স্নিগ্ধ প্রেমের মায়া

পর্ব - ৪২

🟢

পূর্ণ চাঁদের জোসনা ছড়াচ্ছে প্রাঙ্গণজুড়ে। মৃদু বাতাসে অল্প-স্বল্প দুলছে গাছের পাতা। চারপাশে অন্ধকার হলেও চাঁদের আলোয় সবকিছু আবছা আবছা দেখা যাচ্ছে। আয়মান ঘাস বিছানো প্রাঙ্গণে প্রিয়ন্তীর অপেক্ষায় পায়চারি করছে।

প্রিয়ন্তী সদর দরজা খুলে আয়ানের যাওয়ার রাস্তা করে দিয়ে নিজে সরে গেলো। আয়ান খোলা দরজা পেয়ে বাঁধাহীন ঢুকে গেছে ভিতরে। আর প্রিয়ন্তী পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে গেছে বাড়ি থেকে।

প্রিয়ন্তী পা টিপে টিপে নি:শব্দে এসে দাঁড়ালো আয়মানের পিছনে। তার হলুদভর্তি হাত দু'টো পিছনে গুটিয়ে রেখেছে সে। ভেজা ঘাস মাড়িয়ে পৌঁছালো ঠিক আয়মানের পিছু। তৎপর দু'হাত সামনে এনে পিছন থেকেই আয়মানের দু'গাল ভর্তি করে ফেলল হলুদ মাখিয়ে। পরপর ছিটকে দূরে সরে দাঁড়ালো। খিলখিল হাসির ঝংকারে মুহুর্তেই উচ্ছ্বসিত হলো নিস্তব্ধ প্রাঙ্গণ।

আয়মান ত্রস্থ গালে হাত বুলালো। তার হাতও ভরে গেলো হলুদে। সে এই বাড়িতে আসার আগেই হাত-মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে এসেছে। আর আসার পর প্রিয়ন্তী আবার হলুদে মাখামাখি করে ফেলেছে। তাই কিছুটা রাগান্বিত হয়ে বলল,

"এটা কি করলে তুমি? পুরো হলুদে মাখামাখি করে ফেললে আমায়!"

প্রিয়ন্তী হাসতে হাসতে বলল,

"আমি তো আমার হবু বরকে তার বিয়ের হলুদ লাগিয়েছি। আপনার সমস্যা কি?"

প্রিয়ন্তীর হলুদে মোড়া হাত দু'টো উপরে তোলা। আয়মান সেদিকে নজর দিয়ে হুট করে তাকে টেনে আনলো কাছে। প্রিয়ন্তী চমকে গিয়ে বলল,

"এ কি করছেন আপনি? খোলা আকাশের নিচে অসভ্যদের মতো জড়াজড়ি শুরু করেছেন! আশ্চর্য, ছাড়ুন আমাকে!"

আয়মান ছাড়লো না। আরও শক্ত করে নিজের সাথে চেপে ধরে দেখতে থাকলো প্রিয়ন্তীর মোচড়ামুচড়ি। সে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করছে কিন্তু পারছে না। কিছুটা বিরক্তি নিয়ে বলল,

"কি শুরু করেছেন? ছাড়তে বলছি না?"

আয়মানের মধ্যে হেলদোল নেই। সে বেশ স্বাভাবিকভাবেই উত্তর দিলো,

"একটু আগেই তো বললে আমি অসভ্য! তাহলে কোন অসভ্য মানুষ আবার সভ্য মানুষের কথা শুনতে যায়?"

প্রিয়ন্তী হাল ছেড়ে দিয়ে বলল,

"আচ্ছা, আপনি সভ্য মানুষ। এবার ছাড়ুন।"

আয়মান ছাড়লো না। বলল,

"ছেড়ে দেবো। আগে একটু হলুদ লাগাই?"

প্রিয়ন্তী বলল,

"আমি অলরেডি হলুদে মাখামাখি হয়ে আছি। আর লাগবে না।"

"তুমি আমাকে লাগিয়েছো, আমি লাগাবো না কেনও?"

