"একদম ঠিক আছি আমি।পারবেন ম্যাম? সপ্তাহে শনি,রবি সোম শহর স্যার আপনার।এরপর মঙ্গল, বুধ,বৃহস্পতিবার আমার।আর,এক শুক্রবারে সকাল ৬ টা থেকে সন্ধ্যা ৬ টা আমার আর সন্ধ্যা ৬ টা থেকে পরদিন সকাল ৬ আপনার।আবার পরের শুক্রবার সকাল থেকে সন্ধ্যাটা আপনার আর সন্ধ্যা থেকে পরদিন সকালটা শহর স্যার আমার।রাজি তো ম্যাম?"
কঙ্কাবতীর কথায় চৈত্রীকা,শহহর দুজনই অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো তার দিকে।শুধু মাত্র শ্রেয়সই মুখ টিপে টিপে হাসছিলো।চৈত্রীকার মাথাটা গরম করে দিচ্ছে এই কঙ্কাবতী।রাগে গজগজ করতে করতে বললো...
"তোমার সাথে কি মজা করছি আমি?হ্যা?"
কঙ্কাবতী হাসলো।তাচ্ছিল্য হেঁসে ডিভোর্স পেপারটা এগিয়ে দিলো চৈত্রীকার দিকে।বললো....
"আপনি যদি আমার স্বামীকে এতটাই ভালোবাসেন,তাহলে সতীনঘর করতে পারেন,আমার সমস্যা নেই।আমিও বেশ পারবো।তবে আমি আমার স্বামীকে ছাড়ছি না।তো...ক্লিয়ারলি কথাটা একটু শুনুন ম্যাম,এই ডিভোর্স পেপারে আমি কখনোই সই করছি না।মানে,কখনোই না।"
চৈত্রীকা রাগে ফোঁস ফোঁস করতে লাগলো।শহরের ঠোঁটে ফুটে উঠলো কেমন যেন এক প্রশান্তিময় হাসি।কঙ্কাবতী তাকে ছাড়ছে না।হ্যা,কখনোই ছাড়বে না।।।।
শ্রেয়স ধীরে সুস্থে চৈত্রীকার হাত থেকে পেপারটা নিয়ে হাতের বন্ধনে মুছড়ে ফেললো হঠাৎ।তারপরই আবার পেপারটা খুলে নিলো।সেথায় তাকিয়ে হেসে উঠলো সে।কঙ্কাবতীকে উদ্দেশ্য করে হঠাৎই বলে উঠলো...
"ডেয়ার সিনিয়র,আপনার হাতের লিখা তো সুন্দর,তাহলে পেপারে এতো বাজে ভাবে সই করা সাজে?"
ভ্রু কুঁচকে এলো কঙ্কার।কি বলছে এই ছেলে?পেপারে তো সই করেনি কঙ্কা।তাহলে?
"কি সব বলছেন আপনি?আমি কখন পেপারে সই করলাম?"
শ্রেয়স কিছুই বললো না।নির্মল দৃষ্টিতে তাকালো কঙ্কার ঘাবড়ে যাওয়া মুখখানির দিকে।কেমন চোখ গোল গোল করে তাকিয়ে আছে মেয়েটি তার দিকে।দু চোখে একরাশ আগ্রহ ভরপুর।কিন্তু শ্রেয়স যে তার আগ্রহের কারন খানা সহজে খোলাসা করার নয়।তাইতো কঙ্কাবতীর দিকে তাকিয়েই ফিক করে হেসে দিলো সে।পরক্ষণেই পেপারটা চৈত্রীকার দিকে এগিয়ে দিয়ে তাকে বললো...
"আপনি চিন্তা করবেন না ম্যাম।আগামী এক সপ্তাহের মধ্যেই আপনি আসল পেপারটায় সিনিয়রের সই পেয়ে যাবেন।ঠিক এমনই মুছড়ানো একটি কাগজে।আর....একটা কথা ম্যাম।শহর স্যারের জায়গা জমি সবই এখনো তার বাবার নামেই, তাই না স্যার?"
