স্নিগ্ধ প্রেমের মায়া

পর্ব - ৪০

🟢

প্রিয়াকে খুঁজে পাওয়ার কথা শুনে এক মুহুর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেলেন তৌহিদ ও বৃষ্টি। পরমুহুর্তেই আবার খুশিতে লাফিয়ে উঠলেন। বললেন,

"প্রিয়াকে পেয়েছিস? কোথায় ও? আমাদের নিয়ে চল ওর কাছে।"

পিয়াস বলল,

"নিয়ে যাবো। তবে তার আগে তোমাদের কিছু বলা জরুরি।"

তৌহিদ তার কথায় গুরুত্ব না দিয়ে বললেন,

"সব জরুরি কথা পরে শোনা যাবে। আগে প্রিয়াকে নিয়ে আসি।"

পিয়াস অধৈর্য স্বরে বলল,

"প্রিয়াকে তোমরা আনতে পারবে না। ওর বিয়ে হয়ে গেছে।"

বৃষ্টি বললেন,

"বিয়ে হওয়া তো অস্বাভাবিক কিছু না, পিয়াস। আমরা ওর শশুড়বাড়িতে যাবো। তারপর ওকে কিছুদিনের জন্য নিয়ে আসবো।"

পিয়াস বলল,

"কিছুদিনের জন্যই আনতে পারবে। সারাজীবনের জন্য আনার প্ল্যান করো না যেনও!"

তৌহিদ জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে ছেলের দিক চেয়ে প্রশ্ন করলেন,

"এমন হেয়ালী করছিস কেন পিয়াস? যা বলবি স্পষ্ট করে বল।"

পিয়াস এক মুহুর্ত চুপ রইলো। পরপর হতাশ শ্বাস ফেলে বলল,

"প্রিয়ার বিয়ে হয়েছে খান বাড়িতে। আয়ান ভাইয়ার সাথে!"

বৃষ্টি এতক্ষণ উত্তেজনায় বারবার উঠছিলেন আবার বসছিলেন। এইবার একদম সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন। বিস্ময় নিয়ে বললেন,

"আয়ান? ওই জুনাইদের ছেলেই তো, তাই না?"

পিয়াস বলল,

"হ্যাঁ, তাই।"

তৌহিদ হঠাৎ ক্ষেপে উঠলেন। রাগান্বিত স্বরে বললেন,

"তুমি প্রিয়াকে আয়ানের কাছ থেকে নিয়ে আসতে না করছো? তোমার মাথা কি ঠিক আছে? তুমি জানো, ওর বাবার জন্যই আজ আমাদের পরিবার এইভাবে ভেঙে-চুরে গিয়েছে। তারপরও এমন শখ কিভাবে করো?"

পিয়াস তার বাবাকে বোঝানোর চেষ্টা করলো,

"বাবা, যা অন্যায় করেছে আয়ান ভাইয়ার বাবা। ওরা দু'জন তো আর কিছু করে নি। সবচেয়ে বড় কথা, আয়ান ভাইয়া প্রিয়াকে ভীষণ ভালোবাসে। আমি এই দুইদিন ওদের সাথে থেকে স্বচক্ষে দেখেছি।"

বৃষ্টি হতভম্বতায় হা হয়ে বললেন,

"তুমি এই দুইদিন ওদের সাথে থেকেছো?"

পিয়াস সরল স্বীকারোক্তিতে বলে গেলো সব। গড়গড় করে আওড়ে গেলো সব ঘটনা। আয়মান-প্রিয়ন্তীর এনগেজমেন্টের কথাটাও ঢাকলো না। তারপর প্রিয়ন্তীর সামনে সব সত্যিটা আসা। তারপর এক্সিডেন্ট, এরপর সবার দেখা হওয়া। একে একে সব ঘটনা বলে তবেই থামলো পিয়াস। এর মধ্যে ভুল করে বসলো, আয়ান যে প্রিয়াকে জোর করে বিয়ে করেছে, এই কথাটা বলে। সবশেষে বলল,

"বিয়েটা তো আর মানুষের হাতে থাকে না, তাই না? এটা সম্পূর্ণ আল্লাহর হাতে। এখন বিয়ে হয়ে গেছে, তাই ওদের মেনে নেয়াই ভালো হবে।"

তৌহিদ এখনও রেগে রয়েছে। রাগে কপালের শিরা অব্দি ফুলে উঠেছে। উনি বুঝেছেন, ওরা দুই ভাই মিলে তার ছেলের ব্রেইন ওয়াশ করে রেখেছে। তবে তার ব্রেইন ওয়াশ করতে পারবে না। তিনি এর শেষ দেখেই ছাড়বেন!

