প্রিয়ন্তী আজ সারাদিন একদম দূরে দূরে থেকেছে। সন্ধ্যাবেলা যাও আয়মানের কেবিনে ঢুকলো, ঢুকেই বলে বসলো,
"আপনার আনারকলি এসেছে আমার আপনার সাথে দেখা করতে।"
ওর এই উদ্ভট কথা শুনে আয়মান অবাক চোখে চেয়ে আছে ওর দিকে। এতেও যেনও প্রিয়ন্তী বিরক্ত হচ্ছে। বলল,
"এভাবে কি দেখছেন? আপনার আনারকলিকে ভিতরে পাঠাবো?"
আয়মান সন্দিহান হয়ে বলল,
"আনারকলি কে? আনারকলি নামে আমি কাউকে চিনি না।"
প্রিয়ন্তী কপাল চাপড়ে বলল,
"আনারকলি নামে কেউ আসে নি। আপনার আনারকলি এসেছে। নামটা কি ওর? ওহহো, নামটাই তো জিজ্ঞেস করি নি!"
আয়মান ধমকের সুরে বলল,
"নাম জিজ্ঞেস করো নি, আর এসে আমার কানের সামনে আনারকলি, আনারকলি নাম জঁপছো?"
প্রিয়ন্তী ঠোঁট উলটে বলল,
"ভুলে গেছিলাম। ওই যে সকালে আপনাকে জড়িয়ে ধরলো যে মেয়েটা, আপনার প্রেমিকা। সেই এসেছে। পাঠিয়ে দিচ্ছি ভিতরে।"
"আরেহ! ও আমার প্রে... যাহ, চলে গেলো!"
কিছুক্ষণ পর রুমে ঢুকলো নাতাশা। আয়মান ওকে দেখে বলল,
"বলেছিলাম, এয়ারপোর্ট থেকে তোমার আমার রাস্তা আলাদা। আর তুমি কি করছো? আমার বাড়ি, অফিস সব জায়গায় পৌঁছে যাচ্ছো?"
নাতাশা কান্নার সুরে বলল,
"আয়মান, তুমি কি আমাকে মিস করছো না?"
আয়মান মুখের উপর উত্তর দিলো,
"না। আশা করি এবার তোমার উত্তর পেয়ে গেছো। এবার বের হও এখান থেকে।"
নাতাশা জোর গলায় বলল,
"বারবার কেনও আমাকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছো? তুমি বুঝতে পারছো না, আমি তোমাকে ভালোবাসি!"
"কিন্তু আমি তোমাকে ভালোবাসি না। জাস্ট লিভ মি।"
"আয়মান আমি.."
আয়মান মাঝপথে ওকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
"এখান থেকে যাবে নাকি ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করার ব্যবস্থা করতে হবে?"
নাতাশা হাল ছেড়ে দিলো। বুঝলো এখানে থাকলে তাকে অপমানিত হতে হবে। তাই বেরিয়ে গেলো।
নাতাশাকে এইভাবে বেরিয়ে যেতে দেখে প্রিয়ন্তী মনে মনে বলল,
"এইভাবে চলে যাচ্ছে কেনও? ওই খাটাশের সাথে ঝগড়া করলো নাকি? করলেও আমার কি? এমন গন্ডারের সাথে প্রেম করলে ঝগড়া তো হবেই!"
*******
ঝামেলা ছাড়া একটা দিন যাবে, এটা যেনও প্রিয়ন্তীর জন্য অসম্ভব বিষয়। ফাইল কম্পলিট করে আয়মানের কেবিনে নিয়ে টেবিলে রাখলো। পাশেই গ্লাস থাকায় নড়েচড়ে পানিটুকু গড়িয়ে পড়লো টেবিলে। পুনরায় একটা অকাজে আয়মানের এতক্ষণের নাতাশার উপর থাকা রাগ তড়তড় করে বেড়ে গেলো। প্রিয়ন্তী যখনই টের পেলো এখন তাকে কথা শুনাবে সে দিকবিদিক খুঁইয়ে ফাইলগুলো তুলে নিচে ফেলে দিলো। পরপর ভুল বুঝতে পেরে আমতা-আমতা করে বলল,
"ভুল করে মিস্টেক হয়ে গেছে! আই এম ভুল, ইয়ে মানে আই এম সরি!"
