স্নিগ্ধ প্রেমের মায়া

পর্ব - ২৫

🟢

শীতল ঠান্ডা পরিবেশ ছাদজুড়ে। মাঝে মাঝে শীতল বাতাস কাঁপন ধরাচ্ছে শরীরে। জমজমাট আড্ডাও এখন প্রিয়ার কথা শুনে শীতল হয়ে গেছে। এরমধ্যেই চাঁপা উত্তেজনায় ফেঁটে পড়ছে প্রিয়ন্তী। কোনোমতো নিজেকে সামলে রেখেছে সবার সামনে। উত্তেজনায় কথাও ঠিকঠাক বলতে পারছে না। আটকে আটকে বলল,

"তোমার মা-বাবা সম্পর্কে কিছুই জানো না?"

প্রিয়া অবিলম্বে জবাব দিলো,

"না।"

সন্ধ্যা এতক্ষণ উত্তেজিত হয়ে পড়লেও এখন হতাশ হয়ে চুপসে গেছে। ও ভেবেই নিয়েছিলো প্ল্যান সাকসেস! এই প্রিয়াই ওদের হারানো প্রিয়া! কিন্তু প্রিয়া শোনালো হতাশার বানী। সে তার মা-বাবা সম্পর্কে কিছুই জানে না! সন্ধ্যা হতাশ হলেও প্রিয়ন্তী হাল ছাড়লো না। জিজ্ঞেস করলো,

"কিছুই জানো না, এটা কি করে হয়? তোমার মা তোমাকে কোথায় পেয়েছে বা কিভাবে পেয়েছে এসব থেকেও কি জানার চেষ্টা করো নি?"

প্রিয়া কিছুক্ষণ ভেবে পুরোনো কথা মনে করার চেষ্টা করলো। অত:পর বলল,

"আমার মা আমাকে নদীর ধারে পেয়েছিলো। এটাই শুধু জানি। এছাড়া আর কিছু জানা নেই। আর আমার মা-বাবা আদ্যো বেঁচে আছে কি না, তাও জানি না। কারণ তারা বেঁচে থাকলে এতদিনে অবশ্যই আমার খোঁজ করতো।"

প্রিয়ন্তী এক পলক তাকালো সন্ধ্যার দিকে। দু'জনের চেহারাতেই কৌতুহল ও উত্তেজনা ভরপুর। প্রিয়ন্তীর খুশিতে এখনই পিয়াসকে ফোন করে সব জানাতে ইচ্ছে করছে। উচ্ছ্বসিত হয়ে ভুলে বসলো ঠান্ডা মাথায় কাজ করার প্ল্যানিং। বলে বসলো,

"তোমার মা তোমাকে যেদিন পেয়েছিলো, সেদিন কি আশেপাশে কোনো এক্সিডেন্ট হয়েছিলো?"

এহেন প্রশ্নে অবাক হয়ে গেলো সবাই। সন্ধ্যা অদৃশ্য হাতে কপাল চাপড়ালো প্রিয়ন্তীর বোকামীতে। প্রিয়ন্তী উত্তেজনায় ভুল করে বসলেও পরমুহুর্তে যখন বুঝতে পারলো তার ভুল হয়েছে তখন থতমত খেয়ে কথা হারিয়ে ফেলল। প্রিয়া বলল,

"সেটা তো আমি জানি না। তবে এই প্রশ্ন করার মানেটা আমি বুঝলাম না প্রিয়ন্তী! আমার মা-বাবাকে খুঁজে পাওয়ার সাথে এক্সিডেন্টের কি সম্পর্ক?"

সন্ধ্যা কথা কাটাতে বলল,

"প্রিয়ুর কথা ছাড় তো! ও সবসময়ই এমন লজিক ছাড়া উল্টোপাল্টা কথা বলে।"

সন্ধ্যার কথা মেনে নিয়ে চুপ হয়ে গেলো সবাই। তবে ব্যতিক্রম প্রিয়ন্তী। তার মনে পড়লো কতদিন আগে মায়ের বলা গল্পটা। যেখানে তিনি বলেছিলেন তার দাদুর দেয়া চুড়ির কথা। সেটা এখনও প্রিয়ার কাছেই আছে হয়তো! এটাকেই একমাত্র অবলম্বন ভেবে প্রিয়ন্তী প্রশ্ন ছুড়লো,

"তোমার মা-বাবার কোনো স্মৃতি আছে?"

