স্নিগ্ধ প্রেমের মায়া

পর্ব - ২৪

🟢

পিনপতন নীরবতা বিরাজমান কক্ষজুড়ে। যেনও একে অপরের মুখ দেখা ছাড়া আর কোনো কাজ নেই। কিছুক্ষণ এইভাবে চলার পর আয়মান বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো। বলল,

"ভাবি বলতে চাইছেন, নাতাশা সঠিক?"

প্রিয়া ত্রস্থ মাথা দুলিয়ে বলল,

"আমি এরকম বলি নি। আমি জানি না কে সঠিক। কিন্তু জানতে চাই!"

আয়মান মুচকি হেসে বলল,

"তাহলে তো জানার ব্যবস্থা করতেই হচ্ছে!"

সারা-সায়মা একে অপরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলো। তাদের চোখে মুখে স্পষ্ট কৌতুহল। আগ্রহের সাথে জিজ্ঞেস করলো,

"কিভাবে?"

আয়মান বলল,

"নাতাশা যেটা চাইছে সেটাই হোক। ও যখন এতকিছু করেই ফেলেছে, তাহলে আগামী প্ল্যানগুলোও ওর মাথায় সাজানো আছে। ওর সেই প্ল্যানকে সফল করবো আমরা। তারপর দেখবো, ওর উদ্দেশ্যে কি?"

সায়মা বলল,

"ওর প্ল্যান মোতাবেক সবকিছু হলে যদি শেষে ওর উদ্দেশ্যের বিপরীতে না যেতে পারি?"

আয়ান বলল,

"আমরা ওর উদ্দেশ্য ধরতে যাচ্ছি। উদ্দেশ্য সফল করতে না। ওর প্ল্যানমতো সব আগালে ওর উদ্দেশ্য বাইরে আসতে বাধ্য। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটা সফল হতে দেওয়া যাবে না। সবাইকে খুব সাবধানে থাকতে হবে।"

প্রিয়া বলল,

"ওকে ফাইন। তাহলে কাল থেকে নেমে পড়ি প্ল্যানিং এ?"

বলতে বলতে হাত বাড়িয়ে দিলো সামনে। আয়ান ওর চোখের দিকে তাকিয়ে খুব শক্ত করে ধরলো ওর হাত। হেসে বলল,

"ওকে ডান।"

একে অপরের চোখে চোখ রেখে চলে গেলো কিছু মুহুর্ত। ধ্যানজ্ঞান খুঁইয়ে তাকিয়ে থাকায় ভুলে বসলো রুমে আরও তিনজন আছে। ওদের অধরকোণের মুচকি হাসি আর সরছে না। ধ্যান ভাঙাতে আয়মান গলা খ্যাকাড়ি দিয়ে বলল,

"এত রাতে আমার রুমে বসে আমার ঘুম নষ্ট করার কোনো মানে হয়? যা করতে ইচ্ছে হয়, মানুষ নিজের রুমে গিয়েই করতে পারে!"

আয়মানের গলার স্বর পেয়ে প্রিয়া লজ্জা পেয়ে আয়ানের থেকে হাত ছাড়িয়ে দৃষ্টি নামিয়ে নিলো। সায়মা দুষ্টুমী করে বলল,

"হ্যাঁ হ্যাঁ। পাবলিক প্লেস হ্যায় ইয়ে। সাবকুছ নাহি চালতা! রাত তো কম হলো না, সবাই যার যার রুমে যাও। আমরাও যাই!"

সারা হাই তুলতে তুলতে বলল,

"হ্যাঁ চলো।"

সারা-সায়মা চলে যেতেই প্রিয়া মাথা নিচু করে বেরিয়ে গেলো রুম থেকে। আয়ান যেতে নিবে তার আগে আয়মানের কন্ঠ শুনে থমকে গেলো। সে বিরক্ত কন্ঠে বলছে,

"সিঙ্গেল ছোট ভাইয়ের সামনে দেখিয়ে দেখিয়ে রোমান্স করে। পা*ষাণ বড় ভাই কোথাকার!"

আয়ান ঘুরে রহস্যময় হাসি হেসে বলল,

"ওয়েট কর। এক সপ্তাহেই তোর বিয়ের ব্যবস্থা করছি নাতাশার সাথে। এরপর আর আমার রোমান্সে নজর দিবি না!"

