ঘড়ির কাটা টিকটিক করে দুইটার ঘরে এসে পৌঁছেছে। জানলা ফুঁড়ে হিমেল হাওয়া প্রবেশ করছে কক্ষে। প্রিয়ন্তী কম্বলটা আরেকটু টেনে নিয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করলো। কিন্তু কোনোভাবেই চোখে ঘুম ধরা দিচ্ছে না। এপাশ ফিরে একবার তাকালো সন্ধ্যার দিকে। সে গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন। প্রিয়ন্তী হাত বাড়িয়ে ওকে ডাকতে গিয়েও পরমুহুর্তে হাত ফিরিয়ে আনলো। তার ঘুম আসছে না, বলে কি আরেকজনেরও ঘুম নষ্ট করবে?
কিছুক্ষণ এপাশ-ওপাশ ফিরে উঠে বসলো প্রিয়ন্তী। গলা শুকিয়ে চৌচির হয়ে গেছে। বেডসাইডের টেবিল থেকে পানির গ্লাস নিতে গিয়ে দেখলো সেটা খালি। এমনকি জগটা অব্দি সম্পূর্ণ খালি। বিরক্তিতে 'চ' সূচক শব্দ করলো মুখ দিয়ে। পরপর জগ হাতে বের হলো রুম থেকে।
সিড়ির কাছে যাওয়া মাত্রই চোখ পড়লো আয়মানের রুমের দিকে। বিস্মিত দৃষ্টি আবিষ্কার করলো তার রুমের দরজা পুরো খোলা। এত রাতে আয়মানের রুমের দরজা খোলা দেখে ভীষণ অবাক হলো প্রিয়ন্তী। আবার ভেতরে এত অন্ধকারে দূর থেকে কিছু বোঝাও যাচ্ছে না।
কৌতুহলবশত হাতে জগটা নিয়েই প্রিয়ন্তী পা বাঁড়ালো আয়মানের রুমের দিকে। দরজার কাছে আসতেই ভিতরকার দৃশ্য দেখে রূহ কেঁপে উঠলো তার। মণিদ্বয় বিস্ময়ে অক্ষিকোটর ছাড়াতে চাইলো। দু*র্ঘটনা ঘটে যাওয়ার আগেই ত্রস্থ ছুট লাগালো রুমের ভেতর। ছু*রিটা আয়মানের বুকে বসার আগমুহূর্তেই প্রিয়ন্তী ধারালো অংশটুকু চেঁপে ধরলো ডান হাত দিয়ে। বাম হাতে থাকা জগ কাঁপতে থাকা হাত থেকে ছুটে বিছানার উপর পড়লো।
নাতাশা সবেমাত্র ছু*রিটা আয়মানের বুকে চালিয়েছে, তার আগেই প্রিয়ন্তী আটকে দিয়েছে। ধরা পড়ে যাওয়ায়, প্রথমবার হকচকিয়ে কথা বলতে ভুলে গেলো নাতাশা। শুধু অবাক লোচনে চেয়ে রইলো প্রিয়ন্তীর দিকে। পরমুহুর্তে নিজের কাজে বাধাগ্রস্ত হওয়ার দরুণ ক্ষে*পে গেলো সে। রাগান্বিত স্বরে বলল,
"তুমি? তুমি এত রাতে এই রুমে কি করছো?"
নাতাশা কথা বলার সময় ছু*রির উপর জোর খাটানো ছাড়ে নি। এখনও অবিরাম বল প্রয়োগ করে যাচ্ছে আয়মানের বুক অব্দি পৌঁছানোর জন্য৷ নাতাশা যত চেষ্টা করছে প্রিয়ন্তী তত শক্ত করে ছু*রিটা চেঁপে ধরছে। মুঠো করে ধরে রাখা হাতে নাতাশা ছু*রিটা মোচড়াচ্ছে। এর ফলে ভয়ংকরভাবে ক্ষত-বিক্ষত হচ্ছে প্রিয়ন্তীর হাত। টুপ-টাপ র*ক্তের ফোঁটা ওর হাত থেকে ঝড়ে পড়ছে আয়মানের সাদা টি-শার্টে। ব্যাথা পাওয়া স্বত্ত্বেও ছু*রিটা ছাড়ছে না প্রিয়ন্তী। হাতের অসহ্য ব্যাথায় কুকড়ে গিয়ে ঠোঁট কামড়ে ধরলো। তবুও ছু*রিটা আয়মানের বুক অব্দি পৌঁছাতে দেয় নি। র*ক্তের ফোঁটা পড়ে ভিজে যাচ্ছে আয়মানের টি-শার্ট। আর প্রিয়ন্তীর চোখের নোনা জল ভিজিয়ে দিচ্ছে ওর কপোল!
