স্নিগ্ধ প্রেমের মায়া

পর্ব - ৩৬

🟢

নীল অম্বরে সূর্যের দেখা মিলেছে। শীতকাল বিদায় নিচ্ছে আস্তে আস্তে। এজন্য কুয়াশার আনাগোনাও কমে গেছে। পাখিদের কিচিরমিচির শব্দ কানে আসতেই ঘুম ভাঙলো প্রিয়ার। চোখ খুলতেই আয়ানের চিবুক দৃষ্টিগোচর হলো। সে প্রিয়াকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরে গভীর ঘুমে ডুবে। প্রিয়া নড়তেও পারছে না নিজের জায়গা থেকে। আয়ানের মাথার চুলে হাত বুলিয়ে আস্তে করে ডাকলো,

"আয়ান, উঠুন।"

আয়ান ওর ডাকে নড়ে-চড়ে আবারও ঘুমালো। তার মধ্যে উঠার কোনো লক্ষ্মণ নেই। প্রিয়া আরও কয়েকবার ডাকার পর মৃদু স্বরে উত্তর দিলো,

"ডিস্টার্ব করছো কেনও? ঘুমাতে দাও। রাতে ঠিকঠাক ঘুম হয়নি!"

প্রিয়া বিরক্তিতে বিড়বিড় করে বলল,

"রাতে ঠিকঠাক না ঘুমিয়ে মনে হয় কোনো বিশাল কার্য উদ্ধার করেছে উনি! উফফ!"

প্রিয়া একপ্রকার ধাক্কাধাক্কি করে আয়ানকে সরালো নিজের উপর থেকে। পরপর উঠে চলে গেলো ফ্রেশ হতে।

*******

ফ্রেশ হয়ে প্রিয়া নেমে এলো নিচে। প্রিয়ন্তী আরও আগেই নেমেছে নিচে। ড্রইংরুমের সোফায় বসে অপেক্ষা করছিলো প্রিয়ার। আর সবার বক্তৃতা শুনছিলো। প্রিয়া নামতেই সায়মা অভিযোগ করে বলল,

"দেখ প্রিয়া, প্রিয়ন্তী বলে এখনই চলে যাবে। ওকে কিছু বলবি?"

প্রিয়া ধমকের সুরে প্রিয়ন্তীকে বলল,

"কি সমস্যা? এখনই কেনও যাওয়া লাগবে? আমাদের সাথে ভালো লাগছে না?"

প্রিয়ন্তী প্রিয়াকে দেখে উঠে দাঁড়িয়েছে সোফা ছেড়ে। গলার কাছে দলা পাঁকিয়ে থাকা কান্না গিলে বলল,

"আমাকে যেতে হবে, আপু। আম্মু অনেক অসুস্থ। তাই আমি একটু পরেই ঢাকা ফিরে যাবো।"

থমকালো প্রিয়া। ভাষা খুঁজে পেলো না ওকে বাঁধা দেয়ার মতো। কিছুক্ষণ ভেবে তপ্ত শ্বাস ফেলে অনুমতি দিয়ে বলল,

"তাহলে আর কি করার! যাও। খেয়াল রেখো আন্টির।"

প্রিয়ন্তী হাসি টেনে বলল,

"হুম।"

"আর হ্যাঁ, জলদিই আবার ফিরে এসো কিন্তু। আমি অপেক্ষায় থাকবো।"

প্রিয়ন্তী উপর-উপর সায় জানালো। কিন্তু তার অন্তর জানে, এই বাড়িতে আর কোনোদিনও ফেরা হবে না। মিথ্যে আশা দেয়ার ভীষণরকম অনুশোচনা হলো তার মধ্যে। কিন্তু এছাড়া কোনো উপায় নেই!