আয়মান রেগেমেগে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। টেবিলে থাকা কাগজগুলো সরাতে সরাতে হুঙ্কার ছেড়ে বলল,
"কাজ বাড়িয়ে এখানে দাঁড়িয়ে দেখছো কি? যাও পিয়নকে ডাক দিয়ে বলো এখনই এগুলো পরিষ্কার করতে।"
প্রিয়ন্তীও ভয়ে ভয়ে হুকুম পালন করলো৷
সব গুছিয়ে আবার বসতেই প্রিয়ন্তীর মুখ ফঁসকে বেরিয়ে এলো,
"আপনার আনারকলি এমন কাঁদতে কাঁদতে গেলো কেনও?"
আয়মানের মেজাজ এমনিতেই আগ্নেয়গিরির মতো উত্তপ্ত। তার উপর প্রিয়ন্তীর কথা কাজ সবসময় আগুনে ঘি ঢালার মতো কাজ করে। এবারও তাই হলো। কোনোভাবে নিজের রাগ দমিয়ে বলল,
"কি আনারকলি, আনারকলি লাগিয়ে রেখেছো? ওর একটা নাম আছে, নাতাশা!"
প্রিয়ন্তী চোখ নামিয়ে মিনমিন করে বলল,
"প্রেমিকাকে অন্য নামে ডাকলেও দেখছি এর বিস্তর সমস্যা।"
"হোয়াট? কে প্রেমিকা? কার প্রেমিকা?"
প্রিয়ন্তী উত্তর না দিয়ে ঘড়ির দিকে তাকালো। পরপর উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল,
"আটটা বেজে গেছে। ছুটি। বাড়ি যাই স্যার?"
আয়মান কিছু বলবে কি? প্রিয়ন্তী তাকে সেই সুযোগই দেয় নি। একদৌড়ে ছুটে বেরিয়ে গেছে কেবিন থেকে।
আয়মান সেদিকে তাকিয়ে হতাশ হয়ে ভাবলো, ভাবির কথা রাখতে গিয়ে এ কোন বিপদে পড়ে গেলো ও?
*******
আয়মান রাতে বাসায় ফিরে দেখলো সব স্বাভাবিক। মনে হলো কোনো এক জাদুকাঠির ছোঁয়ায় সবাই সকালের ঘটনা বেমালুম ভুলে গেছে। কারো আচরণ দেখে বোঝার উপায় নেই সকালে এত বড় ঘটনা ঘটে গেছে। পারভিনও আয়মান আসার পর একদম স্বাভাবিক আচরণ করেছে। হাসিমুখে কথা বলেছে, প্লেটে খাবার তুলে দিয়েছে৷ আয়মান বুঝতে পারলো এই সবই তার ভাইয়ের কারসাজি। আয়ানের কথাতেই সবাই বিশ্বাস করেছে বলে এখন সব স্বাভাবিক আছে। এমন অবস্থায় পুরোনো কথা তুলে আয়মান আর নিজের মুড খারাপ করতে চাইলো না!
******
বাসায় এসেও শান্তি নেই। ফ্রেশ হয়ে খাওয়া-দাওয়া শেষে প্রিয়ন্তী বসেছে সন্ধ্যার সাথে সারাদিনের আলাপ শেষ করতে। প্রতিটি ঘটনার ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বর্ণনাও বাদ দেয় নি বলতে। মায়ের ডাকে সন্ধ্যা নিচে যেতেই প্রিয়ন্তী আবার ভাবনায় ডুব দিলো।
"আবার ওই বাড়ি কবে যাবো? যেদিন যাবো সেদিন প্রিয়া আপুকে বলবো, ওর দেবরের আনারকলি বাসায় সুযোগ পায় নি বলে অফিস অব্দি এসেছে বন্ধ কেবিনে রোমান্স করতে। আবার আরেকজনের রাগ দেখো! আনারকলি বললেও সমস্যা! আচ্ছা, উনার গার্লফ্রেন্ড থাকাতে আমার এত খারাপ লাগছিলো কেনও? লন্ডনে থেকে এসেছে, মেয়েও তেমনই। উনি যেরকম চায় সেরকমই। আমার তো খারাপ লাগার কোনো কারণ নেই! তাহলে এমন হলো কেনও?"
স্বজনীর ফোনে ভাবনা থেকে বের হলো প্রিয়ন্তী। রিসিভ করে বলল,
"হ্যাঁ ভাবি বলো।"
"আমার ননদিনীর দিনকাল কেমন চলছে?"
"এইতো ভালোই।"
"কোনো সমস্যা হচ্ছে না তো?"
প্রিয়ন্তী বিস্ময়ের ভাব করে বলল,
"সমস্যা মানে? বিরাট সমস্যা। তোমার দেবরের গার্লফ্রেন্ড যেখানে সেখানে রোমান্স করতে এসে পড়ছে এটা সমস্যা না?"
