Mr and Mrs Twins

পর্ব - ২২

🟢

এদিকে বাড়ি ফিরেই ফ্রেশ হয়ে আবির এলো পাখিদের রুমে।জানে এখন দোয়েল নেই,, তাই নক করার প্রয়োজন বোধ করলো না।৷ রুমে ঢুকেই চোখে পড়লো ডিভানে গুটিসুটি হয়ে সুয়ে থাকা চড়ুইয়ের দিকে।ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলো সে।চড়ুইয়ের মাথার কাছে ফ্লোরে বসে পড়লো।,,,আলতো হাতে চড়ুইয়ের মুখের উপরের চুল গুলে সরিয়ে দিলো।,,লক্ষ্য করলো কিছুক্ষন পর পর চড়ুইয়ের ঠোটগুলো কেপে উঠছে।,,,আবির আলতো কন্ঠে ডাকলো...

"চড়াই পাখি?, এই চড়াই পাখি?"

একটু পরেই চোখ খুললো চড়ুই।তাকালো আবিরের দিকে।একদম মুখোমুখি। নিজের গালে থাকা আবিরের হাতের উপর নিজের হাতটা রেখে আলতো চাপ দিলো।,,,আবির লক্ষ্য করছে তার চড়াই পাখির কাজ গুলো।,,

"এই সময় ঘুমাচ্ছো কেন?শরীর খারাপ করছে?"

চড়ুই কিছু বললো না,৷ নিঃপলক তাকিয়ে রইলো আবিরের দিকে।আবিরের হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় চেপে ধরলো।,,,, আবির বাধা দিলে না,,,অপর হাতটা উঠিয়ে চড়ুইয়ের মাথায় রাখলো,,,

"এখানে শুয়েছো কেন?নড়লেই তো পড়ে যাবে।বেডে ঘুমাতে?"

এবারও চড়ুই কিছু বললো না,৷,,, একবার নাক টানলো।তারপর একটা ঢোক গিলে বন্ধি ঠোট দুটো আলাদা করলো।

"কিছু বলছো না কেন চড়াই পাখি?বলো আমায়?শরীর খারাপ করছে?"

একটু পরে চড়ুই জড়ানো কন্ঠে বললো..

"শীত লাগছে খুব"

আবিড় উঠলো না,,,একটু দুরে থাকা এসির রিমোটটা নিয়ে পাওয়ার বাড়িয়ে দিলো।এবার একটু রুমটা গরম হচ্ছে। তবে চড়ুইয়ের হাটু ভেঙে শুয়ে থাকার কোনো পরিবর্তন হলো না।,,

"বোন কোথায়?এখনো আসেনি?"

"চলে আসবে একটু পরেই,,,কোথায় গিয়েছিলো?"

"ফার্মেসীতে,,,কিছু জিনিস আনতে।"

আবির কিছু বললো না,, তাকিয়ে রইলো তার চড়াই পাখির দিকে। চড়ুইও আজ চোখ ফেরালো না,,,,অশান্ত দৃষ্টি দিয়েই তাকিয়ে রইলো আবিরের দিকে।,,৷ কিছুক্ষণ নিরবতা। তারপর চড়ুই বলে উঠলো..

"ব্ ব্যবসার থলে?"

"বলো চড়াই পাখি?"

"আমার মাথায় থাকা আপনার হাতটা দিয়ে আমার চুল গুলো একটু টেনে দিন না,?"

আবির এতক্ষণ চড়ুইয়ের চুলে বুলাতে থাকা হাতটা থামিয়ে দিলো।

"তোমার কি কষ্ট হচ্ছে চড়াই পাখি?প্লিজ আমায় বলো?"

চড়ুই কিছুই বললো না, তবে আলতো করে হাসলো।,,,আবিরও আর কিছু জিজ্ঞেস করলো না। উঠে দাড়িয়ে চড়ুইয়ের হাত থেকে নিজের হাত টা ছাড়ালো।তারপর চড়ুইকে পাজা কোলে তুলে নিলো।,,,,চড়ুই কিছুই বললো না,,,নিরবে দেখতে থাকলো।আবির চড়ুইকে নিয়ে খাটে শুইয়ে দিলো।,,তারপর পায়ের কাছ থেকে কম্বলটা টেনে চড়ুইকে পড়িয়ে দেবে,,,তার আগেই চড়ুই ধীরে ধীরে উঠে বসলো।এলোমেলো হয়ে যাওয়া ওড়নাটা ঠিক করে নিলো।

"বসলে যে? "

"শুয়ে শুয়ে কথা বলতে ভালো লাগে না।"

আবির আলতো হাসলো

"তো এখন কি আমার সাথে কথা বলবে?"