আয়মান এখনও ঘুম থেকে উঠে নি। রাতে দেরি করে ঘুমানোর ফলে এখনও ঘুম ভাঙে নি। প্রিয়ন্তীও চাইলো না একবার ফিরে দেখতে৷ কারণ দেখলেই আর ইচ্ছে করবে না সব ছেড়ে দিতে। তাই একবার মুখদর্শনও করলো না। বাকিদের সাথে দেখা করে বেরিয়ে গেলো সেই বাড়ি থেকে।

********

প্রিয়ন্তী এসে হাজির হলো সন্ধ্যাদের বাড়ির দোরগোড়ায়। কলিংবেল বাজাতেই গেট খুলল তার খালামনি, সুরাইয়া বেগম। ওকে দেখে বলল,

"তোর বেড়ানো শেষ হলো তাহলে? এবার আয় ভিতরে।"

প্রিয়ন্তী ভিতরে ঢুকে সবার আগে বলল,

"খালামনি, আমি ঢাকা চলে যাবো আজ।"

সুরাইয়া অবাক নয়নে চাইল ভাগ্নির দিকে। বিস্ময় নিয়ে বলল,

"এখনই চলে যাবি? কেনও?"

প্রিয়ন্তী বলল,

"এমনিই খালামনি। অনেকদিন বাসার সবাইকে দেখা হয় না। ওদের জন্য ভীষণ মন খারাপ হচ্ছে। তাই আজই চলে যাবো। সন্ধ্যা আপু কই? আপুকে বলে যাই।"

"আরেহ কিন্তু..."

সুরাইয়া বেগম আর কিছু বলতে পারলো না। প্রিয়ন্তী তার আগেই ঢুকে গেলো সন্ধ্যার রুমে। সন্ধ্যাকে ঘুমন্ত অবস্থা দেখে ব্যস্ত হাতে ধাক্কাধাক্কি করে উঠালো। সন্ধ্যা আর বেশিক্ষণ শুয়ে থাকতে পারলো না। উঠে বসলো। বিরক্তিতে চ সূচক শব্দ করে বলল,

"সমস্যা কি? সকাল সকাল ঘুমটা নষ্ট করছিস কেনও?"

প্রিয়ন্তী কোনো উল্টোপাল্টা উত্তর দিলো না। সরাসরি বলল,

"আমি ঢাকা যাচ্ছি। এখনই বের হবো।"

ঘুম ছুটে গেলো সন্ধ্যার। চোখ বড়বড় করে বলল,

"এখনই চলে যাবি? কিছু হয়েছে নাকি প্রিয়ু?"

প্রিয়ন্তী বলল,

"কিছু হয় নি। সবাই ঠিক আছে। আমার ভালো লাগছে না, তাই আমি ঢাকা ফিরে যাবো।"

"কিন্তু প্রিয়া আপু.."

প্রিয়ন্তী হাত দিয়ে ওর মুখ চেঁপে ধরলো। গলার স্বর নামিয়ে বলল,

"প্রিয়া আপুই যে আমাদের পরিবারের মেয়ে এটা যেনও কেউ না জানে। যা যা জেনেছি সব এখানেই শেষ। মনে থাকবে?"

সন্ধ্যা কথা বাড়ালো না। ও নিজেও জানে এই সত্যটা লুকানো থাকাই উত্তম। তাই মাথা নাড়িয়ে বলল,

"আচ্ছা। তাহলে কি আমি তোর জিনিস গুছিয়ে দিবো?"

প্রিয়ন্তী বলল,

"প্রয়োজন নেই। আমি এখন কিছু নেওয়ার অবস্থায় নেই। তুমি পরে সময় করে গুছিয়ে রেখো। পিয়াস ভাইয়া এসে নিয়ে যাবে।"

********

বেশ অনেকক্ষণ পর আয়মান নামলো নিচে। আয়ান নেমেছে কিছুক্ষণ আগে। নাস্তা শেষ করে সোফায় বসে অপেক্ষা করছিলো আয়মানের। সবার মতো সে-ও অপেক্ষায় আয়মানের প্রতিক্রিয়া দেখার। ড্রইংরুমের পরিবেশ একদম শান্ত। কোনো কোলাহল নেই।

আয়মান অবাক হলো সবাইকে এমন চুপচাপ দেখে। টেবিলে বসে সবার আগে দৃষ্টি ঘুরালো আশেপাশে। নজর খুঁজে ফিরলো চিরচেনা মুখশ্রী। কোথাও না দেখে তাকালো গেস্টরুমের দিকে। দরজা খোলা দেখে আন্দাজ করলো, প্রিয়ন্তী হয়তো ঘরে নেই। কিন্তু নিচেও তো কোথাও নেই। তাহলে গেলো কই?