বলেই হাস্যজ্জল মুখে প্রশ্ন ছুড়লো শহরের দিকে।ছেলেটিকে তিনজনেরই খুব খুব বেশিই অদ্ভুত লাগছে।হুট করে এই কথার মানে কি তা হয়তো বুঝে উঠতে পারলো না কেউই।চৈত্রীকা কেমন যেন ঘাবড়ে গেলো।আমতা আমতা করে বলতে লাগলো...
"ক্ কি যা তা বলছো তুমি?এ্ এসব আমায় কেন বলছো?পাগল নাকি তুমি হ্যা?"
শ্রেয়স ঠোঁট উলটে অদ্ভুত ভাবেই দুলতে দুলতে বললো...
"তা আপনিই ভালো জানেন।"
চৈত্রীকা আর কিছুই বললো না।রাগে ফোঁস ফোঁস করতে করতে মুখ বেঁকিয়ে চলে গেলো সেখান থেকে।সে যেতেই শহর যেন হাফ নিঃশ্বাস ফেললো।আড় চোখে একবার শ্রেয়সের দিকে তাকিয়ে কঙ্কাকে বললো...
"বাড়ি চলো কঙ্কাবতী।"
কঙ্কা মানলো।শ্রেয়সের থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে নেমে দাঁড়ালো দোলনা থেকে,তারপর শহরের সাথে পা মিলিয়ে হাটা ধরলো ।তখনই শ্রেয়স পেছন থেকে ডেকে উঠলো...
"ডেয়ার সিনিয়র?"
কঙ্কা, শহর দুজনই আবার থেমে গিয়ে তাকালো তার দিকে।শ্রেয়সের দৃষ্টি নিবদ্ধ কঙ্কাবতীতে,হালকা স্বরে বললো...
"শ্রেয়স আজ আবার কান্না করবে কল্পনায় কারো নির্মম পরিনতি দেখে।আপনি তো সকলের ভালো চান,শুধু এক ভালোবাসাই আপনাকে সর্বহারা করতে পারবে?"
কঙ্কাবতীর হৃদয় কম্পমান। সর্বহারা মানে?কি বুঝাতে চাইছে এই ছেলেটা।শহর স্যারই তো এখন সব কঙ্কাবতীর।তবে কি সে এতো লড়াই এর পরও শহর স্যারকে হারিয়ে ফেলবে?
শহরের ভালো লাগছে না শ্রেয়সের এতো এতো কথা।কেন কঙ্কাবতী অন্য ছেলের সাথে এতটা কথা বলবে? তাই তো কথা না বাড়িয়েই আলতো করে কঙ্কাবতীর বাহু চেপে নিজের সাথে করেই ক্যাম্পাসের বাইরে নিয়ে এলো সে।সকল চিন্তা দস্তুর মত ফেলে উদ্দেশ্য এখন বাড়ি।
---------
দীর্ঘ এক রজনী পাড় হওয়ার পর আবারো সকালের নির্মল আলো পৌছালো সুন্দরের অন্তরে।তেমনি কঙ্কাবতীও চাইলো দিনটা তার সুন্দর দিয়েই ভরিয়ে দিক।ঘুম থেকে উঠেই নিত্যদিনের কাজ হিসেবে গোসল সেরে তৈরী হয়ে নিলো ভার্সিটির জন্য। আলমারি থেকে শহর স্যারের জন্যও এক সুট ড্রেস বের করে রেখে দিলো জায়গা মতো।তারপর নিচে গিয়ে সাবিহাকে নাস্তা বানানোর কাজে সাহায্য করলো। নিয়ম করে সকলে মিলে নাস্তা সেরে নিয়ে তারপর শহরের সাথেই গাড়িতে করে ভার্সিটির উদ্দেশ্যে রওয়ানা।