প্রিয়া একবার বলল, না। পরপর কিছু একটা ভেবে বলল,

"হ্যাঁ আছে। মা যখন আমাকে নদীর ধারে পেয়েছিলো আমার হাতে একটা চুড়ি ছিলো। সেটায় আমার নাম খোদাই করে লেখা ছিলো, 'প্রিয়া'। সেজন্যই মা আমার নাম বদলায় নি। ওই নামটাই রেখেছে৷ মা-বাবার স্মৃতি বলতে আমার কাছে শুধু ওইটাই আছে!"

প্রিয়ার কথা শেষ হওয়ার সাথে সাথে এক ঝড়ো শীতল হাওয়া বয়ে গেলো ওদের মাঝ থেকে। প্রশান্তিতে জুড়িয়ে গেলো প্রিয়ন্তীর অন্তর। সে পেরেছে! পেরেছে সে প্রিয়াকে খুঁজে বের করতে! প্রিয়াই ওর বড় বোন। যাকে বহু বছর আগে তার পরিবার হারিয়ে ফেলেছিলো, তাকে প্রিয়ন্তী খুঁজে বের করতে পেরেছে। সবচেয়ে বড় খুশি, সে তার বড় বোনকে পেয়ে গেছে। প্রিয়ন্তী চোখ বন্ধ করে জোরে শ্বাস নিলো আনন্দের তুফান সামলাতে। পরপর কোনো কথাবার্তা ছাড়াই জড়িয়ে ধরলো প্রিয়াকে।

মানুষ দু'টি কারণে কাঁদতে পারে। এক, হয়তো কোনো দুঃখ পেলে। দুই, বেশি খুশি হলে মানুষ আবেগে কেঁদে ফেলতে পারে। প্রিয়ন্তীর হয়েছে দ্বিতীয় অবস্থা। সন্ধ্যা নিজেকে সামলে রাখলেও সে পারে নি। প্রিয়াকে জড়িয়ে ধরতেই দু ফোঁটা অশ্রু চোখের কার্ণিশ বেয়ে গড়িয়ে পড়েছে। নি:শব্দ কান্নায় আড়াল করছে মনের আনন্দটুকু। সময়ও যেনও আজ থমকে দেখছে দুই বোনের মিলন।

প্রিয়া ভড়কে গেছে প্রিয়ন্তীর হঠাৎ এই কাজে। মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,

"কি হয়েছে, প্রিয়ু?"

প্রিয়ন্তী কান্নাভেজা কন্ঠে শুধু একবার ডাকলো,

"আপু!"

প্রিয়া হতবাক হয়ে বলল,

"আরে! কি হয়েছে, প্রিয়ু? কাঁদছিস কেনও?"

প্রিয়ন্তী নিজেকে সামলে সরে আসলো প্রিয়ার কাছ থেকে। চোখ মুছে বলল,

"কাঁদছি না তো! একদম ঠিক আছি।"

প্রিয়া ওর গালে হাত রেখে জিজ্ঞেস করলো,

"কাঁদছিস না তো, চোখে পানি কেনও?"

প্রিয়ন্তী স্মিত হেসে বলল,

"চোখে কিছু গিয়েছে হয়তো। এজন্যই!"

প্রিয়ন্তীর মুখের অকৃত্রিম হাসি দেখে প্রিয়া মেনে নিলো ওর কথা। সন্ধ্যার দিকে ফিরে দেখলো ওর চোখেও পানি। অবাক হয়ে বলল,

"আশ্চর্য! তুই কদছিস কেনও আবার?"

সন্ধ্যা বলল,

"আমার চোখেও কিছু গিয়েছে। দেখলি না, মাত্র কত জোরে বাতাস আসলো? এজন্যই এমন হয়েছে।"

সায়মা সন্দিহান হয়ে বলল,

"বাতাস তো সবার উপর দিয়েই গিয়েছে। চোখে কিছু না কিছু শুধু তোদের দু'জনেরই পড়লো?"

