স্নিগ্ধ প্রেমের মায়া

পর্ব - ৩৯

🟢

প্রিয়ন্তী টানা দুইদিন অজ্ঞান ছিলো। এই দুইদিন আয়ান, প্রিয়া, পিয়াস, স্বজনী বাড়িতে গেলেই একবারের জন্যও প্রিয়ন্তীর পাশ ছাড়ে নি আয়মান। নাওয়া-খাওয়া ভুলে সে হসপিটালেই বসে ছিলো। ওর আচরণে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ হচ্ছে পিয়াস। মনে হচ্ছে, তার বোন কোনো ভুল মানুষকে ভালোবাসে নি।

ইতিমধ্যে আসা-যাওয়া চলেছে সবার। বাড়ির মধ্যে শুধু সায়মাকে বলা হয়েছে প্রিয়ন্তীর এক্সিডেন্টের কথা। এছাড়া অন্য কেউ জানে না। কারণ পিয়াস এদিকে আছে। তারা প্রিয়ন্তীকে দেখতে আসতে চাইলে পিয়াসের সাথে দেখা হয়ে যাবে। এই মুহুর্তে এমন ভেজাল মাথায় নিতে চাইলো না কেউ। তাই সন্তপর্ণে এড়িয়ে গেছে প্রিয়ন্তীর এক্সিডেন্টের খবর।

সকাল প্রায় এগারোটা। আয়ান-প্রিয়া কথা বলছে ডক্টরের সাথে। পিয়াস-স্বজনীও সেখানে। শুধু আয়মান প্রিয়ন্তীর পাশে বসে। তার হাতে মুঠো করে ধরা প্রিয়ন্তীর ক্যানোলা লাগানো নিস্তেজ হাত। মুখের কাছে এনে ছোট্ট চুমু বসালো সেখানে। তৎক্ষণাৎ স্বল্প নড়ে উঠলো হাতখানা। আলতো করে চেপে ধরলো আয়মানের হাত।

আয়মান হতচকিত হয়ে চিৎকার ছুড়লো,

"ভাইয়া, ভাবি প্রিয়ন্তীর জ্ঞান ফিরছে!"

আয়মানের চিৎকার শুনে তৎপর সবাই ছুটে আসলো কেবিনে। ডক্টরও এলো তাদের সাথে সাথে। প্রিয়ন্তীর পালস রেটিং চেক করে বলল,

"উনার জ্ঞান ফিরছে। এখানে বেশি ভীড় করবেন না। সবাই কিছুক্ষণের জন্য বাইরে যান। পুরোপুরি জ্ঞান ফিরলে আমি-ই আপনাদের ডাকবো।"

আয়মান প্রিয়ন্তীর হাত ছাড়িয়ে নিলো। পরপর বেরিয়ে গেলো সবাই কেবিন ছেড়ে।

অস্থির চিত্তে পার হলো কিছু সময়। খানিক বাদে ডক্টর বের হলো কেবিন থেকে। হেসে বলল,

"কংগ্রাচুলেশনস। উনি এক প্রকার লড়াই করে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছে। এখন পুরোপুরি জ্ঞান ফিরেছে। আপনারা দেখা করতে পারেন। তবে বেশি উত্তেজনাপূর্ন কথা বলবেন না যেনও উনার কোনো ক্ষতি হয়।"

আয়মান কথা শোনামাত্রই এক মুহুর্ত অপেক্ষা করে নি। ঢুকে গেছে কেবিনে। প্রিয়ন্তী আধশোয়া হয়ে বসে আছে বেডে। প্রিয়ন্তীকে সুস্থ দেখে দুটোদিন পর যেনও আয়মান সস্থির নিশ্বাস ফেলল। ওকে দেখে আলতো হাসলো প্রিয়ন্তী। বলল,

"এখনও কিছু হয় নি আমার। হয়তো আরও বিপদ দেখা বাকি আছে!"