ওর প্রশ্নের উত্তর নিয়ে নাস্তার প্লেট হাতে হাজির হলো প্রিয়া। প্লেটটা ওর সামনে রেখে মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করলো,

"দেবরজী কি কাউকে খুঁজছেন?"

আয়মান থতমত খেয়ে ওর দিকে ফিরলো। ইতস্তত করে বলল,

"না! কাউকে না তো!"

আয়ান উঠে এসে দাঁড়ালো প্রিয়ার পাশে। বলল,

"তুমি জানো না, কাকে খুঁজছে? প্রিয়ন্তীকে ছাড়া আবার কাকে খুঁজবে?"

প্রিয়া আয়ানের পেটে কনুই দিয়ে একটা খোঁচা মেরে বলল,

"আপনাকে কেউ বলতে বলেছে? আমি কথা বলছি না?"

আয়ান মুখ খুলল কিছু বলার জন্য। তার আগে আয়মান বলল,

"ঝগড়া বন্ধ করো। আগে বলো, প্রিয়ন্তী কই?"

প্রিয়া ও আয়ান একে-অপরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলো। অত:পর প্রিয়া বলল,

"প্রিয়ন্তী তো চলে গেছে!"

আয়মান বিস্ময়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। অবাক কন্ঠে বলল,

"চলে গেছে মানে?"

প্রিয়া বলল,

"প্রিয়ার আম্মু নাকি অসুস্থ। তাই সকাল সকাল চলে গেছে বাসায়। আজ-কালে হয়তো ঢাকায় চলে যাবে।"

আয়মান সেই যে উঠে দাঁড়ালো আর চেয়ারে বসা হলো না। নাস্তাও খেলো না। খাবার রেখেই উঠে চলে গেলো রুমে। প্রিয়া ও আয়ান পিছন থেকে ডেকেও ওকে আর খেতে বসাতে পারলো না।

আয়মান উপরে যাওয়ার পর পারভিন রান্নাঘর থেকে সায়মাকে ডাক দিয়ে আদেশ দিলো,

"গেস্টরুমটা খালি হয়ে গেছে। গিয়ে একটু গুছিয়ে দে, সায়মা।"

সায়মা সায় জানিয়ে চলে গেলো উপরে। গেস্টরুমে ঢুকে সব গুছাতে গুছাতে হঠাৎ নজরে পড়লো টেবিলের উপর রাখা ছোট্ট চিরকুট।

******

আয়মান নাস্তাটা অব্দি খায় নি। রুমে এসেই শার্ট, প্যান্ট পড়ে নিলো। উদ্দেশ্য, এখনই যাবে সন্ধ্যার বাসায়। রেডি হয়ে হাতে ঘড়ি পড়ছে সেসময় তার রুমের দরজায় এসে দাঁড়ালো সায়মা। মৃদু স্বরে ডাকলো,

"ভাইয়া!"

আয়মান ঘুরে তাকালো ওর ডাকে। অবাক হলো ওর রক্তশূন্য ফ্যাকাশে মুখশ্রী দেখে। সায়মা গুটি-গুটি পায়ে হেটে এসে দাঁড়ালো আয়মানের সামনে। শব্দহীন চিরকুটটা এগিয়ে দিলো আয়মানের দিকে৷ আয়মান চিরকুটটা হাতে ধরতে ধরতে বলল,

"চিরকুট? কার এটা?"