********

তপ্ত দুপুর। সূর্য ঠিক মাথার উপরে। সন্ধ্যা মাত্রই বেরিয়েছে লাইব্রেরি থেকে। একটা বই নেয়ার জন্য এসেছিলো এখানে। তখন বাজার থেকে ফিরছিলেন হেনা বেগম। সন্ধ্যাকে নজরে পড়তেই ডাক ছুড়লেন,

"সন্ধ্যা, একটু দাঁড়াও।"

সন্ধ্যা প্রথমে শুনেও না শোনার ভান করে চলে যেতে চাইলো সেখান থেকে। কিন্তু পারলো না। হেনা বেগম এক প্রকার ছুটে চলে আসলেন ওর কাছে। হাঁপাতে হাঁপাতে জিজ্ঞেস করলেন,

"যাচ্ছো কোথায়? আগে আমার কথাটা তো শুনে যাও! প্রিয়া কেমন আছে? ওর খবরটা তো একটু বলো!"

সন্ধ্যা মুখ ঝাঁমটি মেরে বলল,

"ও কেমন আছে এটা জানার শখ? নাকি আপনি যেমন রাখতে চেয়েছেন, সেরকম আছে কি না ওইটাই জানতে চান? যদি এটাই চেয়ে থাকেন তাহলে আপনি ব্যর্থ। ও আয়ান ভাইয়ার সাথে খুব ভালো আছে।"

এত কথা শোনার বিপরীতেও তুষ্ট হাসলেন তিনি। বললেন,

"ও ভালো থাকলেই আমি খুশি। আমি বুঝতে পেরেছি আমি কত বড় ভুল করেছি। কিন্তু মেয়ের কাছে ক্ষমা চাওয়ার মুখও আমার নেই! শুধু দূর থেকে চাইবো ও সুখে থাকুক।"

তার আবেগী কথায় গলল সন্ধ্যা। কন্ঠ নরম করে বলল,

"ও ভালো আছে। আর দোয়া করবেন, যেনও সবসময় এরকম থাকে। কোনো বিপদ যেনও ওদের স্পর্শ করতে না পারে।"

হেনা বেগম জিজ্ঞেস করলেন,

"তুমি তো ওই বাড়িতে আসা-যাওয়া করো। ওরা সবাই আমার মেয়েটাকে মেনে নিয়েছে তো?"

সন্ধ্যা মাথা নাড়লো। বিড়বিড় করে বলল,

"ওদের পরিবার মেনে নিয়েছে। এবার আমার পরিবার মেনে নিলেই হয়!"

হেনা বেগম পরিষ্কার শুনতে পেলেন না ওর কথা। কৌতুহলী হয়ে আবারও বললেন,

"মনে হচ্ছে কিছু নিয়ে চিন্তায় আছো। কি হয়েছে, বলা যাবে আমাকে?"

সন্ধ্যা রাখ-ঢাক করলো না। ভাবলো প্রিয়াকে এতদিন মায়ের যত্নে তিনিই বড় করেছেন। তাই প্রিয়ার সত্যিটা জানার অধিকার উনার আছে। তাই সন্ধ্যা বলে দিলো,

"হয়েছে অনেক কিছুই। প্রিয়া তো আপনার পালক মেয়ে ছিলো তাই না? আপনি জানেন ও কে?"

