শুভ্রতার ছোয়ায় আবৃত ঘরের বিছানা কঙ্কাবতীর নিথর, নিষ্প্রভ দেহটা দেখেই হৃদপিণ্ড থমকে গেলো শহরের।বিছানার পাশেই নিষিদ্ধ কিছু ঔষধের পাতা।যা দেখেই শহরের চিন্তারা অবসর নিলো যেন তার থেকে।কঙ্কাবতী নেই,কথাটা যেন মেনে নিতে পারচে না সে।কঙ্কাবতী কি করে না থাকতে পারে? এতোটা মায়া লাগিয়ে কঙ্কাবতী কি করে থাকবে তার শহর স্যারকে ছারা? এটা তো অসম্ভব।
শহরের নিশ্বাস নিতে বড্ড কষ্ট হচ্ছে। গলায় এসে যেন আটকে যাচ্ছে সব।ঢোকও গিলতে পারছে না সে।হাত কাপছে,পা দুটোও খুব কাঁপছে। সেই কম্পনরত পা জোরা নিয়েই বিদ্ধস্ত শহর এগিয়ে গেলো নিথর কঙ্কাবতীর কাছে।
কাপা কাপা হাতটা এগিয়ে নিয়ে রাখলো কঙ্কাবতীর গালে।গলা দিয়ে কথা বের হচ্ছে না,তবুও নিজের সর্ব শক্তি দিয়ে ডাকার চেষ্টা করলো..
"ক্ কঙ্কাবতী? এ্ এই কঙ্কাবতী?ব্ বউ? কথা বলো একটু।এই যে আমি তোমার শ্ শহর স্যার ডাকছি তোমায়?"
কঙ্কার কোনো পরিবর্তন পরিলক্ষিত হলো না।হটাৎই শহরের কি হলো জানা নেই।চিৎকার করে উঠলো কঙ্কাবতী বলে।চোখের কার্নিশ বেয়ে গড়িয়ে পড়লো অশ্রু কণা।মুখ গুঁজে দিলো কঙ্কার গলায়।
কাঁদছে সে,,কান্নার সাথে সাথে বাচ্চাদের মতো কেঁপে কেঁপে উঠছে বারবার।একটু পরেই নিজের এলোমেলো চুলের ভাঁজে কারো কোমল হাতের স্পর্শ পেলো যেন শহর।কে হাত রাখলো?
নিজেকে একটু শান্ত করে মুখ তুলে চাইলো সে।নজরে এলো তার কঙ্কাবতী ভ্রু কুচকে তাকিয়ে আছে তার দিকে।
ইশশ,কি যে প্রশান্তময় ক্ষণ ছিলো তখন।শহরের উদ্বিগ্নতা কে দেখে।পাগলের মতো কান্না হাসি মিশেল এক অনুভূতি। দু হাতের আজলে কঙ্কাবতীর মুখটা তুলে নিয়ে অজস্র চুমু খেতে লাগলো কঙ্কাবতীর সারা মুখ জুড়ে।কি হলো কে জানে তার।
"তুমি ঠিক আচো তো কঙ্কাবতী?কিছু হয়নি তো?"
কঙ্কাবতী নিষ্পলক তাকিয়ে এদিক ওদিক মাথা নাড়িয়ে বুঝালো তার কিছু হয়নি।এতেই যেন শহরের হৃদপিণ্ডসহ শীতল হয়ে এলো।দ্রুত আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরলো কঙ্কাবতীকে। কঙ্কাবতীর কাঁধে মুখ গুজেই বলতে লাগলো...
"এমন কেন করলে তুমি? কেন আমায় সবটা বলো নি এতোদিন।কেন বলো না??"
কঙ্কাবতী হুহু করে কেঁদে উঠলো।নিজের সমস্ত জমিয়ে রাখা যন্ত্রণা যেন এক নিমেষেই কারোর উষ্ণ আলিঙ্গনে ধুয়ে মুছে যাচ্চে তার।মন খুলে কাঁদছে সে,,
কঙ্কাবতীর ভয়ঙ্কর কান্না শহরের শিরদাড়ায় যেন কম্পন সৃষ্টি করলো।ইশশ,কতটা যন্ত্রণা মেয়েটা এতোগুলো দিন হজম করে নিলো।শহর আরেকটু শক্ত করে জরিয়ে নিলো কঙ্কাবতীকে নিজের কাছে।
কঙ্কা কাঁদছে মন খুলে।একটু পর কাঁদতে কাদতে হিচকি তুলে নিজেই বললো...
