স্নিগ্ধ প্রেমের মায়া

পর্ব - ৩৮

🟢

পিনপতন নিরবতা বিরাজমান কেবিনজুড়ে। আয়মানের কথা যেনও ছোটখাটো বজ্রপাত করেছে সে স্থানে। সবাই স্তব্ধ দাঁড়িয়ে সেই বজ্রপাতের ধাক্কা সামলাতে। পিয়াসকে উদ্দেশ্য করে আয়মানের বলা সেই কথা-

"প্রিয়ন্তী অজ্ঞান হয়ে বেডে শুয়ে আছে বলে শুধু ওর কথাই চিন্তা করবি? এক বোন অসুস্থ বলে অন্য বোনকে ভুলে যাবি, এটা তো ঠিক না!"

প্রিয়া অবাক বিস্ময়ে অস্ফুটে উচ্চারণ করলো,

"আরেকটা বোন!"

পিয়াস এক পলক তাকালো প্রিয়ার দিকে। পরপর দৃষ্টি ঘুরিয়ে আয়মানের দিক ফিরলো। শুকনো ঢোক গিলে বলল,

"তুই কি করে জানলি?"

আয়মান বলল,

"আমি এতটাও বোকা নই যে কিছু বুঝবো না। জ্ঞান হারানোর আগে প্রিয়ন্তী বলে গিয়েছে ওর কিছু হলে ওর শেষ ইচ্ছে যেনও পূরণ করা হয়। জানিস সেই ইচ্ছেটা কি ছিলো?"

পিয়াস-স্বজনী একে-অপরের সাথে দৃষ্টি বিনিময় করলো। তাদের চেহারায় ঘাবড়ে যাওয়ার ছাপ। সবচেয়ে বেশি ঘাবড়ানোর চিহ্ন ফুটে উঠেছে আয়ানের চেহারায়। ভীত-সন্ত্রস্ত দৃষ্টি সোজা সামনে মেলে শক্ত করে চেপে ধরেছে প্রিয়ার হাত। শুধু প্রিয়ার চেহারায় ঘাবড়ানোর ছাপ নেই। আছে তো শুধু দুর্দান্ত কৌতুহল। সবাইকে নিশ্চুপ দেখে ও-ই জিজ্ঞেস করলো,

"কি বলেছিলো পিয়ন্তী?"

আয়মান প্রতিত্তোরে বলল,

"প্রিয়ন্তী বলেছিলো, ওর পরিবার যেনও আয়ান ভাইয়া ও প্রিয়া ভাবিকে আলাদা না করে!"

আয়ানের হাত বিবশ হয়ে প্রিয়ার হাতের বাঁধন আলগা করে ফেলেছে। যা বোঝার বুঝে নিয়েছে এই কথাতেই। শুধু বুঝে নি প্রিয়া। এইসব হেয়ালীপূর্ণ কথাবার্তা তার মাথায় ঢুকছে না। ধৈর্যহারা হয়ে এক প্রকার চেঁচিয়ে বলল,

"কি বলতে চাইছো তোমরা? একটু পরিষ্কার করে বলবে, প্লিজ? প্রিয়ন্তী কেনও জানাবে এমন ইচ্ছের কথা?"

পিয়াস থমথমে মুখে বলল,

"আমি জানি ও কেনও এমন ইচ্ছার কথা বলেছে। আর ওর ইচ্ছা পূরণ করবো আমরা। প্রিয়ার সত্যিটা কোনোদিনও মা-বাবাকে জানাবো না।"

এবার আয়ানের মনে সাহস সঞ্চার হলো। পুনরায় শক্ত করলো হাতের বাঁধন। জোর গলায় বলল,

"কেউ জানুক বা না জানুক! আমি তো প্রিয়াকে আমার কাছ থেকে নিয়ে যেতে দিবো না!"

আয়মান হাসি ফুটিয়ে বলল,

"তোমার থেকে যেনও কেউ ভাবিকে কেড়ে নিয়ে না যায়, তাই তো প্রিয়ন্তী সব ছেড়ে পালাচ্ছিলো। সব জেনেও এত বড় সত্যিটা লুকিয়ে যাচ্ছিলো, শুধু তোমাদের জন্য।"

পিয়াস হতভম্ব। বিস্ময় নিয়ে বলল,

"প্রিয়ন্তী সব জেনে গেছে?"

