অবেলার অতিথি

পর্ব - ১৩

🟢

শীতকালীন ভোর হতে হতেও যেন হয়ে উঠে না।কুয়াশার চাদরে আবৃত থাকে বেলার মধ্যভাগ পর্যন্ত। আজও ঠিক তেমনই। গতকাল রাতে চৈত্র চলে গিয়েছে তার বাড়িতে,বলে গিয়েছে আজ সকালেই আসবে আবার।সে যাওয়ার পর শহর চেয়েছিলো কঙ্কাবতীর কাছে যেতে।কিন্তু কিছুটা এগোতেই কঙ্কাবতীর দিব্বির কথা মাথায় এলো তার।তাই মন না চাইতেও সেই রুম থেকে পা পিছিয়ে নিয়েছে সে।

তবে মন মানছিলো না।তাইতো বুদ্ধি করে দুর থেকেই দেখার ব্যবস্থা করলো কঙ্কাবতীকে।রুমটায় যে হিডেন ক্যামেরা লাগানো আছে,তা তো কয়েকদিন মাথাতেই ছিলো না তার।তাইতো তারাতারি করে ল্যাপটপটা নিয়ে খাটে আয়েশ করে বসলো শহর। ল্যাপটপ স্ক্রীনে পর্যবেক্ষণ করতে লাগলো কঙ্কাবতীর কাজ।

কিন্তু শীতের রাতে ভারি ব্ল্যাঙ্কেটের আবেশে চোখের পাতায় ঘুম নেমে এলো শহরের।মাত্রই আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসতেই চোখ পড়লো ল্যাপটপ স্ক্রিনে। কিন্তু এটা কি,,কঙ্কাবতী রুমের কোথাও নেই। পুরো রুমটাই খালি।শহর দেওয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলো মাত্র সাড়ে ছ'টা বাজে।এই সময় তো কঙ্কাবতীর ঘুম ভাঙার কথা নয়।তাহলে?

আর বসে রইলো না শহর।দ্রুত বিছানা থেকে নেমে ড্রয়িংরুমে এসে পৌঁছালো, সাবিহাকে রান্না ঘরে টুকটাক কাজ করতে দেখে এগিয়ে গেলো সেই দিকে।জিজ্ঞেস করলো..

"আম্মু?কঙ্কাবতী কোথায়?"

সাবিহা একবার শহরের দিকে তাকিয়ে আবার রান্নায় মনোযোগ দিয়ে বললো...

"তুই-ই তো ছিলি ওর সাথে। রুমেই তো থাকার কথা "

চহর উদ্বিগ্ন কন্ঠে বললো...

"ও রুমে নেই আম্মু।"

চিন্তার ছাপ পড়লো সাবিহার চোখে মুখেও।জিজ্ঞেস করলো...

"কি হয়েছে তোদের??কঙ্কা কোথায়?"

শহর বড় একটা নিশ্বাস ফেললো।মায়ের থেকে কোনো কিছুই লুকানোর ইচ্ছে নেই তার।তাইতো গত কাল রাতের সব কথাই বলতে লাগলো সাবিহাকে। কথার মাঝেই বাড়ির দরজা দিয়ে প্রবেশ করে চৈত্রীকা।তাকে দেখেই কথা থামিয়ে নিলো শহররা।নিজেদেরকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলো দুজনই।সাবিহা এগিয়ে গেলো চৈত্রীকার কাছে।জিজ্ঞেস করলো....

"তুমি এখানে?"

চৈত্রীকা তারাহুরো করে বললো...

"সব বলছি পরে।।আগে একটু কাজ আছে।"

বলেই দ্রুত পায়ে কঙ্কাবতীর রুমে গেলো। বেশ কিছুক্ষণ পর হাতে গত কালকের সেই ডিভোর্স পেপারটা নিয়ে আবারও হাজির হলো সে।মুখে তার বিশ্ব জয়ের হাসি।এসেই শহরকে জড়িয়ে ধরে খুশিতে আত্মহারা হয়ে বললো..