"আ্ আমি প্ পারিনি স্যার।আপনার হক,আমার সমস্ত জীবনের মুল্যবান সম্পদ,আ্ আমি রক্ষা করতে পারিনি।"
শহরের চোখেও পানি।ক্লান্ত কন্ঠে বললো...
"কেন আমায় বলোনি তুমি এতদিন।কেন লুকিয়ে রেখেছো,কেন কঙ্কাবতী?"
"আ্ আমি পারিনি বলতে। ক্ কি বলবো আমি,,আ্ আমি নিজের সম্মান বিলিয়ে এসেছি বলবো?ক্ কি করে,,"
শহর নিজের প্রতি গৃণায় চোখ কুঁচকে নিলো।রাগে ক্ষোবে বলে উঠলো....
"সবটা আমার দোষ,,সবটা,আমি তোমায় একা ছেড়ে দিয়েছি সেদিন।শুধু মাত্র চৈত্রের জন্য আমি তোমার এমন ক্ষতি..."
"সেদিন কত করে আপনাকে ডাকলাম স্যার।আমায় কেন বাঁচাতে আসলেন না স্যার।কেন আসলেন না?"
কঙ্কাবতীর করুণ কন্ঠের আকুতি যেন শহরকে নাড়িয়ে দিচ্ছে ভেতর থেকে।তার এত দিনের ধরে রাখা শক্তিধার অবয়ব,সবটা, সবটাই যেন তুচ্ছ মনে হচ্ছে আজ।নিজেকে কাপুরুষের থেকেও নিম্ম লাগছে।তা নয় তো কি?? নিজ হাতে নিজের স্ত্রীর ক্ষতি করলো সে।ইশশ,এই অপরাধের শাস্তি কি হতে পারে?
"জ্ জানেন স্যার,,আ্ আমি সবটা দেখেছি।স্ সবটা।কিভাবে ঐ লোকগুলো আমার শরীরটা..."
কথা আটকে এলো কঙ্কার।কান্নায় ভেঙে পড়ছে সে।পারছে না বলতে সে।নিজের অসঙ্গতিপূর্ণ পূর্ণ কথাগুলো মুখে আনতে পারছে না সে।
শহর কঙ্কার কপালে নিজের কপাল ঠেকলো।চোখ বুঝে হিসহিসিয়ে বললো...
"আমায় তুমি শাস্তি দাও কঙ্কাবতী।আমায় মেরে ফেলো তুমি।আমি পারছি না নিজেকে ক্ষমা করতে..."
কঙ্কা ঢোক গিললো।শহরের গালে নিজের দু হাত ঠেকিয়ে ঘন ঘন নিশ্বাস ফেলে ওভাবেই বললো...
"ও্ ওরা কি যেন একটা ইনজেকশন দিলো আমায়,,,যার কারনে আ্ আমার সমস্ত শরীর অবস হয়ে ছিলো স্যার।আ্ আমি সবটা দেখেছি,অনুভব করেছি নিজের সাথে কি হচ্ছে, কিভাবে আমার সমস্ত অস্তিত্ব বিলীন করে দিচ্ছিলো তারা,,ক্ কিভাবে আপনার হক...... আ্ আমি অনেক চেষ্টা করেও কিচ্ছু করতে পারিনি।একটা আঙুল পর্যন্ত নাড়াতে পারিনি আমি,এতো অসহ্য যন্ত্রণা, আ্ আমি ম'রে যাচ্ছিলাম,,ওরা আমায় শেষ করে দিচ্ছিলো।আ্ আপনাকে পাইনি আমি,,আমার কেউ ছিলো না, কেউ ছিলো না। কেউ বাচাতে আসলো না আমায়।আপনিও নাহ.."
শহর নীরবে কাদছে। তার চোখের পানিতে ভিজে যাচ্ছে কঙ্কাবতীর পুরো মুখ।কঙ্কাবতী নিজেকে সামলে নিলো কিছুটা।চোখ মুখ মুছে বললো..
