স্নিগ্ধ প্রেমের মায়া

পর্ব - ৩৪

🟢

(প্রাপ্তবয়স্ক ও মুক্তমনষ্কাদের জন্য উন্মুক্ত

)

শীতের সময় থাকার পরও আয়মান ঘামছে। কপাল থেকেও ঘাম ঝড়ে পড়ছে। প্রিয়ন্তীর অজ্ঞান হয়ে যাওয়া দেখেই ঘাবড়ে গেছে ও। কোলে তুলে আনলো গাড়ির সামনে। কোনোভাবে সিটে বসিয়েই নিজের পড়নের জ্যাকেট খুলে ছুড়ে মারলো ব্যাকসিটে। প্রিয়ন্তীর গাল চাপড়ে ঘাবড়ানো গলায় বলল,

"প্রিয়ন্তী, প্রিয়ন্তী? চোখ খুলো!"

প্রিয়ন্তীর কোনো হেলদোল নেই। ভয় পেয়ে মুখটা একদম ফ্যাকাসে হয়ে গেছে ওর। নার্ভাসনেসে আয়মানের মাথা ঠিকঠাক কাজ করছে না। হাত উঠিয়ে ঘাম মুছল কপালের। পরপর কাঁপা হাতে গাড়ির মধ্যে রাখা পানির বোতল তুলে নিলো। পানির ফোঁটা পড়তেই হুশে আসলো প্রিয়ন্তী। পিটপিট করে চোখ খুলে চাইল। অন্যদিকে ওকে চোখ খুলতে দেখে সস্থির নিশ্বাস ফেলল আয়মান। গভীর শ্বাস নিয়ে বলল,

"ঠিক আছো তুমি?"

প্রিয়ন্তী উত্তর দিতে চাইল, সে ঠিক আছে। কিন্তু কিছু বলার আগেই থেমে গেলো বাকশক্তি। হিতাহিতজ্ঞান হারিয়ে কোনো কথাবার্তা ছাড়াই আয়মান জড়িয়ে ধরেছে ওকে। প্রিয়ন্তীর মাথাটা শক্ত করে চেপে ধরেছে নিজের বুকের সাথে। স্তব্ধ প্রিয়ন্তী পরিষ্কার উপলব্ধি করছে আয়মানের দ্রুতগতির হৃৎস্পন্দন। প্রত্যেকটা স্পন্দনের সাথে সাথে ওর নিজেরও হৃৎস্পন্দন পাল্লা দিয়ে বেড়ে যাচ্ছে। আয়মান ওকে জড়িয়ে রেখেই বলল,

"বিপদ আমার উপর দিয়ে যাওয়ার কথা। তুমি কেনও বারবার মাঝখানে এসে পড়ছো? নিজের উপর এইভাবে বিপদ টেনে নিয়ে কি আমাকে মারতে চাইছো নাকি?"

প্রিয়ন্তী পলকে বুঝে গেলো আয়মানের অস্থিরতার মাত্রা। এটাও বুঝলো এই সমস্ত অস্থিরতা শুধু তার জন্য। এতে অন্তর যতটা না প্রশান্তি পেলো তার থেকে বেশি ভর করলো লজ্জা। হৃৎস্পন্দনের ধুকপুক শব্দটা বেড়ে যাচ্ছে ক্রমশ। আয়মানের হাতের উপর নিজের হাত রেখে ওকে আশ্বস্ত করে বলল,

"ঠিক আছি তো আমি! এত চিন্তা করবেন না।"

হঠাৎ আয়মানের ফোনে শব্দ করে বেজে উঠলো রিংটোন। শব্দ পেয়ে আয়মান প্রিয়ন্তীকে ছেড়ে দিয়ে পকেট থেকে ফোন বের করে রিসিভ করলো। হ্যালো বলার আগেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো সায়মার কান্নারত কন্ঠস্বর,

"ভাইয়া, আয়ান ভাইয়ার কিছু একটা হয়েছে। অজ্ঞান হয়ে গেছে আর শ্বাসও নিচ্ছে থেমে থেমে। আমরা ভাইয়াকে নিয়ে হসপিটাল যাচ্ছি। তুমি আর প্রিয়ন্তী জলদি ***** হসপিটালে এসে পড়ো।"

বিশাল হতাশায় কপালে হাত তুলে ফেলল আয়মান। কোনো মতো আচ্ছা বলে ফোন কেটে পকেটে ভরলো।আশপাশ দৃষ্টি বুলিয়ে শান্ত করতে চাইল মস্তিষ্ককে। চতুর্দিক থেকে আসা বিপদে কূল হারা নাবিকের ন্যায় হাবুডুবু খেলো এইবার। প্রিয়ন্তী ওর অবস্থা দেখে জিজ্ঞেস করলো,

"কি হয়েছে?"

