স্নিগ্ধ প্রেমের মায়া

পর্ব - ১৯

🟢

শীতের রাতে ঠান্ডার প্রকোপ বাড়ছে। রাত প্রায় ৮ টা। সময় হয়ে গিয়েছে অফিস ছুটির। প্রিয়ন্তী আজ সারাদিন নিশ্বাস নেওয়ারও সময় পায় নি। ওর সকাল সকাল করা ভুলগুলোর শাস্তি আয়মান এভাবে দিবে বুঝতেও পারে নি। বারবার ঘড়ি দেখছে আর সময় মাঁপছে কতক্ষণে ছাড়া পাবে। ছুটি পেয়ে গেলেই শান্তি!

কিন্তু আয়মান ওর ভাবনায় এক বালতি পানি ঢেলে দিলো। এসে বলল,

"যতগুলো ফাইল ইনকম্পলিট আছে সবগুলো বাড়ি নিয়ে যাবে। কাল সকাল সাতটার মধ্যে আমি এইগুলো কম্পলিট চাই।"

প্রিয়ন্তী অবাক হয়ে বলল,

"বাড়ি নিয়ে যাবো? এতগুলো ফাইল সারারাতে কম্পলিট করতে হবে আমায়?"

"হ্যাঁ। ঠিক সকাল সাতটার মধ্যে।"

প্রিয়ন্তী আমতা-আমতা করে বলল,

"কিন্তু স্যার, অফিস তো সকাল দশটা থেকে। সাতটায়ই কম্পলিট কেনও করতে হবে?"

আয়মান ধমকের সুরে বলল,

"বিকজ ইট'স মাই অর্ডার! তোমাকে কি বলেছিলাম, শুনেছো? আমার পিএ হওয়ার দায়িত্ব হলো আমি যখন যা বলবো তাই করতে হবে। এগ্রিমেন্ট পেপারেও এটাই লেখা ছিলো। তুমি সাইনও করেছো। এখন আমার অর্ডার সাতটায় না হয়ে ভোর পাঁচটায় হলেও তুমি অর্ডার মানতে বাধ্য। সাহিলের থেকে আমার বাড়ির ঠিকানা নিয়ে নিবে। সবগুলো ফাইল কম্পলিট করে সকাল সাতটায় দিয়ে আসবে।"

বলে আয়মান উত্তরের অপেক্ষা না করে গটগট করে হেঁটে চলে গেলো। আর সেদিকে তাকিয়ে হতাশ শ্বাস ফেলল প্রিয়ন্তী।

*****

আয়মান বাড়ি ফিরতেই দরজা খুলে দিলো সারা। দরজা খুলতে একটু দেরি হওয়ায় ঝাঁড়ি মেরে বলল,

"একটা দরজা খুলতে এতক্ষণ লাগে? অলস কোথাকার! টাইমিং এর কোনো ঠিক নেই!"

বাড়ি আসতে না আসতেই রাগারাগি শুরু করায় অবাক হলো সারা। বুঝতে পারলো কোনো কারণে আয়মানের মাথা গরম। কৌতুহল মেটাতে প্রশ্ন করলো,

"কিছু কি হয়েছে ভাইয়া? মাথা গরম কেনও?"

আয়মান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

"আমার মাথা যে কবে ঠান্ডা হওয়ার সুযোগ পাবে সেটা ভেবেই দুশ্চিন্তা হচ্ছে!"

এদিকে প্রিয়া আয়মানকে ঢুকতে দেখে উৎফুল্ল হয়ে বলল,

"আয়মান, তুমি এসে পড়েছো? প্রিয়ন্তীর সাথে দেখা হয়েছে তোমার? কেমন লাগলো ওকে? চমৎকার একটা মেয়ে না?"

আয়মান হাসার চেষ্টা করে বলল,

"হ্যাঁ ভাবি। একটু বেশিই চমৎকার! চমক দিতে দিতে একদম উল্টিয়ে ফেলেছে!"

শেষের কথাটা প্রিয়া শুনতে পায় নি। তাই আবারও শুধালো,

"কিছু বললে?"

আয়মান মাথা নাড়িয়ে বলল,

"না তো। ভাইয়াকে খুঁজছিলাম। ভাইয়া কই?"

