স্টেশনের পুরোনো সিগন্যাল রুমটা প্ল্যাটফর্মের একদম শেষ প্রান্তে। দরজায় তালা দেওয়া ছিলো চাবিটা ঢুকতেই—ক্লিক।
দরজা খুলে গেল ঘরের ভেতরে পুরোনো রেলওয়ে যন্ত্রপাতি।
একটা টেবিল, একটা টেপ রেকর্ডার, আর দেয়ালে একটা পুরোনো রেললাইন নকশা। রাফি নকশার দিকে তাকিয়ে বুঝল—শালবাগান স্টেশন থেকে একটা পুরোনো সার্ভিস লাইন সরাসরি পরিত্যক্ত বাড়ির পাশ দিয়ে গেছে। লাইনটা এখন ব্যবহার হয় না। কিন্তু ২০০৯ সালে ব্যবহার করা হতো।
তানভীর বলল,
“তাহলে বাড়ির গোপন টানেল আর এই রেললাইন একসঙ্গে যুক্ত ছিল।”
রাফি মাথা নাড়িয়ে বলল “এই কারণেই বাড়িতে জিনিসপত্র আনা-নেওয়া সহজ ছিল।”
মেহরিন টেপ রেকর্ডার চালু করল, প্রথমে একজন পুরুষের কণ্ঠ। রাফি সঙ্গে সঙ্গে চিনে ফেলল তার বাবা।
-যদি কেউ এই রেকর্ডিং শুনে থাকে, তাহলে ০৩৭ প্রকল্প শেষ করার সময় এসেছে।
রাফি চুপ করে শুনতে লাগল।
-”সালেহা মারা যাওয়ার পর আমি বুঝেছিলাম, গবেষণাটা বন্ধ না করলে আমার দুই ছেলেকেই হারাব। কিন্তু ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে। ছোট ছেলেকে দিয়ে পরীক্ষার পর নিজের স্মৃতি ধরে রাখতে পারছিল না। বড় ছেলে রাফির স্মৃতির সঙ্গে তার স্মৃতি মিশে যাচ্ছিল। তাই আমি একটা সিদ্ধান্ত নিই। একজনকে সবাই মৃত মনে করবে। অন্যজন স্বাভাবিকভাবে জীবন কাটাবে। আমি ছোট ছেলেকে কালো বাড়িতে লুকিয়ে রাখি। আর রাফির স্মৃতি থেকে তার ভাইয়ের অস্তিত্ব মুছে ফেলার চেষ্টা করি। আগুনটা কোনো দুর্ঘটনা ছিল না। আমি নিজেই আগুন লাগিয়েছিলাম। যাতে সবাই বিশ্বাস করে আমার ছেলে মারা গেছে। কিন্তু আগুনের রাতে সে পালিয়ে যায়। আমি তাকে অনেক খুজেছি কিন্তু পাইনি।”
রেকর্ডিং থেমে গেল।
তিনজনই স্থির হয়ে দাড়িয়ে আছে। রাফি কিছুক্ষণ কোনো কথা বলল না। তারপর বলল,
“তাহলে আমার ভাই বেঁচে আছে এখনল।”
মেহরিন মাথা নাড়ল। “হ্যাঁ।”
রাফি বলল “আর সে এত বছর ধরে আমাকে খুঁজছিল।”
রাফির মাথায় হঠাৎ একটা কথা মনে পরল।
-কিন্তু আমরা যে লোকটাকে কালো রঙের দরজার ঘরে দেখেছিলাম?”
-গবেষক?”
-হ্যাঁ।”
তানভীর বলল, “তাহলে সে কোথায় গেলো?”
কেউ কোনে উত্তর দিতে পারল না। রাফি টেপ রেকর্ডারের আশেপাশে ভালোভাবে দেখতে লাগলো একটা কাগজ পেলো তার ওপর লেখা—
-গবেষক কখনো পরিত্যক্ত বাড়ি থেকে বের হয়নি।”
রাফি থেমে গেল।
-কী, এটা কিভাবে হতে পারে?”