আয়মান মিথ্যে রাগ দেখিয়ে বলল,

"দেখো ভাই, ওসব নজর আমি এমনিতেও দেই না। তুমি বললে জীবনে ঘুরেও তাকাবো না। তাও এই মেয়ের সাথে বিয়ের কথা বলো না!"

শেষ কথায় আয়মানের মিনতিপূর্ণ কন্ঠস্বর শুনে হাসতে হাসতে রুম থেকে বেরিয়ে গেলো আয়ান। আয়মান দরজা লাগিয়ে লাইট বন্ধ করে বিছানায় এসে শুলো। ঘুরতে থাকা সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে ভাবলো,

"নাতাশার গেমে নাতাশাকে বাজিমাত করার কাজে নেমেছি। আল্লাহ জানে, কোন বিপদ অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য!"

*******

কুয়াশা কেটে সূর্যের দেখা মিলেছে আকাশে। তার তীর্যক কিরণ খুব একটা উত্তপ্ত করতে পারছে না চারপাশ। তবুও জানালা গলে আলো মুখে পড়ায় ভয়ানক বিরক্ত হলো প্রিয়ন্তী। অন্যপাশে মুখ ঘুরিয়ে বলল,

"সকাল সকাল কে জানলা খুলেছে? উফফ! একদিন যে একটু শান্তিতে ঘুমাবো সেই উপায় নেই!"

সন্ধ্যা চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে বলল,

"সকাল শেষ। এবার উঠে পড়ুন।"

প্রিয়ন্তী চোখ বুজেই নাক-মুখ কুঁচকে বলল,

"সারা সপ্তাহ ওই গন্ডার জ্বালায় আর আজ তুমি জ্বালানোর দায়িত্ব নিয়েছো? জানলা বন্ধ করো, আমি ঘুমাবো।"

সন্ধ্যা অবাক হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে বলল,

"ছুটির দিন বলে তুই আজ সারাদিন ঘুমাবি প্রিয়ু?"

প্রিয়ন্তী হাই তুলে বলল,

"ঘুমাতে দাও। গুড নাইট!"

প্রিয়ন্তীর কথায় সন্ধ্যা সন্দিহান দৃষ্টিতে বাইরে তাকালো। সেখানে পরিষ্কার দিনের আলো বোঝা যাচ্ছে। তাহলে এই মেয়ে কোন যুক্তিতে এটাকে নাইট বলছে?

সন্ধ্যা চেয়ার ছেড়ে উঠে গিয়ে জানলার পর্দাগুলো ভালোভাবে সরিয়ে দিলো। ঘুমে ব্যাঘাত ঘটায় প্রিয়ন্তী বালিশ মুখের উপর নিয়ে আবার ঘুমানোর চেষ্টা করলো। সন্ধ্যা এসে ওই বালিশ তুলে নিয়ে ওকে মারতে মারতে বলল,

"গুড নাইটের বাচ্চা, ঘুম থেকে উঠ। প্রিয়া সকালে ফোন করেছিলো তোর আজ ওই বাসায় দাওয়াত। যাবি না?"

দাওয়াতের কথায় ধড়ফড়িয়ে বিছানায় উঠে বসলো প্রিয়ন্তী। চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে বলল,

"প্রিয়া আপুর বাসায় দাওয়াত? সপ্তাহে একদিন ওই গন্ডারের মুখদর্শন করতে হবে না ভেবে খুশি ছিলাম। আর আপু সেটায় এইভাবে পানি ঢেলে দিলো? এটা আমি মানি না!"

সন্ধ্যা বিরক্ত হয়ে বলল,

"বোকার মতো কথা বলিস না প্রিয়ু। আজকের মতো চান্স দ্বিতীয়বার না-ও আসতে পারে। আজকেই সুযোগ গল্পের ছলে প্রিয়ার ছোটবেলার গল্প জানার। কে বলতে পারে, যদি সব বলে দেয়?"

