"তুই নি:সন্দেহে প্রেমে পড়েছিস, ভাই!"
আয়মান বিরক্ত হলো আয়ানের এই বারবার একই কথায়। তপ্ত শ্বাস ফেলে বলল,
"কি বারবার তোতাপাখির মতো একই বুলি আউড়ে যাচ্ছো? সমস্যা কি তোমার?"
আয়ান মাথা নাড়িয়ে বলল,
"সমস্যা আমার না, সমস্যা তোর। প্রেমে পড়াটা একটা বিশাল বড় সমস্যা!"
"তাহলে তো তুমি নিজেও সমস্যায় আছো। তো নিজের সমস্যা দেখো না। আমার পিছে কেনও পড়ে আছো?"
আয়ান হতাশ শ্বাস ফেলে বলল,
"মানুষ যে প্রেমে পড়লে অন্ধ হয়ে যায়, তার জ্বলজ্যান্ত প্রমান আমার ভাই। আরে ভাই, আমি তোর সামনে দাঁড়িয়ে আছি। পিছে কোথায় দেখলি?"
আয়মান অন্যদিকে ফিরে চুপ করে রইলো। আয়ানের উদ্ভট কথাবার্তার উত্তর দেয়ার কোনো আগ্রহ তার মধ্যে নেই। কিন্তু আয়ান নাছোড়বান্দা। সে আবারও বলল,
"স্বীকার কর আয়মান!"
আয়মান বিরক্তিতে 'চ' সূচক শব্দ করে বলল,
"কি স্বীকার করবো? ও কাল রাতে আমাকে মরতে মরতে বাঁচিয়ে নিয়েছে। তাই ওর খেয়াল রাখাটাও আমার দায়িত্ব তাই না? এর মধ্যে প্রেম কই পাচ্ছো?"
আয়ান ঠোঁট উলটে বলল,
"আমার ভাই তো মহা দায়িত্বশীল হয়ে যাচ্ছে। শুধু দায়িত্ব। কোনো প্রেম নেই।"
আয়মান দু'পাশে মাথা নাড়লো। পরপর আয়ানকে অবাক করে দিয়ে বলে বসলো,
"প্রেম নেই। ভালোবাসা আছে।"
আয়মানের সহজ স্বীকারোক্তি শুনে ভড়কে গেলো আয়ান। ভাবেও নি, এত দ্রুত আয়মান স্বীকার করে নিবে। টালমাটাল মস্তিষ্ক ভুল প্রশ্ন করে বসলো,
"প্রেম নেই, ভালোবাসা আছে?"
আয়মান বুক ফুলিয়ে বলল,
"হ্যাঁ আছে। প্রেম তো শুধু একটা সম্পর্কের নাম মাত্র। প্রেমে তিক্ততা আসতে পারে। প্রেম শেষ হতে পারে। তবে ভালোবাসা শেষ হওয়ার নয়। ভালোবাসায় তিক্ততা আসে না। বরং যত দিন যায় ভালোবাসার পরিমাণ বাড়তেই থাকে। আর সাধারণত প্রেম বলতে যেটাকে বোঝায়, আমাদের মধ্যে সেরকম কিছুই নেই। শুধু এতটুকু জানি, আই জাস্ট ফিল সামথিং ফর হার!"
আয়ান অবাকের পর অবাক হচ্ছে আয়মানের কথায়। তবুও যথাসম্ভব ভাব-ভঙ্গি স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করলো। আয়মানের কাঁধ চাপড়ে বলল,
"গুড! দিনে দিনে ভাই আমার কাব্যিক কথাবার্তা শিখে যাচ্ছে। তবে এইটা ভালো খবর। প্রেমে পড়লে এইসব মানুষ আপনা-আপনি শিখে যায়।"
আয়মান আয়ানের খোঁচায় পাত্তা দিলো না। নিরুদ্বেগ ভঙ্গিতে বলল,
"জানানোর জন্য ধন্যবাদ। তবে তুমি জানানোর আগেই আমি জেনে গেছি।"
আয়ান উৎফুল্ল স্বরে বলল,
"ওয়াও! কবে জানলি?"
