সময় বহমান তার নিজস্ব গতিতে। তবুও যখন মানুষ চায় সমটা ধীরে-সুস্থে যাক, তখনই সময় দৌড় শুরু করে। পিয়াসের থেকেই খবর পেয়েছে ওরা চট্টগ্রাম পৌছে গেছে। কিছুক্ষণ আগেই আবার নতুন করে খবর শুনলো তারা বাড়িতে আসছে। এতেই অস্থিরতায় সকলের হৃৎস্পন্দন বন্ধ হওয়ার জোগাড়!
অপেক্ষার প্রহরের সমাপ্তি ঘটিয়ে সশব্দে বেজে উঠলো কলিংবেল। ভয়ে হৃৎপিণ্ড ছঁলকে উঠলো প্রিয়ন্তীর। খাঁমচে ধরলো সোফার ফোম।
সবার চেহারায় দৃষ্টি ঘুরিয়ে দরজার দিকে আগালেন নাসরিন। দরজা খুলতেই সম্মুখীন হলেন একজোড়া দুর্ভেদ্য দৃষ্টির। যে দৃষ্টির ভাষা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দে ভুগলেন উনি। বললেন,
"আপনি.. "
বৃষ্টি গম্ভীর কন্ঠে বললেন,
"প্রথমবার খান নিবাসের চৌকাঠে পা রেখেছি আমি। এসেছি নিজের মেয়েদের নিয়ে যেতে। ভিতরে ঢুকতে দিবেন না, বেয়াইন সাহেবা?"
'বেয়াইন সাহেবা' সম্বোধনে শুকনো ঢোক গিললেন নাসরিন। সরে দাঁড়ালেন দরজা ছেড়ে। জায়গা দিলেন সবার ভিতরে ঢোকার। বৃষ্টি কোনোরকম ইতস্ততা ছাড়াই ঢুকলেন ভিতরে। তার পিছন পিছন তৌহিদ, পিয়াস, স্বজনী। পিয়াস-স্বজনী দুজনেরই মুখটা একদম শুকনো লাগছে। তা আয়মানের চোখে পড়তেই বিতৃষ্ণায় মুখ ঘুরিয়ে ফেলল সে। বুঝতে পারলো খবরটা খুব বেশি সুখবর হবে না!
আয়ান তাদের দেখেই আরও প্রিয়ার পাশ চেপে দাঁড়িয়েছে। শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে তাদের সামনে। প্রিয়াও চুপচাপ। এই মুহুর্তে চাচা-চাচিকে সামনে দেখেও শক্তভাবে সামলাচ্ছে নিজেকে। কোনোরুপ দুর্বলতা প্রকাশ করলেই তারা নিয়ে যেতে চাইবে!
বৃষ্টি গভীর দৃষ্টি নিক্ষেপ করে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা আয়ান-প্রিয়াকে ভালোভাবে লক্ষ করলো। অত:পর তাকালো আয়মানের দিকে। তার মুখেও সাত আসমানের অন্ধকার কালো মেঘ ভর করেছে। কারো মুখ থেকেই একটা শব্দও বের হচ্ছে না। সবাই প্রবল আগ্রহে অপেক্ষায় রয়েছে কখন বিবাদী পক্ষ প্রথমে মুখ খুলবে।
ওদের মনোভাব টের পেয়েই মুখ খুললেন তৌহিদ। গলা খ্যাঁকাড়ি দিয়ে বললেন,
"আমরা আমাদের মেয়েদের নিয়ে যেতে এসেছি। প্রিয়া ও প্রিয়ন্তী দুইজনকেই আমাদের সাথে নিয়ে যাবো আমরা।"
প্রতিত্তোরে চিৎকার ছুড়লো আয়ান। একপ্রকার চেঁচিয়ে বলল,
"অসম্ভব! আমি প্রিয়াকে নিয়ে যেতে দিবো না। আর প্রিয়ন্তীকেও আয়মানের থেকে কেড়ে নিয়ে যেতে পারবেন না আপনারা!"
তার চেঁচানোর বিপরীতে শান্ত রইলেন বৃষ্টি ও তৌহিদ। আয়ানের চেঁচানোতে তার কিছুই আসে-যায় না, এমন ভাব করে বললেন,
"আমাদের মেয়ে আমরা নিয়ে যাবো। তোমরা বাঁধা দিচ্ছো কেনও?"