আয়মান দ্রুত কদম ফেলে এগিয়ে এলো ওর সামনে। ওর দু গালে হাত রেখে কিছুটা ঝুঁকলো ওর মুখের কাছে। কপালে অধর স্পর্শ করে চোখে চোখ রেখে কাঁপা কন্ঠে বলল,

"কিচ্ছু হবে না তোমার। কোনো বিপদ হবে না। আমি আছি তো!"

প্রিয়ন্তী হেসে আয়মানের হাতের উপর নিজের হাত রাখলো। বলল,

"সেটা সময় বলবে। আপনি আমার ভাই-ভাবিকেও বলে দিয়েছেন?"

আয়মান মুখ খোলার সাথে সাথে দরজার সামনে থেকে কারো কাশির শব্দ ভেসে এলো। আয়ান, প্রিয়া, পিয়াস, স্বজনী সেখানে দাঁড়িয়ে। আয়ান বলল,

"বলছিলাম, আমরা কি ভিতরে আসতে পারি?"

আয়মান প্রিয়ন্তীকে ছেড়ে সরে বসলো। প্রিয়া অনুমতির অপেক্ষা করে নি। ছুটে এসে জড়িয়ে ধরেছে প্রিয়ন্তীকে। শব্দহীন কান্নায় ভেঙে পড়লো সে। ঠোঁট উলটে বলল,

"একবারও আমাকে বললি না, তুই আমার বোন?"

প্রিয়ন্তী অবাক চোখে চাইল আয়মানের দিকে। আয়মান ইশারায় বোঝালো সবাই সব জেনে গেছে। বুঝতে পেরে প্রিয়ন্তী হাত রাখলো প্রিয়ার মাথায়। দু'হাতে জড়িয়ে বলল,

"আমি না বললেও তুমি তো জেনেছো, তাই না? এখন কান্নাকাটি কেনও করছো? সব ভুলে একটু হাসো প্লিজ!"

প্রিয়া ওকে ছেড়ে চোখের পানি মুছল। মৃদু হেসে বলল,

"অবশ্যই হাসবো। অনেক খুশি আমি তোদের সবাইকে পেয়ে।"

প্রিয়ন্তী থেমে তাকালো পিয়াসের দিকে। সে নিস্তব্ধ তাদের দিকে তাকিয়ে। প্রিয়ন্তী মুখ গোমড়া করে তাকে বলল,

"আমার সাথে কথা বলবে না, ভাইয়া? রেগে আছো ?"

পিয়াস উত্তর দিলো না। ছোট ছোট কদম ফেলে এগিয়ে এলো তাদের দিকে। বাক্যহীন দু'দিক থেকে জড়িয়ে ধরলো দু'বোনকে। কান্নাভেজা কন্ঠে বলল,

"রেগে নেই। শুধু উপভোগ করছি এমন সুন্দর দৃশ্য। তোদের দু'জনকে এইভাবে একসাথে দেখে মনে হচ্ছে সব চাওয়া-পাওয়া পূর্ণ হয়ে গেছে। এমন একটা দিন দেখার অপেক্ষাতেই ছিলাম!"

আয়ান উৎফুল্ল স্বরে বলল,

"যাক! প্রিয়ন্তীর জ্ঞান অবশেষে ফিরেছে। এবার আয়মান, তুই বাসায় গিয়ে ফ্রেশ হয়ে খেয়ে আয়। আমরা আছি প্রিয়ন্তীর সাথে।

আয়মান দু'পাশে মাথা ঝাঁকিয়ে না বোধক উত্তর দিলো। প্রিয়ন্তী বলল,

" আপনি দু'দিন না নাওয়া-খাওয়া ভুলে হসপিটালে বসে ছিলেন? আবার এখনও না করছেন?"