হেনা বেগম দু'পাশে ঘাড় দুলিয়ে না বোঝালেন। বলতে চাইলেন, প্রিয়াকে কিভাবে পেয়েছেন! তার আগে সন্ধ্যা বলে ফেলল,

"প্রিয়া আমাদেরই আত্মীয়। আমার খালামনির বড় জায়ের মেয়ে ছিলো প্রিয়া। ওইদিন এক্সিডেন্টে প্রিয়ার মা-বাবা মারা যাওয়ার পর ভাগ্যক্রমে আপনি পেয়ে গেছিলেন।"

হেনা বেগম চকিতে বিস্ময়ে নিয়ে তাকালো ওর দিকে। বলল,

"তার মানে প্রিয়ার পরিবারকে পাওয়া গেছে?"

"হুম। কিন্তু সমস্যা অন্য জায়গায় হয়ে গেছে।"

"কি সমস্যা?"

সন্ধ্যা প্রথমে ইতস্তত করলো সব বলতে। কিন্তু পরমুহুর্তেই আবার ভাবলো, উনি জানলেই বা কি এমন হয়ে যাবে? তাই কিছুক্ষণ ভেবে বলেই ফেলল সব কাহিনি। সব বলা শেষে লম্বা শ্বাস নিয়ে তাকালো হেনা বেগমের দিকে।

বিস্ময়ে তার ভ্রুযুগল কপালে ঠেকেছে। হতবিহ্বলতায় ভুলে গেলো পলক ফেলতেও। অনেকটা কাঁদো কাঁদো ভঙ্গিতে বলল,

"এবার কি হবে? ওরা কি প্রিয়াকে ঢাকা নিয়ে চলে যাবে?"

সন্ধ্যা চিন্তিত ভঙ্গিতে জবাব দিলো,

"হয়তো। আমি নিজেও জানি না, কি হবে?"

হেনা বেগম হঠাৎ-ই একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন। বিস্ময়ে গোল হয়ে থাকা চোখ-মুখ স্বাভাবিক করলেন। শক্ত কন্ঠে বললেন,

"কখন আসছে তোমার খালামনিরা?"

"আজই আসবে। বিকাল তিনটা-চারটা বাজবে খুব সম্ভব।"

হেনা বেগম বললেন,

"তাহলে উনাদের প্রথমে তোমাদের বাড়িতে ডাকো। আর উনারা আসার পর আমাকে একটা কল দিও। আমার উনাদের সাথে দেখা করা প্রয়োজন। আমার অনুরোধ রইলো তোমার কাছে। কলটা দিও, প্লিজ!"

সন্ধ্যা কিছু একটা ভেবে রাজি হয়ে গেলো তার কথায়। অত:পর হেনা বেগম সেখান থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেলেন। সন্ধ্যা ফোন করলো পিয়াসকে। বলে দিলো সবাইকে নিয়ে আগেই ওদের বাসায় যেতে। কারণটা বলতেও ভুলল না!

********

তৌহিদ ও বৃষ্টি রেগে অগ্নিশর্মা হয়ে রয়েছেন। তার ইচ্ছা ছিলো প্রথমেই খান বাড়িতে যাবেন আর দুই বোনকে নিয়ে আসবেন। কিন্তু পিয়াসের জেদের কাছে হার মেনে এখন এসে বসে আছেন বোনের বাড়িতে। এত দূর থেকে আসার দরুণ ক্লান্তিতে ছেঁয়ে গেছে তাদের শরীর। তবুও তেজ ধরে রেখেছে ওই বাড়ি যাওয়ার জন্য। সুরাইয়া বেগম কোনোমতো বোন আর বোনের জামাইকে বুঝিয়ে আটকে রেখেছেন।

সুরাইয়া বেগম, সন্ধ্যা, পিয়াস ও স্বজনী। সবার কাঙ্খিত অপেক্ষার কলিংবেলটি বেজে উঠলো হঠাৎ। সন্ধ্যা লাফিয়ে উঠে দরজা খুলল। সেখান থেকে ভিতরে ঢুকলো ছোটখাটো গড়নের এক হাসি-খুশি মহিলা। তিনি সবার আগে এসে হাজির হলেন বৃষ্টির সামনে। মুখের হাসিটা আরেকটু প্রশস্ত করে সম্ভাষণ জানালেন,

"আসসালামু আলাইকুম, চৌধুরী সাহেবা। আপনার সাথেই দেখা করতে এলাম। কেমন আছেন আপনি?"