আয়মান কথার পিঠে ধারালো উত্তর দিলো,
"ওরা শুধু আপনাদের মেয়ে নয়। প্রিয়া ভাবি, ভাইয়ার বউ আর প্রিয়ন্তী আমার বাগদত্তা। তাই সমস্ত কিছুতে আপনাদের অধিকার চলবে না।"
তৌহিদ চমৎকার শব্দে হাততালি দিলেন। ঠোঁটে হাসির রেখা ফুটিয়ে বললেন,
"তোমাদের বউ, বাগদত্তা বলে তোমাদের অধিকার হয়ে গেছে? আমাদের মেয়েদের উপর আমাদের অধিকার নেই?"
আয়মান একইভাবে বলল,
"অধিকার অবশ্যই আছে। তবে ওদেরও নিজের উপর অধিকার আছে। আফটার অল, ওরা প্রাপ্তবয়স্ক! ওরা নিজেরা যাকে চাইবে তার সাথেই জীবন সাজাবে। আপনারা জোর করতে পারবেন না। এটা গেলো প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার যুক্তি! এরপর আরও আছে! আপনারা চাইলেই প্রিয়ন্তীকে নিয়ে যেতে পারেন, তবে বেশিদিন রাখতে পারবেন না। কোনদিন না কোনদিন আমিই গিয়ে নিয়ে আসবো। আমি আবার লুকিয়ে কিছু করি না। যা করার বলেই করি! তাই আগেই বলে দিলাম, যেনও পরে আপনারা কোনো সমস্যা সৃষ্টি না করেন।"
কাটকাট জবাবে হতভম্ব সবাই। পারভিন মুখে ওড়না চেপে ধরেছেন ছেলের এহেন কথায়। কি সুন্দর ঠান্ডা মাথায় হুমকি দিয়ে দিলো, প্রিয়ন্তীকে তুলে আনার। তিনি এতক্ষণ চুপচাপ দেখে ভেবেছিলেন ছেলে ভয়ে আছে। কিন্তু এ তো পুরো বিপরীত বের হলো! উলটো প্রিয়ন্তীর মা-বাবাকেই ভয় দেখাচ্ছে ছেলে!
প্রিয়ন্তী মাথা নুইয়ে ফেলেছে। আয়মান মা-বাবার সামনে এমন কিছু বলে ফেলবে তা কল্পনাতীত ছিলো। আগে জানলে মা-বাবা আসার আগেই ড্রইংরুম ছেড়ে পালাতো। তাহলে এমন লজ্জায় মাথা কটা যেতো না!
তৌহিদ কথার বিপরীতে উত্তর খুঁজতে মাথা চুলকালেন।
কিছুক্ষণ ভেবে বললেন,
"তোমরা যাই বলো, আমরা ওদের নিয়ে যাবোই!"
ক্ষেপে গেলো আয়ান। তবুও উত্তর দিলো ভাইয়ের মতো ঠান্ডা মাথায়। বলল,
"এই চিন্তাটা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারছেন না আপনারা? বলেছি তো নিয়ে যেতে দিবো না! তাও বেহুদা ভাবছেন এসব। বলেছি দিবো না, তো দিবোই না। আপনারা ভুলে যাচ্ছেন, প্রিয়া আমার বউ। আর বিয়ের পর যেকোনো মেয়ের উপর প্রথম অধিকার থাকে স্বামীর। আমি না চাইলে ও এই বাড়ির বাইরে পা-ও ফেলতে পারবে না। সেখানে আমার অনুমতি ছাড়া আপনারা ওকে এত দূর নিয়ে যাওয়ার প্ল্যান করছেন কিভাবে? আমি ওকে যেতে দিবো না!"