"পুরোটা রাত আমার বি'ষের মতো কেটেছে।প্ পরদিন অনেক কষ্টে আ্ আমি পালিয়েছি সেখান থেকে।হ্ হাটতে পারছিলাম না স্যার,,এ্ একটু এগিয়েই সারাটা শরীর আমার চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে যাচ্ছিলো।বাসে উঠলাম,তার কিছুক্ষণ পরেই এ্ এক্সিডেন্টটা.."
থামলো কঙ্কা।নিজেকে ধাতস্থ করে চোখ মেলে তাকালো শহরের দিকে।ভেজা চোখে চেয়ে করুন কন্ঠে বললো...
"আপনি কেন এসেছেন স্যার??আমি তো ডিভোর্স পেপারে সাইন করে এসেছি।"
শহর সোজা হয়ে বসে শার্টের হাতায় চোখ মুছে নিলো।বড় একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললো...
"একজন সাইন করলেই হয়ে যায় না।তোমার সাহস কি করে হয় আমাকে ছেড়ে আসার? এই ভালোবাসো তুমি?"
"আর কোনো উপায় ছিলো না আমার।আর আপনি তো চৈত্রীকা ম্যমকে ভালোবাসেন."
"তো?তাই বলে তুমি নিজের স্বামীকে অন্যের জন্য ছেড়ে আসবে??আর কি ভেবেছো তুমি?আমি সত্যিটা জানার পর তোমায় ছেড়ে দেবো?"
কঙ্কাবতী দীঘল চোখে চেয়ে জিজ্ঞেস করলো...
"আপনি আমায় মেনে নেবেন?"
শহর ফের প্রশ্ন করলো...
"তুমি মেনে নেবে আমায়?"
"ভালোবাসায় মেনে নেওয়ার কোনো মানে হয় না।"
"তাহলে কেন জিজ্ঞেস করছো আমি মেনে নিবো কি না।তুমি আমার বউ,এটা তোমার অধিকার,আর আমি তোমায় তোমার প্রাপ্য অধিকার দেবো।ভালোবাসার অধিকার।"
"কিন্তু আমি যে আপনাকে আপনার সম্পূর্ণ অধিকার কখনোই দিতে পারবো না।আমি যে আর..."
কঙ্কাকে বলতে দিলো না শহর।বাধা দিয়ে বললো...
"তুমি পবিত্র। এটা আমি মানি। সব মেয়েরাই তার স্বামীকে শুদ্ধ শরীর দিতে চায়।তুমি না হয় আমায় মন থেকে ভালোবাসাটাই দিও।ঠিক প্রথমের দিনগুলোর মতো যত্ন নিও আমার।দিনরাত সারাটাক্ষন আমায় ভালোবাসি ভালোবাসি বলতে থেকো।আমার এতেই হবে।"
-----------
পূর্ণতায় পরিপূর্ণ হয়তো হলো কঙ্কাবতী।অবশেষে কাঙ্খিত মানুষটি তার।তার ভালোবাসা,শহর স্যার পুরোটাই তার নিজের।তবুও যেন কোথাও একটা ফাঁকা। সেই ঘটনার প্রায় দু'মাস কেটেছে।শহর আইনি ভাবে যথেষ্ট চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সেদিনের সেই নরপশুদের শাস্তি দেওয়ার।
এর মধ্যে কঙ্কা আবার ভার্সিটি যাওয়া আসা শুরু করেছে।নাহ,,আগের মতো চাঞ্চল্যতা ঠিক নেই তার মধ্যে। এখন আর শহরদের বাড়ির কেউ সারাটাক্ষন মেতে থাকেনা হাসি আনন্দে। ভার্সিটিতে সেই দোলনাটা রয়েছে এখনো কামিনীতলায়।তবে সেখানটায় ছোটখাটো একটা ভিউজোনের মতো করে ফেলা হয়েছে।দোলনাটায় কেউ বসে না আর।