আয়মান ত্রস্থ এসে বসলো ড্রাইভিং সিটে। বলল,

"ভাইয়াকে নিয়ে হসপিটাল যাচ্ছে সবাই। আমরাও সেখানেই যাচ্ছি।"

সিটবেল্ট লাগানোর পর মেসেজের টুংটাং শব্দে আবার ফোন হাতে তুলল। ছোট্ট একটা মেসেজে মুচকি হাসি ফুটলো মুখে। লম্বা শ্বাস ফেলে বলল,

"এটা আগে বললেই হতো!"

প্রিয়ন্তী বিস্মিত কন্ঠে বলল,

"কি হয়েছে ভাইয়ার? কি আগে বললে হতো?"

আয়মান বলল,

"কিছু হয় নি। হসপিটাল চলো।"

********

আয়ানের সাথে হসপিটাল গেলো প্রিয়া, পারভিন ও ফারদিন। আর কেউ জোর-জবরদস্তি করেও যেতে পারলো না। সায়মা সবচেয়ে বেশি জেদ ধরেছিলো, কিন্তু কোনো কাজ হলো না। ব্যর্থ হয়ে হতাশার শ্বাস ফেলা ছাড়া কিছু করার রইলো না!

********

আয়মান-প্রিয়ন্তী মাত্র হসপিটাল পৌঁছেছে। খানিকক্ষণের মাঝে এসে গেলো আয়ানের কেবিনের সামনেও। প্রিয়া ও পারভিন, দুজনেই কাঁদতে কাঁদতে চোখের পানিতেই যেনও সমুদ্র বানিয়ে ফেলবে। ফারদিন পারভিনকে বুঝিয়ে কিছুটা শান্ত করতে পারলোও প্রিয়াকে শান্ত করা যাচ্ছে না। কাঁদতে কাঁদতে হেচকি উঠে গেছে ওর। আয়মান প্রিয়ন্তীকে ইশারায় বলল, প্রিয়ার কাছে যেতে। সেও নি:শব্দে সায় জানিয়ে গেলো প্রিয়ার কাছে।

প্রিয়ন্তী ওকে সামলাতে গেলেও প্রিয়া ওকে পেয়ে আরও বেশি জোরে কেঁদে ফেলল। চোখ-মুখ ফুলে গেছে ওর কান্নার তোঁপে। তখন সেখানে এসে উপস্থিত হলো ডক্টর। তথ্য শোনালো হতাশার। বলল,

"আমরা কোনো গ্যারান্টি দিতে পারছি না। অবস্থা বেশি খারাপ হলে আইসিইউতে নেওয়া হবে। কিন্তু এখন কিছু বলা যাচ্ছে না।"

এই কথা শুনে প্রিয়া একদম ভেঙে পড়লো। প্রিয়ন্তীর নিজেরও খারাপ লাগছে প্রচুর। কিন্তু কান্না করতে পারছে না। কেননা ও নিজেও ভেঙে পড়লে প্রিয়াকে সামলাবে কে?

এদের সকলের মধ্যে আয়মানই কেবল অভিব্যক্তিহীন। সে ডক্টরকে প্রশ্ন করলো,

"আমরা কি কেবিনে পেসেন্টের কাছে যেতে পারি?"

ডক্টর কেবিনের ভেতর যাওয়ার অনুমতি দিয়ে চলে গেলো সেখান থেকে। সবাই একযোগে ঢুকলো কেবিনে। পারভীন বসলো ছেলের পাশে। কিছুসময় নিরবে অশ্রুপাত করার পর আয়মান বলল,

"মা, এখানে বেশিসময় থাকার দরকার নেই। তুমিও অসুস্থ হয়ে পড়বে। এরচেয়ে ভালো তুমি বাসায় যাও। আমরা তিনজন থাকি এখানে।"

পারভিন প্রথমে একদমই রাজি ছিলো না। কিন্তু আয়মান বুঝিয়ে-সুঝিয়ে রাজি করিয়ে ফেলল তাকে। কিছুক্ষণ পর চাচার সাথে মা-কে পাঠিয়ে দিলো।

পারভিন চলে যেতেই আয়ানের বেডের পাশের চেয়ারে বসে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল প্রিয়া। ওর কান্নার শব্দে অল্প অল্প চোখ খুলল আয়ান। কিন্তু প্রিয়া নিচে তাকিয়ে থাকার ফলে সেই দৃশ্য তার দৃষ্টিগোচর হলো না। কিন্তু চোখে পড়ে গেলো প্রিয়ন্তীর। সে অবাক বিস্ময়ে মৃদু চিৎকার দিয়ে বলল,

"আরে, আয়ান ভাইয়া চোখ খু...উম...উম..!"

