অবেলার অতিথি

পর্ব - ৭

🟢

সাবিহাদের ছাড়া আজ প্রায় চার দিন পাড় হতে চললো কঙ্কার।বাড়িটা বেশ শান্ত লাগে।কথা বলার মানুষ নেই তার।শহর স্যারও বাড়িতে থাকে না তেমন।ক্লাস শেষ হলে কঙ্কাকে বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে চলে যায় আবার,ফেরে প্রায় রাত ১১ টার দিকে।

রান্না শেষ করে সন্ধ্যার দিকে একটু পড়তে বসেছিলো কঙ্কা।এখন রাত প্রায় সাড়ে আটটা কি নয়টা।থাই গ্লাস যুক্ত জানালা দিয়ে শো শো করে বাতাস বইছে।আকাশের অবস্থা ভিষণ খারাপ,ঝড় ছুটলো বলে।

কিছু একটা ভেবে কঙ্কা ফোন লাগালো শহরের নম্বরে।দুবার রিং হতেই শহর ফোন তুলে সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করলো...

"হুম,কে বলছেন?"

কঙ্কাবতীর ভীষন মন টানলো।ঠোঁট উলটে ফোনের অপর পাশে থাকা শহরের উদ্দেশ্যে বললো...

"আমার নম্বরটা আপনি সেভ করেন নি স্যার?"

একটুখানি নীরবতা,পরক্ষণেই শহর বললো...

"কেন ফোন দিয়েছো তুমি?"

"ওহ,,বলছিলাম যে আজ একটু তারাতারি ফিরবেন?বাইরে তো ভীষন ঝড় উঠেছে,আ্ আমার পুরো বাড়িতে একা,এ্ একটু ভয়ও করছে.."

শহর যেন তাচ্ছিল্য হাসলো...

"এখন কেন ভয় করছে একা?এতোই যখন একা থাকার ভয়,তাহলে আম্মুদের সাথে যাওনি কেন?"

"দেখুন স্যার,,আমি ভয় পাই না,, আজ নেহাত ঝড় উঠেছে,তাই বলছি আরকি,তারাতারি ফিরতে,আর কিছুই নাহ।"

শহর হাপ ছাড়লো।এই মেয়ের সাথে অযথা কথা বলে সময় নষ্ট করার ইচ্ছে নেই তার।বাবার বিজনেস ফাইলগুলো দ্রুত চেক করতে হবে তাকে।তাই আস্তে করে বললো...

"চেষ্টা করছি।"

------

চেষ্টা করছি বললেও তা রাখতে পারেনি শহর।অফিসের কাজ গুলো করতে করতে প্রায় সাড়ে দশটা বাজতে চললো।এখান থেকে গাড়িতে করে বাড়ি পৌঁছাতে আরো প্রায় চল্লিশ মিনিটের পথ।তবুও কঙ্কাবতীর কথা মাথায় রেখে বেড়িয়ে পড়লো সেই ঝড় তুফানের মধ্যেই।

প্রায় পাঁচ মিনিটের রাস্তা অতিক্রম করেছে কিনা সন্দেহ।ওমনি একের পর এক কল আসতে লাগলো শহরের ফোনে।অনেকক্ষণ পর যখন সে বিরক্ত হয়ে ফোন হাতে নিলো দেখলো স্ক্রীনে জ্বলজ্বল করছে 'চৈত্রীকা' নামটি।

ভ্রু জোরা কিঞ্চিৎ কুঁচকে নিলো শহর।এই সময় চৈত্রের তো কল দেওয়ার কথা নয়।তাহলে কেন ও এতোবার কল দিচ্ছে?

ভাবনার মাঝে আবারো যখন ফোনটি বেজে উঠলো,তখন শহর আর রিসিভ না করে থাকতে পারলো না।ফোনটা কানে ধরতেই ভেসে এলো চৈত্রের ক্লান্ত, কাতরানো কন্ঠের আওয়াজ....

"শহর?তুমি কোথায়?"

"হোয়াট হ্যাপেইন্ড চৈত্র? তোমার কন্ঠ এমন শোনাচ্ছে যে?"

"খুব শরীর খারাপ করছে আমার শহর।আমি একা আর পারছি না।তুমি প্লিজ আ্ আমাকে একটু হসপিটাল নিয়ে যাবে?আসবে একটু?"

