স্নিগ্ধ প্রেমের মায়া

পর্ব - ১৬

🟢

কুয়াশার চাদরে ঢাকা রাতে অল্পস্বল্প চাঁদের আলো দেখা যাচ্ছে। রাত নেমেছে অনেকক্ষণ৷ সবাই যার যার রুমে ঘুমাতে চলে গেছে। প্রিয়া সায়মার সাথে বিস্তর আলোচনা করে রুমের পথে পা বাঁড়িয়েছে। হাঁটছে আর ভাবনার সাগরে ডুবে হাত কচলাচ্ছে। ভেবে রেখেছে, আজ রুমে গিয়ে একটাও উল্টাপাল্টা কথা বলবে না। একদম ঠান্ডা মাথায় আয়ানকে প্রিয়ন্তীর কথাটা বলবে। আয়ান বললে অবশ্যই আয়মান প্রিয়ন্তীকেই হায়ার করবে।

দরজা ঠেলে আগে উঁকি দিয়ে আশপাশ দেখে নিলো প্রিয়া। আয়ানের মনোযোগ সম্পূর্ণ ল্যাপটপে দেখে নি:শব্দে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলো। পরপর চুপচাপ এসে বসলো আয়ানের সামনে। কিছু বলবে কি বলবে না ভাবতে ভাবতে আয়ানই বলে উঠলো,

"তোমাকে কিছু বলার ছিলো, প্রিয়া।"

প্রিয়াও বলে ফেলল,

"আমারও আপনাকে কিছু বলার আছে। খুব জরুরি।"

আয়ান জানে প্রিয়া যদি একবার বলতে শুরু করে তাহলে তার কথাটা বলার সুযোগ সারারাতেও আসবে না। তাই বলল,

"আগে আমার কথাটা বলে নেই।"

প্রিয়া মাথা নেড়ে বলল,

"না। আগে আমি বলে নেই। জলদিই শেষ করবো। তারপর আপনি বলেন।"

আয়ান হার মেনে নিলো। ল্যাপটপ বন্ধ করে সাইডে রেখে বলল,

"ঠিক আছে বলো।"

সম্মতি পেয়ে প্রিয়া বলতে লাগলো সকালের ঘটনা৷ প্রিয়ন্তীর সাথে দেখা হওয়া, কথা বলা এবং ওর চাকরীর প্রয়োজন। কোনোটাই বাদ রাখলো না। এর মধ্যে প্রিয়ন্তীর হাজারো প্রশংসা তো রয়েছেই! আয়ানও মনোযোগ দিয়ে শুনেছে ওর কথা। সব শুনে বলল,

"তো আমাকে কি করতে বলছো?"

প্রিয়া নিষ্পাপ দৃষ্টিতে তাকালো আয়ানের দিকে। হঠাৎ করেই একদম শান্ত নদীর মতো মিইয়ে গেলো। বলল,

"প্রিয়ন্তী কাল আয়মানের অফিসে ইন্টারভিউ দিতে যাবে। আপনি একটু আয়মানকে রিকুয়েষ্ট করবেন যেনও প্রিয়ন্তীকে চাকরীতে রেখে নেয়?"

আয়ান দু'বার মাথা নাড়িয়ে বলল,

"অসম্ভব! আয়মানকে বললেই হবে? ও ওর পছন্দমতো পিএ রাখবে। শান্ত-শিষ্ট, চুপ-চাপ, গোছানো, পাংচুয়াল, কাজের প্রতি আগ্রহী। চাকরীতে রাখার ক্ষেত্রে ওর প্রথম পছন্দ নিয়মনীতি মেনে চলা একটা মেয়ে। যেনও অফিসের সব রুলস অক্ষরে অক্ষরে পালন করে। সময়সূচির যেনও এক মিনিটও হের-ফের না হয়। মেয়েটাকে হতে হবে কাজের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। যেনও সবকাজ একদম সময়মতো হয়ে যায়। সেক্ষেত্রে ও নিজেই বেছে নিবে এমন মেয়ে। আমি বললে কিছুই হবে না। তবে তুমি বলে দেখতে পারো। যদি মেনে যায়!"