আয়মান পারভিন ও ফারদিনকে নিচে ছেড়ে এসে মাত্রই কেবিনে ঢুকেছে। তখনই প্রিয়ন্তীর চিৎকার শুনে একপ্রকার ছুটে এসে মুখ চেপে ধরেছে ওর। ফলাফল, অর্ধেক কথা বলেই উম উম্ করতে থাকলো প্রিয়ন্তী। আয়মান চাপা স্বরে ধমকে উঠলো,

"চুপ করো। চেঁচিয়ে কি সবাইকে জানাবে নাকি?"

প্রিয়াও প্রিয়ন্তীর চিৎকার শুনে কান্না ভুলে ওর দিকে চাইল। চোখে-মুখে কৌতুহলের ছাপ। আয়মান প্রিয়ন্তীর মুখ ছেড়ে দিয়ে গিয়ে কেবিনের দরজা বন্ধ করলো। জানলা বন্ধ করেও পর্দা টেনে দিলো। এমন ব্যবস্থা করলো যেনও ভিতরকার কথা বাইরে অব্দি না পৌঁছায়। প্রিয়া ও প্রিয়ন্তী শুধু অবাক চোখে দেখে গেলো আয়মানের কর্মকান্ড।

আয়মান সব বন্ধ করে আশেপাশে তাকিয়ে একবার পরখ করে দেখলো সব ঠিক আছে কি না! অত:পর বলল,

"ভাইয়া, সব বন্ধ। এবার উঠতে পারো।"

প্রিয়াকে অবাক করে দিয়ে আয়ান অক্সিজেন মাস্ক খুলে উঠে বসলো। অভিনয় করে বলল,

"বাপরে বাপ! বিষ খাইয়ে মেরেই ফেলতে চাইছিলো আমাকে। ভাগ্যিশ বেঁচে গেছি!"

প্রিয়া হা করে চেয়ে ওর কথা শুনছিলো। আয়ানের কথা শেষ হওয়ার পর ঝাঁঝালো কন্ঠে বলল,

"আপনার কিছু হয় নি? আপনি অভিনয় করছিলেন? পাষাণ পুরুষ কোথাকার! আর আমি কি না আপনার চিন্তায় মরে যাচ্ছিলাম?"

বলতে বলতে হামলা করে বসলো আয়ানের উপর। এলোপাথাড়ি কিল-ঘুষি মারতে লাগলো ওর বুকে। আয়ান মার খেয়েও হাসছে। প্রিয়ার চোখ থেকে এখনও পানি বেরোচ্ছে। তবে এটা ঠিক কষ্ট পাওয়ার কান্না নয়! বুক থেকে এক বিশাল দুশ্চিন্তার পাথর সরে যাওয়ায় খুশির কান্না!

কিছুক্ষণ এভাবে চলার পর আয়ান প্রিয়ার দু'হাত ধরে ফেলল। ওকে শান্ত করতে জড়িয়ে ধরলো শক্ত করে। কিন্তু প্রিয়া শান্ত হচ্ছে না। নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা অব্যাহত রেখে বলল,

"ছাড়ুন আমাকে। একদম ধরবেন না। আপনার সাথে কোনো কথা নেই। আমাকে কি টেনশনে রেখে মারতে চাইছিলেন?"

প্রিয়ন্তী মুগ্ধ দৃষ্টিতে দেখছে ওদের এই কান্ড। অধরকোণে ফুটে উঠেছে মিষ্টি এক টুকরো হাসি। আয়মান ভাই-ভাবির থেকে চোখ সরিয়ে তাকালো প্রিয়ন্তীর দিকে। মুহুর্তেই একরাশ মুগ্ধতা আষ্টেপৃষ্ঠে ঘিরে ধরলো তাকে। আয়মান নিজেই অবাক হয় নিজের এই ভাবনায়। বিরক্তি কবে যে ধীরে ধীরে মুগ্ধতায় রূপ নিলো টেরই পায় নি! আর এখন জীবনের সকল মুগ্ধতা যেনও এই রমণীকে ঘিরেই!

আয়মান প্রিয়ন্তীকে উদ্দেশ্য করে বলল,

"এইভাবে কি দেখছো?"

প্রিয়ন্তী মুগ্ধ হেসে লম্বা শ্বাস নিয়ে বলল,

"কি সুন্দর, তাই না?"

আয়মান অনিমেষ ওর দিকে চেয়ে বলল,

"একটু বেশিই সুন্দর!"

প্রিয়ন্তী হঠাৎ হাসি বন্ধ করে ওর দিক চাইল। সন্দিহান হয়ে বলল,

"আপনি কি করে জানলেন আয়ান ভাইয়ার কিছু হয় নি?"