চৈত্রের প্রতি টানটা আর তেমন আসে না শহরের।কিন্তু মেয়েটার কন্ঠে আসলেই কাতরতা ভরপুর এখন।চিন্তাদ্ভিত হয়ে শহর ঘড়ির দিকে চাইলো..

চৈত্রের বাবা মা নেই।এখানে মেসে থাকে একাই।হঠাৎ এতো রাতে অসুস্থথা শুনে আপত্তি থাকা স্বত্বেও শহর বাধ্য হলো চৈত্রের মেসের উদ্দেশ্যে গাড়ি ঘুড়াতে।

দ্রুততার সহিত গাড়ি চালিয়ে চৈত্রের মেসে পৌছাতেই চৈত্র দরজা খুলে দিলো।শহর দরজা থেকেই তাকালো চৈত্রের দিকে একবার।পড়নে তার একটি ফিনফিনে পাতলা শাড়ী,স্লিভলেস ব্লাউজ।এত্তো রূপচর্চা, শহরের যেন মনে হলো না চৈত্র ডাক্তারের কাছে যাবে।জিজ্ঞেস করলো....

"কি হয়েছে তোমার?হসপিটাল যাবে বললে?"

চৈত্র হালকা হেসে শহরের হাত টেনে ভেতরে আএনে দরজা বন্ধ করে বললো....

"হুম, যাবো তো।আগে তুমি ভেতরে এসে একটু জিরিয়ে নাও।"

শহরেরে একটুও ভালো লাগছিলো না বিষয়টা,তবুও চৈত্রের কথা ভেবে ড্রয়িংরুমের সোফায় এসে বসলো।একটুক্ষণ সময় যেতেই রিনঝিন চুরির আওয়াজ তুলে একটি হাত এগিয়ে এলো শহরের দিকে। একগ্লাস পানি এগিয়ে দিলো চৈত্র।শহর নাকোচ করে বললো...

"লাগবে না।তুমি রেডি?গেলে চলো?"

চৈত্র পানির গ্লাসটা টেবিলের উপর রেখে এক আবেদনময়ী হাসি দিয়ে এগিয়ে এলো শহরের কাছে।শহরের পাশে সোফায় বসেই মুখটা নিজের দিকে ঘোরালো।বিরক্ত হয়ে শহর জিজ্ঞেস করলো..

"হোয়াট আর ইউ ডুয়িং দিস?চৈত্র, তুমি কি আসলেই অসুস্থ? "

সাথে সাথেই চৈত্র ওয়াইনি ভয়েজে বলে উঠলো...

"আ'ম ফিস বেইবি।বাট,আ'ম সো থার্স্টি।আই হার্ডলি নিড ইউ রাইট নাও।"

শহর পিছিয়ে গেলো।শান্ত ভাষায় মাথ ঠান্ডা রেখে বলতে লাগলো....

"দেখো চৈত্র,আই নো তুমি কি চাইছো।বাট আমি তোমাকে এখন একটা সিঙ্গেল কিসও করতেও আমার বিবেকে বাধা দেয়।অন্তত যতদিন কঙ্কার সাথে আমার ডিভোর্স টা হচ্ছে ততদিন স্টে এওয়ে ফ্রম মি।প্লিজ তুমি আমাকে কোনো প্রকার বডি এটাচম্যন্ট দেখাবে না প্লিজ। তুমি.... "

নাহ,,শহর পারলো না সম্পূর্ণ কথা শেষ করতে,তার আগেই চৈত্র এক প্রকার ঝাপিয়ে পড়লো যেন তার উপর।উন্মাদের মতো নিজের বুকের উপর থেকে শাড়ির আচলটা ফেলে দিলো সে।জোর করে শহরের গলা জড়িয়ে ধরে বলতে লাগলো....

"আমি এসব কিচ্ছু শুনতে চাইনা।আই নিড ইউ,,প্লিজ বেইবি।পুরো ঘর খালি,,শুধু তুমি আর আমি।কেউ জানবে না।ঐ কঙ্কাও না।প্লিজ আজ রাতটায় আমাকে তোমার হতে দাও,,প্লিজ.. "

আর সহ্য হলো না শহরের। এক প্রকার ছুড়ে ফেললো চৈত্রকে নিজের থেকে।চোয়াল শক্ত করে উঠে দাঁড়ালো সোফা থেকে। চৈত্রের দিকে ঘৃণিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো....