কঙ্কা দুর থেকেই তাকিয়ে রইলো সেই দোলনাটার দিকে।কিন্তু আজ আর ইচ্ছে করলো না সেথায় গিয়ে বসতে,অথচ দোলনাটা ফাঁকা। পাশ থেকে দুটো মেয়ে পার করে যাওয়ার সময় কঙ্কার কানে এলো,মেয়েগুলো কঙ্কাদোলকে যাওয়ার কথা উচ্চারন করেছে।তবে কি শ্রেয়সের কথাটাই মিললো।
হ্যা,,শ্রেয়স মাইন্ড রিডার।ভবিষ্যৎ নিয়ে ঠিক যা যা বলেছে তাই তাই হয়েছে।কিন্তু এখন আর কোকড়ানো চুলের গোলগোল চশমাওয়ালা শ্রেয়সকে কোথাও দেখা যায় না।কঙ্কাবতী তার ডিপার্টমেন্টে গিয়ে শ্রেয়সের নাম ও বর্ণনা দিয়ে খোঁজও নিয়েছে।কিন্তু অদ্ভুত, ডিপার্টমেন্টের কেউই শ্রেয়সকে চেনে না,এমনকি নামটাও শুনেনি কখনো।তবে কি শ্রেয়স সম্পূর্ণই একটি কাল্পনিক চরিত্র? তার হঠাৎ আগমন কি শুধু কঙ্কাবতীর জন্যই হয়েছিলো?
নিজের হাতে কারো হাতের স্পর্শ পেয়ে ভাবনা থেকে ফিরলো কঙ্কা।শহর স্যার তার হাত ধরেছে শক্ত করে।হ্যা,পুরো ভার্সিটি ক্যাম্পাসে দাঁড়িয়েই তিনি কোনো দ্বিধা ছাড়াই কঙ্কাবতী ভরসার হাতে ধরেছে।আচ্ছা, শহর স্যার কি এখন আর লোক জানাজানির ভয় পাচ্ছে না?
"দাঁড়ালে কেন কঙ্কাবতী?ক্লাসে চলো।"
কঙ্কাবতী দৃষ্টি নামিয়ে একবার শহরের হাতের দিকে চাইলো।পরক্ষনেই মুচকি হেসে মাথা নাড়িয়ে সায় জানো শহরকে।
--------
সবটা স্বাভাবিক থাকলেও কঙ্কাবতীর ভেতরে চলছে এক নিবিড় যন্ত্রণা। শুক্রবারের সকাল।ভার্সিটি আজ দুজনেরই বন্ধ। সকালের নাস্তা সেরে রুমে আসতেই বারান্দায় কঙ্কাবতীকে আনমনা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলো শহর।মেয়েটা আজকাল এভাবেই কাটিয়ে দেয় তার সময় গুলো।
ঘন একটা নিশ্বাস ফেলে শহর পেছন থেকে হালকা জড়িয়ে ধরলো কঙ্কাবতীকে।
"কি ভাবছো বউ?"
কঙ্কাবতী চমকালো না।নীরব কন্ঠে বললো...
"আপনার জীবনটা আমি নষ্ট করে দিচ্ছি তাই না।আপনাকে স্বামী হওয়ার সুখ দিতে পারিনি।আর হয়তো..."
"হয়তো কি কঙ্কাবতী??কেন তুমি নিজেকে এতটা তুচ্ছ মনে করছো।তুমি আমার মনের মতো।আমি তোমায় এভাবেও চাই,ওভাবেও চাই।কেন এসব ভেবে নিজেকে কষ্ট দিচ্ছো তুমি?আগের মতো হয়ে যাও না প্লিজ।"
কঙ্কাবতী ঘুরে দাঁড়িয়ে চোখে চোখ রাখলো শহরের।তার দৃষ্টি দেখে শহর বুঝলো কঙ্কাবতী কিছু একটা বলতে চাইছে।তাইতো কঙ্কার দু গালে আদুরে হাত রেখে সুধালো...
"কিছু বলবে তুমি??নির্দিধায় বলো?"
" দুটো মাস ধরে আমার পি'রিয়ড মিস যাচ্ছে স্যার।আ্ আমার মনে হচ্ছে, আমার মধ্যে ঐ নরপশুগুলোর অ্ অংশ...."