আয়মান স্মিত হেসে বলল,

"সায়মা ফোন করে কান্নাকাটি করে খবরটা দিলো। বিনা কারণে পাঁচ মিনিট আমাকে টেনশনে রেখে মেসেজ দিয়ে কাহিনি বলল।"

প্রিয়ন্তী জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে বলল,

"কি কাহিনি?"

"ভাইয়ার মেসেজের স্ক্রিনশট।"

আয়মান ফোন বের করে সায়মার দেয়া স্ক্রিনশটটা দেখালো। সেখানে সায়মার উদ্দেশ্য আয়ানের দেয়া একটি মেসেজ। গোটা গোটা অক্ষরে লেখা,

"নাতাশা পায়েসে বিষ মিশিয়েছে আমাকে মারার জন্য। আমিও ওটা খেয়ে মরে যাবো। তারপর একটু বেশি করে কান্নাকাটি করিস, বোন আমার! আবার অভিনয় করতে বলেছি বলে হাসিস না। নাহলে সত্যি সত্যি মরতে হবে!"

মেসেজের ভাষা পড়ে প্রিয়ন্তী হাসি থামাতে পারলো না। হাসতে হাসতে বলল,

"আপনারা পারেনও সবগুলো মিলে! কিন্তু বিষ মিশিয়েছে এটা দেখলো কে?"

আয়মান বলল,

"নাতাশা হয়তো ভেবেছে ওর উপর সরাসরি নজর রাখবো আমরা। কিন্তু নজর তো লুকিয়ে রাখছিলো। সারা দেখে ফেলেছে বিষ মেশাতে। তারপর আর কি? কাজ হয়ে গেলো!"

প্রিয়াও শুনলো সব। শেষে মুখ গোমড়া করে বলল,

"কমপক্ষে আমাকে বলে নিলেও পারতে তোমরা। এইভাবে টেনশনে মরতে হতো না আমাকে!"

আয়ান বলল,

"বলার সুযোগ পেলাম কই? আর আমিই বা কি জানতাম তুমি এভাবে কান্নাকাটি জুড়ে দিবে!"

প্রিয়া চেঁতে বলল,

"একদম চুপ। আপনার সাথে কোনো কথা বলছি না আমি। ধোকাবাজ! কোনো কথা বলার চেষ্টা করবেন না।"

আয়ান বলল,

"আচ্ছা, আচ্ছা, কথা বলা লাগবে না। তুমি শুধু প্ল্যানিং শুনো। এবারের কাজ কিন্তু তোমার।"

*******

দরজার খটখট শব্দে নাতাশা বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। বাড়িতে সবাই ব্যস্ত নিজেদের শোকে। নাতাশা সেই সুযোগে দরজা আটকে বসেছে গেস্টরুমের। হঠাৎ নক করার শব্দ পেয়ে উঠে গিয়ে দরজা খুলল। পরপর চোখের সামনের দৃশ্য দেখে বিস্ময়ে মণিগুলো অক্ষিকোটর ত্যাগ করে বেরিয়ে আসতে চাইল।

প্রিয়া দাঁড়িয়ে দরজার সামনে। অবস্থা তার ভীষণরকম বিধ্বস্ত। উষ্কখুষ্ক চুলে পাগলের বেশ ধরেছে যেনও! চোখ-মুখ লাল হয়ে ফুলে রয়েছে। নাতাশা ওর এই রুপ দেখেই আমতা-আমতা করে জিজ্ঞেস করলো,

"তু..তুমি?"

তৎক্ষণাৎ প্রিয়া বিনা বাক্যব্যয়ে ঠাস করে কষিয়ে চড় মারলো নাতাশার গালে। এক থাপ্পড়ে তাল হারিয়ে হুমড়ি খেয়ে নিচে পড়লো সে। মাথাটা ঝিমঝিম করে উঠলো তার। সঙ্গে বাড়লো গালের উপর সশব্দে চড় মারার দরুণ জ্বালা। প্রিয়ার থেকে হঠাৎ এরকম আচরণ বিন্দুমাত্রও আশা করে নি। তাই ভুলে গেলো প্রতিক্রিয়া দিতেও!

তবে প্রিয়া দেরি করে নি। এক থাপ্পড়ে নিচে পড়ার পরই তৎপর আবারও তুলে নাতাশাকে। এবার চড়টা পড়লো অন্যগালে। এইভাবেই লাগাতার কয়েকটা চড় মেরে নাতাশাকে বিধ্বস্ত করে তবেই দম নিলো ও। আঙুলের স্পষ্ট ছাপ পড়ে গেছে তার গালে। প্রিয়া কান্নাভেজা কন্ঠে বলল,

"কেনও করলে এমন? আয়ানকে না মা*রলেও পারতে তুমি! কেনও আমার স্বামীকে মা*রলে?"

