মানুষ ভালোবাসে ভালো থাকার জন্য। বলতে গেলে এই ক্ষেত্রে কঙ্কা আর শহরের ভালোবাসা একই দিকে চলছে।কঙ্কা জোর করে বিয়ে করেছে শহরকে।বলতে গেলে বাধ্য করেই।কারন সে শহরকে নিজের কাছে আটকে রাখতে চায়।তেমনি করে নিজের মন না টানলেও শহর বার বার সায় দিচ্ছে চৈত্রের বেসামাল অবৈধ ছোয়াগুলো কে।কারণ শহরও চায় চৈত্রকে।সে চায় চৈত্র নারীটি তার হয়েই থাকুক।ভালোবাসে সে চৈত্রকে,তাইতো চৈত্রের অবাধ্য ডাকে বারবার নিজেকে সায় জানিয়েছে।খারাপ করেছে নিজের কাছে নিজেকে।
বুদ্ধিদিপ্ত শহর বারবার ভেবেছে রুমে হিডেন ক্যামেরার বিষয়টি নিয়ে।কঙ্কা রুমটিকে নিজের মতো করে ব্যবহার করছে।শহর না থাকলে নিজের ব্যক্তিগত অনেক কিছুই করে হয়তো।এভাবে কি করে শহর একটি মেয়ের পার্সোনাল মোমেন্ট নিজ চোখে দেখবে?
চিন্তা করেও টিকতে পারলো না চৈত্রের কথা ভেবে।নাহ,প্রয়োজনে নিজে কিছুই দেখবে না,চৈত্রকে দেখাবে।তবুও ক্যামেরা লাগবে।এছাড়াও কঙ্কা মেয়েটির প্রতিও বেশ সন্দেহ শহরের।কোনো প্রকার উদ্দেশ্য ছাড়া কি করে একটি মেয়ে এতটা বেহায়য়াপনা করে।এতোবার ফিরিয়ে দেওয়ার পরও কায়দা করে বিয়েটা করে নেয়। নাহ,মেয়েরা সহজে নিজের আত্মসম্মানের দিকে প্রখর।উদ্দেশ্য ছাড়া তা বিসর্জন কখনোই দেবে না।তেমনি কঙ্কাও হয়তো তেমনই এক উদ্দেশ্য নিয়ে হাজির হয়েছে তাদের বাড়িতে সেটি জানতে হবে শহরকে।
দিনের বেশিরভাগ সময়ই বাড়িতে থাকলে কঙ্কা শর্মির সাথে থাকে। এই যে এখনও রুমে নেই।সেই সুযোগেই শহর ছোট মাইক্রো ক্যামেরাটি লুকিয়েছে রুমের কোনের একটি সোপিজের আড়ালে,সাথে দিয়েছে একটি মিনি মাইক্রোফোনও।যাতে ফোনে কারোর সাথে কথা বলতে গেলেও শহররা খুব সহজেই জানতে পারে তা।
-----
দিন চলছে বেশ দারুন ভাবেই কঙ্কার।সংসারটা সে বেশ দারুন ভাবেই সামলে নিচ্ছে।নিবে নাই বা কেন? এতো ভালো শশুর-শাশুড়ী,ননদ ক'জন পায়। কঙ্কার এখন প্রায় মনে হয় উপরওয়ালা তাকে এতদিনে একটি পরিবার সুখ দিয়েছে।ইশ,চেয়েছিলো শুধু তার ভালোবাসার মানুষটিকে।কিন্তু ভাগ্য তাকে তার শহর স্যারের সাথে সাথে আরো কত গুলো মানুষ যে দিলো আপন করে।এদের এই ক'দিনের ঋণই তো কঙ্কা মিটাতে পারবে না,বাকি জীবন তো রয়েই গেলো।
ছুটির দিনে বিকাল সময়টা বেশ আরামেই কাটছিলো শহরের।রুমে শুয়ে শুয়ে অডিও বুক শুনা,তার সব থেকে প্রিয় অবসর।কিন্তু তার এই সুন্দর মুহুর্ত গুলো যেন ব্যাগড়া দেওয়ার জন্য যে কঙ্কাবতী হাজির হয়েছে।হুট করেই কোথা থেকে এসে যেন কঙ্কা এক বড়সড় সাহস দেখিয়ে ফেললো।বিছানায় আরাম করে চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকা শহরের নাকটা চেপে ধরলো।
বিষয়টা অনুভব হতেই দ্রুত চোখ খুলে তাকালো শহর।নিজের মুখের উপর কঙ্কাকে হাসি হাসি মুখ করে ঝুঁকে থাকতে দেখে মাথা গরম হয়ে গেলো তার।চট করেই নিজের নাক থেকে কঙ্কার হাতটা চেপে ধরলো সে।বিরক্তিতে উচ্চারন করতে নিলো...
