অবেলার অতিথি

পর্ব - ৯

🟢

শহরের অন্তস্তলকে শান্ত করে কঙ্কাবতী দরজা খুলে

দাড়ালো তার সামনে।উদ্বিগ্ন শহরের ঘনঘন নিঃশ্বাস ফেলতে থাকা বক্ষস্থল দেখেও যেন কঙ্কাবতীর পরিবর্তন হলো না।শহর নিজেই জিজ্ঞেস করলো....

"এতোক্ষণ কি করছিলে।দরজা কেন খুলো নি?এতবার ডাকলাম?"

কঙ্কাবতী দরজা থেকে ধীর পায়ে সরে এসে বললো...

"চেঞ্জ করছিলাম।"

শহরও রুমে ঢুকতে ঢুকতে বললো...

"তো এতে করে ডাকলাম।উত্তর দাও নি কেন হুম?"

কঙ্কা ঘাড় ফিরিয়ে তাকালো।ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো....

"দিলাম তো উত্তর। আপনি শুনেন নি?"

শহর আর কিছু বললো না।ঘন একটা নিশ্বাস ফেলে বিছানায় বসলো।দুজনই চুপ।কেউ কিচ্ছুটি বলছে না।এভাবে ঠিক কতক্ষণ কাটলো জানা নেই।একটু পর শহর নিজেই করুন কন্ঠে বলে উঠলো...

"আ'ম সো সরি কঙ্কাবতী।আমি তখন হসপিটালে..."

ফিচেল হাসলো কঙ্কা।তাচ্ছিল্য স্বরে বললো...

"সরি কেন বলছেন?ভালোবাসা কি কোনো অপরাধ নাকি?"

শহর চুপ হয়ে গেলো।কঙ্কা একবার আড়চোখে শহরের দিকে তাকিয়ে মনোযোগ দিলো বিছানা গোছানোর কাজে।একটু পর৷ আবার বললো....

"আমার খুব ক্লাস ক্লান্ত লাগছে।ঘুমাবো কিছুক্ষণ, আপনি এবার রুম থেকে বেরিয়ে গেলে ভালো হতো।"

কঙ্কার কথায় শহর ভ্রু কুঁচকে বললো...

"আমায় যেতে বলছো যে?এতদিন তো আমার সাথে ঘুমানোর জন্য পাগলামি করতে।"

একটা ঘন শ্বাস ফেলে কঙ্কা বললো...

"আজ আর ইচ্ছে করছে না।একা থাকতে চাই একটু।ঘুমাবো,ঘুমাতে দিন আমায়?"

কি নিঃসংকোচে আবদার।শহর কি আর তা উপেক্ষা করতে পারে? পারলো না তো,এই যে এখনও সোজা উঠে দাঁড়িয়ে গেলো।রুমের বাইরে যাওয়ার আগে সাবধানী কন্ঠে কঙ্কাকে বলে গেলো..

"ঘুমাও তুমি।আমি বিরক্ত করছি না।তবে দরজায় খিল দেবে না একদম।মনে থাকে যেন।"

কঙ্কা হ্যা বা না কিছুই বললো না।শহরও আর কিছু না বলেই চলে গেলো।

রাতের খাবার টেবিলে বেরে নিয়ে শহর কঙ্কার রুমে গিয়ে ডাকলো।কিন্তু কঙ্কা উঠলো না, ঘুম ঘুম কন্ঠেই বললো শহরকে খেয়ে নিতে।ও একটু পরে উঠে নিজেরটা খেয়ে নেবে।কথা বাড়ানো শহরের ভালো লাগে না।তাই তো কঙ্কাকে আর জোর না করে নিজেও দোতলার রুমটায় গিয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিলো।কাল সারাটা রাত ঘুম হয়নি।প্রথমে কঙ্কাকে হেনস্তা করার অপেক্ষায় পরে আবার সেই কঙ্কার চিন্তায়,হসপিটালের করিডোরে এপাশ ওপাশ করেই কাটিয়ে দিয়েছিলো পুরোটা সময়।

চোখ দুটো যখন ক্লান্ততায় ভিরিয়ে আসতে যাবে তখনই বালিশের পাশে থাকা ফোনটি বেজে উঠলো। শহর জনে এই সময় কে কল করতে পারে,তবে ইচ্ছে হলো না রিসিভ করার।তাইতো এক হাতে ফোনটির সাইড বাটন চেপে সুইচ অফ করে রাখলো ফোনটা।

রাতের অনেকটা সময় পাড় হয়ে যাওয়ার পরও শহরের চোখে ঘুম নেই।তবে সে বুঝতে পারছে ঘুমটা খুব প্রয়োজন তার।ক্লান্ততা ভরপুর,তবুও ঘুম নেই।কেন?