শক্ত কন্ঠের উত্তর আয়ানের। বলা শেষে শক্ত করে ধরলো প্রিয়ার হাতটা। বুঝিয়ে দিলো, ও আসলেই প্রিয়াকে যেতে দিবে না। বৃষ্টির অবস্থা এমন হয়েছে, তিনি হাসবেন না কাঁদবেন ঠিক বুঝে উঠতে পারছেন না! তৌহিদ ভিতর ভিতর অনেক খুশি। তবে সেটা উপরে প্রকাশ করলেন না। বিরক্ত কন্ঠে বললেন,
"বিয়ে করেছো বলে যে অধিকার দেখাচ্ছো? তোমার মনে আছে তো বিয়েটা কিভাবে করেছো? জোর করে বিয়ে করে আবার অধিকারের বাণী শোনাচ্ছো আমাকে?"
আয়ান স্তব্ধ। এমন একটা কথা ও আশা করে নি। পরপর অগ্নিদৃষ্টি হানলো পিয়াসের উপর। সে বেচারা চেহারায় নিষ্পাপ ভাব ফুটিয়ে তুলে ঠোঁট উলটে বোঝালো সে কিছুই করে নি! আয়ান তার বিপরীতে কটমট দৃষ্টিতে তার দিক তাকিয়ে বোঝালো, তোমার পরে হচ্ছে!
এই দৃশ্য নজর এড়ালো না তৌহিদের। তিনি ধমকের সুরে বললেন,
"এভাবে পিয়াসের দিকে কি দেখছো? দু'ভাই মিলে মেয়ে দু'টোর মাথা তো ভালো করেই খেয়েছো। এখন ছেলেটাকেও নিজের চোখের আগুন দিয়েই ভষ্ম করে দেয়ার প্ল্যান করেছো নাকি?"
আয়ান থতমত খেয়ে গেলো তার এই কথায়। ত্রস্থ পিয়াসের উপর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিলো। শান্ত স্বরে বলল,
"আপনাদের মেয়েদের মাথা খাওয়ার সময় আমাদের কই? ওরাই তো আমাদের মাথা খেয়ে কুল পায় না!"
আয়মান নিচে তাকিয়েই সম্মতি জানালো ভাইয়ের কথায়। গম্ভীর কন্ঠে বলল,
"কারেক্ট! ভাইয়া একদম ঠিক বলেছে।"
রক্ত চড়ে গেলো প্রিয়া, প্রিয়ন্তী দু'জনের মাথাতেই। তবু পরিবেশ বিবেচনা করে চুপ রইলো। একবার সবকিছু ঠিক হলে এদের হাড়ে হাড়ে বোঝাবে মাথা খাওয়া কাকে বলে!
ড্রইংরুমে উপস্থিত সবাই বিস্মিত সিরিয়াস মুহুর্তে আয়ানের এরুপ কথায়। গুরুগম্ভীর মুহুর্তেও প্রচন্ড হাসি পাচ্ছে তাদের। কিন্তু এই মুহুর্তে হাসাও পাপের সামিল। তাই মুখ চেপে কোনোরকম দমিয়ে রাখলো হাসি।
তৌহিদ বারবার খেঁই হারাচ্ছেন ওদের সাথে কথা বলে। একেকবার একেক ভাই একটা একটা করে নিউক্লিয়ার বোমা ফেলছে। ধুপধাপ হুমকি দিয়ে ফেলছে। আবার মেয়েদের দোষটাও বলে দিলো। প্রিয়ার স্বভাব না জানলেও প্রিয়ন্তীর স্বভাব ভালো মতোই আয়ত্ত্বে আছে তার। তাই ওরা যে ঠিক বলেছে, একশ ভাগ নিশ্চিত উনি। জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে বললেন,
"এমন বউ বাড়িতে রেখেছো কেনও, যারা ঘরে খাবার থাকার পরও তোমাদের মাথা খায়? তোমাদের উচিত এই দুই মাথা খাওয়া বউদের বাপের বাড়ি দেখে আসা!"
আয়মান চ সূচক শব্দ করে বলল,
"যা মন চায় বলতে থাকুন। তাও আমরা ওদের দিবো না।"
তৌহিদ তাল হারালেন কথার। কাহিনি না বাড়িয়ে বলে ফেললেন,
"বিয়েটা জোর করে হয়েছে, তাই বলে কি আনুষ্ঠানিকতার প্রয়োজন নেই?"