কঙ্কাবতীর নিশ্বাস ভারি হচ্ছে। কথা আটকে যাচ্ছে মুখে তার।শহর শুনলো,,খারাপ লাগছে খুব।তবুও সে কঙ্কাবতীকে বুঝতে দিলো না,,কঙ্কাবতীকে সামলে নিয়ে বললো...
"কঙ্কাবতী,,ত্ তুমি এই জন্য এতটা টেনশন করছো।আরেহ,,কিচ্ছু হবে নাহ।এমনিই হয়তো মিস করছে।তোমার অসুস্থতার কারণে অনেকটা ব্লাড গেছে এই ক'দিনে।তাই হয়তো এমন হচ্ছে। তুমি কি টেস্ট করেছো?"
কঙ্কাবতী দু দিকে মাথা নাড়ালো।শহর বললো...
"ঠিক আছে,তুমি থাকো।আমি কীট নিয়ে আসছি,হুম?"
শহর যেতে নিলের কঙ্কা তার হাত ধরে বাঁধা দিলো।শহর জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাতেই বললো...
"নাহ।আ্ আমার ভয় করছে স্যার।এভাবে টেস্ট করবো না।য্ যদি ভুল আসে?"
শহর কিছুক্ষন নীরবে দেখলো কঙ্কাবতীর করুন মুখটা।মেয়েটার ভেতর ঠিক কি চলছে তা যে ঠাওর করা মুশকিল। শহর নিজেকে ধাতস্থ করে নিলো।কঙ্কাবতীর হাত ধরে রুমে নিয়ে আসতে আসতে বললো..
"রেডি হয়ে নাও।ডক্টরের কাছে যাবো এখুনি।কোনো সন্দেহ রাখবো না তোমার মনে।চলো।"
-------
ড.সাবরিনা সাবা, গাইনি বিশেষজ্ঞ। তার চেম্বারেই বসে আছে শহর আর কঙ্কাবতী।ড.সাবরিনার হাতে কঙ্কাবতীর কিছু টেস্ট রিপোর্ট। সেগুলো সাইটে টেবিলে রেখেই তিনি একটু বাঁকা চোখে তাকালেন কঙ্কাবতীর দিকে।তার তাকানোর ধরন দেখেই কঙ্কাবতী ঢোক গিললো।আড়ালে শহরের হাত চেপে ধরলো নীরবে।শহর বুঝতে পেরে আস্বস্ত করলো তাকে।ড. সাবরিনা এবার শহরের দিকে তাকিয়ে আকারে ইঙ্গিতে কিছু প্রশ্ন করলো..
"আপনি তো উনার হাসবেন্ড। আপনি কি বাইরে থাকেন?আই মিন, আপনারা কি ডেইলি একসাথেই থাকেন না?"
শহর স্বাভাবিক ভাবেই উত্তর দিলো...
"আমরা একসাথেই থাকি।হঠাৎ এই প্রশ্ন যে ??"
ড. সাবরিনা আর কথা ঘোরাতে চাইলো না।সরাসরিই বলতে লাগলো...
"দুঃখিত মি.শেহেরিশ।আপনার হয়তো শুনে খারাপ লাগবে,,তাও সত্যিটা বলছি আপনাকে।আপনার ওয়াইফ আপনার সাথে চিট করছে।সি ইস ইন্টিমেন্টেড উইথ এনাদার ম্যান।"
কথাখানা কানে যেতেই কঙ্কাবতীর চোখ থেকে এক ফোটা পানি গড়িয়ে পড়লো।শহর উদ্বিগ্ন হয়ে তাকে সামলাতে লাগলো...
"কঙ্কাবতী,,কাঁদছো কেন।কিচ্ছু হয়নি। আমি আছি তো,,বলছি বুঝিয়ে।প্লিজ ওসব মাথায় এনো না তুমি।"
কঙ্কা চেষ্টা করলো নিজেকে সামলানোর।উঠে দাঁড়িয়ে আস্তে করে বললো...
"আ্ আপনি কথা বলে আসুন স্যার।আমি বাইরে অপেক্ষা করছি।"
শহর বাঁধা দিলো না তাকে।ভালো হয় কঙ্কাবতী এসব কথার মাজে না থাকলেই।কঙ্কা যেতেই শহরকে ড. সাবরিনা বললো...