চড়ুই উপর নিচ মাথা ঝাকালো।আবির গিয়ে চড়ুইয়ের মুখোমুখি বসলো।

"আমার সাথে কথা বলার ইচ্ছে জাগলো যে হঠাৎ? '"

চড়ুই কিছু বললো না,,,তবে হাসলো।

"আমরা তো এবার চলে যাবো।"

মুখ মলিন হয়ে গেলো আবিরের।

"হঠাৎ এই কথা?".

" ওমা,,হঠাৎ কোথায়?,,আমরা তো এসেছিই জিসান ভাইয়ার বিয়েতে। এখন তো সব শেষ,,,"

আবির চড়ুইয়ের চোখে চোখ রাখলো।

'"উহুম,,,,শুরু,,,সবে মাত্র সব শুরু,,,,এমন এক শুরু যার শেষ বলতে কিছু নেই৷,, যত দিন যাবে সব আবার নতুন মনে হবে,,,,মনে হবে এটাই মাত্র শুরু,,কোনো একজোড়া পাখির শুরু,,,একজন চাতক পাখি,,আর এক তার উড়াল পাখি। বুঝেছো পাতিহাঁস? "

বলেই চড়ুইয়ের নাকটা টেনে দিলো।,,চড়ুই ভ্রু কুচকে বললো...

"এটা কি ছিলো?"

আবির ঠোট এলিয়ে হাসলো..

"চেক করছিলাম,, তোমার নাম টিপলে দুধ বের হয় কিনা,,"

"মানে?"

"হুম,,এখন দেখলাম বের হয় না,, এর মানে কি জানো পাতিহাঁস? "

"কি?"

"এর মানে হলো,,,,,

এগিয়ে এলো চড়ুইয়ের দিকে।কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বললো...

" you are ready for everything... (তুমি সব কিছুর জন্য তৈরি।)

একটু থামলো।আবার বললো..

"And now I can do anything according to my mind,,,,,with,,,,,,you.....understand?,,, only with you(এবং এখন আমি যা খুশি করতে পারি আমার মন মতো,,,,,,তোমার সাথে।,,বুঝেছো?,,শুধু, তোমার সাথে)

চড়ুইয়ের আঁখি যুগল বন্ধ। ঘন ঘন শ্বাস ফেলছে।আবিরের এমন কাজ যে চড়ুইয়ের শরীরে কম্পন ধরিয়ে দিচ্ছে। আর কথা গুলো??কথা গুলে কি ছিলো?কি বলছেন উনি?,,,

আবির আস্তে করে সরে এলো।তাকালো চড়ুইয়ের দিকে। চোখ বন্ধ করে শ্বাস ফেলতে দেখে নিরবে হাসলো।একটু পর কিছু একটা আন্দাজ করে আবার চড়ুইয়ের নাক টিপে দিলো।দ্রুত চোখ খুললো চড়ুই,,,দেখলো আবির স্বাভাবিক ভাবেই দরজার দিকে তাকিয়ে আছে।

" ওহ ভাই,,তুই এখানে?,,"

বলতে বলতেই রুমে ঢুকলো নিবিড়,,,তারপর হাতে থাকা প্যাকেটটা সাইড টেবিলে রাখলো।

"হুম,,,ফ্রেশ হয়েই এলাম,, "

বলতে বলতেই দোয়েল রুমে ঢুকলো,,, নিবিড় বললো...

"নিচে যা,, আমিও ফ্রেশ হয়ে আসছি''

বলেই বেরিয়ে পড়লো সে।দোয়েল এসেই চড়ুইকে বললো...

" কিরে,,,,তোর কি বেশি খারাপ লাগছে?"

"উহুম,,,একটু ঘুমিয়েছি,, এখন ঠিক আছি।"

"নিবিড় ভাইয়া হাওয়াইমিঠাই এনেছে,,,খাবি না??"

চড়ুই খুশি হয়ে বললো...