"ফাইনালি,,,তোমাদের ডিভোর্সটা হয়েই গেলো শহর।।দেখো, ঐ মেয়েটা সাইন করে দিয়েছে।এবার আমরা বিয়েটা করে নেবো শহর।"

ততক্ষণে লাবিবও রুম থেকে এসে হাজির হয় সেখানে।চৈত্রের কথা শুনে সাবিহা এগিয়ে এসে পেপারটা হাতে নিয়ে বললো...

"কঙ্কা ডিভোর্স পেপারে সাইন করেছে মানে? কঙ্কা কেন আমার ছেলেকে ডিভোর্স দিবে??"

চৈত্রীকার খুশি আর দেখে কে।

"ডিভোর্স দিয়েছে এটাই ফ্যাক্ট,কেন দিলো সেটা বিষয় নয় আন্টি।"

তারপর শহরের দিকে তাকিয়ে আবেগী কন্ঠে বললো...

"বেইবি,আ'ম সো হ্যাপি টু ডে।"

শহর মুচকি হাসলো।উত্তর দিলো...

"আমিও।এবার আমাদের বিয়েতে আর কেউ বাধা হতে পারবে না চৈত্র।"

তখনই সাবিহা তেতে বললো..

"এসব কি বলছিস তুই শহর?এই মেয়েকে তুই বিয়ে করবি? আমি কখনোই ওকে আমার ছেলের বউ হিসেবে মানবো না।"

শহর যেন হুট করেই পরিবর্তন হয়ে গেলো।কন্ঠে প্রখরতা এনে বললো...

"তুমি আর আমাকে জোর করে বিয়ে করাতে পারবে না আম্মু।আমি নিজ ইচ্ছায় চৈত্রকে বয়ে করবো।আমরা দুজন দুজনকে ভালোবাসি। "

সাবিহা আর লাবীব কিছুতেই চৈত্রকে মানবে না এই বাড়ির বউ হিসেবে।কিন্তু শহরও নাছোর বান্দা। সে চৈত্রকেই বিয়ে করবে৷ শহরের এমন কথায় লাবীব শক্ত কন্ঠে বলে উঠলো...

"বেশ,,তুই যদি একেই বিয়ে করতে চাস,কর।তবে একটা কথা মাথায় রাখবি,এই মেয়েকে বিয়ে করার সাথে সাথেই আমি তোকে ত্যাজ্য পুত্র করবো আইনি ভাবে।আমার বাড়ি,সম্পতি কোনো কিছুতেই তোর অধিকার থাকবে নাহ।এমন ছেলে আমার চাই না।"

শহর কিছুক চুপ করে তাকিয়ে রইলো তার বাবার দিকে একটু পরেই কনৃঠে কঠোরতা এনে বললো...

"ঠিক আছে।প্রয়োজন নেই তোমার বাড়ি, সম্পত্তির।"

এরপর চৈত্রীকার দু হাত চেপে ধরে মিষ্টি কন্ঠে বললো...

"চলো চৈত্র।।তুমি পারবে না,আমার সাথে ছোট্ট একটা ভাড়া বাড়িতে থাকতে?আমার যেই জব আছে,সেইটা দিয়ে আমরা ঠিক সংসার চালিয়ে নিবো।চলো..."

বলেই চৈত্রের হাত টেনে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নিতেই,চৈত্র ঝাড়ি মেরে হাত ছাড়িয়ে নিলো তার থেকে।হালকা চেঁচিয়ে বললো...

"আর ইউ ম্যাড শহর? তোমার বাবার সম্পত্তি ছাড়া কি আছে তোমার আর?? সামান্য লেকচারারের আর কতই বা বেতন??এই সামান্য বেতনে আমি কিভাবে থাকবো??কখনোই পসিবল নয়।।তুমি তোমার বাবাকে রাজি করাও,, যাও।"

শহর আরো একটু করুন কন্ঠে বললো...

"কেন চৈত্র?তুমি আমায় ভালোবাসো না?পারবে না ভালোবাসা দিয়ে আমাদের ছোট্ট সংসারটা গুছিয়ে নিতে?"

"শোন শহর,,ভালোবাসা দিয়ে সব হয়না।।আরে প্র্যাক্টিক্যালি ভাবো,,এটা কিভাবে সম্ভব, আমি কখনোই পারবো না।"

শহর চৈত্রের চোখে চোখ রেখে বললো..