প্রিয়ন্তী বলল,

"তোমার চোখে কিছু পড়লে যদি মামলা ঠুকে দাও? এই ভয়ে পড়ে নি!"

শীতল পরিবেশ আবার জমজমাট হয়ে উঠলো সবার হাসির শব্দে। প্রিয়ন্তী বলল,

"আচ্ছা আপু, আমি কি ওই চুড়িটা দেখতে পারি?"

কথাটা বলা শেষ হতে দেরি হলো, সন্ধ্যার চিমটি দিতে দেরি হলো না৷ চিমটি খেয়ে প্রিয়ন্তী অস্ফুটস্বরে "আউচ" করে উঠলো। কটমট করে সন্ধ্যার দিকে তাকাতেই সন্ধ্যা ইশারায় বেশি কৌতুহল দেখাতে না করলো৷

প্রিয়া অতসব খেয়াল করে নি। প্রিয়ন্তীর প্রশ্নের উত্তরে বলল,

"তুলে রাখা আছে। অন্য কোনো সময় দেখাবো।"

আড্ডায় আড্ডায় সন্ধ্যা নেমে গেছে। সূর্যের আলো কেটে গিয়ে অন্ধকার জায়গা করছে সেখানে। আরোশী এসে ডাকলো সবাইকে,

"তোমাদের আড্ডা শেষ হলো? এবার নিচে চলো সবাই।"

*******

নিচে নামতেই ড্রইংরুমের থমথমে পরিবেশ দেখে কিছু একটা আন্দাজ করলো প্রিয়া, সারা, সায়মা। অন্যদিকে কিছু না বুঝে অবাক হয়ে মুখ দেখাদেখি করলো সন্ধ্যা ও প্রিয়ন্তী। সন্ধ্যা ইশারায় প্রিয়ন্তীকে জিজ্ঞেস করলো, কি হয়েছে? প্রিয়ন্তী ঘাড় উঁচিয়ে বোঝালো সে জানে না।

গোমড়ামুখে সোফায় বসে আছে পারভিন। তার সামনের সোফায় মুখোমুখি বসে আয়ান ও আয়মান। নাসরিন আরোশীর ছেলে অর্ণবকে কোলে নিয়ে বসে আছে৷ ছেলেটাও চুপচাপ দেখছে সবার গম্ভীর মুখ।

প্রিয়ন্তী প্রিয়ার কানের কাছে মুখ নিয়ে জিজ্ঞেস করলো,

"কি হয়েছে আপু? সবাই এমন থম মেরে আছে কেনও?"

প্রিয়া তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আশপাশ পরখ করে বলল,

"দুই ভাই বো*মটা মনে হয় ব্লা*স্ট করেই ফেলেছে।"

প্রিয়ন্তী ভ্রু কুঁচকে শুধালো,

"বো*ম? আমি তো আশেপাশে কোথাও বো*ম ব্লা*স্টের আলামত পাচ্ছি না। দেখো, কোথাও কোনো জ্বা*লা-পো*ড়াও নেই।"

প্রিয়া ওর কথা শুনে মাথায় চাটি মেরে বলল,

"আমি এটম বোমের কথা বলি নি, বোকা । চুপচাপ দেখ, নিজেই বুঝে যাবি।"

সম্পূর্ণ ঘটনা পরিষ্কার হলো যখন আয়মান মুখ খুলল,

"মা, মুখ গোমড়া করেও কোনো লাভ হবে না। আমি নাতাশার সাথে এনগেজমেন্টটা দ্রুতই করে ফেলতে চাইছি। মেনে নাও, প্লিজ!"

অবাকের চূড়ান্ত সীমায় গিয়ে কদম টলে উঠলো প্রিয়ন্তীর। ওর একপাশে সন্ধ্যা দাঁড়িয়ে থাকায় সন্ধ্যার হাতটাই জোড়ে চেঁপে ধরলো। সন্ধ্যা চিৎকার দিতে গিয়েও থেমে গেলে প্রিয়ন্তীর রক্তশূণ্য, ফ্যাকাসে মুখশ্রী দেখে। কিছু একটা ধারনা করতে পেরে প্রিয়ন্তীর হাতটা ধরলো। কিছু বুঝে নি এমন ভাব করে বলল,

