কুয়াশামোড়া সকালে সূর্য তার কিরণে উত্তপ্ত করছে চারপাশ৷ আগামীকাল এনগেজমেন্টের আয়োজন থাকার পরও আয়মান আজ অফিসে এসেছে। প্রিয়ন্তী কেবিনে প্রবেশ করতেই ওর থমথমে মুখশ্রী নজরে পড়লো আয়মানের। সৌজন্যতার খাতিরে জিজ্ঞেস করলো,
"কি হয়েছে?"
প্রিয়ন্তী সৌজন্যতার ধার ধারলো না। সরাসরি উত্তর দিলো,
"আপনার বিয়ের আয়োজন হয়েছে।"
ত্যাড়া উত্তরে বিরক্ত হলো আয়মান৷ ভালোমানুষি দেখিয়ে জিজ্ঞেস করায় নিজেকে চড় মারতে ইচ্ছে করলো। কিন্তু প্রিয়ন্তী সামনে থাকায় ইচ্ছেকে দমন করলো। বলল,
"আমি জানি। অন্যকিছু থাকলে বলো!"
প্রিয়ন্তী উত্তর দিলো,
"অন্যকিছু আর কি বাকি থাকবে? আপনার আনারকলির সাথে আপনার বিয়ে ঠিক হয়েছে। অভিনন্দন জানাতে এলাম।"
আয়মান তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে একবার পরখ করলো প্রিয়ন্তীর চেহারা। দুর্দান্ত তেজ ধরে রাখার চিহ্ন সেখানে। ওর ভেতরকার অনুভূতি ধরা যাচ্ছে না। অন্যদিকে বারবার আপনার আনারকলি, আপনার আনারকলি করে মাথা নষ্ট করেই যাচ্ছে আয়মানের৷ আয়মান তেঁতো কন্ঠে বলল,
"এটা আবার অভিনন্দন জানানোর কি হলো? বিয়ে সবারই হয়। এত স্পেশালভাবে অভিনন্দন দেওয়ার মতো কোনো ব্যাপারই না এটা।"
আয়মানের উত্তরে বিস্মিত হলো প্রিয়ন্তী। পরপর ঠোঁটে হাসি টেনে বলল,
"আপনার আনারকলিকে পাওয়ার অভিনন্দন জানাচ্ছি। ছোট চুলের আনারকলি।"
আয়মান এমন উদ্ভট নাম শুনেও অবাক হলো না। প্রতিনিয়ত এইসব শুনতে শুনতে এখন বিস্ময় ছুটি নিয়ে দার্জিলিং গিয়েছে। বলল,
"ছোট চুলের আনারকলি, তো আমি কি করবো? ওর ছোট চুল দেখে দরদ লাগলে তুমি তোমার লম্বা চুলগুলো দিয়ে দিতে পারো।"
প্রিয়ন্তী বিস্ময় নিয়ে চুলের খোঁপায় হাত দিলো। নাহ, সেটা ঠিকঠাক বাঁধা আছে৷ অফিসে আসলে মাথায় প্রতিদিন হিজাব না থাকলেও খোঁপাটা করা থাকে। তাহলে আয়মান জানলো কি করে ওর চুল লম্বা না ছোট?
আয়মান ওর মনের কথা যেনও মুখে তাকিয়েই স্পষ্ট পড়তে পারলো। উত্তর দিলো,
"কাল ছাদে তোমার খোঁপা খুলেছিলো তখন দেখেছি।"
প্রিয়ন্তী বিশাল হা করে, পরমুহুর্তেই নাক-মুখ কুঁচকে বলল,
"কাল ছাদে আপনি আমাদের লুকিয়ে লুকিয়ে দেখছিলেন?"
আয়মান কম্পিউটারে চোখ রেখে স্বাভাবিক কন্ঠে উত্তর দিলো,
"লুকিয়ে দেখার কি আছে? আমার বাড়ির ছাদ আর সেখানে কে থাকে না থাকে, দেখার অধিকার আমার আছে।"
প্রিয়ন্তী ফোঁড়ন কেটে বলল,
"কেনও? আনারকলিকে দেখে মন ভরছে না?"