পিয়াস স্বজনীর পাশেই বসা ছিলো। ফোন লাউড স্পিকারে থাকার দরুণ গার্লফ্রেন্ডের কথাটা সে শুনেছে৷ আস্তে করে বলল,
"আয়মানের গার্লফ্রেন্ড?"
স্বজনী ওর দিকে তাকিয়ে বলল,
"নাতাশা!"
পিয়াস ঝট করে চোখ তুলে তাকালো স্বজনীর দিকে। চোখে চোখে হয়ে গেলো আলাপন। এদিকে প্রিয়ন্তী চুপচাপ দেখে গলার স্বর উঁচু করে বলল,
"কি হলো ভাবি? উত্তর দিচ্ছো না যে? দেখেছো কত বড় সমস্যা যে তুমিই চুপ হয়ে গিয়েছো। এখন বলো আমি নিজের কাজ করবো নাকি এমন লাইভ রোমান্টিক মুভি দেখবো?"
স্বজনী বলল,
"তুমি তোমার কাজ করবে। কে কি করলো দেখার প্রয়োজন নেই।"
প্রিয়ন্তী বিস্তর অভিমানের সাথে বলল,
"তোমার দেবরের যে গার্লফ্রেন্ড আছে, এটা তো আমায় বলো নি।"
ফোনের অপরপাশে পিয়াস বসে বসে বিড়বিড় করলো,
"গার্লফ্রেন্ড থাকলে না বলব! মেয়ে মানুষ বেশি বুঝে, প্রমাণিত।"
কথাটার স্বজনীর কানে প্রবেশ করতেই কনুই দিয়ে খোঁচা মারলো। চোখের ইশারায় বোঝালো, ফোনটা কাটুক। তোমার হচ্ছে! মুখে প্রিয়ন্তীকে উদ্দেশ্যে করে বলল,
"গার্লফ্রেন্ড থাকলে কি করবো বলো? এটা বলার মতো মনে হয় নি, তাই বলি নি। ওর গার্লফ্রেন্ড নিয়ে তোমার সমস্যা হচ্ছে কেনও?"
প্রিয়ন্তী দ্রুত কথা কাটিয়ে বলল,
"আমার সমস্যা হতে যাবে কেনও? আমি তো খুশিই। যাক, দ্রুতই তাহলে একটা বিয়ের দাওয়াত পাবো।"
স্বজনী নরমসুরে বলল,
"তুমি খুশি থাকলেই আমরাও খুশি।"
প্রিয়ন্তী কান থেকে ফোন নামিয়ে বলল,
"অজানা জিনিসে কৌতুহল বেশি। আর নি*ষিদ্ধ জিনিসে আকর্ষণ বেশি। আর কোনোকিছুই বেশি বেশি ভালো নয়।"
******
ফোন কাটার পর স্বজনী বলল,
"একটু আগে কি যেনও বলছিলে?"
পিয়াস বালিশ নিয়ে নিজের জায়গায় গিয়ে বলল,
"বলছিলাম আয়মানের গার্লফ্রেন্ড থাকলে না আমরা জানতাম।"
"তারপর কি বললে?"
পিয়াস মাথা চুলকে মনে করার ভান ধরে বলল,
"এরপর তো কিছু বলি নি।"
স্বজনী নিজের মাথার কাছের বালিশটা তুলে ছুড়ে মারলো ওর দিকে। বলল,
"মেয়ে মানুষ বেশি বুঝে তাই না?"
বালিশটা পিয়াসের গায়ে লাগার আগেই ও ধরে ফেলেছে। সে বালিশটা বিছানায় রেখে বলল,
"এই একটা নাতাশার মধ্যে কি পেয়েছো তোমরা? এত ঝামেলা করছো কেনও?"
স্বজনী হাঁটু মুড়ে বসে পড়লো খাটের উপর। মুখ বেঁকিয়ে বলল,
"হ্যাঁ এখন তো আমাকে ঝামেলা মনে হবেই!"
পিয়াস হতাশ হয়ে বলল,
"আসলেই তোমার সাথে পারা সম্ভব না। তুমি ঝামেলা না, ওই নাতাশা ঝামেলা। সব জায়গায় শুধু ঝামেলা তৈরি করে বেড়াচ্ছে!"
স্বজনী ভ্রু কুঁচকে বলল,
"এখন ডায়লগ ছাড়া হচ্ছে, তাই না?"