"ওয়াট দা..."
শহররের মুখের কথাটা কেঁড়ে নিয়ে কঙ্কা বলে উঠলো....
"ওয়াট দা বিউটিফুল সিন।হাউ রোমান্টিক। "
বলেই কিটকিটিয়ে হেঁসে উঠলো কঙ্কা।শহর তারাহুরো করে শোয়া থেকে উঠে বসে বললো...
"এই মেয়ে,,সমস্যা টা কি তোমার?"
কঙ্কা কি ভয় পেলো??নাহ তো।এই যে একবার ও শহরের থেকে নিজের হাতটা ছাড়ানোর চেষ্টাও করলো না।উল্টো ওমনি করেই বিছানার উপর উঠে শহরের বরাবর বাবু হয়ে বসলো।হাতের দিকে ইশারা করে মুচকি হেঁসে বললো...
"ভালো লাগছে কিন্তু।"
শহর তাকালো হাতের দিকে।বুঝলো কঙ্কাবতীর কথার মানেটাও। চোখ ছোট ছোট করে কঙ্কার দিকে তাকিয়ে বললো...
"আমাকে টাচ করার সাহস কে দিয়েছে তোমায়?"
"ওমাহ!আপনি আমার একটা মাত্র বর,আপনাকে টাচ করবো না তো কি অন্য বেটাকে টাচ করবো?"
"তুমি যাকে ইচ্ছে টাচ করো,যা ইচ্ছে করো,তবে আমায় তুমি ছুবে না।"
শহরের কর্কশ কন্ঠও যেন হার মানায় না কঙ্কার ছেলেমানুষীকে।সে তো তার মতোই দুষ্টুমিতে ব্যস্ত।
শহর যতই কঙ্কাকে ধমকাচ্ছে।কঙ্কা ততই নিজের দুষ্টুমির সীমা বাড়িয়ে দিচ্ছে।বুঝলো শহর,যে এই মেয়েকে ধমক দিয়ে কোনো লাভ নেই।
হুট করে মাথায় এক নতুন ফন্দি আটলো সে।নিজের হাতটা এগিয়ে নিয়ে কঙ্কার গালে রাখলো আলতো করে।কন্ঠে আনলো কোমলতা।কোনো রাগ নেই যে।কোথায় গেলো তা?ডাকলো সে কঙ্কাকে...
"কঙ্কাবতী?শোনো আমার কথা?"
হুট করেই কঙ্কা শান্ত হয়ে গেলো।শহরের এই সামান্য স্পর্শেই যেন কেঁপে উঠলো সে।ঢোক গিললো বার কয়েক।শহর বুঝলো,তার কাজটা হচ্ছে ভালো মতোই।তাইতো ঠোঁটের কোনে মিথ্যে মুচকি হাসি এনে বললো...
"তুমি আমায় ভালোবাসো তাই না?"
কঙ্কার কি একটু খানি সম্মোহনী রোগের দেখা মিলছে?হয়তো মিলছে।নইলে নি এই চতুর মেয়েটি চুপটি করে তাকিয়ে থাকতো শহরের দিকে?এই যে এখনো কেমন শহরের প্রশ্নে ভদ্র মেয়ের মতো উপর নিচ মাথা ঝাকালো।তা দেখে শহর বললো...
"তাহলে তোমার ভালোবাসার দোহাই,তুমি আমাকে,আমার অনুমতি ছাড়া টাচ করবে না কখনো।"
বুকের ভেতর ধুম করে একটা পাথর পড়লো যেন কঙ্কার,কিন্তু গোপনীয়তা যে কঙ্কার সর্বকালের সঙ্গী।তেমনি করে এক নাম মাত্র পুরুষ, কঙ্কাবতীর মুখখানা দেখে বুঝতেই পারলো না মেয়েটার অন্তরে সে নীরবে এক অদৃশ্য গু*লি ছুড়েছে।
কঙ্কাবতী এবার আর আগের মতো কিটকিটিয়ে বাচ্চা হাসি দিলো না,মুচকি হাসলো শুধু।এই হাসিটাও যে নকল তাও বুঝতে পারলো না নির্দয় পুরুষটি।কিন্তু কঙ্কাবতীর বুদ্ধিখানা হাটুর নিচে হলেও মেয়েটি সাক্ষাৎ বুঝে ফেললো তার ভালোবাসার মানুষটির মনের খবর।নাহ,এই কথাটি আর মনের অন্তরালে রাখলো না।হালকা হেঁসে শহরকে বললো...