আয়মান বিরক্ত হয়ে চোখ তুলে চাইল ওর দিকে। গম্ভীর কন্ঠে বলল,
"আমি গিয়েছিলাম সায়মাকে ডাকতে, কিন্তু সবাইকে আড্ডায় ব্যস্ত দেখে না ডেকেই চলে এসেছি।"
প্রিয়ন্তী কথাগুলো বিশেষ আমলে নিলো না। সে ব্যস্ত আয়মানের মনে নাতাশাকে নিয়ে অনুভূতি জানতে। ওর মাথায় একটা বিষয় ঢুকছে না। সেটা হলো, আয়মানের যদি নাতাশার সাথে সম্পর্ক থাকে তাহলে সে নাতাশার নাম শুনলেই বিরক্ত হয় কেনও?
পরপর কতগুলো উদ্ভট প্রশ্নে আয়মানের মেজাজের লাগাম ছুটে গেলো। কথার খেঁই হারিয়ে ধমক দিয়ে বলল,
"তোমার কি সারাদিন আমার মাথা নষ্ট করা ছাড়া কোনো কাজ নেই? কাজ থাকলে সেটা করো। বকবক করে আমার মাথা খেও না।"
প্রিয়ন্তী চুপসে গিয়ে বলল,
"বকবক করে মাথাও খাওয়া যায়? জানতাম না তো! আচ্ছা, কিভাবে খায়? আর টেস্ট কেমন?"
আয়মান রাগে কটমট করে বলল,
"তুমি খেতে থাকো, তাই টেস্টটাও তুমিই জানো। এখন আমার চোখের সামনে থেকে যাও!"
আয়মাননে রেগে যেতে দেখে প্রিয়ন্তীও বিশেষ ঘাঁটালো না। চুপচাপ বেরিয়ে গেলো কেবিন থেকে। যেতে যেতে আপনমনে বকে তুলোধুনো করলো নাতাশাকে,
"বোম বেশি রেগে ব্লাস্ট হয়ে গেলে ভুক্তভোগীটা আমাকেই হতে হবে! ওই আনারকলির কি? সে তো নিজের মত ঘুরে বেড়াচ্ছে। আরেহ, বিয়েটা যখন তুই করবি তো তুই-ই এসে তোর প্রেমিকের রাগ মনে ভরে দেখ না! আমাকেই কেন দেখতে হবে? অসহ্য!"
*******
ভরদুপুরে ছুটি হয়েছে ভার্সিটি। ঠিক মাথার উপর সূর্য। তবে পৌষের শীতলতার প্রভাবে এই উত্তাপটাও আরামদায়ক। ভার্সিটি থেকে বের হতেই আয়ানের কালো গাড়িটা চোখে পড়লো গেটের সামনে। সায়মা আজ ভার্সিটি আসে নি। তাই প্রিয়াকে একাই বাড়ি যেতে হবে। এজন্যই আয়ান এসেছে ভেবে প্রিয়া গেলো গাড়ির কাছে। আয়ান ড্রাইভিং সিটে বসা। প্রিয়া বিনাবাক্যে বসে পড়লো আয়ানের পাশের সিটে।
প্রিয়া ঠিকঠাক হয়ে বসার সাথে সাথেই সচকিতে চমকাল, যখন দেখলো গাড়ি উল্টোদিকে মোড় ঘুরেছে। হকচকিয়ে শুধালো,
"কোথায় যাচ্ছি আমরা?"
আয়ান নিরুদ্বেগ সামনে তাকিয়ে জবাব দিলো,
"ঘুরতে।"
প্রিয়া আয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল,
"এই ভরদুপুরে ঘুরতে? বাসায় সবাই চিন্তা করবে না?"