বলতে বলতে আয়মান ওর গাল দিয়ে স্পর্শ করলো প্রিয়ন্তীর কপোল। নিজের গালে লাগানো হলুদ মাখিয়ে দিলো প্রিয়ন্তীর গালেও। প্রিয়ন্তী তৎপর ছটফট থামিয়ে স্থির হয়ে গেলো। লজ্জাবনত দৃষ্টি নামিয়ে নিলো নিচে। লজ্জার লালিমা ছেয়ে গেছে তার কপোলজুড়ে। আয়মান এক গালে স্পর্শ করে পরমুহুর্তে অন্য গালেও নিজের গালে লাগানো হলুদ ছোঁয়ালো। প্রিয়ন্তী হৃৎস্পন্দন থমকে উপভোগ করলো এই প্রথম এত কাছাকাছি আসার মুহুর্তটাকে।

*******

হুশে আসতেই প্রিয়া আয়ানের থেকে ছিটকে দূরে সরলো। চাঁপা স্বরে বলল,

"আপনি এত রাতে আমার রুমে এসে বসে আছেন? বাসার সবাই জানে? প্রিয়ন্তীও আমার সাথে এই রুমেই থাকবে। যেকোনো সময় চলে আসবে রুমে। আপনি যান এখন!"

আয়ান বলল,

"সমস্যা নেই। প্রিয়ন্তী অন্যরুমে চলে যাবে। আমি.."

প্রিয়া আয়ানকে আর কিছু বলার সুযোগ পেলো না। ঠেলেঠুলে রুমের বাইরে বের করে দিলো। দরজার বাইরে দাঁড় করিয়ে বলল,

"আজকে বাসায় যান। বাকিটুক কাল!"

আয়ান ভাবুক ভঙ্গিতে বলল,

"কাল? আচ্ছা, আমি অপেক্ষায় থাকবো কিন্তু! কাল নিতে আসবো। তারপর আর কোথাও যেতে দিবো না!"

প্রিয়া বিনা উত্তরে ওর মুখের উপর দরজা আটকে দিলো। উলটো ঘুরে দরজায় পিঠ ঠেকিয়ে লম্বা শ্বাস ফেলল। মুখ ফুলিয়ে বলল,

"অসভ্য লোক! এর সাথে যে কিভাবে আমার বিয়ে হয়ে গেলো, কে জানে?"

********

প্রিয়ন্তী লজ্জামাখা চেহারায় রুমে ঢুকতেই ভ্রু উঁচিয়ে চাইল প্রিয়া। কিছু একটা আন্দাজ করে বলল,

"কই ছিলেন, ম্যাডাম?"

ওর কন্ঠস্বরে ঘোর থেকে বের হলো প্রিয়ন্তী। থতমত খেয়ে বলল,

"কই ছিলাম? আমি...আমি তো নিচে ছিলাম। হ্যাঁ, আমি নিচে ছিলাম।"

প্রিয়া আর কোনো প্রশ্ন করলো না। ওকে শাড়ি চেঞ্জ করতে বলে নিজে ঢুকলো ওয়াশরুমে।

*********

হাস্যজ্বল দিন। কোনো এক কপোত-কপোতীর বিয়ের প্রহর লেখার আনন্দে উদ্ভাসিত দিন। কাল রাতে দেরি করে ঘুমানোর ফলে সকালে ঘুম ভাঙতেও দেরি হয়েছে। প্রায় দুপুর হয়ে গেছে। প্রিয়ন্তী ও স্বজনী দুইজন মিলে বউ সাজাচ্ছে। প্রিয়ন্তী নিজেই শখ করেছে, ও ওর বোনকে বউ সাজে সাজাবে। খয়েরী রঙের লেহেঙ্গা পড়েছে প্রিয়া। সাজ শেষে প্রিয়ন্তী বলল,

"চোখ তুলে একবার নিজেকে দেখো, আপু। বউ সাজে তোমাকে কত সুন্দর লাগছে! আমার বড় জা!"

দুষ্টুমীর সুরে শেষের কথাটা বলল প্রিয়ন্তী। প্রিয়া ওর কান মলে দিয়ে বলল,

"আচ্ছা, তাই?"

প্রিয়ন্তী কানে স্বল্প ব্যাথা অনুভূত হতেই নিচু হয়ে গেছে। বলল,

"হ্যাঁ তাই। আয়ান ভাইয়া অজ্ঞান হয়ে গেলে কি হবে? বিয়েটা লেট হবে না?"

প্রিয়া আরেকটু জোরে চেপে ধরলো ওর কান। প্রিয়ন্তী অস্ফুট শব্দ করে বলল,

"ব্যাথা পাচ্ছি, আপু! ছাড়ো।"

স্বজনী বলল,

"আচ্ছা হয়েছে। প্রিয়া, এবার ওর কানটা ছেড়ে দাও।"

প্রিয়া প্রিয়ন্তীর কান ছেড়ে ঠোঁট বেঁকিয়ে বলল,

"শুধু ভাবি বলল বলে ছেড়ে দিলাম। নাহলে তোর খবর ছিলো!"