পিয়াস খাটের উপর উঠে এসে ওকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরলো। গলায় মুখ ডুবিয়ে বলল,
"যেটা তোমার মনে হয়।"
স্বজনী স্পর্শের আবেশে চোখ বুজে ফেলেছে। ঢোক গিলে বলল,
"এখন আমার যা মনে হয় তাই!"
"ইয়েস! এখন আর ডিস্টার্ব করো না তো!"
বলেই পিয়াস স্বজনীকে নিজের দিকে ঘুরালো। নেশাক্ত দৃষ্টি অবাধ্য হয়ে চলে গেলো অধরে। মুহুর্তেই ওকে কাছে টেনে ওষ্ঠের ভাঁজে ওষ্ঠ ডুবালো...!
*****
দরজায় হাত দিয়েও বারবার ফিরিয়ে আনছে প্রিয়া। যতবার ধাক্কা দিয়ে খুলতে যাচ্ছে ততবার মনে হচ্ছে আয়ান যদি আবার উল্টোপাল্টা কিছু করে ফেলে? আয়ানের এই হঠাৎ হঠাৎ করা কার্যক্রমের ফলে কোনদিন সে নিশ্চিত হার্ট এট্যাক করবে।
আজ সকালের সেই হঠাৎ ধাক্কাটা এখনও সামলাতে পারে নি। মনে পড়লে এখনও লজ্জায় রাঙা হচ্ছে গাল। ভিতরে গিয়ে আয়ানের মুখোমুখি হওয়ার চাইতে এইখানে দাঁড়িয়ে রাত কাটিয়ে দেওয়াও এখন প্রিয়ার কাছে সহজ মনে হচ্ছে!
তখন আয়ান হুট করে দরজা খুলে আবির্ভাব হলো ওর সামনে। দু'হাত বুকে গুজে বলল,
"রুমে ঢুকবে না? নাকি কোলে করে নিয়ে যেতে হবে?"
প্রিয়া বড় বড় চোখ করে তাকালো আয়ানের দিকে। আয়ান ভ্রু উঁচিয়ে ইশারায় প্রশ্নটা আবার জিজ্ঞেস করতেই বলল,
"প্রয়োজন নেই। আমি যেতে পারবো। আপনি রাস্তা ছাড়ুন।"
আয়ান এক কথায় দরজার সামনে থেকে সরে গেলো। রুমে ঢুকে বসে পড়লো বিছানায়। আজ ওর সামনে প্রত্যেকদিনকার মতো ল্যাপটপ নেই। রুটিনের ব্যতিক্রম দেখে সস্থির নিশ্বাস ফেলল প্রিয়া। লাইট অফ করে বিছানায় এসে বসলো। শোয়ার আগেই আয়ান জিজ্ঞেস করলো,
"এখন আবার কিছু শখ করছে? কোনো শখ থাকলে বলতে পারো। আমি দায়িত্ব সহকারে পূরণ করে দিবো।"
আয়ানের কথায় প্রিয়া আরেকটু সাইড চেঁপে বসলো। আঙুল তুলে ঝাঁঝালো কন্ঠে বলল,
"দেখুন, আমার কোনো শখ নেই। বিনা কারণে নিজের শখ আমার নামের উপর চাঁপাবেন না।"
আয়ান অবাক হওয়ার ভান করে বলল,
"সকালে জড়িয়ে ধরার শখ তো তুমিই করলে। এখন আমার উপর দোষ চাঁপাচ্ছো কেনও?"
"ওইটা আমি শুধু কথার কথা বলেছি। শখের কথা বলি নি!"
"শখ হয়েছিলো তাই বলেছো। এখন কি শখ লাগছে তাই বলো, আমি পূরণ করি।"
প্রিয়া আরেকটু দূরে সরে বলল,
"আপনি কি, হ্যাঁ? প্রথমরাতে তো খুব লম্বা লম্বা লেকচার ছাড়লেন। আমি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি, এই সেই! এখন সেসব কোথায় গেলো?"
আয়ান কাধ উঁচিয়ে বলল,
"সেটা তো সত্যিই বলেছি। আমি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি বলেই তুমি ঠিকঠাক আছো। যদি তোমার কথামতো নিয়ন্ত্রণ ছাড়া হতাম, তাহলে সকালে সব এলোমেলো পেতে।"
প্রিয়া তৎক্ষণাৎ কানে বালিশ চাঁপা দিয়ে পাশ ফিরে শুয়ে পড়লো। দাঁতে দাঁত চেঁপে বলল,
"আপনি যতক্ষণ জাগে থাকবেন আপনার এই নির্লজ্জ মুখ চলতেই থাকবে। এরচেয়ে ভালো ঘুমান। আর আমাকেও ঘুমাতে দিন।"