স্নিগ্ধ প্রেমের মায়া

পর্ব - ৩৩

🟢

সূর্যের কিরণে পরিবেশের শীতলতা ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। পাখিদের কলকাকলি ভেসে আসছে বাতাসের সাথে সাথে। আয়মান ড্রাইভিং সিটে বসে একমনে সামনের দিকে তাকিয়ে আছে। প্রিয়ন্তী এসে বসলো পাশের সিটে। সিটবেল্ট লাগাতে লাগতে বলল,

"চলুন।"

আয়মান এক ধ্যানে পথের দিকে তাকিয়ে। প্রিয়ন্তীর কথা তার কান অব্দি পৌঁছায় নি। প্রিয়ন্তী এবার গলার স্বর কিছুটা উঁচু করে বলল,

"কি হলো? যাবেন না?"

আয়মান হুশে ফিরে ত্রস্থ ওর দিকে তাকালো। বলল,

"ওহ, তুমি এসে পড়েছো?"

প্রিয়ন্তী চোখ ছোট ছোট করে বলল,

"কেনও? আপনি দেখেন নি? কার খেয়ালে ডুবে আছেন শুনি? আপনার আনারকলির?"

আয়মান রাগান্বিত দৃষ্টিতে ওর দিক চেয়ে বলল,

"আবার আনারকলি কোত্থেকে আসলো?"

প্রিয়ন্তী আঙুল দিয়ে ওর মাথার দিকে ইশারা করে বলল,

"আপনার মাথা থেকে এসেছে। ওর ভাবনা ভাবছেন বলেই আমি বলেছি।"

আয়মান জবাব না দিয়ে সামনে তাকিয়ে গাড়ি স্টার্ট করলো। গাড়ি চলতে শুরু করলো সকালের ঝঞ্ঝাটবিহীন রাস্তায়। প্রিয়ন্তী এখনও আয়মানের জবাবের অপেক্ষায়। কিন্তু সে নিশ্চুপ। প্রিয়ন্তীর সহ্য হচ্ছে না এই নিশ্চুপতা। উসখুস করছে কথা বলার জন্য। শেষমেশ বলে ফেলল,

"কথা বলছেন না কেনও? জানেন তো, নীরবতাই সম্মতির লক্ষ্মণ। তার মানে আপনি এতক্ষণ ওর কথাই ভাবছিলেন।"

আয়মান বিরক্ত হয়ে বলল,

"তুমি কি নাতাশাকে ছাড়া আর কোনো টপিক খুঁজে পাও না?"

প্রিয়ন্তী মুখের উপর বলল,

"না পাই না। নিজের প্রেমিকার নামে অন্য কেউ কিছু বললে সেটা সহ্য হয় না?"

আয়মান বলল,

"তোমাকে কয়বার বলতে হবে, ও আমার প্রেমিকা না।"

প্রিয়ন্তী মুখ বেঁকিয়ে বলল,

"আপনি বললেই হলো? দেখলাম তো সেদিন, এনগেজমেন্ট করার জন্য কি তাড়াহুড়ো করলেন।"

আয়মান রাগ চেঁপে রাখতে পারছে না। কই ভাবে, একা দুইজন সুন্দরভাবে সময় পার করবে। কিন্তু প্রত্যেকবারই ঝগড়া লেগে যায়। তবুও ঠান্ডা মাথায় বলল,

"ওটা দরকার ছিলো। নাতাশার উদ্দেশ্য বের করতে। কাজ তো হয়েছে। ও আমাকে মেরে ফেলবে। এটাই ওর উদ্দেশ্য।"

প্রিয়ন্তী কেঁপে উঠে বলল,

"বললেই হলো, মেরে ফেলবে? এত সহজ নাকি?"