বৃষ্টি অবাক হয়েছে উনাকে দেখে। কোনোরকম সালামের জবাব দিয়ে প্রশ্নবোধক চাহনি নিক্ষেপ করলেন সুরাইয়া বেগমের দিকে। তিনি উত্তর দেয়ার আগেই হেনা বেগম বললেন,

"চিনেন না আমাকে, তাই তো? আমিও আপনাকে চিনতাম না। আজই তো প্রথম দেখা হলো আমাদের। আচ্ছা, আমি আমার পরিচয়টা দিয়ে নেই। আমি হেনা, আপনাদের মেয়ে প্রিয়ার পালক মা আমি। আপনারা যখন মেয়েকে নিয়ে যেতেই চাইছেন, তাহলে মেয়ের সম্পর্কে সবকিছু জানা আপনাদের জরুরি না? সেই সবকিছুই জানাতে এলাম আপনাদের। আমি ওকে পালন করে এত বড় করেছি, ওর সম্পর্কে ভালোভাবে আমিই জানবো, তাই না?"

থমকে গেলো ড্রইংরুমের পরিবেশ। কেউ বুঝে পেলো না হেনা বেগমের কথার মানে৷ শুধু দৃষ্টি বিনিময় করে যাচ্ছে একে-অপরের সাথে। বৃষ্টি কিছুক্ষণ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সামনে থাকা হাসি-খুশি মহিলাটিকে পরখ করে বললেন,

"আপনি প্রিয়ার পালক মা? আর ওর সম্পর্কেই কথা বলতে চাইছেন? তাহলে একটু অপেক্ষা করুন। আমরা ওদের নিয়ে আসি, তারপরই সব কথা হবে।"

হেনা বেগম বাঁধা দিয়ে বললেন,

"না! একদম না! প্রিয়াকে ওর শশুড়বাড়ি থেকে আনার চিন্তাও করবেন না। তাহলে এটা আপনাদের জীবনের অনেক বড় ভুল সিদ্ধান্ত হবে।"

এবার রেগে গেলো তৌহিদ ও বৃষ্টি। বৃষ্টি ঝাঁঝালো কন্ঠে বললেন,

"ভুল? আপনি কি জানেন আমাদের সম্পর্কে যে কোনটা ভুল আর কোনটা সঠিক বুঝবেন?"

তাদের অস্থিরতার বিপরীতে হেনা বেগম একদম শান্ত। সে এখনও ঠোঁটে হাসি ঝুলিয়ে রেখেছে। বলল,

"আপনাদের ব্যাপারে আমি সবই জানি। কিন্তু আপনারা জানেন না আয়ান-প্রিয়ার ব্যাপারে। সেটাই আমি আজ আপনাদের বলবো।"

তৌহিদ ভ্রু কুঁচকে বললেন,

"সব জানেন মানে?"

"সব মানে সব। আপনাদের পুরো ইতিহাসই জানি আমি। কিন্তু আমি সেই অতীতটা নিয়ে একটুও আগ্রহী নই। তাই কোনো অতীতই মানবো না আমি। আমি যদি কোনোকিছু মানি! তাহলে মানবো, বর্তমান আর ভবিষ্যৎ।"

বৃষ্টি বললেন,

"আপনি কি বলতে চাইছেন, এটা কি পরিষ্কার করে বলবেন?"

হেনা বেগম এবার আসল কথা তুললেন। বললেন,

"আপনারা অতীত বিচার করছেন। আপনারা দেখছেন, আয়ানের বাবা কিভাবে আপনাদের পরিবার ধ্বংস করেছে। কিন্তু আপনারা এটা দেখেননি, ও কিভাবে আপনাদের মেয়েকে যত্নে রেখেছে। একটা সত্যি কথা আপনাদের বলি! নিজেকে আপনাদের সামনে প্রিয়ার মা দাবি করলেও, নিজের কাছে সেই দাবিটা করতে পারি না। যখনই মনে হয় আমি কি অন্যায় করতে যাচ্ছিলাম, তখনই নিজের সাথে চোখ মেলানোর সাহসও পাই না। সেই ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করতে এসেছি আজ আমি! নিজের ভুলে মেয়েটাকে কষ্ট দিচ্ছিলাম, সেই ভুল আপনাদের করতে দিবো না।"