"হেই, ছোটু ভাই! আমি এখানে।"

বলতে বলতে দু'হাত পিছে গুজে সিড়ি বেঁয়ে নামছিলো আয়ান। নেমে এসে বরাবরের মতো আয়মানের সিল্কি গোছানো চুলগুলো হাত দিয়ে এলোমেলো করে দিয়ে বলল,

"কেমন দিন গেলো, ভাই? আশা করি, খুব ভালো কেটেছে।"

আয়মান হাত দিয়ে চুলগুলো ঠিক করতে করতে বলল,

"চুল এলোমেলো করো না, ভাইয়া!"

আয়ান এই কথা এক কান দিয়ে শুনলো, আরেক কান দিয়ে বের করলো। অত:পর প্রিয়াকে বলল,

"প্রিয়া, আমার ছোটু ভাইয়ের জন্য এক গ্লাস শরবত করে আনো। আজ বেচারার উপর অনেক ধকল গিয়েছে।"

প্রিয়া মাথা নাড়িয়ে চলে গেলো কিচেনে। পিছন পিছন সায়মা। আয়ান আয়মানের দিকে ঘুরতেই সম্মুখীন হলো এক জোড়া সন্দেহী দৃষ্টির। ভ্রু উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলো,

"এভাবে তাকিয়ে আছিস কেনও?"

আয়মান তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,

"আমার দিন সম্পর্কে তুমি কিভাবে জানলে? আর ধকল গিয়েছে এটাই বা তোমায় কে বলল?"

আয়ান মুচকি হেসে বলল,

"আমার ভাইয়ের উপর ধকল যাবে, আর আমি জানবো না? এমন পিএ রেখেছিস, শান্তি কি পাবি?"

আয়মান বিস্ময় নিয়ে বলল,

"পিএ-র সম্পর্কে তুমি কি করে জানলে?"

"শোন, কাল রাতে যখন তোর ভাবি বলেছে প্রিয়ন্তী একদম ওর মতো, তখনই বুঝেছি আজ তোর উপর এমন বিপদ যাবে!"

আয়মান ঠান্ডা মাথায় কিছুক্ষণ ভেবে হিসাব মেলানোর চেষ্টা করলো। পরপর প্রিয়ন্তীর স্বভাবগুলো চিন্তা করে বলল,

"ভাইয়া, তুমি কি ইনন্ডিরেক্টলি ভাবির বদনাম করলে?"

আয়ানের ভাবলেশহীন উত্তর,

"বদনাম কোথায় করলাম? সত্যি কথাই তো বলেছি!"

আয়মান মাথা নাড়িয়ে বলল,

"ভাবিকে বলতে হবে তুমি যে ভাবির অনুপস্থিতিতে ভাবির নামে আমার কাছে বদনাম করছো।"

আয়ান ঘাবড়ালো না। নিরুদ্বেগ ভঙ্গিতে উত্তর দিলো,

"বল গিয়ে। আমিও বলবো তুই প্রিয়ন্তীর নামে বদনাম করেছিস। এন্ড ইউ নো হোয়াট? এটা শুনলে কিন্তু ও খুব রেগে যাবে। বড় আদরের ছোট বোন বানিয়েছে কি না!"

আয়মান চোখ ছোট ছোট করে বলল,

"হুমকি দিলে আমাকে?"

আয়ান চোখের ইশারায় না বোঝালো। তারপর বলল,

"প্রত্যেক ক্রিয়ারই একটি সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে। আমিও তোর ক্রিয়ায় প্র‍তিক্রিয়া দেখিয়েছি ভাই!"

আয়মান হতাশ শ্বাস ফেলে বলল,

"আমি আছি নিজের জ্বালায়! আর তুমি বড় ভাই হয়ে আমার অশান্তির মজা নিচ্ছো?"

আয়ান ধমকের সুরে বলল,

"কিসের মজা নিচ্ছি? পিএ তুই রেখেছিস তুই বুঝবি। কিন্তু প্রিয়ন্তীর সাথে কোনো উল্টাপাল্টা না। আফটার অল, আমার শালিকা বলে কথা!"

আয়মান কটমট করে বলল,

"বিপদে পড়লে চামচিকেও লাত্থি মারে। আর আমার বিপদে আমার ভাই মারলো!"