আয়মান কাধ উঁচিয়ে বলল,
"জানি না। যা হয়েছে সব হঠাৎ করে হয়ে গেছে। তাই এনগেজমেন্টের সময় ওকে সামনে দেখে ভাবলাম ওর সাথেই এনগেজমেন্টটা করে ফেলি।"
আয়ানের উৎফুল্লতার হাসি দপ করে নিভে গেলো। স্তব্ধ দাঁড়িয়ে বলল,
"এত কিছু মাথায় নিয়ে ঘুমাস কেমনে?"
আয়মান বলল,
"এতকিছু মাথায় নিয়েও ঘুম এসে পড়ে। এই দেখো না, কাল রাতে একটু ঘুমিয়ে কি কাহিনিটাই না হয়ে গেলো! যাই হোক, কাল রাতের কাহিনি বাদ দেই। বিপদ এখনও মাথার উপর আছে। তোমার আজ অফিস যাওয়া লাগবে না। আমি প্রিয়ন্তীকে নিয়ে একটু পর ডক্টরের কাছে যাবো। বাসার সবার খেয়াল রেখো।"
আয়ান মাথা নাড়িয়ে বলল,
"আচ্ছা।"
*******
আয়ান আয়মান নিচে নেমে দেখলো ড্রইং রুমে সবার সাথে সন্ধ্যাও আছে। বড়রা কাজে ব্যস্ত। তারা তিনজন বোঝাতে চাইছে প্রিয়ন্তীকে তাদের বাড়িতে রাখার কথা। কিন্তু সন্ধ্যা প্রত্যেকবারই না করে দিচ্ছে। আয়মান ড্রইং রুমে ঢুকতেই শুনলো সন্ধ্যার কথা,
"না না। এক রাত থেকেছি বলে আরও কয়েকদিন? কোনোভাবেই সম্ভব না। যদি বিপদের কথা বলিস তো প্রিয়ন্তীকে বাড়ি থেকে বের হতে দিবো না আমরা। তাও ওকে নিয়েই যেতে হবে।"
প্রিয়া বলল,
"ব্যাপারটা যত সাধারণ ভাবে নিচ্ছিস ততটাও সাধারন নয়, সন্ধ্যা। তুই এত টেনশন কেনো নিচ্ছিস? আমরা আছিস না?খেয়াল রাখবো তো ওর।"
সন্ধ্যা বলল,
"দেখ ভাই, আমি অতসব জানি না। আমার মা কোনোভাবেই দিবে না। বড় কথা ও আমার খালামনির মেয়ে। উনি যদি জানতে পারে যে প্রিয়ন্তী এখানে থাকছে তাহলে ভীষণ রাগ করবে।"
আয়মান সব শুনে বরফ-শীতল কন্ঠে বলল,
"আশ্চর্য! তোমার বোনকে কয়েকদিন আমাদের বাড়িতে রাখতে হলে কি এখন আমার ওকে বিয়ে করতে হবে?"
সন্ধ্যা ঠান্ডা স্বরের এরকম প্রশ্নে থতমত খেয়ে পলক ফেলতে ভুলে গেলো। কিন্তু বাকিরা স্বাভাবিক। ওরা খুব ভালো করে আয়ান, আয়মান দুজনেরই স্বভাব জানে। তাই নতুন করে অবাক হওয়ার মতো কিছু নেই। শুধুমাত্র সন্ধ্যাই এরকম পরিস্থিতির স্বীকার প্রথমবার হচ্ছে। প্রথমবার বিস্ময়ে চুপ হয়ে গেলেও পরমুহুর্তে বিড়বিড় করে বলল,
"প্রিয়ন্তী এতদিন ধরে এরসাথে কাজ করছে কিভাবে? এরকম বাকশক্তি হরণ করা কথা বললে আদ্যো এরকম মানুষের সাথে থাকা যায়?"
আয়মান ওকে চুপ দেখ ভ্রু কুঁচকে বলল,
"এনি প্রবলেম?"
সন্ধ্যা কোনোরকম হাসি টেনে বলল,
"অনেক প্রবলেম।"
তখন প্রিয়ন্তী ঢুকলো ড্রইংরুমে। বলল,
"কারো কোনো প্রবলেমে পড়তে হবে না। আমি এখানেই থাকবো। সবাইকে এত বিপদে ফেলে রেখে আমি পালাবো? এত ভীতু আমি নই!"
