তিনদিন পর বাড়ি ফিরলো কঙ্কাবতী।শহরের বাড়িতে।এই বাড়িটায় সব কিছুই তো শহরের,কঙ্কাবতীর কিছুই নেই।শহরের পরিবারটাও যেন কঙ্কাবতীর নয়।কিন্তু কঙ্কাবতীর খুব ইচ্ছে হয় তাদের আপন ভাবতে। এই যে মাত্রই সাবিহা তাকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়লো। তবে আজ আর কঙ্কাবতীর মাঝে কোনো পরিবর্তন দেখা গেলো না।না হাসলো,আর না কাদলো,চুপ করে লেপ্টে রইলো সাবিহার বুকের মাঝে।
বেশ কিছুক্ষণ পরও কঙ্কাবতীর কোনো রূপ পরিবর্তন না দেখে সাবিহা মুখ তুলে চাইলো তার দিকে।দেখলো,মেয়েটা চুপ করে লেপ্টে আছে তার বুকে।নীরব,স্ব উজ্জল চোখে কোথাও যেন তাকিয়ে আছে এক দৃষ্টিতে। সাবিহা ডাকলো তাকে...
"কঙ্কা মা?কি হলো তোর?এভাবে চুপ করে আছিস যে?"
কঙ্কা উঠে বসলো সাবিহার কোল থেকে।আস্তে করে বললো...
"শরীরটা খুব খারাপ লাগছে আম্মু।"
সাবিহার বুকটা হুহু করে উঠলো,লাবিবও ব্যস্ত হয়ে সাবিহাকে বললো...
"তুমি বরং ওর সাথে রুমে যাও,শহর বাবা,কঙ্কা মাকে রুমে নিয়ে যা আস্তে আস্তে।"
শহর শুনলো,কঙ্কাকে নিয়ে রুমে গেলো। সাবিহাও যেন আরো একটু যত্নশীল হতে চাইলো মেয়েটার প্রতি।এভাবে করে আরো দু দুটো দিন কাটলো।কঙ্কাবতী কিছুটা সুস্থ। তবে চিন্তিত রয়েছে শহর,সাবিহা সকলেই।
কারনটা হলো,কঙ্কাবতীর পরিবর্তন। কঙ্কাবতী আর আগের মতো নেই।সারা বাড়িতে আজ দুদিনে সে একটি বারও হই হুল্লোড় ফলালো নাহ।ঐ রুমের মধ্যেই যেন আটকে রেখেছে নিজেকে।সারাটাক্ষন আনমনা হয়ে থাকে।কি ভাবে সে?কী এমন হয়েছে কঙ্কাবতীর সাথে?
সাবিহা বেশ চেষ্টা করছে মেয়েটার মন ভালো করার।শহরও জানতে চায় কঙ্কাবতীর হঠাৎ এমন পরিবর্তনের কারন।কিন্তু কঙ্কাবতী কথা বলে না।নীরবতাই যেন তার এক মাত্র সঙ্গি হয়ে ধরা দিয়েছে সাথে।তার এই নীরবতাই যে সহ্য হচ্ছে না শহরের।হাওয়ায় উড়তে থাকা পাখির মতো কঙ্কাবতীর হঠাৎ বুলি ফুরিয়ে গেলো কেন? কঙ্কাবতীর দুষ্টামি গুলোই যে এখন শহরের প্রতিদিনের সঙ্গী।
-----
কঙ্কাবতীর এমন গুমোট ভাবটা সহ্য হয় না শহরের।এদিকে চৈত্র মেয়েটাও দিচ্ছে আরো চাপ।শহরের প্রচুর কাজ।কিন্তু সেই খেয়াল কি কেউ রাখতে জানে?সবাই নিজের নিজের বলেই ছুটে।
সব কাজ গুলো শেষ করে বাড়ি ফিরতে ফিরতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে এলো শহরের।ক্লান্ত দেহটা টানতে টানতে রুমে নিয়ে গেলো কোনো মতে।চোখ দুটিও যেন আজকাল কঙ্কাবতীকে বড্ড হারায়।শহরের কঠিন মস্তিষ্ক জানান দিচ্ছে, সে খুব বাজে ভাবেই কঙ্কাবতীর মায়ায় আটকেছে।মৃ*ত্যু ছাড়া এই মায়া কাটানো সত্যিই অসম্ভব।