আয়মান মাথা নাড়লো। একবার প্রিয়ন্তীর মুখশ্রীতে দৃষ্টি বুলিয়ে বলল,

"হ্যাঁ। কাল রাতে ও নিজেই আমার কাছে সব জানতে চেয়েছিলো। আমি কি তখন জানতাম ও তোর বোন? বলে দিয়েছি সব ইতিহাস। এটাও বলে ফেলেছিলাম, তোর বোনের সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই আর হওয়া সম্ভবও নয়। অতীতের দহনে এটা অসম্ভব। এটাতেই হয়তো আমার উপর খুব অভিমান হয়েছে ওর। দেখ না, কেমন আমাকে ফাঁকি দিয়ে চলে যাওয়ার প্ল্যান করে ফেলেছে!"

বলতে বলতে ভিজে উঠলো আয়মানের চোখ। পিয়াস ওর কাঁধে হাত রেখে বলল,

"কিচ্ছু হবে না ওর। এত ভালোবাসার পর কেউ সেই ভালোবাসা দূরে ঠেলে পালিয়ে যেতে পারে নাকি?"

আয়ান বলল,

"কিন্তু তোমার মা-বাবার ব্যাপারটা কি করবো, পিয়াস? তোমার দুটো বোনকে নিয়েই তো ঝামেলা করবে তারা!"

প্রিয়া আয়ানের থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিলো। ঝাঁঝালো কন্ঠে বলল,

"আপনারা কি বলতে চাইছেন, সেটা আমাকে পরিষ্কার করে বলবেন? কে উনার বোন?"

আয়মান ভণিতাহীন উত্তর দিলো,

"আপনি। আপনি পিয়াসের ছোট বোন। আপনিই প্রিয়ন্তীর বড় বোন। আমার বাবা যে দু'জনকে খু*ন করেছিলো তারা আপনার মা-বাবা আর প্রিয়ন্তীর চাচা-চাচি। আর নদীতে ভাসিয়ে দেয়া মেয়েটি আপনি ছিলেন। যাকে পরবর্তীতে হেনা আন্টি পেয়ে গেছিলো।"

প্রিয়া সম্পূর্ণরূপে স্তব্ধ হয়ে গেলো এই কথা শুনে। বিস্ময়ে কথা হারিয়ে হা করে রইলো। বড় বড় নেত্রপল্লব আরও বড় করে চেয়ে রইলো। কম্পনরত পায়ে দু'কদম পিছিয়ে গিয়ে ধপ করে বসে পড়লো চেয়ারে। কিছু সেকেন্ডের ব্যবধানে তার পুরো পৃথিবী উলটপালট হয়ে স্থির পড়ে রইলো। প্রিয়া বিস্ময়ে স্বল্প কিছু শব্দ উচ্চারণ করলো মুখ থেকে.

"মানে আমি ওদের বোন?"

আয়মান মাথা ঝাঁকালো। বলল,

"প্রিয়ন্তী যখন রাস্তায় ওর ইচ্ছের কথা বলল, তখন আমি ওর কথায় খুব একটা গুরুত্ব দেই নি। দিতামই বা কিভাবে? বিভোর ছিলাম প্রিয়ন্তীর চিন্তায়। তারপর হসপিটালে আসার পর যখন ভাবি বলল, তার আর প্রিয়ন্তীর ব্লাড গ্রুপ সেম তখন আমার মনে ঘটকা লাগলো। পুনরায় ভাবতে বসলাম, প্রিয়ন্তীর বলা কথাগুলো। তারপর কাহিনি মিলাতে বেশি সময় লাগে নি আমার!"

