স্নিগ্ধ প্রেমের মায়া

পর্ব - ২৭

🟢

ফুল ও লাইটিং এর মাধ্যমে ভীষণ সুন্দরভাবে সাজানো হয়েছে পুরো খান নিবাস। স্বল্প সময়ে আয়োজন করা হলেও আয়োজনের কোনো কমতি রাখা হয় নি। দাওয়াতও করা হয়েছে বিশালসংখ্যক মানুষকে। এই বাড়িতে শুধুমাত্র প্রিয়াই নাতাশার সাথে ভালো ব্যবহার করছে। এছাড়া সারা ও সায়মাকে বললেও তারা বিশেষ গায়ে মাখে নি। তাদের কথাবার্তায় গা'ছাড়া ভাব স্পষ্ট।

নাতাশা দোতলার রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে দেখছে নিচের আয়োজন। লেহেঙ্গাটা নিজ থেকে পড়লেও বাকি সাজের জন্য কারো সাহায্য প্রয়োজন। কিন্তু কাউকেই পাচ্ছে না। প্রিয়াও প্রচন্ড ব্যস্ত। নাতাশা বাড়িতে আসার পর তার সাথে কিছুক্ষণ কথা বলে, ওকে গেস্টরুমে বসিয়ে চলে গেছে। সারা-সায়মা কিচ্ছুক্ষণ পর গিয়ে এনগেজমেন্টের সমস্ত জিনিস দিয়ে এসেছে। এরপর আর কারো দেখা নেই!

নিচে তাকিয়ে নাতাশা অতিরঞ্জিত আয়োজন দেখে কিছুটা ভড়কাল। প্রিয়াকে বলার সাথে সাথে এত দ্রুত সব হয়ে গেলো, যে সঠিকভাবে ভাবারও সময় পেল না। তার মধ্যেই এভাবে এনগেজমেন্ট! এনগেজমেন্টে এত বিশালসংখ্যক মানুষ দাওয়াত দেয়ার কোনো প্রয়োজন ছিলো কি?

দেখতে দেখতে হঠাৎ নাতাশার নজর পড়লো সদর দরজায়। হালকা কমলা রঙের গাউন পরিহিত নজরকাড়া সৌন্দর্য নিয়ে প্রিয়ন্তী হাজির হয়েছে দোরগোড়ায়। প্রিয়ন্তীকে দেখে নাতাশা ওকে পরখ করে তাকালো নিজের দিকে। বিদেশিনী সাদা চামড়ার হওয়ার পরও ওর সৌন্দর্য ফিঁকে প্রিয়ন্তীর কাছে। সায়মার সাথে কথা বলার সময় ঠোঁটের কোণে যে মিষ্টি হাসিটা ধরে রেখেছে তাতে যেনও রূপলাবণ্য আরও বেড়েছে। ধবধবে সাদা চামড়া না হলেও বাঙালী নারীর এ এক ভিন্নরকম সৌন্দর্য!

এতক্ষণ একা একা অসহায় হয়ে বসে থাকায় নাতাশা যতটা না বিরক্ত হয়েছিলো, প্রিয়ন্তীকে দেখে সেই বিরক্তি তরতর করে বেড়েছে। ওইদিন অফিসে প্রিয়ন্তীর ব্যবহারে ক্ষুব্ধ হয়েছে সে। এখন অনুষ্ঠানে দেখেও মেজাজটা বিগড়াচ্ছে। কিছু মুহুর্তের জন্য রাগ লাগলেও হঠাৎ একটা কথা ভেবে রাগ উঁবে গিয়ে শয়তানি হাসি ফুটলো নাতাশার ঠোঁটে। ভাবলো, আজ প্রিয়ন্তী বুঝবে ওর আসল জায়গা কোথায়! নাতাশা যে আয়মানের কি হয়, সেটা প্রিয়ন্তীর মাথায় ভালোভাবে ঢুকবে।

*******

প্রিয়ন্তী আর সন্ধ্যা কিছুক্ষণ সায়মার সাথে কথা বলার পর প্রিয়ার খোঁজ করলো। সায়মা জানালো, ও রান্নাঘরে৷ সায়মার উত্তর দেওয়ার পরই প্রিয়ন্তী ছুটে গেলো সেখানে। ওকে এইভাবে ছুটে যেতে দেখে সায়মা অবাক হলেও মুচকি হাসলো সন্ধ্যা। বোনের প্রতি এত টান যে না দেখে থাকতেই পারছে না!