আয়মান বলল,

"তুমি সুস্থ হও। তোমাকে নিয়ে একেবারেই যাবো।"

আয়ান হঠাৎ হাসি বন্ধ করে বলল,

"আমার মনে হয়, এবার বাসার সবাইকে সব জানিয়ে দেয়া উচিত।"

পিয়াস ত্রস্থ তার দিকে ঘুরে বলল,

"তুমি সিউর ভাইয়া? মা-বাবা জানলে কিন্তু অনেক বড় ভেজাল লেগে যাবে।"

আয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

"আমি জানি ভেজাল লাগবে। কিন্তু তোমার মা-বাবার নিজের মেয়েদের উপর অধিকার তো আছে তাই না? ওদের সাথে দেখা করানো তো উচিত।"

আয়মান বলল,

"ভাইয়া ঠিক বলেছে। আমি চাই না কারো থেকে লুকিয়ে কিছু হোক। যা হবে, সবাইকে জানিয়েই হবে।"

পিয়াস বলল,

"ঠিক আছে। তাহলে আমি ঢাকা গিয়ে মা-বাবাকে জানাবো সব।"

প্রিয়ন্তী বলল,

"হ্যাঁ ভাইয়া। তুমি কালই যাও। যত দ্রুত সব সমস্যা মিটে যাবে ততই শান্তি!"

পিয়াস মাথা নাড়িয়ে বলল,

"না! তোকে অসুস্থ রেখে আমি কাল কিভাবে যাবো?"

প্রিয়া ওকে আশ্বস্ত করে বলল,

"আমি আছি তো ভাইয়া। আমরা ওর খেয়াল রাখবো।"

********

পরেরদিন সকালে প্রিয়ন্তীকে হসপিটাল থেকে ডিসচার্জ করা হলো। পিয়াস-স্বজনী ভোরবেলাতেই রওনা হয়েছে ঢাকার পথে। আর বাকিরা প্রিয়ন্তীকে নিয়ে বাড়ি ফিরেছে প্রায় দশটার দিকে। দরজা খুলে প্রিয়ন্তীকে দেখেই চমকে উঠলেন পারভিন। অবাক বিস্ময়ে বললেন,

"তুমি না ঢাকা গিয়েছিলো? তাহলে এখনও চট্টগ্রামে আর এই অবস্থায়?"

আয়মান পাশ থেকে বলল,

"আহা, মা! সব প্রশ্ন কি এইখানেই করবে। ভিতরে যেতে দাও ওকে।"

খেয়াল আসতেই পারভিন নিজে ওকে হাত ধরে ভিতরে নিয়ে গেলেন। খুব সাবধানে ওকে বসালেন ড্রইংরুমের সোফায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই সবাই এসে হাজির হলো সেখানে। সায়মা ছাড়া বাকি সবাই অবাক হয়েছে প্রিয়ন্তীর এই অবস্থা দেখে। তার মাথায় তখনও ব্যান্ডেজ। সায়মা ওর কাছে এসে বলল,

"এখন ঠিক আছো তুমি? আর কোনো প্রবলেম নেই তো?"

উপরে হাসিতে উড়িয়ে 'ঠিক আছি' কথাটা বলে ফেলল প্রিয়ন্তী। কিন্তু সে জানে বেশিক্ষণ ঠিক থাকা হবে না। প্রচন্ড ঝড় আসবে আজ, যাতে লন্ডভন্ড হয়ে যাবে সবকিছু।

সবার জিজ্ঞাসাবাদ শেষে মুখ খুলল আয়মান। বলল,

"তোমাদের প্রশ্ন শেষ হলে এবার আমি কিছু বলি?"

পারভিন তাকালেন ছেলের মুখের দিকে। সাথে সাথে বুকখানা ধক করে উঠলো তার। ছেলের বিধ্বস্ত, মলিন মুখশ্রী পানে দেখেই মায়ের মন কেঁদে উঠলো। পরপর চোখ বুলালো আয়ান-প্রিয়ার উপরও। তাদের চেহারাই বলে দিচ্ছে গত দু-তিন দিন যাবত বিশাল ঝড়ের মধ্যে দিয়ে গেছে সবাই। পারভিন সবাইকে উদ্দেশ্য করে প্রশ্ন করলো,

"কি হয়েছে বলবি আমাকে? তোদের সবার মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে খারাপ কিছু হয়েছে। আমাদের থেকে লুকাচ্ছিস?"