এতটুকু বলে আয়মান থামলো। সময় দিলো প্রিয়াকে ধাক্কা সামলানোর। যখন বুঝলো প্রিয়া নিজেকে কিছুটা সামলে ফেলেছে তখন শুরু করলো অতীতে ফিরে যাওয়া। কাল যেভাবে প্রিয়ন্তীকে সব বলেছে, তারই পূর্ণ-পূর্ণ বর্ণনা করলো আবারও। আস্তে আস্তে পুরো বিষয়টা ঢুকে গেলো প্রিয়ার মস্তিষ্কে। এখন বুঝলো, কেনও আয়মানের প্রিয়ন্তীকে হারিয়ে ফেলার এত ভয়! কেনই বা আয়ান পিয়াসের অন্য বোনের কথা শুনে এত ঘাবড়ে গেলো! নিজের ভাগ্যের প্রতি আফসোস হলো প্রিয়ার। কেনও এত নিষ্ঠুর খেলা খেলল এ ভাগ্য?

আয়ান বুঝতে পারলো আকস্মিক ঝড়ে প্রিয়া নিস্তব্ধ হয়ে পড়েছে। ওর এহেন অবস্থা দেখে অনুশোচনায় ছেয়ে গেলো ওর মন। সে প্রিয়ার সামনে গিয়ে হাঁটু মুড়ে বসে পড়লো। ওর হাত ধরে অনুতপ্ততার সুরে বলল,

"আমি চেয়েছিলাম তোমাকে দুনিয়ার সব সুখ এনে দিতে। অথচ দেখো, আমার বাবা-ই তোমার থেকে তোমার সব সুখ বহুবছর আগেই কেড়ে নিয়েছে।"

প্রিয়া হতবিহ্বল দৃষ্টিতে তাকালো আয়ানের দিকে। কিন্তু উত্তর দিলো না। আয়ান মাথা নুইয়ে বলল,

"তোমার সাথে বাবা যা করেছে তার কোনো ক্ষমা হয় না, প্রিয়া। তোমার মা-বাবা, তোমার ভাই-বোন, তোমার পরিবার সবকিছু কেড়ে নিয়েছে উনি। এরজন্য আদ্যো কিভাবে ক্ষমা চাইতে হয়, আমি জানি না। আমি শুধু বলবো, বাবার পাপের শাস্তিটা আমায় দিও না প্লিজ। নিজের মা-বাবার পরিনতির কথা ভেবে আমায় ছেড়ে যেও না।"

প্রিয়া অশ্রুসিক্ত নয়নে নিষ্পলক চেয়ে রইলো আয়ানের দিকে। এই স্বল্প সময়ে ভীষণ ভালোবেসে ফেলেছে এই মানুষটাকে। কে জানতো, পরিবারকে জড়িয়ে তাদের এমন বিষাক্ত অতীত থাকবে? আয়ানকে পেয়ে মনে হয়েছিলো জীবনের প্রাপ্তির খাতার সব পাতা বোধহয় পূর্ণ! তাহলে কেনও ঘুরে-ফিরে এলো অতীতের অপূর্ণতা? এটা তো ও চায় নি।

আয়ান মেনে নিতে পারছে না ওর নিশ্চুপতা। ওকে চুপ থাকতে দেখে বারবার মনে হচ্ছে, প্রিয়া ওকে ছেড়ে চলে যাবে। নিজের মা-বাবার খু*নীর ছেলের সাথে কোনোভাবেই সংসার করবে না ও। এতেই ভয়ে হৃৎপিণ্ড লাফাতে শুরু করেছে৷

পিয়াস তীক্ষ্ণ নজরে চেয়ে দেখছে এই ঘটনা। স্বজনীও পাশে দাঁড়িয়ে চোখের জল ফেলছে। পিয়াস আয়মানের উদ্দেশ্য করে বলল,

"প্রিয়াকে কি সব বলা উচিত হলো, আয়মান? আমি সবসময় এটাই চেয়ে এসেছি ওরা দুইজন যেনও একসাথে খুব সুখে থাকে। এসব শুনে কি প্রিয়া আয়ান ভাইয়ার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবে?"