সায়মা অভিব্যক্তিহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,

"প্রিয়ন্তীর। গেস্টরুমে রেখে গিয়েছে।"

প্রিয়ন্তীর চিরকুট শুনেই আয়মান ত্রস্থ চোখ বুলালো সেটায়। একটি সাদা কাগজে কালো কালি দিয়ে লেখা কিছু বাক্য যথেষ্ট ছিলো তার পুরো দুনিয়া উলটপালট করে দিতে। উথাল-পাথাল ঝড় শুরু হলো তার মস্তিষ্কে। চিরকুটে লেখা,

"পিয়াসের বোনকে আপনি কোনোদিনও ভালোবাসতে পারবেন না। অতীতে তৈরি বিশাল এক শত্রুতার দেয়াল আছে দু'জনের মাঝে। কিন্তু জানেন কি? পিয়াসের বোন আপনাকে ভীষণ ভালোবাসে! তাই তো আপনার কথা ফেলতে পারলো না। আপনি বলেছিলেন না, পিয়াসের বোনের তার পরিবারের কাছেই থাকা উচিত? তাই সে পরিবারের কাছেই ফিরে যাচ্ছে। ভালো থাকবেন। আর জেনে রাখবেন সে আপনাকে ভীষণ ভালোবাসে। আপনার ইচ্ছেতেই আপনার থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।

~পিয়াসের বোন।"

কেঁপে উঠলো আয়মান। কম্পনরত হাত থেকে ছুটে পড়লো চিরকুটটা। সায়মা শূন্য দৃষ্টিতে চেয়ে বলল,

"তাহলে কি তোমাদের গল্পটা এখানেই শেষ? তিক্ত অতীতের কাছে হেরে যাবে তোমাদের ভালোবাসা?"

আয়মান আশংকায় হাবুডুবু খেয়ে ঢোক গিলল। গলা শুকিয়ে কাঠ-কাঠ। জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে বলল,

"এভাবে সব শেষ হতে দিবো না। পিয়াসকে আমি ছাড়বো না!"

আয়মান আর এক মিনিটও সময় ব্যয় করলো না। দ্রুত বেরিয়ে গেলো সেখান থেকে। ওকে এইভাবে হন্তদন্ত হয়ে বের হতে দেখে পিছু ডেকে প্রশ্ন করলো সবাই। কিন্তু আয়মান ফিরেও তাকালো না। গাড়িতে বসে সোজা রওনা করলো সন্ধ্যাদের বাসার পথে!

******

প্রিয়ন্তী রেডি হয়ে কিছুক্ষণ আগে বেরিয়েছে সন্ধ্যাদের বাড়ি থেকে। এর মধ্যে সন্ধ্যা আরও কয়েকবার জিজ্ঞেস করেছে, কি হয়েছে? কিন্তু প্রিয়ন্তী বারবার কথা কাটিয়ে গিয়েছে। শেষ মুহুর্তে চলে যাওয়ার আগে একটা কথাই বলেছে,

"আমি চলে যাওয়ার পর আয়মান খান আসতে পারে, আমাকে খুঁজতে। ভুলেও আমার ঠিকানা দিবে না তাকে।"

এতেই সন্ধ্যা বুঝে গেলো আয়মান আসবে। প্রিয়ন্তী চলে যাওয়ার পর সন্ধ্যা অস্থির ভঙ্গিতে পায়চারি করছিলো বারান্দায়। যখন নিচে আয়মানের গাড়ি দেখতে পেলো এক মিনিটও দেরি করলো না। ছুটে নেমে এলো নিচে। আয়মান ওকে দেখে জিজ্ঞেস করলো,

"প্রিয়ন্তী কই, সন্ধ্যা?"

সন্ধ্যা ছুটে আসার দরুণ হাঁপাচ্ছে। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,

"প্রিয়ন্তী বেরিয়ে গেছে। তবে বেশিদূর যেতে পারে নি, ভাইয়া। দশ-পনেরো মিনিট হবে বেরিয়েছে। ঢাকার বাসও ধরতে পারে নি নিশ্চিত। আপনি গেলে, পেয়েও যেতে পারেন।"

আয়মান আর কথা বলে সময় ব্যয় করলো না। চলে গেলো বাস স্টেশনের দিকে গাড়ি ছুটিয়ে। গাড়ির স্পিডও বাড়িয়ে তুলল যথাসম্ভব। যেকোনোভাবে প্রিয়ন্তীকে আটকাতে হবে!