আয়ান এই কথায় অবাক হয়ে কিছু বলতে নিলো। কিন্তু আয়মান ধুপধাপ পা ফেলে নিজের রুমে গিয়ে দুম করে দরজা বন্ধ করে দিলো।

প্রিয়া গ্লাস হাতে বেরিয়ে আয়মানকে না দেখে প্রশ্ন করলো,

"গেলো কই ও? রুমে চলে গেলো? আমার তো ওকে আরও কিছু জিজ্ঞেস করার ছিলো।"

আয়ান ওর হাত থেকে গ্লাস নিয়ে নিজে শরবতটুকু খেয়ে বলল,

"আর কি জিজ্ঞেস করবে? প্রিয়ন্তীর ব্যাপারে জিজ্ঞেস করার কিছুই নেই। ও এমনিই আয়মানের জন্য পারফেক্ট পিএ। আজ এত ফাস্ট আর সুন্দরভাবে কাজ করেছে যে সামলাতে গিয়ে আমার ভাই হিমশিম খেয়ে গেছে।"

প্রিয়া আয়ানের কথার অর্থে ফাজলামো ধরতে পারলো না। খুশি হয়ে বলল,

"আমি জানতাম, প্রিয়ন্তী সব ঠিকঠাক করবে।"

*******

পিয়াস ফ্রেশ হয়ে মাত্র ওয়াশরুম থেকে বেড়িয়েছে। স্বজনী চায়ের কাপ হাতে রুমে ঢুকে নি:শব্দে দরজা ঠেলে দিলো। তার শশুড়-শাশুড়ি তাদের রুমে। এখন কথা বলতে এসেছে প্রিয়ন্তীর আয়মানের অফিসে প্রথম দিন নিয়ে।

বেডসাইডের টেবিলে চায়ের কাপটা রেখে স্বজনী প্রশ্ন করলো,

"আয়মানের অফিসে আজ প্রিয়ন্তীর ইন্টারভিউ ছিলো। প্রিয়ন্তীর থেকে শুনলাম আয়মান ওকে জবে রেখেছে। কিন্তু সারাদিন আর প্রিয়ন্তীকে পেলাম না। তোমার বোন ভীষণ ব্যস্ত মানুষ হয়ে গেছে!"

পিয়াস বলল,

"প্রিয়ন্তীকে আসার সময় ফোন দিয়েছিলাম। বলল আজ প্রথম দিন, সব গুছিয়ে নিতে একটু হিমশিম খাচ্ছে। আস্তে আস্তে সব ঠিক হয়ে যাবে। আর বলেছে ব্যস্ততা না থাকলে কাল ফোন দিবে।"

স্বজনী হতাশ হয়ে বলল,

"প্রিয়ন্তী যদি এত ব্যস্তই থাকে, তো সেখানকার খবর বলবে কে?"

পিয়াস কিছু একটা ভেবে বলল,

"প্রিয়ন্তী ব্যস্ত। তো আয়মানকেই জিজ্ঞেস করি ওর আজ সারাদিনের খবর। দেখি কি বের হয়!"

স্বজনী উৎফুল্ল হয়ে বলল,

"ভালো বুদ্ধি। ফোন করো আর স্পিকারে রেখে কথা বলো। আমিও শুনি আমার ননদিনীর কাহিনি!"

*******

আয়মানের সবকিছুই নিয়মমাফিক। এমনকি বাইরে থেকে এসে সাথে সাথে ফ্রেশ হওয়াটাও তার দৈনিক নিয়মের মধ্যে পড়ে। কিন্তু আজ সেই নিয়মের ব্যতিক্রম হলো। রুমে ঢুকে মেজাজ নিয়ে ধুমধাম দরজা বন্ধ করে ফেলেছে। তারপর থেকেই রুমের এপাশ থেকে ওপাশ পায়চারী করে যাচ্ছে। প্রিয়ন্তীর একটা একটা কর্মকান্ড মনে পড়ছে আর মেজাজ সপ্তমে চড়ে বসছে। প্রিয়ন্তীর এই অগোছালো স্বভাব ওর পছন্দ হয় নি। ও নিশ্চিত প্রিয়ন্তী কালও সকাল সাতটায় ফাইল দিতে আসবে না।

তার এসব ভাবনার মাঝে বিরক্তিকর শব্দে বেজে উঠলো ফোন। আয়মান ফোনটা হাতে নিয়ে দেখলো স্ক্রিনে ভাসছে পিয়াসের নাম্বার। তাই দ্রুত নিজের মেজাজ সামলে রিসিভ করলো ফোন। গম্ভীর কন্ঠে বলল,

"হ্যালো।"

ওপাশ থেকে ভেসে এলো পিয়াসের উৎফুল্ল কন্ঠস্বর,

"কি খবর ভাই? কেমন আছিস? ফোন ধরতে এত দেরি হলো কেনও?"