প্রিয়ন্তী বলল,

"আমি একা যাবো? তুমি সাথে গেলে ভালো হতো।"

"আমি তো যাবোই! আম্মুকে অনেককিছু বলে রাজি করিয়েছি। এবার তুই উঠে রেডি হ।"

*******

বিকেল নামতেই শীতল বাতাসের স্পর্শে ঠান্ডা হয়ে গেলো ছাদ। সন্ধ্যা এখনও সায়মার রুমে আছে। প্রিয়া প্রিয়ন্তীকে টেনেটুনে ছাদে নিয়ে এসেছে একসাথে গল্প করবে বলে। কিন্তু সন্ধ্যা ও সায়মার দেখা নেই। তাই প্রিয়ন্তীকে বসতে বলে নিজে গেলো নিচে।

প্রিয়ন্তী একা একা হেঁটে হেঁটে দেখছিলো ছাদের সাজসজ্জা। ফুলের গাছে সাজানো ছাদ দেখে মনে পড়ে গেলো নিজের বাড়ির কথা। তখনই আয়মান ফোনে কথা বলতে বলতে ঢুকলো ছাদে। প্রিয়ন্তী চুপচাপ এক কোণায় দাঁড়িয়ে থাকায় আয়মানের চোখে পড়লো না৷ কিন্তু প্রিয়ন্তী ওকে ঠিকই দেখেছে। আয়মান বলছে,

"ভাই, আর বলিস না! কোন এয়ারপোর্টে বলেছিলাম রাস্তা মাঁপতে। এখনও পিছু পিছু ঘুরছে। শেষে কি না ভাবিকে পটিয়ে ফেলল?"

---------

"যাই হোক, আমরা শুধু ওর প্ল্যানমতো কাজ করছি। দেখি না কি উদ্দেশ্য!"

--------

অপরপাশের ব্যক্তিটা কি বলেছে সেটা প্রিয়ন্তীর জানা নেই। তবে যাই বলেছে, হাসির মতো কিছু বলেছে। আয়মান হাসছে। মন খুলে হাসছে। সেই হাসির দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে প্রিয়ন্তী মনে মনে ভাবলো,

"হাসলে উনাকে কত সুন্দর লাগে! উনি কি জানে এই কথা? জানে না বোধহয়! জানলে কি সবসময় এমন গোমড়ামুখে থাকতো?"

হঠাৎ হুড়মুড় করে ছাদে সবার চলে আসায় সৎবিৎ ফিরলো প্রিয়ন্তীর। সবাইকে দেখে আয়মানও কল কেটে দিয়েছে। পরপর কারো দিকে না তাকিয়েই সাইড কাটিয়ে চলে গেলো নিচে। প্রিয়া প্রিয়ন্তীর কাছে এসে বলল,

"আয়মান কিছু বলেছে তোমাকে?"

প্রিয়ন্তী চোখ তুলে তাকালো প্রিয়ার দিকে। বলল,

"কিছু বলে নি তো! আমাকে বোধহয় দেখেও নি।"

প্রিয়া সস্থির নিশ্বাস ফেলে বলল,

"যাক! আসো সবাই বসে গল্প করি।"

বিশাল ছাদবাগানে ফুল গাছের ছড়াছড়ি। এরমধ্যে এক সাইডে মাদুর পেতে বসেছে সবাই। গল্পের ছলে প্রিয়ন্তীই প্রথম জিজ্ঞেস করলো,

"আচ্ছা, প্রিয়া আপুর বিয়ে কিভাবে হয়েছে? তোমার আর ভাইয়ার লাভ ম্যারেজ, নাকি এরেঞ্জ ম্যারেজ?"

হঠাৎ এই প্রশ্নে প্রিয়া থমকে গেলো। এক পলক তাকালো সায়মার দিকে। ওর হয়ে উত্তরটা সায়মাই দিলো,

"ওদের লাভ ম্যারেজও না, এরেঞ্জ ম্যারেজও না। ইট'স আ ফোর্স ম্যারেজ!"

প্রিয়ন্তী কিছুটা অবাক হয়ে বলল,

"ফোর্স ম্যারেজ! মানে?"