*******

প্রিয়ন্তী উদ্দেশ্যহীন পথের এক ধার ধরে হাটছে। সে মানুষটা এই পথে থাকলেও মনটা পড়ে রয়েছে খান নিবাসের সেই ডাকাতের কাছে। যে ভয়ংকরভাবে তার মনটা ছিনিয়ে নিয়ে নিজের কাছে রেখে দিয়েছে। শুধু তারই থাকা হলো না সে মানুষটার কাছে। মুহুর্তে মুহুর্তে ভেতরটা ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে তার। অশ্রুতে চোখের দৃষ্টি বারবার ঝাপসা হয়ে আসছে।

আয়মান আশেপাশে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখতে দেখতে আগে বাড়ছিলো। গাড়ি থামালো যখন রাস্তার উল্টোপাশে প্রিয়ন্তীকে হেটে যেতে দেখলো। গাড়ি থেকে নেমে চিৎকার করে ডাকলো,

"প্রিয়ন্তী!"

থেমে গেলো প্রিয়ন্তীর কদম। চোখের কোণে যে পানিগুলো জমে ঝাপসা হয়ে ছিলো, তা টুপ করে গড়িয়ে পড়লো সোজা পিচঢালা সড়কে। একবার মনে হলো ভ্রম হচ্ছে তার। কিন্তু যখন পিছে ফিরে আয়মানকে দেখলো, সব বিভ্রান্তি উড়ে গেলো। এক পলকে মস্তিষ্ক থেকে উড়ে গেলো সব কথা। আয়মানের কাতর ধ্বনি ভেসে এলো কানঅব্দি,

"আমি জানতে চাই না, তুমি কার বোন? তুমি কার মেয়ে? আমি শুধু জানি, তুমি আমার! শুধুই আমার।"

যার ডাকে প্রিয়ন্তী দুনিয়া ভুলতে সক্ষম, তার ডাকে ভুলে গেলো অতীতের গল্পও। মন বলল, সব পিছুটান ভুলে আয়মানের কাছে ছুটে যেতে। মানবে না, মানবে না করেও মেনে নিলো মনের কথাই! সব ফেলে ছুট লাগালো চলতি রাস্তার মধ্য দিয়েই!

আর এটাই কাল হলো তার। অপরপাশ থেকে আসা গাড়ির ধাক্কায় ছিটকে পড়লো রাস্তার একপাশে। মাথা ঠুকে গেলো রাস্তার পাশে বাঁধানো ইটে। গলগল করে রক্ত বেরোলো মাথা ফেঁটে। মুহুর্তেই রাস্তা রক্তাক্ত হয়ে গেলো।

আয়মান একদম স্তব্ধ হয়ে গেলো এই ঘটনায়। প্রিয়ন্তীকে বাঁচানোর মতো কোনো সুযোগও পেলো না। তার আগেই সে রক্তাক্ত হয়ে লুটিয়ে পড়লো রাস্তার ধারে। আয়মান ছুটে গিয়ে বসলো ওর পাশে। মাথাটা কোলে তুলে অস্থির কন্ঠে বলল,

"প্রিয়ন্তী, এটা কি করলে তুমি? কে বলেছিলো এইভাবে ছুটতে। আচ্ছা, তুমি চোখ খোলা রাখো। আমি এক্ষুণি হসপিটাল নিয়ে যাচ্ছি। একদম চোখ বন্ধ করবে না!"