বিছানায় উপুর হয়ে শুয়ে পাশের খালি জায়গাটায় এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সে।ফাঁকা, আজ পুরো জায়গাটাই ফাঁকা। অথচ গতকালই এই সময় এই জায়গায় চুপটি করে হাত গুটিয়ে ঘুমাচ্ছিলো কঙ্কাবতী।শহরও ঠিক এভাবেই তাকিয়ে ছিলো তার ঘুমন্ত মুখটির দিকে।তখনও তো একবারও মনে হয় নি যে একটা দিন সেই মুখখানা না দেখলে ঘুম হবে না শহরের।

এপাশ ওপাশ করেও যখন ঘুম আসছিলো না, তখন আর দেরি করলো না শহর।উঠে গিয়ে নিচ তলায় কঙ্কার রুমে পৌঁছালো। দরজাটা ভিরানোই ছিলো।আস্তে করে সেটি খুলতেই শহরের চোখ আটকে গেলো।নরম বিছানায় ঠিক সেই দিনের মতোই কঙ্কাবতী কাতরাচ্ছে।আবার?

দৌড়ে গিয়ে ঝুকলো সে কঙ্কার দিকে।কয়েকবার ডাকার পরও কঙ্কা স্বাভাবিক হচ্ছে না দেখে শহর কিছু না ভেবেই কঙ্কাকে শক্ত করে নিজের সাথে চেপে ধরলো।হাতের মুষ্টিবদ্ধ বাধন ছেড়ে যেন বেরিয়ে যাওয়ার উপক্রম কঙ্কার। তবুও শহর ছাড়ছে না।নিজের সর্ব শক্তি দিয়ে বাহুডোরে আবদ্ধ করে রেখেছে কঙ্কাবতীকে।মিনিট দুয়েক ওভাবেই যায়।কঙ্কাবতীও আবার নিস্তেজ হয়ে ঢলে পরে শহরের বুকের মাঝেই।বক্ষস্থল কম্পমান দুজনেরই কারোর এক রোগের বতস হয়ে আবার কারো সে জন হারানোর ভয়ে।কঙ্কাবতী ঘুমিয়ে আছে বুঝতে পেরে শক্ত হাতের বাধন একটু নরম করলো শহর।তবে ছাড়লো না কঙ্কাকে।পাশ থেকে একটি বালিশ নিয়ে খাটের বোর্ডে ঠেকিয়ে নিজেও আধশোয়া হলো সেথায়।বুকের মাঝে কঙ্কাবতীর অবস্থান।বিছানায় তো অঢেল জায়গা।তবুও শহরের ইচ্ছে করছে না কঙ্কাবতীকে পাশে শুইয়ে দিতে।এই যে একটু প্রশান্তি পাচ্ছে সে,তা তো কঙ্কাবতীর সংস্পর্শে থেকেই।বুকের একপাশে কঙ্কাবতীর নিখুঁত স্পর্শের মিষ্টি আভাস,আর অন্য পাশে তীব্র খারাপ লাগা নিজের প্রতি।

চোখ নামিয়ে কঙ্কাবতীর ঘুমন্ত নিষ্পাপ মুখটার দিকে তাকিয়ে অজানায় হারাতে চাইলো শহর,কিন্তু চাইলেই কি অজানায় হারানো যায়?অজানায় তো সুখ সুখ শুধু সুখই থাকে।তাহলে কঙ্কাবতীর কষ্ট নিয়ে শহর কি করে অজানায় হারাবে?

তাই হারিয়ে যাওয়ার পন্থিখানা আর অবলম্বন না করে আপন মনেই ভাবলো শহর..