আয়মান হতাশ শ্বাস ফেলে বলল,

"মুখ ফেরাবে কি না, আমি জানি না! আমি শুধু জানি, সবার-ই অতীতটা জানা প্রয়োজন। অতীত জানুক, তারপর বিষাক্ত কাঁটাতার পেরিয়ে বের হোক তিক্ততার ছায়া থেকে। তারপর সব অতীত ভুলে সুন্দরভাবে সবকিছু শুরু হোক। অজানা থেকে জেনে-শুনে হাত ধরুক একে অপরের। তাহলে অতীত সামনে আসার ভয়ে কাউকেই আর গুমড়ে মরতে হবে না।"

স্বজনী সম্মতি প্রকাশ করলো আয়মানের কথায়। পিয়াসকে বলল,

"ঠিকই বলেছে উনি। জানো তো, সত্যি বেশিদিন চাপা থাকে না। এক না একদিন ঠিকই সামনে আসবে। আর তারপর? তারপর ভালোবাসা আর পরিবারের মধ্যে দ্বিধাদ্বন্দে ভুগে অঘটন ঘটিয়ে নিথর পড়ে থাকতে হবে প্রিয়ন্তীর মতো। এরচেয়ে সব আগেই হওয়া ভালো!"

আয়ানের মুখখানা একদম ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। ভীষণ ভয় পাচ্ছে, প্রিয়াকে হারিয়ে ফেলার। এদিকে প্রিয়াও কিছু বলছে না। এর ফলে ওর দুশ্চিন্তার মাত্রা আরও তুঙ্গে উঠে যাচ্ছে। আয়ান কাতর স্বরে ওকে অনুরোধ করে বলল,

"এভাবে চুপ থেকো না প্লিজ! কিছু তো বলো। অন্য কারো পাপের শাস্তি আমায় দিবে না তো?"

প্রিয়া সব ভুলে মৃদু হাসলো ওর পাগলামী দেখে। বলল,

"পাপ যে করেছে তার শাস্তি সে নিজেই পাচ্ছে। অন্যের পাপের শাস্তি আপনাকে দিবো? এতটাও অমানবিক হই নি আমি!"

প্রশান্তির হাওয়া বয়ে গেলো রুমজুড়ে। স্বজনী সস্থির নিশ্বাস ফেলে বলল,

"আমি জানতাম, প্রিয়া অবুঝের মতো কোনো কাজ করবে না।"

বিশাল এক পাথর নেমে গেলো আয়ানের বক্ষভাগের উপর থেকে। উত্তেজনায় আরও শক্ত করে প্রিয়ার হাত মুঠোয় চেপে ধরলো। বলল,

"আমার বাবা শৈশবকালে তোমার থেকে তোমার পুরো পরিবার কেড়ে নিয়েছে। তোমার সব সুখ বাবা শেষ করেছিলো। এখন আমি প্রমিজ করছি, আমি আমার সাধ্য অনুযায়ী সব সুখ এনে দিবো তোমাকে। সব সুখ বিছিয়ে দিবো তোমার পায়ের নিচে।"

প্রিয়া উত্তর না দিয়ে শুধু অশ্রুসমেত হাসলো। পরপর জড়িয়ে ধরলো একে-অপরকে। এতটা নিবিড়ভাবে, যেনও কেউ কারো থেকে দূরে যাওয়ার কোনো সুযোগ না পায়।

আয়মান চোখ নামিয়ে অন্যদিকে ফিরে গেছে। শুধু চেয়ে আছে পিয়াস। স্বজনী ওকে ধাক্কা দিয়ে বলল,

"এভাবে কি দেখছো? বোন হয় তোমার!"

পিয়াস চোখ সরিয়ে স্বজনীর দিকে তাকালো। প্রশান্তিতে বুক ফুলিয়ে বলল,

"আমার বোন হয় বলেই তো দেখছি। নজর জুড়াচ্ছি নিজের। ছোট বোনকে তার উপযুক্ত জীবনসঙ্গীর সাথে সুখে দেখার মতো বড় প্রশান্তি কোনো ভাইয়ের জন্য হয়তো এই দুনিয়ায় আর নেই!"

স্বজনী স্মিত হেসে বলল,

"এবার কি করবে? দু'বোনের সুখ আমরা দেখছি। মা-বাবা তো আর দেখবে না। তাদেরকে ম্যানেজ করবো কিভাবে?"

পিয়াস ভ্রু কুঁচকে ওর দিক চেয়ে বলল,

"তুমি তো এমনভাবে বলছো যেনও আমরা ওদের ধরে জোর করে বিয়ে দিয়ে দিয়েছি। এজন্য বাসায় বলতে বিস্তর প্রবলেম!"