"আ'ম এক্সট্রিমলি সরি,, কিন্তু আমি উনার শরীরে বেশ কয়েক জনের ডিএনএ পেয়েছি।আপনি বুঝতে পারছেন আমি যা বলতে চাইছি। "
"আমি জানি ড.। বাট,আ'ম সরি,আপনি বুঝতে একটু ভুল করেছেন।আমার ওয়াইফ চিট করছে না।।একচুয়ালি সি ওয়াজ রে'পড।আমরা এতো সিরিয়াসলি প্রেগন্যান্সি টেস্টটা এই জন্যই করাতে এসেছি।"
ড.সাবরিনা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো শহরের দিকে।অবাকের রেশ কাটিয়ে বললো..
"ওয়াট!!আ'ম সো সরি।আমি না জেনেই... "
"ইটস ওকেয়।টেস্ট রিপোর্টে কি এসেছে যেন?"
"দেখুন,,রিপোর্টে তেমন কিছুই ধরা পরে নি।এত তারাতারি কিছু বলা যাচ্ছে না।আপনারা নাহয় আরো একটা মাস অপেক্ষা করুন।তারপর হয়তো বিষয়টা ক্লিয়ার হবে।"
শহরের মনে যেন একটু খানি শক্তি সঞ্চার হলো।কঙ্কাবতীকে নিয়ে বাড়ি ফিরলো সে।সেদিন রাতটায় কঙ্কাবতী নীরব ছিলো পুরোটা সময়।শহরও তার ক্লান্ততার ঔষধ হিসেবে বেছে নিলো কঙ্কাবতীকে।তীব্র ভাবে ইচ্ছে হলো কঙ্কাবতীকে জড়িয়ে ধরতে।মনে হচ্ছিল যেন ছেড়ে দিলেই শহরের থেকে পালিয়ে যাবে তার কঙ্কাবতী।শক্ত করে নিজের বক্ষপাজরে আগলে রাখলো সারাটা রাত। আজীবনের তৃষ্ণা মিটানোর একটুখানি প্রয়াস হয়তো এটা।.....
---------
"অন্তঃ বাসিনী "
কঙ্কাবতীর সেই ডায়েরী খানার পাতা গুলো আজ রঙচটা। চারটা বছর ধুলো ময়লায় পরে থাকা জিনিস,আর কতই বা ভালো থাকে?
শুভ্র পাঞ্জাবির উপর এলোমেলো ভাবে শাল জড়ানো শহরের গায়ে।আজকাল আর পরিপাটি থাকা হয় না তার।চুল দাঁড়ি গুলোও বেড়ে উঠছে অনবরত। চারটা বছর পর সেই পরিচিত রুমটায় পদার্পন করেই ধুলো জমা ডায়েরীটা হাতে নিয়ে চেয়ারে বসলো শহর।
এই ডায়েরীটার প্রতিটি পাতায় তার কঙ্কাবতী রয়েছে।এই শহর স্যারকে ঠিক কতটা ভালোবেসেছে কঙ্কাবতী,তার সাক্ষী এই 'অন্তঃবাসিনী'
টেবিল ল্যাম্পটার গুটিগুটি আলোয় শহর একের পর এক উল্টে উল্টে পড়তে লাগলো তার কঙ্কাবতীর লিখে রাখা অনুভূতি গুলো।শহর স্যারকে ভালোবাসার প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত। হ্যা,কঙ্কাবতী নিজের জীবনের পুরোটা সময়ই ভালোবাসলো শহর স্যারকে। শহরও কি তাই পারবে?