হঠাৎ সায়মার পিছে আয়মানকে আসতে দেখে হাসি বন্ধ করে নড়ে-চড়ে দাঁড়ালো সন্ধ্যা৷ সায়মাকে ধাক্কা দিয়ে আস্তে করে বলল,

"তোর ভাই আসছে।"

আয়মান ওদের কাছে এসে আন্তরিক হেসে সন্ধ্যাকে বলল,

"এসেছো তুমি? তোমার বোনকে যে দেখছি না?"

আয়মান কথাটা সাদা মনে জিজ্ঞেস করলেও সায়মা বিষয়টা সেভাবে নিলো না। ভ্রু কুটি করে জিজ্ঞেস করলো,

"ওর বোন দিয়ে তোমার কি কাজ?"

আয়মান সায়মার মনোভাব বুঝতে পেরে বিরক্ত হলো। চোখ রাঙিয়ে বলল,

"শাট আপ সায়মা! ওকে দেখেছি তাই জিজ্ঞেস করেছি ওর বোনও এসেছে কি না! কাজ থাকলেই কি খোঁজা লাগবে নাকি? তাহলে দেখ তোকেও আজ সবাই খুঁজে খুঁজে হয়রান হচ্ছে। নিজের কাজ ফেলে এখানে এসে আড্ডা দিচ্ছে, আবার অন্যের কাজের খবর নিতে যায়।"

সায়মা দু'হাত কোমড়ে রেখে রাগ দেখিয়ে বলল,

"আমি কাজ ফেলে আড্ডা দিচ্ছি?"

আয়ান মুখের উপর বলল,

"কোনো সন্দেহ?"

সায়মা কিছু বলার জন্য হা করতেই আয়মান ওকে থামিয়ে দিয়ে বলল,

নাহ! আর কিছু বলার দরকার নেই। গিয়ে দেখ নাতাশার কোনো হেল্প লাগবে কি না!"

সায়মা হাত নামিয়ে বলল,

"হ্যাঁ, এখন থেকেই বোনদের ট্রেনিং দেয়া শুরু করেছো কিভাবে তোমার বউকে মাথায় তুলে রাখতে হবে! কোনো ভাই আমাদের হলো না। হুহ!"

পরপর ভেঙচি কেটে মুখ ঘুরিয়ে হাঁটা ধরলো রান্নাঘরের দিকে। নাতাশার দিকে খেয়াল রাখার প্রয়োজন আপাতত মনে করছে না!

সন্ধ্যা এতক্ষণ মাথা নিচু করে ঠোঁট টিপে হাসছিলো৷ সায়মা যেতেই মাথা উঁচিয়ে স্বাভাবিক করলো নিজেকে। বলল,

"আপনি প্রিয়ন্তীর কথা জিজ্ঞেস করছিলেন! ও আসে নি।"

হুট করে মুখ থেকে মিথ্যা কথাটা ফঁসকে গেলো সন্ধ্যার। দেখতে চাইলো প্রিয়ন্তীর অনুপস্থিতির কথা শুনে আয়মানের কি প্রতিক্রিয়া হয়? কিন্তু আয়মান হতাশ করলো তাকে। সে বেশ স্বাভাবিকভাবে 'ওহ আচ্ছা।' বলে প্রস্থান ঘটালো সেখান থেকে।

*******

প্রিয়া ভীষণ ব্যস্ত শাশুড়ীর কাজে সাহায্য করতে। প্রিয়ন্তী হঠাৎ রান্নাঘরে ঢুকে ওকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে বলল,

"আপু, আমি এসে পড়েছি।"

প্রিয়া কাজ ফেলে ঘুরলো প্রিয়ন্তীর দিকে। হেসে বলল,

"এতক্ষণে? সকাল থেকে আসতে পারলি না?"