"পারবে না?"

চৈত্রীকাও মুখের উপর বললো...

"নাহ"

বেশ কিছুক্ষণ নীরবতা ছাড়িয়ে হঠাৎই শহর হুহা করে হেসে উঠলো।তার সাথে সাথে বিজয়ের হাসি হাসলো লাবিব আর সাবিহাও।

নিজেকে সামনে নিয়ে শহর ডিভোর্স পেপারটা হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করে বললো...

"উমম,,সাইনটা তো শুধু কঙ্কাবতী করেছে।আমি এখনো সাইন করা বাকি।এন্ড চৈত্র,তোমার ঠুনকো ভালোবাসাটা আমার প্রতি নয়,,আমার বাবার সম্পত্তির প্রতি। তাই না??"

চৈত্র কিছুটা ঘাবড়ে গেলো।একবার শহরের দিকে তো আরেক বার লাবিব আর সাবিহার দিকে তাকালো।কিন্তু কিছুই বুঝতে পারলো না।এই মুহুর্তে এরা এভাবে হাসছে কেন?

শহর এগিয়ে এসে বললো...

"কি? কিচ্ছু মাথায় ঢুকছে না, তাই না?,আসলে তোমার এই চরম রূপটা আমি অনেক আগেই দেখে ফেলেছি।তোমার প্রতিটা কাজে লোভ লাললসা,সবই আমার চোখে পড়েছে। তুমি কি করে ভাবলে তোমার জন্য আমি আমার কঙ্কাবতীকে ডিভোর্স দেবো?কঙ্কাবতী আমায় নিজের থেকেও বেশি ভালোবাসে।আমার এতো যত্ন ওর থেকে ভালো কেউই নিতে পারবে না।আর ভাবছো,আমও নিজের ক্ষতি করবো কঙ্কাবতীকে ছেড়ে দিয়ে??"

চৈত্র ভ্রু কুঁচকে বললো...

"তুমি এসব কি বলছো শহর?আর তোমাকে তোমার বাবা ত্যাজ্য পুত্র করেছে, আট তুমি হাসছো?"

শহর একবার তাকালো লাবীবের দিকে।তখন লাবিব হালকা হেসে বললো...

"তোমার কি মনে হয়,আমি আমার এক মাত্র ছেলেকে এভাবে দুরে ঠেলে দেবো??সবটাই নাটক ছিলো তোমার আসল রুপ দেখার জন্য। "

চৈত্র যেন আকাশ থেকে পড়ছে৷এরা সবাই মিলে ওকে কেমন বোকা বানাচ্ছে।বিরক্তিতে হালকা চেচিয়ে বললো চৈত্র...

"মানেটা কি এসবের??"

শহর এবার সাফ সাফ বলে উঠলো...

"মানে আর কিছুই নয়,,বের হও আমাদের বাড়ি থেকে। আর কখনো নিজের এই কুৎসিত মুখটা দেখাবে না আমায়,,তুমি জানো আমি প্রয়োজনে কতটা খারাপ হতে পারি। সো,গেট আউট।"

চৈত্র এবার একটু নেকি সুরে বলতে নিলো..

"শহর,তুমি প্লিজ..."

"তোমাকে যেতে বলেছি এখান থেকে।নাহলে এক্ষুনি পুলিশ এনে হ্যারাসম্যান্টের কেসে ঝুলিয়ে দেবো।জোর করে আমার ওয়াইফকে ডিভোর্স পেপারে সই করানোর অপরা'ধে।"

অনেক চেষ্টা করেও চৈত্র আর কোনো গতি করতে পারলো না।অগত্যা চিরকালের মতো শহরের জীবন থেকে নামমাত্র প্রিয় চৈত্রমাস বিদায় নিলো।

শহর আর একটিবারের জন্যও ভাবলো না চৈত্রের কথা।তার এখন কঙ্কাবতীকে ফিরিয়ে আনতে হবে। কিন্তু এই সকালে গেলো কোথায় মেয়েটা?গতবার একবার হারিয়ে গেলো পুরো দুটো দিনের জন্য। কি হলো কিছুই বললো না এখনো কাউকে।আর এখন আবার একা একা বেরিয়ে পড়লো?