থামলেন হেনা বেগম। এতক্ষণে ঠোঁটে ধরে রাখা হাসিটা হঠাৎ করেই উঁবে গেছে। ভিজে উঠেছে চোখ। কোনোরকম নিজেকে সামলে তৌহিদের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। আবারও বলা শুরু করলেন,

"আপনার বোনকে বিয়ের পর সতীন দেখতে হয়েছিলো। আপনি জানেন, প্রিয়াও নিজের ফুপুর মতো একই জিনিস দেখতো যদি আয়ান না থাকতো! হ্যাঁ, আমি প্রিয়ার বিয়ে ঠিক করেছিলাম। তাও এক বিবাহিত ছেলের সাথে। বিয়েটা হয়ে গেলে ঠিক কি হতো ভাবতে পারছেন? আপনার বোন যেমন সতীনের মুখোমুখি হয়েছিলো, তেমনই আপনাদের মেয়েকেও হতে হতো। কিন্তু সেরকম কিছুই হয় নি। কার জন্য জানেন? আয়ানের জন্য!"

কথায় তার অনুশোচনার সুর স্পষ্ট। চোখের পানি বলে দিচ্ছে তিনি নিজের কাজের জন্য কতটা অনুতপ্ত! নিজের অপরাধ নিজমুখে বলার মতো খারাপ লাগা কেমন, সেটা হারে হারে উপলব্ধি করছেন তিনি। তবুও গলগল করে আউড়ে গেলেন নিজের অন্যায়!

তৌহিদ ও বৃষ্টি বাদে সবাই আয়ানের পক্ষেই ছিলো। তারা সন্দিহান হয়ে একে-অপরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করছে। সুরাইয়া বেগম তাকালেন বোনের মুখের দিকে। তার চেহারায় হতবিহ্বলতা স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। এখন শুধু সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করলেই হয়!

বৃষ্টি সোফার হাতল ধরে ভর দিয়ে দাঁড়ালেন। বিড়বিড়িয়ে উচ্চারণ করলেন,

"প্রিয়াকে সতীনের সংসারে যেতে হতো রুবিনার মতো? আয়ান বাঁচিয়ে নিয়েছে ওকে?"

বৃষ্টির করা প্রশ্ন মনে করেই উত্তর দিলেন হেনা বেগম,

"হ্যাঁ। আয়ান যখন জানতে পেরেছে, তখন ও নিজেই বিয়ে করেছে প্রিয়াকে। বিয়েটা জোর করে করলেও, আয়ান জোর করেছে শুধু প্রিয়াকে সতীনের ঘরে না দেয়ার জন্য। আপনারা এতটুকু জেনেছেন প্রিয়াকে জোর করে বিয়ে করেছে, অথচ আগে পরের কাহিনি জানেন না? এই তো গেলো আগের কাহিনি! এবার আসি পরের কাহিনিতে। যেই পরিস্থিতিতে ওদের বিয়ে হয়েছে, তাতে কোন শশুড়বাড়ি বউকে সম্মানে মাথায় তুলে রাখতো? কিন্তু ওই পরিবারের সবাই প্রিয়াকে আদর ও সম্মান দিয়ে মাথায় তুলে রেখেছে। দেখেন, প্রিয়াকে আমি বড় করেছি ওর স্বভাব আমি জানি। ওর মধ্যে আত্মসম্মানবোধ ভীষণ প্রখর। নিজের অসম্মান দেখলে ও ওই বাড়ির মানুষকে ঘুরেও দেখতো না! কিন্তু প্রিয়া নিজমুখে বলেছে, ও ওই বাড়িতে সুখে আছে। সেখানে আমি মানতে বাধ্য ও সুখেই আছে।"

বৃষ্টি দাঁড়ানো থেকে ধপ করে বসে পড়লেন সোফায়। অশ্রু দেখা দিয়েছে তার চোখেও। বললেন,

"প্রিয়া আমাদের বাড়ির মেয়ে জানার পরও কি ওরা এইভাবে রাখবে ওকে?"