"ওয়াও,,, কতদিন পরে,,,, চল,,,"

নেমে দাড়ালো সে।আবিরও দাঁড়ালো।

"বড় পাখি,,তুমি বাইরে থেকে এসেছো,,,ফ্রেশ হয়ে আসো,,,আমি ওকে নিয়ে যাচ্ছি "

"আচ্ছা "

,,,,,,,,,,,,ড্রয়িং রুমে উপস্থিত সবাই ,,নিবিড়ও এসেছে,,,,সবার হাতেই হাওয়াইমিঠাই।একটু একটু করে খাচ্ছে সবাই,,,তবে ব্যতিক্রম চড়ুই।সে খাচ্ছে অন্য স্টাইলে সম্পুর্ন মিঠাইটাকে হাত দিয়ে চেপে ছোট্ট বলের মতো করে এক গালে পুরছে,,,,তারপর আবার আরেকটা নিচ্ছে।।,,,এমন করতে করতো সবার একটার সাথে চড়ুইয়ের আটটা খাওয়া শেষ।আরো কয়েকটা খাওয়ার পর চড়ুই দেখলো টেবিল খালি,,,,আর একটাও নেই।তা দেখে আজমল হেসে উঠল এসে নিজের হাতে থাকা মিঠাই টা চড়ুইকে দিয়ে বললো...

"আমি এসব খাইনা আম্মু,,নে এটা,,, "

চড়ুই হাসি মুখে মিঠাইটা হাতে নিলো,,,তারপর তার থেকে অর্ধেক মতো নিয়ে আলতো চাপে মাঝারো আকারের একটা বল বানালো তারপর সেটা আজমলের মুখের সামনে ধরে বললো...

" তবে আজ খেতে হবে,,,একটু খানি,,আমি কিন্তু পুরোটা দেবো না।"

আজমল তাকিয়ে রইলো চড়ুইয়ের দিকে। তারপর চোখ ফিরিয়ে সাবিহার দিকে তাকিয়ে দেখলো সে হাসছে।প্রাপ্তির হাসি,,,আজমলও হাসলো,,,তারপর চড়ুইয়ের দিকে তাকিয়ে হা করতেই,,, চড়ুই মুখ প্রসারিত করে হেসে মিঠাইটা আজমলের মুখে পুরে দিলো।তারপর আবার নিজের অংশ থেকে আরেকটু নিয়ে আজমলের মুখের সামনে ধরে বললো...

"একবার খেতে নেই,,,,''

আজমল কিছু বললো না,,,হাসি মুখে সেটাও খেয়ে নিলো।,,,,,,

" জিমান বললো....

"আমরা কি দোষ করলাম"

কথার মানে বুঝতে পেরে চড়ুই হাসলো,,,তারপর নিজের হাতে থাকা মিঠাই থেকে একটু একটু করে,, জিমান,রফিক,সাবিহা,জুলেখা,তানিজ কে একটু একটু করে দুবার খাইয়ে দিলো।,, সবাই হাসলো এমন কাজে।,,,চড়ুই আবার আগের জায়গায় এসে বসলো,,,, নিবিড় তার হাতে থাকা মিঠাইটা এগিয়ে দিয়ে বললো...

"এটা নাও ছোট পাখি,,,,"

চড়ুই তাকালো,,,

"অর্ধেক নিজে খান,,,আর বাকি অর্ধেক বোনকে দিন,,,ও মাত্র দুটো খেয়েছে।"

চড়ুইয়ের কথায় নিবিড় দোয়েলের দিকে তাকালো,,, দোয়েলও তাই করলো,,,,চড়ুইয়ের এমন কথায় লজ্জা পেলো দোয়েল।,,,আবির ডান হাত দিয়ে ফোন টিপতে টিপতে চড়ুইয়ের দিকে নিজের হাতে থাকা মিঠাইটা চড়ুইয়ের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো...

"টেক ইট চড়াই পাখি "

হাসলো চড়ুই...

"থ্যাংক ইউ ব্যবসার থলে..."

বলেই যে দু হাত বাড়িয়ে মিঠাইটা চেপে ধরতে যাবে তার আগেই আবির সেটা সরিয়ে ফেললো,,,চড়ুই মুখ মলিন করে বললো...

"এতক্ষণে মোট কটা খেয়েছো.?"

চড়ুই ভাবলো,,,তবে মনে করতে পারলো না,,,,আহিশ বলে উঠলো...

"সতেরোটা খেয়েছে মোট,,"

আবির ফোন রাখলো,,,তারপর প্যাকেটের গিট খুলতে খুলতে বললো...

"১৭ টা কে হত্যা করে তারপর খেয়েছো,,, এই লাস্ট পিসটা একটু জীবিতই খেয়ে দেখো?"

বলেই কাঠির মাথায় একটু খানি মিঠাই নিয়ে চড়ুইয়ের মুখের সামনে ধরলো,,,,

"ওভাবেই তো মজা,"

আবির চোখ পাকিয়ে বললো..