কঙ্কাবতীর এই কাজখানা খুবই অসহ্য লাগলো শহরের কাছে।মেয়েটা রাগ করে বাড়ি ছেড়েছে ভালো কথা,তাই বলে কাউকে না জানিয়ে এই শীতের সকালে?

শহর নিজের বুদ্ধি কাজে লাগাতে ভুললো না।কঙ্কাবতী চলে গেছে,,হয়তো কোনো চিঠি রাখতে পারে তার জন্য রুমটায়,বা অন্য কিছু? তাইতো দ্রুত ল্যাপটপটা নিয়ে ছুটলো সেই রুমে।পুরো রুমটা খুঁজেও তেমন কিছু পেলো না,তাই এবার সে একটু ঘন মোশন করে গতকাল পুরো রাতের ফুটেজ দেখতে লাগলো রুমটার।

শহর আর চৈত্র রুম থেকে যাওয়ার পর কঙ্কাবতী সেভাবেই খাটে হেলান দিয়ে বসে ছিলো কিছুক্ষণ। প্রায় ১০ মিনিট পরে বিছানা থেকে নামলো সে।ধীরে পায়ে গিয়ে দাঁড়ালো আয়নার সামনে।নিজেকেই পর্যবেক্ষণ করলো কিছুক্ষণ। এরপর ওয়ারড্রব থেকে খুঁজে খুঁজে নিজের প্লাজু আর শহরের একটি সাদা রঙের টিশার্ট বের করলো।ওয়াশরুমে গিয়ে শাড়ি পালটে প্লাজু আর টিশার্টটি পড়ে বের হলো।এই এতোটা সময় ধরে কঙ্কাবতী শান্ত।কি নীরব ভঙ্গিতে কাজ গুলো করছে।

শহর লক্ষ্য করলো কঙ্কাবতীর চুল থেকে চুইয়ে চুইয়ে পানি পড়ছে।এটা দেখেই মাথা গরম হয়ে গেল তার।মেয়েটা এতো পাজি কেন,এই শীতের রাতে গোসল করছে।পাগল হয়ে গেলো নাকি ও? করলো তো করলো চুল গুলোও ভালো মতো মুছলো না।টাওয়ালটা নিয়ে বারান্দায় মেলে দিলো।

ফিরে এসে আবারো আয়নার সামনে দাঁড়ালো সে।নিজেকেই নিজে চুপচাপ দেখলো কিছুক্ষণ। শহরের ঢিলেঢাকা টিশার্ট টা নেড়েচেড়ে দেখে একটু উচিয়ে লম্বা এক নিঃশ্বাস নিলো কঙ্কাবতী।এ যেন শহরকে ছোঁয়ার প্রবনতাটা তার এই টিশার্টটি থেকেই পূরণ করছে।এতে যে শহরের শরীরের সেই পরিচিত গন্ধটা মিশে আছে দারুন ভাবে।

খাটের কাছে এসেই ড্রয়ার থেকে কলম নিলো।তারপর কাট থেকে ডিভোর্স পেপারটা হাতে তুলে নিলো।বেশ কিছুক্ষণ এক নজরে তাকিয়ে রইলো সেই পেপারটির দিকে কঙ্কাবতী।বিছানায় পেপারটি রেখে সে হাটু ভাজ করে বসলো ফ্লোরে।কাপা কাপা হাতে পেপারটিতে সাইন করতে গিয়েও পারলো না কঙ্কাবতী।হুহা করে কেঁদে উঠলো সে।

স্ক্রীনে এই দৃশ্যটি দেখে ঠোঁটের কোনে হাসি ফুটে উঠলো শহরের।তারমানে কঙ্কাবতী সাইন করেনি পেপারে।কঙ্কাবতী ভালোবাসে তার শহর স্যারকে।মনের ভেতর এক আনন্দের স্রোত বয়ে গেল যেন শহরের।

কান্নায়, ক্রোধে কঙ্কা ডিভোর্স পেপারটি দুমড়ে মুচড়ে ছুড়ে ফেললো দুরে।সে কি কান্না কঙ্কাবতীর।পাগলের মতো কাঁদছে সে, সাথে অনবরত নিজে নিজেই বলছে কতকিছু।সে ছাড়বে না তার শহর স্যারকে।পারবে না সে।