সারা গর্বের সহিত উত্তর দিলো,

"ফোর্স ম্যারেজ মানে ভাইয়া জোর করে বিয়ে করেছে। ভাবির বিয়ে অন্য জায়গায় ঠিক হয়েছিলো। তারপর যেদিন ভাবির বিয়ে, ওইদিন ভাইয়া ভাবিকে তুলে কাজি অফিস নিয়ে গিয়ে বিয়ে করে নিয়েছে।"

প্রিয়া চোখ বন্ধ করে মাথা নিচু করে ফেলেছে। কি অবলীলায় ভাইয়ের কার্যকলাপ গর্বের সাথে বলে যাচ্ছে দুইজন! মনে হচ্ছে, ওর ভাই জোর করে তুলে নিয়ে বিয়ে করে বিশ্বজয় করে ফেলেছে। বোনগুলোও ভাইয়ের মতোই হয়েছে!

সারার উত্তরে নড়েচড়ে বসলো প্রিয়ন্তী। জোর করে বিয়ের কথা শুনে মনে কৌতুহল মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। উৎফুল্ল হয়ে বলল,

"বিয়ের দিন তুলে নিয়ে গিয়ে বিয়ে! ইন্টারেস্টিং! আয়ান ভাইয়া প্রিয়া আপুকে কত্ত ভালোবাসে দেখেছো? একদম তুলে নিয়ে বিয়ে করেছে। হাউ রোমান্টিক!"

প্রিয়ন্তীর কথায় প্রিয়া মাথা নিচু করে বিড়বিড় করলো,

"রোমান্টিকের খ্যাতা (কাঁথা) পুড়ি! কি ভয়টাই না পেয়েছিলাম তখন! আর এখন দেখো। দিনে দিনে রঙবদল হচ্ছে উনার!"

সায়মা প্রিয়াকে একটা ধাক্কা দিয়ে হুশে আনলো। বলল,

"এভাবে বিড়বিড় করে আর কত আমার ভাইয়ের দুর্নাম করবি? এবার বউ হয়েছিস, স্বামীর একটু তো সুনাম কর!"

প্রিয়া চোখ পাঁকিয়ে বলল,

"তোকে কে বলেছে আমি তোর ভাইয়ের দুর্নাম করছি?"

প্রিয়ন্তী প্রিয়ার কথায় সায় দিয়ে বলল,

"হ্যাঁ তাই তো! আপুকে কখনো ভাইয়ার নামে কোনো দুর্নাম করতে দেখি নি।"

প্রিয়ন্তীর কথায় উচ্চস্বরে হেসে উঠলো সবাই। শুধুমাত্র প্রিয়া চুপ। ইতস্ততায় নখ দিয়ে জামা খুঁটছে। এদিকে সবার হাসির কারণ না বুঝে বোকার মতো তাকিয়ে আছে প্রিয়ন্তী। সবার হাসি থামতেই প্রশ্ন করলো,

"হাসলে কেনও তোমরা?"

সায়মা উচ্চশব্দের হাসি থামালেও হাসির রেশ মুখজুড়ে। বলল,

"তোর কথায় বিশাল মাপের ভুল আছে, প্রিয়ু। বিয়ের আগে এই মেয়ে আমার ভাইয়ের নামে আমাদের সামনেই কম দুর্নাম করে নি! ভাইয়া জন্মের সময় নাকি আম্মু করলার জুস খেয়েছে। তাই আমার ভাই এত তিতা হয়েছে। ভাইয়া সবসময় এমন মুখ নিয়ে ঘুরে যেনও তাকে কেউ নিমপাতা বেঁটে খাঁইয়ে দিয়েছে! উহু, এগুলো আমার কথা নয়! সব তোর প্রিয়া আপুর কথা!"

প্রিয়ন্তী মুখ ফঁসকে বলে বসলো,

"সে তো তোমার আয়মান ভাইয়ার বেলায়ও করলার জুস খেয়েছিলো আন্টি!"

বলেই সাথে সাথে দাঁত দিয়ে জিভ কাটলো প্রিয়ন্তী। বুঝে গেলো ভুল জায়গায় ভুল কথা বলে ফেলেছে। ওর কথায় একমুহুর্তের জন্য সবাই অবাক হলেও পরমুহুর্তে হেসে ফেলল। সারা মজার ছলে বলল,

"প্রিয়া আপু আয়ান ভাইয়ার বদনাম করতে করতে আয়ান ভাইয়ারই বউ হয়ে গেছে। প্রিয়ন্তী আপু, তুমিও আয়মান ভাইয়ার বদনাম করতে করতে ভাইয়ারই বউ না হয়ে যাও!"