প্রিয়ন্তী ওকে ছেড়ে দিয়ে বলল,

"ঘুম থেকে উঠতে দেরি হয়ে গিয়েছে৷ যাই হোক, তোমার দেবরের বউয়ের কি খবর?"

প্রিয়ন্তীর কথায় সবার হুশে আসলো নাতাশার কথা। পারভীন কপাল চাপড়ে বললেন,

"এই রে! নাতাশার খবরই তো নেয়া হলো না! আর তোরা সব এখানে বসে আছিস? যা গিয়ে দেখ ওর কোনো হেল্প লাগে কি না!"

সায়মা রান্নাঘরে ঢুকলো সেসময়। হাঁটা বহাল রেখে বলল,

"সাজতে হেল্প করবো নাকি ষড়যন্ত্র করতে?"

সায়মার কথায় ফিঁক করে হেসে দিলো প্রিয়ন্তী। পারভিন চোখ রাঙিয়ে সায়মাকে চুপ থাকতে ইশারা করলো। পরপর প্রিয়ন্তীকে বললেন,

"প্রিয়ন্তী, তুমি গিয়েই দেখে আসো আয়মানের বউকে।"

'আয়মানের বউ' শব্দটায় প্রিয়ন্তীর বিরক্ত লেগে গেলো। বিড়বিড় করে বলল,

"এই লোক আমাকে এলার্জি বলে! আর এখন যে এর বউয়ের নামে আমার এলার্জি হচ্ছে সে বেলা? এটা তো আবার তার দেখারই বিষয় না!"

মনে হাজারো ভাবনা থাকলেও সবার সামনে সেগুলো প্রকাশ করলো না। মিষ্টি হেসে সায় জানালো পারভীনের কথায়।

******

আয়ানের আজ ব্যস্ততা থেকে ছুটিই পাচ্ছে না। এদিক ওদিক ঘুরে ঘুরে সব কাজের তদারকি করছে। আয়মান এসে দাঁড়ালো ওর পিছনে। দু'হাত বুকে গুজে বলল,

"কাজ হচ্ছে না ভাইয়া?"

আয়ান পিছে ঘুরে তাকালো আয়মানের দিকে। সে পেস্ট কালার পাঞ্জাবি পড়েছে। চুলগুলো গুছিয়ে এক সাইডে ফেলে রাখা৷ গোছানো চুলগুলো দেখেই আয়ানের হাত এগিয়ে গেলো সেখানে। আয়মান তৎপর পিছে হেঁলে গেলো। দু'পাশে মাথা নাড়িয়ে বলল,

"আজকে চুল নষ্ট করা যাবে না।"

আয়ান বহুকষ্টে নিজের হাতটাকে আবার টেনে পিছনে আনলো। বিষয়বস্তু ঘুরিয়ে বলল,

"আয়মান, আর ইউ এক্সাইটেড?"

আয়মান উত্তর দিলো,

"ইয়েস, অফকোর্স! আজকে তোমার বিয়ের ফাইনাল ডেট এনাউন্সমেন্ট হবে তো আমি এক্সাইটেড থাকবো না? ভাইয়া, তুমি ধারনাও করতে পারবে না আমি তোমার বিয়েটা নিয়ে কত্তটা এক্সাইটেড!"

আয়ান হতভম্ব হলো এই উত্তরে। বোকার মতো চেয়ে উত্তর দিলো,

"আয়মান, আমি আমার বিয়ের কথা বলি নি। আমি তোর এনগেজমেন্টের কথা বলেছি।"

আয়মান নিরুৎসাহিত ভঙ্গিতে বলল,

"এনগেজমেন্ট? এটা নিয়ে এক্সাইটেড হওয়ার কি আছে? হওয়ার আছে, হবে, কাহিনি শেষ। এক্সাইটেড হওয়ার মতো কিছু পাচ্ছি না!"

আয়ান ওর দু কাঁধে হাত রেখে বলল,

"যেকোনো সম্পর্কই খেলা হয় না আয়মান। সেখানে কারো সাথে জীবন জুড়ে যাওয়ার সম্পর্কটা তো একদমই অন্যরকম। তুই এই নতুন সম্পর্কে এক্সাইটেড না?"