এভাবে ঠিক কতক্ষণ সময় কাটলো ঠাওর করলো না শহর।সময় দেখার যে বিন্দু পরিমানও ইচ্ছে নেই তার।কঙ্কাবতী কাঁদতে কাঁদতে ক্লান্ত হয়ে বিছানার কিনারাতেই মাথা ঠেকিয়ে ঘুমিয়ে পড়লো।কি নির্মল সেই বন্ধ আঁখি দুটি।কি স্নিগ্ধতা মিশে আছে সেথায়। শহর হয়তো কতগুলো বছর কাটিয়ে দিতে পারবে তার কঙ্কাবতীর এই বন্ধ দুচোখের দিকে তাকিয়ে।

কিন্তু হায়,,সেই ইচ্ছেটাও যে পূর্ণ হলো না তার।হঠাৎই কঙ্কাবতীর শরীর কেঁপে কেঁপে উঠতে লাগলো।ঘুমের মাঝে সেই আবার প্যানিক এটাক।শহরকে হারানোর ভয় আবারো আঁকড়ে ধরলো কঙ্কাবতীকে।

মুখ দিয়ে অজস্র শব্দের আন্দোলন।কিন্তু কন্ঠনালি যেন কঙ্কাবতীর বিরুদ্ধে, তাইতো চিৎকার করতে দিচ্ছে না যন্ত্রণায় ফেটে পড়া কঙ্কাবতীকে।

বিদ্যুতের শক লাগার মতো কম্পমান শরীরটি আর টিকে থাকতে পারলো না সামান্য ঐ খাটের কার্নিশে।ঠাশ করে পুরো কঙ্কানতীটাই পড়লো ফ্লোরে।হাতে থাকা একমুঠো কাচের চুরি ঝনঝন আওয়াজ করে ভাঙতে লাগলো।কাটা চুরির টুকরোয় কঙ্কার হাতের রশ্মি বেয়ে চিরচির করে টকটকা রক্ত গড়াতে লাগলো।

শহরের বুকের ভেতর তুমুল ঝর।পারছে না শুধু স্ক্রিন ভেঙে গিয়ে কঙ্কাবতীকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বললে..

"কঙ্কাবতী ভয় পায় না।আমি আছি তো তোমার কাছে।আমাকে হারানোর ভয়ে এতটা যন্ত্রণা পেও না তুমি।"

কিন্তু তা যে আর পারলো না শহর।সময় যে তার জন্য থেমে নেই আর।শহর শুধু উদ্বিগ্ন হয়ে দেখেই গেলো কঙ্কাবতীর ছটফটানি।ছটপট করতে করতে কঙ্কা দু চোখের পাতা বিভৎস ভাবে উলটে ফেললো,,মুখ থেকে সাদা ফেনা বেরিয়ে এলো তার।যেটা দেখে শহরের সারাটা শরীর কাপতে লাগলো ভয়ে,,এই অবস্থায় কঙ্কাবতী কোথায় গেলো।

ঐ অবস্থা থেকেই থেমে গেলো কঙ্কাবতী।নিবিড় ভাবেই এলোমেলো অবস্থায় পরে রইলো ফ্লোরে। জ্ঞান হারালো কঙ্কা।

আর সইতে পারলো না শহর।দু চোখ লাল টকটকে হয়ে রয়েছে।এই শীতেও কপাল বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়লো তার।

কয়েকটা ঘন্টা কেটে গেলো ঐভাবেই।কঙ্কাবতীর কোনো নড়চড় হলো না।এদিকে শহরের চিন্তায় মাথা ফেটে যাচ্ছে।