"আমি জানি, আপনার এই যত্ন করে গালে হাত রাখা,আদুরে সুরে কথা বলা সবটাই আমার জন্য মিথ্যা। তবুও,আমার ভালোবাসার দোহাই দিয়ে বলেছেন তো কথা খানা,কঙ্কাবতী রাখবে তা।কঙ্কাবতী তার শহর স্যারকে অন্তর থেকে ভালোবেসেছে,তাই শহর স্যারের পেশিবহুল শরীরের প্রতি কঙ্কাবতীর আকর্ষণ নেই।যা করতো,শুধুই মজা করে।তবে এবার থেকে কঙ্কাবতী মজা করেও আর শহর স্যারের শরীর ছুবে না।কিন্তু হৃদয় ছোঁয়ার চেষ্টা কঙ্কাবতী ঠিক চালিয়ে যাবে।"
বলেই মুখের হাসিখানা আরেকটু প্রসারিত করলো কঙ্কা। হাতের ভাজে কঙ্কার গাল খানার বিকৃতি বেশ লাগলো শহরের।ধীরে ধীরে কঙ্কাবতী নিজের মাথাটা ডান পাশে সরিয়ে নিলো,যাতে করে শহরের হাতের আদল থেকেও আলাদা হয়ে গেলো কঙ্কাবতীর মুখখানা।শহর তাকিয়ে দেখলো,কেমন মেয়েটা নিজ থেকেই তার দেওয়া কথা রাখছে।
কঙ্কা উঠে গেলো মুখে সেই বিস্তৃত হাসিখানা রেখেই।কিন্তু তার শহর স্যার কি কখনো জানতে পারবে?কঙ্কাবতী এখন আড়ালে গিয়ে দু ফোঁটা অশ্রু ফেলবে, ভালোবাসাকে ছুঁয়ে দেখার ক্ষমতা হারানোর কষ্টে।
------
নির্জন প্রহরীতে মানুষ একটু দেহের শ্রান্তি চায়।মস্তিষ্ককে প্রখর করতে সারাদিনের ক্লান্ততার অবসান দিয়ে একটু আগেই ডিনার সেরে এসে বিছানায় গা এলিয়ে দিয়েছে শহর।ঘুম আসেনি এখনো।তাই তো কঙ্কাবতীর রুমে আসা থেকে বিছানায় তার পাশে শোয়া,সবটাই খেয়ালে আছে শহরের।
সেদিন ভালোবাসার দোহাই দিয়ে বলার পর থেকে আজ প্রায় ৫-৬ দিন মেয়েটা শহরকে ছোঁয় না।তবে দুষ্টুমি কমায় নি একদমই।ছুয়ে দেওয়া ছাড়াও যে কত ধরনের দুষ্টুমি আছে,তা এই কঙ্কাবতীর থেকেই শিখা যায়। এই যেমন শহর শাওয়ারে ঢুকলে মাঝ পথে কঙ্কা বাইরে থেকে পানির লাইনটা বন্ধ করে দেবে।হুটহাট শহরের স্টাডি টেবিল জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখবে "ভালোবাসি স্যার" লিখা কতগুলো রঙিন চিরকুট।সিরিয়াস টাইমে শহরের পেছন থেকে এসে ভাউ দেবে,আবার নিজেই হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাবে।।
আজকাল এসবে অভস্ত্য হয়ে গেছে শহর।তাদের শান্ত নিরিবিলি বাড়িটায় এখন রোজই উচ্চহাসির ফোয়ারা বয়,এই কিছু একটা পড়ে ঝনঝন করে আওয়াজ তুলে বসে,আবার হুট করেই বক্সে উচ্চ শব্দে গান বেজে উঠে।এই সবই কঙ্কাবতীর আগমনের ফল। বাড়ির বাকি তিনজন সদস্য এই সব বেশ ভালো ভাবে উপভোগ করলেও, করতে পারে না শহর।ঐ যে, বলে না? যাকে পছন্দ নয়,তার করা ভালো কাজ গুলোও পছন্দ হতে চায় না। কঙ্কাবতীর প্রতি শহরের ঠিক এমনই একটা সম্পর্ক।তবুও শহর সহ্য করে নেয় সবটাই।গোপরে তৈরি করছে এক বিচ্ছেদের দলিলও।আবার এক হাতে সামলে উঠছে তার প্রিয় চৈত্রকেও।
এই সবকিছু সামলে এসে যখন একটু শান্তিতে ঘুমাতে এলো,তখন পাশের কঙ্কাবতী শুরু করলো আরো একটি বিরক্তিকর কাজ।
মেয়েটা আজ একটু পরপরই এপাশ ওপাশ করছে।যার দরুন বিছানাটা নড়ার কারনে বারবার শহরের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটছে।শহর বেশ বিরক্ত মেয়েটার এই সকল কাজে।চোখ বন্ধ রেখেই কঠিন কন্ঠে বললো...