প্রিয়া বলল,

"সে নাহয় বুঝলাম। প্রিয়ন্তীও ঠিক এরকমই। শান্ত-শিষ্ট, চুপচাপ মেয়ে। অনেকটাই আমার মতো। কাজও আশা করি ঠিকভাবেই করবে। আয়মানকে তাহলে আমিই বলে দেখবো।"

আয়ান অবাক দৃষ্টিতে তাকালো প্রিয়ার দিকে। বলল,

"প্রিয়ন্তী তোমার মতোই?"

প্রিয়া প্রিয়ন্তী সম্পর্কিত প্রত্যেকটি কথার উত্তর উৎসাহের সঙ্গে দিচ্ছে। এবারও বলল,

"হ্যাঁ। আমার মতোই। আমার তো একদিনেই ওকে খুব পছন্দ হয়ে গেছে!"

আয়ান জবাব না দিয়ে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলো। চুলে হাত বোলাতে বোলাতে বিড়বিড় করে বলল,

"হয়ে গেলো! আমার মাথা নষ্ট করার জন্য এই মেয়ে তো আছেই। এখন বান্ধবি পাতিয়েছে এমন, আমার ভাইটা শেষ! একদিকে ভালোই হয়েছে। আমি একা কেনও ভুগবো? এবার আয়মানও একটু বুঝুক!"

প্রিয়া ওকে বিড়বিড় করতে দেখে জিজ্ঞেস করলো,

"কি বিড়বিড় করছেন?"

আয়ান সোজা হয়ে বসে বলল,

"কই? কিছু না তো। বলছিলাম যে, আমি আয়মানকে বলে দেখবো। তুমিও বলো। তোমার কথা শোনার চান্স বেশি।"

প্রিয়া মেনে নিলো ওর কথা। প্রিয়ন্তীর বিষয়ে কথার ইতি টেনে বলল,

"আপনি কিছু বলতে চাইছিলেন।"

আয়ান হঠাৎ কিছু মনে পড়ার মতো করে বলল,

"হ্যাঁ। বলতে চাইছিলাম... সরি!"

আয়ানের মুখে সরি শুনে প্রিয়া থমকে গেলো। এই ঘাড়ত্যাড়া মানুষের মুখে ও এটা আশা করে নি! বিস্ময়ে হা করে তাকিয়ে আছে আয়ানের দিকে।

এমনিতেই আয়ানের ধৈর্য-সহ্য কম। আবার প্রিয়াকে চুপ থাকতে দেখে মেজাজ আরও বিগড়ে গেলো। ধমকের সুরে বলল,

"চুপ হয়ে গেলে কেনও? শুনতে পাও নি কি বলেছি?"

প্রথমবার ভদ্রতার সহিত সরি বলা। পরপরই আবার ধমক দেয়া। দুই রূপে প্রিয়া থতমত খেয়ে গেলো। নিজেকে সামলে দুষ্টুমির সুরে বলল,

"কি বললেন? শুনতে পাই নি আমি।"

আয়ান বুঝতে পারলো প্রিয়া দুষ্টুমী করছে। সে নিজেও বিপরীত পন্থা অবলম্বন করলো। হুট করে প্রিয়ার দু'হাত ধরে টেনে আনলো একদম কাছে। এতটা কাছে যে আয়ানের উষ্ণ নিশ্বাস পড়ছে প্রিয়ার মুখশ্রীতে। প্রিয়া হঠাৎ আক্রমণে ঘাবড়ে গিয়ে উত্তর দিতে ভুলে গেলো। আয়ান বলল,

"শুনতে পাও নি? আরেকটু কাছে এনে বললে শুনতে পাবে? প্রয়োজন হলে বলতে পারো। আমার কোনো সমস্যা নেই।"