কঙ্কাবতী বেশ খুশমেজাজে আছে।নিজেকেই নিজে কেমন খুশির জোয়ারে ভাসাতে লাগলো।অন্তরে দুঃখ গুলো মনে পড়লে যে দিনটাই খারাপ যাবে তার।তাই যা হওয়ার দেখা যাবে,কঙ্কাবতী কখনো নিজের কষ্ট গুলো প্রকাশ্যে আনবে না।
ভার্সিটিতে বন্ধুমহলটার সাথে কয়েকটা দিন একটুও ভালো যাচ্ছে না কঙ্কার।ঐ যে কথায় আছে না? ম"রার উপর খড়ার খা।
কঙ্কাবতীর ভালো লাগে না বন্ধুগুলোর এমন ব্যবহার।তাইতো আজকাল সঙ্গটাও কেমন অচেনা অচেনা।ক্লাস করেছে চারটা।পরের ক্লাসটা শহর স্যারের, আজকাল তার ক্লাস করতেও ভালো লাগে না।পড়ায় মন বসে কম,মনে পড়ে যায় নারাজির কথাগুলো।তাইতো আজও বেরিয়ে এলো কঙ্কাবতী।কামিনীতলায় আজ দোলনাটা খালি।বাতাসের তালে হালকা দুলছে।কঙ্কাবতী আজ আর দ্বিতীয় কিছু চিন্তা করলো না,গিয়ে বসলো সেথায়।আজও যখন নিজ প্রচেষ্টায় দোলনাটা দোলাতে সমস্যা হচ্ছিলো,তখন কঙ্কাবতী অনুভব করো পেছন থেকে কেউ যেন তাকে দোল খাওয়াচ্ছে।মাথা ঘুরিয়ে তাকাতেই শ্রেয়সের গোলগোল চশমাওয়ালা চেহারাটা চোখে পড়লো।ঠোঁটের কোনে কিঞ্চিৎ হাসি।
কঙ্কাবতীর মনে পড়ে গেলো শ্রেয়সের কালকের বলা কথা গুলো।ইচ্ছে হলো জিজ্ঞেস করবে, কেন শ্রেয়স কাল এসব বলেছে।ভেবেই কিছু বলার জন্য মুখ খুলতে গেলেই শ্রেয়স বলে উঠলো....
"আজ আর আমি কিছুই বলবো না সিনিয়র।শুধুই সাহায্য করি একটু,আজই তো শেষ।এরপর থেকে কামিনীতলার এই দোলনাটা থাকলেও কেউ বসবে না তো আর।তাইতো আগামীতে দোলনাটা কঙ্কাদোলক হিসেবেই পরিচিত হবে।"
বলেই হাসলো শ্রেয়স।কঙ্কাবতীর শত সমগ্র আগ্রহ থাকলেও জিজ্ঞেস করলো না শ্রেয়সকে।ছেলেটা যে আর কিছুই বলবে না,তা বুঝে গেছে কঙ্কা।নির্মল চিত্তে দু চোখ বুজে গতকালের মতোই দোল খেতে লাগলো কঙ্কা।এদিকে দৌতলার বারান্দা থেকে এক জোড়া চোখ এই দৃশ্য দেখে অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মতো ফুলতে লাগলো। যেই চোখ জোড়া স্বয়ং কঙ্কাবতীর ভালোবাসার...
----------
"চৈত্র তোমাকে আমি বারবার বলেছি এই ধরনের কাজ না করতে।কেন তুমি বার বার কঙ্কাবতীকে এভাবে ডিভোর্স পেপারে সাইন করার জন্য জোর করছো?আরেহ ওর রিসেন্টলি একটা মিনি স্ট্রোক হলো, তোমার এমন প্রেশারে মেয়েটা তো এবার...."
শহরকে পুরো কথাটা শেষ করতে না দিয়েই চৈত্র উদ্বিগ্নের মতো বলে উঠলো...