আয়ান একইভাবে বলল,
"না, করবে না। আমি বলে দিয়েছি, আমি আমার বউ নিয়ে ঘুরতে যাচ্ছি।"
প্রিয়া থমকাল সেই এক শব্দে। 'আমার বউ' শব্দটা মৃদু কঁম্পন ধরালো বক্ষপটে। লজ্জায় রক্তিম হয়ে দৃষ্টি নামালো নিচে৷ মাঝেমধ্যেই আয়ানের কিছু কথা ওর চঞ্চল সত্ত্বাটিকে ঘুম পাড়িয়ে একদম শান্ত করে দেয়।
*******
এক ঘন্টা পর তারা পৌছালো শহরাঞ্চল থেকে কিছুটা দূরের রেস্টুরেন্টে। খুব একটা নামীদামী না হলেও এর চারপাশের পরিবেশ মনোমুগ্ধকর। গাছপালা ঘেরা এক সুনিবিড় পরিবেশে স্থাপিত এই রেস্টুরেন্ট একান্ত সময় কাটানোর উপযুক্ত স্থান। রেস্টুরেন্টের দোতলায় চারপাশে দেয়ালবিহীন খোলা পরিবেশ। শুধুমাত্র ছাদটা চারকোণার পিলারের উপর নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে। শীতল বাতাসে গাছের পাতাগুলো কেঁপে কেঁপে উঠার দৃশ্যটাও চোখে পড়ার মতো।
আয়ান প্রিয়াকে নিয়ে রেস্টুরেন্টের দোতলায় এলো। প্রিয়া আশেপাশে তাকিয়ে আবিষ্কার করলো সেখানে তারা দুইজন ছাড়া কেউ উপস্থিত নেই। প্রশ্ন করে বসলো,
"এখানে কেউ নেই যে?"
আয়ান চেয়ার টেনে ওকে বসার সুযোগ করে দিলো। ইশারায় চেয়ার দেখিয়ে বসতে বলল। প্রিয়া বসতেই আয়ান ওর প্রশ্নের উত্তর দিলো,
"তুমি কি আমাদের মাঝখানে আরও কাউকে চাইছো?"
প্রিয়া দু'পাশে ঘাড় নাড়িয়ে না বোঝালো। আয়ান বলল,
"এই সেকেন্ড ফ্লোরটা কিছু সময়ের জন্য আমাদের। তোমার পছন্দের জায়গায় নিয়ে এসেছি।"
প্রিয়া ভ্রু উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
"আমার পছন্দের জায়গা কে বলল?"
আয়ান শার্টের কলার ঠিক করতে করতে বলল,
"প্রকৃতি তোমার পছন্দের। তাই ভাবলাম এই প্রকৃতির সান্নিধ্যেই তোমাকে নিয়ে আসি। বিয়ের পর আজ প্রথম কোথাও ঘুরতে এলাম। চাইলেই পারতাম শহরের কোনো দামী রেস্টুরেন্টে এই দুপুরটা কাটাতে। কিন্তু আমার মনে হলো, প্রকৃতিঘেরা এই স্নিগ্ধ পরিবেশটাই বেশি উপযুক্ত।"
প্রিয়া আয়ানের কথাগুলো মুগ্ধ হয়ে শুনলো। অন্যরকম এক ভালোলাগার ছোঁয়া ছিলো সেখানে। তার পছন্দকে গুরুত্ব দেওয়ায় ভালোলাগার মাত্রাটা আরও দ্বিগুন বেগে বৃদ্ধি পেলো। মুগ্ধ দৃষ্টিতে আশেপাশে তাকিয়ে বলল,
"আপনি একদম ঠিক কাজ করেছেন। জায়গাটা আমার ভীষণ পছন্দ হয়েছে।"
আয়ান মুচকি হেসে বলল,
"এই প্রকৃতির মাঝে বসে, এই স্নিগ্ধ পরিবেশে তোমার স্নিগ্ধ প্রেমের মায়ায় নিজেকে জড়ানোর শুভ সূচনা করতে চাইছি আমি!"
আয়ান নিচু স্বরে কথাগুলো বলায় প্রিয়া শুনতে পায় নি সেই কথা। তার দৃষ্টি বাইরের পরিবেশে নিবদ্ধ। আর আয়ানের দৃষ্টি ওর উপর নিবদ্ধ। ওয়েটার খাবার দিয়ে গিয়েছে সেটাও প্রিয়ার নজরে পড়ে নি। সে ব্যস্ত গাছের পত্রপল্লবের নৃত্য দেখতে!