সন্ধ্যা জানতো প্রিয়ন্তী এরকম কিছুই বলবে। তাই প্রিয়ন্তী উঠার আগেই কথা শেষ করতে চাইছিলো। কিন্তু হলো না। আর হবেও না! প্রিয়ন্তী জেদ ধরে বসলে সবাই মানতে বাধ্য। তবুও ওকে বোঝানোর শেষ চেষ্টা করলো,
"প্রিয়ু, সমস্যাটা আমার নয়। সমস্যাটা খালামনির। উনি জানতে পারলে খুব রাগ করবে।"
প্রিয়ন্তী বলল,
"তাহলে আমি এখনই ভাইয়াকে ফোন করে বলে দিচ্ছি।"
সন্ধ্যা মানা করার আগেই প্রিয়ন্তী কল লাগালো পিয়াসের নাম্বারে। হতাশ হয়ে হাল ছাড়লো সন্ধ্যা। পিয়াস ফোন ধরতেই প্রিয়ন্তী বলল,
"হ্যালো ভাইয়া। গুড মর্নিং!"
পিয়াসও হাসিমুখে সম্ভাষণ জানালো,
"গুড মর্নিং। আজ এত সকাল সকাল যে?"
প্রিয়ন্তী বলল,
"খুব দরকার আছে ভাইয়া। আমি কিছুদিন এই বাড়িতে প্রিয়া আপুর সাথে থাকতে চাই। আপুও আমাকে রাখতে চাইছে। কিন্তু সন্ধ্যা আপু দিচ্ছে না। তুমি একটু বলবে যেনও পারমিশন দেয়?"
পিয়াস হতচকিত প্রিয়ন্তীর এমন আবদারে। ধমকের সুরে বলল,
"তোর মাথা ঠিক আছে, প্রিয়ু? তুই ওই বাড়িতে কেনও থাকতে যাবি?"
"দরকার আছে ভাইয়া। আপুদের অনেক বিপদ ওই নাতাশাকে নিয়ে। এমন বিপদে আমি ওদের হেল্প করতে চাই। না করো না প্লিজ!"
পিয়াস কিছুক্ষণ ভেবে বলল,
"না থেকে কি হেল্প করা যায় না?"
প্রিয়ন্তী জোর দিয়ে বলল,
"না। আমি বলেছি থাকবো তো থাকবো। কয়েকটা দিনের ব্যাপার। ম্যানেজ করে নাও সবাইকে। আর বেশি চিন্তা করো কেনও? প্রিয়া আপু তো আছেই। একটু আপুর সাথেই কথা বলে নাও!"
প্রিয়া হতবাক হয়ে চাইল প্রিয়ন্তীর দিকে। এহেন প্রস্তাবে ভড়কে গেছে ও। বিস্মিত পল্লব ঝাঁপটে ইশারায় বোঝালো, আমি কথা বলবো?
প্রিয়ন্তী কোনোদিক না ভেবেই এমন প্রস্তাব রেখেছে। সে ভালো করেই জানে পিয়াস ঠিক কতটা অধীর আগ্রহে আছে প্রিয়ার সাথে একটিবার কথা বলার জন্য। তাই প্রথম সুযোগেই নিরাশ করতে চাইলো না। এই বাহানায় যদি একটু প্রশান্তি পায়, ক্ষতি কি?
পিয়াসও ভুলে গেলো উত্তর দিতে। বাকহীন চুপচাপ দাঁড়িয়ে বুঝলো হৃৎপিণ্ডের অন্দরের ঝড়। প্রিয়া যখন হারিয়েছে, তখন ঠিকঠাক কথা বলা শিখে নি। শুধু অস্পষ্ট কয়েকটা শব্দ উচ্চারণ করতে পারতো। সেই হিসেবে জীবনের ২১ টা বছর পর প্রথমবারের মতো ছোট বোনের সাথে কথা বলবে ও। মস্তিষ্ক উত্তেজনায় অস্থির হয়ে পড়েছে।
প্রিয়ন্তী পিয়াসের নীরবতাকেই সম্মতি ধরে নিয়ে ফোন বাড়িয়ে দিলো প্রিয়ার দিকে। প্রিয়া একবার ফোনের দিকে তাকিয়ে কাঁপা হাতে ফোনটা ধরলো। কানে নিয়ে রিনরিনে কন্ঠে উচ্চারণ করলো,
"আসসালামু আলাইকুম, ভাইয়া!"