এই কঙ্কাবতী তাকে তার থেকেও বেশি ভালোবাসে।হ্যা,ঠিক ততটাই ভালোবাসে যতটা ভালোবাসা সে কখনো পাবে বলে আশাই করে নি।না নিজের থেকে আর না প্রিয় চৈত্র মাসের থেকে।

এই যে কঙ্কাবতী কি দারুন নিজের যন্ত্রণা গুলো নীরবে নিভৃতে সয়ে যাচ্ছে। এতগুলো দিন শহরের থেকে এতো এতো বাজে কথা শুনেও সে একটি বারও তো বলেনি 'এসব বলবেন না দয়া করে,আমার শুনতে খারাপ লাগে।' অথচ কঙ্কাবতীর অন্তরে শহরের প্রতিটি কথাই তীক্ষ্ণ আঘাত হেনেছে বারনবার।আর বোকা, অন্ধ প্রেমে আবদ্ধ শহর ভেবেছি কঙ্কাবতী নিতান্তই এক বেহায়য়া প্রকৃতির মেয়ে।যার কোনো পারিবারিক শিক্ষা নেই,তাইতো এতো এতো অপমানের পরও সে শহর স্যারের পিছু ছাড়লো না।

দাম্পত্য জীবনে নানা ঝঞ্ঝাবায় দেখা যায় স্ত্রী স্বামীকে নিজের থেকে দুরে থাকতে বলে।আর এখানে শহর কঙ্কাবতীকে বলেছে তাকে না ছুঁয়ে থাকতে।নাহ, কোনো সময় সীমা দেয় নি।ইহা হয়তো তাদের বৈবাহিক জীবনের ইতি পর্যন্তই থাকতে পারে,তবুও কঙ্কাবতী মেনে নিলো তা,সে অনুমতি ব্যতীত ছুঁবে না তার শহর স্যারকে। স্ব শারীরিক সুখ নারী পুরুষ উভয়ই চায়।কঙ্কাবতীও তো চায় প্রিয় মানুষটির সান্নিধ্য।আরো চায় ক্লান্ত মস্তিষ্ক শান্ত করতে,তার আপনের বুকে মাথা ঠেকিয়ে।

ভাবতে ভাবতেই আলতো হাতে কঙ্কাবতীর কপালে লেপ্টে থাকা চুলগুলো সরিয়ে দিলো শহর।কঙ্কাবতীর ডান ভ্রু ছুইছুই করে একটি ব্রন বেশ ভালো ভাবেই জায়গা দখল করে নিয়েছে।কঙ্কাবতীর ফর্সা কপালে ব্রনটা একদম লাল টসটসে টমেটোর মতো হয়ে আছে যেন। ইশশ,ব্রনও এত্তো কিউট দেখতে হয় বুঝি কখনো?

নিজেকে কেমন এক ঘোরের মধ্যে পেলো যেন শহর।আস্তে করে নিজের ওষ্ঠ ছুঁইয়ে দিলো সেই ব্রনটার উপর।একবার, দুবার, তিনবার করতে করতে বহুবার হলো ঔষ্ঠ ছোঁয়া। ধীরে ধীরে ঔষ্ঠ গিয়ে ঠেকলো কঙ্কাবতীর কপালের মাঝখানে। ঠিক কতবার একই কাজের পুনরাবৃত্তি হলো জানা নেই শহরের।বেশ কিছুক্ষণ পর থেমে হঠাৎই তার চোখ আটকালো কঙ্কাবতীর টসটসা ফুলের পাপড়ির ন্যয় চিকন রেখার ঠোটগুলোতে।ইশশ,কত বছর যেন সেই ঠোঁট জোড়ায় শিশির কনার স্পর্শ ঘটেনি।পানির অভাবে যেন শুকিয়ে আছে ঠোঁট জোড়া। শহরের বেশ মায়া হলো ঠোঁট জোড়ার উপর।ইচ্ছে হলো একটু ভিজিয়ে দিক নিজের লালাভ শিশির বিন্দু দ্বারা।

ইচ্ছেটাকে আর আটকালো না শহর।কঙ্কাবতী আর কঙ্কাবতী ছারা দ্বিতীয় কোনো কিছুর কথাই চিন্তা করলো না আজ আর।না কোনো প্রিয় চৈত্র মাস,আর না ভিন্নস্নাতের নারী লোভ।কঙ্কাবতী তো তারই তিন কবুল পরে ঘরে তোলা বউ।এই শহরের সম্পূর্ণ হক রয়েছে পুরো কঙ্কাবতীর উপর।তাহলে ইচ্ছে কেন অপূর্ণ রাখবে? রাখেও নি শহর।