অনেকক্ষণ এইভাবে চলার পর খানিকটা বিরক্ত হলো আয়ান। কোথায় তারা একসাথে সময় কাটানোর জন্য এসেছে, আর এই মেয়ে আশপাশ দেখেই কূল পাচ্ছে না! এখন আয়ানের মনে হচ্ছে শহরের বিলাসবহুল রেস্টুরেন্টে গেলেই ভালো হতো। কমপক্ষে প্রিয়ার নজর তো ওর উপর থাকতো। এখানে তো ও আয়ানের প্রতি আগ্রহই দেখাচ্ছে না। প্রিয়া যেই গাছের দিকে তাকিয়ে আয়ান সেখানে রোষপূর্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো। এক প্রকার হিংসা হলো ওর গাছের পাতাটাকে।
প্রিয়ার ধ্যান ভাঙাতে আয়ান গলা খ্যাঁকাড়ি দিয়ে বলল,
"তোমার দেখা শেষ হলে আমি কিছু বলতে চাইছিলাম।"
আয়ানের ডাকে প্রিয়া হুশে আসলো। সোজা হয়ে বসে বলল,
"জি, বলুন।"
আয়ান গম্ভীর কন্ঠে বলল,
"দেখা শেষ হয়েছে তাহলে?"
প্রিয়া উৎফুল্ল হয়ে বলল,
"পরিবেশটা এত্ত সুন্দর, সারাদিন সারারাত তাকিয়ে থাকলেও দেখা শেষ হবে না। এত সুন্দর জায়গায় নিয়ে আসার জন্য অনেকগুলো থ্যাংকস।"
প্রিয়ার অভিবাদনের জবাবে আয়ান শুধুমাত্র ছোট্ট 'হু' করলো। মনে মনে আফসোস হলো নিজের জন্য! বাজেভাবে প্রিয়ার মায়ায় ডুবে যাচ্ছে ও। আগে ওকে চোখের সামনে দেখলেও অনাগ্রহ বই আগ্রহ জাগে নি! আর এখন অন্য কেউ ওর মনোযোগ পেলে তাকে হিংসে হচ্ছে। হোক সেটা জড়বস্তু!
আয়ানকে চুপ থাকতে দেখে প্রিয়া নিজেই বলল,
"আপনি কিছু বলতে চাইছিলেন।"
প্রিয়ার কথায় আয়ান ভাবনা থেকে বেরিয়ে নড়ে-চড়ে বসলো। বলল,
"হ্যাঁ। তুমি অনুমতি দিলে বলতে পারি।"
এহেন কথায় প্রিয়ার কাঁশি উঠে গেলো। আয়ান ওর দিকে পানি এগিয়ে দিলো। প্রিয়া পানি খেয়ে ঠিকঠাক হতেই জিজ্ঞেস করলো,
"আর ইউ ওকে?"
প্রিয়া জোরে শ্বাস নিয়ে বলল,
"আই এম ওকে৷ আর ইউ ওকে? আপনি ঠিক আছেন? না মানে, কিছু বলার জন্য কবে থেকে আমার অনুমতি নিতে শুরু করলেন?"
প্রিয়ার কন্ঠে স্পষ্ট দুষ্টুমির আভাস। আয়ান বুঝতে পারলো ওর কর্মকাণ্ড। সিরিয়াস মুহুর্তে এমন দুষ্টুমিতে বিরক্তও হলো কিছুটা। বলল,
"কথাটা বলতে তো দিবে, নাকি?"
প্রিয়া হাসি থামিয়ে মুখটাকে গম্ভীর বানানোর চেষ্টা করলো। পরপর বলল,
"হ্যাঁ এবার বলুন।"
আয়ান চেয়ারে পিঠ এলিয়ে চোখ বুঝলো। সাজিয়ে নিলো বাক্যমালা। তারপর উঠে বসে সরাসরি চোখ রাখলো প্রিয়ার চোখে। বলল,
"আমরা কি আবার সবকিছু সুন্দরভাবে শুরু করতে পারি না?"