রুমের দরজাটা হালকা ঠেলে ভেতরে তাকাতেই দেখলো কঙ্কাবতীকে।নাহ,আনমনা হয়ে নেই,ড্রেসিন টেবিলের সামনে বসে সাজছে সে।পড়নে তার মখমলের সিম্পল জরজেট নুড পিংক শাড়ি।আচল ছড়িয়ে ফ্লোরেই ঠেকেছে তার।
শহরের দৃষ্টি আটকালো আজ কঙ্কাবতীর পানে।ঐ যে আয়নায় দেখা যাচ্ছে এক মায়াবী মুখ।মাত্রই চোখের নিচে চিকন রশ্মি দিয়ে কাজল টানলো সে।সেই কাজল আকা গোল গোল চোখের দৃষ্টি জোড়া যখন সামনে নিবন্ধ হলো আয়নায়,তখনই আখিতে আখি মিললো যেন।শহরের ওষ্ঠদ্বয় কিঞ্চিৎ ফাঁক। চোখের পাতায় ধরা দিচ্ছে বারবার কঙ্কাবতীর উজ্জল রঙা সাজ সজ্জা।
মেয়েটা এই রাতে এইভাবে সাজছে কেন হঠাৎ? উত্তর মিললো না শহরের।ধীর পায়ে দু কদম এগিয়ে যেতেই কঙ্কাবতীর ঠোঁটের কোনে মৃদু হাসি পরিলক্ষিত হলো।উঠে দাঁড়ালো না সে।আয়নায় তাকিয়েই শহরকে উদ্দেশ্য করে হাসলো।দ্রুততার সহীত ঠোঁটে টকটকা লাল লিপস্টিক লাগাতে লাগাতে জিজ্ঞেস করলো...
"আমায় কেমন লাগছে স্যার?"
শহর মুখে একটু রুঢ় ভাব ফুটিয়ে তুললো। শান্ত-শীতল কন্ঠে বললো...
"এই রাতে এভাবে সাজার মানে কি?শাড়ী,এতো এতো গহনা,হ্যাবি মেকআপ?কোথায় যাচ্ছো তুমি এখন?"
কঙ্কাবতী মুখ থেকে হাসি সরালো নাহ।আরেকটু হেঁসে বললো....
"আজতো কোথাও যাবো নাহ,এমনিই সাজলাম।ইচ্ছে হলো তাই।খারাপ লাগছে?"
শহর মুখে তারিফ করলো নাহ কঙ্কার।শুধু উপর থেকে নিচে পুরোটা কঙ্কাবতীকে ভালো করে পরক করে নিলো,নাহ খারাপের কোনো চিহ্নই নেই, বরং উজ্জলতা ছড়িয়ে পড়ছে যেন কঙ্কা জুড়ে। টকটকে লাল রঙা লিপস্টিকটি যেন একটু বেশিই ফুটে উঠেছে।
শহর কি কিছু একটা অনুভব করছে কঙ্কাবতীর প্রতি?হয়তো,কিন্তু এটা যে ঠিক সময় নয়।শহর তো নেমেছে এক নেউটের মুখোশ খুলতে।এই মুহুর্তে কঙ্কাবতীতে এতটা বিভোর হলে তো সম্পূর্ণ পরিকল্পনাটাই ভেস্তে যাবে।নাহ,,নিজেকেই নিজে সামলে নিলো শহর।বুদ্ধিদীপ্তির দরুন নীরবে আখি নিচু করে বেরিয়ে এলো রুম থেকে।তার বেরিয়ে যাওয়ার পানে কঙ্কাবতী তাকিয়ে রইলো অপলক।ঠোঁটের কোনের মিষ্টি হাসিটা একটুও নড়চড় হলো না।
ড্রয়িংরএমের সাথে লাগোয়া বেলকানির গ্রীলে দু হাত ঠেকিয়ে অন্ধকারে তাকিয়ে আছে শহর।মনটা বড্ড খারাপ।কিন্তু কেন??সে তো তার পরিকল্পনার পথ ধরেই এগিয়ে যাচ্ছে।পূর্ণতা তো ঠিক সামনেই,তবুও কেন এতোটা মন খারাপ তার??