"আজ আবার এই নতুন বেয়া" দবি শুরু করেছো।সারাটা দিন তো জ্বালিয়ে মারো আমায়,এখন কি রাতেও একটু শান্তিতে ঘুমাতে দিবে না?"
কঙ্কা শুনলো।কিন্তু তার দিক থেকে কোনো উত্তর এলো না।নড়াচড়াও কমলো না।শহর আবার একটু জোরে চেচিয়ে বললো....
"এই মেয়ে,,তুমি কি চাও একটু ক্লিয়ারলি বলবে আমাকে,আমায় মেরে ফেলতে এসেছো এই বাড়িতে?শান্তিকে কি থাকতে দেবে না তুমি আমায়?"
কঙ্কা কিচ্ছু বললো না,শুধু তাকিয়ে রইলো শহরের রাগান্বিত মুখশ্রীর দিকে।একটু পরেই উঠে ওয়ারড্রব থেকে একটা শাড়ি নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে গেলো।
শাওয়ার নিলো প্রায় পনেরো মিনিটের মতো।বেরিয়ে এসে হাতের ভেজা টাওয়ালটা বারান্দায় গিয়ে মেলে দিয়ে এলো সে।শহরের দিকে তাকিয়ে দেখলো একবার।চোখ বন্ধ তার,নিশ্চয়ই ঘুমিয়েছে।তাইতো আর রুমের লাইটটা না জ্বালিয়ে নিজের ফোনের ফ্ল্যাস দিয়েই কিছু একটা খুজতে লাগলো রুমের ভেতর।তখনই শহরের শান্ত কন্ঠের আওয়াজ ভেসে এলো কানে...
"তুমি যদি ভেবে থাকো,এতো রাতে শাড়ি পড়ে এসে,আমায় নিজের প্রতি আকৃষ্ট করবে,,তাহলে তুমি ভুল ভাবছো মেয়ে।"
কঙ্কা তাকালো পেছনে।লোকটা এমন কেন,সবসময় দু লাইন বেশি বুঝে।ইচ্ছে করছে গালপ আস্ত একটা মুরগি ভরে দিই।কিন্তু এসব কিছুই করলো না কঙ্কা।নিজের কন্ঠে নিস্তেজতার ছাপ পড়ছে আজ।বললো...
"নিত্য ব্যবহার করা জামা আরেকটা ভেজা,আর যেগুলো আছে,ঐ গুলো বেশ কজ করা। পড়ে ঘুমানো যাবে না,তাই এই নর্মাল সুতির শাড়িটা পড়েছি।আপনাকে শরীর দেখিয়ে নিজের কাছে টানার প্রয়োজন আমার নেই স্যার।ভালোবাসি মন থেকে,তাই আপনার মনটাই চাইবো আমি।"
শহর একই ভাবে থেকেই শুনে গেলো কথা গুলো।উত্তর দিলো না আর।কঙ্কা আবার বলে উঠলো...
"যাই হোক,জেগেই যেহেতু আছেন।আমায় একটু বলবেন আপনার হটব্যাগটা কোথায়?আমার একটু লাগবে।"
শহর নড়েচড়ে শুয়ে বললো...
