রাত্রি প্রহর ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে। একে একে বিদায় নিচ্ছে মেহমান। প্রিয়া সন্ধ্যার সাথে কথা বলছিলো তখন সাহিলের সাথে কথা শেষে সেখানে উপস্থিত হলো আয়মান। সন্ধ্যা ভাবলো আয়মান হয়তো এই জোর করে করা এনগেজমেন্টটা নিয়ে বিব্রত হয়েছে। এজন্য সরি বলতে এসেছে। কিন্তু আয়মানের চেহারায় বিব্রতবোধ বা অনুতাপের লেশমাত্র নেই। সে বেশ স্বাভাবিকভাবে বলল,
"সন্ধ্যা, নাতাশার সাথে আমার এনগেজমেন্ট হওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু হয়ে গেছে প্রিয়ন্তীর সাথে। ও এখনও ধাক্কাটা সামলে উঠতে পারে নি। এখন তোমরা বাসায় গেলে, তোমার পরিবারকে যদি বলে দেয় তাহলে ব্যাপারটা মোটেই দৃষ্টিনন্দন হবে না। আমরা না হয় কাল বসে ঠান্ডা মাথায় বিষয়টা নিয়ে আলোচনা করবো। আর প্রিয়ন্তীকেও তো স্বাভাবিক করা দরকার। তোমরা না হয় আজ রাত এখানেই থেকে যাও!"
সন্ধ্যা স্তব্ধ হয়ে তাকালো আয়মানের দিকে। অদৃশ্য কেউ যেনও কানের কাছে এসে ফিসফিসিয়ে ওকে তাচ্ছিল্য করে গেলো,
"কি ভাবলি আর কি হলো? মানুষ বিয়ে করে বউ রাখে। এ তো বাগদান করেই বউ রেখে দিতে চাইছে!"
ভাবনাগুলো মস্তিষ্কে প্রবেশ করতেই সন্ধ্যার কাশি উঠে গেলো। প্রিয়া ওকে ধরে বলল,
"সন্ধ্যা, আর ইউ ওকে?"
পরপর ডাক দিলো সায়মাকে।
"সায়মা, এক গ্লাস পানি নিয়ে আয় তো!"
সায়মা তৎক্ষণাৎ পানির গ্লাস হাতে নিয়ে ওদের কাছে এলো। পানি খাওয়ার পর প্রিয়া আবার জিজ্ঞেস করলো,
"এবার ঠিক আছে?"
সন্ধ্যা পানির গ্লাস সায়মার হাতে দিয়ে মাথা নাড়িয়ে বলল,
"হুম। আমি ঠিক আছি।"
আয়মান আবারও বলল,
"তো যা বলছিলাম আমি। আজ থেকে যাও এখানে। তোমার বান্ধবিদেরই তো বাসা।"
সন্ধ্যা ঘনঘন দু'পাশে মাথা নাড়িয়ে না বোঝালো। বলল,
"মা দিবে না। রাতে কোথাও বাইরে থাকলে মা দুশ্চিন্তা করবে।"
আয়মান বলল,
"ভাবি কথা বলে নিবে। তুমি চিন্তা করো না। ভাবি, আপনি উনার সাথে একটু কথা বলে নিয়েন প্লিজ!"
প্রিয়া সায় জানালো আয়মানের কথায়। অত:পর সন্ধ্যাকে বলল,
"নাম্বারটা দে। আমি ম্যানেজ করছি।"
সন্ধ্যা ভয়ে ভয়ে মায়ের নাম্বারটা প্রিয়াকে দিলো। ওরূপ ধারনা মা রাজি হবে না। বরং তাকে আর প্রিয়ন্তীকে বকা খেতে হবে। কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে প্রিয়া মিষ্টি কথায় মানিয়ে নিলো তার মা-কে। হাসিমুখে ফোন কেটে সন্ধ্যাকে বলল,
"কাজ হয়ে গেছে। আজ রাতে থেকেই যা!"
আয়মান সন্ধ্যাকে বলল,
"তোমার মা মেনে নিয়েছে। এবার তো আর তোমাদের প্রবলেম নেই, না?"
সন্ধ্যা মাথা নাড়িয়ে না বোঝালো। আয়মান এবার প্রিয়াকে বলল,
"ভাবি, মেহমানরা সব খেয়ে-দেয়ে একে একে চলে যাচ্ছে। রুমে একা প্রিয়ন্তী বসে আছে। এখনও কিছু খায়ও নি। আপনি একটু ওকে খাইয়ে দিয়ে আসবেন?"