সামনে ঘুটঘুটে অন্ধকার থাকলেও শহর যেন একটু আগের কঙ্কাবতীকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে।ঐ যে নুডপিংক শাড়ি।নাহ,,চিকনা মেয়েটাকে শাড়িতে ভালোই মানায়।আচ্ছা, কঙ্কাবতী যদি রোজ রোজ ঠিক এভাবেই শাড়ি পড়ে শহরের সামনে দাঁড়িয়ে বিস্তৃত হাসিখানা দেয়,তাহলে শহরের সারা দিনের ক্লান্তি কি আর অবশিষ্ট থাকবে কখনো? নাহ,,কঙ্কাবতীর ঐ রুপ শুধু প্রশান্তি দেয়।
আলতো হাসলো শহর।কঙ্কাবতীকে ভাবলে কি আর মন খারাপ থাকে?? না তো।এই যে শহরের এখন ইচ্ছে করছে বেসুরো গলায় গান গাইতে।ইচ্ছেকে অবলোকন করলো না আর শহর।চোখ বন্ধ করে কঙ্কাকে মনে নিয়ে ধরলো দুটো লাইন...
"চাঁদনি পশরে কে,আমার স্মরণ করে...
কে আইসা দাড়াইছে গো,আমার দুয়ারে."
পেছন থেকে কাঁধে কারো হাতের স্পর্শ পেয়ে শহর গান থামিয়ে ফিরে চাইলো।সাবিহা দাঁড়িয়ে, চোখে মুখে বেশ ঘুমের রেশ।জিজ্ঞেস করলো...
"এত রাতে এখানে দাঁড়িয়ে গান ধরার কি আছে? কঙ্কামা একা,ওর পাশে গিয়েই না হয় গানটা ধর।"
বলেই আলতো হাসলো সাবিহা।মায়ের মন একটু হলেও বুঝে,এই যে সাবিহা এখন বেশ জানে, তার ছেলে প্রিয় চৈত্রমাসের চেয়েও কঙ্কাবতীর মায়ায় জড়িয়ে যাচ্ছে বেশি।এটাই তো চায় সবাই।কঙ্কা যে এই শহরকেই বেপরোয়া ভাবে ভালোবাসে,তার সাক্ষাৎ প্রমাণ তো সাবিহারা নিজ চোখেই দেখতে পায়।
শহরকে চুপ থাকতে দেখে সাবিহা আবার বললো...
"মেয়েটা অসুস্থ তো,,যা না বাবা ওর কাছে।"
শহর বাধ্য ছেলের মতোই শুনলো কথাটা।যাওয়ার আগে সাবিহাকে বলে গেলো...
"তুমিও ঘুমিয়ে পড়ো আম্মু,বেশ রাত হয়ে গেছে।"
-------
করিডোর দিয়ে হাটতে হাটতেই শহর মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলো,আজ মন থেকে কঙ্কাবতীর তারিফ করবে সে।নাহ মনে কোনো দন্ধ রাখবে নাহ।মনের কথাগুলো সামনাসামনিই বলবে কঙ্কাবতীকে।মেয়েটা এই শহরের রাতের আধারের চাঁদের আলোর মতোই হয়ে উঠেছে যে।যা না থাকলে এই শহর নিস্তব্ধ, আঁধার।
রুমের কাছাকাছি আসতেই রিনঝিন চুরির ছন্দহীন শব্দ কানে বাজলো শহরের।ভ্রু জোড়া কুঁচকে এলো তার।কঙ্কাবতী কি করছে রুমে একা একা?
নীরব পায়ে এগিয়ে গিয়ে শহর দাঁড়ালো রুমের দরজার সামনে। কিন্তু হায়,,এটা কি দেখছে সে?মাত্র আধঘন্টায় কি হলো কঙ্কাবতীর।একটু আগেই তো কি সুন্দর হাসি দিয়ে শহরকে জিজ্ঞেস করছিলো
"আমায় কেমন লাগছে?"