''হা করো বলছি"

চড়ুই একটু ভয় পেলো,,,তাই চুপচাপ হা করে ফেললো, , আবিরও মিঠাই টুকু চড়ুইয়ের মুখে পুরে দিলো,,,, এভাবে দু তিন বার চড়ুইকে খাইয়ে এবার নিজেই একটু মুখে পুরলো।তা দেখে চড়ুই হঠাৎ আবিরের মাথার সিল্কি চুলগুলো হাত দিয়ে এলোমেলো করে দিয়ে বললো..

"গুড বয়"

আবির ভ্রু কুচকে তাকালো চড়ুইয়ের দিকে,,, মানেটা বুঝতে পেরে চড়ুই আগের মতোই হাসি মুখে বলে উঠলো...

"এই যে আপনি সবার মতো না করেন নি,,, নিজে নিজেই খাচ্ছেন,, তাই।"

এমন কান্ডে সবাই মিটমিট করে হাসছে,,,,আবির কন্ঠ নিচু করলো...

"নিজে না খেলে কি করতে??"

চড়ুইয়ের সরল উত্তর..

"কি আবার, জোর করে খাইয়ে দিতাম"

আবির আর কিছুই বললো না,,,, চুপচাপ নিজেও খেতে লাগলো,, চড়ুইকেও খাওয়াতে লাগলো,,,বাকি সবাই কি ভাবলো তার তোয়াক্কাও করলো না,,, খেতে খেতেই চড়ুই নিবিড়ের দিকে তাকিয়ে বললো...

"নিবিড় ভাইয়া,,,,আপনিও কি এই ব্যবসার থলে,, মানে আপনার ভাইয়ের মতোই নির্লজ্জ??"

চড়ুইয়ের এমন কথায় সবাই চকিত দৃষ্টিতে তাকালো তার দিকে। আবিরেরও হাত থেমে গেলো,,,আজমল সরু কন্ঠে বললো...

"এসব কি বলছিস আম্মু?"

চড়ুই ফিরে তাকালো আজমলের দিকে

"হ্যা আঙ্কেল,,,,, আপনি বলুন তো,,,,আপনার ছেলেটা এত লজ্জাহীন কেন?"

দোয়েল চাপা স্বরে বললো...

"বোন,, কি বলছিস এসব,,, চুপ কর?"

চড়ুই ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে বললো...

"তুই থাম তো বোন,,,,আঙ্কেল,, আপনি বলুন তো??"

আজমল কি বলবে,,কিছু খুজে পেলো না।,,,আহিশ বললো...

"আবির ভাই কি করেছে,, ছোট পাখি??? "

চড়ুই স্বাভাবিক ভাবেই বললো...

"এই যে,,, এত গুলো মানুষের সামনে আমাকে খাইয়ে দিচ্ছে?,,, উনার লজ্জা করছে না?"

এই কথা শুনে সবাই অবাক হয়ে একে অপরের দিকে তাকালো,,, তারপর হঠাৎ করেই একসাথে হুহা করে হেসে উঠলো,,,আবির ছাড়া।।।

চড়ুই অবাক...

"এই তোমরা সবাই হাসছো কেন??"

আবির বললো...

"তুমি আমার জান নিয়ে নিচ্ছিলে চড়াই পাখি,,,,এভাবে কেউ বলে?উপহহ"

চড়ুই ক্যাবলার মতো করে বললো..

"এ্যা!!"

সাবিহা বললো...

"আম্মু,, তুই তো সবাইকে ভয় পাইয়ে দিয়েছিলি,,,"

"আরে,,আমার কথাকে কেউ তো একটু ইনপরটেন্স দাও,,,,"

আবির পাত্তা দিলো না,,,

"খাওয়া শেষ,,এবার গিয়ে একটু রেস্ট নাও,,,তোমার হেলথ্ কান্ডিশন ঠিক নেই।,,,আম্মু? "

সাবিহা উত্তর দিলো...

"হ্যা বাবা বল?,,,"

"ড. আরিশাকে বলো সময় করে একবার বাড়িতে আসতে। চড়াই পাখি উইক,,,সাথে বড়পাখিও উইক হবে।এটা স্বাভাবিক। আর এছাড়া সবার হালকা চেক আপ করিয়ে নিবে।"

চড়ুই তাড়া দিয়ে বললো...

"আমি ঠিক আছি,,, ড.আসা লাগবে না।"

আবির কঠিন কন্ঠে বললো...

"তোমায় জিজ্ঞেস করেছি আমি?"

চড়ুইয়ের রাগ হলো,,,খেপে গেলো সে,,,উঠে গিয়ে সোজা আবিরের সামনে দাড়ালো,,,তারপর কর্কশ কন্ঠে বললো...