"এভাবে খামচি দিচ্ছিস কেনও? হাতে ব্যাথা পাচ্ছি তো! সোজা হয়ে দাঁড়া।"

প্রিয়ন্তী ঢোক গিলে ত্রস্থ স্বাভাবিক করলো নিজেকে। সম্পূর্ণ ঘটনা জানতে মনোনিবেশ করলো সামনের দিকে। আয়ান বলতে লাগলো,

"মা, আয়মান যখন চাইছে তাহলে ওদের এনগেজমেন্টটা করিয়ে দাও না। সবচেয়ে বেশি ভালো হবে আমরা দুই-তিনদিনের মধ্যেই আয়োজনটা করে ফেলি।"

আয়মান সায় দিয়ে বলল,

"হ্যাঁ। ভালো কাজে দেরি করতে নেই। যত দ্রুত সম্ভব তত দ্রুতই করে ফেলা উচিত।"

প্রিয়ন্তী নিজেকে দমিয়ে রাখতে চাইলেও পারলো না। বিক্ষিপ্ত মস্তিষ্কের জোরে বাধ্য হয়ে কন্ঠনালী ফুড়ে বের হলো শব্দগুচ্ছ,

"আন্টি, আপনার ছেলে যখন চাইছে তাহলে এনগেজমেন্টটা করিয়ে দিন। এমনিতে, উনার তাড়াহুড়ো একটু বেশিই মনে হচ্ছে! সমস্যা না থাকলে বিয়েটাও করিয়ে দিন।"

বেশ স্বাভাবিক কন্ঠে কথাগুলো বলায় পারভীন ওর কথাগুলো দুষ্টুমী হিসেবেই নিলো। তাই উত্তরে দু'পাশে মাথা নাড়িয়ে বলল,

"আয়ানের বিয়ের অনুষ্ঠান এখনও হয় নি। সেখানে ওর বিয়ে কি করে দিবো? ও যখন চাইছে তাহলে রবিবার ওদের এনগেজমেন্ট করিয়ে দিবো। বিয়ে-শাদি এখন হবে না।"

পারভীন অনুমতি দিয়ে দেয়ার সবাই হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো। প্রিয়া খুশি হলো এই সিদ্ধান্তে। কারণ, নাতাশা সঠিক হলে ওর প্রাপ্য সম্মান ও পেয়ে যাবে। আর আয়মান সঠিক হলে নাতাশার সত্য বাইরে আসবে। এজন্যই আয়ান এত দ্রুত এনগেজমেন্ট করানোর কথা বলেছিলো। ও চায় না ওর স্ত্রীর মনে ওর ভাইকে নিয়ে কোনোপ্রকার ভুল ধারনা হোক। একটা পরিবার টিকিয়ে রাখতে সবার প্রথম বিশ্বাস থাকা প্রয়োজন। একে অপরের প্রতি বিশ্বাসের মাধ্যমেই পরিবার জুড়ে থাকে। সেখানে বাইরে থেকে আসা কোনো ব্যক্তির ষড়যন্ত্র পারবে না সেই পরিবারে ভাঙন ধরাতে।

পারভীন রাতের খাবার খেয়ে যাওয়ার জন্য বললেও নাকচ করে দিলো প্রিয়ন্তী। বলল,

"রাত হয়ে যাচ্ছে আন্টি। আমার খালা-খালু অনেক চিন্তা করবে। বাড়ি যেতে হবে আমাদের।"

কিছুক্ষণ পর সবার থেকে বিদায় নিয়ে সন্ধ্যা ও প্রিয়ন্তী চলে গেলো বাসায়।

*******

বাসায় পৌঁছেই সবার আগে পিয়াসকে ফোন করলো প্রিয়ন্তী। আয়মান নিজের প্রেমিকাকে বিয়ে করতে চাইছে, এইসব ভাবনা ছুড়ে ফেলে ভাবতে বসলো প্রিয়ার কথা। এত বছর পর বোনকে ফিরে পেয়েছে, এরচেয়ে খুশির খবর আর কিছু হতে পারে?

পিয়াস ফোন রিসিভ করে বলল,

"হ্যাঁ প্রিয়ু, বল!"