আয়মান বিরক্তি চেঁপে ফোনটা কান থেকে নামিয়ে স্ক্রিনে তাকালো। পরপর বিড়বিড় করে বলল,

"নাহ! নাম্বারটা পিয়াসেরই। তাহলে মাথায় ওই এলার্জির কথা ঘুরছে কেনও? কেউ দু'চারটা কথা একবারে বললেই ওই মেয়ের কথা মাথায় আসছে। একটা মানুষ এক নিশ্বাসে এতগুলো কথা কিভাবে বলতে পারে?"

এদিকে পিয়াস কোনো উত্তর না পেয়ে ধৈর্যহারা হয়ে গেলো। ফোনের মধ্যেই চেঁচিয়ে বলল,

"কিরে ভাই? মুখে আঠা লাগিয়ে ঘুরছিস নাকি? জবাব দিতে পারছিস না?"

আয়মান ভাবনা শেষে সবে ফোনটা কানে নিয়েছিলো। তৎক্ষণাৎ চিৎকার মস্তিষ্কে প্রবেশ করতেই পুনরায় বলল,

"আশ্চর্য! তুই ওই এলার্জির মতো বেহুদা চিৎকার করছিস কেনও?"

পিয়াস নতুন নামটা শুনে অবাক হয়ে বলল,

"এলার্জি? এলার্জির মতো বেহুদা চিৎকার করছি মানে?"

আয়মান বুঝলো মেজাজ গরম থাকায় ও উল্টাপাল্টা বলে ফেলছে। কিন্তু কথাটা পিয়াসকে বলা ছাড়াও উপায় নেই। ভাইয়াও তো মজা নিলো। তাহলে দুঃখের কথাটা বলবে কাকে?

ভাবতে ভাবতে বলে ফেলল,

"আর বলিস না! আজ ইন্টারভিউ দিতে একটা মেয়ে এসেছিলো।"

মেয়ের কথা শুনেই পিয়াস নড়েচড়ে বসলো। বাকি কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে বলে বসলো,

"মেয়ে? ইন্টারেস্টিং ব্যাপার! তারপর কি হলো?"

"ভাই প্লিজ! তুই ওই এলার্জির মতো কথার আগে উত্তর দিস না। আমার পুরো কথাটা শোন।"

এবার স্বজনীও উঠে এসে পিয়াসের গা ঘেঁষে বসলো। মনে একরাশ কৌতুহল চেঁপে বসেছে কথাগুলো শোনার জন্য। আগ্রহ নিয়ে নিজেও চুপচাপ বসলো আয়মানের কথা শুনতে। আবার আঙুল দিয়ে পিয়াসের ঠোঁট চেঁপে ইশারায় চুপ থাকতো বলল। অত:পর সম্পূর্ণ মনোযোগ দিলো আয়মানের বক্তব্যে।

আয়মান একে একে সব ঘটনা খুলে বলেছে। প্রিয়ন্তীর একেকটা কর্মকান্ড শুনেছে আর দুজন চাঁপা হাসিতে ফেটে পড়েছে। আবার কোনো কোনো সময় দুঃখও হয়েছে আয়মানের কথা ভেবে। পিয়াস আস্তে করে স্বজনীকে বলল,

"আমি জানতাম এই মেয়ে এসব জীবনেও করতে পারবে না। এজন্যই বলেছিলাম আয়মানকে সব বলে রাখি। কিন্তু না! ম্যাডাম নিজের জেদের বাইরে যাবেই না। আর কিছু থাকুক না থাকুক, মাথা ভর্তি জেদটুকু ঠিকই আছে!"

আয়মান অপরপাশে নিশ্চুপ থেকে ভাবলো কল কেটে গেছে। কিন্তু স্ক্রিনে তাকিয়ে যখন দেখলো পিয়াস লাইনে আছে তখন সন্দিহান হয়ে বলল,

"পিয়াস, তুই কি আমার কথা শুনছিস না?"

পিয়াস থতমত খেয়ে বলল,

"আরে না না! সব কথা শুনেছি। এখন কিছু তো করার নেই। আমরা সবাই জানি আয়মান আহমেদ খান তার ওয়াদার খেলাপ করে না। এখন প্রিয়া ভাবিকে কথা দিয়ে ফেলেছিস যখন ওই মেয়েকে বের করতে তো পারবি না! একটু বুঝিয়ে-পড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করিস।"

আয়মান বলল,

"হবে না, হবে না! ওই মেয়েকে ত্যাড়াভাবেই ঠিক করতে হবে!"