"হ্যা,,,আমাকে তো জিজ্ঞেস করতেই হবে না,,, আপনিই বইলেন,,,আর ইয়া বড় সুই আমার শরীরে গেথে দিক,,,,ঐ দিন ঘুমে ছিলাম,, তাই না করতে পারিনি,,,উঠার পরে কি পরিমান ব্যথা যে পাইছি,,,,,,সেটা তো আর আপনি বুঝবেন না ব্যবসার থলে।,,,ডাকুন ড.,,আর একবার মেরে দেখাক আমাকে সুই,,,আপনাকে তখন আমি..."

আবির ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে মুখ উচু করে চড়ুইয়ের দিকে তাকিয়ে রইলো,,,,, আর কিছু বললো না চড়ুই,, পেছন ফিরে চলে যেতে নিলো,,, ৪ কদম গিয়ে,,কিছু একটা ভেবে আবার আবিরের সামনে ফিরে এসেই দু হাত দিয়ে আবিরের সিল্কি চুল গুলো মুঠ করে ধরে,, মাথাটা এদিক ওদিক নেড়ে তারপর নিচের দিকে নামিয়ে দিতে দিতে বললো....

"এভাবে আমার দিকে না তাকিয়ে নিচে তাকান মি: থলে।হুহ"

বলেই ঝারি মেরে আবিরের চুল ছেড়ে গটগট পায়ে উপরে উঠে গেলো।,,,,, সবাই হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলো,,, কি করলো এটা চড়ুই,,,,এবার তো আর আবির তার আস্ত রাখবে না।,,,,তবে সবার ভাবনায় জল ঢেলে আবির চড়ুইয়ের দিকে তাকিয়ে ফিক করে হেসে দিলো,,, তা দেখে একটু পরে বাকি সবাই ও জোরে হেসে দিলো।,,,,

***********

জিসানের বিয়ের পর ৫ দিন অতিবাহিত হলো।পাখিরা চলে যেতে চাইছিলো।তবে এই বাড়ির কেউই তাদের যেতে দেয়নি,,,আর কদিন,,আর কদিন বলে রেখে দিয়েছে।সাথে হৃদও।,,,ড্রয়িং রুমের এককোনায় সোফায় বসে নখ কামড়াচ্ছে চড়ুই।পাশেই দোয়েল মোবাইলে কিছু একটা দেখছে।সাবিহা রান্না ঘর থেকেই এদের পর্যবেক্ষণ করছে আর মনে মনে হাসছে।জুলেখাও তাই,,,,তানিজ পাখিদের সাথেই সোফায় বসে হৃদের মাথায় তেল লাগিয়ে দিচ্ছে। আর হৃদ,,সে তানিজের সামনে সোফার নিচে বসে আরামসে তেল লাগাতে দিচ্ছে। আজমলরা একটু আগেই এসেছে,,তাই সবাই ফ্রেশ হতে রুমে গেছে।আবিররা এখনো এসে পৌছায় নি।আহিশ এসে পাখিদের মাঝখানে ঠেসেঠুসে বসতে বসতে বললো...

"আরে চিল ইয়ার,,,,এইটা নিয়ে এতো টেনশনের কি আছে?ফার্স্ট ইয়ারের রেজাল্টই তো।ফেইল করলে ডোনেশন দিয়া উঠে যাবো।আমাকে দেখ,,কত ফ্রীলি নিচ্ছি ব্যপারটা।,,আর তোরা?হাহ,,,"

হৃদ ফোরন কেটে বললো...

"আপনি তো ফ্রী থাকবেনই,,,ডামপেশ কিনা?আমার বার্ডসরা তো আর এমন নাহ,,,ওরা যথেষ্ট সিরিয়াস।"

আহিশ বাকা হেসে হৃদের দিকে তাকিয়ে বললো...

"শাশুড়ির হাতে তেল দিচ্ছো, দাও না,,,, এখন আবার বরকে নিয়ে পড়লে কেন,,,,সারাক্ষণ বরকে নিয়ে থাকলে সবাই কি ভাববে বলোতো? "

হৃদ রেগে গেলো,,,মাথা উচিয়ে তানিজকে বললো...

"শাশুড়ী.... ধ্যাৎ,,,,ছোট আম্মু,,দেখো,,তোমার এই লেজ বিহীন বাদর ছেলেটা আবার আমার পেছনে লাগছে।"

তানিজ হেসে বললো...