নাতাশা আরও চেঁপে ধরলো ছু*রিটা। প্রিয়ন্তীর দিক চেয়ে হিসহিসিয়ে বলল,
"ছু*রিটা ছাড়ো প্রিয়ন্তী। আমাকে আমার কাজ করতে দাও।"
প্রিয়ন্তী শান্ত অথচ কঠোরতা পরিপূর্ণ স্বরে বলল,
"তুমি তো উনার বউ হতে চাও, তাই না? তাহলে কেনও উনাকে মে*রে বিয়ের আগেই বিধবা হতে চাইছো?"
নাতাশা শান্তভাবে হেসে তাচ্ছিল্যভরে বলল,
"আমার চিন্তা করছো নাকি নিজের? আমি তো শুধু বউ হতে চাইছিলাম, হই নি । আর তুমি তো ওর সাথে জুড়ে গিয়েছো। বিয়ে হওয়ার পর ওকে মা*রলে তোমার উপর সারাজীবনের মতো বিধবা তকমা লেগে যাবে। এরচেয়ে ভালো আগেই মেরে ফেলি। তুমিও বিন্দাস আর আমিও!"
প্রিয়ন্তী রোষপূর্ণ দৃষ্টিতে চেয়ে বলল,
"আমার কোন জনমের আপন বোন লাগো, যে আমার কথা এত ভাবছো? নিজের স্বার্থেই উনাকে মা*রতে চাইছো তুমি।"
নাতাশা ছু*রি ধরা হাতের বাঁধন একটু আলগা করলো। প্রিয়ন্তীকে বোঝাতে ঠান্ডা মাথায় হেসে বলল,
"ওকে বাঁচানোর জন্য নিজেকে ক্ষত-বিক্ষত করতে একবারও ভাবো নি। তুমি জানো আয়মান যে তোমাকে মে*রে ফেলতে চাইছিলো? তাও শুধু আমার জন্য! ও তোমার সাথে বাগদান করেছে শুধু পরিবারের সম্মান বাঁচাতে। এরপর আমার কাছে এসে বলেছে, তোমাকে মে*রে রাস্তা ক্লিয়ার করে আমাকে বিয়ে করবে। এরপরও ওকে বাঁচানোর জন্য তুমি নিজেকে কষ্ট দিবে?"