প্রিয়া এতক্ষণে হুশে আসলো। আয়ানকে এতটা কাছে দেখেই বক্ষস্পন্দন প্রবল হতে শুরু করলো। হাতেও চাঁপ লাগছে। নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে বলল,

"হাতে ব্যাথা লাগছে। ছাড়ুন। শুনেছি আমি।"

আয়ান প্রিয়ার হাত ছেড়ে কিছুটা দূরে সরে বসলো। বিছানায় আধশোয়া হয়ে চোখ বন্ধ করে বলল,

"আমি নিতান্তই ভদ্রলোক বলে এক কথায় ছেড়ে দিয়েছি। নাহলে তোমার কথা শোনা আমার কাজ নয়!"

প্রিয়া কটমট করে বলল,

"দেখছি ভদ্রতার নমুনা!"

আস্তে করে বললেও কথাটা আয়ানের কান অব্দি পৌঁছে গেলো। সে চোখ খুলে আবার উঠে বসলো। বলল,

"তুমি চাইলে আরও নমুনা দেখাতে পারি। যখন মন চাইবে শুধু বলবে। আমি সব ভদ্রতা জমা করে রেখেছি।"

এই কথা শুনে প্রিয়া খাট থেকে উঠে কিছুটা দূরে সরে দাঁড়ালো। কন্ঠ উঁচু করে বলল,

"এই, আমি নিচে ঘুমাবো।"

আয়ান বলল,

"ডু ইউ হ্যাভ এনি প্রবলেম? আমি আগেই বলেছি, তোমাকে আমার বিছানাতেই ঘুমাতে হবে। অন্য কোনো ব্যবস্থা আমি করতে পারবো না। এটাও বলেছি, আমার নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ আছে। তাও এমন বলছো? তাহলে কি...."

এতটুকু বলে থামলো আয়ান। পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালো প্রিয়ার দিকে। তার চাউনীতে কৌতুহল। আয়ানের পরবর্তী কথাটা জানার কৌতুহল। আয়ান নিরাশ করলো না। প্রত্যেকবারের মতো এবারও উত্তর দিলো অবিশ্বাস্য। বলে বসলো,

"তাহলে কি আমি ভেবে নিবো, তুমিই নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছো না?"

প্রিয়া বিস্ময়ে এত্ত বড় হা করে ফেলেছে। হাতদুটো আপনা-আপনি উঠে এসেছে মুখ অব্দি। মুখ ঢেকেই নাক সিঁটকে বলল,

"ছিহ! কি অভদ্র চিন্তা-ভাবনা আপনার!

আয়ান হঠাৎ করে ক্ষেপে গেলো। রাগান্বিত হয়ে বলল,

"কিসের অভদ্র চিন্তা-ভাবনা ? সব ঠিক আছে আমার। তুমিই সবসময় সবকিছুতে ভেজাল করে ফেল। আমি ছিলাম কোন কথায়, আর তুমি এটাকে টানতে টানতে কই নিয়ে গেলে! আমি তো সরি বলেছিলাম তোমায় ভুল বুঝেছিলাম বলে। ইট ওয়াজ মাই মিস্টেক। তোমার মা বলেছিলো তুমি সামিরের বউ-বাচ্চার কথা জেনেই বিয়ে করতে চাইছো। তাই তোমাকে কথাও শুনিয়ে ফেলেছি। পরে জানতে পারলাম তুমি কিছুই জানতে না। ছোট্ট একটা ভুল হয়ে গেছে! এজন্য সরি বললাম।"

সব ভুলে আবারও মুগ্ধতা ঘিরে ধরলো প্রিয়ার অন্তরে। আরেকবার কৃতজ্ঞ হলো আয়ানের উপর। তারপর বলল,

"ছোট্ট একটা ভুল? এই যে আপনি আর আমি স্বামী-স্ত্রী, এইটা আসলেই ছোট্ট কিছু? আমাকে বিয়ে করাটা আসলেই ছোট্ট ভুল?"