আয়মান রাখ-ঢাকহীন বলল,

"লুকানো ছিলো। আজ সব খোলাশা করবো।"

সবার কৌতুহলপূর্ণ দৃষ্টি পড়লো আয়মানের উপর। তারা সবাই আয়মানের উত্তরের অপেক্ষায়। সায়মা জানে কি হবে তার ভাইয়ের উত্তর! সবার থেকে ভিন্নরকম উদ্বেগ তার মধ্যে। ভয়ে রীতিমতো কাঁপছে সে। উদ্বিগ্নতায় খপ করে চেপে ধরলো পাশে বসা প্রিয়ন্তীর হাত।

আয়মান যখন একে একে বলা শুরু করলো সব ঘটনা তখন হতভম্বতায় নিস্তেজ হয়ে যেতে থাকলো পুরো ড্রইংরুম। যখন আয়মানের সব বলা শেষ হলো, তখন পারভিন ধপ করে বসে পড়লেন সোফায়। কান্নার দমকে তার নেত্রপল্লব তিরতির করে কাঁপছে।

আয়ান, আয়মান একে অপরের সাথে দৃষ্টি বিনিময় করে দু'জন একইসাথে গিয়ে বসলো মায়ের পায়ের কাছে। মুখ খুলল আয়ান,

"আমরা জানি মা, ওরা রুবিনা আন্টির ভাইজি এটা মেনে নিতে তোমার কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু কি করবো বলো? ভাগ্যে যা ছিলো তা তো হয়েই গেছে! এখন অন্য কারো অন্যায়ের শাস্তিটা কি আমাদের দিলে সেটা কি ঠিক হবে?"

পারভিন স্নেহের হাত রাখলেন দুই ছেলের মাথায়। তিক্ত অতীতের তীব্র দহনে পুড়ছেন উনি। তবুও ছেলেদের মুখের দিকে চেয়ে দূরে সরিয়ে রাখলেন সেই কষ্ট। গলা অব্দি দলা পাঁকিয়ে থাকা কান্নাগুলোকেও গিলে ফেললেন। বললেন,

"আমার কাছে তোদের খুশি সবার আগে। আর যা হয়ে গেছে তা তো আর আমরা বদলাতে পারবো না৷ প্রিয়া বা প্রিয়ন্তী, কারো প্রতিই আমার মনে কোনো ক্ষোভ নেই।"

এতক্ষণ অতীতের কাঁটা পারভিনের গায়ে ফুঁড়ে দেয়ার অনুশোচনায় মাথা নিচু করে রেখেছিলো প্রিয়া, প্রিয়ন্তী দুজনেই। পারভিনের কথায় সেই নতদৃষ্টি তুলে তার দিক চাইল। তিনি হাত উঠিয়ে দু'জনকে ইশারায় কাছে ডাকলেন। চোখ ভরে উঠলো দু'বোনের। বিনা বাক্যব্যয়ে তারাও ছুটে গিয়ে মাথা রাখলো পারভিনের কোলে।

*******

ভোরে রওনা দেয়ায় ঢাকায় পৌঁছাতে বেশি সময় লাগে নি। সকাল হওয়ায় রাস্তা-ঘাটও খালিই ছিলো। দুপুরের আগেই পৌঁছে গেছে তারা। পিয়াসের গাড়িটা মাত্রই হাজির হয়েছে চৌধুরী নিবাসের সামনে। কিন্তু গাড়ি থেকে নামার সাহস সে পাচ্ছে না। মনে হচ্ছে এখান থেকে নামা মানেই ঝড়ের সম্মুখে অগ্রসর হওয়া। হৃৎপিণ্ডটা ভীষণরকম লাফাচ্ছে আশংকায়। স্বজনী ওকে আস্তে করে ধাক্কা দিয়ে বলল,

"কি হলো? ভিতরে যাবে না?"