"জানি না আমি।"
কঙ্কার কন্ঠে আজ একটু নমনীয়তাই প্রকাশ পাচ্ছে যেন।বললো...
"একটু দিন না প্লিজ।রাত দুটো বাজে,এই সময় আম্মু বা আপুকে বিরক্ত করতে চাইছি না,নাহলে তাদের থেকেই নিতাম।"
"একবার যখন বলেছি দিবো না তো দিবোই না।ংখুজে পেলেও আমার জিনিসে তুমি হাত দেবে না একদম।"
কঙ্কা আজ হার মানলো।আর খুজার চেষ্টা চালালো না হটব্যাগটা।বিছানার পাশে এসে নিজের বালিশ আর ব্ল্যাঙ্কেটটা নিয়ে সোফার কাছে এগোতে নিলেই শহর তাচ্ছিল্য হেসে বললো...
"আমার সাথে একই বিছানায় ঘুমানোর শখ বুঝি মিটে গেছে?"
কঙ্কা হেসে বললো...
"শুধু আজকের জন্য ছাড় দিচ্ছি স্যার।নেহাতই কাল আপনার সকাল সকাল ক্লাস আছে তাই।নইলে আমি বিছানা ছেড়ে ঐ ছোট্ট সোফায় ঘুমানোর মেয়ে না।"
------
এই কটা দিন সকালে উঠে রুমের মাঝে কঙ্কাকে পায়নি শহর।পেয়েছিলো কঙ্কার হাসির শব্দ বাইরে থেকে।প্রতিদিন কঙ্কা শহরের আগে উঠেই রান্নাঘরে গিয়ে সাবিহা আর শর্মিকে কাজে সাহায্য করতো। কিন্তু আজ আর বাইরে থেকে কোনো হাসির শব্দ এলো না শহরের কানে।এলার্মের আওয়াজে রোজকারের মতো ঘুম থেকে উঠতেই দেখলো কঙ্কাবতী এখনো সোফায় ঘুমিয়ে আছে।
শহর ডাকলো না তাকে।তবে উঠে গিয়ে রুমের জানালার পর্দাগুলো টেনে দিলো,যার দরুন জানালা দিয়ে মিষ্টি রোদের ঝিলিক এসে হাতছানি দিলো যেন কঙ্কাবতীর চোখে মুখে।শহর ভাবলো,এবার এমনিই উঠে যাবে হয়তো।এই ভেবেই শহর নিজের মতো শাওয়ার নিয়ে এলো,আয়নার সামনে দাড়িয়ে ভার্সিটির জন্য তৈরিও হতে লাগলো।কিন্তু কঙ্কা তো উঠছে না।ভাবলো একবার ডাক দিয়েই দেখুক।যেই ভাবা, সেই কাজ।শহর হাতে ঘড়িটা পড়তে পড়তেই গলাটা একটু উঁচিয়ে ডাকলো কঙ্কাকে...
"কঙ্কাবতী,উঠে পরো।আজ কি ক্লাস নেই তোমার?"
উত্তর এলো না কঙ্কার দিক থেকে।শহর তাকিয়ে দেখলো একবার।রেডি হয়ে তারপর এলো কঙ্কার কাছে।সোফার নিচে পড়ে আছে কঙ্কার বালিশটা।নিজেকে পুরোটা ব্ল্যাঙ্কেটে জড়িয়ে ঘুমাচ্ছে মেয়েটা।শহর আস্তে করে হাটু ভাজ করে বসলো সোফার সামনে। সাদা রঙের ব্ল্যাঙ্কেটে মোড়ানো কঙ্কার চেহারাটায় যেন হুট করেই কিছু একটা খুঁজতে লাগলো শহর।কিন্তু কি তা??জানা নেই শহরের।কঙ্কার মাথাটা নিজের হাতে একটু তুলে ধরে বালিশটা মাথার নিচে দিলো সে।একটু খানি মন চাইলো আজ, কঙ্কাবতী তো তারই স্ত্রী, একটু না হয় গভীর ভাবে পর্যবেক্ষণ করুক তাকে।
অধিকার বোধটা আজ কেন যেন গ্রহন করতে মন চাইলো শহরের।এই কটা দিন যতবার চৈত্র তার কাছাকাছি এসেছে,ততবার শহরের চোখের পাতায় অদৃশ্য ভাবে কঙ্কাবতীর চেহারা ভেসে উঠেছে বারংবার। মেয়েটির অদৃশ্য চেহারাটা মনে পড়তেই বারবার চৈত্রকে নিজের থেকে দুরে করেছে শহর।