এই কথায় স্বল্প হাসি ফুটে উঠলো আয়মানের ঠোঁটে। পরমুহুর্তেই গম্ভীরতার আড়ালে হাসি লুকিয়ে বলল,

"এখন তো শুধু উদ্দেশ্য জানা গেলো। দেখি উদ্দেশ্যের পিছনে কারণটা কি! এজন্য ওর উপর নজর রাখতে হবে।"

প্রিয়ন্তী ভ্রু উঁচিয়ে বলল,

"মেয়েদের উপর নজর রাখার আপনার ভীষণ শখ, তাই না? বিশেষ করে সেই মেয়ে যখন নাতাশা হয়। এটার মধ্যে কোনো আলাদা মজা আছে নাকি?"

আয়মান ভ্রুক্ষেপহীন বলল,

"হ্যাঁ, মজা আছে। তুমিও ট্রাই করতে পারো?"

প্রিয়ন্তী সন্দিহান দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,

"আপনি বলতে চাইছেন আমি ছেলেদের উপর নজর রাখবো? আচ্ছা, কোন ছেলেকে দিয়ে শুরু করবো?"

আয়মান রেগে গিয়ে ঝাঁড়ি মেরে বলল,

"আমি নাতাশার উপর নজর রাখার কথা বলেছি, প্রিয়ন্তী। কোনো ছেলের উপর না। সবসময় উল্টাপাল্টা কথা!"

প্রিয়ন্তী কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

"আপনার প্রেমিকার উপর আমি কেনও নজর রাখতে যাবো? নজর রাখলে সে মনে করবে, আমি তাকে নিয়ে জেলাস!"

আয়মান দৃষ্টি সামনে রেখেই প্রশ্ন করলো,

"জেলাস না?"

প্রিয়ন্তী ভড়কে গেলো এই প্রশ্নে। আয়মান কি উত্তর চাইছে সেটা পরিষ্কার বুঝতে পারলো। কিন্তু সে উত্তর দিলো উল্টোটা। বলল,

"একদমই না। জেলাস হওয়ার মতো ওর কাছে কি আছে? শুধু কিছু ফাও এটিটিউড। এসবকে প্রিয়ন্তী পাত্তা দেয় না!"

আয়মান সঠিক সময়ে সঠিক প্রশ্ন করে বসলো,

"যদি জেলাস ফিল না-ই করো তবে সারাদিন আপনার আনারকলি, আপনার আনারকলি বলে আমার মাথা নষ্ট করো কেনও?"

প্রিয়ন্তী দুষ্টু হেসে আস্তে করে বলল,

"আপনার মাথা নষ্ট করতে ভালো লাগে।"

কন্ঠ নামিয়ে কথাটা বললেও ঠিকই আয়মানের কান অব্দি পৌছে গেছে। সে উদ্বেগহীন প্রশ্ন করলো,

"মানুষের মাথা নষ্ট করা কি তোমার শখ? বিশেষ করে যখন মাথাটা আমার হয়। এটায় কি আলাদা কোনো মজা আছে?"

তার প্রশ্ন তাকেই ফিরিয়ে দেয়ার কটমট করে আয়মানের দিকে চাইল প্রিয়ন্তী। দাঁতে দাঁত চেঁপে বলল,

"আমার কথা আমাকেই ফিরিয়ে দিচ্ছেন? তাহলে আমিও আপনার উত্তরটাই ফিরিয়ে দেই, হ্যাঁ মানুষের মাথা নষ্ট করতে ভীষণ মজা।"

আয়মান বিরক্তি চেঁপে বলল,

"ইউ নো হোয়াট? নাতাশা তোমার থেকে অনেকগুন ভালো। কমপক্ষে বকবক করে আমার মাথা তো নষ্ট করে না। একটু শান্তিতে ড্রাইভও করতে দিচ্ছো না। এভাবে আমার মনোযোগ নষ্ট করলে, দুর্ঘটনা ঘটতে বেশি সময় লাগবে না।"

প্রিয়ন্তী তেঁতে উঠে বলল,

"হয়েছে? নাতাশা, নাতাশা নাম জঁপা হয়ে গেলে আমি কিছু বলি? রাস্তা-ঘাটে দুর্ঘটনা আমার জন্য ঘটবে না। দুর্ঘটনা ঘটবে আপনার নাতাশার খেয়ালে ডুবে থাকার কারণে। বুঝতে পেরেছেন?"