ঝাপ মেরেই দখল করে নিলো কঙ্কাবতীর শুষ্ক ঠোঁট জোড়া।কেঁপে উঠলো কঙ্কাবতী।শহরের বুকের কাছে ধরে রাখা শার্টের উপর হাতের বাধন টা আরো শক্ত হয়ে এলো।কঙ্কাবতীর ছোট্ট দেহখানা আরো কুঞ্চিত হলো শহরের বক্ষে।শিহরন, শিহরন সুর যে বইছে কঙ্কাবতীর সারা অঙ্গে,তা যেন নিমিত্তেই জানান দিলো শহরের চিত্তে।নারীর এরুপ শিহরন যে পুরুষকে আরো গভীরে নিয়ে যায় তা জানা ছিলো না শহরের।উত্তেজনায় নাক দিয়ে স্বাভাবিক নিশ্বাস ফেলতে কষ্ট হচ্ছে শহরের।তবুও যেন ছাড়তে চাইলো না কঙ্কাবতীর ঔষ্ঠ জোড়া।গভীর,আরো আরো আরো গভীর ভাবেই নিজের সাথে মিশিয়ে নিতে লাগলো শহর তার কঙ্কাবতীকে।

চৈত্রের মতো কঙ্কাবতী তালে তাল মিলাচ্ছে না।শুধু শিহরনে বারবার কেঁপে উঠছে,রাঙাবতীর ন্যয় নিজেকে যে লজ্জায় গুটিয়ে নেওয়ার উপায় হিসেবে বেছে নিচ্ছে সেই শহরের চওড়া বক্ষস্থলই।কিন্তু কঙ্কাবতী কি আর জানে,তার লজ্জার আভাস শহরকে আরো উত্তেজিত করে তুলছে।হুট করেই শহর পরিকল্পনা ব্যতিত কাছে পেতে চাইছে কঙ্কাবতীকে।এতটা কামনা তো আগে কখনো জন্মায়নি শহরের মধ্যে। চৈত্র তো প্রায়ই অর্ধ উ'লঙ্গ হয়ে নানা ভাবে আকৃষ্ট করতে চাইতো শহরকে নিজের অঙ্গভঙ্গি দ্বারা।তখন তো শহর শুধু দেখে যেত চৈত্রের কান্ড,কখনোই তার মতো করে আকর্ষণ অনুভব করে নি।কিন্তু আজ?

আজ তো কঙ্কাবতী তাকে কাছে ডাকছে না,বরং লজ্জায় মিইয়ে যাচ্ছে বারংবার।ইশশ নারীর ভুষন লজ্জা, কথাটা বুঝি এই জন্যই বলে?

শহর যে একা নিশ্বাস নিতে পারছে না তা নয়।ঠিক একই ভাবে কঙ্কাবতীও যেন পারছে না নিশ্বাস নিতে।কঙ্কাবতীর একটি হাত এগিয়ে শহরের গলা স্পর্শ করলো। হাতের গুটি গুটি নখ দিয়ে আঁচড় কাটলো শহরের ঘাড়ে। ছুটতে চাইলো শহরের বন্ধন থেকে,বুঝতে পেরে শহর ঠোঁট ছাড়লো কঙ্কার।তবে ঘাবরালো না যেন।বরণ চোখ বুঁজে কঙ্কাবতীর মাথাটা লুকিয়ে নিলো নিজ বক্ষে।

দুজনেরই ঘন ঘন নিশ্বাস পরলো কিছুক্ষণ। একটুপর কঙ্কাবতী শহরের বক্ষে লুকিয়েই ঘুমুঘুমু কন্ঠে বলে উঠলো....

"আপনাকে ছেড়ে আমি কোত্থাও যাবো না শহর স্যার।কোত্থাও নাহ।আ্ আমি আপনার কাছেই থাকবো।বউ তো আমি আপনার।বউ কখনো তার বরকে অন্যকারোর হাতে ছেড়ে দেয়?"

শহর শুনলো সবটাই। তবে কি উত্তর দেওয়া উচিৎ তা বুঝতে পারলো না।অন্তরে স্থির কাব্য গাইছে...

"আমিও তোমায় নিজের থেকে দুরে রাখছি না কঙ্কাবতী।"

তবে মুখে যে তা বলতে পারলো না।সময় আসে নি তো।কঙ্কাবতীকে তো আরো একটু দুরে রাখার নিস্তার অভিনয় করতে হবে তাকে, সত্যিই দুরে রাখতে হবে তার কঙ্কাবতীকে।

কঙ্কাআবারো প্রশ্ন করলো...

"বলুন না স্যার? আমি আপনাকে দেবো কেন?"

হাফ নিঃশ্বাস ফেললো শহর।কঙ্কাবতীর ঘুমঘুম কন্ঠ শহরকে আবারো কিছুর ইঙ্গিত দিচ্ছে। উফহ,শহর ঠিকই চিনেছে।এই মেয়ে আস্ত একটা বি*ষ।ব্রনে বি'ষ,কপালে বি'ষ, ঠোঁটে বি'ষ এমনকি তার কন্ঠেও বি'ষ। তাইতো এই উৎপথিত বি'ষকে আর বাড়তে না দিয়ে শহর কঙ্কাবতীর চুলের ভাঁজে হাত বুলিয়ে দিতে শুরু করলো।বললো...