শিরদাঁড়া বেয়ে শীতল স্রোত নেমে গেলো নাতাশার। ভয়ে ও আতঙ্কে মুখখানা ফ্যাকাশে বর্ণ ধারন করলো। নিজের পক্ষে সাফাই দিলো,

"আ..আমি মারি নি। আমি কেনও মারতে যাবো?"

তখন প্রিয়ার পিছু পিছু রুমে ঢুকলো আয়মান, প্রিয়ন্তী, সারা ও সায়মা। সারা রুমে ঢুকেই জোর দিয়ে বলল,

"আয়ান ভাইয়াকে নাতাশাই মেরেছে। আমি দেখেছি ওকে পায়েসে বিষ মেশাতে। আমার কাছে ভিডিও-ও আছে।"

সবাই মুখে বেদনাবিধুর ভাব ধরে রেখেছে। কেউ বুঝতে পারবে না এগুলো তাদের অভিনয়। সারার ভিডিও-এর কথা বলায় কাজ হলো এইবার। নাতাশা ঘাবড়ে গিয়ে বলল,

"আমি..আমি আসলে...!"

আবারও জোরেশোরে চড় পড়লো গালে। একের পর এক আক্রমণে বিপন্ন হয়ে হাল ছাড়লো নাতাশা। বলে ফেলল,

"হ্যাঁ। আমিই মিশিয়েছি বি*ষ। মরেছে ভালো হয়েছে। আমার বদলা পূরণ!"

প্রিয়া রাগী কন্ঠে বলল,

"কিসের বদলা? তোমার সাথে এই পরিবারের কোনো সম্পর্ক নেই তো কিসের বদলা নিবে তুমি? কে তোমার কি ক্ষতি করেছে? তুমি আয়ানের আগে ফারহানকেও মে*রেছো।"

নাতাশা এইবার অস্বীকার করলো না। বুঝতে পেরেছে এইবার মিথ্যা বললে আবারও থাপ্পড় পড়বে গালে। তাই ভালো মানুষের মতো স্বীকার করে ফেলল,

"হ্যাঁ আমিই মেরেছি দুইজনকে। আমি আয়মানকেও মারতে চেয়েছি। কিন্তু পারি নি প্রিয়ন্তীর জন্য। ও ভুল সময়ে এসে আয়মানকে বাঁচিয়ে নিয়েছে।"

তখন নাতাশাকে অবাক করে দিয়ে রুমে ঢুকলো আয়ান। সম্পূর্ণ সুস্থ-সবল। ওকে দেখে বিস্ময়ে আকাশ থেকে পড়লো নাতাশা। হতভম্ব হয়ে বলল,

"এ তো মরে নি! তাহলে এতক্ষণ?"

আয়ান রুমে আসার পর প্রিয়া কান্নাভেজা চোখ মুছে ফেলেছে। উষ্কখুষ্ক চুলগুলোও দ্রুত বন্দি করলো হাত খোঁপায়। বলল,

"না মরে নি। তোমার স্বীকারোক্তি নেয়ার জন্য এই নাটক করলাম। তুমি যে মাত্র স্বীকার করলে তুমি দু'টো খু*ন করেছো, সেটার ভিডিও করেছি আমরা। এরপর সোজা আইনত ব্যবস্থা নেয়া হবে।"

নাতাশা তাচ্ছিল্য করে বলল,

"আইন? কিসের আইন? যেটা টাকা দিয়ে কিনে নেয়া যায়? আয়মানের বাবা যখন আমার মামাকে খু*ন করলো তখন কই ছিলো এই আইন ব্যবস্থা?"

আয়মান অবাক হয়ে বলল,

"বাবা খু*ন করেছে তোমার মামাকে? কিন্তু কেনও?"

নাতাশা বলল,

"কারণ আমার মামা উনার আরও দুটো খু*নের স্বাক্ষী ছিলো। পরিকল্পিতভাবে এ*ক্সি*ডেন্ট ঘটিয়ে দুটো মানুষকে হ*ত্যা করেছিলেন উনি। আর নাম দিয়েছিলেন এক্সি*ডেন্টের। শুধু তাই নয়! একটা এক বছরের বাচ্চা ছিলো তাদের সাথে। সেই বাচ্চাটাকেও নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছেন।"

পুরো কামরা স্তব্ধ হয়ে গেলো কিছু সময়ের জন্য। এইসকল ইতিহাস আয়ান-আয়মান জানে। এছাড়া সারা-সায়মা কিছুই জানে না এসবের ব্যাপারে। নিজের বাবার ব্যাপারে এইসব হজম হচ্ছিলো না তাদের। অপেক্ষায় ছিলো ভাইরা হয়তো উচিত জবাব দিবে। কিন্তু তাদের রক্তশূণ্য মুখশ্রী দেখেই আন্দাজ করে ফেলল, নাতাশা যা বলছে সত্যিই বলছে!