ভাইয়া ডাকটায় পিয়াসের ভেতরকার অস্থিরতার ঝড় তৎক্ষণাৎ থেমে গেলো। প্রশান্তিতে চোখ বুজে ফেলল ও। পরপর ধাপ করে বসে পড়লো খাটের উপর। কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ থেকে শুধুমাত্র অনুভব করলো বোনের মুখের ভাইয়া ডাকটা।
পুরুষ মানুষের কাঁদতে নেই। তাই বলে যে পুরুষ মানুষের অনুভূতি নেই, এমনটা নয়। কিছু সময় খুশির আতিশায্যে কান্নারা আপনা-আপনি বেরিয়ে আসে। তেমমই খুশির প্রমাণস্বরূপ দু'ফোটা অশ্রু পিয়াসের চোখ থেকে বেরিয়ে পড়লো। স্বজনী ওর পাশে বসা। ও কাঁধে হাত রাখতেই পিয়াস হুশে আসলো। নড়ে-চড়ে বলল,
"ওয়ালাইকুম আসসালাম, প্রিয়া আপু। ভালো আছো?"
প্রিয়ার বুকে হঠাৎ ঢিপঢিপ শব্দ শুরু হয়েছে। আকস্মিক পিয়াসের আন্তরিক তুমি সম্বোধন শুনে অবাক হলো। নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
"জি ভাইয়া, ভালো আছি। আপনি?"
পিয়াস বলল,
"এতক্ষণ যতটুকু ভালো ছিলাম, এখন তার থেকে কয়েকগুন বেশিই ভালো আছি।"
প্রিয়া বুঝলো না পিয়াসের কথার মানে। চোখ পিটপিট করে চাইল প্রিয়ন্তীর দিকে। এদিকে স্বজনী প্রিয়ার নাম শোনার সাথে সাথেই এক প্রকার ধস্তাধস্তি শুরু করেছে ফোন নেয়ার জন্য। কিছুক্ষণ এভাবে চলার পর কেড়ে নিলো ফোন। এতক্ষণ লাফালাফির দরুণ হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
"হ্যালো প্রিয়া আপু, আমি প্রিয়ন্তীর ভাবি বলছি। কেমন আছেন?"
মেয়েলী কন্ঠ পেয়ে প্রিয়া এইবার অস্বস্তি ছেড়ে স্বাভাবিক হলো। হাসিমুখে উত্তর দিলো,
"এইতো ভালো। আপনি?"
স্বজনী লম্বা শ্বাস নিয়ে নিশ্বাস স্বাভাবিক করতে চাইলো। তবুও স্বাভাবিক হচ্ছে না। উত্তেজনায় হৃৎস্পন্দন চলছে দ্রুতগতিতে। আটকে আটকে বলল,
"আমিও ভালো আছি। আপনার সাথে কথা বলার পর তো আরও বেশিই ভালো আছি। শুনুন, একদিন আসবেন কিন্তু আমাদের বাসায়। আমার আপনার সাথে দেখা করার খুব শখ!"
প্রিয়া বলল,
"আমার সাথে দেখা করার শখ? কিন্তু আমি তো কোনো সেলিব্রেটি নই, আপু!"
স্বজনী এক তুড়িতে কথাটা উড়িয়ে দিয়ে বলল,
"সেলিব্রেটিদের সাথে দেখা করার আমার আগ্রহ নেই। আপনি তো সেলিব্রেটি থেকেও বড় কিছু। তাই আপনার সাথে দেখা করার শখ!"
"তা, এত শখ হলো কিভাবে শুনি?"
স্বজনী উৎফুল্ল স্বরে বলল,
"প্রিয়ন্তীর থেকে শুনে শুনে। আর প্রিয়ন্তীর কথা কি বলবো! ও তো মহা পল্টিবাজ। বোনকে পেয়ে ভাবিকে ভুলেই গেছে!"
প্রিয়া সব অস্বস্তি ভুলে হেসে ফেলল। বলল,
"ভাবিকে ভুলে গেছে? সমস্যা নেই। আমি ওর কান টেনে ওর ভাবির কথা মনে করিয়ে দিবো।"
স্বজনী বলল,
"হ্যাঁ, টেনে দিয়েন। আমি অনেকদিন সামনে পাচ্ছি না তো! তাই সুযোগও হচ্ছে না।"
প্রিয়া তাল মিলিয়ে বলল,
"এইজন্যই বেশি বাড় বেড়েছে। আমি আবার কান টেনে ওকে ঠিক জায়গায় নিয়ে আসবো।"
"ওকে। আপনার উপর ভরসা করে ছাড়লাম কিন্তু!"