আয়মান ক্রোধে ফুলে বলল,

"নাতাশা, নাতাশা নাম আমি জঁপছি না তুমি? এসেছো থেকে নাতাশা, নাতাশা করেই যাচ্ছো!"

প্রিয়ন্তী কোনোভাবেই হার মানবে না। সেও চেঁচিয়ে বলল,

"আমার বয়েই গেছে ওর নাম জপতে! ওসব আপনার কাজ। আপনার আনারকলি কি না!"

আয়মান এক প্রকার চিৎকার করে বলল,

"প্রিয়ন্তী!"

এক ধমকে প্রিয়ন্তী মিইয়ে গেলো। মিনমিন করে বলল,

"এভাবে চেঁচাচ্ছেন কেনও? আমি শুনতে পাই তো!"

আয়মান বলল,

"তুমি চুপ থাকো। তাহলেই আর আমি চেঁচাবো না।"

প্রিয়ন্তী মাথা নেড়ে বলল,

"সেটাই তো হয় না৷ এমনিতেই আমি কম কথা বলি। তার উপর আপনি চুপ থাকতে বলেন৷ আমার বাকস্বাধীনতা কেড়ে নিতে চান?"

আয়মান হঠাৎ গাড়িতে গতিতে ব্রেক কষলো। হুট করে থেমে যাওয়ায় সামনের দিকে হুমড়ি খেয়ে পড়তে নিলো প্রিয়ন্তী। আয়মান তৎক্ষণাৎ শক্ত করে চেঁপে ধরলো ওর বাহু। পড়তে দিলো না। পরমুহুর্তেই ঘুরালো নিজের দিকে। দু'বাহু পেঁচিয়ে দূরত্ব ঘুঁচিয়ে কাছে টানলো।

কাছাকাছি আসার দরুণ বিস্ময়ে চোখ বড়বড় করে ফেলেছে প্রিয়ন্তী। দু'জনের নিশ্বাসে নিশ্বাস মিলিত হওয়ার মতো কাছাকাছি আসা। আয়মানের এমন হুটহাট ব্যবহার বিভ্রান্ত করে ফেলে তাকে। চেঁপে যেতে চাইলো পিছনে। কিন্তু পারলো না। আমতা-আমতা করে বলল,

"কি করছেন কি? ছাড়ুন আমাকে!"

আয়মান তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চেয়ে আছে ওর দিকে। এতেই যেনও প্রিয়ন্তী আরও গুলিয়ে ফেলছে নিজেকে। বড় বড় চোখগুলো পলক ফেলছে বারবার। ওকে যেনও আরও বিভ্রান্ত করতে আয়মান বলল,

"বাকস্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ার কথা বলছো? এখনও নেই নি। তবে তুমি চাইলে এখনই চেষ্টা করতে পারি।"

প্রিয়ন্তীর লজ্জায় হাবুডুবু খাওয়া মন খুঁজে ফেরে কথার মানে। কিন্তু বুঝে পায় না, আয়মান কি বলতে চাইলো! নিজেকে ছাড়ানোর জন্য মোচড়ামুচড়ি করতে করতে বলল,

"চেষ্টা করবেন মানে?"