"ম*রে যাক।।ঐ কঙ্কাবতী ম*রে গেলে তোমার কি হ্যা?বরং আমাদেরই তো লাভ।আমাদের মাঝে আর কেউই থাকবে না।তাহলেই তো..."
সহ্য হলো না শহরের।নির্জন ভবনটির প্রতিটি দেওয়ালে দেওয়ালে প্রতিধ্বনি হতে লাগলো চৈত্রের গালে পরা থাপ্পরের আওয়াজটি।
ঠিক এই সময়টাতেই আগমন ঘটে কঙ্কার।
চৈত্রের গালে হাত দেখে কঙ্কাবতী মুখ টিপে হেঁসে বললো...
"দেখলেন তো ম্যাম।আমার শহর স্যার,শুধু আমারই।আমার জন্য সে তার পুরোনো প্রেমিকার গায়ে হাতও তুলতে পারে।"
কথাটা বলেই পেছনে ফিরে শহরকে বললো...
"বাড়ি যাবো আমি।"
বলতে না বলতেই শহর রাগের মাথায় এবার থাপ্পর বসিয়ে দিলো কঙ্কার গালে।বুঝে উঠার আগেই আরো একটি থাপ্পর এসে পড়লো কঙ্কার গালে।চোখ তুলে তাকাতেই বুঝলো পরবর্তী থাপ্পরটা চৈত্রীকা মেরেছে।অবাক হয়ে গেলো কঙ্কা।চৈত্রীকা তাকে থাপ্পর মারলো,অথচ শহর স্যার কিছুই বলছে না চৈত্রীকা ম্যামকে।উল্টো কঙ্কাবতীকেই বললো....
"কেন এসেছো এখন আমার কাছে??যাও ঐ ছেলেটার সাথে বাড়ি যাও তুমি।এতোক্ষণ তো বেশ হাসাহাসি করছিলে ওর সাথে। এখন যাও?"
কঙ্কাবতী বুঝতে পারলো তার শহর স্যার,তাকে নিয়ে জেলাস।ইশশ,এমন একটা দিনের জন্যই তো এতো অপেক্ষা করছিলো কঙ্কাবতী। পূর্নতা কি তবে আর বেশি দুরে নেই?
ভাবতেই ঠোঁটের কোনে হাসি ফুটে উঠলো কঙ্কাবতীর।নিমেষেই থাপ্পড়ের কথা ভুলে গিয়ে দু কদম এগিয়ে আবার বলতে নিলো...
"আচ্ছা সরি,আর কথা বলবো না ওর সাথে।এবার তো বাড়ি চলুন?"
শহর পিছিয়ে গেলো।হাতের ইশারায় কঙ্কাকে থামিয়ে বৃদ্ধাঙ্গুলি উচিয়ে চোখ রাঙিয়ে বললো...
"নাহ,,তুমি আর আমার সাথে যাবে না।তোমার মুখটা আর এক মিনিটের জন্যও দেখতে চাই না আমি। যাস্ট গেট আউট ফ্রম হিয়ার।"
কঙ্কাবতী হা হয়ে গেলো।এদিকে চৈত্রের মুখে বাঁকা হাসি।নিজের ব্যাগ থেকে পঞ্চাশ টাকার একটা নোট নিয়ে হুট করেই গুঁজে দিলো কঙ্কার হাতে।কুটিল হেসে বললো...
"ওর কাছে মনে হয় টাকা নেই,বুঝলে তো শহর।তাই ভাড়া টা দিয়ে দিলাম।এই টাকা দিয়ে দিব্বি বাড়ি চলে যেতে পারবে উহুম,শহরদের বাড়িতে নয়,,তোমার আগের বাড়ি।অবশ্য তোমার বাবা মারই তো ঠিক নেই,থাকার বাড়িটায় আদেও থাকতে পারো তো?"