প্রিয়া উত্তর দিতে নিলে পিয়াস স্বজনীর হাত থেকে ফোন কেড়ে নিলো। বলল,
"দুনিয়ার সব আলাপ তুমি একাই করবে নাকি? আমাকেও কিছু বলতে দাও!"
স্বজনী ভেঙচি কেটে বলল,
"তুমি বলবে? তুমি তো কিছু বলতেই পারছো না। শুধু ভ্যাবলার মতো ফোন কানে লাগিয়ে বসে আছো।"
পিয়াস কটমট করে বলল,
"তোমাকে তো আমি পরে দেখে নিচ্ছি। আগে কথাটা শেষ করি।"
অত:পর ফোন কানে লাগিয়ে কন্ঠে যথাসম্ভব গম্ভীরতা ঢেলে বলল,
"হ্যাঁ আপু। কি বলছিলেন, বলুন।"
একবার তুমি, পরেরবার আপনি। দুইবার দুইরকম সম্বোধনে প্রিয়া থতমত খেয়ে গেলো। আমতা-আমতা করে বলল,
"ভাইয়া, প্রিয়ন্তী থাকুক কিছুদিন আমার বাসায়। আমি বলছি তো আমি খেয়াল রাখবো। কোনো চিন্তা নেই।"
প্রিয়ন্তী নিম্মস্বরে ওকে শিখিয়ে দিলো,
"বলো এইটা আমার আবদার। ভাইয়া মুহুর্তেই মেনে যাবে।"
প্রিয়াও প্রিয়ন্তীর কথানুযায়ী বলল,
"ভাইয়া, এটা আমার আবদার। প্লিজ, না করবেন না।"
পিয়াস প্রত্যেকবার অনুভব করছে প্রিয়ার মুখে ভাইয়া ডাকটা। শেষে আবদারের কথা শুনে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিড়বিড়িয়ে বলল,
"দুনিয়ায় যত মানুষের সামনে যতই তেজ দেখাই। এই বউ আর বোন, এদের সামনে কোনো তেজ কাজ করে না। আর আবদার তো ফেলার মতো সুযোগই নেই!"
অত:পর হেসে প্রিয়াকে বলল,
"আবদার যখন করেছেন তাহলে কিভাবে ফেলি? মেনে নিলাম আপনার আবদার। এবার দুষ্টের মহারানীকে ফোন দিন।"
প্রিয়া খুশি হয়ে গেলো অনুমতি পেয়ে। ধন্যবাদ বলে খুশিমনে ফোনটা ধরিয়ে দিলো প্রিয়ন্তীর হাতে। প্রিয়ন্তী ফোন কানে তুলে বলল,
"হ্যাপি? এবার একটা থ্যাংকিউ দাও আমাকে। না না, থ্যাংকিউ দিতে হবে না। তুমি শুধু থাকার পারমিশন দিয়ে দাও।"
পিয়াস বলল,
"আমার লাইফের বেস্ট একটা গিফট দিয়েছিস আজ। সেই খুশিতে দু'বোনের জেদই পূরণ করে দিলাম। তবে খেয়াল রাখিস নিজের, আর বাকি সবার। আরেকটা কথা, ওই ডেঞ্জার ওইম্যান নাতাশা থেকে সাবধান।"
প্রিয়ন্তী বলল,
"একদম চিন্তা কর না। ও ডেঞ্জার ওইম্যান হলে, ডেঞ্জারদের কিভাবে লাত্থি মেরে বের করতে হয়, তা আমাদের ভালোই জানা আছে।"
আরও টুকটাক কথা বলে ফোন কাটলো পিয়াস। প্রিয়ন্তী ড্রইংরুমে ওদের মাঝে এসে সন্ধ্যাকে বলল,
"ভাইয়া ম্যানেজ হয়ে গেছে। আর চিন্তা করা লাগবে না।"
সন্ধ্যা মুখ কালো করে বলল,
"যেই বুদ্ধি খাটিয়েছো, না মেনে উপায় আছে?"