পিয়াস স্বজনীর দিকে তাকিয়ে ইশারায় পরামর্শ চাইলো। অত:পর আমতা-আমতা করে বলল,

"আয়মান, বলছিলাম যে শুধু শুধু মেজাজ ভালো না। ঠান্ডা মাথায় সমাধান করে ফেললে ভালো হয়।"

আয়মান ঘনঘন দু'পাশে মাথা নাড়লো। বলল,

"সম্ভব না। ওই মেয়ের কথা শুনলে আমার হিমালয়ের মতো ঠান্ডা মেজাজও মরুভূমির মতো উত্তপ্ত হয়ে যায়। সেখানে ঠান্ডা সমাধান অসম্ভব।"

পিয়াস মাথা চুলকে আস্তে করে বলল,

"বিরাট একটা মিথ্যা কথা বলে ফেলল। এর মেজাজ তো বিনা কারণেই সবসময় মরুভূমির মতো উত্তপ্ত থাকে। এখন আমার বোনটার উপর দোষ চাঁপাচ্ছে!"

স্বজনী কপাল চাপড়ে বলল,

"আর দোষ! প্রিয়ু যে এমন জগাখিচুরি পাকাবে তা আগে থেকেই জানা ছিলো। ওদেরটা ওদের বুঝতে দাও!"

পিয়াস বলল,

"ঠিক বলেছো। নিজের বুদ্ধিতে পরিচয় লুকিয়ে যাওয়ার প্ল্যান করেছে। এবার আমাকে বললে তবেই আমি আয়মানের কাছে ওর পরিচয় দিবো তার আগে না। আর যা বুঝলাম, বেচারার আজ বারোটা বেজেছে!"

*******

শহরজুড়ে শীতের শীতলতায় রাত নেমেছে অনেকক্ষণ। প্রিয়া রুমে ঢুকে দেখলো আয়ান প্রতিদিনের মতো আজও ল্যাপটপে ব্যস্ত। খাওয়ার টেবিলে যতবার আজ আয়মানের সাথে প্রিয়ন্তীর ব্যাপারে কথা বলতে চেয়েছে, আয়ান ততবারই থামিয়ে দিয়েছে। শেষে ব্যর্থ হয়ে হাল ছেড়েছে ও। সেইসব প্রশ্ন উগড়ে দিলো এখন। বিছানার এক সাইডে বসে বলল,

"আপনি আয়মানের সাথে প্রিয়ন্তীর ব্যাপারে কথা বলতে দিলেন না কেনও?"

ল্যাপটপের উপর আয়ানের চলতে থাকা হাত থেমে গেলো। বলল,

"সবাই ছিলো তো তাই! আর আমার মনে হয় একদিনেই আয়মান প্রিয়ন্তীর সম্পর্কে এত ধারনা করতে পারবে না। কয়দিন যাক, ও নিজে এসে তোমার কাছে প্রশংসা করবে প্রিয়ন্তীর।"

প্রিয়া বুঝতে পেরে বলল,

"আচ্ছা। আপনি ঘুমাবেন না?"

"আমার কিছু কাজ আছে। শেষ করে ঘুমিয়ে যাবো। তুমি ঘুমাও।"

প্রিয়া বিরক্তি নিয়ে বলল,

"আপনার কাজ শেষ হয় না? সারাদিন পরও এই রাতে থাকে?"

আয়ান ল্যাপটপের দিকে তাকিয়ে উত্তর দিলো,

"হ্যাঁ থাকে তো।"

প্রিয়া রেগেমেগে বলল,

"তাহলে আপনি এই ল্যাপটপ আর আপনার কাজের সাথেই সংসার করুন।"

বলেই সে উল্টো ঘুরে শুয়ে চোখ বন্ধ করে ঘুমানোর চেষ্টা করলো। আয়ান ওর কথার উত্তর না দিয়ে স্বল্প হাসলো শুধু।

কাজ শেষে ল্যাপটপ রেখে শুতে গিয়েই ভাবলো প্রিয়া হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছে। আরেকটু নিশ্চিত হলো যখন ঘুমের ঘোরেই পাশ ফিরে শুলো। আয়ান ওর দিকে এক দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো। মনে মনে ভাবলো,

"একসময় ওর নাম শুনলেই বিরক্ত হয়ে ড্রইং রুম ছাড়তাম। এখন যখন আমার রুমেই আমার পাশে থাকছে তখন কোথায় যাবো? এখন তো নিজের রুম ছাড়ার মতো বিরক্তিও আসে না। বিয়ে করে ভেবেছিলাম ভালোবাসা কোনোদিনও হবে না। তবে এখন কেনও মায়ায় জড়িয়ে যাচ্ছি?"