আয়মান যেরকম হুট করে কাছে টেনেছে, সেরকম হুট করেই দূরে সরে বসলো। ভদ্রভাবে নিজের সিটে বসে বলল,

"পরে বলবো। এখন ক্লিনিক এসে গেছে। নামো, আগে তোমাকে ডক্টর দেখিয়ে নেই।"

********

সকাল ১১ টায় ঘুম ভাঙলো নাতাশার। উঠে দেখলো, সায়মা খাটে বসেই ফোন টিপছে। সে উঠতেই মিষ্টি হেসে সম্ভাষণ জানালো, "গুড মর্নিং।"

নাতাশাও কোনোরকম হাসি টেনে বলল,

"গুড মর্নিং।"

সায়মা বলল,

"ঘুম পূরণ হয়েছে? তাহলে ফ্রেশ হয়ে নিচে আসো। নাস্তা দিচ্ছি।"

সায়মা উঠে নিচে যেতে নিলো। দরজা অব্দি যাওয়ার পর নাতাশা পিছু ডেকে প্রশ্ন করলো,

"আয়মান কই?"

সাথে সাথে সায়মার মুখের হাসি দপ করে নিভে গেলো। বিড়বিড়িয়ে বলল,

"শুরু হয়ে গেলো আয়মান, আয়মান! যত্তসব বিরক্তিকর!"

নাতাশা উত্তর না পেয়ে আবারও বলল,

"কি হলো? আয়মান কই?"

সায়মা কিছুক্ষণ ভেবে কথা সাজিয়ে বলল,

"আয়মান ভাইয়া বাইরে গিয়েছে। আসতে একটু দেরি হবে।"

"আর প্রিয়ন্তী?"

সায়মা এবার ভাবনাবিহীন বলে বসলো,

"ওরা চলে গেছে।"

কথাটা বলার পর সায়মার মনে পড়লো আয়মান একটু পরেই প্রিয়ন্তীকে নিয়ে বাসায় ফিরে আসবে। তখন কি জবাব দিবে?

তবে নাতাশা স্বস্তি পেলো এই কথায়। সায়মাও ঘুরে হাঁটা দিলো বাইরে। যেতে যেতে মনে মনে ভাবলো,

"প্রিয়ন্তীকে নিয়ে আসার পর কি বলবে ওইটা ভাইয়াই বুঝবে। আমি ওসব ভেবে কি করবো? ও রাখবে ও বুঝুক। আমাকে যে কেন টেনশন দিয়ে যায়!"

********

সায়মা নিচে নেমে প্রিয়াকে বলল নাতাশার কথা। অত:পর বলল,

"যাও, ভাইয়াকে গিয়ে বলো এই কাহিনি। আর জিজ্ঞেস করো এবার কি করবে?"

প্রিয়া মাথা নাড়িয়ে চলে গেলো উপরে। রুমে ঢুকে দেখলো আয়ান বিছানায় বসে খুব মনোযোগ দিয়ে ফোনে কিছু একটা করছে। ও গিয়ে আয়ানের সামনে বসে বলল,

"শুনুন, নাতাশা উঠে গেছে। আর উঠেই আয়মান, প্রিয়ন্তীর খোঁজ করছে। আপনার মনে হয় না, প্রিয়ন্তীকে এই বাসায় দেখলো ও বুঝে যাবে ওর ষড়যন্ত্র ওর বিরুদ্ধেই কাজ করছে?"

আয়ান ফোন সাইডে রেখে প্রিয়ার দিকে তাকালো। সে কৌতুহলী দৃষ্টিতে চেয়ে আছে তার দিকে। আয়ান ওকে কাছে টেনে উল্টোদিকে ঘুরিয়ে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরলো। নিজের বুকে প্রিয়ার পিঠ ঠেকিয়ে উদরে হাতের স্পর্শ রাখলো। প্রিয়া আবেশে চোখ বুজে ফেলল। অনুভূতির প্রজাপতিরা যেনও পেটে সুড়সুড়ি দিতে শুরু করেছে। আয়ান ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,

"কবে শেষ হবে এইসব ঝামেলা? এদের জন্য শান্তিমতো একটু প্রেম করার সময়-সুযোগও হয়ে উঠছে না।"

প্রিয়া আয়ানের হাতের উপর হাত রেখে বলল,

"সমস্যা তো লন্ডনে আরামে ছিলো। আপনার ভাই-ই তো সাথে করে নিয়ে এলো।"

আয়ান বলল,

"নিজের ঝামেলা তো করেছেই! সাথে আমাদেরও শান্তি হরণ!"