ভাবনায় ডুবে এক ধ্যানে বসে থাকা পিয়াস নড়ে-চড়ে উঠলো। এলোমেলো পলক ফেলে বলল,

"হ্যাঁ যাবো। প্রস্তুত করছি নিজেকে ঝড়ের সামনে যাওয়ার জন্য।"

স্বজনী ওকে আশ্বস্ত করে বলল,

"যা হবে, ভালোর জন্যই হবে।"

*******

তৌহিদ ও বৃষ্টি দুজনেই বসে রয়েছে ড্রইংরুমের সোফায়। পিয়াস সকালেই ফোন করে জানিয়েছে, তারা আসছে। আর এটাও বলেছে, বাবা যেনও বাসায় থাকে। তার জরুরি কথা আছে। অগত্যা তৌহিদও ছেলের কথা মেনে বসে রয়েছে বাড়িতে। তাদের অপেক্ষার প্রহর সমাপ্ত করে বাড়িতে ঢুকলো পিয়াস ও স্বজনী। তাদের দেখে বৃষ্টি অস্থির কন্ঠে বললেন,

"তোরা এসেছিস এতক্ষণে? চট্টগ্রাম গিয়েছিলি কেনও? প্রিয়ন্তী ঠিক আছে? ও ফোনও ধরছে না তিনদিন ধরে।"

পিয়াস মায়ের দু কাঁধ ধরে তাকে টেনে এনে সোফায় বসালো। বলল,

"শান্ত হও মা। একে একে সব বলবো!"

তৌহিদ জিজ্ঞেস করলেন,

"কি এমন বলবি যার জন্য আমাকে বাসাতে বসিয়ে রাখলি?"

পিয়াস কোনো হেঁয়ালী করলো না। সরাসরি বলল,

"প্রিয়াকে খুঁজে পেয়েছি।"

*******

আয়মান নিজের রুমে একা বসে ছিলো। মাত্রই গোসল সেরে বেরিয়েছে। অস্থিরতায় ভুলে গেলো তোয়ালেটা বারান্দায় দিতেও। কোনোরকম বিছানায় ছুড়ে ফেলে নিজেও মাথা চেপে ধরে বসে পড়লো বিছানায়। তখন হন্তদন্ত পায়ে তার রুমে প্রবেশ করলো আয়ান। উত্তেজিত স্বরে বলল,

"পিয়াস ফোন করেছিলো, আয়মান। ওরা পৌঁছে গেছে। এবার শুধু সব বলা বাকি! কে জানে কি হবে?"

আয়মান হাত সরালো নিজের কপাল থেকে। চোখ ঘুরিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো ভাইয়ের উপর। বলা বাহুল্য, তার মধ্যকার অস্থিরতা পরিষ্কার বুঝলো আয়মান। দুশ্চিন্তায় বিন্দু বিন্দু ঘাম দেখা দিয়েছে কপালে।

আয়মান উঠে দাঁড়ালো বিছানা ছেড়ে। গম্ভীর কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,

"ভয় পাচ্ছ, ভাইয়া?"

আয়ান মাথা নাড়লো। ভণিতাহীন উত্তর দিলো,

"ভীষণ ভয় পাচ্ছি। প্রিয়াকে হারিয়ে ফেলার ভয়। ও শুধু আমার জীবনের সাথে জুড়ে যায় নি, বরং আমার পুরো জীবনটাই ও হয়ে গেছে। আমি ওকে কোনোভাবেই হারাতে পারবো না!"

আয়মান সন্তুষ্ট চিত্তে হাসলো। বলল,

"তুমি তো স্বীকারই করতে চাও না, তুমি যে ভাবিকে ভালোবাসো। এখন তাহলে আমার কাছে স্বীকার করছো?"