কিন্তু এখন যে চৈত্রের কথা মনে আসছে না শহরের।মনের কোথাও যে চৈত্র নামের কেউ একজনকে আজ প্রায় চারটা বছর ধরে শহর পুসে রেখেছে,তা যেন নিমেষেই ভুলে বসলো সে।অবাধ্য দৃষ্টি জোড়া দিয়ে কঙ্কাবতীর মুখ খানা বেশ ভালো ভাবেই পর্যবেক্ষণ করলো সে।ফ্যাকাসে লাগছে আজ অন্য দিনের তুলনায়।টসটসে লালছে ঠোঁটগুলোতেও যেন আজ রক্তশূণ্যতা দেখা দিয়েছে।নীলছে ঠোঁট জোড়া মৃদু কাঁপছে কঙ্কার।আর অদ্ভুত ভাবে সেই নীলছে বর্নের ঠোঁট জোড়াই আজ বেশ টানছে শহরকে।
এ আজ কেমন অনুভব করছে শহর?বুঝতে পারছে না নিজেও।গলা শুকিয়ে কাঠ।শুকনো ঢোক গিললো সে,তবুও যেন অনাকাঙ্ক্ষিত তৃষ্ণাটা মিটছে না তার।এই অষ্টাদশী মেয়েটাকে তো শহর এমন কামনাময়ী রূপে চায়না কখনোই।তবুও কেন মেয়েটা কিছু না করেই অনেক কিছু করে দিচ্ছে শহরের।কি অদ্ভুত, কি অদ্ভুত।
শহর নিজেকে সামলাতে পারছে না। বেসামাল ভাবে চাইছে নিজের তৃষ্ণা মিটাতে,ঐ ফ্যাকাসে গোলগোল ঠোঁট দুটিতে নিজের ঠোঁট ডুবিয়ে।কিন্তু শহরের মস্তিষ্ক যে বাধা দিচ্ছে তাকে।কি করবে,কি করবে করে করে,শহর আর পারলো না নিজের মনের তৃষ্ণা মেটাতে।তবে নিজের ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি দ্বারা সেই লোভাতুর ফ্যাকাসে ঠোঁট দুটি একটু ছুঁয়ে দিলো সে।
আর পারলো শহর।দ্রুত উঠে বেরিয়ে এলো রুম থেকে।বাইরে এসে দাঁড়াতেই অনুভব হলো,তার হৃদপিণ্ডটা যেন অনেকক্ষণ পর লাফাতে শুরু করেছে।তাও বেশ দ্রুত গতিতে।বুকে হাত দিয়ে ঘন ঘন নিশ্বাস নিলো শহর।মনে মনে কঙ্কাবতীকে হাজার খানেক গালিও দিলো।উফহ,মেয়েটা বেশ ধুরন্ধর, কেমন যেন অদ্ভুত এক আকর্ষণ করার শক্তি পুসে রাখে নিজের মধ্যে। নাহলে কি শহরের মতো এক নারীতে আসক্ত পুরুষকেও নিজের ঐ শুষ্ক, ফ্যাকাসে ঠোঁটের কাছে এতো বাজে ভাবে ঘায়েল করতে পারলো মেয়েটা?ইশশ,কিছুই করলো না কঙ্কা,জানতেও তো পারলো না তার নিদ্রার মাঝে কি বিভৎস এক কান্ড হয়ে গেলো নিরলায়।অথচ শহর বুঝতে পারলো তার মধ্যে দিয়ে অদ্ভুত এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঝড় বয়ে গেছে মাত্র কিছুক্ষণ আগেই।বুঝে নিলো, বউ তার এতো ছোটও নয়।পুরুষ মানুষ নীরবেই আকর্ষিত হবে তার ঐ ছোট্ট ননির পুতুলের মতো দেহখানির দিকে।
পরক্ষণেই শহর নিজের মনের ভাবখানা পরিবর্তন করলো।আপনা কে আপনই বললো,এই মেয়ে রাস্তাঘাটে পুরুষের দৈহিক চাহিদা মেটানোর জন্যই তৈরি।শহরের মতো শান্ত পুরুষের সাথে সংসার করা এই গোভাতির কর্মে নেই।শহরের সাথে এই মেয়ে কোনো দিকেই মানান সই নয়। কখনো হবেও না।
ভেবেই লম্বা একটা নিশ্বাস ফেলে চোখ বুঝলো শহর।আবার চোখের পাতায় সেই ভেসে উঠলো কঙ্কার সেই ফ্যাকাসে ঠোঁটখানি।দৃরুততার সহীত চোখ খুলে ফেললো শহর,মাথাটা দু পাশে কয়েকবার নাড়া চাড়া করে নিজে নিজেই বির বির করে বললো....