সবথেকে বেশি খারাপ অবস্থা হয়েছে প্রিয়ন্তীর। হাত-পা কাঁপছে খারাপভাবে। সোজা হয়ে দাঁড়াতেও পারছে না ও। হঠাৎ সম্পূর্ণ অতীত সামনে এসে পড়ার ধাক্কাটা সামলাতে পারছে না। এক বছরের বাচ্চার কথা শুনে নির্দ্বিধায় মন ধরে ফেলেছে মেয়েটা প্রিয়া। আর খু*ন হওয়া দু'জন মানুষ তার চাচা-চাচি। ঠিক এই কারণেই তবে দুই পরিবারের এত বছরের শ*ত্রুতা? সবদিক ঘুরেফিরে এই ভাবনাই এলো প্রিয়ন্তীর মাথায়। এইজন্যই ভাবি বলতো, আয়মান ওর জন্য নি*ষিদ্ধ আকর্ষণ! যা কোনোদিনও পাওয়া সম্ভব না। নিজের ভাইয়ের খু*নির ছেলের হাতে তৌহিদ কোনোদিনও মেয়ে তুলে দিবে না!

এইসব অতীত কি জানতো পিয়াস? এইজন্যই তার মা-বাবাকে এখনও বলে নি প্রিয়ার কথা। কি হবে যখন প্রিয়া জানতে পারবে, তার মা-বাবার খু*নীর ছেলের সাথেই বিয়ে হয়েছে তার। তার মা-বাবার খু*নীর ছেলের সাথেই সারাজীবনের জন্য বাঁধা পড়েছে ও।

আয়ান-আয়মানও নিশ্চুপ। ভাষা হারিয়ে ফেলেছে কিছু বলার। কিন্তু বেশিক্ষণ সইলো না এই নিস্তব্ধতা। যখন বুঝলো সবাই তাদেরই উত্তরের অপেক্ষায়, তখন মুখ খুলল আয়মান। বলল,

"বুঝলাম যা করেছে সব জুনাইদ খান করেছে। মানলাম দু'টো খু*ন লুকাতে তোমার মামাকেও খু*ন করেছে। কিন্তু উনি জানলো কিভাবে তোমার মামা সব জেনে গেছে? আমাদের তো পূর্ব আত্মীয়তাও ছিলো না?"

উত্তর মিলে গেলো সবার। বুঝে গেলো, জুনাইদ আসলেই খু*ন করেছে তাদের। আহত শ্বাস ফেলল সারা-সায়মা।

নাতাশা থতমত খেলো আয়মানের প্রশ্নে। কিছুক্ষণ ভেবে দেখলো সত্যিটাই বলে দেয়া উচিত। তাই বলে দিলো,

"মামা খু*নটা হতে দেখার পরও স্বাক্ষী দেয় নি। মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করেছিলো তোমার বাবার কাছে। এতেই উনি ক্ষে*পে গিয়ে মে*রে ফেলেছেন!"

চাপা দীর্ঘশ্বাস বের হলো দুই ভাইয়ের শ্বাসনালী ফুঁড়ে। আয়ান বলল,

"এমন ঘৃণ্য একজন মানুষের সন্তান হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিতেও লজ্জা করছে। একের পর এক অন্যায় করেই গিয়েছেন উনি। নাতাশা, যত যাই বলো! এই মানুষটাকে আর আমাদের বাবা বলে পরিচয় দিও না, প্লিজ!"

থামলো নাতাশা। মুহুর্তেই আত্ম-উপলব্ধি করলো ভুল করেছে ও। জুনাইদের সাথে তার ছেলেদের তুলনা করে ভীষণরকম ভুল করেছে। রক্ত সবসময় যে একইরকম হবে এরকম কোনো কথা নেই! আয়ান-আয়মান ভিন্ন ওদের বাবার থেকে। প্রতিশোধের নেশায় তার পরিবার তাকে অন্ধ করে দিয়েছিলো। এখন সেই অন্ধত্ব ঘুঁচে গেলো। বুঝে গেলো তাদের ব্যক্তিত্ব সম্পূর্ণ ভিন্ন। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি।

আয়মান প্রায় বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছে। সে জিজ্ঞেস করলো,

"ফারহানকে কিভাবে খু*ন করেছো?"