প্রিয়ন্তী যেমন প্রিয়াকে সাজিয়েছে, প্রিয়াও তেমন শখ করলো প্রিয়ন্তীকে সাজানোর। স্বজনী বলল,

"ওর বিয়ে তো কাল! তুমি ওকে কাল সাজিয়ে দিও।"

প্রিয়া শুনলো না কারো কথা। জোর করে প্রিয়ন্তীকে বসিয়ে দিলো চেয়ারে। বউ সাজে নিজে লেগে পড়লো ছোট বোনকে সাজাতে।

********

সদর দরজার সামনে বরযাত্রীর পথ আটকে দাঁড়িয়েছে প্রিয়ন্তী। সাথে স্বজনী ও সন্ধ্যাও আছে। সায়মা বরযাত্রীর সাথে দাঁড়িয়ে গভীর ভাবনায় মগ্ন ও কোন পক্ষে যাবে? ভাই পক্ষ? নাকি বান্ধবি পক্ষ?

যেসময় পরিবেশ হৈচৈ এ মুখর থাকার কথা সেসময় সব শান্ত। ছেলেপক্ষ এক বাক্যে মেনে নিয়েছে দাবী। এতেই চরম হতাশার সাগরে ডুবলো মেয়েপক্ষ। সন্ধ্যা বিড়বিড় করে স্বজনীর কানে বলল,

"ভাবি, কম চেয়ে ফেললাম নাকি?"

স্বজনী হতাশার সুরে বলল,

"হয়তো! আরেকটু বেশি চাওয়া উচিত ছিলো।"

এক বাক্যে দাবী মেনে নেওয়ার পিছনেও রহস্য আছে। সিদ্ধান্ত হয়েছিলো মেয়েপক্ষের সাথে বিবাদটা করবে আয়মান। কিন্তু হতাশাজনক ভাবে সে প্রিয়ন্তীকে দেখার পরই ধ্যান-জ্ঞান খুঁইয়ে ডুব মেরেছে। প্রিয়ন্তী পড়েছে হোয়াইট কালারের লেহেঙ্গা। অফ হোয়াইট কালারের সাথে ম্যাচিং করে শুভ্র পাথরের জুয়েলারি। দীঘল চুলগুলো খোলাই রেখেছে আজ। মিষ্টি হাসিটা লেগেই রয়েছে অধরকোণে। সাদা গোলাপের রাজ্য থেকে আসা এক শুভ্রপরীর ন্যায় লাগছে তাকে।

আয়মানের এমন নিশ্চুপতা দেখে আয়ান বুঝে গেলো হবে না কিছুই! তার ভাই যেভাবে ডুবেছে তাকে আর তোলা যাবে না। তাই বাক-বিতন্ডায় না জড়িয়ে চুপচাপ দাবি মেনে নিলো। এমনিতেও দাবি-দাওয়া নিয়ে ঝগড়া করে সময় নষ্ট করার ইচ্ছে তার নেই! শুধু বউ নিয়ে যেতে পারলেই হলো! এমনিতেই বিবাহিত বান্দা এক সপ্তাহ বউ ছাড়া রয়েছে। এটাই বা কম কিসে?

******

প্রথম ধাক্কা দরজার সামনে শেষ হওয়ার পর দ্বিতীয় ধাক্কা আবার জুতো চুরির। এবার শুরু হলো তর্ক। আয়মানের যুক্তি,

"জুতো তো আমরা একবার কিনে এনেছি। তো কিনে আনা জুতো আবার তোমাদের থেকে টাকা দিয়ে নিতে যাবো কোন দুঃখে?"

সন্ধ্যা হেসে শান্ত স্বরে বলল,

"আয়মান ভাইয়া! আপনি না কালকের বিয়ের বর? নতুন বরদের এভাবে ঝগড়া করা সাজে? ভালোয় ভালোয় দাবি মেনে নিন।"

আয়মান কাটকাট উত্তর দিলো,

"নতুন বরের ঝগড়া করা সাজে না? তাহলে নতুন বউ যে লাফিয়ে লাফিয়ে জুতো চুরি করে বেরাচ্ছে, এটা তো খুব মানানসই হচ্ছে তাই না?"