"আহিশ,,, এসব কি হ্যা,,,,দেখছিস না আমার বৌমা রেগে যাচ্ছে?"

হৃদ বিরক্ত হয়ে বললো...

"উপহ ছোট আম্মু,,,তুমিও,,?"

তানিজ হেসে দিলো,,,, পাখিদের এই দিকে তেমন খেয়াল নেই,,কারন এই কয়েকদিনে আহিশ আর হৃদের কেমিস্ট্রি সম্পর্কে বাড়ির সবাই-ই অবগত।,,,,,,,,৯ টায় রেজাল্ট আউট হওয়ার কথা,,,এখন ৯ টা ১৪ বাজে,,এখনো দিচ্ছে না কেন?",,,,বিরক্ত নিয়ে আরো একবার কলেজের ওয়েবসাইটে ঢুকলো দোয়েল,,,উৎকন্ঠা নিয়ে বলে উঠলো...

"এই এই,, রেজাল্ট আউট হয়েছে..."

আহিশ আর চড়ুই মনোযোগ দিলো ফোনের দিকে,,,,,,তখনই কোথা থেকে জিসান এসে ছো মেরে ফোনটা নিয়ে বললো...

"আমি দেখবো তোদের রেজাল্ট"

বিপাসাও এসে তানিজের পাশে দাঁড়ালো। আজমলরাও এসে সোফায় বসলো।সবাই উৎসুক দৃষ্টিতে জিসানের দিকে তাকালো। জিসান বললো,,,রোল বল তোদের,,,

দোয়েল বললো...

"আমার ২৪২, আর বোনের ২৪১,,,আহিশের...

" ২৫৬"

জিসান বললো...

"ওকেয়,,,তাহলে প্রথমে ছোট পাখিরটা।"

কিছুক্ষণ ফোন ঘাটাঘাটি করলো জিসান,,,তারপর অবাক হয়ে চড়ুইয়ের দিকে তাকালো।কিছু বলছে না দেখে চড়ুই বললো....

"কি হলো জিসান ভাইয়া,,, বলুন না?"

জিসান ঐভাবে থেকেই বললো....

"ফেইল"

দাড়িয়ে গেলো চড়ুই,,,,সাথে দোয়েলও,,,বিশ্বাস হচ্ছে না তাদের,,,,আহিশও অবাক,,,একটু ভেবে দ্রুত বললো...

"আর বাকি গুলো?"

জিসান আবার ফোনে মনোযোগ দিলো,,,

"বড় পাখি...জি পি এ ৪.৬৭।

একটু হাসলো চড়ুই,,তবে দোয়েলের মধ্যে কোনো ভাবান্তর দেখা গেলো না।

" আর,,, আহিশ.......তুইও,,,,ফেইল"

নিরবতা ছেয়ে গেলো সারা রুমে।সবাই অবাক।আহিশ এতোক্ষণ মজা করলেও সত্যিটা যেন মেনে নিতে পারছে না,,,এমবতো হওয়ার কথা নাহ,,,

দোয়েলও ভাবনায় পড়ে গেলো,,,,সবার লেখা প্রায় একই ছিলো৷,, তারা দুজন তো একসাথেই পরেছে হলে,,তাহলে??এটা কি করে সম্ভব হলো?"",,,চড়ুইয়ের চোখ চিক চিক করছে,,৷

"ব্ বোন,,,কাকাই কে কি করে বলবো?"

চড়ুইয়ের কথায় তার দিকে তাকায় দোয়েল,,,,বিপাসা বললো...

"তোমাদের অন্য ফ্রেন্ডদের জিজ্ঞেস করো?"

স্তম্ভিত ফিরলো আহিশের,,,দ্রুত রাবতিকে ফোন লাগালো,, কথা শেষে বললো....রাবুর জি পিএ ৩.৫০,,আর কেয়া ফেইল।,,, জিসান ফোনের দিকে তাকিয়ে বললো...

"এটা কি করে পসিবল?"

তার কথায় সবাই তাকালো..

"সাইন্স ডিপার্টমেন্টের ৬১৩ জন স্টুডেন্টের মধ্যে মাত্র ৫৬ জন পাশ করেছে,,,বাকি সব ফেইল।"

দোয়েল অবাক হয়ে বললো...

"ওয়াট!!!"

জিমান বললো...

"এটা কি করে সম্ভব?এতো ওয়েলনোন একটা কলেজে এই রকম রেজাল্ট? "

আজমল বললো...

"কোনো সমস্যা হয় নি তো?"