নাতাশার সরল স্বীকারোক্তি,

"লন্ডনে ফারহান গিয়েছিলো তোমার কাছে। সেখান থেকেই ওর সাথে আমার পরিচয়। তবে সম্পর্কটা শুধুই ছিলো বন্ধুত্বের। সেই থেকেই সুযোগ পেয়ে খুন করেছি। ও একটা মেয়েকে পছন্দ করতো। মেয়েটা ছিলো তোমার বেস্ট ফ্রেন্ড পিয়াসের ছোট বোন। প্রিতী নাকি কি যেনও নাম সঠিক মনে নেই! তবে ফারহান বলল, তুমিও নাকি ওই মেয়েকে পছন্দ করতে?"

আয়মান কাষ্ঠ হেসে বলল,

"এরকম ভুল আমি করবো? পিয়াসের সাথে মজা করেই বলতাম আমি। সেটাই বোধহয় ফারহান শুনেছিলো। ওটা ওর ভুল ধারনা ছিলো। পিয়াসের বোনের দিকে চোখ তুলে তাকানোর দুঃসাহসও আমি কোনোদিন করবো না। কারণ...!"

প্রিয়ন্তী কেঁপে কেঁপে উঠছে আয়মানের কথায়। হৃৎস্পন্দন এতটাই দ্রুতগতিতে চলা শুরু করেছে যেনও এখনই বন্ধ হয়ে যাবে। প্রিয়ন্তীর মনে হচ্ছে সে যেকোনো সময় মাথা ঘুরে পড়ে যাবে।

অন্যদিকে সবাই অপেক্ষায় আয়মানের উত্তরের। নাতাশা অধীর আগ্রহে বলল,

"কারণ কি?"

আয়মান বলল,

"কারণ সেটা অসম্ভব। পিয়াসের বোনকে আমি আজ পর্যন্ত দেখিও নি। আর দেখতেও চাই না। ওর পরিবার জীবনেও এসব মানবে না। কারণ তোমার মামা যেই খু*ন দু'টো হতে দেখেছে সেটা পিয়াসের চাচা-চাচি ছিলো!"

প্রিয়ন্তীর পায়ের নিচের মাটি সরে গেলে মুহুর্তেই! এক ফোঁটা পানি টুপ করে ঝড়ে পড়লো প্রিয়ন্তীর চোখ থেকে। যেটা ভেবেছিলো ঠিক সেটাই হয়েছে ওর সাথে! পরিষ্কার বুঝে গেছে ওদের ভবিষ্যতটা শুধুই বিচ্ছেদের। অবাধ্য মন হাত বাড়িয়েছে নি*ষিদ্ধ দিকে। এরই জ্বালাতন বয়ে বেড়াতে হবে সারাজীবন! মরে গেলেও পূর্ণতা পাবে না তার ভালোবাসা।

প্রিয়ন্তী খুব করে চাইলো যেনও তার পরিবার প্রিয়ার কথাটা না জানতে পারে। মন থেকে চাইছে যেনও এই অতীতের ছায়া থেকে বেরিয়ে ওরা দুইজন ভীষণ সুখে থাকুক। অপূর্ণতার গল্পটা শুধু তার জন্যই তোলা থাক। যেভাবে হুট করে এসেছিলো আয়মানের জীবনে, সেভাবে হুট করেই আবার হারিয়ে যাবে!

********

নাতাশাকে প্রমাণসহ পুলিশের হাতে দেওয়া হয়েছে। সাথে ধরা পড়েছে ওর খালাও। এটাই ছিলো ওর সর্বশেষ পরিণতি। জুনাইদ যা করেছে, সেটা অন্যায়। আর সেই অন্যায়ের শাস্তি সে মৃত্যুর পর অবশ্যই পাচ্ছে। কিন্তু তার জের ধরে তার ছেলেদের মেরে ফেলাটাও অন্যায়! এর শাস্তি প্রাপ্য নাতাশা ও তার পরিবার। প্রায় দু'বছর আগে ছেলে হারানোর শোকে দিন-রাত মাতম করেছে নাসরিন। দু'বছর পর ছেলের মৃ*ত্যুর খবরে এতটা কষ্ট পেলো না। প্রশান্তি নিয়ে ভাবলো, কমপক্ষে এই মাটিতে তো ছেলের চিরজীবনের স্থান হয়েছে!