"তোমাকে হার্ট করতে চাইছি না চৈত্র আমি। তোমার এই জঘন্য রুপটা মেনে নিতে পারছি না আমি অন্তত এই চৈত্রমাসকে আমি ভালোবাসিনি।আমাকে পেতে চাইলে,,নিজের এসব লালসাকে সংযত করো চৈত্র।নইলে আমার তুমি পাবে না কখনোই।,,গেলাম আমি..."

বলপই হনহনিয়ে বেরিয়ে এলো মেস থেকে।মাথাটা যেন দাওদাও করে জ্বলছে তার।চৈত্রকে আজকাল অসহ্য লাগে শহরের। তার কারনগুলোও যে স্পষ্ট। মেয়েটার মনে কিভাবে এতো কুটচাল এলো??কই এতোগুলো বছরে তো একটুও টের পায়নও শহর।এই শহর আর চৈত্রের নেই,এটা শহর বুঝে গেছে।কিন্তু চৈত্রকে কথাট কিভাবে বলবে?যে ভালোবাসার শহর চৈত্রকে ছাড়তে চাইছে??মেয়েটা যে খুব কষ্ট পাবে।

গাড়ির ড্রাইভিং সীটে বসে হেলান দিয়ে ঘনঘন নিঃশ্বাস নিলো য়হর,হয়তো নিজেকে শান্ত করার উদ্দেশ্যে।এই রাতে চৈত্রের থেকে এমনটা সে একদমই আশা করেনি।

ঘড়ির কাটা প্রায় একটা ছুইছুই। কঙ্কাবতী চেয়েছিলো আজ যেন একটু তারাতারিই বাড়ি ফিরে,অথচ শহর আজই এতোটা দেরি করে ফেললো। আকাশ এখন পরিষ্কার। এক দফা ঝড় হয়েই ক্ষান্ত হলো যেন সে।কঙ্কাবতী কি খুব ভয় পেয়েছিলো?

মাথায় কথাটা আসতেই দ্রুত গাড়ি স্টার্ট দিলো শহর।বাড়ি ফিরতে হবে খুব তারাতারি।অনেক রাত হওয়ায় হাইরোডে প্রচুর স্পিডে গাড়ি চালাতে পেরেছে শহর।তাইতো একঘন্টার পথ আদঘন্টাতেই পৌঁছাতে পেরেছে।নিজের কাছে থাকা চাবি দিয়ে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলো সে।অন্য দিন এগারোটার দিকে এলো হয় টিভিট আওয়াজ শোনা যেতো,নয়তো কঙ্কাবতীর পড়ার আওয়াজ।কিন্তু আজ নিস্তব্ধ পুরো বাড়ি।শহর দেরি করলো না,মেয়েটা কি করছে, কেমন আছে দেখতে ছুটে গেলো নিজের রুমের সামনে।

একি,দরজা ভেতর থেকে বন্ধ? কঙ্কাতো কখনো দরজা লক করে না।ঘুমাচ্ছে?তাও দরজা লক করার কি আছে?বেশি কিছু না ভেবে শহর নক করলো দরজায়।দুবার,তিনবার।সাথে জোর গলায় ডাকলোও...

"কঙ্কা??এই কঙ্কা??কি করছো তুমি??ঠিক আছো??"

একটু পরেই ভেতর থেকে কঙ্কার ঘুমুঘুমু কন্ঠের আওয়াজ ভেসে এলো...

"আমি ঘুমাচ্ছি.."

শহর নক করা বন্ধ করলো।আরেকটু চেচিয়ে বললো...

"তো দরজা কেন লক করেছো?দেখি খোলো দরজা?"

"নাহ,, আজ এই দরজা খুলবে না।আপনার আজ এই রুমে আসা বন্ধ।"

"মানেটা কি??আমি চেঞ্জ করবো তো,আমার ড্রেসতো নিতে দাও?"

"না মানে না।এতো রাতে এসেছেন কেন আপনি?ভালোবেসে যত্ন নেন না মেনে নিলাম।মানুষ হিসেবে একটু করুনা তো করতে পারতেন স্যার?জানেন কত্তটা ভয় পেয়েছিলাম আমি?এই ঝড় বৃষ্টির দিনে একটু তারাতারি আসলে কি খুব অসুবিধা হয়ে যেতো?"