******

কুয়াশাঘেরা সকালে সূর্যের আলোর উপস্থিতি খুব একটা টের পাওয়া যাচ্ছে না। প্রিয়ন্তীকে সকাল সাতটায় আসার কথা বলেছে তাই আয়মানও সাতটা থেকেই ওয়েট করছে।

কিন্তু আয়মানের ধারনা সম্পূর্ণ সত্যি করে দিয়ে প্রিয়ন্তী সাতটায় এলো না। দেখতে দেখতে যখন ঘড়ির কাঁটা সাতটা ত্রিশে পৌছালো আয়মান প্রিয়ন্তীকে ফোন করলো। দু'বার রিং হয়ে যখন ফোন কেটে গেলো আয়মান নিশ্চিত হলো প্রিয়ন্তী ঘুমাচ্ছে।

সকাল আটটা ত্রিশ মিনিটে হন্তদন্ত হয়ে প্রিয়ন্তী এলো আয়মানদের বাসায়। সায়মা গিয়ে বাড়ির কিছুটা কাছে থেকেই ওকে নিয়ে এসেছে। ভয়ে ভয়ে বাড়িতে ঢুকেছে প্রিয়ন্তী। দেড় ঘন্টা লেট করে ফেলেছে ও! কে জানে আয়মান আজ কি শাস্তি দিবে?

প্রিয়ন্তী যখন এইসব ভাবনায় ডুব সায়মা তখন ওকে ধাক্কা দিয়ে বলল,

"ভাইয়া রুমে। যা গিয়ে ফাইলগুলো দিয়ে আয়।"

প্রিয়ন্তীও মাথা নাড়িয়ে সিড়ি বেঁয়ে উঠতে লাগলো। কিন্তু পা-টা যেনও আজ কোনো ভাবেই আগাতে চাইছে না। তবুও বহু কষ্টে ভয়কে জয় করে নক করলো আয়মানের রুমের দরজায়।

পারমিশন পেয়ে যখন রুমে ঢুকলো আয়মান কোনো সম্ভাষণ ছাড়াই বলল,

"কয়টায় আসার কথা ছিলো তোমার?"

প্রিয়ন্তী আমতা-আমতা করে বলল,

"সাতটায়!"

"তাহলে দেড় ঘন্টা লেট হলো কেনও?"

প্রিয়ন্তী মাথা নিচু করে বলল,

"ফাইলগুলো কম্পলিট হচ্ছিলো না, তাই।"

আয়মান জানে এটা মিথ্যা কথা তবুও কিছু বলল না। যতটুকু হেনস্থা করতে পেরেছে এতেই সন্তুষ্ট সে। বাকিগুলোর জন্য তো আরও দিন পড়েই রয়েছে..!

*****

এদিকে প্রিয়ন্তীকে পেয়ে সারা-সায়মা, প্রিয়া খুব খুশি। ওরা কোনোভাবেই ওকে আজ যেতে দিবে না। পারভিন খানও বেশ আদরের সাথেই ওর আপ্যায়ণ করেছেন। মেয়েটাকে তারও পছন্দ হয়েছে। খুবই মিশুক বলে, রেখেও দিতে চাইছেন আজ সারাদিনের জন্য!

কিন্তু আয়মান নারাজ। দশটা বাজতেই তাড়াহুড়ো করতে লাগলো অফিস যাওয়ার জন্য। আয়মান চাইছে না দ্বিতীয় দিনই প্রিয়ন্তী অফিস মিস দিক। আর পরিবারের কেউ চাইছে না আয়মানের কথা মানতে। এউ নিয়ে তাদের মাঝে চলছে বিস্তর বাকবিতন্ডা। তখন দোরগোড়ায় হাজির হলো অনাকাঙ্ক্ষিত একজন...!

স্নিগ্ধ প্রেমের মায়া গল্পটি তিয়াশা চৌধুরী-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক ও রোমান্টিক থ্রিলার গল্প