প্রিয়ন্তীর প্রতি আয়মানের এই কেয়ার দেখে মনে মনে ভীষণ খুশি হলো প্রিয়া। মুচকি হেসে বলল,
"এখুনি যাচ্ছি আমি।"
*******
প্রিয়ন্তী থম মেরে বসে রয়েছে খাটের উপর। আয়মান সেই যে রুমের দরজা বাইরে থেকে বন্ধ করে গিয়েছে এখনও কারো আসার নাম নেই। প্রিয়ন্তীও একবারও চেষ্টা করে নি কাউকে ডাকার। মূলত এই কাজটা করার বোধ অব্দি কাজ করছিলো না তার মধ্যে। বারবার ডান হাতটা তুলে নিজের অনামিকা আঙুলের দিকে তাকাচ্ছে, আর ভাবছে কি থেকে কি হয়ে গেলো! কানের কাছে অবিরাম বেজে চলেছে আয়মানের বলা কথাটা,
"তুমি আমার হবু মিসেস হয়ে গেছো।"
কথাটা মনে পড়ার সাথে সাথে শিউরে উঠছে বারবার। অসাঢ় মস্তিষ্ক যখন আস্তে আস্তে মেনে নিচ্ছে আকস্মিক ঘটনাটা তখন দরজার সামনে খট করে শব্দ হলো। নিশ্চুপ বসে থাকা প্রিয়ন্তী শব্দ পেয়ে চমকে দরজার দিক ফিরলো। প্রিয়া খাবারের প্লেট হাতে ঘরে ঢুকলো। কাচ্চি বিরিয়ানির সুঘ্রাণ ভেসে এলো ওর হাতে থাকা প্লেট থেকে। প্রিয়ন্তীর ক্ষুধার্ত পেট তৎক্ষণাৎ সব ভুলে খাবার দাবি করলো। মস্তিষ্ক যখন বেশি ভাবনায় ডুবে থাকে তখন পারপার্শ্বিক ব্যাপারগুলো সন্তপর্ণে এড়িয়ে যায়৷ যেমন এতক্ষণ প্রিয়ন্তী নিজের ক্ষুধার কথা ভেবেও দেখে নি। এখন খাবারের ঘ্রাণ পাওয়ার সাথে সাথে উপলব্ধি করলো পেটটা সম্পূর্ণ খালি হয়ে গিয়েছে। এই প্লেটের পর আরও দু-প্লেট কাচ্চি এনে দিলেও সে অনায়াসে খেতে পারবে। কিন্তু অন্য একজনের বাড়িতে বসে তো এসব আর বলা যায় না!
প্রিয়া এসে বসলো প্রিয়ন্তীর পাশে। প্লেটটা সাইডে রেখে বলল,
"ক্ষুধা লেগেছে না? খাবে না?"
প্রিয়ন্তী আড়চোখে একবার তাকালো কাচ্চির প্লেটের দিকে। খাবার দেখে এতক্ষণের সব ঘটনা ওর মাথা থেকে বেরিয়ে গেছে। এখন পেট ও মস্তিষ্কের একটাই দাবি, "খাবার চাই, খাবার চাই। খাবার না দিলে ভাবনা নাই!"
নিজের ভাবনায় প্রিয়ন্তী নিজেই বিরক্ত হলো। প্লেট থেকে চোখ সরিয়ে তাকালো অন্যদিকে। প্রিয়া ধরে ফেলেছে ওর মনের কথা। তাই কথা না বাড়িয়ে দ্রুত প্লেট হাতে নিলো। এক লোকমা খাবার ওর মুখের কাছে তুলে ধরে বলল,
"খেয়ে নে আগে। বাকি আলাপ পরে!"
খুশিতে প্রিয়ন্তীর চোখে পানি এসে পড়লো। প্রথমবারের মতো বড় বোনের হাতে খাবে ও। যদি প্রিয়া ছোটবেলায় হারিয়ে না যেত, তাহলে হয়তো অনেক আগেই এভাবে আদর করে মুখে তুলে খাইয়ে দিতো! কিন্তু সেটা হলো না। বহুবছর পর এসে প্রিয়ন্তী এই আদরটুকু পাচ্ছে। প্রিয়ার চোখে পড়ার আগেই দ্রুত চোখের কোণে আসা জলটুকু মুছে ফেলল ও। পরপর হা করতেই প্রিয়া ওর মুখে খাবার তুলে দিলো।
********
মেহমানদের আসা-যাওয়ার মাঝে ভীড় এড়িয়ে চুপচাপ বাড়িতে ঢুকে গেলো নাতাশা। হলরুমে আসতেই কর্ণকুহরে প্রবেশ করলো আশেপাশের মানুষের কিছু কথা। তাদের কথায় স্পষ্ট বোঝা গেলো, এনগেজমেন্ট হয়ে গেছে। নাতাশা অবাক হয়ে ভাবলো,
"আমি তো এখানে ছিলাম না। তাহলে এনগেজমেন্ট হলো কার সাথে?"