খারাপ লাগছে শহরের।আসলেই এতটা দেরি করা উচিৎ হয়নি।উচিৎ হয়নি চৈত্রের কথায় মেসে যাওয়া।ভেবেই আর রাগ দেখালো না কঙ্কার উপর।বরং শান্ত কন্ঠে বোঝাতে লাগলো...

"আচ্ছা বাবা,,এখন তো এসেছি আমি।এবার দরজাটা খোলো.??"

"এখন এসে কি হবে?ঝড় বৃষ্টি সব থেমে গেছে,আমার ভয়ও চলে গেছে এখন।তাই এখন আর দরজা খুলবো না আমি।আপনি অন্যরুমে যান।এটা আপনার শাস্তি। "

শত কথা বলেও কঙ্কাকে দিয়ে দরজাটা খোলাতে পারলো না শহর।হাফ নিশ্বাস ফেলে অন্য রুমের দিকে যেতে নিয়ে বললো...

"তোমাকে মজা কাল দেখাবো।ওয়েট করো শুধু মেয়ে.."

সাথে সাথে কঙ্কাও আবার ডেকে বললো...

"শুনুন..টেবিলে খাবার ঢেকে রেখেছি।কষ্ট করে ঢাকনাটা সরিয়ে খেয়ে নেবেন।"

শহর আড়চোখে একবার দরজার দিকে তাকিয়ে চলে গেলো রুমের সামনে থেকে।

------

সকালে পাখিদের কিচিরমিচির আওয়াজে ঘুম হালকা হয়ে এলো শহরের।একটু এপাশ ওপাশ করে শুতে নিয়ে হুট করেই নিজের বা হাতটা কোথায় যেন রাখলো।অদ্ভুত এক অনুভূতি। কি এটা?কৌতুহল বসত হালকা ঘুমের মাঝেই নিজের হাতটা চেপে ধরলো সেই স্থানে।কি নরম..

শহর বুঝতে পারলো না বিছানায় এতো নরম কি আছে?চোখ জোড়া হালকা খুলেই দেখার চেষ্টা করলো সেই জিনিসটি। চোখ খুলতেই দেখলো কঙ্কাবতী তার পাশেই শুয়ে আছে।নিজের হাতখানার দিকে তাকাতেই দেখলো জামার উপর দিয়েই সে কঙ্কাবতীর কোমরখানা চেপে ধরে রেখেছে। মস্তিষ্ক হঠাৎ যেন বিকল হতে লাগলো শহরের।এতোক্ষণ ধরে কি নিয়ে খেলছিলো শহর?কঙ্কাবতীর নরম কোমড়খানা? ইশশ,ছিহ..

হুট করেই হাতখানা সরিয়ে নিলো সে।নিজেকে কেমন চোর চোর মনে হচ্ছে, চোরই তো।না বলে নারীর শরীর চুরি করছে সে।ছি ছিহ, একদম উচিত হয়নি কঙ্কাবতীর কোমড় ছোঁয়া। কিন্তু এই মেয়ে এই রুমে কেন?রাতেই তো শহরকে তার রুম থেকে তাড়িয়ে দিয়ে ঘুমাচ্ছিলো,এখানে আসলো কখন?

কোনো এক অজানা কারনেই ফিক করে হেঁসে উঠলো শহর।মেয়েটা তাকে ছুয়েও দেখেনা। নাহ,ঘুমের মাঝেও ছোঁয় না,ছুলে শহর ঠিক বুঝতে পারতো।তাও বিয়ের পর থেকে একটা দিনও শহরের পাশ ছাড়া ঘুমায়নি।

নিজের মুখটা একটু কঙ্কাবতীর মুখের দিকে এগিয়ে নিলো শহর।চোখ ছোট ছোট করে ঘুমন্ত কঙ্কাবতীকেই বলতে লাগলো...

"আমার পাশে ছাড়া ঘুমাতে পারো না যখন, রুমে ঢুকতে দাওনি কেন হুম??সেই ঠিকই তো পরে আমার পাশেই এসে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছো।দুষ্টু মেয়ে।এত্তো দুষ্টামি কি করে করতে পারো তুমি?"