আর এখন কঙ্কাবতীর দু চোখের পানি লেপ্টে আছো পুরোটা মুখ জুড়ে।লাল লাল চোখদুটি যেন স্পষ্ট রুপে ধরা দিচ্ছে আয়নায়।মেয়েটা এভাবে উন্মাদের মতো কাঁদছে কেন?? শুধু তাই নয়,,এতোক্ষণের সমস্ত সাজ সজ্জা নিজ হাতে ধ্বংস করছে সে।হাতের উলটো পিঠ দিয়ে চোখের কাজল,ঠোঁটের লিপস্টিক সবকিছু এলোমেলো করে ফেলছে।গুছিয়ে বাঁধা চুলের ভাঁজের চিকন ক্লিপগুলোও পাগলের মতো টেনে টেনে ফেলে দিচ্ছে। গলায় লাগোয়া সুন্দর সাদা পাথরের নেকপিসটা ধরে টানতেই টার্সেল ছিড়ে গেলো। কঙ্কাবতী ছুড়ে ফেললো সেই নেকপিসটা দুরে। এরপরই উন্মাদের মতো কাদতে কাঁদতে নিজের কানের বড় ঝুমকো ছুঁতেই শহর চেঁচিয়ে ডাকলো তাকে।দ্রুত পায়ে এগিয়ে গওয়ে হাত ছাড়িয়ে নিলো কান থেকে কঙ্কাবতীর।
"কি করছো কি তুমি এসব??কান ছিড়ে যাবে তো..."
কঙ্কাবতী টলছে।তবুও যেন নিজেকে সামলে নিয়েছে সে।শহরকে দেখেই কান্নার গতি কমিয়ে নিলো।শহরের ভীষণ অসহ্য লাগছে কঙ্কাবতীর এমন রূপ। মেয়েটাকে এভাবে বড্ড বেমানান লাগছে।মুখে হাসি নেই,কাউকে প্রাণোচ্ছল করার প্রচেষ্টা নেই।
কঙ্কাবতী লেপ্টে যাওয়া কাজল যুক্ত লাল লাল দুটি চোখ দিয়ে আলতো তাকালো শহরের দিকে।শহরের বুক কাঁপছে। মেয়েটাকে চিনেও যেন চিনতে পারছে না সে।তবুও নিজেকে শান্ত করার প্রয়াশ চালিয়ে বললো...
"কি হয়েছে তোমার, আমায় বলো না কঙ্কাবতী?এমন করছো কেন তুমি?"
কঙ্কা উত্তর দিলো নাহ।বামে আয়নায় তাকিয়ে নিজের বিদ্ধস্ত রূপটা একবার দেখে নিলো যেন সে।পরক্ষণেই আবার করুন দৃষ্টিতে শহরের দিকে তাকিয়ে ভাঙা গলায় বললো...
"সারাটা দেহে কলঙ্ক আমার।ইচ্ছে করছে না আপনাকেও কলঙ্কের ছিটে দেওয়ার।কিন্তু আমি যে পারছি না স্যার।"
শহর শুনলো কঙ্কাবতীর এলোমেলো কথা গুলো।যেগুলোর এপিঠ ওপিঠ কিছুই যেন বোধগম্য হলো না তার।প্রশ্ন করবে কঙ্কাবতীকে সে।তার আগেই কঙ্কাবতীর জলচোখের গোলগোল দৃষ্টি নিজের চোখের দিকে আবদ্ধ হতে দেখে থেমে গেলো সে।কঙ্কাবতী কেমন করে যেন ঘাড় কাত করে অসহায় কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো...
"আ্ আপনাকে একটু ছুঁই?"
বুকের কোথাও যেন বিদ্যুৎ চমকের ন্যয় অনুভুত হলো শহরের।বিয়ের এই এতগুলো দিন পাড় হলো।শহর মানা করার পর থেকে কঙ্কাবতী নিজ থেকে কখনোই ছোঁয়নি তাকে।আজ মেয়েটাকে এত্তো কেন অসহায় লাগছে,কাউকে ছুঁয়ে দেখার আকাঙ্খা বুঝি এতটাও তীব্র হয়??