,,,কথার মাঝেই জিসানের হাতে থাকা ফোন বেজে উঠলো,,,

"পাখি,,,তোমাদের কাকাই ফোন করেছে"

এগিয়ে দিতেই চড়ুই ফোনটা নিয়ে রিসিভ করলো..

"হ্ হ্যালো,, ক্ কাকাই?"

"কে,,দোয়েল আম্মু?"

"না কাকাই,,আ্ আমি চড়ুই,,"

"ওহ,,,আম্মু,,,রেজাল্টের কি খবর?"

চড়ুই চুপ করে গেলো।

"কি হলো আম্মু?বল?"

চড়ুই বললো...

"ক্ কাকাই..."

"কি হলো আম্মু?এতো তোতলাচ্ছিস কেন?,,,,নির্ভয়ে বল আম্মু,,আমি কি তোদের কিছু করবো?বল আম্মু?"

"কাকাই,,আ্ আমি ফেইল করেছি।"

এক নিঃশ্বাসে বললো কথাটি,,,ওপাশ থেকে কিছু শোনা গেলো না।একটু পরে আমোজ বললো..

"আর দোয়েল আম্মু?"

কথাটি শুনে চড়ুই দোয়েলের দিকে তাকালো,,,,বলতে নিলো..

"বোন....."

শেষ করার আগেই দোয়েল ছো মেরে চড়ুইয়ের হাত থেকে ফোনটা নিয়ে বললো...

"আমি,,,,আমিও ফেইল করেছি কাকাই।।"

আমোজ কিছুক্ষণ চুপ থাকলো,,,একটু পরে বললো...

"তোরা একদম ভেঙে পরবি না আম্মুরা,,,,চিন্তার কিছু নেই,,হ্যা?এটা তো ফাইনাল না হুম,,,,আমি ব্যবস্থা করবো "

দোয়েল বললো..

"কাকাই,,,,তোমার কিছু করা লাগবে না,,,,, আ্ আমরা আরো একটা বছর ফার্স্ট ইয়ারে থাকবো,,,এ্ এতে তো আমাদেরই ভালো হবে তাইনা?"

উপস্থিত সবাই চকিত দৃষ্টিতে তাকালো দোয়েলের দিকে। শুধু চড়ুই ছাড়া,,,সে দোয়েলের দিকে কাতর দৃষ্টিতে তাকিয়ে ভাবছে...

"তার এই বোনটা তার জন্য মিথ্যা বলছে?যাতে তাদের ক্লাস গ্যাপ না পরে,, এত কেন করে তার এই বোন টা,,,,"

দোয়েল ফোন রাখতেই চড়ুই গিয়ে ঝাপটে ধরলো দোয়েলকে। চোখ থেকে গড়িয়ে একফোটা পানি পড়লো...

"তুই আমার জন্য কেন মিথ্যা বললি বোন?,,,সত্যিটা বলে দিতি?কি এমন হতো?"

দোয়েল কিছু বললো না,,,শুধু জড়িয়ে ধরলো বোনকে।,,,দুজনের কাধে হাত রাখলো হৃদ,,,

"ডোনেশনের জন্য আব্বুকে মিথ্যা বললি দোয়েল পাখি?,,কেন??আব্বু কি দিতো না?,,তুই বুঝাচ্ছিস না?,,,কচু বোঝাচ্ছিস,,আমরা জানিনা?কেই বা এক ক্লাসে দু বছর থাকতে চায় হুম?আমি সব বলে দিবো আব্বুকে। "

দোয়েল তাড়া দিয়ে বললো..

"না হৃদ,,,এমন করিস না৷ তুই ছোট,,,বুঝতে পারছিস না,,, ডোনেশন টা অল্প টাকার নয়, অনেক বড় এমাউন্ট।কাকাইয়ের খুব কষ্ট হয়ে যাবে রে.."

হৃদ বললো..

"কিন্তু...."

শেষ করার আগেই টেবিলে থাকা দোয়েলের ফোবনা বেজে উঠলো।চড়ুই গিয়ে ফোনটা তুললো,,,অবাক হয়ে দোয়েলের দিকে তাকিয়ে বললো..

"বাবা ফোন করেছে.."

সবাই চকিত দৃষ্টিতে তাকালো। কারন এখানে এসেছে অবদি পাখিদের কখনোই তাদের বাবার সাথে ফোনে কথা বলতে দেখেনি।আহিশ তো বলেই ফেললো..

"তোদের বাবা তো তার দরকার ছাড়া ফোন করে না?"

সাবিহা বললো..

"ফোন রিসিভ করবি না আম্মু?"