আয়মান চ সূচক শব্দ করে বলল,

"ভাইয়া, এটা কোনো মন থেকে জুড়ে যাওয়া সম্পর্ক নয় যে এক্সাইটমেন্ট থাকবে! এটা জাস্ট নাতাশার উদ্দেশ্যে জানার জন্য লোক দেখানো একটা অনুষ্ঠান মাত্র!"

আয়মান আঙুল তুলে ইশারা করলো আশেপাশের মানুষের দিকে। পরপর বলল,

"এই যে মানুষগুলো দেখছো না? অনুষ্ঠানটা শুধু তাদের দেখানোর জন্য! আর ফারহানের খোঁজ পাওয়ার একটা রাস্তা বলতে পারো।"

আয়ান বলল,

"আমরা যতই বলি অনুভূতিহীন সম্পর্কগুলো শুধুমাত্রই লোক দেখানো, কিন্তু একটা সম্পর্কে জুড়ে গেলে অনুভূতি তৈরি হতে শুরু করে। আমরা না চাইতেও একসময় এই অনুভূতির হাতে বন্দি হই! সম্পর্ক একবার জুড়ে গেলে এত সহজে ভাঙা যায় না, ভাই!"

আয়মান অবাক হয়ে বলল,

"এইসব তুমি বলছো ভাইয়া? এই তুমিই একদিন বলেছিলে বিয়েটা শুধু করতে হয় বলেই করা! কাকে করলে সেটা ম্যাটার করে না। আর নিজেই এখন সম্পর্কের মূল্যের কথা বলছো?"

আয়ান মুচকি হেসে বলল,

"কারণ এখন আমি বুঝেছি, অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে সম্পর্কে জুড়ে যাওয়ার ব্যাপারটা আজব হলেও সম্পর্কটা জুড়ে তো গেছে! এখন একটা জিনিসই উপলব্ধি করছি। সম্পর্ক জুড়ে গেলে আস্তে আস্তে অনুভূতি বাড়তেই থাকবে। ভেঙে যাওয়ার চান্সই নেই!"

আয়মান হতাশ শ্বাস ফেলল আয়ানের এইসব কাব্যিক কথাবার্তায়। তর্ক না করে মেনে নিয়ে বলল,

"বুঝেছি।"

আয়ান জিজ্ঞেস করলো,

'কি বুঝলি?"

আয়মান বলল,

"দেখো ভাইয়া, তোমার আর ভাবির বিয়ের ব্যাপারটা সম্পূর্ণ আলাদা ছিলো। বিয়েটা অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে হলেও ভাবি তোমার যোগ্য মেয়ে। ভাবির প্রতি তোমার অনুভূতি জাগতেই পারে! কিন্তু নাতাশার প্রতি আমার অনুভূতি? ইট'স ইম্পসিবল!"

আয়ান ভাবার ভান করে ভ্রু কুঁচকে বলল,

"তাহলে নাতাশা তোর উপযুক্ত মেয়ে না। হ্যাঁ, তোর সাথে আসলেই নাতাশার যায় না। নাতাশার জায়গায় অন্য কে হলে তোর সাথে ভালো মানাতো বলতো?"

আয়মানের মনোযোগ হঠাৎ সিড়িপথে চলে যাওয়ায় আয়ানের প্রশ্ন ঠিকভাবে শুনে নি। সন্ধ্যা বলেছে প্রিয়ন্তী আসে নি। তাই প্রিয়ন্তীকে দেখে চোখ আটকে গেছে সেখানে। প্রিয়ন্তীর মুখশ্রীর শুধু এক সাইড দেখা যাচ্ছে, তাতেও আয়মানের চিনতে বিলম্ব হয় নি। মুখ ফুটে অস্ফুটস্বরে বের হলো,

"প্রিয়ন্তী!"

আয়ান ভাবলো আয়মান হয়তো তার প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে। সে খুশি হয়ে বলল,

"রাইট! প্রিয়ন্তীকে তোর সাথে মানাতো!"

"ভাইয়া, আমি মাত্র প্রিয়ন্তীকে দেখলাম!"