"দিতে হবে না কাউকে।আমি তোমার কাছেই আছি।এখন ঘুমাও কঙ্কাবতী। "

কঙ্কা আবার বলে উঠলো...

"আ্ আমিও আপনাকে হারিয়ে ফেলবো স্যার।"

ভয় খানা যেন মেয়েটার অন্তর হতে সরছেই না।শহর কি করে কঙ্কাবতীকে এই ভয় থেকে দূরে রাখবে?

"হারাবে না।আছি তো আমি তোমার পাশেই,এবার একটুখানি ঘুমাও।বাজে চিন্তা করো না,ভয় পাবে।আমিকোথাও যাচ্ছি না,এই যে তোমার সাথে আছি,এভাবেই থাকবো।ঘুমাও কঙ্কাবতী।"

কঙ্কাবতী এবার একটু নড়ে চড়ে আরাম করে শুয়ে ঘুমের মাঝেই শহরকে নকল করার মতো বলে উঠলো...

"হুমম,ঘুমাও শহর স্যার।"

-----------

আজ প্রায় চার পাঁচ দিন পর কঙ্কাবতী ভার্সিটিতে এসেছে।সাবিহা আর লাবিব ফিরে এসেছে বাড়িতে।তবে শর্মিকে আনেনি।তাই তো আর বাড়িতে একা একা ভালো লাগছিলো না কঙ্কার।আজ কাল শহর স্যারও আর লুকায় না কিছু।কঙ্কাবতীর সামনেই চৈত্রীকার সাথে পোনালাপে ব্যস্ত হয়।মাঝে মধ্যেই কথায় কথায় বলে বসে,চৈত্রের এই জিনিসটা আমার পছন্দের, চৈত্র হলে এখন এটা করতো,,এসব শুনে কঙ্কা,শহরের সামনে মেনে নেওয়ার মতো ফিচেল হাসিও দেয়।কিন্তু প্রিয় মানুষটির মুখে তার প্রেমিকার সম্পর্কে কথা শুনতে যে একটুও ভালো লাগে না কঙ্কার।তাই তো আজ আবার বের হলো একটু খোলা হাওয়ার উদ্দেশ্যে।ভার্সিটির ক্যাম্পাসের ঐ কামিনীতলায় বসবে বলে।জায়গাটায় কিছু একটা তো আছেই,ঠিক কঙ্কাবতীর মন শীতল করার মতোই কিছু।

বন্ধুমহলটাও আজ একটু নারাজি কঙ্কার প্রতি।বিয়ে করেছে দু মাস পেরোলো,অথচ বান্ধবী তাদের তার বরের ছবিই দেখালো না।আজও এই নিয়েই যত রাগ সবার।তাইতো দুটো ক্লাস করার পর যখন কঙ্কাবতী বেরিয়ে এলো ক্লাস থেকে তখন আজ আর কেউ সঙ্গ দিলো না কঙ্কাবতীর।সবাই গোমট ধরে না করে দিয়েছে,তারা নাকি আজ সব গুলো ক্লাস সেড়ে তারপরই বের হবে।অথচ তারা বুঝলো না,চতুর্থ বিষয়ের সময়ই কঙ্কাবতী তার ভালোবাসার মানুষটির মুখোমুখি হয়ে কষ্ট পাবে।শহর স্যারকে দেখলেই যে কঙ্কাবতীর মনে পড়ে যায় সেদিন হসপিটালে দেখা সেই দৃশ্য খানা।

কঙ্কাবতীর ইচ্ছে হলো না আজ আর এই বন্ধুমহলকে মানাতে।তাই তো না করে দেওয়ার পর চুপচাপ ক্লাস থেকে বেরিয়ে এসে পৌছালো কামিনীতলায়।কঙ্কাবতীর প্রশান্তির জায়গা।আজই চোখে পড়লো,কেউ যেন কামিনী গাছের ডালের সাথে ঝুলিয়ে খুব সুন্দর একটি দোলনা বানিয়েছে এখানটায়।যার হস্ত রশি গুলো লতানো ফুল পাতায় তৈরি,তবে দেখেই বুঝা যাচ্ছে বেশ মজবুত হবে।

কঙ্কাবতীর খুব ইচ্ছে করলো দোলনাটায় আলতো কয়টা দোল খেতে।কিন্তু সেখানে তো একটি ছেলে বসা। তবুও কঙ্কা আজ দোল খেয়েই ছাড়বে সেই দোলনায়।এই ভেবেই এগিয়ে গেলো সেই দোলনার কাছে।কোকড়ানো ঝাকরা চুলওয়ালা ছেলেটার চোখে গোল গোল ফ্রেমের একটা চশমা।ছেলেটা দোল খাচ্ছে না,এমনিই বসে বসে ফোন ঘাটছে।তাই তো কঙ্কাবতী অনুনয়ের সুরে বললো...