প্রিয়ন্তী শান্ত দৃষ্টিতে চেয়ে নাতাশার প্রত্যেকটি কথা শুনেছে। ইতিমধ্যেই আড়চোখে তাকিয়ে দেখেছে নাতাশা হাতের চাঁপ কমিয়ে এনেছে৷ প্রিয়ন্তীও এই সুযোগের অপেক্ষায় ছিলো। বাম হাত দিয়ে নাতাশার হাত চেঁপে ধরে ছু*রিটা ছাড়িয়ে নিয়েছে ওর হাত থেকে। ছু*রিটা হাত থেকে ফেলে দেওয়ার পরও প্রিয়ন্তী লক্ষ করলো না হাতটা কতখানি কেটে র*ক্তাক্ত হয়েছে। সে ব্যস্ত নাতাশাকে আটকাতে। এক প্রকার হাত মু*চড়ে পিছনে নিয়ে গেলো। তৎক্ষণাৎ হাত ব্যাথায় কঁকিয়ে উঠলো নাতাশা। প্রিয়ন্তী তেজী স্বরে জানালো,
"সম্পর্ক জুড়েছে, আর সেটা তুমি মেনেও নিয়েছো। তাহলে আরেকটা জিনিস ভালোভাবে মেনে নাও। সম্পর্ক যদি থাকে, তবে প্রিয়ন্তী সেই সম্পর্কের সম্মান করতে জানে। আর সেই সম্মান থেকেই আমি বলছি, আমি তোমাকে একবিন্দুও বিশ্বাস করি না।"
তৎক্ষণাৎ আয়মান হকচকিয়ে বিছানায় উঠে বসলো। এক পলকে দৃষ্টি গোচর হওয়া দৃশ্য দেখে বিস্ময় ফুটে উঠলো ভাব-ভঙ্গিতে।
আয়মানকে উঠে বসতে দেখে নাতাশার মাথায় এলো অন্য বুদ্ধি। ন্যাকা কান্না করে বলল,
"আয়মান, দেখো ও কি করছে! তোমাকে মা*রতে এসেছিলো ও। আমি আটকেছি বলে এখন আমার হাত মুচড়ে ধরেছে।"
আকস্মিক নাতাশার বলা মিথ্যা কথাটায় হতবিহ্বল হয়ে হাত ছেড়ে দিলো প্রিয়ন্তী। নাতাশা নিজের হাতটা সামনে এনে আয়মানের সামনে রেখে কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল,
"দেখো, হাতটা লাল করে দিয়েছে। আর তোমার টি-শার্ট দেখো। র*ক্তে ভিজে লাল হয়ে গিয়েছে। ওকে কি করবে বলো?"
প্রিয়ন্তী বিস্ময়ে স্বল্প হা করে তাকিয়ে রইলো আয়মানের দিকে। নাতাশার থেকে পুরো কথা শুনে আয়মান র*ক্তচক্ষু নিয়ে তাকালো প্রিয়ন্তীর দিকে৷ বিছানা থেকে উঠে দাঁড়িয়েছে ও। গলার স্বর উঁচু করে ঝাঁঝালো কন্ঠে বলল,
"তুমি আমাকে খু*ন করতে চাইছিলে? আমার বাড়িতে থেকে আমার রুমে ঢুকে আমাকেই খু*ন করতে চাইছিলে তুমি? কি ক্ষ*তি করেছি আমি তোমার?"
প্রিয়ন্তীর কদম টলে উঠলো আয়মানের এই অবিশ্বাসে। হাতের ক্ষতের থেকেও ভয়ংকরভাবে ক্ষত-বিক্ষত হলো ওর ক্ষুদ্র হৃদয়। মুহুর্তের মাঝে সব অনুভূতি কর্পূরের ন্যায় উঁবে গেছে। শুধুমাত্র মন-মস্তিষ্ক ছিন্ন-ভিন্ন করে একটা কথাই সেখানে প্রবেশ করলো। "আয়মান ওকে অবিশ্বাস করেছে।"
আয়মান আবারও চেঁচালো,
"কি হলো? উত্তর দাও!"
প্রিয়ন্তী তবুও স্তব্ধ মূর্তির ন্যায় দাঁড়িয়ে রইল। উত্তর দেয়ার প্রয়োজন মনে করলো না। যে মানুষের ওর প্রতি বিশ্বাস নেই, তাকে কিছু বোঝানোর চেষ্টা করাটা বেমানান। তাই নিশ্চুপ থাকাই শ্রেয় মনে করলো। আয়মান যদি ওকে ওমনই ভেবে থাকে, তাতে ক্ষতি কি? এছাড়া সে বললেও তো আয়মানের ধারণা বদলে যাবে না!
আয়মান কোনো উত্তর না পেয়ে অধৈর্য হয়ে পড়লো। কপালে হাত ঘঁষলো খানিক। চোখ বুজে চেষ্টা করলো রাগ নিয়ন্ত্রণ করার। তারপর শান্ত স্বরে বলল,
"প্রিয়ন্তী, তুমি তোমার রুমে যাও। তোমাকে তো আমি কাল দেখে নিবো। ভাবি তোমায় রেখেছে, তাই তোমার পর্দাফাঁসও ভাবির সামনেই হবে। এখন রুমে যাও!"