বলেই আয়মান আয়ানকে সাইডে সরিয়ে নিজেও গেলো সিড়িপথে।

*****

সিঁড়ি দিয়ে উঠে প্রিয়ন্তী সোজা প্রবেশ করলো নাতাশার রুমে। সে লেহেঙ্গা পড়ে থম মেরে বসে আছে। প্রিয়ন্তী ওকে দেখে ভেতর থেকে টেনে-হিচড়ে আনলো হাসি। বলল,

"আপু, আপনার কোনো হেল্প লাগবে?"

নাতাশা ন্যাঁকা কান্না করে বলল,

"হ্যাঁ। দেখো না লেহেঙ্গা পড়ে বসে আছি, অথচ কাউকে পাচ্ছিই না! একটু সাজিয়ে দিবে আমায়?"

প্রিয়ন্তী ছোটখাটো ঝটকা খেলো এই কথায়। শেষে কি না, তাকেই আয়মানের বউ সাজাতে হবে?

*******

আয়মান উপরে এসে প্রিয়ন্তীক কোথাও দেখলো না। মনে মনে ভাবলো,

"এভাবে সিঁড়ি দিয়ে উঠে হঠাৎ কই হারিয়ে যাবে? নাতাশার রুমে গিয়েছে? নাহ! সারাক্ষণ আনারকলি আনারকলি করে মাথা খায়। তাকে দেখতে যাবে না অবশ্যই! তাহলে গেলো কই? নাকি আমিই ভুল দেখলাম? আজকাল কি জেগে জেগে সপ্ন দেখা শুরু করলাম?"

ভাবতে ভাবতে নিচে নামলো আয়মান। আয়ান ওকে দেখে দুষ্টু হেসে জিজ্ঞেস করলো,

"পেলি প্রিয়ন্তীকে?"

আয়মান ভাবুক ভঙ্গিতে নিচে তাকিয়ে বলল,

"না।"

আয়ান ওকে স্বান্ত্বনা দেয়ার ভঙ্গিতে বলল,

"অনুষ্ঠানে এত মানুষ আছে, কোথাও না কোথাও অবশ্যই আছে। পেয়ে যাবি, চিন্তা করিস না।"

আয়মান বলল,

"কিন্তু ওর বোন তো বলল, প্রিয়ন্তী আসে নি। তাহলে আমি ওকে দেখলাম কেনও?"

আয়ান অবাক হওয়ার ভান করে বলল,

"তুই একাই দেখলি? আমিও তো সিড়ির দিকে তাকালাম কিন্তু কাউকেই দেখলাম না। তুই একাই প্রিয়ন্তীকে দেখছিস?"

আয়মান বলল,

"হ্যাঁ। আমি ওইসময়ও প্রিয়ন্তীকে মেহমানদের মাঝে ছুটে যেতে দেখেছি। তারপরই সন্ধ্যাকে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, আর ও বলল আসে নি। তাহলে আমি প্রিয়ন্তীকে দেখছি, এটা কি করে সম্ভব? দুইবার ভুল দেখলাম?"

আয়ান ভ্রু উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলো,

"তুই কি নাতাশার সাথে এনগেজমেন্টটা নিয়ে সিউর আয়মান?"

আয়মান ক্ষিপ্ত দৃষ্টিতে তাকাতেই আয়ান আবারও বলল,

"না মানে, এনগেজমেন্ট নাতাশার সাথে। আর তুই এদিক-সেদিক প্রিয়ন্তীকে বারবার দেখছিস। তাহলে কি এনগেজমেন্টটা করা আসলেই উচিত? তাও প্রিয়ন্তীকে নিয়ে দিবাসপ্ন দেখতে দেখতে? আয়মান, নিজের মনের কথা শোন!"

আয়মান লম্বা শ্বাস ফেলে বলল,

"শুনেছি।"

আয়ান জিনিস করলো,

"কি বলল তোর মন?"

আয়মান হেসে জানালো,

"আমার মন বলল, তোমার ভাইকে বলো বড় হয়ে যেতে। আর এইসব বাচ্চাদের মতো আলাপ বন্ধ করতে বলো। এনগেজমেন্ট যার সাথে হচ্ছে, তার সাথেই হবে!"