প্রিয়ন্তী উচ্ছ্বল কন্ঠে বলল,

"ভাইয়া, মিশন সাকসেসফুল। প্রিয়া আপুকে পেয়ে গেছি! আয়ান ভাইয়ার বউ-ই আমাদের হারানো বোন প্রিয়া।"

পিয়াস যেনও খুশিতে লাফিয়ে উঠলো। বলল,

"আর ইউ সিউর প্রিয়ু?"

"হ্যাঁ ভাইয়া। আই এম সিউর। আজকে প্রিয়া আপুর বাসায় দাওয়াত ছিলো। সেখানে গিয়ে আপুর থেকে সব জেনে আসলাম। জানো, আমি না নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারছিলাম না। কিন্তু কি করবো বলো? তুমি যে সাথে ছিলে না! তাই কিছু বলি নি। তুমি আসো, তারপর একসাথে না হয় আপুর পরিবার আপুর সামনে হাজির হবে!"

পিয়াস চোখের কোণে আসা এক ফোঁটা জল মুছে বলল,

"অবশ্যই! আসবো না মানে? আমি আমার আরেকটা বোনকে খুঁজে পেয়েছি, তাকে দেখতে আসবো না?"

প্রিয়ন্তী বলল,

"অবশ্যই আসবে। মা-বাবাকেও বলতে হবে আমরা পেরেছি প্রিয়া আপুকে খুঁজতে! তাদের নিয়েও চলে এসো এখানে। একদম সারপ্রাইজড হয়ে যাবে এতদিন পর আপুকে দেখলে!"

মা-বাবাকে জানানোর কথা শুনে এতক্ষণের খুশিতে ভাঁটা পড়লো পিয়াসের। আঁড়চোখে দরজায় তাকাতেই দেখলো স্বজনী ঢুকছে রুমে৷ স্বজনী ওর দিকে তাকাতেই ইশারা করলো রুমের দরজা লক করে ফেলতে। পরপর শুকনো ঢোক গিলে বলল,

"হ্যাঁ, মা-বাবাকে তো বলবোই। সেটা না হয় আমরা সারপ্রাইজ দিবো। তুই একদমই কিছু বলবি না। ভুলেও বলবি না আমাদের প্রিয়াই আয়ান ভাইয়ার বউ!"

প্রিয়ন্তী মাথা নাড়িয়ে বলল,

"একদম বলবো না!"

স্বজনী পিয়াসের কথা শুনে ঝট করে দৃষ্টি ঘুরিয়ে তাকিয়েছে তার দিকে। প্রিয়াকে খুঁজে পাওয়া গেছে শুনে তার মনেও খুশির জোয়ার বাঁধ ভেঙেছে। কিন্তু পিয়াসের মুখটা কেমন ফ্যাকাসে লাগছে। নিজের ভেতরকার ভীষণ অস্বস্তি সাইডে রেখে পিয়াস জিজ্ঞেস করলো,

"আচ্ছা প্রিয়ু, একটা কথা বল তো! আয়ান ভাইয়া আর প্রিয়ার সম্পর্ক কেমন?"

প্রিয়ন্তী ওর অস্বস্তি টের পায় নি। তার কন্ঠস্বর একইরকম উৎফুল্ল। বলল,

"অনেক ভালো! আমি যতটুকু শুনেছি, ভাইয়া আপুকে ভীষণ ভালোবাসে।"

সস্থির নিশ্বাস নিয়ে পিয়াস বসে পড়লো খাটে। স্বজনী বুঝেছে ওর বিধ্বস্ত অবস্থা। পাশে এসে ওর কাঁধে হাত রাখলো। পিয়াস বলল,

"আচ্ছা প্রিয়ু, তাহলে আমরা জলদিই এসে দেখা করবো প্রিয়ার সাথে। আজ রাখি?"

"হ্যাঁ রাখো। জলদিই আসো চট্টগ্রাম। আমিও চলে যাবো ঢাকা। আমার কাজ শেষ। এখানে আর আমার কোনো প্রয়োজন নেই।"

প্রিয়ন্তী কথাগুলো বলে পিয়াসের উত্তরের অপেক্ষা না করেই খট করে ফোন কেটে দিলো৷

নিজের অবস্থার ভিত্তিতে পিয়াসও আর সেটা নিয়ে মাথা ঘামালো না। স্বজনীকে বলল,

"প্রিয়াকে খুঁজে পেয়েছি। এটা খুব খুশির সংবাদ। মা-বাবা জানলে খুব খুশি হবে। কিন্তু আদ্যো কি এই খবরটা তাদের জানানো উচিত হবে? শেষে প্রিয়ার ভাগ্যে আয়ান ভাইয়ার সাথেই বিয়ে হওয়া লেখা ছিলো?"