তাদের কথার মাঝে হঠাৎ প্রিয়া কন্ঠে মুগ্ধতা মিশিয়ে বলল,
"তবে যাই বলো, প্রিয়ার ভাইয়া-ভাবি ভীষণ আন্তরিক। এমনভাবে কথা বলছিলেন, যেনও আমায় কতকাল ধরে চিনে!"
প্রিয়ন্তী মুচকি হেসে বলল,
"হ্যাঁ। চিনেই তো!"
পরপর সবার সন্দেহী দৃষ্টির কবলে পড়ে বুঝিয়ে বলল,
"আমি ফোন করলেই আপুর কথা সবসময় বলতাম। তাই চিনেছে আরকি!"
আয়মান বলল,
"যাক। তাহলে তো আর কোনো সমস্যা নেই। প্রিয়ন্তী, তুমি রেডি হও।"
প্রিয়ন্তী বিস্মিত হয়ে বলল,
"রেডি হবো? কোথায় যাবো?"
আয়মান ধমক দিয়ে বলল,
"কোথায় আবার? ডক্টরের কাছে। হাতের অবস্থা তো বারোটা বাজিয়ে ফেলেছো।"
আয়ান আস্তে করে ওর কানের কাছে গিয়ে বলল,
"ভাই, বকিস না। তোর জন্যই তো হাতে ব্যাথা পেয়েছে।"
আয়মানও একইভাবে আস্তে আস্তে বলল,
"তুমি আর ওর সাফাই দিও না। ওকে বকার উপরেই রাখতে হবে। নাহলে মুহুর্তে মুহুর্তে একটা করে দুর্ঘটনা ঘটায়।"
আয়ান বলল,
"আচ্ছা হয়েছে। আর বলতে হবে না। রাস্তায় নিয়েও আর বকিস না ওকে।"
আয়মান আর কিছু বলল না। প্রিয়ন্তীও মুখ অন্ধকার করে চলে গেছে উপরে রেডি হতে। ও যাওয়ার পর সায়মা জিজ্ঞেস করলো,
"নাতাশা উঠলে কি বলবো, ভাইয়া? ও যদি জিজ্ঞেস করে তুমি কোথায়?"
ভালো মেজাজে থাকা অবস্থায় নাতাশার কথা ঢুকানোতে মেজাজ খারাপ হয়ে গেলো আয়মানের। চেঁতে-টেতে বলল,
"বলবি আমার বউ নিয়ে ডেটিং এ গিয়েছি। ওর সমস্যা?"
প্রিয়া হাসি চেঁপে বলল,
"তোমরা ডেটিং এ গিয়েছো, এটা বলবো দেবরজী?"
প্রিয়ার কথায় বাকিরাও মুখ চেঁপে হাসতে শুরু করেছে। আয়মান বিরক্ত কন্ঠে বলল,
"নিজেরা বানিয়ে কিছু বলে দিও। এটাও শিখিয়ে দিতে যেতে হবে নাকি?"
এতটুকু বলে হনহন করে বেরিয়ে গেলো সেখান থেকে। সোজা বাইরে গিয়ে গাড়িতে ঢুকে বসলো। অপেক্ষা করতে থাকলো প্রিয়ন্তী আসার৷
কিচ্ছুক্ষণ বাদে প্রিয়ন্তী রেডি হয়ে নেমে এসে প্রথমে ড্রইংরুমে ঢুকলো। খোঁজ করলো আয়মানের,
"উনি কই? ডক্টরের কাছে না যাবে বলল?"
বাকিরা তখনও এই বিষয়টা নিয়ে হাসাহাসি করছিলো। প্রিয়ন্তীকে দেখে সবাই হাসি থামানোর চেষ্টা করলো। প্রিয়া বলল,
"আয়মান বাইরে তোমার অপেক্ষা করছে। যাও, বায় বায়!"
সোজা বিদায় সম্ভাষণ। এক প্রকার ঠেলেঠুলে বিদায় দেয়ার সামিল। প্রিয়ন্তীও মুখ গোমড়া করে হাটা দিলো বাইরের দিকে। যেতে যেতে বিড়বিড় করলো,
"আরে বাহ! এতক্ষণ সন্ধ্যা আপুর সাথে আমাকে রাখা নিয়ে কি চেঁচামেচি করলো। আর এখন আমি মেনে নিয়েছি বলে কোনো দামই নেই। সোজা বায় বায় বলে দিলো?"