দীঘল এক রজনী পাড় হলো। কিন্তু চৌধুরী বাড়িতে আজ আর সূর্য উঠলো না,বরং নিভে গেলো তাদের নীলমণি রত্ন।এক অপারগ মা বাবার সামনে দিয়ে খাটিয়ায় চড়লো তাদের সন্তান।
হ্যাঁ,অন্তঃবাসিনী নামক ডায়েরীটার মাঝে কঙ্কাবতীকে খুঁজতে খুঁজতেই চেয়ারে হেলান দিয়ে চিরকালের মতো চোখ বুঁজে নিলো নিষ্প্রভ শহর। সকাল হতেই গভীর থেকেও গভীর হতে লাগলো বাড়িটায় কান্নার সুর।আম্মু কাঁদছে, আব্বু কাঁদছে, ছোটবেলায় খেলার সাথী বড় বোনটাও আজ কাঁদছে তার ভাইয়ের জন্য।
আর কঙ্কাবতী? সে কোথায়? সে তো সেই চারটা বছর আগেই পাড়ি জমিয়েছে না ফেরার দেশে।নিজের প্রতি চরম ঘৃণা,ভালোবাসার মানুষটিকে নিজের সতীত্বের সুখ না দিতে পারার যন্ত্রণার শাস্তি হিসেবে মৃত্যুর পথটাই বেছে নিলো সেদিন কঙ্কাবতী। প্রচন্ড হীনমন্যতা তাকে কোনোদিকই ভাবিয়ে তোলার সময় দেয়নি।না পারলো ধর্মের দোষের সঙ্গা নিতে,আর না পারলো শহরের অন্তরে লুকায়িত ভালোবাসার পরিমান করতে।সবটা না জেনেই চার বছর আগের সেদিন রাতে শহরের বাহুডোর থেকে বেরিয়ে নীরবে তিনতলা বাড়িটার ছাঁদ থেকে ঝাপ দিলো সে।
তারপর? তারপর সেই এক চাঞ্চল্যকর কঙ্কাবতীর ইতি ঘটলো সেখানেই।
খাটিয়ায় চড়িয়ে শহরকে ধীরে ধীরে নিয়ে যেতে লাগলো শেষ ঠিকানায়।খাটিয়াবাহী প্রতিটি লোকের এক একটি কদমের সাথে যে শহরের সুখের এক একটি বাক্য বাহিত হলো...
''সেদিন যখন নতুন সূর্যদ্বয়ের সাথে তোমায় নিজের বাহুডোরে না পেয়ে, পেলাম বাড়ির বাগানের ইটের সলিংয়ের জায়গাটায়,আমি তখনই একটা জীবনের অন্ত হতে দেখেছি নিজের।তুমি আমায় একপাক্ষিক ভালোবেসেছো দুটো বছর,তারপর?দুজন দুজনকে ভালোবেসে কাছে পাইলাম দু'টো মাস।আর দেখো কঙ্কাবতী,আমি তোমায় এক পাক্ষিক ভালোবাসলাম চারটা বছর।
তোমার ভালোবাসার সময়ে তুমি আমায় সামনে পেয়েছিলে,আমার গলার স্বর তোমার কান অব্দি পৌছেছে, আমার নয়নে নয়ন মিলেছে।কিন্তু এই চারটা বছর,আমার ভালোবাসার সময়ে আমি তোমায় পাইনি কঙ্কাবতী।তোমার মুখের হাসিটুকু দেখিনি,তোমার রিনরিনে আওয়াজের কথাগুলো শুনিনি।তোমার কাজল বিহীন মায়াবী দু'টি চোখের দেখা পাইনি,যেই চোখ দু'টি আমায় দেখলেই নির্মল হাসতো। ক্ষনে ক্ষনে উন্মাদের মতো ভালোবাসি শব্দটি শুনি নি।
তুমি কি বুঝতে পারছো,আমার ভালোবাসার পাল্লাটা তোমার থেকেও ভারী হয়ে উঠেছে।অথচ লোকে বলতো,শহরের থেকেও কঙ্কাবতী ভালো কাউকে পেলে ভালো হতো।শহরের চরিত্রটা ভালো লাগছে না।শহর কঙ্কাবতীর যোগ্য নয়।হুহ,,যোগ্যতার বিচারে আজ আমি এগিয়ে দেখো।
তোমাকে তোমার মতো করে ভালোবাসতে পারিনি আমি।কিন্তু দেখো,তার অধিক ভালোবেসেছি।সেই আধিক্যের ফলে আমি মষ্তিকের জ্ঞান শূন্য হয়েছি ধীরে ধীরে।জানো কঙ্কাবতী,তোমার জন্য পাগলামো গুলো মানুষের খুব চোখে লাগতো।আমিও নিজের মধ্যে থাকতাম না।আমাকে বিকৃত হতে দেখে আব্বু আম্মু আমায় নিয়ে গেলো সেই দুর আমেরিকায়।যেথায় তোমার একটা চিহ্নও রাখতে দেয় নি।কিন্তু তারা তো আর জানতো না,তুমি স্বয়ং আমার হৃদয়েই আছো।
তথাকথিত পাগল জিবন থেকে সুস্থ করতে আমার আব্বু আম্মুর এই যে চারটা বছর সময় লেগে গেলো।এখন আমি তাদের কাছে সম্পূর্ণ সুস্থ, তারা ভাবছে আমি তোমায় ভুলতে সক্ষম।কিন্তু সেটা কি আদেও হয়েছে?