প্রিয়ন্তীও কথা না বাড়িয়ে মাথা নিচু করে চুপচাপ আয়মানের রুম থেকে বেরিয়ে গেলো। ও বেরিয়ে যেতেই নাতাশা বলল,
"এটা কি করলে তুমি? ওকে কিছু না বলেই রুমে পাঠিয়ে দিলে?"
আয়মান স্বান্ত্বনার সুরে বলল,
"ওকে এখন রুমে পাঠিয়ে দেয়াই উচিত হয়েছে। একবার হামলা করেছে, আরেকবার করতে কতক্ষণ? এইবার আমার উপর করেছে, এরপরের বার তোমার উপর করবে। আমি তোমাকে নিয়ে রিস্ক নিতে চাই না। তাই এখন তোমাকে একা রাখাও যাবে না। এক কাজ করি, তোমাকে আজ রাতে সারা-সায়মার রুমে দিয়ে আসি। আজ রাতের জন্য ম্যানেজ করে নাও।"
নাতাশা ত্রস্থ মাথা নাড়িয়ে বলল,
"না না। সেটার দরকার নেই। আমি একাই ঘুমাতে পারবো।"
আয়মান তবুও মানলো না। টেনেটুনে ওকে নিয়ে গেলো সায়মার রুমের কাছে। গিয়ে দু-তিনবার নক করার পর ঘুমে ঢুলুঢুলু চোখে দরজা খুলল সায়মা। দরজার সামনে এত রাতে আয়মান, নাতাশাকে একসাথে দেখে ঘুম উড়ে গেলো তার। হলরুম থেকে আসা আবছা আলোতে ভুল দেখছে কি না, সেই ভেবে চোখ ডলে পুনরায় তাকালো। স্বল্প আলোতে শুধু তাদের মুখটাই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। এজন্যই আয়মানের টি-শার্টে লেগে থাকা রক্তটাও খেয়াল করলো না সায়মা। বিস্মিত স্বরে বলল,
"এত রাতে তোমরা?"
আয়মান শঙ্কিত দৃষ্টিতে আশেপাশে তাকিয়ে বলল,
"সায়মা, আজ রাতে নাতাশাকে তোদের রুমে রাখ । বাইরে থাকা ওর জন্য বিপদ!"
শব্দ পেয়ে সারারও ঘুম ভেঙে গেছে। চোখ ডলতে ডলতে সে-ও উঠে এসেছে দরজার সামনে। আয়মানের শেষ কথাটুকু শুধু শুনেছে ও। সেই ভিত্তিতেই উত্তর দিলো,
"যে নিজেই বিপদ, তার আবার কি বিপদ হবে?"
আয়মান চোখ রাঙিয়ে ওর দিকে তাকাতেই থতমত খেলো। আমতা-আমতা করে বলল,
"ইয়ে মানে, আমি বলতে চাইছিলাম, আমাদের বাড়িতে কিসের বিপদ?"
নাতাশা বিরক্ত হয়ে নাক-মুখ কুঁচকে ফেলল। তপ্ত শ্বাস ফেলে আয়মানকে বলল,
"আয়মান, আমি এই রুমে থাকবো না। আমি গেস্ট রুমেই যাচ্ছি।"
আয়মান ওর হাত টেনে ধরে ওকে বাঁধা দিলো। অত:পর বলল,
"নাতাশা, তুমি বুঝতে পারছো না! একা থাকা তোমার জন্য বিপদ। তাই আমি আমার বোনদের কাছে রেখে যাচ্ছি। ওদের কাছে তুমি নিরাপদ থাকবে।"
নাতাশা কন্ঠ নামিয়ে বিড়বিড় করে বলল,
"আমার তো মনে হচ্ছে, এদের কাছেই আমি সবচেয়ে বেশি অনিরাপদ।"
নিচু স্বরে বলায় আয়মান সেই কথা শুনতে পায় নি। সে আদেশের সুরে সারা-সায়মাকে বলল,
"যা বলেছি তাই কর। ওকে আজ নিজেদের রুমেই রাখবি। আর ভালোভাবে খেয়াল রাখবি। কোনো দরকার পড়লেই আমাকে কল করবি। আমি জেগেই আছি!"