কথা যেনও নয়, ছোটখাটো বজ্রপাত ঘটালেন ড্রইংরুমে। হতভম্ব হয়ে গেলো সবাই। বৃষ্টি পারভিনের সামনে গিয়ে বলল,
"দুটোই তো মেয়ে আমাদের! ঘটা করে শশুড়বাড়ি পাঠাতে চাইছি, আর আপনার নাছোড়বান্দা ছেলেরা তো ওদের দিতেই চাচ্ছে না! বলছি, আজ ওদের নিয়ে যাই। তারপর আপনারা না হয় বরযাত্রী নিয়ে গিয়ে ওদের তুলে আনবেন।"
প্রিয়ন্তী অবাক বিস্ময়ে বলল,
"মা-বাবা, তোমরা সব মেনে নিয়েছো?"
প্রতিত্তোরে মিষ্টি হাসলো দুইজন। বললেন,
"না মেনে উপায় আছে? দেখ দুইজন কিভাবে হুমকি দিয়ে যাচ্ছে! আমি বাবা এই বয়সে এসে এসব হুমকি শুনি ভয়ে গুটিয়ে থাকতে পারবো না! এরচেয়ে উত্তম, ভালোয় ভালোয় মেয়ে দিয়ে দেই!"
প্রিয়া-প্রিয়ন্তী দুজনেই লজ্জিত ভঙ্গিতে মাথা নিচু করে ফেলল। আয়ান বুক ফুলিয়ে লম্বা শ্বাস নিলো প্রশান্তির।আর পিয়াস ত্রস্থ এসে হতভম্ব হয়ে থাকা আয়মানের গলা জড়িয়ে ধরলো। উৎফুল্ল স্বরে বলল,
"কংগ্রাচুলেশনস দুলাভাই! আমি পারমামেন্টলি তোর শালা হতে যাচ্ছি!"
আয়মান ভ্রু কুঁচকে ওর দিক চাইতেই নিজেকে শুধরে নিয়ে বলল,
"সরি, সমন্ধি হতে যাচ্ছি! এখনই খুশিতে ড্যান্স দিতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু এখন দিবো না, বোনের বিয়েতে দিবো!"
*******
বসে শান্তিপূর্ণ ভাবেই সব আলোচনার সমাপ্তি হলো। পিয়াসরা চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা চলে গেলেও তাদের বাড়িটা এখানে রয়েছে। লোক রেখে দিয়েছিলো পরিষ্কারের জন্য। বছরে একবার কি দুইবার আসা হতো এখানে। সিদ্ধান্ত হলো এক সপ্তাহ পর ওই বাড়িতেই বিয়ের অনুষ্ঠান হবে। পারভিন প্রস্তাব রাখলেন,
"তাহলে দুই বোনকে একইসাথে নিয়ে আসি আমাদের বাড়িতে?"
বৃষ্টি রাজি হলেন এক বাক্যে। হাসিমুখে বললেন,
"ঠিক আছে। আয়ান আর প্রিয়ার বিয়েটা তো আগেই হয়েছে। শুধু আনুষ্ঠানিকতা বাকি। আয়মান-প্রিয়ন্তীর বিয়েটাও ওদের অনুষ্ঠানেই দিয়ে দেই। আমরা থাকি সেই সুদূর ঢাকা। বারবার অনুষ্ঠানে ধকলও যাবে বেশি।"
আয়মান মাথা নেড়ে বলল,
"ভালো সিদ্ধান্ত। আমি রাজি আগামী সপ্তাহেই বিয়ে করতে।"
বলা শেষেই পেটে কনুইয়ের গুঁতো খেলো পিয়াসের। সে চাঁপা গলায় বলল,
"এত অস্থির হোস না ভাই! বিয়েটা প্রিয়ন্তীর সাথেই হচ্ছে তোর। একটু ধৈর্য ধর!"
আয়মানও তার মতো চাঁপা স্বরে বলল,
"সেটাই তো ধরতে পারছি না! পারলে এখনই বিয়েটা করে ফেলতাম। কিন্তু না! ওদের মাথায় ভূত চেপে বসেছে আনুষ্ঠানিকতার। এখনও এক সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হবে।"
পিয়াস হতাশ দৃষ্টিতে চাইল আয়মানের দিকে। বলল,
"একটু লজ্জা রাখ, ভাই! আমি প্রিয়ন্তীর বড় ভাই হই!"