স্বজনী পালটা উত্তর দিলো,

"আমরা জোর করে না দিলেও বিয়ে তো হয়েছে। বাসায় প্রবলেম তো আরও আগে আছে! জানলে যে কি হবে, কে জানে?!"

ওর কথায় দুশ্চিন্তার আভাস। পিয়াস এসব একদম উড়িয়ে দিয়ে বলল,

"আল্লাহ যদি ওদের বিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে পারে, তাহলে জুড়ে রাখার ব্যাপারটাও তিনিই করবে।"

প্রিয়ার হঠাৎ মনে পড়লো এই কেবিনে তারা ছাড়াও তার বড় ভাই-ভাবি আছে। অস্বস্তিতে গাঁট হয়ে আয়ানকে ছাড়াতে চাইলো নিজের থেকে। কিন্তু সে নাছোড়বান্দা বান্দা মানুষ তাকে ছাড়ছেই না। শেষ না পেরে নিম্ম স্বরে বলল,

"ছাড়ুন আমাকে। এখানে আমার বড় ভাই আছে।"

আয়ান বলল,

"থাকুক তোমার বড় ভাই। আমার তো ছোট, তাই না? আমি তো আমার বউকে জড়িয়ে ধরেছি। কার কি?"

কথাটা আয়ান একটু জোরেই বলে ফেলেছে। স্বজনীর সাথে কথায় ব্যস্ত থাকার পরও পিয়াসের কান অব্দি পৌঁছে গেছে এই বাণী। সে বেচারা নিজেই অস্বস্তিতে পড়ে ঘাড় নিচু করে মাথা চুলকালো। আস্তে করে বলল,

"দুই দুইটা বোনের বড় ভাই হয়েও পাত্তা পাচ্ছি না। কি সুন্দর অবলীলায় সব বলে যাচ্ছে! আয়মানের স্বভাব তো আগে থেকেই জানা ছিলো। এখন দেখছি সে এসব বড় ভাই থেকেই আয়ত্ত্ব করেছে।"

স্বজনী কটমট করে বলল,

"তুমি নিজেই তো বোনদের পাত্তা দাও না। এজন্য বোন জামাইরা তোমাকেও পাত্তা দিবে না। সুদে-আসলে হিসাব বরাবর।"

প্রিয়া আয়ানের কথা শুনে নিজেই হতভম্ব হয়ে গেছে। সে আয়ানকে এক প্রকার ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে কিছুটা দূরে সরে দাঁড়ালো। তখনও মাথা নিচু করে রয়েছে ও। আয়ান স্বাভাবিক। সে পিয়াসের কাছে এসে বলল,

"এত বছর পর পেয়েছো তোমার বোনকে। একটু কথাও বলবে না?"

আবেগে আপ্লুত হয়ে মাথা ঝাঁকালো পিয়াস। পরপর সোজা হাজির হলো প্রিয়ার সামনে। লম্বা শ্বাস নিয়ে স্বাভাবিক করলো নিজের ভিতরকার অস্থিরতা। থেমে থেমে বলল,

"প্রিয়া.. তুমি.."

প্রিয়া মাঝপথে থামিয়ে দিলো পিয়াসকে। কাঁপা কন্ঠে বলল,

"ভাইয়া! আমাকে কি তুই করে আর বনু বলে ডাকা যাচ্ছে না? যেভাবে ঢোকার সাথে সাথে প্রিয়ন্তীকে ডাকলে?"

পিয়াস থমকে গেলো। পূর্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো প্রিয়ার মুখপানে। তার ডাগর চোখে পানি টলমল করছে। পিয়াসের চোখেও অশ্রুরা হানা দিলো। জোরে জোরে মাথা ঝাঁকিয়ে বলল,

"অবশ্যই ডাকা যায়। একটা বোনকে ডাকবো, আরেকটা বোনকে ডাকবো না এটা কখনও হয়? তোকেও ডাকবো বনু!"