প্রিয়া চোখ খুলে আয়ানের দিক মুখ ঘুরিয়ে চাইল। উৎফুল্লতার সাথে বলল,

"আপনার মনে হয় না, ওদের মধ্যে কিছু একটা আছে? মানে এই দেখুন, ওদের এইভাবে এনগেজমেন্ট হয়ে যাওয়া। প্রিয়ন্তীর আয়মানকে বাঁচানো। তারপর আয়মানের ওর প্রতি এত্ত কেয়ার! সবকিছু কিন্তু একটা দিকেই ইঙ্গিত করছে।"

আয়ান মুচকি হেসে বলল,

"আর তুমি যেটা বুঝেছো, সেটা যদি সত্যি হয় তো তুমি খুশি হবে?"

প্রিয়া বলল,

"খুউউব! প্রিয়ন্তীকে নিজের জা হিসেবে পেয়ে যাবো। ভালো হবে না?"

আয়ান বলল,

"অবশ্যই ভালো হবে। এখন দেখি, ওরা দুইজন কি করে!"

"যেটা বলতে এলাম, সেটাই তো বললাম না! নাতাশার কি করবো এখন?"

আয়ান প্রিয়ার গালে ছোট্ট করে চুমু খেলো। পরপর ওর গালে নিজের গাল ঘঁষতে ঘঁষতে বলল,

"নাতাশার কথা বেশি ভাবতে হবে না। ওর স্বার্থ থাকলে ও নিজের শখেই এখানে থাকবে। দেখতে থাকুন।"

প্রিয়া উসখুস করে বলল,

"এবার ছাড়ুন। নাতাশা নিচে এসে পড়েছে। আমিও যাই।"

আয়ান এক বাক্যে ছেড়ে দিলো ওকে। প্রিয়া উঠে দরজা পর্যন্ত গিয়ে আবার ঘুরে তাকালো। বলল,

"টেবিলে এক পেয়ালা পায়েস এখনও রাখা আছে। এনে দিবো? খাবেন?"

আয়ান হ্যাঁ সূচক মাথা নেড়ে বলল,

"আচ্ছা আনো।"

*******

প্রিয়া নিচে নেমে দেখলো নাতাশা ইতিমধ্যেই নিচে চলে এসেছে। সায়মা ওকে নাস্তা দিয়ে চলে গেছে। পুরো টেবিলে নাতাশা একা বসে খাচ্ছে। প্রিয়া ওকে দেখে হেসে এগিয়ে এলো। টুকটাক কথা বলে যখনই পায়েসের পেয়ালাটা নিতে নিলো, তখনই রান্নাঘর থেকে পারভিনের ডাক ভেসে এলো। সে পায়েসটা না নিয়েই ছুটলো রান্নাঘরে। কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে দেখলো নাতাশা কারো সাথে ফোনে কথা বলছে। তাই কথা না বাড়িয়ে পেয়ালাটা নিয়ে চলে গেলো উপরে।

*******

আয়মান আর প্রিয়ন্তী মাত্রই ক্লিনিক থেকে বেরিয়েছে। ডক্টর প্রিয়ন্তীর হাত আবারও ড্রেসিং করে কিছু ওষুধ লিখে দিয়েছে। প্রিয়ন্তী এই ওষুধের কথা শুনেই বিশাল হতাশায় ভুগছে। খালামনির বাড়িতে থাকলে হয়তো এই ঝামেলা থেকে বেঁচে যেত। কিন্তু আয়মানের হাত থেকে বাঁচা অসম্ভব! এখন নিজেকে নিজেরই চড় মারতে ইচ্ছা করছে, কেনও থেকে গেলো আয়মানদের বাড়িতে?