সারার কথাটা সবাই মজা হিসেবেই নিয়েছে। হেসেছেও প্রাণ খুলে। কিন্তু ঠাট্টার ছলে বললেও কথাটা সরাসরি হৃৎপিণ্ডে গিয়ে আঘাত হেঁনেছে প্রিয়ন্তীর। মৃদু কেঁপে উঠে শরীর জানান দিলো অস্বস্তির মাত্রা৷ আমতা-আমতা করে বলল,

"ইয়ে আমরা প্রিয়া আপুর আর আয়ান ভাইয়ার বিয়ের গল্প শুনছিলাম। তোমরা কই থেকে কই চলে যাচ্ছো?"

সায়মা হাসি বন্ধ করে বলল,

"হ্যাঁ তাই তো। তা প্রিয়া ভাবি, এত বদনাম করার পর মিসেস আয়ান আহমেদ খান হয়ে কেমন ফিল করছেন?"

প্রিয়া দুম করে কিল বসালো সায়মার পিঠে। কটমট করে বলল,

"যেমন ভাই, তেমন তার বোন। সবকয়টা আমাকে জ্বালিয়ে মারলো!"

সায়মা ওর কথায় বিন্দু পরিমাণও পাত্তা না দিয়ে বলল,

"আমাকে মারলি? ভাবি হয়ে ননদের গায়ে হাত তুললি? আমি ননদ নির্যাতন মামলা দিবো তোর বিরুদ্ধে।"

প্রিয়া ভেঙচি কেঁটে বলল,

"তো আমি বসে থাকবো নাকি? আমিও তোর বিরুদ্ধে ভাবি নির্যাতন মামলা দিবো।"

প্রিয়ন্তী ওদের কথা থামিয়ে কাতর স্বরে বলল,

"তোমরা মামলা পরে দিলেও পারবে। এখন আমাকে গল্পটা বলে নাও!"

প্রিয়ন্তীর মিনতিপূর্ণ কন্ঠস্বর শুনে সোজা হয়ে বসলো সবাই। সায়মা বলল,

"নিজের বিয়ের গল্প বউ বলবে? লজ্জা পাবে না বলতে? আমিই বলছি।"

প্রিয়ন্তী আগ্রহের আতিশয্যে আরেকটু এগিয়ে বসলো। দু'হাতে গাল রেখে হাতে ভর দিয়ে বসে বলল,

"হ্যাঁ হ্যাঁ বলো!"

সায়মা বলতে লাগলো,

"প্রিয়ার যেদিন বিয়ে ছিলো সেদিন হঠাৎ বাইরে ঝামেলা হয়। চেঁচামেচির শব্দ আসছিলো আমাদের কানে। বিয়ে বাড়িতে এরকম ছোটখাটো ভেজাল লাগেই! আমরাও সেরকম ভেবেই প্রিয়াকে রুমে একা রেখে বাইরে চলে গেলাম। সেই মুহুর্তে ভাইয়া কোনোভাবে প্রিয়ার রুমে ঢুকে পড়ে। তারপর অজ্ঞান করে তুলে নিয়ে যায় সেখান থেকে। আমরা যখন রুমে গেলাম, প্রিয়াকে কোথাও পেলাম না। পরে ভাইয়া ফোন করে যখন কাজি অফিস যেতে বলল, তখনই আমার সন্দেহ হয়েছিলো। পরবর্তীতে সেখানে পৌঁছে তো দেখলাম ঘটনা সত্যিই!"

প্রিয়ন্তী শুধালো,

"তারপর?"

সারা বলল,

"তারপর আর কি? সেভাবেই বিয়ে হয়ে গেলো। এই মেয়ে তো বিয়ে করবেই না! অনেক বুঝানোর পর শেষে রাজি হলো। কিন্তু অনুষ্ঠান এখনও হয় নি। কিছুদিন পর হবে। তোমাদের কিন্তু অগ্রিম দাওয়ার রইলো!"

প্রিয়ন্তী প্রশ্ন করলো,

"প্রিয়া আপুকে যে বিয়ের আগমুহূর্তে পাওয়া যায় নি, পাত্রপক্ষ কোনো ঝামেলা করে নি?"