প্রিয়া সব ভুলে অবাক হয়ে চেয়ে রইলো এহেন কথায়। যেটা মনে মনে এতদিন চাইছিলো আয়ান সেই প্রস্তাব রাখায় হৃদয় একটা স্পন্দন মিস করলো। মনের মধ্যে ভেসে গেলো অন্যরকম সুখের জোয়ার। তাও উপর-উপর নিজেকে স্বাভাবিক রেখে বলল,
"সেটা কিভাবে?"
আয়ান বলল,
"বিয়ের আগে যা হয়েছে, সেটা ভুলে যাই। তুমি আমাকে পছন্দ করতে না, আমিও তোমায় সহ্য করতে পারতাম না। কিন্তু আল্লাহর হয়তো এই ইচ্ছাই ছিলো, আমরা এক হবো। ভাগ্যে আমাদের এক হওয়াই লেখা ছিলো। সেটা হয়ে গেছে। তাহলে আমরা আগামী নিয়ে ভাবি?"
প্রিয়া বুক ফুলিয়ে সস্থির নিশ্বাস নিলো। অজ্ঞাত সম্পর্কের ভারী বোঝাটা এতদিনে হৃৎপিণ্ডের উপর চেঁপে বসেছিলো। আজ সেটা সুরসুর করে নেমে গেলো। মুচকি হেসে বলল,
"আপনি যেটা চাইছেন সেটাই হবে। এবার আগামীর ভাবনাটা বলুন?"
আয়ান ত্রস্থ মুখে গাম্ভীর্যতা ফুটিয়ে তুলল। প্রিয়া মুখ দেখে আন্দাজ করলো আয়ান হয়তো গুরুত্বপূর্ণ কিছু বলবে। নিজেও প্রস্তুতি নিলো সেরকম কিছুই শোনার। কিন্তু আয়ান ওর ভাবনা বিফলে নিয়ে বলে বসলো,
"বেবি কয়টা নেয়া যায়? ক্রিকেট টিম? ফুটবল টিম? নাকি দুইটা টিমই?"
গাম্ভীর্যপূর্ণ সময়ে এহেন উত্তরে ভড়কাল প্রিয়া। পরপর চেঁতে-টেতে একাকার হয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। বলল,
"এটা আপনার ভবিষ্যতের ভাবনা?"
আয়ান নিষ্পাপ স্বরে জানালো,
"আপাতত ভবিষ্যৎ ভাবনা বলতে তো আমি এটাকেই পেলাম।"
প্রিয়া রেগেমেগে বলল,
"আমি থাকবো না আপনার সাথে। এখনই বাড়ি যাবো।"
প্রিয়া যেতে নিলে আয়ান ওর হাত টেনে ধরলো। টেনেটুনে আবার বসালো চেয়ারে। হাসি চেঁপে বলল,
"আচ্ছা আচ্ছা, মজা করছিলাম। এবার সিরিয়াস হয়ে বলি?"
প্রিয়া উত্তর দিলো না। মুখ ঘুরিয়ে চেয়ে রইলো অন্যদিকে। আয়ান বলল,
"আচ্ছা ক্রিকেট টিম, ফুটবল টিম যখন তোমার পছন্দ হলো না তাহলে কি টিম বানানো যায় সেটা বলো! আমি সবকিছুতে রাজি।"
এরুপ লাগামছাড়া কথায় প্রিয়া লজ্জা পাচ্ছে। কিন্তু আয়ানের সামনে সেটা প্রকাশ করা মানেই সমূহ বিপদ। এই মুহুর্তে আয়ানের সামনে থেকে পালানোরও রাস্তা নেই। তারা বাড়ি থেকে অনেক দূরে। আয়ান ওর লজ্জা বুঝতে পারলে আরও নতুন করে কিছু সংযোজন করবে৷ তাই কোনোরূপ প্রতিক্রিয়া না দেখানোই যুক্তিযুক্ত।
ওকে চুপ দেখে আয়ান সিরিয়াস হলো। বলল,
"আচ্ছা, ভবিষ্যৎ ভাবনা তাহলে পরে ভাববো। এখন বর্তমানের ভাবনা ভাবি।"
প্রিয়া মিনমিন করে বলল,
"তাহলে সব ভাবনা বাদ দেই৷ এখন খেয়ে-দেয়ে বাসায় রওনা দেই। কাল আয়মানের এনগেজমেন্ট। বাসায় অনেক কাজ আছে।"
আয়ান ঘাড় উঁচিয়ে বলল,
"ওকে! যেমন তোমার ইচ্ছা। এই ঝামেলাটা শেষ হোক। তারপর নাহয় ভাববো!"