প্রিয়ন্তী এখনও জ্ঞান হারায় নি। তবে খুব বেশি রক্ত বেরিয়ে যাওয়ায় শ্বাস আটকে আসছে ওর। জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে নিশ্বাস ধরে রাখার জন্য। আয়মান বলার পর ও আয়মানের হাত ধরে আটকালো। বহুকষ্টে উচ্চারণ করলো,

"আমাকে বাঁচানোর চেষ্টা করবেন না। না বাঁচলেই হয়তো সবচেয়ে বেশি ভালো হবে, আমার জন্য৷ আপনার জন্য! শুধু আমার একটা কথা রাখবেন প্লিজ?"

আয়মানের হৃৎপিণ্ডের গতি ভীষণভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রিয়ন্তীর মুখে মৃত্যুর কথা শুনে ওরও দমবন্ধ লাগছে। চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ছে আপনা-আপনি। দুঃসহ অবস্থায় মুখ থেকে উত্তর বের হলো না তার।

প্রিয়ন্তী কথাও বলতে পারছে না ঠিকঠাক। তবুও চেষ্টা করে যাচ্ছে বলার।

"আমি মরে গেলে আমার শেষ ইচ্ছের কথাটা আমার পরিবারকে জানাবেন। আমার পরিবারকে বলবেন ওরা যেনও সব শত্রুতা ভুলে আয়ান ভাইয়া আর প্রিয়া আপুকে মেনে নেয়। ওদের যেনও আলাদা না করে, এটাই আমার শেষ ইচ্ছা!"

আয়মানের মাথায় কথাটার কিছুই ঢুকলো না। ও জানে না প্রিয়া প্রিয়ন্তীরই বোন। আর এই মুহুর্তে জানার পরিস্থিতিও নেই। আয়মান শুধু উপলব্ধি করছে প্রিয়ন্তীর অবস্থা। সে কোনোরকম ওকে কোলে তুলল হসপিটাল নেয়ার জন্য। প্রিয়ন্তী মৃদু হাসলো ওর অস্থিরতা বুঝে। আবদার করে বসলো,

"একবার বলবেন, ভালোবাসি? প্রথমবার আর শেষবারের মতো?"

আর সহ্য হলো না আয়মানের। ধমক দিয়ে বলল,

"চুপ করবে তুমি? কিছু হবে না তোমার! শেষবার হবে না।"

প্রিয়ন্তী করুণ স্বরে বলল,

"একবার বলুন প্লিজ!"

আয়মান ওকে গাড়ির ব্যাকসিটে লম্বা করে শুইয়ে দিলো। ওড়না খুলে মাথায় বাঁধলো রক্ত আটকাতে। প্রিয়ন্তীর অবস্থা দেখে একদম পাগল পাগল লাগছে নিজেকে। ভেবে নিলো পিয়াসের সাথে ওর বোঝাপড়াটা পরে হবে। আগে প্রিয়ন্তীকে বাঁচাতে হবে। ওর আবদার মেটাতে বলল,

"ভালোবাসি! ভীষণ ভালোবাসি! প্রথমবার বলছি, শেষবার নয়। কারণ আমি সারাজীবন বলতে চাই। শুধু তুমি থেকে যাও!"

প্রিয়ন্তীর চোখ প্রায় বন্ধ হয়ে আসছে। কোনোরকমে টেনেটুনে খুলে রাখতে চাইছে। আয়মানের বলা কথা ঠিকই প্রবেশ করলো তার কানে। প্রশান্তির হাসি ফুটলো তার অধরকোণে। বলল,

"আমি পূর্ণ! এবার মরলেও আর কোনো আফসোস থাকবে না। এমনিতেও আপনাকে পাওয়া আমার কপালে লেখা ছিলো না। তাই এভাবে ছেড়ে যাওয়াই শ্রেয়। বেঁচে থাকলে তিলে তিলে মরতে হতো। বিচ্ছেদ যে হওয়ারই ছিলো! তাই মৃত্যুই হোক আপনার থেকে আমাকে কেড়ে নেওয়ার একমাত্র অস্ত্র!"

স্নিগ্ধ প্রেমের মায়া গল্পটি তিয়াশা চৌধুরী-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক ও রোমান্টিক থ্রিলার গল্প