আয়মান নিরুদ্বেগ বলল,
"তো আমি কি করবো? বড় ভাই হয়েছিস, দায়িত্বসহকারে বোনকে আমার হাতে তুলে দে। আর কানের সামনে মাছির মতো ভ্যানভ্যান করিস না।"
পিয়াস কষ্ট পেয়েছে এমন ভান করে বলল,
"আমার জন্য আমার বোনটাকে পেলি! আর আমার বোনকে পেয়ে আমাকেই দূরছাই করা শুরু করলি? তুই বদলে গেলি বন্ধু!"
আয়মান বিশেষ পাত্তা না দিয়ে বলল,
"হ্যাঁ বদলে গেছে তোর বন্ধু। এখন তোর দুলাভাই লাগে। সম্মান দে!"
সম্মান রইলো সাইডে পড়ে। পিয়াস কাঁদো কাঁদো হয়ে গান ধরলো,
"সম্পর্ক বদলে গেলো একটি পলকে..!
আমার আপন বন্ধু পর হয়ে গেলো রে..!"
যাও বিয়েটা ঠিক হয়েছে আগামী সপ্তাহে, এতে আয়মান সস্থির নিশ্বাস ফেলেছে। কিন্তু প্রিয়ন্তী সেটায় পানি ঢেলে দিলো। বলল,
"দুটো বিয়ে একসাথে হলে আমি আপুর বিয়েতে মজা করবো কিভাবে? গেট ধরা, আয়ান ভাইয়ার জুতো চুরি করা, এগুলো মিস করবো নাকি? কোনোভাবেই না! আমাদের বিয়েটা পরে আয়োজন করলেও হবে।"
ওর আবদার মেনে নেওয়ার আগেই কাতর স্বরে চিৎকার ছুড়লো আয়মান,
"নায়ায়ায়া!"
সিনেমাটিক স্টাইলে ওর 'না' শুনে সবাই কথা বন্ধ করে ওর দিকে তাকালো। পারভিন জিজ্ঞেস করলো,
"কোনো সমস্যা আয়মান?"
আয়মান অস্থির কন্ঠে বলল,
"অনেক বড় সমস্যা, মা! প্রিয়ন্তী বলছে আমাদের বিয়ের আয়োজনটা পরে করতে। কিন্তু এতে তো ঝামেলা আরও বেশি হবে। আন্টিরা কি বারবার ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম আসবে নাকি? একসাথে হলেই তো ভালো হয়!"
প্রিয়ন্তী বলল,
"কিন্তু একসাথে হলে তো আপুর বিয়ে ইঞ্জয় করে হবে না!"
আয়মান বলল,
"কেনও হবে না? এরও সমাধান আছে। হলুদ দুজনের একসাথেই হবে। শুধু বিয়েটা একদিন আগে-পরে। যেদিন হলুদ হবে, তার পরদিন ভাইয়া-ভাবির বিয়ে। আর তাদের বিয়ের পরেরদিন আমাদের বিয়ে। প্রবলেম সলভড! একসাথে বিয়েও হলো আর ইঞ্জয়ও হলো। তাহলে এটাই ফাইনাল?"
অগত্যা মেনে নিলো সবাই এই কথাই। এমনিতেও তৌহিদ আর পিয়াস বিজন্যাস ছেড়ে বেশিদিন এই শহরে পড়ে থাকতে পারবেন না। তাই বিয়েটা দ্রুত হয়ে যাওয়াই ভালো!