প্রিয়ন্তী পিছন থেকে জোরেশোরে চিমটি কাটলো সন্ধ্যার হাতে। চাপা স্বরে ধমকে উঠলো,

"তোমার ভেজাল না লাগালে হচ্ছিলো না? আমি কথা বললে কাজ হয়ে যেতো। তুমি কি করলে? মাঝ থেকে আমায় ফাঁসিয়ে দিলে!"

সন্ধ্যা ডান হাত দিয়ে ডান কান ধরলো। জিভ কেটে বলল,

"সরি! ভুল হয়ে গেছে!"

আয়মান বলল,

"ঝামেলা না করে জুতোটা দিয়ে দাও।"

প্রিয়ন্তী ওকে নকল করে বলল,

"ঝামেলা না করে টাকাটা দিয়ে দিন।"

এরকম চলল কিছুক্ষণ। আয়ান ক্ষণে ক্ষণে দৃষ্টি বদল করছে একবার আয়মানের দিকে, একবার প্রিয়ন্তীর দিকে। খানিক বাদে বিরক্ত হয়ে বলল,

"চুপ কর ভাই! বিয়ে করতে এসেছি। আদালতে কেস কিভাবে লড়ে সেটা দেখতে আসি নি, যে তোরা এইভাবে বিরোধী পক্ষের মতো তর্কাতর্কি করবি!"

আয়ান রাজি হলো মেয়েপক্ষের দাবি মেনে নিতে। পাওনা বুঝিয়ে দিলো প্রিয়ন্তীর হাতে। সে নাচতে নাচতে সেখান থেকে উপরে চলে গেলো। আর আয়মান ওর দিক চেয়ে আপনমনে বলল,

"দেখো কেমন লাফাচ্ছে! এই লাফালাফি করার জন্যই বিয়েটা একদিন পিছিয়েছে এই মেয়ে। একে কে বোঝাবে আমার এত ধৈর্য নেই। তার উপর আমার সামনে এইভাবে ঘুরে বেড়ানোর মানে হয়?"

*******

দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার পর্ব শেষে নির্ধারিত হলো বিয়ে পড়ানোর মুহুর্ত। প্রিয়ন্তী আর স্বজনী প্রিয়াকে নিচে নিয়ে এলো। প্রিয়া নেমেছে পর থেকেই মাথা ঝুঁকিয়ে রেখেছে। মনে হচ্ছে ফ্লোরে কোনো অপরূপ দৃশ্য আছে, যার দিক থেকে চোখ সরানো মানেই মস্ত বড় ভুল!

প্রিয়া যেমন ফ্লোর থেকে চোখ সরাচ্ছে না, তেমন আয়ান ওর উপর থেকে চোখ সরাচ্ছে না। দু'জনের গায়ের পোশাক একই কালার। আয়ানের গায়েও গাঢ় খয়েরী রঙের শেরওয়ানী। পাগড়ি পড়া মাথায় সেটআপ করে রাখা চুলগুলো ঢাকা পড়েছে। একই রঙে সজ্জিত এই দম্পত্তি অনুষ্ঠানের সবার নজর কাড়লো। দু'জন দুপাশে বসেছে। তাদের মাঝে পাতলা ওড়না দিয়ে পর্দা ফেলা হয়েছে। তবে আয়ানের তাকিয়ে থাকতে খুব একটা অসুবিধা হচ্ছে না!

বিয়ে পড়ানোর আগ মুহুর্তে বৃষ্টি বললেন,

"এক মিনিট, কাজী সাহেব। মেয়ের মা-কে ডেকে নেই।"

হতভম্ব প্রিয়া এতক্ষণ পর নিচ থেকে চোখ তুলে চাইল চাচির দিকে। হতবিহ্বলতায় বলল,

"মা?"

বৃষ্টি প্রিয়াকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

"হ্যাঁ মা।"

পরপর হাঁক ছুড়লেন অদৃশ্য কারো দিকে,

"হেনা আপা, আসবেন না?"

সন্ধ্যার টানাটানিতে বহু কষ্টে ইতস্ততা কাটিয়ে হেনা বেগম এসেছেন স্টেজে। তবুও ছেলে-মেয়েদের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন আড়ষ্ট ভঙ্গিতে। মুখ কাচুমাচু করে বললেন,

"আমি না আসলে হতো না?"

বৃষ্টি মুচকি হেসে উত্তর দিলেন,

"আপনি না আসলে কিভাবে হতো? আপনার মেয়ে আর আপনি থাকবেন না ওর বিয়েতে? তা কি হয়?"