কঙ্কাবতীর পরিবার থেকেও যেন নেই।নিজের বাবা মায়ের প্রতি কঙ্কাবতী নিজেই তো বিতৃষ্ণা, তবুও চৈত্রের মুখে এমন কথা যে সইতে পারছে না সে। রাগে দাত মুখ খিঁচে আসছে তার।
তবুও কঙ্কাবতীর বিবেকে বাঁধা দেয় শিক্ষককে কিছু বলতে বাজে ভাবে।তাইতো হাতের টাকা টা আবার চৈত্রীকার হাতেই ধরিয়ে দিয়ে লাল লাল চোখে তাকালো শহরের দিকে।নীরবে,তীক্ষ্ণ কন্ঠে প্রশ্ন ছুড়লো...
"আমায় নিয়ে যাবেন না আপনি?"
শহরও সমান তালে রাগ নিয়ে বললো...
"গেট আউট ফ্রম মাই আই'স।"
কঙ্কাবতী দাঁড়ালো না।কোনো প্রকার তারাহুরোও দেখালো না।চুপচাপ কাধের ব্যাগটা চেপে ধরে চলে গেলো সেখান থেকে।
কঙ্কাবতী যেতেই বারান্দার রেলিংয়ে দু হাতের ভর দিয়ে দাড়ালো শহর।এক হাত দিয়ে চুল গুলোকে পেছনে ঠেলে বার কয়েক ঘন নিশ্বাস নিয়ে নিজেকে শান্ত করার প্রয়াশ চালালো। একটু পরেই কাঁধে চৈত্রের হাতের স্পর্শ অনুভব করতেই ঝাপটিয়ে হাতরা সরিয়ে নিলো শহর।ঘুরে দাড়িয়ে আবারো অগ্নিচোখে তাকালো চৈত্রের দিকে।স্থির, তবে কঠিন স্বরে বললো...
"এতো বড় সাহসটা তুমি না দেখালেও পারতে চৈত্র।আমার ওয়াইফের গায়ে হাত তোলার মতো কোনো অধিকার আমি তোমায় দিই নি।তোমায় ভুগতে হবে এর জন্য। মাইন্ড ইট.."
বলেই হনহন পায়ে বেরিয়ে এলো নিরিবিলি ভবনটার থেকে।ক্লাস তো এমনিই শেষ।বাড়িতে ফিরে একটা শাওয়ার নেওয়া খুব জরুরি।মাথাটা কেমন সত্যিই আউলে আছে।
ভার্সিটি ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে পরিচিত সেই দোকানটির সামনে গাড়ি থামালো শহর।যেখান থেকে কঙ্কাবতীর উঠার কথা।জানালা খুলে প্রতিদিনের নিয়মে বা দিকে তাকিয়ে খুঁজলো কঙ্কাবতীকে।কিন্তু আজ তো নেই কঙ্কাবতী।
ভ্রু কুঁচকে শহর গাড়ি থেকে নেমে এদিক ওদিক খুঁজলো একটু। কিন্তু নেই কঙ্কাবতী।ব্যপার কি?শহর তো ভেবেছিলো যত যাই হোক,কঙ্কাবতী এখানেই এসে দাঁড়াবে। মেয়েটাও রাগ করতে পারে?জানা ছিলো না তো শহরের।
দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে যখন এসব ভাবছিলো তখনই দোকান থেকে বয়ষ্ক দোকানি এসে শহরকে বললো...
"কঙ্কাবতীকে খুজতাছেন স্যার? অয় তো আইজ দেখলাম বাসে উইঠা গেলো।"
শহর হালকা হাসার চেষ্টা করে বললো...