শহর কিচ্ছুটি বললো নাহ।সম্মতি সরূপ নিজের হাতটা বাড়িয়ে দিলো কঙ্কাবতীর দিকে।কঙ্কাবতী তাকালো সেথায়।কিন্তু ধরলো না হাতটা।বরং নীরবে একপা এগিয়ে এসে নিজের মাথাটা ঠেকালো শহরের বক্ষস্থলে।হুম,শুধুই মাথা,আর কিচ্ছু নয়।হাত দিয়ে শহরের শরীরের অন্য কোনো অংশও ছুলো না সে।একটু বলতে ঐ একটুই ছোঁয়া।
শহরের বক্ষপিঞ্জরের খাঁচায় এক অজানা পাখির উড়াউড়ি চলছে যেন।কঙ্কাবতীর এই এইটুকুই ছোঁয়ার কামনা?
কিন্তু শহর কি জানে,ভালোবাসার মানুষটার হৃৎস্পন্দনের চেয়ে শান্তির কিছু নেই।কঙ্কাবতীও ঐ শান্তি টুকুই খুঁজছে হয়তো।
"আপনাকে ভালোবাসি স্যার।জীবনের শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত ভালোবাসবো। হুম,আরো কয়েকটা প্রহর আপনাকে ভালোবাসা বাকি আ্ আমার।,,এই কঙ্কাবতী ভীষণ ভালোবাসে তার শহর স্যারকে।ভীষণ.."
আবেশে শহরের চোখ বুঁজে এলো।কঙ্কাবতীর মুখে এই ভালোবাসা শব্দটি যেন শুধু মাত্র শহরের জন্যই দিয়েছে উপরওয়ালা।এতো প্রশান্তি,।।
কঙ্কাবতী নিশ্চুপ।থেকে থেকে হিচকির আওয়াজ আসছে,সময়ের সাথে সাথে তাও যেন মিলিয়ে যেতে লাগলো।হঠাৎই কঙ্কাবতী পুরো শরীরে ভাড় যেন ছেড়ে দিলো। এক পেশে হয়ে পড়ে যেতে নিলেই শহর দ্রুততার সহীত আগলে নিলো তাকে।
জ্ঞান হারিয়েছে কঙ্কাবতী।বার কয়েক ডাকার পরও চোখ খুললো না সে।শহর পাঁজা কোলে তুলে নিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিলো কঙ্কাবতীকে।উদ্বিগ্নতা ঘিরে ধরছে তাকে।মেয়েটার শরীর ভীষণ দূর্বল,তার উপর একটু আগের করা পাগলামি গুলো। অতিরিক্ত টেনশনের কারনেই হয়তো জ্ঞান হারিয়েছে।
শহর নিজেকে শান্ত করে নিলো।অপেক্ষা কঙ্কাবতীর জ্ঞান ফেরার।মেয়েটার এলোমেলো চুলের ভাঁজে একটু পরপরই বিচরন করছে শহরের শক্ত হাত।মুখটার দিকে তাকালেই শহরের মাথায় প্রশ্নের ঝুলি এসে হাজির হয়।কেন করলো মেয়েটা এমন?কি চলছে তার মনে?
তবে উত্তর পায় না শহর।যতটুকু পারলো কঙ্কাবতীর মুখের মেকআপ গুলো পরিষ্কার করে নিলো শহর।হুট করেই দৃষ্টি পড়লো কঙ্কাবতীর বা পায়ে।যেখানে বেশ জায়গা জুড়ে পুড়ে যাওয়ার ছাপ।শহরের মনে পড়লো প্রায় বছর খানেক আগের কথা...