প্রিয়া বলতে চাইল,

"কিন্তু ছোট মা.."

বৃষ্টি থামিয়ে দিলেন ওকে মাঝপথে। বললেন,

"জানি তুই কি বলবি! উনি যে ভুল করেছেন তার জন্য উনি অনুতপ্ত। তোরও উচিত তাকে মাফ করে দেয়া। আর সত্যি কথা বলতে, আমি এসেছিলাম তোদের একেবারে নিয়ে যেতেই! অত:পর উনার কথাতেই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে দুই ভাইয়ের হাতে দুই মেয়েকে তুলে দিচ্ছি আমি।"

বিস্ময়ে কথা হারিয়ে ফেলল প্রিয়া। আয়ানও সমান হতভম্ব। সবাই অবাক হয়েছে এই কথা শুনে। কেউ ভাবে নি, শেষ মুহুর্তে হেনা বেগম এসে এত বড় উপকারটা করবেন!

নিজেকে সামলে টলোমলো পায়ে উঠে দাঁড়ালো প্রিয়া। পরপর গিয়ে জড়িয়ে ধরলো হেনা বেগমকে। হেনা বেগম অশ্রুসিক্ত নয়নে ওকে বললেন,

"আমাকে মাফ করে দিবি তো, প্রিয়া?"

প্রিয়া উত্তরে কিছুই না বলে শুধু অশ্রু বিসর্জন দিলো। হেনা বেগম ভুল করেছে আর অনুতপ্তও হয়েছে। আর যে ভুল করে নিজের ভুল স্বীকার করে, তার প্রতি ক্ষোভ পুষে রাখতে নেই। প্রিয়াও মায়ের প্রতি কোনোরুপ ক্ষোভ রাখলো না। জন্মধাত্রী মা না হলেও এতগুলো বছরে মায়ের আদরে বড় তো করেছেন উনিই!

আয়ান-প্রিয়ার বিয়েটা সবার উপস্থিতিতেই হলো। গতবার যখন কাজি অফিসে বিয়ে করলো তখন সারা-সায়মা আর আয়ানের একটা বন্ধু ছিলো। আর আজ আছে পুরো পরিবার। সবাইকে সাক্ষী রেখে পূর্ণবার কবুল বলল তারা।

******

প্রিয়ন্তী ভীষণরকম খুশি। সবাইকে এইভাবে একসাথে দেখবে কোনোদিন কল্পনাও করে নি। কল্পনা না করলেও সপ্নের ন্যায় বাস্তব রুপ লাভ করেছে এই দৃশ্য। খুশিতে নাচতে নাচতে সবার হাতে মিষ্টি তুলে দিচ্ছে ও।

আয়মান তীক্ষ্ণ চোখে পরখ করছে প্রিয়ন্তীকে। দৃষ্টি প্রিয়ন্তীর উপর থাকলেও মন ভাবছে অনেককিছু। বিস্তর ভেবে একটা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল ও। হঠাৎ ধুপধাপ পা ফেলে নেমে গেলো স্টেজ থেকে। সোজা গিয়ে হাজির হলো প্রিয়ন্তীর সামনে। কোনো কথাবার্তা ছাড়াই খপ করে চেপে ধরলো ওর হাত। টেনেটুনে নিয়ে এলো স্টেজের উপর। অত:পর কাজিকে উদ্দেশ্য করে বলল,

"কাজি সাহেব! আয়ান ভাইয়া আর প্রিয়া ভাবির বিয়ে পড়ানো হয়ে গেছে না? এবার আমাদেরটাও পড়িয়ে ফেলুন। দু'দিন ঝামেলা করার কি দরকার? একদিনেই দুটো বিয়ে সেরে ফেলি।"

বিস্ময়ে হা হয়ে গেলো স্টেজে উপস্থিত সবাই। বিস্মিত প্রিয়ন্তী চিৎকার ছুড়লো,

"কি?! বিয়ে? আমাদের বিয়ে তো কাল হওয়ার কথা!"