******
ওইদিন তৌহিদ ও বৃষ্টি যাওয়ার আগে প্রিয়া ও প্রিয়ন্তীকে নিজের সাথে নিয়ে গেছে। এর মধ্যে দু, দু'টো বিয়ের আয়োজন করা সামান্য কথা নয়! ভীষণ ব্যস্ততায় দুই পরিবারের সপ্তাহ কাটলো। আয়ান-প্রিয়া কিংবা আয়মান-প্রিয়ন্তী, কারোই একসাথে আলাদা সময় কাটানো হয় নি। দেখতে দেখতে ঘনিয়ে এলো হলুদের রাত। সন্ধ্যা থেকে শুরু হওয়া বিশাল অনুষ্ঠান শেষ হলো রাত প্রায় দু'টোয়। হাতে-মুখে হলুদে মাখামাখি হয়ে দু'বোন এলো রুমে। ক্লান্তিতে ঢুলছে তারা। গায়ে জড়িয়ে রাখা কাঁচা হলুদ রঙের শাড়ি। বাঙালিয়ানা শাড়ির সাথে খোলা, এলোচুলে থাকা বেলীফুলের গাজরাটা ভীষণভাবে মানিয়ে গেছে। অনুষ্ঠানের শুরুতে মেক আপ দিলেও এখন সেসব ঢাকা পড়েছে হলুদের আস্তরণের নিচে।
প্রিয়ন্তী রুমে ঢুকেই সোজা বিছানায়। শাড়িটার একটুও এদিক-ওদিক করে নি। কিন্তু প্রিয়া বসেছে সাজ-পোশাক খুলতে। ফুলের গহনাগুলো একে একে খুলে বিভিন্ন জায়গায় লাগানো শাড়ির পিনগুলো খুলে ফেলেছে। তার কাজের মাঝে হঠাৎ শোয়া থেকে লাফিয়ে উঠে বসলো প্রিয়ন্তী। ইতস্তত করে বলল,
"আমি একটু বাইরে যাচ্ছি, আপু। তুমি একটু পরে চেঞ্জ করো।"
স্বজনী ওদের রুমে দিয়ে যাওয়ার সময় ভুল করে হলুদের বাটিটা টেবিলের উপর রেখে গেছে। প্রিয়ন্তী সেখান থেকে মন ভরে হলুদ নিলো। দু'হাতের তালু হলুদে পরিপূর্ণ করে চলে গেলো রুমের বাইরে..!
******
"ভাইয়া, আর ইউ সিউর তুমি ভিতরে যাবে? দেখো, রিস্ক নিয়ে যেও। কারো চোখে পড়লে আর ভাবি সেটা জানতে পারলে খবর হয়ে যাবে!"
আয়ান আয়মানের সম্ভাবনা উড়িয়ে দিয়ে বলল,
"কি আর হবে? আমার বিয়ে করা বউয়ের সাথে দেখা করতে যাচ্ছি। এমনিতেই এই কয়দিন এই মেয়ে দেখাই করলো না! আজ তো আমি দেখা করেই যাবো!"
আয়মান ঠোঁট উলটে ভাইকে বাহবা দিয়ে বলল,
"টুরু প্রেমিক পুরুষ।"
আয়ান বলল,
"হ্যাঁ, আমি জানি। তুই শুধু তোর প্রেমিকা নারীকে ডেকে রুম খালি কর। আমি আমার বউয়ের কাছে যাবো।"
আয়মান বলল,
"মেসেজ দিয়েছি। ও হয়তো রুমের বাইরে এসেও পড়েছে। তুমি নির্দ্বিধায় ভাবির রুমে চলে যাও।"
********
প্রিয়ন্তীকে এভাবে হুট করে বাইরে যেতে দেখে ভড়কালো প্রিয়া। তবে বিশেষ পাত্তা দিলো। ও যাওয়ার পর দরজা লাগিয়ে শাড়ি খোলার প্রস্তুতি নিলো। তৎক্ষণাৎ দরজার নব ঘোরানোর শব্দ এলো। প্রিয়া ভাবলো প্রিয়ন্তী এসেছে। সে দরজা খুলে সামনে ব্যক্তিকে না দেখেই ঘুরে গেলো। বিরক্ত কন্ঠে বলল,
"এভাবে বারবার আসা-যাওয়া না করে ভিতরে থাক, নাহয় বাইরে যা। আমি শাড়ি চেঞ্জ করবো।"
পিছন থেকে ভেসে এলো পুরুষালী গম্ভীর গলার কন্ঠস্বর,
"চাইলে, আমার সামনেও শাড়ি চেঞ্জ করতে পারো। আমার কোনো প্রবলেম নেই!"
প্রিয়া সচকিতে বিস্ময় নিয়ে ফিরলো আয়ানের কন্ঠস্বর পেয়ে। সব সেফটি পিন খুলে ফেলায়, শাড়িটাও অগোছালো হয়ে গেছে। প্রিয়া কোনোরকম আঁচলটা ভালো করে টেনে বলল,
"আপনি এত রাতে এখানে?"