সারাদিনের একের পর এক কাহিনি ও দৌড়াদৌড়ি শেষে রাতে সবাই যার যার রুমে একটু বিশ্রাম নিচ্ছে। এখন তারা একদম চিন্তামুক্ত। প্রিয়ার সারাদিনের ধকলে রাতে মাত্র গোসল করে বেরিয়েছে ওয়াশরুম থেকে। চুল থেকে টাওয়ালটা খুলে বারান্দায় মেলে দিয়ে আসলো ও। অত:পর চুপচাপ এসে বসলো আয়ানের সামনে৷ ওর হাত ধরে বলল,

"আপনি কি এখনও নাতাশার বলা কথাগুলো ভাবছেন? এত ভেবে কি হবে? যা হওয়ার তা হয়েই গেছে। আপনার বাবা..সরি জুনাইদ খান মা*রা গেছে আরও অনেকবছর আগে। তাই অতীত ধরে বসে থাকার কোনো মানেই হয় না! আগামীর কথা ভাবুন।"

আয়ান হেসে বলল,

"আমি অতীতের কথাও ভাবছি না, আমি ভবিষ্যতের কথাও ভাবছি না। আমি ভাবছি শুধু বর্তমানের কথা!"

প্রিয়া কৌতুহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলো,

"বর্তমানের কি কথা?"

আয়ান ওর হাতটা ছাড়িয়ে নিজের হাতের মুঠোয় পুরলো। কিছুটা সামনে ঝুঁকে এসে বলল,

"তোমার কথা। তোমার পাগলামীর কথা। আমার জন্য তোমার মনে থাকা এক আকাশ ভালোবাসার কথা!"

প্রিয়া থমকে গেলো। কথা-বার্তাহীন নিষ্পলক চেয়ে রইলো আয়ানের মুখপানে। মায়াময় চোখ দুটোতেই জমা হাজারো কথা!

আয়ান কাছে টানলো প্রিয়াকে। নিজের কোলে বসিয়ে মুখ ডোবালো ঘাড়ে। ছোট ছোট চুমুতে মুহুর্তেই বেসামাল করে তুলল মেয়েটাকে। অজানা শিহরণে অস্বাভাবিক হয়ে পড়লো তার হৃৎপিণ্ডের গতি। প্রিয়া কেঁপে উঠে খাঁমচে ধরলো আয়ানের হাত।

আয়ান মুখ উঠালো ঘাড় থেকে। পরপর প্রিয়াকে কোল থেকে নামিয়ে শুইয়ে দিলো বিছানায়। কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,

"আমাকে নিয়ন্ত্রণহীন করার প্রতিযোগিতায় নেমে ধৈর্যের পরীক্ষা নিচ্ছো নাকি? আর কত আমার ধৈর্যের পরীক্ষা নিবে? এবার যে বাঁধ ভেঙে ফেলেছো তুমি! এবার সামলানোর দায়িত্ব তোমার!"

প্রিয়া লজ্জায় নেঁতিয়ে পড়ে একদম লেপ্টে গেলো বিছানার সাথে। টের পাচ্ছে আয়ানের অস্বাভাবিক পাগলামোর ঝড়। আয়ান নিজের ওষ্ঠ দ্বারা আবৃত করলো ওর ওষ্ঠাধর। প্রিয়া নিজেকে সামলাতে চেঁপে ধরলো আয়ানের শার্টের কলার। মুহুর্তে মুহুর্তে প্রেমের বেসামাল তুফানে বিলীন হয়ে যাচ্ছে ও।

খানিক বাদে আয়ান ছেড়ে দিলো প্রিয়ার ওষ্ঠদ্বয়। আবারও চুমু বসালো ঘাড়ে। সাথে ছোট্ট ছোট্ট কামড়। প্রিয়া পারছে না আয়ানের এই পাগলামো সামলাতে। লজ্জায় বুঁদ হয়ে রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছে মুখশ্রী। কোনোরকম বলল,

"আপনার না নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ আছে? তাহলে এমন নিয়ন্ত্রণহীন আচরণ করছেন কেনও?"

আয়ান বুঝলো প্রিয়া ওকে খোঁচা মেরেই কথাটা বলেছে। আয়ানও প্রতিত্তোরে বলল,

"সব তোমার দোষ। তাই শাস্তিস্বরূপ সামলাতেও হবে তোমাকেই..!

বন্ধ ঘরে মিলিত হলো একজোড়া প্রণয় সাগরে বয়ে যাওয়া মন। গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ কামরাজুড়ে। এক জোড়া হৃদয়ের পূর্ণতার খুশিতে নেচে উঠলো পরিবেশও ঠান্ডা বাতাসের সাথে সাথে!

কেউ জানলো না, যেই পাতায় পূর্ণতার গল্পটা লেখা হলো তার অপর পাতাতেই লিখা হলো বিচ্ছেদের গল্পটাও...!

স্নিগ্ধ প্রেমের মায়া গল্পটি তিয়াশা চৌধুরী-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক ও রোমান্টিক থ্রিলার গল্প