সায়মা মাথা দুলিয়ে সারাকে বলল নাতাশাকে নিয়ে ভেতরে যেতে। সেও কথামতো আদেশ পালন করলো। অগত্যা নাতাশা বাধ্য হলো সারার সাথে যেতে।
নাতাশা সারার সাথে ভিতরে যাওয়ার পর সায়মা বাইরে থেকে দরজাটা টেনে দিলো। বাইরে এসে সরে এলো সিড়ির দিকে। আলোর রেখার কাছে আসতেই ধীরে ধীরে ফুটে উঠলো আয়মানের টি-শার্টে লেগে থাকা তাজা র*ক্তের দাগ৷ রীতিমতো আঁতকে উঠলো সায়মা। ঘাবড়ানো গলায় জিজ্ঞেস করলো,
"তোমার টি-শার্টে এত র*ক্ত কোত্থেকে এলো ভাইয়া?"
আয়মান হেয়ালির সুরে বলল,
"কেউ একজন আমাকে বাঁচাতে গিয়ে নিজের র*ক্তগুলো এভাবে ঝড়িয়েছে!"
সায়মা অবাক হয়ে বলল,
"মানে? তোমাকে বাঁচাতে গিয়ে র*ক্ত ঝড়িয়েছে? কে সে?"
আয়মান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
"কে আবার? তোর ভাবি।"
সায়মা ভ্রু কুঁচকে ফেলল এই কথায়। চোখ পিটপিট করে জিজ্ঞেস করলো,
"আমার ভাবি? ইউ মিন..."
আয়মান আর কিছু ওকে বলতে দিলো না। ধমক দিয়ে থামিয়ে দিলো মাঝপথে। বলল,
"এত প্রশ্ন করার কি আছে? নাতাশাকে তোদের রুমে রেখেছি দেখেছিস না? ওকে সারারাত দেখে রাখতে হবে। তোদের ঘুম নষ্ট করে ওদের দেখে রাখার মতো গুরুতর দায়িত্বটা তোদের দিতাম না। কিন্তু আমি করতে বাধ্য! বুঝিসই তো, আমি ছেলে আর ও মেয়ে। নজর রাখার জন্য হলেও আমি ওর সাথে সারারাত থাকতে পারবো না। বিষয়টা নিয়ে আর কে কি ভাববে না ভাববে, তার থেকে বড় কথা আমি কি ভাববো? আমার নিজের কাছেই তো দৃষ্টিকটু লাগবে! এজন্য আমি তোদের রুমে পাঠিয়েছি। আজ রাতটা কষ্ট করে খেয়াল রাখ। আর আমি তো আছিই সারারাত খেয়াল রাখার জন্য।"
সায়মা বিরক্ত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
"কিন্তু ওর উপর এত নজরই বা রাখা লাগবে কেনও?"
"কারণ ও একটু আগে আমাকে খু*ন করতে গিয়েছিলো। প্রিয়ন্তী গিয়ে ওই সময় আমাকে না বাঁচালে, আমাকে আর সকালে পেতি না।"
এই কথা শুনে সায়মা থমকে গেলো কিছু সময়ের জন্য। ভাইকে খু*ন করতে গিয়েছিলো কথাটা শুনেই পায়ের তলার মাটি সরে গেলো। অনুভূতিশূণ্য দৃষ্টিতে আয়মানের দিক চেয়ে বলল,
"তোমাকে মা*রতে গিয়েছিলো? আর তুমি এখনও ওকে এ বাড়িতে রাখছো?"