** কঙ্কাবতীর কেমিস্ট্রির একটি প্র্যাক্টিক্যাল ক্লাসের জন্য, প্রায় ৭০+ স্টুডেন্ট ল্যাবে ছিলো সেদিন।তাদের শিক্ষক শহর স্যার।ক্লাসের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে শহর যখন শিক্ষার্থীদের নানা রকম কেমিক্যাল নিয়ে পড়া বুঝাচ্ছিলো তখনই চোখ যায় কঙ্কাবতীর দিকে,চোখ যাওয়ার কারন,কঙ্কাবতীর হাতে ডংডং চিপস।।মেয়েটা ক্লাসে দাঁড়িয়েই চিপস খাচ্ছে।যা দেখে শহরের কপালের রগ গুলো বেশ ফুলে উঠেছে রাগে। টেবিলের উপর থেকে স্কেল নিয়ে কঙ্কাবতীকে একটা মারবে।কিন্তু অসাবধানতার কারনে স্কেল নিতে গিয়েই টেবিল থেকে বিকারে থাকা সালফিউরিক এ'সিড নিচে পড়লো।নিচে বললে ভুল হবে,কঙ্কাবতীর পায়ের উপর পড়লো।
সাথে সাথেই যন্ত্রণায় বিভৎস এক চিৎকার দিয়ে উঠলো কঙ্কাবতী।
সেবার ভাগ্য ভালো ছিলো এসি'ডটির সাথে পানি মিশ্রিত ছিলো বেশ,,তাইতো পায়ের এই অংশটা গলে পড়ে যায়নি।কিন্তু যেই চিপসের জন্য এই এতকিছু হয়ে গেলো,ডাক্তারের কাছে নেওয়ার পরও কঙ্কাবতী হাত থেকে এই চিপসের প্যাকেটটি ফেললো নাহ।
মেয়েটার আগের বাচ্চামো গুলোর কথা মনে পড়তেই হেসে উঠলো শহর।আলতো করে কঙ্কাবতীর পায়ের পোড়া জায়গাটায় হাত বুলিয়ে দিয়ে ঠোঁট নামিয়ে বেশ কয়েকটি চুমু একে দিলো সেইখানটায়...
--------
রাত কতটা গভীর হলো জানা নেই কঙ্কার।জ্ঞান ফিরতেই পিটপিট করে চোখ খুলতেই আবছা আলো যুক্ত রুমটায় নিজেকে ছাড়াও আরো দুজন ব্যক্তির উপস্থিতি অনুভব করলো কঙ্কাবতী।তারা আর কেউই না,শহর স্যার,আর তার প্রিয় চৈত্রমাস।
চাপা কন্ঠে তারা ভীষণ ঝগড়া করছে,বুঝতে পেরেছে কঙ্কাবতী।শহর বারবার চৈত্রকে বলছে..
"তুমি আমার বাড়ি থেকে যাও চৈত্র।এতো রাতে কেন তুমি এভাবে বাড়িতে এসেছো আমার?বাড়িতে সবাই আছে আমার।তুমি চলে যাও বলছি।"
কিন্তু চৈত্রীকা শুনার পাত্রী নয়।সেও জোর গলায় বলছে...
"নাহ,,এই মেয়েকে আজ পেপারে সাইন করতেই হবে।এর আগে আমি যাবো নাহ।যা হবে হোক।"
নীরবে এক হতাশার নিঃশ্বাস ফেলে উঠে বসলো কঙ্কা।কঙ্কাকে বসতে দেখেই চৈত্রীকা তেড়ে আসলো তার কাছে।হাতে থাকা ডিভোর্স পেপারটা কঙ্কাবতীর দিকে এগিয়ে দিয়ে রুঢ় কন্ঠে বললো....
"এই মেয়ে,আজ তোমাকে পেপারে সাইন করতেই হবে।নিজের ভালো চাইলে এক্ষুনি পেপারে সাইন করো,আর বিদায় হও আমার শহরের জীবন থেকে।"
বিরক্তির চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেলো শহর।চৈত্রীকাকে আটকানোর চেষ্টা চালালো বেশ ভাবে...
"চৈত্র,তুমি পাগল হয়ে গেছো?দেখতে পাচ্ছো তুমি?মেয়েটার মাত্র জ্ঞান ফিরেছে.."
চৈত্র নিজেকে শহরের থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বললো..