"আমায় একটু দোলনাটায় বসতে দিবেন?"

চশমার গ্লাস গলিয়ে ছেলেটি উঁচু হয়ে তাকালো কঙ্কাবতীর দিকে।পা থেকে মাথা পর্যন্ত একবার পর্যবেক্ষণ করে আবার মনোযোগ দিলো ফোনে।

এমাহ,ছেলেটি কি বুঝতে পারে নি কঙ্কা কি বলছে?

কঙ্কার আজ আর ইচ্ছে হলো না কারোর সাথে ঝগড়া করার।তাই তো কথা বাড়ালো না আর।চুপ করে কাঁধের ব্যাগটা একটু টেনে নিয়ে পেছন ফিরে হাটা ধরলো। দু কদম পেরোতেই দেখলো ছেলেটি তাকে পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছে। তাকে যেতে দেখে কঙ্কা পেছনে ফিরে দেখলো দোলনাটা খালি।ঠোঁটের কোনো কিঞ্চিৎ হাসি ফুটলো তার।দৌড়ে গিয়ে উঠে বসলো সুন্দর দোলনাটায়।দু হাতে লতানো রশিগুলো ধরে বসে একটু দোল খাওয়ার প্রচেষ্টা চালালো।কিন্তু...বাট্টুস কঙ্কাবতীর পা ইতোমধ্যেই মাটি থেকে কয়েক ইঞ্চি উপরে ঝুলছে।অল্প একটু পা মাটিতে ছোয়ানোর প্রচেষ্টায় বার বার ব্যর্থ হয়েও যেন চেষ্টা ছাড়তে চাইলো না সে।

তখনই চোখে পড়লো গোলগোল চশমাওয়ালা ছেলেটি আবার এগিয়ে আসছে তার দিকে।ছেলেটি এসেই এক পলক ট্যারা চোখে কঙ্কার দিকে তাকিয়ে নিজের কাধের ব্যাগটা হালকা ছুড়ে ফেললো বিস্তর মাঠের সবুজ ঘাসের উপর।তারপরই কঙ্কার পেছনে গিয়ে দোলনার রশিগুলো দোলাতে লাগলো হাত দিয়ে।

কঙ্কাবতী বুঝলো না আসলে হচ্ছে টা কি, মুখ তুলে পেছনে ক্যাবলার মতো ছেলেটির দিকে তাকাতেই দেখলো সে জন মহা ব্যস্ত যেন,খুবই মনোযোগ দিয়ে কঙ্কাবতীর দোলনাটা দোলানোর কাজ করছে। বেশ অনেকক্ষণ ধরে কঙ্কাবতীকে এভাবে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে বললো...

"ডেয়ার সিনিয়র,দোলনের প্রকৃত সুখটা উপভোগ করতে চাইলো সামনে তাকিয়ে দু চোখ বন্ধ করতে হয়।"

কঙ্কাবতী বললো না কিছুই।সামনে তাকিয়ে ছেলেটির কথা মতোই দু চোখ বুঁজে নিলো হালকা।নীরবতা বেশ অনেকক্ষণ দুজনার মধ্যে। একটু পরে ছেলেটিই আবার বলে উঠলো...

"সিনিয়রের পা জোড়া আরেকটু লম্বা হওয়া উচিত ছিলো।এখন তো আপনাকে আমার জুনিয়রই মনে হচ্ছে।"

কঙ্কাবতীর বেশ ভালো লাগছে ছেলেটির কথার ধরন।তাইতো হালকা হেঁসে জিজ্ঞেস করলো....

"আপনি বুঝি আমার জুনিয়র?"

"হুম,ফার্স্ট ইয়ার।আপনি তো সেকেন্ড ইয়ার তাই না?"

"হুম।কি করে জানেন?"