আয়ান ঘোর লাগা দৃষ্টিতে ওর দিক চেয়ে বলল,
"তোমাকে দেখতে এসেছিলাম। হলুদে ডোবানো আমার বউটাকে ঠিক কেমন লাগে, সেটাই দেখতে চাচ্ছিলাম! ভেবেছিলাম দেখেই চলে যাবো। কিন্তু তুমি যে আমায় এমন রূপ দেখাবে, এটা তো ভাবি নি! সত্যি বলতে, শাড়িতে তোমাকে ভীষণ সুন্দর লাগে। কিন্তু অগোছালো শাড়িতে তোমায় অন্যরকম লাগে! আমাকে পাগল করে দেওয়ার মতো কিছু আছে সেথায়!"
কেঁপে উঠলো প্রিয়া। ঢোক গিলে পিছিয়ে গেলো এক কদম। ওর এক কদম পিছানোর বিপরীতে তিনকদম আগে বাড়লো আয়ান। প্রিয়ার একদম কাছাকাছি চলে এলো ও। প্রিয়া লজ্জায় পিছাতে পিছাতে সিঁটিয়ে গেলো টেবিলের সাথে ধাক্কা লেগে। আয়ান এক হাতে ওর কোমড় চেপে নিজের সাথে মিশিয়ে দাঁড়ালো। প্রিয়ার কম্পন আরও বৃদ্ধি পেলো। আয়ানের পড়নের পাঞ্জাবিটা খাঁমচে ধরলো হাত দিয়ে।
আয়ান টেবিলে থাকা হলুদের বাটি থেকে এক মুঠো হলুদ হাতে তুলে নিলো। প্রিয়ার ঝুঁকে থাকা দৃষ্টির উপর নামিয়ে আনলো নিজের মুখ। তার উত্তপ্ত নিশ্বাস আছড়ে পড়ছে প্রিয়ার মুখশ্রীতে। হৃৎপিণ্ডের কম্পন জোড়ালো হচ্ছে তার। আয়ান নাকের পৃষ্ঠ ঘঁষলো প্রিয়ার সরু নাকের ডগায়। ফিসফিসিয়ে বলল,
"আমাদের বিয়ের হলুদ আমার বউকে লাগানোর অধিকার তো আমার আছে, তাই না? সবাই হলুদ লাগিয়েছে। আমি হলুদ না লাগালে তোমার হলুদ সম্পূর্ণ হয় কিভাবে?"
বলতে বলতে আয়ান ওর উদরের উপর থেকে শাড়ির অংশটা সরিয়ে ফেলল। উন্মুক্ত উদরে ধীরগতিতে হলুদভর্তি হাতের স্পর্শ আঁকলো। আস্তে-আস্তে ভরে ফেলল সেখানে হলুদ দিয়ে। প্রিয়া মাথা নিচু করে চোখ খিঁচে বন্ধ করে ফেলেছে। আয়ানের স্পর্শে ভয়ংকর শিহরণ বইছে দেহজুড়ে। ওর অনুভূতিদের আরও প্রশ্রয় দিতে আয়ান বলে বসলো,
"হাত-মুখ তো সবাই ভরে ফেলেছে। আমার জন্য কেউ একটু জায়গায় খালি রাখে নি! মন ভরে হলুদ লাগাবো, সেই উপায়ও নেই!"
প্রিয়া উত্তরে 'টু' শব্দটিও করলো না। চুপচাপ সহ্য করে গেলো আয়ানের পাগলামী। আয়ান আরও গভীর স্পর্শে হলুদের ছোঁয়া দিতে লাগলো সবখানে। সাথে গলায়, ঘাঁড়ে অধরের উষ্ণ স্পর্শ। সময়ে সময়ে অনুভূতিরা লাগাম খুইয়ে বসে। প্রিয়া নিস্তেজ হয়ে নিজের ভর ছেড়ে দেয় আয়ানের বাহুডোরে। খানিক বাদে প্রিয়া আয়ানের হাত সরিয়ে জড়িয়ে ধরে আয়ানকে। মাথাটা শক্ত করে চেপে ধরে নিজের সবচেয়ে বিশ্বাসী বক্ষভাগের উপর..!