জবাব খুঁজতে ত্রস্ত পা বাড়ালো আয়মানের রুমের দিকে। আশপাশের ব্যস্ত মানুষদের দৃষ্টি এড়িয়ে চুপচাপ পৌঁছেও গেলো উপরে। রুমে প্রবেশ করতেই দেখলো আয়মানও খাটে বসা। সে কালবিলম্ব না করে ছুটে আয়মানের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। পরপর জিজ্ঞেস করলো,
"কাকে নিজের বাগদত্তা বানিয়েছো তুমি?"
আয়মান হঠাৎ সামনে নাতাশাকে দেখেই অবাক হয়ে গেলো। বিহ্বল দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
"তুমি?"
নাতাশা দাঁতে দাঁত চেঁপে বলল,
"হ্যাঁ আমি। আমি তো বাড়িতে ছিলাম না। তাহলে তোমার এনগেজমেন্ট হলো কি করে? কাকে বানিয়েছো নিজের বাগদত্তা?"
প্রশ্ন শুনে আয়মান নিজেকে স্বাভাবিক করলো। প্রস্তুত হলো গুছিয়ে উত্তর দেয়ার জন্য৷ অত:পর নাতাশার দিকে তাকিয়ে মস্তিষ্কে সাজিয়ে রাখা কথাগুলো একের পর এক উগড়ে দিলো,
"এনগেজমেন্টের আগমুহূর্তে কনেকে পাওয়া যাচ্ছিলো না। হঠাৎ করে কোথায় গিয়েছিলে তুমি? জানো আমার পরিবার কতটা বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে পড়েছিলো? সবাই নানান কথা বানাচ্ছিলো কনে ভেগে গেছে বলে! আমি আর কি করতাম? পরিবারের সম্মান বাঁচাতে প্রিয়ন্তীর সাথে এনগেজমেন্ট করে ফেলেছি।"
সবশেষে প্রিয়ন্তীর নাম শুনে এক কদম পিছিয়ে গেলো নাতাশা। কন্ঠনালী ফুড়ে বের হলো,
"প্রিয়ন্তী!"
নাতাশা প্রিয়ন্তীকে নিচু দেখাতে চাইছিলো আর প্রিয়ন্তীই কি না আয়মানের বাগদত্তা হয়ে গেলো? হতাশায় ডুবে মস্তিষ্ক খেঁই হারালো চিন্তার। হতবিহ্বল হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো সেখানেই।
আয়মান সূক্ষ্ম নজরে খেয়াল করে গেলো নাতাশার প্রতিক্রিয়া। হেরে যাওয়ায় হতাশার চিহ্ন ফুটে উঠেছে মুখে। আয়মান এতক্ষণ ভেবেই রেখেছে কি কি করতে হবে। সেই পরিকল্পনামাফিক বলল,
"নাতাশা, যা হয়ে গেছে সেটা তো আমরা বদলাতে পারবো না। তবে বিশ্বাস করো, আমার মনে ওর জন্য কোনো ফিলিংস নেই। এই এনগেজমেন্টটা শুধুই সম্মান বাঁচানোর জন্য লোক দেখানো মাত্র। দুদিন যাক, তারপর আমি এই এনগেজমেন্ট ভেঙে দিবো।"
নাতাশা অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
"সত্যি?"
নাতাশার কন্ঠে যতটা অবিশ্বাস, আয়মান তার থেকে দ্বিগুন নিশ্চয়তার সুরে বলল,
"একদম সত্যি! আমি সবাইকে সব বুঝিয়ে বলবো। এখন সারাকে ডাকি, তুমি রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নাও।"
আয়মান নাতাশাকে নিজের রুমে রেখে বেরিয়ে গেলো। খালি রুমে একা থাকার সুযোগ কাজে লাগালো নাতাশা। দরজার কাছে গিয়ে চুলে লাগানো ক্লিপ থেকে একটা খুলে নিলো। লকের ভেতর ক্লিপ ঢুকিয়ে কয়েকবার উল্টোপাল্টা খোঁচাখুঁচি করে লাভ হলো না। তবুও কোনোভাবে হাল ছাড়ার পাত্রী নয়! অনেক কসরত করে শেষমেশ নষ্ট করে ফেলল আয়মানের দরজার লক। আজ রাতে এই লকহীন দরজাই তার কাজে আসবে!