আয়ান বলল,

"ব্যাপারটা স্বীকার, অস্বীকারের নয় আয়মান। আমি মুখে বলি বা না বলি, ওকে ভীষণ ভালোবাসি। আমি তোর ভাই। তোর কাছে স্বীকার না করলেও তুই তোর ভাইয়ের মনের কথা ঠিকই বুঝে যাবি। প্রিয়ার ক্ষেত্রেও তাই। ও উপলব্ধি করেছে আমি ওকে কতটা ভালোবাসি। নাহলে আমার বাবা ওর মা-বাবার খু*নী জানার পর মুখ ফিরিয়ে নিতো না আমার থেকে?"

আয়মান হ্যাঁ সূচক উত্তরে মাথা নাড়লো। বলল,

"ভাবি যখন বুঝেছে, তাহলে বাকিরাও বুঝবে। তুমি একদম চিন্তা করো না, ভাইয়া। ভাবিকে তোমার থেকে কেউ কেড়ে নিয়ে যাবে না।"

আয়ান দুশ্চিন্তাগ্রস্থ ভঙ্গিতে বলল,

"একটা কথা কি জানিস? এইখানে প্রিয়ার পরিবার চৌধুরী পরিবার না হয়ে অন্য পরিবার হলে নির্দ্বিধায় নিজের প্রিয় মানুষটাকে কেড়ে নিয়ে আসার পরিকল্পনা করতাম। কিন্তু বাবার কর্মকাণ্ডই যে আমার হাত-পা বেঁধে ফেলেছে। বাবা ওদের সবকিছু কেড়ে নেওয়ার পর, আমার জন্য তাদের মেয়েকে দাবি করাটা কি অন্যায় হবে না?"

আয়মান উত্তর খুঁজে পেলো না। তার ভাই কথাটা সঠিক বলেছে। ঠিক এই কারণেই তার হাত-পা'ও বাঁধা। এই অতীতের ছায়াটা না থাকলে জীবন হয়তো অন্যরকম হতো! আরও বেশি সুন্দর।

আয়ান আয়মানের থেকে কোনো উত্তর না পেয়ে নিজেই আবার বলল,

"পিয়াস হয়তো এতক্ষণে সব বলেও দিয়েছে, আয়মান। সব শুনলে ওরা আজই চলে আসবে মেয়ে নিতে। আমি তো প্রিয়াকে দিবো না!"

আয়মান নিজের দুশ্চিন্তা ভুলে ভাইয়ের অস্থিরতার চিন্তায় ডুবলো। স্বান্ত্বনা দিয়ে বলল,

"নিতে পারবে না। আমরা প্রিয়া ভাবিকে নিতে দিবো না যাই হয়ে যাক! তোমার ভাবিকে হারাতে হবে না। আমি প্রমিজ করছি। যা করতে হয় করবো, তবে তোমার থেকে ভাবিকে কেড়ে নিয়ে যেতে দেবো না।"

******

পূর্ণবার প্রিয়ন্তী আসার পর ওকে গেস্টরুমে দেয়া হয় নি। সারাদিনের জন্য সায়মার রুমটাই উপযুক্ত মনে হয়েছে। আয়ান, আয়মান বাড়ির সবাইকে বলে দিয়েছে চৌধুরী বাড়িতে আজই খবর পৌঁছাবে। তারা নিশ্চিত, তৌহিদ ও বৃষ্টি ওদের নিতে রাত পোহানোর অপেক্ষা করবে না। তাই সারাদিনের জন্য প্রিয়ন্তীকে সায়মান রুমেই পাঠালো রেস্ট করতে।

প্রিয়ন্তী চোখ বুজে শুয়ে ছিলো বিছানায়। তখন দরজা খুলে ভিতরে ঢুকলো প্রিয়া। হাতে তার স্যুপের বাটি। প্রিয়ন্তী ওর উপস্থিতি টের পেতেই চোখ খুলল। প্রিয়া এসে ওর পাশে বসার পর নিজেও উঠে বসলো। স্যুপ দেখে বলল,

"এটার কি দরকার ছিলো আপু? আমার একটুও খেতে ইচ্ছে করছে না।"