আয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

"এটা ভুল নয়। এটা আমাদের ভাগ্য। যেটা হওয়ার জন্য নির্ধারিত ছিলো সেটাই হয়েছে।"

পূর্ণবার ভালোলাগার এক অনবদ্য ছোঁয়া। প্রিয়া মুচকি হেসে বলল,

"আসলেই ভাগ্য, ভুল নয়। তবে আমার জীবনের বিয়ের দিনটা সবসময় মনে থাকবে। মানুষ যে রাগের মাথায় তুলে বিয়েও করে ফেলে, আপনাকে না দেখলে জানতেই পারতাম না!"

ওর বলার ভঙ্গিতে আয়ান স্মিত হাসলো। বলল,

"দেখতে থাকো। আরও অনেককিছু জানতে পারবে।"

প্রিয়া কথা কাটিয়ে হাঁই তুলতে তুলতে বলল,

"এখন দেখার সময় নেই। ঘুমাবো।"

*******

কুয়াশা কেটে সূর্যের দেখা পাওয়া যাচ্ছে অল্প অল্প। সকালের সময় যত বাড়ছে কুয়াশা সরে গিয়ে মৃদু রোদ্দুরে পরিপূর্ণ হচ্ছে প্রাঙ্গণ। আয়মান বিরক্ত হয়ে স্ট্যাচু বনে দাঁড়িয়ে রয়েছে তাদের বাড়ির সদর দরজার বাইরে। তার সামনে রাখা কালো গাড়িটির দিকে তাকাচ্ছে আর বিরক্তি বাড়ছে।

আঞ্জুম খান কপাল চাপড়ে বললেন,

"আরে বাবা, আয়ান শুধু বাইকই নিয়ে গেছে! এজন্য কি তুই গাড়িতে করে যেতে পারবি না? আয়ান অন্য জায়গায় গিয়েছে বলে বাইক নিয়ে বেড়িয়েছে। আর তোর জন্য এই গাড়িটা রেখেই গেছে৷ এটাতেই যেতে হবে আজ।"

আয়মান তাও কিছু না বলে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো। আয়মানের ফুপ্পি, আরোশীও সেখানে দাঁড়িয়ে। তিনি বললেন,

"একটা বাইকের জন্য এমন করছিস আয়মান? তোর ভাব দেখে কি মনে হচ্ছে জানিস? মনে হচ্ছে আয়ান তোর বাইক না, তোর বউ নিয়েই অন্য কোথাও রেখে এসেছে।"

আয়মান ভ্রু কুঁচকে তাকালো ফুপ্পির দিকে। এদিকে বাইকে চলাচল করতেই সে বেশি কম্ফোর্টেবল। সেটা না থাকায় সে বিরক্ত। অন্যদিকে বাইকের সাথে বউকে টেনে আনায় বিরক্তর উপর মহাবিরক্ত হলো সে। আঞ্জুম খান বললেন,

"আহা, আয়মান! না রেগে গাড়ি নিয়েই যা। কে বলতে পারে? বউ-ও পেয়ে যেতে পারিস!"

অগত্যা আয়মান গাড়ি নিয়েই বের হলো।

*******

প্রকৃতির প্রত্যেক সময় ভিন্ন ভিন্ন রংবদল। আবহাওয়া চলবে তার নিজ মর্জিমতো। আকাশও হুট করে রঙ বদলে ফেলল। কালো মেঘ ছেয়ে গেলো সেথায়। টুপটুপ করে এক দু'ফোঁটা বৃষ্টিও নামতে শুরু করেছে। প্রিয়ন্তী হেঁটেই বাড়ি থেকে রওনা দিয়েছিলো। আবহাওয়া দেখে রিকশাওয়ালারও দাম বাঁড়িয়েছে। এমনিতেও ইহজন্মে তার সময়সূচির কোনো ঠিক-ঠিকানা ছিলো না। আজও উল্টোপাল্টা করে ফেলেছে। কিন্তু ইন্টারভিউ দিতে তো দেরি করা যাবে না! তাই না খেয়েই বেড়িয়ে পড়েছে। ভেবেছিলো রিকশা পেলে দ্রুত পৌঁছে যাবে। কিন্তু রিকশার দেখা নেই।