*******
আয়মান নিচে গিয়ে সারা-সায়মা ও আয়ানকে ডাকলো। পরপর তাদের খুলে বলল সব ঘটনা। মেহমান এখনও সবাই যায় নি। অল্প কিছু মানুষ এখনও ড্রইং রুমে বসে আছে। তাদের সাথে বসে আলাপ করছে বাড়ির মুরব্বীবর্গ। তাই এই মুহুর্তে আয়মান কাউকে ডেকে কোনো ভেজাল করলো না। শুধু সারাকে উপরে নিয়ে গিয়ে, তার সাথে নাতাশাকে পাঠিয়ে দিলো গেস্ট রুমে।
********
খাওয়ার পুরোটা সময় প্রিয়া ও প্রিয়ন্তী নিশ্চুপ ছিলো। খাওয়ানোর সময় বোনের আদূরে স্পর্শটুকু খুব করে অনুভব করছিলো প্রিয়ন্তী। প্রিয়াও ওকে স্বাভাবিক দেখে কোনো কথা বলে নি। খাওয়ানো শেষে প্রিয়া প্লেটেই হাত ধুয়ে নিলো। এরপর পানিভর্তি প্লেটটা টেবিলে রেখে আবারও এসে প্রিয়ন্তীর সাথে বসলো। হাসি টেনে বলল,
"প্রিয়ু, তুই কি এই হঠাৎ এনগেজমেন্টটা নিয়ে আপসেট?"
এই প্রশ্নে প্রিয়ন্তী বিভ্রান্ত হয়ে পড়লো। সে আসলেই আপসেট, কিন্তু এটা কি আদ্যো মুখ ফুটে বলার মত বিষয়?
প্রিয়ন্তীকে চুপ থাকতে দেখে প্রিয়া আবারও বলল,
"দেখ প্রিয়ু, আমি জানি এই সম্পর্কটা হঠাৎ করে মেনে নেওয়া তোর পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু আমাদের হাতে কিছু ছিলো না। আমি বলবো, মেনে নেওয়া না নেওয়া তোদের দুইজনের ব্যাপার। তোদের তো তাও এনগেজমেন্ট হয়েছে। আমাদের তো হুট করে বিয়েটাই হয়ে গেলো। তোরা চাইলেই এই সম্পর্কটা ভেঙে ফেলতে পারিস। কিন্তু আমরা পারি নি। এই সম্পর্কটাকেই আমাদের ভাগ্য মেনে নিয়ে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে গেছি দিনের পর দিন। এমনকি এখন এই সম্পর্কটাকে মন থেকে মেনে নিয়েছি দু'জনে। তোদের পক্ষে কি আদ্যো সম্ভব হবে?"
প্রিয়ন্তী মুখ তুলে চাইলো প্রিয়ার দিকে। কিছু বলতে গিয়েও বারবার কথার খেঁই হারাচ্ছে ও। কিছুক্ষণ শান্ত থেকে ধাতস্থ করলো নিজেকে। এরপর কান্নাভেজা কন্ঠে বলল,
"তোমাদের মেনে নিতে আপত্তি ছিলো না। কিন্তু তোমার দেবরের তো আপত্তি থাকতেই পারে। উনি তো আমাকে পছন্দ করে না। তাহলে কেনও আমাকে আংটি পড়ালো? কেনও করলো এমন?"
প্রিয়া পল্লব ঝাঁপটে প্রশ্ন করলো,
"তোকে পছন্দ করে না? তো কাকে করে?"
প্রিয়ন্তী নাক টানতে টানতে উত্তর দিলো,
"উনি তো নাতাশাকে পছন্দ করে। সরি, পছন্দ করে না। উনি নাতাশাকে ভালোবাসে। ওকেই যখন ভালোবাসে তো ওকে নিজের বাগদত্তা বানাতো। আমাকে কেনও?"
প্রিয়া কিছুক্ষণ চুপ থেকে প্রিয়ন্তীর কথাগুলো মস্তিষ্কে নেড়ে-চেড়ে দেখলো। অত:পর হাসতে হাসতে বলল,
"তোর মনে হয় আয়মান নাতাশাকে ভালোবাসে?"
প্রিয়ন্তী অবাক হয়েছে প্রিয়ার হাসি দেখে। ওর ধারনামতে ও কোনো কৌতুক বলে নি। তাহলে প্রিয়া হাসলো কেনও? সে মুখ গোমড়া করে বলল,
"মনে করার কি আছে? সে তো নাতাশাকে ভালোবাসেই। এটাতে হাসির কি দেখলে তুমি?"