*******

প্রিয়ন্তী ভীষণ সুন্দরভাবে নাতাশাকে সাজিয়ে তৈরি করেছে। হৃৎপিণ্ডের চিনচিনে ব্যাথাটা মনে রেখেই পুরোটা সময় মুখে হাসি ধরে রেখেছে। সাজানোর মাঝে প্রিয়া, সারা, সায়মা, সন্ধ্যা সবাই একে ঘুরে ঘুরে গিয়েছে। সাজানো শেষ হতেই প্রিয়ন্তীও নাতাশাকে রুমে রেখে নিজে চলে গেলো।

হঠাৎ ফোনে কল আসলেই রিসিভ করলো নাতাশা। বলল,

"হ্যাঁ লিলি বল।"

"নাতাশা, তুই যা করছিস ভেবে করছিস তো? এই হঠাৎ এনগেজমেন্ট ঠিক হয়ে যাওয়াটা সন্দেহজনক না?"

নাতাশা বাঁকা হেসে বলল,

"সন্দেহজনক হলেও কিছু করার নেই। ওরা নিজের বিপদ নিজেই ডাকবে। শুধু একবার এনগেজমেন্টটা হয়ে যেতে দে।"

"এনগেজমেন্ট গুরুত্বপূর্ণ নাকি খালামনি?"

নাতাশা অবাক হয়ে বলল,

"মানে?"

"মানে, আন্টির অবস্থা খারাপ। দ্রুত আয়।"

বিরক্তিতে 'ওহ শিট' বলে ফোন কাটলো নাতাশা। ওর সব প্ল্যানিং এর হেল্পে থাকে ওর খালামনি। তার এই অবস্থায় ও বসে থাকতে পারবে না। আবার এত মেহমানের ভিড়ে কাউকে বলে যাওয়াও যাবে না। কিছুক্ষণ ভেবে নাতাশা সিদ্ধান্ত নিলো, ও কাউকে না বলেই পিছন দরজা দিয়ে চলে যাবে। আবার এনগেজমেন্টের আগ মুহুর্তেই চলেও আসবে!

******

হলরুমভর্তি মেহমানের ভিড়ে সাজানো ছোট্ট স্টেজটার সামনে দাঁড়ালো সায়মা। তার সামনে রাখা টেবিলে দুটো আংটি রাখা গোলাপ ফুলে সাজানো প্লেটে সুন্দরভাবে সজ্জিত। এছাড়াও কিছু মিষ্টিজাতীয় খাবার রাখা টেবিলে। সায়মা যেই সোফার সামনে দাঁড়িয়ে তার একপাশে আয়মান বসে রয়েছে। আর সায়মার দুইপাশে দাঁড়ানো আয়ান ও প্রিয়া। অনুষ্ঠান শুরুর আগে সায়মা অনেকটা ঘোষণার মত কিছু লাইন আওড়ালো মাইকে। সবশেষে জানালো দু'টি খবর।

"আজকে আমি আপনাদের সামনে দু'টো খুশির খবর উপস্থাপন করছি। প্রথমটা, আগামী ১০ দিন পর আমার বড় ভাই ও ভাবির বিয়ের অনুষ্ঠান ধুমধাম করে হবে। আপনারা সবাই সেই অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত।"

এতটুকু বলে থামলো সায়মা। আশেপাশে তালিবর্ষণ শুরু হয়েছে। সেদিকে পরোয়া না করে সে তাকালো সিড়িপথে। সে অপেক্ষায় রয়েছে কখন সারা নাতাশাকে নিয়ে নামবে! তারপরই পরবর্তী ঘোষণাটা দিবে ও। কিন্তু পরিবারের সবাইকে অবাক করে সারা নামলো একা। স্টেজে এসে মাথা নিচু করে মৃদু স্বরে জানালো,

"নাতাশা ঘরে নেই। উপরতলার সবজায়গা তন্নতন্ন করে খুঁজে ফেলেছি, কোথাও নেই!"

স্নিগ্ধ প্রেমের মায়া গল্পটি তিয়াশা চৌধুরী-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক ও রোমান্টিক থ্রিলার গল্প