মধ্যরাস্তায় হঠাৎ সিগন্যালে সব গাড়ি থেমে থাকতে দেখলো ও। ধারনা করলো পাঁচ থেকে দশ মিনিটে জ্যাম ছুটে যাবে। আবার বৃষ্টিও বাড়ছে। তাই ভেবে-চিন্তে সামনে পাওয়া গাড়ির মিররে নক করলো।

গাড়ির কাঁচ নামতেই দৃষ্টিগোচর হলো গম্ভীর মুখশ্রী। পড়নে তার ব্ল্যাক জিন্স আর ধূসর রঙের শার্ট। রঙটা মানিয়েছেও ভীষণ। প্রিয়ন্তী নিজের দিকে একবার চোখ বুলিয়ে দেখলো, অবিশ্বাস্যভাবে সেও আজ ধূসররঙা গাউন পড়েছে। তার ভাবনার মাঝে ভেসে এলো গম্ভীর স্বর,

"এনি প্রবলেম?"

প্রিয়ন্তী সাত-পাঁচ না ভেবে বলতে লাগলো,

"জি প্রবলেম। ভীষণ প্রবলেম। আপনি তো সামনেই যাচ্ছেন তাই না? আমাকে একটু সামনে ছেড়ে দিতে পারবেন প্লিজ? আমার আজ একটা জবের ইন্টারভিউ আছে। কোনো রিকশাও পাচ্ছি না আশেপাশে। দেখুন, বৃষ্টিও নেমে যাচ্ছে। অনেক বড় বিপদে পড়েছি, একটু ছেড়ে দিবেন?"

আয়মানের দৃষ্টি সামনে দিকে। প্রিয়ন্তীর দিকে না তাকিয়েই গাড়ির লক খুলে দিলো। ইঙ্গিত পেয়ে প্রিয়ন্তীও খুশিমনে উঠে বসলো গাড়িতে।

আয়মান চুপচাপ বসে আছে। কিন্তু প্রিয়ন্তী চুপ থাকতে পারছে না। কথা বলার জন্য উসখুস করছে। মনে মনে ভাবছে, এখন কাউকে কল করলে কি উনি বিরক্ত হবে?

আয়মান কিছুক্ষণ ভেবে কিছু একটা আশংকা করে বলল,

"আপনি ইন্টারভিউ দিতে যাচ্ছেন?"

প্রিয়ন্তী কথা বলার সুযোগ পেয়ে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো। বলতে লাগলো,

"হ্যাঁ। আর লেট হলে ওই ব*জ্জাত নিশ্চিত কোনো একটা ঝামেলা করে ফেলতো। এজন্যই এত তাড়াহুড়ো। উনার জন্য আজ সকালে নাস্তাটা অব্দি খেতে পারি নি আমি!"

এরকম উত্তরে আয়মান বিরক্ত হলো। একটা প্রশ্নের জন্য এক বাক্যে উত্তরই যথেষ্ট। চার-পাঁচটা লাইন বলে এত বড় অনুচ্ছেদ রচনার কি দরকার? তার সবচেয়ে বেশি অপছন্দের বিষয়ের মধ্যে এটি একটি! বলল,

"আপনি ইন্টারভিউ দিতে যাচ্ছেন। আমি যদি ভুল না করি, তাহলে আপনি আপনার অফিসের বস সম্পর্কে কিছুই জানেন না। তাহলে তাকে ব*জ্জাত বলার কারণ? আর দ্বিতীয় কথা, আপনার নাস্তা খেতে না পারাটা আপনার দোষ। তার দোষ নিশ্চয়ই নয়৷ আপনিই হয়তো সময়সূচি ঠিক রাখতে পারেন না!"