স্বজনী চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল,

"প্রিয়াকে দেখার জন্য বহু বছর ধরে তারা তড়পাচ্ছে। তাদেরকে না জানিয়েও তো উপায় নেই! কিন্তু আয়ান ভাইয়ার সাথে বিয়ে হয়েছে জানলেই তো তুলকালাম হয়ে যাবে!"

পিয়াস হতাশ শ্বাস ফেলে বলল,

"কেনও ওরা এভাবে অতীত আঁকড়ে পড়ে আছে? যদি অতীত ভুলে শুধু ওদের সুখের কথা চিন্তা করতো, তাহলে আমি নির্দ্বিধায় এখনই সবাইকে নিয়ে চট্টগ্রাম রওনা দিতাম। কিন্তু সেটা এত সহজে হওয়ার নয়! কি করবো আমি, স্বজনী? কিছু বুঝতে পারছি না। এত বছর পর বোনকে পেয়েও তার কাছে যেতে পারছি না। প্রিয়ন্তী মা-বাবাকে জানাতে বলেছে, আমি সেটাও পারছি না। কি জবাব দিবো আমি প্রিয়ন্তীকে? এতদিন প্রিয়াকে খুঁজে পাওয়ার জন্য পাগল ছিলাম। আর আজ খুঁজে পাওয়ার পর মনে হচ্ছে, কেনও খুঁজে পেলাম? অজ্ঞাত হয়েই ও সুখে থাকতো। বড় ভাই হিসেবে ওর সুখটাই তো আমার চাওয়া। এই দুই পরিবারের শত্রুতা যদি আমার বোনের সুখটা নষ্ট করে দেয়? তাহলে কি করবো? এই ভয়ংকর টানাপোড়েন তো নিঃশেষ করে দিবে আমাকে!"

স্বজনী ওকে স্বান্ত্বনা দিয়ে বলল,

"কেনও ভাবছো এতকিছু? বোনকে পেয়েছো, সেই খুশিটা মন খুলে উপভোগ করো। কেনই বা ভাবছো শত্রুতা ওদের সম্পর্ক নষ্ট করবে? এমনও তো ভাবতে পারো ওদের ভালোবাসার সম্পর্ক শত্রুতা নষ্ট করে দিবে।"

শেষের কথায় পিয়াস অবাক হয়ে তাকালো স্বজনীর দিকে। জিজ্ঞাসু দৃষ্টি বলছে, এটাও সম্ভব?

স্বজনী ওর চোখের ভাষা বুঝতে পেরে আশ্বস্ত করে বলল,

"সবই সম্ভব। ভালোবাসা মন থেকে হলে সবকিছু পেরিয়ে সংসার সাজানো সম্ভব। এই শত্রুতা শেষ করতে কতক্ষণ? হতেও পারে ওদের ভালোবাসা এই শত্রুতার বেড়াজাল দুই পরিবারের মাঝ থেকে সরিয়ে ফেলবে। পরিবার থাকুক বিরুদ্ধে। আমরা তো আছিই ওদের পক্ষে! তাই না?"

পিয়াস স্বজনীকে জড়িয়ে ধরে বলল,

"আমি সত্যিই ভাগ্যবান তোমাকে পেয়ে। এভাবেই সব পরিস্থিতিতে শুধু আমার সঙ্গে থেকো।"

*******

রাত দশটা। অন্ধকার ও কুয়াশাঘেরা সম্পূর্ণ পরিবেশ। প্রিয়ন্তী ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে সন্ধ্যাকে বলল,

"আমার জিনিসপত্রগুলো কাল গুছিয়ে রেখো। ভাইয়া আসলে আমি ঢাকা চলে যাবো।"

সন্ধ্যা অবাক হয়ে বলল,

"চলে যাবি মানে?"