"বাসে গেলো?,ও্ ওহ আচ্ছা আচ্ছা। ঠিক আছে ধন্যবাদ চাচা। "
বলেই গাড়িতে উঠে বসলো আবার।মনে মনে চিন্তা করলো, মেয়েটার এতো রাগ? না জানিয়ে চলে গেলো? কোথায় আর যাবে,সেই ঘুরে ফিরে শহরের কাছেই তো আসবে সে।ভেবেই আলতো হেসে গাড়ি স্টার্ট দিলো শহর।
বাড়ি ফিরে রুমের দিকে ছুটে শহর, কঙ্কাবতীকে দেখার উদ্দেশ্যে।কিন্তু উচ্ছাসের মাত্রা কমে এলো শহরের যখন রুমটা পুরো খালি পেলো।ভ্রু জোরা কুঁচকে চিন্তা করতে লাগলো,
কঙ্কাবতী তো আরো আগেই বাস ধরেছে বললো।তাহলে এতোক্ষণে তো বাড়ি পৌঁছে আরামে ঘুম দেওয়ার কথা মেয়েটার।এখনো ফিরেনি?
মৃদুস্বরে কানে বাড়ি খেলো গানের কয়েকটি লাইন...
""" টাপুর টুপুর বৃষ্টি নুপুর,
জল ছবির এই গায়ে..
তুই যে আমার একলা আকাশ
মেঠো সুরের বায়, রেএএ মেঠো সুরের বায়... """
আওয়াজটা শর্মির ঘর থেকে আসছে।শর্মিতো বাড়িতে নেই এখন।তাহলে এই গান নিশ্চয়ই কঙ্কাবতী শুনছে?
ভেবেই ছুটে গেলো শহর সেথায়।শর্মির রুমে কঙ্কাবতী? এই কঙ্কাবতী ডাকতে ডাকতে ঢুকতেই দেখলো রুমে কঙ্কাবতী নেই,রয়েছে শহরের মা।শহরকে দেখেই সাবিহা হালকা হেঁসে বললো...
"তোরা চলে এসেছিস?দেখ রোজ কঙ্কা এসে গান শুনে।আজ আমি ও আসার আগেই গান চালিয়ে বসে এইলাম।তা কোথায় কঙ্কা?"
শহর ঢোক গিললো।তবে কি কঙ্কাবতী এখনো বাড়ি ফেরেনি?
"কঙ্কাবতী এ্ এখনো আসেনি আম্মু?"
শহরের থমকানো কন্ঠের কথা শুনে একটু অন্য রকম লাগলো সাবিহার কাছে।বললো...
"নাহ,,তোর সাথেই তো ফেরার কথা কঙ্কার।তাহলে এই কথা জিজ্ঞেস করছিস যে?"
শহর এদিক ওদিক তাকিয়ে ভাবতে লাগলো কি বলবে।তবে এই মুহুর্তে কিচ্ছু লুকাতে চাইলো না শহর।তাইতো আজ ভার্সিটিতে ঘটে যাওয়া সব কথাই বললো সাবিহাকে।সবটা শুনে সাবিহা বেশ নারাজি হলো নিজের ছেলের প্রতি। নানা কথা শুনানোর মধ্যে শহর যখন বলে উঠলো...
"প্লিজ আম্মু, তুমি আমায় পরে ইচ্ছে মতো বকো।এখন কঙ্কাবতীকে খুঁজে পাওয়াটা জরুরি।"
কথাটা শুনেই মনটা একটু নরম হলো সাবিহার।ঢোক গিলে বললো...
"তুই কল করেছিস ওকে?"
শহর হা না কিচ্ছু বললো না।দ্রুত পকেট থেকে ফোন বের করে ডায়াল করলো কঙ্কাবতীর নম্বরে।দু বার রিং হতেই কেটে গেলো কলটি।এভাবে শহর চার পাঁচবার দেওয়ার পরেও বারবার কেটেই দিচ্ছিলো কঙ্কাবতী। শহর করুন চোখে সাবিহার দিকে তাকাতেই বললো....