প্রিয়া কাঁদতে কাঁদতে জড়িয়ে ধরলো ভাইকে। তার কান্নার দমকে পরিবেশ ভারি হয়ে উঠলো। জীবনের একুশটা বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর দুই ভাই-বোন একত্রিত হয়েছে। সময়ও যেনও থেমে গিয়ে স্বাক্ষী হচ্ছে অপূর্ব সুন্দর এই মুহুর্তের। প্রিয়ন্তী যেদিন থেকে জেনেছে প্রিয়া ওর বোন, সেদিন থেকে এমন একটা মুহুর্তের জন্য ভীষণ শখ করেছিলো। তার সেই শখটা তার সামনেই পূরণ হয়েছে, অথচ সে নিজে নিথর পড়ে রয়েছে।

পিয়াস প্রিয়াকে ছাড়িয়ে ওর চোখে পানি মুছলো। মিথ্যা ধমক দিয়ে বলল,

"কাঁদছিস কেনও? এতগুলো বছর পর তোকে দেখছি, এইভাবে কান্নাকাটি করে ফোলা মুখ দেখার জন্য? একদম না! হাসিখুশি দেখার জন্য।"

প্রিয়া চোখের পানি আড়াল করে হাসলো। বলল,

"বেশি খুশিতে কান্না পাচ্ছে ভাইয়া। আমি কোনোদিনও ভাবি নি আমার ভাই-বোনকে আমি ফেরত পাবো।"

স্বজনী ভাব নিয়ে বলল,

"ভাই-বোনকে ফিরে পাওয়ার আশা করে নি, তাও পেয়ে গেছে। এজন্য ভাবির দামই নেই?"

প্রিয়া পিয়াসের সামনে থেকে সরে হাজির হলো স্বজনীর সামনে। ওর গলা জড়িয়ে ধরে বলল,

"তোমার তো বেশি দাম, ভাবি! যেদিন ভাইয়া পেয়েছি সাথে ফ্রি ভাবিও পেয়েছি। আমার তো ভাবি পাওয়ার শখ পূরণ হয়ে গেলো।"

স্বজনীও আলিঙ্গন করে বলল,

"আমার তোমাকে পাওয়ার শখ পূরণ হলো।"

খানিক বাদে প্রিয়া গিয়ে বসলো প্রিয়ন্তীর পাশে। আঁখিদ্বয় ভিজে আসা জল টুপ করে এক ফোঁটা গড়িয়ে পড়লো প্রিয়ন্তীর হাতে। কান্না গিলে বলল,

"আচ্ছা, ও তো জানতো আমি ওর বোন। তখন থেকে কি ও অপেক্ষা করে নি, আমি কবে জানবো? অবশ্যই করেছে। আজ আমি জেনেছি ও আমার বোন। একটু জড়িয়ে ধরবে না আমাকে? কখন উঠবে ও?"

বলতে বলতে হেঁচকি উঠে গেছে ওর। স্বজনী সামলালো ওকে। বলল,

"জলদিই উঠবে। ওর যেই শখ পূরণ হয়েছে, সেটা স্বচক্ষে দেখা এখনও বাকি। এখন শুধু প্রিয়ন্তীর সুস্থ হওয়ার অপেক্ষায়!"

তাদের এই আবেগে আপ্লুত সময়টুকুতে দুই ভাই নিরব দর্শক। তারা সার্থক বোনকে ভাইয়ের কাছে ফিরিয়ে দিতে পেরেই। যখন চারদিক থেকে খারাপ খবরে ভরে যাচ্ছিলো তখন এই দৃশ্য একটুখানি স্বান্ত্বনার মতো কাজ করলো। শুকনো মরুভূমিতে এক পষলা বৃষ্টির ন্যায় প্রশান্তি দিলো পিয়াসের আচরণ।

এতকিছুর ভিড়েও বিক্ষিপ্ত চিত্ত আয়মানের। সে অস্থির নয়নে বারবার দেখে যাচ্ছে প্রিয়ন্তীকে। যদি একটুখানি নড়াচড়া টের পাওয়া যায়! কিন্তু প্রত্যেকবারই সে আশাহত হচ্ছে। মন বলছে, সবকিছু ঠিক হয়েও যেন হয় নি! ঝড়ের পূর্বের শান্ত পরিবেশ ভয়ংকর কালবৈশাখীর লক্ষণ..!

স্নিগ্ধ প্রেমের মায়া গল্পটি তিয়াশা চৌধুরী-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক ও রোমান্টিক থ্রিলার গল্প