আয়মানের গাড়িটা রাস্তার অপরপাশে সাইড করে রাখা। আয়মান দাঁড়িয়ে প্রিয়ন্তীকে বলল,

"তুমি গাড়িতে গিয়ে বসো। আমি মেডিসিনগুলো নিয়ে আসছি।"

প্রিয়ন্তী মাথা নাড়িয়ে সায় জানালো। তখনও তাদের চক্ষুগোচর হয় নি একটি ট্রাক, যেটি তাদের অপেক্ষাতেই দাঁড়িয়ে। ট্রাকের ভিতর বসে থাকা ব্যক্তির গম্ভীর আলাপ চলছে কারো সাথে।

"সায়মা বলেছে, প্রিয়ন্তী সকাল সকাল বাড়ি চলে গেছে? কিন্তু আমি তো দেখছি ও আয়মানের সাথে আছে। হাতে ব্যাথা পেয়েছে, সেটার জন্যই ডক্টর দেখাতে এসেছে। কি করবো, নাতাশা? তোমার পথের কাঁটাকে উড়িয়ে দিবো এই মুহুর্তে?"

ওপাশ থেকে সম্মতিসূচক ধ্বনি শুনতেই সে বাঁকা হেসে কল কাটলো। ইঞ্জিন চালু করে সামনে আগালো। বেখেয়ালী প্রিয়ন্তীর সেদিকে খেয়াল নেই। আয়মানকে রেখেই পা বাড়িয়েছে সামনে। তৎক্ষণাৎ ধেয়ে আসলো ট্রাক। সেদিকে তাকিয়ে ভয়ে রুহ উড়ে গেলো প্রিয়ন্তীর। আতঙ্কে ভুলে গেলো সরতেও। মৃত্যুকে চোখের সামনে দেখে একটা চিৎকার দিয়ে মুহুর্তেই জ্ঞান হারালো।

আয়মান ট্রাকের এগিয়ে আসার শব্দ পেয়েই এক মুহুর্তও দেরি করে নি। এক টানে প্রিয়ন্তীকে নিয়ে এসেছে রাস্তার সাইডে। প্রিয়ন্তী জ্ঞান হারিয়েছে ওর বুকেই।

ট্রাকের ভেতর থাকা ব্যক্তি উদ্দেশ্যে ব্যর্থ হলো। ট্রাক চাঁপা দেয়ার ঠিক আগ-মুহুর্তে আয়মান প্রিয়ন্তীকে সরিয়ে ফেলেছে। পিছে ফিরে একবার দেখে নিলো ওদের দুজনকে ক্ষোভে জোরেশোরে লাত্থি মারলো গাড়িতে। প্রত্যেকবারই ব্যর্থ হচ্ছে তারা!

********

প্রিয়া পায়েসের পেয়ালাটা আয়ানের হাতে দেওয়ার পর আয়ান বলল,

"প্রিয়া, একটু ঠান্ডা পানি এনে দিবে?"

"হ্যাঁ। এনে দিচ্ছি।"

দু'মিনিট পরে প্রিয়া ঠান্ডা পানির গ্লাস হাতে ফিরে এলো। ঘরে ঢুকতেই চক্ষুগোচর হওয়া দৃশ্য দেখে বরফ-শীতল স্রোত বয়ে গেলো শিরদাঁড়া বেয়ে৷ হৃৎস্পন্দন থমকে গেলো কিছু সময়ের জন্য। পানির গ্লাস ছুটে পড়ে গেলো হাত থেকে। গ্লাস পড়ে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়লো রুমে। চিৎকার ছুড়লো জোরে,

"আয়ান..!"

স্নিগ্ধ প্রেমের মায়া গল্পটি তিয়াশা চৌধুরী-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক ও রোমান্টিক থ্রিলার গল্প