আয়মান বোনের দু বাহুতে হাত রাখলো। শান্ত স্বরে বোঝানোর ভঙ্গিতে বলল,
"হ্যাঁ সায়মা। কারণ ওর থেকেই আমরা জানতে পারবো ফারহানের খবর। আর দ্বিতীয় কথা, এই মুহুর্তে ওর সাথে কোনো খারাপ আচরণ করলে সেটা প্রিয়ন্তীর উপর দিয়ে যাবে। আমি চাই না ও প্রিয়ন্তীর কোনোপ্রকার ক্ষতি করুক। প্রিয়ন্তী আমার রুমে যাওয়ার পরপরই আমার ঘুম ভেঙেছে। তাও আমি ঘুমিয়ে থাকার নাটক করে শুনছিলাম নাতাশার কথা। সব জেনেবুঝেই আমি ওর সাথে এই ব্যবহার করেছি। আর স্বল্প সময়ের জন্য প্রিয়ন্তীর সাথেও খারাপ ব্যবহার করে ফেলেছি!"
সায়মা জিজ্ঞেস করলো,
"তোমাকে খু*ন করতে চাইলো নাতাশা। বাঁচালো প্রিয়ন্তী। আর ওর সাথেই খারাপ ব্যবহার করলে? কি বলেছো ওকে?"
আয়মান বোনের দিকে তাকিয়ে হাসার চেষ্টা করলো। বলল,
"আমি জেগে উঠার পর নাতাশা বলল প্রিয়ন্তী আমাকে খু*ন করতে চাইছে। আমিও ওর সাথে তাল মিলালাম। কথা শুনিয়ে ওকে রুমে পাঠিয়ে দিলাম।"
সায়মা ঝাঁড়ি মেরে বলল,
"তুমি কি হ্যাঁ? ওই মেয়েটা তোমার জন্য কষ্ট পেলো আর তুমি ওকে আবারও কষ্ট দিলে?"
আয়মান ঠোঁট উলটে বলল,
"আমার কি দোষ? ওইসময় ওকে কিছু না বললে নাতাশা ওর ক্ষতি করার চেষ্টা করতে পারতো। তাই তো ওর সামনে প্রিয়ন্তীকে বকে ভুলভাল বুঝিয়ে দিয়েছি। এখন গিয়ে সব বুঝিয়ে বলে দিবো!"
সায়মা দুষ্টুমির সুরে জিজ্ঞেস করলো,
"এত রাতে ওর রুমে যাবে?"
আয়মান নিরুদ্বেগ উত্তর দিলো,
"হ্যাঁ যাবো। আমার টি-শার্টটাও পুরো লাল করে ফেলেছে নিজের হাতের র*ক্তে। রাতটার জন্য ব্যান্ডেজ করে আসি। কাল ডক্টরের কাছে নিয়ে যাবো।"
বলেই আয়মান নিজের রুমের দিকে পা বাড়ালো ফার্স্ট এইড বক্স নেয়ার জন্য। আর সায়মা অবাক চোখে দেখে গেলো ভাইয়ের কর্মকাণ্ড। খানিক বাদেই বুকভরা প্রশান্তি নিয়ে নিজেও গেলো রুমে। এখন সারারাত বসে নাতাশাকে পাহারা দেয়ার পালা!
*******
প্রিয়ন্তী রুমে এসেই দেখেছে সন্ধ্যার কোনো পাত্তা নেই। তাকে ডাকার মতো কাজটাও তার দ্বারা হলো না। এক আকাশ সমান অভিমান দলা পাঁকিয়ে কন্ঠনালীতে আটকে আছে। ঠিক এই কারণে ওর নামটাও বের হলো না মুখ থেকে। সমস্ত অনুভূতি ও বাক্যমালা আজ আহুতি দিয়েছে সেখানেই।
প্রিয়ন্তী চুপচাপ গিয়ে দাঁড়ালো বারান্দায়। হৃদয়ের ক্ষত থেকে হওয়া রক্তক্ষরণ অশ্রুজল রুপে গড়িয়ে পড়ছে আঁখিদ্বয় থেকে। হাত থেকে পড়া র*ক্তের অনুভূতি অল্প খানিকও জায়গা পাচ্ছে না তার মনে।
আয়মান দরজার নব ঘুরিয়ে দেখলো সেটা খোলাই আছে। অতি শোকে প্রিয়ন্তী লকটাও লাগাতে ভুলে গেছে। আয়মানও খুব সন্তপর্ণে চুপিচুপি ঢুকলো রুমে। ড্রিম লাইটের স্বল্প আলোয় দেখলো সন্ধ্যা বিছানার এক পাশে গভীর ঘুমে তলিয়ে। প্রিয়ন্তীর পাশটা ফাঁকা। আয়মান আশেপাশে চোখ বুলিয়েও রুমের কোথাও প্রিয়ন্তীকে দেখলো না। ধারনা করলো হয়তো বারান্দায় আছে।
ফার্স্ট এইড বক্সটা খাটের উপর রেখে নি:শব্দে আয়মান এসে বারান্দার সামনে দাঁড়ালো। নিজের ধারণা সঠিক দেখে সস্থির নিশ্বাস ফেলল। শান্ত স্বরে ডাকলো,
"প্রিয়ন্তী!"