কাগজের নিচে আরেকটা লাইন—“সে ২০০৯ সালের আগুনেই মারা যায়।”
তাহলে কিছুক্ষণ আগে যে লোকটা তাদের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল—সে কে?
রাফি হঠাৎ বুঝতে পারলো বলল “সে গবেষক ছিল না।”
মেহরিন তাকিয়ে বলল “তাহলে কে ছিলো?”
রাফি বলল “আমার ভাই।”
ঘরের বাতাস যেন হঠাৎ থেমে গেল। রাফি টেবিলের ওপর হাত রেখে বলল
-সে আমাদের ভয় দেখায়নি। সে আমাদের এখানে এনেছে।
কারণ সে চেয়েছে আমরা সত্যিটা খুঁজে পাই। আমাদের ওই পরিত্যক্ত বাড়িতে যাওয়া, এখানে আসা সব কিছুর পিছনেই আমার ভাইয়ের হাত ছিলো।
রাত ৩টা ১২ বাজে। হঠাৎ স্টেশনের লাউডস্পিকার চালু হলোনশুধু শোঁ শোঁ শব্দ। তারপর একটা শিশুর কণ্ঠ।
“ভাইয়া…”
রাফি স্থির হয়ে গেল ঠান্ডায়।
“আমি জানি তুই এখানে।”
মেহরিন চারদিকে তাকাল। স্টেশন তো ফাঁকা।
কণ্ঠটা আবার এল—“কালো দরজার চাবিটা নিয়ে এসেছিস?”
রাফি পকেট থেকে ০৩৭ চাবিটা বের করল। তারপর বলল,
“তুই কোথায়?” কোনো উত্তর নেই।
হঠাৎ সিগন্যাল রুমের পেছনের দরজায় তিনবার শব্দ হলো।
ঠক।
ঠক।
ঠক।
তানভীর দরজা খুলে দেখলো পেছনে একটা সোজা করিডোর। করিডোরটা নিচের দিকে নেমেছে। রাফি টর্চ জ্বালিয়ে এগিয়ে গেল। কিছুদূর পর তারা বুঝল—এই পথটাই পুরোনো রেল সার্ভিস টানেলের সঙ্গে যুক্ত।
আর টানেলের শেষ মাথা গিয়ে উঠেছে—কালো বাড়ির উত্তর দিকের নিচে। রাফি থেমে গেল। সবকিছু যেনো একসঙ্গে মিলতে শুরু করল।
দেয়ালের ভেতরের টানেল, রেললাইন, সিগন্যাল রুম, কালো দরজা, ০৩৭ কোড।
টানেলের শেষ মাথায় একটা ছোট লোহার দরজা পেলো। দরজার ওপর লেখা—০৩৭।
রাফি চাবিটা ঢুকিয়ে ঘুরাতেই দরজা খুলে গেল।
ভেতরে একজন বসে আছে বয়স প্রায় আঠারো-উনিশের মতো। রাফির মতো দেখতে হুবুহু কিন্তু সে রাফির ভাই নয়।
কারণ ছবির সঙ্গে মিলিয়ে রাফি বুঝল—লোকটার বয়স এখন প্রায় তেত্রিশ। এই মানুষটা বয়সে বড় তার মুখে ক্লান্তি।
সে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে বলল “ভাইয়া।”
রাফির চোখে পানি চলে এল।
“তুই…”
লোকটা মাথা নাড়ল।
“হ্যাঁ।”
রাফি এগিয়ে যেতে থাকলো একটু পরেই থেমে গিয়ে বলল
“তুই এত বছর কোথায় ছিলি?”
তার ভাই বলল,
“বাবার পুরোনো একজন বন্ধু আমাকে লুকিয়ে রেখেছিল।”
রাফি বলল “কেন?”