আয়মান তেঁতো স্বরে উত্তর দিলো,

"বিয়েটা কাল হওয়ার কথা ছিলো কেনও? কারণ তুমি যেনও তোমার বোনের বিয়েতে আনন্দ করতে পারো। তো সেটা তো হয়েছেই! বোনের বিয়ে ভালোই লাফাতে লাফাতে ইঞ্জয় করেছো। এখন বোনের বিয়ে শেষ, এবার নির্দ্বিধায় তুমিও বিয়ে করতে পারো।"

এক প্রকার লাফিয়ে উঠলো সব ভাই-ভাবি, বোন। অর্থাৎ মুরুব্বিরাই ধাক্কা সামলাতে পারছে না, কিন্তু ছোটরা ভীষণ আনন্দিত। স্বজনী উৎফুল্ল স্বরে বলল,

"ভাইয়া, তাহলে কি আমি প্রিয়ন্তীকে বউ সাজিয়ে আনবো?"

আয়মান বলল,

"সেটার দরকার পড়বে না, ভাবি। আপনি শুধু ঘোমটাটা আনুন। তাহলেই হবে। বড় ভাইকে বিয়ে করাতে এসে নিজেও বউ নিয়ে যাবো! ওয়াও, কি ইউনিক বিয়ে!"

স্বজনী ত্রস্থ মাথা দুলিয়ে সায় দিলো এই কথাতেই। ছুটে গেলো প্রিয়ন্তীর রুমে ওড়না আনতে। এক মিনিটেই সুতোর কারুকাজ করা মেরুন রঙের ওড়না নিয়ে নেমে এলো নিচে। ছুটে যাওয়া-আসার দরুণ হাঁপাচ্ছে ও। জোরে শ্বাস নিয়ে ওড়নাটা আয়মানের সামনে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

"নিয়ে এসেছি ভাইয়া। এইবার?"

আয়মান স্বজনীর হাত থেকে ওড়নাটা তুলল নিজের হাতে। চোখ বুলিয়ে পরমযত্নে খুলল ওড়নার একেকটা ভাজ। অত:পর নিজ হাতে সেটা পড়িয়ে দিলো প্রিয়ন্তীর মাথায়। শুভ্র রঙের লেহেঙ্গার সাথে মেরুন রঙের ঘোমটা। বিস্ময়ে থম মেরে থাকা প্রিয়ন্তীকে অদ্ভুত সুন্দর লাগছে এই ঘোমটাতে। ওর বড়বড় হয়ে থাকা চোখের দিকে তাকিয়ে আয়মান বলল,

"চলো, এইবার বিয়ে করে ফেলি।"

আয়মান নিজেও আজ সফেদরঙা পাঞ্জাবি পড়েছে। দু'জনকে পাশাপাশি কোনো মেঘের রাজ্যের রাজা-রানী মনে হচ্ছে।

এতক্ষণে বিস্ময় সামলে নিয়েছে সবাই। যেহেতু আয়মান বলেছে বিয়ে করবে, তাহলে বিয়ে করবেই! তাই বাঁধা দিলো না কেউ। রাজি হয়ে গেলো সবাই। বৃষ্টি একবার নজর বুলালেন আয়ান-প্রিয়ার উপর। পরমুহুর্তেই আবার চোখ ঘুরানের আয়মান-প্রিয়ন্তীর দিকে। অপূর্ব সুন্দর দুই জোড়া শালিকের নজরজাড়া দৃশ্য দেখে চোখ জুড়িয়ে গেলো তার। প্রশান্তির হাসি হেসে মনে মনে কয়েকবার উচ্চারণ করলেন,

"মাশাল্লাহ!"

কাজি কবুল বলতে বললে অধৈর্য পুরুষ বেশ দ্রুতই কবুল বলল। অপরপক্ষে প্রিয়ন্তী সময় নিলো কিছুটা। ধীরে-সুস্থে কবুল বলে উপভোগ করলো সম্পূর্ণরুপে আয়মানের হয়ে যাওয়ার মুহুর্তেটাকে।

মনে পড়লো এক সপ্তাহ আগেই কতটা ভয়ে ছিলো আয়মানের জীবন থেকে চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার। আর আজ শুধুমাত্র একটা শব্দ তিনবার আউড়ে তার বউ হয়ে গেলো প্রিয়ন্তী। সমস্ত দুশ্চিন্তা, শত্রুতা ও তিক্ততার অবসান ঘটলো এই দুই যুগলের মিলনে। পূর্ব অতীতের চিহ্ন মুছে গেলো তাদের সবার জীবন থেকে। শুধু রইলো সুন্দর ভবিষ্যতের মিষ্টি সপ্ন!

স্নিগ্ধ প্রেমের মায়া গল্পটি তিয়াশা চৌধুরী-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক ও রোমান্টিক থ্রিলার গল্প