হঠাৎ রুমে আয়মানের কন্ঠস্বর পেয়ে হকচকাল প্রিয়ন্তী। এক পলকের জন্য ভাবলো হয়তো তার মনের অবাস্তব ভাবনা। কিন্তু পরমুহুর্তে পিছে ঘুরে আয়মানকে দেখে তার ভুল ধারনা ভেঙে গেলো। মনে জমা অভিমানগুলো তৎক্ষণাৎ প্রতিবাদ জানিয়ে বলল,
"কেনও এসেছেন আমার কাছে? আপনি তো আমায় খু*নি মনে করেন। তাহলে কেনও এসেছেন?"
কিন্তু মুখ ফুঁড়ে একটা শব্দও প্রকাশ করা হলো না। চুপচাপ মাথা নামিয়ে নিলো। আয়মান কাছে এসে ওর ক্ষত হওয়া হাতটা আলতো হাতে স্পর্শ করলো। কিন্তু প্রিয়ন্তীর মনে জমে থাকা অভিমান এই স্পর্শে কোনো অনুভূতি জাগতে দিলো না। আয়মান রক্তের সমুদ্র দেখে চাঁপা স্বরে ধমকে বলল,
"তুমি কি পাগল? এইভাবে কেউ ছু*রি চেঁপে ধরে? কতখানি রক্ত গিয়েছে, ধারনা আছে তোমার?"
প্রিয়ন্তী উত্তর দিলো না। শুধু তাচ্ছিল্যভরে হাসলো নিজের উপরে। আয়মান এক প্রকার টেনে ওকে রুমের ভেতর নিয়ে গেলো। খাটে বসিয়ে ফার্স্ট এইড বক্স খুলে নিজে হাতের ড্রেসিং শুরু করলো। এইবার কোনো বকাবকি করলো না। ভীষণ নরম সুরে বলল,
"কি দরকার ছিলো আমাকে বাঁচাতে গিয়ে নিজের হাতটা এইভাবে ক্ষত-বিক্ষত করার?"
প্রিয়ন্তী অবাক হলো এই কথায়। অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে চেয়ে বলল,
"আপনি বিশ্বাস করেছেন, আমি আপনাকে মা*রার চেষ্টা করি নি?"
আয়মান তাকালো না প্রিয়ন্তীর দিকে। ওর সম্পূর্ণ মনোযোগ নিবেশিত প্রিয়ন্তীর হাতে। তুলা দিয়ে যত্নসহকারে একটু একটু করে রক্ত মুছে দিচ্ছে৷ বেশ স্বাভাবিকভাবে বলল,
"অবিশ্বাস করলে তো নতুন করে বিশ্বাস করার প্রশ্ন আসবে তাই না? আর যেই মেয়ে আমাকে বাঁচানোর জন্য নিজেকে ক্ষত-বিক্ষত করতে পারে সে কোনোদিন আমার ক্ষতি করার চেষ্টা করবে, এটা আমি কোনোদিনও বিশ্বাস করবো না। স্বয়ং সেই মেয়ে এসে আমাকে বললেও আমি বিশ্বাস করবো না।"