এই প্রশ্নে চুপ হয়ে গেলো সায়মা। খুঁজে পেলো না উত্তর। এই বিষয়ে কিছু বললেই, পুরোনো কথা মনে করে প্রিয়ার মন খারাপ হবে। প্রিয়ার কথা ভেবে সরু নেত্রে তাকালো প্রিয়ার দিকে। প্রিয়ন্তীর প্রশ্নের উত্তরে স্মিত হেসে প্রিয়া বলল,

"পাত্রপক্ষ ঝামেলার আগে তাদের সাথেই ঝামেলা হয়ে গেছে। কারণ.."

এতটুকু বলে থামলো প্রিয়া। দীর্ঘশ্বাস নিয়ে ভাবলো পুরোনো কথাগুলো। ওর থেমে যাওয়ার প্রিয়ন্তীর আগ্রহ আরও বেড়ে গেছে। সে শুধালো,

"কারণ কি?"

"কারণ আমার যার সাথে বিয়ে ঠিক হয়েছিলো, সে বিবাহিত ও এক বাচ্চার বাবা ছিলো।"

এই কথায় হঠাৎ ছাদের পরিবেশ স্তব্ধতায় ছেঁয়ে গেলো। প্রিয়া ধীরগতিতে চোখ তুলে তাকালো প্রিয়ন্তীর দিকে। এতক্ষণের আগ্রহে পরিপূর্ণ চেহারার এখন ভাষা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। নিশ্চলভাবে বসে আছে। পরিস্থিতে দেখে প্রিয়াই বলল,

"সামির বিবাহিত ছিলো এটা আমি জানতাম না। কিন্তু উনি জানতো। এজন্যই বিয়ের আগ-মুহুর্তে আমাকে তুলে নিয়ে গেছে। আমার পুরো জীবনটা নষ্ট হওয়ার থেকে বাঁচিয়ে নিয়েছে। যা হয়েছে সেটা নিয়ে আমি মোটেও মন খারাপ করি না৷ কারণ আমি আমার বর্তমান নিয়ে সুখী। সত্যি বলছি, এমন একজন জীবনসঙ্গী পেয়ে আমি আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞ।"

প্রিয়ার কথায় সবাই হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো। কেউই চায় না আগের কথা মনে করে ও মন খারাপ করুক। এজন্য কেউ কথাও বাড়ালো না। কিন্তু প্রিয়ন্তীর কৌতুহল এখনো মেটেনি। সে মাথা নাড়িয়ে প্রশ্ন করলো,

"তোমার যার সাথে বিয়ে ঠিক হয়েছিলো তার ব্যাপারে তোমার মা-বাবা খোঁজ নেয় নি? ছেলের সম্পর্কে খোঁজ না নিয়েই বিয়ে দিতে গিয়েছিলো?"

সায়মা চাইলো এই মুহুর্তে একটা মিথ্যা কথা বলতে। অবলীলায় বলে দিতে চাইলো, তারা জানতো না। কিন্তু প্রিয়া সত্যি লুকালো না। বলে ফেলল,

"আমার মা জেনেবুঝেই কাজটা করছিলো। হয়তো দ্রুত বিদায় করতে চাইছিলো আমাকে!"

প্রিয়ন্তী অবাক হয়ে বলল,

"জেনে-বুঝে আন্টি তোমাকে বিবাহিত ছেলের সাথে বিয়ে দিতে চেয়েছিলো? এটায় তো তুমি কোনোদিন সুখ পেতে না। কোনো মা কেনও চাইবে তার মেয়ে কারো দ্বিতীয় স্ত্রী হোক?"

প্রিয়া কাষ্ঠ হেসে বলল,

"আমার মা-বাবা হলে হয়তো এই খেলাটা খেলতে পারতো না।"

এবার প্রিয়ন্তীর কৌতুহল আকাশ ছুঁয়েছে। প্রিয়ার একেকটি কথা গেঁথে যাচ্ছে মস্তিষ্কে। কোনো আকাঙ্খিত উত্তরের আশায় ধড়ফড় করছে বুক। বলল,

"উনি তোমার মা না?"

প্রিয়া উত্তর দিলো,

"উনি আমারই মা। তবে আমার পালক মা। আমার জন্মদাতা মা-বাবাকে আমি আজও চিনি নি।"

স্নিগ্ধ প্রেমের মায়া গল্পটি তিয়াশা চৌধুরী-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক ও রোমান্টিক থ্রিলার গল্প