তার বাই উত্তর দিলো “যারা ০৩৭ প্রকল্প চালাত, তারা ভয় পেয়েছিল পরীক্ষার তথ্য বাইরে চলে যাবে।”
রাফি বলল “তুই কি আমাকে খুঁজেছিস?”
-হুম অনেকবার।
-তাহলে সরাসরি সামনে আসিসনি কেন?
সে হেসে বলল,
-তুই তো আমাকে চিনতিস না। তোর স্মৃতি থেকে আমাকে মুছে দেওয়া হয়েছিল। আমি কাছে গেলে তোর ওপরও বিপদ আসত।
রাফি নিচু গলায় বলল,
-তাহলে এই পরিত্যক্ত বাড়ির ঘটনাগুলো?
-আমি করেছি।
-ছবিগুলো?
-ক্যামেরা দিয়ে তুলেছি।
-ফোনের কণ্ঠ?
-রেকর্ডিং করেছিলাম।
-ভেজা পায়ের ছাপ?
-টানেলের পানি।
-দেয়ালের শব্দ?
-পুরোনো পাইপ আর লুকানো মেকানিক্যাল ডিভাইস।
রাফি হা হয়ে তাকিয়ে রইল।
তার ভাই বলল, “আমি চেয়েছিলাম তুই যেনো ভয় পাস। কিন্তু কোনো ভূত বা অন্য কিছুর জন্য না, সত্যিটা খোজার জন্য যেন তুই বাড়িটা ছেড়ে না যাস।
রাফির ভাই রাফিকে একটা ফাইল দিয়ে বলল “এটা দেখ।”
ফাইলের প্রথম পাতায়—০৩৭ — চূড়ান্ত রিপোর্ট।
ভেতরে লেখা ছিল—পরীক্ষাটি সফল হয়নি। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ছিল শেষ পাতায়।
“স্মৃতি মুছে ফেলা যায়নি। কেবল দমন করা হয়েছে।”
রাফি বুঝল—তার শৈশবের যেসব দৃশ্য এতদিন অদ্ভুত স্বপ্ন মনে হয়েছে, সেগুলো আসলে তার নিজের স্মৃতি।
তার ভাইয়ের সঙ্গে কাটানো সময়। কালো দরজার সামনে দাঁড়ানো, লাল খেলনা গাড়ি, বাবার চিৎকার, আগুন, সবকিছু।
তার ভাই বলল, “তুই আমাকে ভুলিসনি। শুধু তোর মস্তিষ্ক ভুলে থাকার অভিনয় করেছে।”
রাফির চোখ দিয়ে পানি পড়তে লাগল। সে ছোটবেলার সেই লাল গাড়িটা ভাইয়ের হাতে দিয়ে বলল “এটা তোর।”
ভাই গাড়িটা নিল।
দুজন কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর রাফি বলল,
“চল।”
“কোথায় যাব?”
“আমার সাথে বাড়ি যাবি।”
তার ভাই মৃদু হাসল। “এবার সত্যিই বাড়ি জাবো তুই যেহেতু আমাকে নিতে এসেছিস।”
রাফি পুলিশকে ফোন করে লোকেশন দিয়ে আসতে বলল।
ভোর ৫টা ১২। পরিত্যক্ত বাড়ির সামনে পুলিশ এসে পৌঁছাল। রাফি সব নথি তাদের হাতে দিল।
গবেষণার প্রমাণ পুরোনো হাসপাতালের রেকর্ড, সিগন্যাল রুমের ক্যাসেট, গোপন টানেলের তথ্য, সবকিছু।
মেহরিন শেষবারের মতো বাড়িটার একটা ছবি তুলল।
গাড়ি ছাড়ার আগে রাফি শেষবারের মতো পরিত্যক্ত বাড়িটার দিকে তাকাল। দোতলার কালো জানালাটা খোলা।
সেখানে কেউ নেই। পুরো বাড়ি যেনো শান্ত হয়ে আছে।