চড়ুইয়ের স্তম্ভিত ফিরলো। রিসিভ করে কানে তুললো ফোনটা।কাপা কাপা কন্ঠে বললো..

"হ্ হ্যালো,,,"

"কে তুমি?"

"চ্ চড়ুই,,,,"

"ওহ,,,,শুনলাম নাকি ফেইল করেছো দুজনই,,,,,"

চড়ুই তাকালো দোয়েলের দিকে,,,দোয়েল প্রশ্নাতুর দৃষ্টিতে তাকালো বোনের দিকে।

"তা নিজের মাকে তো জন্মের সময়ই মেরে ফেলেছো দুজন মিলে,,,,"

কথাটা শুনেই চড়ুই কাতর স্বরে বললো..

"বাবা!!"

"চুপ করো,,,তোমরা ডাকবে না আমায় বাবা বলে,,,আমার একটাই সন্তান।সে হলো আমার ছেলে,,, নিরাজ।,,,ভুলে যেও না আমি তোমাদের সেদিনই ত্যাগ করেছি যেদিন নিরাজ আমার ঘর আলো করে এসেছে।,,,,,,,,,"

চড়ুইয়ের চোখ গড়িয়ে পানি পড়লো।সবাই উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো চড়ুইয়ের দিকে। ওপাশের কথা কেউই শুনতে পারছে না।,,,

"আমি চাইলে তোমাদের তখনই কোথাও ফেলে আসতে পারতাম।কিন্তু তা আমি করিনি,,,,সে যাই হোক,,,,এখন আমার ভাইয়ের কাছে আছো,,,,ও নিতান্তই নাজুক স্বভাবের লোক।তোমাদের মুখ ফুটে বলতে পারছে না যে ও তোমাদের প্রতি বিরক্ত।,,,,আর তোমরাও তো বড় হয়েছো?এতটুকু বোঝোনা?ওর ও তো বউ বাচ্চা আছে,,,তাদেরও চালাতে হয়,,,তোমাদের দুজনের জন্য তার যথেষ্ট খরচ হচ্ছে।,,,,,৷ এখন তোমাদের জন্য ডোনেশন দিতে গেলে আরো বেশি খরচ হবে ওর।,,,,"

চড়ুই চোখ মুছলো।সাহস সঞ্চয় করে বললো...

"কাকাই তো কখনোই আমাদের এমন কিছু বলেনি।তাহলে...."

"প্রথমেই বলেছি,,ও মুখ ফুটে কিছু বলতে পারে না।,৷, এখন আমি বলছি,,,,,ও না কোনো ডোনেশন দেবে,,আর না তোমাদের আর পড়াশোনা হবে।,,,,যত দ্রুত সম্ভব বাড়ি ফিরে এসো।এখানকার সভাসদের ছেলে আর তার ভাতিজা এসেছে তোমাদের জন্য সম্মন্ধ নিয়ে,,,,আশা করি এর থেকে ভালো কিছু তোমরা ডিজার্ভ করো না।আর না জীবনে পাবে কোনোদিন।,,,,,বিয়ে করে ওদের ঘর সামলাও।,,,,আর যেন বলতে না হয়।,,,,

কল কেটে দিলো পাখিদের বাবা,,,,,চড়ুই হতভম্ব হয়ে রইলো।কান থেকে ফোনটা নামিয়ে ছেড়ে দিলো তা।একটু শব্দ করে ফোনটা টেবিলে পড়লো।,,,,হাত পা অবস হয়ে আসছে তার।এসব কি বললো তার বাবা?,,,বিয়ে?তাও ঐ নোংরা ছেলে গুলোকে।আর নিজেকে সামলাতে পারছে না চড়ুই,,,,সাবিহা বললো...

" চড়ুই আম্মু?"

চড়ুইয়ের ভাবান্তর হলো না।আগের মতোই আনমনা হয়ে তাকিয়ে রইলো।, হঠাৎ কাধে কারো হাতের স্পর্শ পেয়ে সেদিকে তাকালো চড়ুই।আবির দাড়িয়ে আছে।,,,

"কি হয়েছে চড়াই পাখি?এমন দেখাচ্ছে কেন তোমায়? "

কন্ঠে সম্পুর্ণ কোমলতা।চড়ুই আর পারলো না,,,দ্রুত গতিতে ঝাপটে ধরলো আবিরের গলা।অঝরে কেদে উঠলো। আবির সহ সবাই অবাক।হঠাৎ কি হলো চড়ুইয়ের?,,,,

মি. এন্ড মিস. টুইন্স পর্ব ২২ গল্পের ছবি