুলো দিন তারা বন্ধুত্বে অটুট ছিলো। আর আজ এই ভুল বোঝাবুঝির জন্য কি বন্ধুত্ব শেষ হয়ে যাবে?

আয়মান নিজের মনের ক্রোধ, প্রিয়ন্তীকে হারিয়ে ফেলার আশংকায় পাগলপ্রায়। সেসব অনুভূতি একেবারে উগলে দিলো পিয়াসের উপর। দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

"তুই যদি আমাকে বলতি আমার বাবার করা অপরাধের প্রতিশোধ হিসেবে তুই আমার প্রাণ নিবি, আমি খুশিমনে সেই প্রাণদন্ড মেনে নিতাম। কিন্তু এমন নিষ্ঠুর খেলা কেনও খেললি? কেনও তোর বোনকে পাঠালি আমার কাছে? কেনও আমি ওর সাথে জুড়ে যাওয়ার আগেই বাঁধা দিলি না? আল্লাহ ওকে আমার থেকে কেড়ে না নিলেও তোরা তো ঠিকই প্রিয়ন্তীকে আমার থেকে কেড়ে নিবি! আমি বাঁচবো কিভাবে ওকে ছাড়া?"

বলতে গিয়ে ভিজে উঠেছে চোখের কার্ণিশ। আয়মানের বলা একেকটা কথা যেনও অন্তর ফুঁড়ে বেরিয়ে আসা কাতর আর্তনাদ। আর্তনাদে ভারি হয়ে উঠলো পুরো কেবিন। উপস্থিত সবার রূহ কাঁপছে। সাথে কম্পন ধরেছে হাত-পায়েও৷ পিয়াস ভাষা খুঁজে পাচ্ছে না আয়মানকে সামলানোর। ও জানে যা হয়েছে তা অনেক বড় ভুল হয়েছে। আর এই ভুল শুধরানোরও উপায় নেই! পিয়াস নিজেও জানে না, ও পরিবারকে ঠিক কিভাবে সামলাবে? কিন্তু এখন বন্ধুকে সামলানো খুব জরুরি।

"ভীষণ ভালোবাসি ওকে। আমার থেকে কেড়ে নিয়ে যাস না প্লিজ!"

বলতে বলতে হাঁটুমুড়ে মেঝেতে বসে পড়লো আয়মান৷ কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না নিজেকে। পুরুষ মানুষের কাঁদতে নেই। তবুও তার চোখে জমা হয়েছে পানি।

পিয়াস টেনে দাঁড় করালো আয়মানকে। একবার বোনের মুখের দিকে তাকালো। তারপর দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো আয়মানের বিধ্বস্ত চেহারার উপর। গম্ভীর কন্ঠে প্রশ্ন করলো,

"ভালোবাসিস আমার বোনকে?"

আয়মান পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালো পিয়াসের দিকে। আস্তে করে মাথা নাড়িয়ে বলল,

"হ্যাঁ।"

পিয়াস ওর দিক তাকিয়েই আয়ানকে উদ্দেশ্য করে বলল,

"আয়ান ভাইয়া, পৃথিবীতে ভালোবাসার শক্তি বেশি নাকি ঘৃণার?"

আয়ান নির্দ্বিধায় উত্তর দিলো,

"ভালোবাসার।"

পিয়াস লম্বা শ্বাস নিয়ে বলল,

"তাহলে নিজের ভালোবাসার উপর বিশ্বাস রাখ। তোদের ভালোবাসা সত্যি হলে, কোনো ঘৃণার দেয়াল ঠেকাতে পারবে না তোদের। শুধু সময়ের ব্যাপার!"

আয়মান ওর স্বান্ত্বনা মানলো না। কাঁধ থেকে পিয়াসের হাত নামিয়ে বলল,

"ছিনিয়ে আনতে বলছিস? সেটা তো আমি পারবো। কিন্তু তুই এমন করলিই বা কেনও? একবারও কেন বললি না প্রিয়ন্তী তোর বোন?"

পিয়াস কপট রাগ দেখিয়ে বলল,

"তুই আমার বোনকে ভালোবাসিস না ওর পরিচয়কে? যদি জানতি ও আমার বোন, তাহলে কি ওকে ভালোবাসতি না? প্রিয়ন্তী আমার বোন। এটা জানার পর যদি তোর ভালোবাসা একটু এদিক-ওদিক হয়, তাহলে তো বোনের দায়িত্বটা দেয়া একদমই উচিত হবে না!"

আয়মান এই কথার বিপরীতে উত্তর খুঁজে পেলো না। আসলেই তো ভালোবাসাটা একদমই তার হাতে ছিলো না। এটা তো সত্যিই, প্রিয়ন্তীকে প্রথম প্রথম সহ্য করতে না পারলেও এখন খুব গভীরভাবে ভালোবেসে ফেলেছে! ওকে হারিয়ে ফেলার ভয়টা যেভাবে মনে জেঁকে বসেছে, সেটা যেনও চোখে আঙুল ঢুকিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে মেয়েটা ওর মনের কতটুকু জায়গা দখল করে আছে। তাহলে প্রিয়ন্তী পিয়াসের বোন এটা জানার পর তার অনুভূতির আদ্যো কোনো পরিবর্তন হতো কি?

আয়মানের উত্তর না পেয়ে ধৈর্যহারা হলো পিয়াস। বলল,

"উত্তর দিচ্ছিস না কেনও? তাহলে কি প্রিয়ন্তীকে ঢাকা নিয়ে যাওয়াই বেটার হবে?"

আয়মান গলার স্বর উঁচু করে চেঁচিয়ে বলল,

"না! একদম না!"

স্বজনী সব ভুলে মৃদু হাসলো এসব দেখে। অত:পর বলল,

"পিয়াসের কোনো দোষ নেই, ভাইয়া। আমরা বারবার বলতে চেয়েছি আপনাকে ওর কথা। কিন্তু প্রিয়ন্তীই বারণ করেছে। বলেছিলো, কারো বোন, মেয়ে হওয়ার পূর্ব পরিচয় নিয়ে আপনার কাছে যাবে না। যাবে সম্পূর্ণ নিজের পরিচয় নিয়ে, প্রিয়ন্তী হয়ে। আমরা কি ভেবেছিলাম এমন কিছু হয়ে যাবে?"

আয়মান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

"যা হওয়ার তা তো হয়েই গেছে। এরপর কি হবে সেটাই ভাবার বিষয়! তুই যাই বল, পিয়াস! তোর মা-বাবা কোনোদিনও মানবে না এসব।"

পিয়াস চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল,

"আমিও জানি না, এটা কিভাবে হবে? সবচেয়ে বড় কথা প্রিয়ন্তী ঠিক হবে তো?"

আয়মান চোখ ঘুরালো প্রিয়ন্তীর দিকে। এক দৃষ্টিতে ওর মুখের দিকে চেয়ে বলল,

"হবে। ও এভাবে আমাকে ছেড়ে যেতে পারে না।"

স্নিগ্ধ প্রেমের মায়া গল্পটি তিয়াশা চৌধুরী-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক ও রোমান্টিক থ্রিলার গল্প