"আমি মাইন্ড রিড করতে পারি কিছুটা।আপনি হয়তো মাত্রই অর্গানিক্যাল কোনো সাবজেক্টের ক্লাস করে এসেছেন।"

"ফলো করেন নাকি আমায়?"

"নাহ,তেমন ইচ্ছেও নেই।অনুসরনের চেয়ে অপেক্ষা করাই উত্তম।হুমায়ুন আহমেদ স্যারের বইয়ের শেষ পৃষ্ঠার অপেক্ষা যেমন করে পাঠকরা,ঠিক তেমনি।"

"সুন্দর কথা বলেন তো আপনি?"

"অনেকেই বলে,তবে যার থেকে শুনতে চাই সে কখনোই বলে নি।আমি শ্রেয়স।মাত্রই তো নাম জিজ্ঞেস করতেন।তাই না সিনিয়র?"

আসলেই কঙ্কাবতী মাত্রই ছেলেটির নাম জিজ্ঞেস করতে জাচ্ছিলো।কি করে বুঝলো সে?

"সত্যিই সবার মাইন্ড রিড করতে পারেন আপনি?"

"চেষ্টা করি যাস্ট।আপনার নামটাও সুন্দর,শোনার পরে যে কোনো সুন্দর মনের মানুষের কান থেকে সোজা অন্তরে গিয়ে ঠেকে।"

"তো আমার নাম টা কি বলুন তো?"

"শিউর বলতে পারবো না,তবে এটুকুই বলি আপনার নামখানা খুবই প্রাচীন ধাঁচের। এখনকার দিনে সহজে এই নাম কেউ রাখে না।আর শিউরিটি দিতে পারি এই নামে আর কোনো মেয়ে এই পুরো ভার্সিটিতে নেই।"

প্রদর্শনীর ভঙ্গিটা বেশ ভালো লাগলো কঙ্কার।সামনে তাকিয়ে হালকা হেঁসে বললো...

" আমার নাম কঙ্কাবতী।"

ছেলেটি হয়তো হালকা হেসেছে।তবে এই প্রসঙ্গে কিছু বলেনি।কঙ্কাই আবার জিজ্ঞেস করলো....

"আপনি সাইকোলজি স্টুডেন্ট?"

" কমন প্রশ্ন। নাহ,আমি একাউন্টিং এর স্টুডেন্ট। "

" তাহলে মাইন্ড রিড কি করে করেন?"

"উমম,,সবাই ভাবে আমি সব সময় সাইকোলজির বই পড়ি,বা হয়তো প্রাইভেট ভাবে সাইকোলজি নিয়ে পড়ি।আমি সবাইকে বোঝাতে চাই না আসল সত্যিটা,বিশ্বাস করবে না জানি কেউই।তবে আপনাকে বলতে পারি,কারন আপনি খুব বোকা প্রকৃতির মেয়ে মানুষ।আমি কখনোই সাইকোলজির বই নিয়ে পড়াশুনা করি নি।আমার বাসায় কোনো এক্সট্রা বইও নেই।আমি মনে করি মাইন্ড রিডের বিষয়টি আল্লাহ প্রদত্ত।"

"আমি বোকা কে বললো?"

"আআআ,এই যে আপনি এক অপূর্ণতার পেছনে ছুটছেন? কোনো চালাক মানুষই এমনটা করে না।আররর আপনি বোকা হওয়ার অন্যতম কারন,আপনি পূর্নতা পেয়েও নিজের আবেগকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে সবটা হারিয়ে ফেলবেন।নিজের সাথে সাথে আরো কতগুলো মানুষের সুখ কেঁড়ে নেওয়ার কারন হবেন আপনি।"

কঙ্কাবতীর বুকটা ধক করে উঠলো।পেছনে মাথা ঘুরিয়ে শ্রেয়সকে কিছু বলতে যাবে তখনই কানে এলো একটি মেয়ে কন্ঠ....

"এটায়য় সাইন করো মেয়ে..."

আবার সামনে তাকাতেই দেখলো চৈত্রীকা আর শহর দাড়িয়ে। কঙ্কাবতীর সামনে একটি পেপার এগিয়ে দাড়িয়ে আছে চৈত্রীকা।শহরের মেজাজ যেন তুঙ্গে।তবুও ভার্সিটি ক্যাম্পাসে সিন ক্রিয়েট করতে চায় না বলে সহ্য করছে চৈত্রের সবটা।চাপা স্বরে চৈত্রকে ধমক দিয়ে বললো....

"চৈত্র এসব বন্ধ করো।কঙ্কাকে এভাবে এসব....."