প্রিয়া ওর গালে আলতো হাত বুলিয়ে বলল,
"পাগল! আয়মান ওকে ভালোবাসে না৷ ও আমার কথায় এনগেজমেন্টটা করছিলো!"
এইবার প্রিয়ন্তীর মধ্যে কৌতুহল জেগে উঠলো। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে প্রিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
"তোমার কথায়? মানে?"
প্রিয়া একে একে সব বলল প্রিয়ন্তীকে। আর এই এনগেজমেন্টটাও যে নাতাশার উদ্দেশ্য বের করার জন্য করেছে এটাও বলল৷ সব শুনে প্রিয়ন্তী হতাশ শ্বাস ফেলে বলল,
"এনগেজমেন্ট তো আমার সাথে হয়ে গেলো। এবার কি হবে, আপু? তোমরা নাতাশার উদ্দেশ্য কিভাবে জানবে?"
প্রিয়া বলল,
"নাতাশা যখন জানতে পারবে এনগেজমেন্ট তোর সাথে হয়েছে, তখন ও চুপচাপ বসে থাকবে না। কোনো না কোনো পদক্ষেপ অবশ্যই নিবে। তখনই আমরা ধরবো ওকে। ওকে নিজমুখেই স্বীকার করতে হবে ওর উদ্দেশ্য!"
*******
মেহমান সব যাওয়ার পর নাতাশার এই বাড়িতে থাকা নিয়ে ছোটখাটো একটা তুফান বয়ে গিয়েছে ড্রইংরুমে। প্রিয়া সেই যে প্রিয়ন্তীকে খাইয়ে দিয়ে নেমেছে, এরপর প্রিয়ন্তী ঘর থেকেও বের হয় নি। শুধু সবার কথার কিছু কিছু অংশ তার কান অব্দি পৌঁছেছে৷ প্রিয়ার থেকে শুনেছে আজ রাতে ওকে এই বাড়িতেই থাকতে হবে। প্রিয়ন্তী এই রুমেই থাকবে। ওর সাথে থাকবে সন্ধ্যা। আর নাতাশা গেস্টরুমে, যেখানে আজ সারাদিন ছিলো।
সময় গভীর রাত। সারাদিন এত ধকলের পর কেউই আর রাত জাগে নি। সবাই নিজ নিজ রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে শুয়ে পড়েছে। আয়মানও ব্যতিক্রম নয়। রুমে ঢুকে যেই দরজা লক করতে যাবে, তখনই অবাক হয়ে আবিষ্কার করলো দরজার লকটা কাজ করছে না। কয়েকবার চেষ্টা করার পরও কোনোভাবেই লক করতে না পেরে হাল ছাড়লো আয়মান। লক করার বিশেষ প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি না করায় নির্দ্বিধায় লক ছাড়াই ঘুমাতে গেলো। ক্লান্তিতে বিছানায় পড়তেই গভীর ঘুমে তলিয়ে গেছে ও । পুরো খান নিবাস কিছু সময়ের ব্যবধানে ঘুমপুরীতে পরিণত হয়েছে।
শুধুমাত্র ব্যতিক্রম একজন মানুষ। নাতাশা এখনও জেগে নিজের উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য। যখন বুঝতে পারলো সবাই ঘুমিয়ে গেছে তখন নি:শব্দে বের হলো নিজের রুম থেকে। পা টিপে টিপে কোনোপ্রকার শব্দ ছাড়াই এলো আয়মানের রুমের সামনে। হাতে তার ধারালো ছু*রি। আস্তে করে দরজার নবে হাত ঘুরাতেই নি:শব্দে সেটাও খুলে গেলো। নাতাশা বিশ্বজয়ের হাসি হেসে প্রবেশ করলো রুমে। ছু*রি হাতে ধীরপায়ে এসে হাজির হলো আয়মানের পাশে।
আয়মান সটান হয়ে বিছানায় শুয়ে আছে। পড়নে ব্ল্যাক ট্রাউজার ও হোয়াইট টি-শার্ট। গভীর নিশ্বাসের শব্দ শুনে বোঝা যাচ্ছে সে গভীর নিদ্রায় ডুবে। নাতাশা ওর ঘুমন্ত মুখশ্রী পানে চেয়ে অধর একপাশে হেলিয়ে শয়তানী হাসি হাসলো। বলল,
"এই ঘুমটাই হবে তোমার শেষ ঘুম।"
বলতে দেরি হাত চালাতে দেরি হলো না। ডান হাতে শক্ত করে ধরে রাখা ছু*রিটা উপরে উঠে গেলো। পরপর নেমে এলো সোজা আয়মানের বুকের পাশটায়...!