প্রিয়ন্তী থমথমে মুখে বলল,

"চলে যাবো মানে চলে যাবো। আমি চট্টগ্রাম এসেছিলাম প্রিয়া আপুকে খুঁজতে। আমার কাজ শেষ তাই আমি চলে যাবো।"

সন্ধ্যা ধমক দিয়ে বলল,

"এভাবে চলে যাবো বললেই চলে যাওয়া যায় নাকি? এখন কোথাও যাওয়া হবে না।"

প্রিয়ন্তী কন্ঠস্বর উচু করে বলল,

"যাবে না কেনও? আমি তো যাবোই। আমি এখানে আপুকে খুঁজতে এসেছিলাম। সেটা শেষ তাই চলে যাবো। কারো বিয়ে খেতে আসি নি, যে দাওয়াতের অপেক্ষায় বসে থাকবো।"

এতক্ষণে সন্ধ্যার মাথায় ঢুকলো প্রিয়ন্তীর রেগে থাকার কারণ। বোঝার ভান করে বলল,

"ওহহো! কারো বিয়ে হচ্ছে বলে আপনার প্রবলেম হচ্ছে? কিছু জ্বলছে নাকি?"

প্রিয়ন্তী থতমত খেয়ে বলল,

"আরে না না! কারো বিয়েতে আমার প্রবলেম হতে যাবে কেনও? আমি যাওয়ার কথা বলছিলাম কারণ অনেকদিন সবাইকে ছেড়ে আছি তো!"

সন্ধ্যা আঙুল তুলে ইশারায় প্রিয়ন্তীকে কাছে ডেকে বলল,

"এদিকে বস।"

প্রিয়ন্তীও ওর কথামতো এসে বসলো। সন্ধ্যা সন্দিহান দৃষ্টিতে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,

"তুই কি কোনোভাবে আয়মান ভাইয়াকে পছন্দ করে ফেলেছিস?"

হঠাৎ এহেন প্রশ্নে প্রিয়ন্তী ভড়কে গেলো। আমতা-আমতা করে বলল,

"আরেহ না না! তুমি যা ভাবছো তেমন কিছু না!"

"তেমন কিছু না তো কেমন কিছু? যদি কিছু না-ই হয় তাহলে উনার বিয়ে নিয়ে তোর সমস্যা হচ্ছে কেনও?"

প্রিয়ন্তী মিনমিন করে বলল,

"আসলেই উনার সাথে আমার কিছু নেই৷ বিশ্বাস করো, অফিসে যেদিন গিয়েছি সেদিনই উনাকে আমি প্রথমবার দেখেছি। ভাইয়ার বেস্ট ফ্রেন্ড হওয়ার সুবাদে সারাক্ষণই উনার কথা শুনতাম। শুনতে শুনতেই কবে আমার মাথায় ঢুকে বসেছে টেরও পাই নি। কিন্তু সেটা শুধু জানার আগ্রহ ছিলো। উনাকে সামনে থেকে দেখার ও জানার আগ্রহ ছাড়া আর কিছুই না! ভালোবাসা তো একদমই না! এই গন্ডারকে ভালোবেসে নিজেকে ডুবানোর ইচ্ছা আমার নেই!"

বলে প্রিয়ন্তী উত্তরের অপেক্ষা না করে দৌড় দিলো। সন্ধ্যার মা ডাক দেয়ায় সন্ধ্যার হাত থেকে বাঁচার সুযোগ হাতছাড়া করলো না। ও চলে যেতেই সন্ধ্যা মুচকি হেসে আপনমনে বলল,

"জানার আগ্রহটাই যে বেশি সমস্যা করে ফেলেছে! শুরু থেকে আগ্রহ দমন করা উচিত ছিলো। এখন যখন হয়ে গেছে তো কি করার? আর প্রিয়া আপু তো অলরেডি বউ হয়েও গিয়েছে৷ এখন তো একটাই চাওয়া, ভালোবাসার মিষ্টি সম্পর্কের আড়ালে সব শত্রুতার তিক্ততা হারিয়ে যাক!"

স্নিগ্ধ প্রেমের মায়া গল্পটি তিয়াশা চৌধুরী-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক ও রোমান্টিক থ্রিলার গল্প