চৈত্র শহরের কথায় পাত্তা না দিয়ে কঙ্কাকে বললো....

"তুমি তো জেনেই গেলে আমাদের সম্পর্কের কথা।তাই এবার চুপচাপ আমার শহরকে ডিভোর্সটা দিয়ে দাও।কারন শহর কখনোই আমাকে ছাড়া অন্য মেয়েকে নিজের বউ হিসেবে মেনে নেবে না। তাই চুপচাপ ডিভোর্স পেপারে সাইন করো,কাবিনের টাকা ফেরত পাবে তুমি,তারপর নিজের পথ দেখো।"

কঙ্কা চুপ করে দেখলো চৈত্রকে।একটিবারও মুখ ফিরে শহরের দিকে তাকালো না।দেখতেও চাইলো না শহরের প্রতিক্রিয়া কেমন।

শ্রেয়স দোল থামিয়ে দিলো কিছুক্ষণ আগেই। চোখের চশমাটা একটু উঁচুতে ঠেলে বুকে দু হাত গুঁজে দাঁড়ালো। নীরবতা ছাড়িয়ে সে-ই চৈত্রীকা হেঁসে বললো....

" রাগ করে ছিঁড়ে ফেলার ভয়ে ডিভোর্স পেপারের ফটোকপিতে সাইন করাতে এনেছেন ম্যাম? প্রয়োজন ছিলো না। আসল পেপার আনলেও সিনিয়র কখনোই ছিঁড়ে ফেলবে না তা।"

শহর, চৈত্র দুজই ভ্রু কুঁচকে তাকালো শ্রেয়সের দিকে।শহর জিজ্ঞেস করলো....

"তুমি কে? কঙ্কাবতীর সাথে কি করছো তুমি? তুমি তো ওর ফ্রেন্ডদের মধ্যে কেউ নও?"

শ্রেয়স একটু মাথা ঝুকিয়ে শহরকে বললো...

"উনি আমার সিনিয়র হয় স্যার।দোলন সহায়ক।"

কথাটা বুঝলো না কেউই।চৈত্রীকা নাক কুঁচকে বললো...

"কি?"

"কিছু নাহ,সিনিয়র আপনাকে কিছু বলবে ম্যাম।"

বলেই এক কদম পিছিয়ে দাঁড়ালো শ্রেয়স।চৈত্র তাকালো কঙ্কাবতীর দিকে।কঙ্কা ধীরে সুস্থে চৈত্রের হাত থেকে পেপারটা নিয়ে উল্টে পাল্টে নিয়ে সরাসরি তাকালো চৈত্রের দিকে।কিঞ্চিৎ হাসলো আপন মনেই।বললো....

"শহর স্যার আপনাকে ভালোবাসে তাই না?"

চৈত্রীকা গর্ভের সহীত বললো....

"হ্যার,চার বছর ধরে।"

শহরের ইচ্ছে করছে না কঙ্কাকে চৈত্রের কোনো কথা শোনাতে।তাইতো কঙ্কাকে তাড়া দিয়ে বললো...

"তোমাকে কিচ্ছু করতে হবে না কঙ্কাবতী।বাড়ি চলো আমার সাথে।"

হাসলো কঙ্কা।শহরকে না শুনে আবার বললো....

"সতীনকে নিয়ে এক ঘরে থাকতে পারবেন ম্যাম?"

অবাকের চরম পর্যায়ে গিয়ে শহর কিছুটা চেঁচিয়ে বলে উঠলো...

"মানেহ??মাথা ঠিক আছে তোমার?কি বলছো তুমি এসব?"

কঙ্কার কোনো পরিবর্তন হলো না।আগের মতো করেই চৈত্রের দিকে তাকিয়ে বললো.....

"একদম ঠিক আছি আমি।পারবেন ম্যাম? সপ্তাহে শনি,রবি সোম শহর স্যার আপনার।এরপর মঙ্গল, বুধ,বৃহস্পতিবার আমার।আর,এক শুক্রবারে সকাল ৬ টা থেকে সন্ধ্যা ৬ টা আমার আর সন্ধ্যা ৬ টা থেকে পরদিন সকাল ৬ আপনার।আবার পরের শুক্রবার সকাল থেকে সন্ধ্যাটা আপনার আর সন্ধ্যা থেকে পরদিন সকালটা শহর স্যার আমার।রাজি তো ম্যাম?"

অবেলার অতিথি গল্পটি অভ্রায়ীনি ঐশি-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক থ্রিলার ভিত্তিক গল্প