********
এনগেজমেন্ট সন্ধ্যায় হলেও তোড়জোড় শুরু হয়েছে সকাল থেকেই। প্রিয়ার ফোন পেয়ে সকাল সকাল খান বাড়িতে হাজির হয়েছে নাতাশা৷ মনে মনে নিজেকে বাহবা জানাচ্ছে নিজের বুদ্ধির জন্য। আজকের পর থেকে সে আয়মানের বাগদত্তা হয়ে যাবে। এটাই তো সে চাইছিলো! কিন্তু প্রিয়াকে বলার পর কাজটা এত দ্রুত হয়ে যাবে সেটাই ভাবে নি।
******
সায়মা প্রিয়ন্তী ও সন্ধ্যা দু'জনকেই ইনভাইট করেছে ভাইয়ের বাগদানের অনুষ্ঠানে। বিকালে সন্ধ্যা রেডি হলেও প্রিয়ন্তী খাটে চুপচাপ বসে রয়েছে। সন্ধ্যা অর্ধেক সাজ রেখে এসে বলল,
"কিরে? রেডি হচ্ছিস না কেনও? যাবি না?"
প্রিয়ন্তী মুখ ভার করে বলল,
"না, আমি যাবো না। তুমি যাও।"
সন্ধ্যা ওর হাত টেনে বলল,
"এসব ঢং বাদ দে। উঠে রেডি হ।"
প্রিয়ন্তী বিরক্ত কন্ঠে বলল,
"বললাম তো যাবো না!"
সন্ধ্যা মুখ বেঁকিয়ে বলল,
"কেনও গো? তুমি কি আশায় বসে আছো আয়মান খান এসে তোমায় কোলে করে নিয়ে যাবে।"
প্রিয়ন্তী ধুপধাপ পা ফেলে উঠে দাঁড়ালো। ঝাঁঝালো কন্ঠে বলল,
"একদম তার কথা আমার সামনে বলবে না। সে গিয়ে তার আনারকলিকে কোলে নিক। কোলে নিয়ে বসে থাকুক। আমার কি?"
সন্ধ্যা কিছু একটা ভাবার ভান করে বলল,
"হ্যাঁ তাই তো! তোর কি? তোর তো কিছু না। তাহলে তুই জ্বলছিস কেনও?"
প্রিয়ন্তী দাঁতে দাঁত চেঁপে বলল,
"আমি জ্বলছি না৷ আমি শুধু বলছি।"
সন্ধ্যা কাধ উঁচিয়ে বলল,
"আমাকে বলে কি লাভ? তুই অনুষ্ঠানে গিয়ে আয়মান ভাইয়া আর নাতাশাকেই বল। বলে ফেল, তুই দেবদাস হয়ে যাচ্ছিস!"
প্রিয়ন্তী রেগে কিছু বলতে যাবে তার আগে সন্ধ্যা ওকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
"সরি! একটু মিস্টেক হয়েছে। দেবদাসী হবে, রাইট?"
প্রিয়ন্তী কটমট করে বলল,
"এসব কিছুই না। শুধু শুধু আমার ঠান্ডা মেজাজটা বিগড়িও না। তুমি যাও।"
সন্ধ্যা ঠোঁটে হাসি টেনে বলল,
"আমি তো যাবোই, তবে তোকে নিয়ে যাবো। তুই যতক্ষণ না রেডি হবি, আমি ততক্ষণ তোকে এগুলো বলতেই থাকবো।"
প্রিয়ন্তী এক প্রকার চেঁচিয়ে বলল,
"ওকে ফাইন! রেডি হচ্ছি আমি। যাবো অনুষ্ঠানে!"