"এতকিছু আমি জানি নাহ।ওকে আজ সাইন করতে হবে মানে হবেই।এই মেয়ে সাইন কর।"
কঙ্কাবতী নিরব দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো চৈত্রের দিকে।নাহ,কোনো ক্ষোব নেই,রাগ নেই,বিরক্তিও নেই।হাত বাড়িয়ে পেপারটা নিলো সে চৈত্রের হাত থেকে।
সেথায় একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে বললো...
"আপনি এখন যান,,কাল সকালে সাইন সহ পেপারটা পেয়ে যাবেন।"
কথাটায় ভীষন ভাবে চমকে গেলো শহর।কঙ্কাবতী সাইন করবে??মানে টা কি??
শহরের ভেতর ভেতর আগুনের ফুলকার ন্যয় জ্বলছে।তবুও সে দেখতে চায় কঙ্কাবতী কি করে।তাইতো আর একটি কথাও না বলে চুপ করে তাকিয়ে রইলো তার দিকে।
"নাহ,,তুমি এক্ষুনি সাইন করবে।"
চৈত্রের ত্যাড়া কথায় কঙ্কাবতীও উত্তর দিলো...
"যদি চান আমি ডিভোর্স টা দিয়ে দিই,তাহলে চুপচাপ পেপারটা রেখে এখন বেরিয়ে যান।তা না পারলে আমি সাইন করবো নাহ।"
চৈত্র বুঝলো,কঙ্কাবতী এক কথার মেয়ে।যাই হোক,কিছুটা তো শিউরিটি নেওয়া গেলো যে সাইন করবে।তাইতো হার মেনে পেপারটা কঙ্কার কাছে দিয়েই বেরিয়ে যাওয়ার সীদ্ধান্ত নিলো।পেছন ফিরে শহরকে বললো...
"চলো এখান থেকে।"
শহরের দৃষ্টি কঙ্কাবতীতেই নিবদ্ধ রেখে বললো...
"এটা আমার রুম,,তুমি তোমার বাড়ি যাও।।"
চৈত্র জেদ ধরলো...
"নাহ,,তুমি এই মেয়ের সাথে এক রুমে থাকবে নাহ।আমার দিব্বি দিলাম।"
শহরের কোনো হেলদোল হলো নাহ।আগের মতো করেই বললো...
"যা ইচ্ছে করো,,আমি আমার রুম থেকে যাবো না।"
চৈত্র একটু গলা উঁচু করে বললো..
"শহর,তোমাকে আমার দিব্বি দিলাম,,শুনতে পাওনি??"
শহরও তার মতো করেই বললো....
"বললাম তো যা ইচ্ছে করো।"
চৈত্রের রাগ যেন তরতর করে বাড়তেই লাগলো।তেতে উঠে কিছু বলতে যাবে তখনই কঙ্কাবতী বলে উঠলো....
"আপনি যান স্যার,,আমার দিব্বি।"
সাথে সাথেই শহরের মুখভঙ্গি পরিবর্তন হয়ে এলো।বুকে গুঁজে রাখা হাতদুটোও ছাড়িয়ে নিলো সে।অবাকের পর অবাক হচ্ছে যেন।কঙ্কাবতীকে ইচ্ছে করছে ঠাটিয়ে দুটো থাপ্পর মারতে।কিনৃতু নিজেকে সংযত করে নিলো শহর।দু কদম এগিয়ে এসে কঙ্কাবতীকে উদ্দেশ্য করে বললো...
"লোক দেখানো ভালোবাসা এই পর্যন্তই ছিলো বুঝি আমার প্রতি?হাহ,,তোমার মতো ক্লাসলেস মেয়েদের থেকে এর বেশি কিছু আশা করাই ভুল।"
বলেই শহর ঘনঘন কদম ফেলে বেরিয়ে গেলো রুম থেকে,সাথে চৈত্রীকাও।
কঙ্কাবতীর দৃষ্টি নিচু।তাচ্ছিল্য হেঁসে স্বল্প স্বরে বললো...
"ভালোবাসলেই পেতে হবে তা তো নিয়ম নেই স্যার।
আমি না হয় আপনাকে না পেয়েই ভালোবাসলাম।"