তারা চিন্তা মুক্ত হয়ে আমায় নিয়ে এই চারটা বছর পর আবার নিজেদের নীড়ে ফিরেছে গতকালই।ভেবেছে,আমি আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবো তোমাকে ছাড়াই।কিন্তু সেটা যে কখনোই সম্ভব নয়।এই বাড়িটায়,বাড়ির সামনের রাস্তা,ভার্সিটির কামিনীতলা,কঙ্কাদোলক,বাড়ির বাগানের সেই জায়গাটায় আজও আমি তোমায় দেখতে পেলাম।তারপর?তোমার মাঝেই ডুবে গেলাম ভোরের সূর্য ওটার আগেই।হয়তো আম্মু আব্বু এখন খুব আপসোস করছে,কেন ফিরে আসলো এইখানে,এই চারটা বছরই তো ভালো ছিলো।কিন্তু আমি ভালো ছিলাম না,সেটা তারা বুঝলো না।তুমিও বুঝলে নাহ।
কেন আমার জীবনে অবেলার অতিথি হয়ে ধরা দিলে তুমি,কেন আমার নীড়ের, আমার মনের বাসিন্দা হলে না? কেন সেদিন আমার মনের অনুভুতি গুলো বুঝলে না তুমি? আমি তো মেনে নিতাম তোমায়।সেই নরপশু গুলোর অংশকেও মেনে নিতাম।কারন তার মা হতে তুমি,আমি নিজের অংশ না দিয়েই না হয় বাবা ডাক শুনতাম।ঐ সামান্য শরীরের বীর্য কি একটা সন্তানের চরিত্রটাই একই রকম করে দিতো? তার শরীরে পশুগুলোর রক্ত থাকলেও সে নিজে তো থাকতো আমাদেরই কাছে,আমরা না হয় তাকে সুন্দর জীবনের উদাহরণ গুলো দিয়েই বড় করে তুলতাম।মানুষ করে তুলতাম।কেন একটিবার আমায় সবটা বলার সুযোগ দিলে না কঙ্কাবতী?
পরীক্ষা নিচ্ছিলে আমার তাই না?এই দেখো এই বারে আমি শত নম্বর পেয়ে পাশ করেছি।তোমার ভালোবাসায় আমি খাটিয়ায় চড়ছি আজ।কি সুন্দর দৃশ্য, আমার অন্তরের তৃপ্তি আজ হলো।তোমায় না পেয়েও পেলাম,আমার একটা ভালোবাসা, আমার কঙ্কাবতী। তুমি না হয় পৃথিবীর সকল কঙ্কাবতীকে বলে দিয়ো,এই শহরদের যেন এতটা যন্ত্রণা না দেয়,এই শহররা তাদের কঙ্কাবতীকে নিয়ে পৃথিবীর সুখ দেখতে চায় আরো কটা বছর।হাতে হাত রেখে,,শহরের বুকে মাথা রেখে প্রতিটা কঙ্কাবতী যেন ক্ষনে ক্ষনে বলতে পারে ভালোবাসি।
আমি পারলাম না হাত হাত রাখতে,,তোমায় কখনো ভালোবাসি কথাটি বলা হয়নি।
আজ আমার নীরব আন্দোলনে বলছি তোমায়।
"আমার কঙ্কাবতী,তোমার এই শহর স্যার তোমায় ভীষণ ভালোবেসেছে,কখনো প্রকাশ্যে না এনেই ভালোবেসেছে.....।।"