নাহ,কঙ্কাবতী উত্তর দিলো না।শহর উত্তর আশাও করছে না।ঘুমন্ত পুতুল কি আর উত্তর দিতে পারবে নাকি? একটু পরে সরে এসে আবার নিজের জায়গায় শুয়ে প্রতিদিনের নিয়মের সকাল সাড়ে ছয়টার এলার্মটা বন্ধ করে দিলো সে।আজ শুক্রবার, ভার্সিটি অফ দুজনেরই।যদিও বাকি শুক্রবার গুলোতে শহর চৈত্রকে সময় দেয়,কিন্তু আজ কোথাও বের হবে না।কালকের ঘটনার জন্য চৈত্র নিজ থেকে সবটা না মিটিয়ে নেওয়া পর্যন্ত শহর নিজ থেকে ভুলেও যাবেনা চৈত্রের কাছে।তাই ভাবলো ঘুমাবে আরো কিছুক্ষণ। কঙ্কাই বা উঠে আর কি করবে,ঘুমিয়েই নিক।

সারাটা দিক কঙ্কা বেশ জ্বালিয়েছে শহরকে।তার তাড়নায় বিরকৃত হয়ে শহর বিকেলের দিকে বাড়ি থেকে বেরিয়ে বন্ধু মহলে যোগ দিলো।মনে মনে কঙ্কাকে শিক্ষা দেওয়ার এক ধুরন্ধর ফন্দি আটলো।মেয়েটাকে একটা উচিত শিক্ষা দিতেই হবে আজ।এতো দুষ্টামি আর নেওয়া যায় না।না ছুয়েও মেয়েটা জ্বালিয়ে মারতে ওস্তাদ।

রাতে ডিনার সেড়ে শহর আগেভাগেই রুমে চলে এলো কঙ্কা কিছু হাতের কাজ সেরে নিয়ে তারপর এলো রুমে।এমাহ,রুমটা এতো অন্ধকার কেন?

হাত বাড়িয়ে লাইটের সুইচ অন করতে গেলেই শহরের সাবধানী কন্ঠ শুনা গেলো....

"লাইট জ্বালাবে না।মাথা ব্যাথা করছে আমার।চুপচাপ ঘুমাও এসে."

কঙ্কা আর জ্বালালো না লাইট।এগিয়ে এলো বিছানার দিকে,উদ্বিগ্ন হয়ে বললো...

"হঠাৎ মাথা কেন ব্যাথা করছে? আমি চুল টেনে দিবো??"

"নাহ,,প্রয়োজন নেই।আমি ঔষধ খেয়েছি,ঠিক হয়ে যাবে।তুমি ঘুমাও,বিরক্ত করো না শুধু।"

কঙ্কা সত্যিই আজ আর বিরক্ত করলো না শহরকে।কথাও বললো না তেমন।হাতমুখ ধুয়ে এসে চুপচাপ নিজের জায়গায় শুয়ে পড়লো।

------

মধ্যরাতে নিজের কপালের উপর তরল কিছুর আভাস পেতেই ঘুম হালকা হয়ে এলো কঙ্কার।নড়েচড়ে ঘুমাতে গেলে আবারো সেই তরল টুপটাপ করে পড়তে লাগলো কঙ্কার কপাল জুড়ে।বিরক্তিতে নাক কুঁচকে এলো তার। বিরক্তিকর অবস্থার কারনে ঘুমও যেন ভেঙে যাচ্ছে বারবার।

ধীরে ধীরে চোখ খুলে বোঝার চেষ্টা করলো কি হচ্ছে?

চোখ খুলতেই বুঝতে পারলো পুরো রুমটা কেমন যেন লালছে কমলা আলোয় ভরতি।আশপাশে তাকাবে,তার আর প্রয়োজন হয়নি সিলিংয়ের দিকে চোক যেতেই আত্মা কেঁপে উঠলো কঙ্কার।

ভয়ঙ্কর এক দানব আকারের একটা বস্তু ঝুলছে কঙ্কার উপর।সম্পূর্ণ কালো আলখাল্লায় আবৃত বস্তুটি।সিংহের মতো কেশর ভর্তি একটি নিকৃষ্ট ভয়ঙ্কর মুখ।বড় বড় দুটো লাল দাত বেরিয়ে আছে সেই কেশর ভেদ করে,,মুখের ভেতর থেকে গড়িয়ে পড়ছে টকটকে লাল র'ক্তের ন্যয় তরল।

ভয়ঙ্কর বস্তুটি যেন ধীরে ধীরে নিচের দিকে নামছে।সাথে সাথে বুকের ভেতরটা যেন ফাঁকা হতে লাগলো কঙ্কার।সমস্ত শরীরে অরোধীত কম্পন বাড়ছে।কি করবে সে? কি করবে??