হেনা বেগম আত্মবিশ্বাসী কন্ঠে বললেন,

"অবশ্যই রাখবে। কারণ আয়ান অতীত, বংশ, পরিচয় বিচার করে প্রিয়াকে ভালোবাসে নি। আমি খুবই সাধারণ মধ্যবিত্ত মানুষ। বিয়ের দু'বছরেই আমার স্বামী মারা গিয়েছে। প্রিয়াকে নিয়েই আমার ছোট দুনিয়া। সিঙ্গেল মাদার হওয়াটা, কত কষ্টের আমি জানি। এছাড়া প্রিয়া আমার পালক মেয়ে। ওর মা-বাবার কোনো পরিচয়-ই কেউ জানতো না। ওদের পরিবার প্রিয়ার ব্যাপারে এইসব কথা ভালো করেই জানতো। কিন্তু এইটা নিয়ে একটা কথাও বলে নি, আমি গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি। যেখানে ওরা অতীত, বংশ-পরিচয় বিচার করছে না, তাহলে আপনারা কেনও করবেন? ভুলে যান সব অতীত। যে অন্যায় করেছিলো তার শাস্তি আল্লাহ তাকে দিবে। নিজের ঘরের বাচ্চাদের উনার অন্যায়ের শাস্তি দিবেন না। সব ভুলে মিলে যান দুই পরিবার। অন্তত মেয়েদের সুখটা দেখে!"

এতক্ষণে মুখ খুললেন সুরাইয়া বেগম। শান্ত স্বরে বোঝাতে চাইলো,

"উনি একদম ঠিক বলেছে। বাবা অন্যায় করেছে বলে ছেলেরাও করবে এমন তো না! আর এমনও না যে আয়ান, আয়মান বাবার ছায়ায় বড় হয়েছে। জুনাইদ তো ছোট থাকতেই মুখ ফিরিয়েছে ঘর সংসার থেকে। দু ভাই-ই বাবার ভালোবাসা পেয়েছে চাচার কাছ থেকে। আশা করি, আদর্শটাও চাচার থেকেই নিবে। আর এখন পর্যন্ত যা দেখেছি আমার ওদের খারাপ মনে হয় নি! প্রিয়ন্তী এই কয়দিন যে হসপিটালে ছিলো, আয়মান ওর সাথেই থেকেছে। ওর খেয়াল রেখেছে। শুনেছি সব পিয়াসের থেকেই। আমার মনে হয় না, মেনে নিলে তোমরা কোনো ভুল করবে!"

হেনা বেগম বললেন,

"আপনাদের যদি নিজের মেয়েদের উপর বিশ্বাস থাকে তাহলে মানা করার প্রশ্নই আসে না! চৌধুরী সাহেব, আপনার বোন দুর্বল ছিলো। তাই অন্যায় না সইতে পেরে আত্মহত্যা করেছে। ওরা দুইজন তো দুর্বল নয় বরং সাহসী ও প্রতিবাদী। বোনের দুঃখে কেঁদেছেন। মেয়েদুটোকে নিয়ে গেলে তাদের চোখের পানিও আপনাকে দেখতে হবে! এরচেয়ে ভালো মেনে নিন ওদের সুখটা।"

সবদিক বিচার-বিবেচনা করে বিধ্বস্ত ভাবনায় ডুবে গেলেন দুই স্বামী-স্ত্রী। ভেবে দেখলেন, তারা দুইজন ছাড়া কেউ-ই নেই তাদের পক্ষে। সবাই শুধু দুই ভাইয়ের পক্ষেই যাচ্ছে! এতগুলো মানুষ তো আর ভুল সিদ্ধান্ত নিবে না। আর ওরা আয়ান, আয়মান সম্পর্কে যা যা বলল তা ওদের সিদ্ধান্ত বদলানোর ভাবনা ভাবতে বাধ্য করলো। তবুও এক ভাবনায় সিদ্ধান্ত তারা নেবে না! বারবার ভাববে, কি করা যায়?

স্নিগ্ধ প্রেমের মায়া গল্পটি তিয়াশা চৌধুরী-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক ও রোমান্টিক থ্রিলার গল্প