ভোরের আলো ফুটতেই একটু একটু করে নড়ে উঠলো কঙ্কাবতী।ধীরে ধীরে জ্ঞান ফিরলো তার।নিজেকেই নিজে যেন এক শক্তিমহী রুপে আবিষ্কার করলো সে।উঠলো,পরে যেতে নিয়েও সামলে নিলো নিজেকে।নিজের অবস্থা দেখে কি একটু অবাক হলো কঙ্কা?? বুঝা গেলো না।নিরবে বেসিনের সামনে গিয়ে মুখের ফেনা ধুয়ে নিলো।হাতের শুকিয়ে যাওয়া রক্তও ধুয়ে পরিষ্কার করে নিলো।মেয়েটা কাটা জায়গায় একটা অয়েন্টমেন্ট পর্যন্ত লাগালো না।

ওমাহ,পাগল মেয়েটা এসে রুমে পরে থাকা কাঁচের চুড়ির টুকরো গুলো পরিষ্কার করে ফ্লোরে শুকিয়ে যাওয়া রক্তও ভেজা নেকরা দিয়ে মুছে ফেললো।মানে এই রুমটায় গত রাতে যে এতো কিছু হয়ে গেলো,মেয়েটা তার কোনো চিহ্নই রাখলো না।

ড্রেস চেঞ্জ করে পরনের টিশার্টটা ধুয়ে বারান্দায় শুকাতেও দিয়ে দিলো।এরপরই গতকালকের ছুড়ে ফেলা ডিভোর্স পেপারটা তুলে নিয়ে ভাজ খুলে নীরবে কোনো প্রকার প্রতিক্রিয়া ছাড়াই সাইন করে দিলো সেথায়। এরপরই দ্রুত নিজের বিবাহ চিহ্ন অর্থাৎ নাকফুল আর হাতের সোনার বালা দুটি খুলে আলমারির ড্রয়ারে তুলে রেখে দিলো।আর দেরি না করেই বেরিয়ে এলো কঙ্কাবতী।

---------

পুরো দৃশ্যটা দেখে ক্রোধে ফেটে পড়লো শহর।মেয়েটা কি শক্ত ভাবে সাইন করে ফেললো ডিভোর্স পেপারে।একটুও হাত কাপলো না তার।কিন্তু শহর যে এত সহজে তাকে ছেড়ে দেবে না।।এতগুলো দিন ধরে ভালোবাসি ভালোবাসি বলে শহরকে নিজের প্রতি আকৃষ্ট করে নিয়ে এখন ডিভোর্স দেওয়া হচ্ছে? তা তো হতে দেবে না শহর।

শহরের সিক্সথ সেন্স বলছে কঙ্কাবতী এই মুহুর্তে তার বাবার বাড়িতেই যাবে।কারন হাতে করে কিছুই নেয়নি সে।এমনকি শরীরে থাকা সোনার গহনা গুলোও রেখে গেছে।

শহর আর দেরি করলো না।ল্যাপটপটা বন্ধ করে আলমারি থেকে কঙ্কার খুলে রাখা গহনা গুলো পকেটে পুরে নিয়ে রওনা দিলো কঙ্কাবতীর উদ্দেশ্যে।

------

কঙ্কাদের বাড়িটা বড়সড় হলেও প্রায় সময়ই খালি থাকে।দারোয়ানের থেকে শহর জসনতে পারলো কঙ্কূর মা বাবা কেউই এখন বাড়িতে নেই।দুজনই নিজস্ব কাজে বাইরে রয়েছে।তবে কঙ্কা এসেছে কিছুক্ষণ আগেই। এখনো বাড়িতেই আছে।

শহর আর দেরি করলো না।বাড়ির ভেতর ঢুকেই কঙ্কাবতীর রুমে দিকে যেতে নিবে।তখনই ড্রয়িংরুমের টেবিলের উপর একটি কাগজে চোখ পড়লো।এক নজরে মনে হলো লেখাগুলো কঙ্কাবতীর। শহর এগিয়ে এসে চিঠিটা তুলে নিলো।নীরবে পড়তে লাগলো চিঠিটা....

"মা,

তুমি কখনোই আমায় ভালো শিক্ষা দিতে পারো নি।আমার পারিবারিক শিক্ষার বড্ড অভাব।তাই তো আমি সেদিন রাতে নিজের শরীর বিলিয়েছি কতগুলো পুরুষের কাছে.......

অবেলার অতিথি গল্পটি অভ্রায়ীনি ঐশি-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক থ্রিলার ভিত্তিক গল্প