শহর স্যার,,,শেষ ভরসা।চোখ জোড়া সেই যে বড় বড় হয়ে নিবন্ধ হয়েছে সেই ভয়ঙ্কর বস্তুটিতে।সরতে চাইছে না যেন,মনে হচ্ছে দৃষ্টি নড়লেই বস্তুটি কঙ্কার উপর এসে হামলে পড়বে।

হাত বাড়িয়ে পাশে খোঁজার চেষ্টা করলো শহর স্যারকে।কিন্তু একি?শহর স্যারতো নেই।ক্ কোথায় শহর স্যার?নেই কেন??

অনাকাঙ্ক্ষিত মুহূর্তে অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে বাচ্চাদের মতোই এক ভাবনা ভর করলো কঙ্কার মাথায়।ভীতু কঙ্কা ভুলে গেলো নিজের কথা,চিন্তা করলো...দানবটির মুখে র*ক্ত কেন??কার র*ক্ত??

শহর স্যারও নেই।তার মানে কি দানবটি তার শহর স্যারকে......

ভাবনার সাথেই যেন বস্তুটি হঠাৎ দ্রুত ঝাপিয়ে পড়লো কঙ্কার উপর।ভয়ে দিক বিদিক ভুলে প্রানের দায়ে পাশ ফিরতেই গড়িয়ে পড়লো খাট থেকে কঙ্কা।

একসাথে দুটো আওয়াজ।খাট থেকে কঙ্কার পরে যাওয়ার সময় অদ্ভুত এক আতঙ্কিত চিৎকার আর উপর থেকে বস্তুটি বিছানায় পড়ে যাওয়ার ঝনঝন আওয়াজ। তারপরই হু হা কটে ভেসে এলো দরজার পাশ থেকে শহরের অট্টহাসির আওয়াজ।

আহ,,পরিকল্পনা সফল তার।ঠিক যেমনটা ভেবেছিলো,তাই-ই হলো।ভীষণ ভয় পেয়েছে কঙ্কাবতী।এবার বুঝুক মজা,আর জীবনেও দুষ্টামি করার নাম মাথায় আনবে না শিউর।

বেশ অনেকদিন পর শহর চিন্তামুক্ত প্রাণ খোলা হাসি দিচ্ছে।ছোট বেলার করা মজা গুলো আবারও যে এভাবে প্রয়োগ করতে তা এতদিন মাথায়ও আসেনি।বিছানায় পড়ে থাকা নিজের তৈরি কৃত্রিম খরের দানবটির দিকে তাকিয়ে হাফ ছাড়লো শহর।মনে মনে বললো...

"সামান্য খেলনা হয়েই তুই বাজিমাত করে দিয়েছিস, হাহ।"

বিছানার ওপাশে পড়ে থাকা কঙ্কাকে না দেখেই শহর ডাকলো....

"কঙ্কাবতী,কোমর ঠিক আছে তো??ঘোর কাটিয়ে এবার উঠো।সিনেমা শেষ।"

বলতে বলতেও হাসির ফোয়ারা যেন কাটাতেই পারছে না শহর আজ।সত্যিই মেয়েটা বেশ কুপোকাত হয়েছে আজ।এতদিনে শহর একটা কাজের কাজ করেছে।এবার দুষ্টামির সাথে সাথে শহর স্যারের ভুতটাও মাথা থেকে নামবে মনে হয় কঙ্কাবতীর।

অতি উচ্ছ্বসিত হাসি,আর মজার ছলে করা কাজের মাঝে শহর বুঝলো কঙ্কাবতীর শিক্ষা হয়েছে।অথচ সে বুঝতে পারলো না একটু আড়ালে থাকা কঙ্কাবতীর প্রানখানা তখন জম দুয়ারের মুখে মৃত্যু -মুক্তির অবিরাম খেলায় জিতার প্রয়াশ চালাচ্ছে যে।

অবেলার অতিথি গল্পটি অভ্রায়ীনি ঐশি-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক থ্রিলার ভিত্তিক গল্প