প্রিয়ন্তী অবাক হয়ে বলল,

"সময়সূচি? কিসের সময়সূচি? যখন যেটা মন চায় সেটাই করো, লাইফ বিন্দাস! সময়সূচির ধার কে ধারে?"

আয়মান এবারও বিরক্ত হলো ওর কথায়। এই মেয়ের সাথে কথা বলা-ই বেকার। তার অপছন্দের সবগুলো গুন এই মেয়ের মধ্যে পরিপূর্ণ! আর যার-ই হোক, তবে তার পিএ যেনও কোনোভাবেই এই মেয়ে না হয়।

কথাটুকু ভাবার পরপরই আয়মানের মস্তিষ্কে ঢুকলো অন্য ভাবনা। এই মেয়ে বলেছে সামনেই যাবে। সামনে তো তারই অফিস। আর তারই অফিসে আজ ইন্টারভিউ! তাহলে কি তার পিএ পদের-ই ক্যান্ডিডেট?

আয়মান নিশ্চিত হতে শুধালো,

"কোথায় ইন্টারভিউ দিতে যাচ্ছেন আপনি?"

প্রিয়ন্তী হাসিমুখে বলল,

-"খান এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড। ছোট নবাবের পিএ পদে ইন্টারভিউ দিতে যাচ্ছি। এমনিতে শুনেছি বস জাতির লোকেরা মহা পাজি হয়। অহংকারী আর খাটাশ হয় এই প্রজাতির লোকজন। আয়মান খানও নিশ্চয়ই তার ব্যতিক্রম হবে না। এমনিতেও তার ব্যাপারে যাই শুনেছি সবই নেগেটিভ! শুনেছি তার নাকি চরিত্রেরও সমস্যা আছে। যেখানে সেখানে মেয়েদের সাথে ঢলাঢলির স্বভাবও আছে। এমন বাজেও মানুষ হয়? এমনিতে আমি অন্য শহর থেকে এসেছি তাকে ভালোমতো চিনিও না। আপনি চিনেন?"

আয়মান এতক্ষণ দাঁতে দাঁত চেপে নিজের রাগ কন্ট্রোল করার চেষ্টা করছিলো। প্রিয়ন্তীর কথা শুনে মস্তিষ্ক রাগে ফেঁটে পড়ছে। তবুও সঠিক সময়ে একে শায়েস্তা করার চিন্তায় চুপচাপ সামনে তাকিয়ে ড্রাইভিং করছে। শেষের প্রশ্নে যেনও রাগ আরও তড়তড় করে বেড়ে গেলো। বলল,

"এক সেকেন্ডের জন্য চুপ থাকতে পারছেন না? মুখটা ননস্টপ চলতেই আছে।"

প্রিয়ন্তী বিস্ময়ের এমন একটা ভাব করলো যেনও সে ভীষণ অবাক হয়েছে। চোখ বড় বড় করে বলল,

"আপনি আমাকে চুপ থাকার কথা বলছেন? জানেন আমি স্কুলে থাকতে আমার ক্লাস টিচার কি বলেছিলো? জানেন না তো? আমিই বলছি। উনি বলেছিলেন, যদি চুপ থাকার কোনো প্রতিযোগিতা হতো তাহলে নি:সন্দেহে আমিই ফার্স্ট প্রাইজ পেতাম। তাহলেই বুঝুন আমি ঠিক কতটা শান্ত-শিষ্ট!"

স্নিগ্ধ প্রেমের মায়া গল্পটি তিয়াশা চৌধুরী-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক ও রোমান্টিক থ্রিলার গল্প