"কঙ্কাবতী,তুমি আমার জন্য একখন্ড উত্তপ্ত বি*ষ ছাড়া আর কিছুই নও।"
নিচে নেমেই দ্রুততার সহীত নাস্তা সেরে নিলো শহর।সাবিহা জিজ্ঞেস করলো কঙ্কা কোথায়।শহর স্বাভাবিক ভাবেই একটু বিকৃত স্বরে বললো...
"ভান করে এখনো ঘুমিয়ে আছে আরকি।রাতে পিরিয়ড হয়েছে মনে হয়। "
লাবিব ছিলো না বলেই শহর সহজ ভাবে কঙ্কার কথাটা মা'কে বলেছে।এর আরো একটি কারনও আছে।শহর তো আর সারাদিন পড়ে থাকবে না ঐ মেয়ের নাটক দেখার জন্য। সেই ভার টা না হয় মা আর বোনকেই দিয়ে গেলো।জেনে রাখলে তো ভালোই।"
শর্মি ভ্রু কুঁচকালো। বললো..
"ওমাহ,,পিরিয়ড হয়েচে বলে না হয় একটু ঘুমাচ্ছে। তাই বলে তুই ভান বলবি এটাকে।এসব কি ভাই?"
শহর স্পষ্ট ভাষায় বললো...
"দেখ আপু।আমার মনে হলো তাই তোদের জানিয়ে রাখলাম।বাকিটা তোরা বাড়িতে থাকবি,তোরাই দেখে নে।ঐ মেয়ের কোনো কিছু নিয়েই আমার বিন্দু পরিমান আগ্রহ নেই।আমি আমার মতোই থাকবো।"
বলেই নাস্তা শেষ করে উঠে যেতে নিলে সাবিহা শান্ত স্বরে বললো...
"ঐ চৈত্রীকা কে ভুলে যা।দেখবি ঠিক কঙ্কার সব কিছুর প্রতিই তোর আগ্রহ বাড়বে।"
পায়ের গতি কমে গেলো শহরের।তার পরিবার জানে চৈত্রের কথা।সে নিজেই আরো আগে বলে রেখেছে। চৈত্রকে দেখেও বার কয়েক তারা।কিন্তু তবুও তারা চৈত্রকে একটি বারের জন্যও শহরের বউ হিসেবে মেনে নিতে রাজি হয়নি।উল্টো এই কঙ্কাকে এনেছে,যেন শহরের মন থেকে চৈত্র মুছে যায়।কিন্তু শহর নিজের ভালোবাসার প্রতি বেশ বিশ্বাসী। সেই বিশ্বাস থেকে প্রতি সময়ের মতো এখনো কন্ঠে জোর দিয়ে বললো.....
"চৈত্রকে ভুলা আমার জন্য সম্ভব নয় আম্মু।বাকি যা বলবে সব পারবো আমি।কিন্তু প্রিয় চৈত্রমাস, আমার বাকি বারো মাসেও সঙ্গিনী।চৈত্রের সাথে আমি বেইমানি করতে পারবো না,,কখনোই না।"
আর একটি মুহূর্তও দাঁড়ালো না শহর।নীরবে বেরিয়ে গেলো বাড়ি থেকে।এক্ষুনি তার চৈত্রের কাছে যেতে হবে দ্রুত।একটু বেশি সময় তার চৈত্রকেও দিতে চায় শহর তার অবসরে,মেয়েটাও যে বড্ড বেসামাল শহর বলতেই। মনে মনে বললো শহর...
"প্রিয় চৈত্রমাস, চৈত্রের শহর চৈত্রেরই থাকবে।শহর চৈত্রকে ছেড়ে কিছুতেই ঐ কঙ্কাবতীর মিথ্যা ভালোবাসার বি*ষ পান করবে না।কখনোই নাহ।"