প্রিয়া ধমক দিয়ে বলল,

"তোর খেতে ইচ্ছে করবেও না। না ইচ্ছে করলেও খেতে হবে। আনার আগে যেহেতু পারমিশন নেইনি সেহেতু খাওয়ানোর আগেও অবশ্যই পারমিশন নিবো না।"

বলতে বলতে চামচে স্যুপ তুলে প্রিয়ন্তীর মুখের সামনে ধরলো। প্রিয়ন্তীও কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ খেয়ে নিলো। বোনের এমন আদর পাওয়ার বহুবছর শখ করেছে। আজ যখন সেই আদরটা কপালে জুটেছে তখন ছাড়তে ইচ্ছে করলো না। শুধু উপভোগ করলো মুহুর্তটাকে। খাওয়া শেষে বলল,

"তুমি কিছু খাও নি আপু?"

প্রিয়া বলল,

"এখনই খাবো, নিচে গিয়ে।"

প্রিয়া চলে যেতে চাইলে প্রিয়ন্তী টেনে ধরলো ওর হাত। বলল,

"আরেকটু বসো। কথা আছে তোমার সাথে।"

প্রিয়ন্তীর কথায় প্রিয়া আবারও বসলো। প্রিয়ন্তী প্রথমেই ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করলো বোনের মুখশ্রী। সেখানে ভয়ের ছাপ স্পষ্ট। প্রিয় জিনিস হারিয়ে ফেলার ভীষণ ভয়। প্রিয়া ওকে এইভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে বলল,

"এভাবে কি দেখছিস?"

"তোমাকে দেখছি। তোমার ভাব-ভঙ্গি বলে দিচ্ছে, তুমি আয়ান ভাইয়াকে হারানোর ভয় পাচ্ছ।"

প্রিয়া হতাশ শ্বাস ফেলে বলল,

"ভয় হওয়াটাই কি স্বাভাবিক নয়, প্রিয়ু? কেনও হলো আমাদের এমন অতীত? যা আমাদের ভিতর থেকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। কিভাবে হবে এর সমাধান?"

প্রিয়ন্তী মাথা নুইয়ে ফেলল। বলল,

"সব আমার জন্য হয়েছে। আমি যদি তোমায় খুঁজতে না আসতাম তাহলে এই পরিবারের কাহিনি কোনোদিনও বের হতো না। তুমিও সব অজানা অবস্থাতেই সুখে থাকতে পারতে। আমিই তো মাটির ভিতর থেকে একুশ বছর আগে পুঁতে ফেলা গল্পটাকে আবারও জাগিয়ে তুললাম!"

প্রিয়া কাষ্ঠ হেসে বলল,

"তাহলে তো তুই আমাকেই দোষী বানাচ্ছিস। শুধু আমার দিক না বলে নিজের দিকও বল! আমি যেরকম অবস্থাতে আছি, সেই অবস্থাতে তো তুই নিজেও আছিস। সেটা কার জন্য? আমার জন্যই তো! আমাকে খুঁজতে না এলে তোদের দুইজনের মধ্যে কোনো সম্পর্কই হতো না। আর না থাকতো অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ভয়! আমি তো নিজের থেকেও বেশি ভয় তোদের জন্য পাচ্ছি।"

প্রিয়ন্তী বলল,

"আমাদের জন্য ভয় পাওয়ার কিছু নেই আপু। যা ভাগ্যে আছে তাই হবে। আমি সব মেনে নিতে প্রস্তুত আছি৷ শুধু তোমাকে আর আয়ান ভাইয়াকে আলাদা করলে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারবো না। তুমি তোমার মন থেকে সব ভয় ঝেড়ে ফেলো। আমি প্রমিজ করছি, তোমাদের আলাদা হতে দিবো না। আমার কাছে আমার বোনের সুখ আগে। যা করতে হয় সব করবো, তবুও আমার প্রমিজ পূরণ করবোই।"

স্নিগ্ধ প্রেমের মায়া গল্পটি তিয়াশা চৌধুরী-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক ও রোমান্টিক থ্রিলার গল্প