"আরেহ, হয়তো রাগ করে বাবার বাড়িতে গেছে কঙ্কা।আমার নম্বর থেকে কল করে দেখি দাড়া।"
সাবিহার নম্বর থেকে কল করার পরও বারবার কল কেটেই দিচ্ছিলো কঙ্কাবতী।সাবিহা দেখলো তার ছেলেটা কেমন হাসফাস করছে।তাইতো শান্তনা দিলো নিজেকে এবং শহরকেও।বললো....
"দেখলি তো??সব সময় হাসি খুশি থাকা মেয়েটার রাগ কতটা গভীর হতে পারে?এমন মানুষ গুলো সহজে রেগে যায় না,অভিমানও দেখান না।মনের শুপ্ত কোনে লুকিয়ে রাখে।আর কোনো কারনে রেগে গেলে সহজে আর সেই রাগ ভাঙা যায় না।আরে কষ্ট দে না মেয়েটাকে তুই?"
শহর নাক কুঁচকে বললো...
"আম্মু তুমি এখন এসব না বলে একটু বুদ্ধি দাও না,কি করে কঙ্কাবতীর খোঁজ পাবো।"
সাবিহা শহরকে বুঝিয়ে বললো...
"আরে হয়তো, রাগের মাথায় কেটে দিচ্ছে কলটা।আচ্ছা,থাক না কিছুক্ষণ ও বাড়িতে।দেখবি রাতের দিকে রাগ কমলে এমনিই কল দেবে ও আমাকে।যা এখন ফ্রেশ হয়ে আয়,আমি খাবার বাড়ছি।"
সে সময় সাবিহার বলা কথাটিকে নিয়েই শহর শান্ত হলো।নিজেকে বুঝ দিলো কঙ্কাবতী ঠিক আছে।কিন্তু তবুও মনের ভেতর কেমন যেন হাসফাস লাগছে তার।একটু পর পর গিয়েই সাবিহাকে জিজ্ঞেস করছে কঙ্কাবতী কল করেছে?
ফের বার বারই অসফল হয়ে ফিরে আসছে।দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যা হলো,সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত প্রায় সাড়ে দশটা।রুমের ভেতর পায়চারি করতে করতেই আপন চিত্তে কঙ্কাবতীর প্রত্যেকটা দুষ্টুমির কথা ভাবছে শহর।খুব মিস করছে যে সেগুলো আজ।একটা সময় শহর ছিলো একরোখা,এই সব যে খুবই অপছন্দের ছিলো তার কাছে।কিন্তু ধীরে ধীরে কঙ্কাবতীর এসব দুষ্টামিতে কেমন যেন অভ্যস্ত হয়ে গেছে শহর।আজকাল কঙ্কাবতীকে ছাড়া যে একটা মুহুর্তও ভালো লাগে না তার।
এসব ভাবনার মাঝেই হঠাৎ হন্তদন্ত হয়ে শহরের রুমে ঢুকলো লাবিব আর সাবিহা।দুজনের চোখে মুখেই চিন্তার ছাপ স্পষ্ট। তাদের এমন অবস্থা দেখে শহরও ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো....
"কি হলো তোমাদের।এমন দেখাচ্ছে কেন?"
সাবিহা শাড়ির আচলের ভাঁজে কপালের ঘাম মুছে বললো....
"একটু আগেই কঙ্কার ফোনটি রিসিভ হলো। ক্ কঙ্কা ধরেনি।একটা লোক বললো সে নাকি বালুকহাটির মোড়ে রাস্তার ডাস্টবিনে ফোনটি পেয়েছে।এখান থেকে প্রায় চার ঘন্টার পথ বালুকহাটি।"
সাবিহার গলা কাঁপছে,তার সাথে সাথে লাবিবও চিন্তিত কন্ঠে বললো....
"কঙ্কামায়ের ফোনটা ওখানে পাওয়া গেছে শুনে আমি ওদের বাড়ির নম্বরে কল দিই মাত্র।তারা জানালো কঙ্কা মা নাকি ও বাড়িতে যায়ই নি আজ।"