রাত ১০টা ৩৮ মিনিট। বৃষ্টিটা তখনও থামেনি পুরোপুরিভাবে। শহর থেকে প্রায় পঁচিশ কিলোমিটার দূরে, পুরোনো একটা পাকা রাস্তার পাশে পরে আছে একটা পরিত্যক্ত বাড়ি। বাড়িটা ছিলো দোতলা কিন্তু বাড়িটা অনেক বড় ছিলো। সামনের দেয়ালের বেশিরভাগ জায়গায় শ্যাওলা জমে গেছে। জানালাগুলো কাঠের, কিন্তু সবগুলো বন্ধ। বাড়ির চারপাশে প্রায় হাঁটু সমান গাছপালায় ঘেড়া। বাড়িটা কার, এর মালিক কে কেউ জানতো না। স্থানীয়রা শুধু এক নামে চিনত—পুরান বাড়ি।
বাড়ির একটা দরজা বাইরে থেকে দেখলে সম্পূর্ণ কালো মনে হতো। গ্রামের মানুষজন বলে সেই দরজাটা গত পনেরো বছর ধরে খোলা হয়নি।
সেদিন রাতে বাড়িটার সামনে এসে থামল একটা সাদা মাইক্রোবাস। গাড়ি থেকে তিনজন নামল।
প্রথমে নামল রাফি, বয়স ২৮ বছরের মতো। পেশায় স্থাপত্যবিদ। পুরোনো ভবন নিয়ে কাজ করে। সে কন্টাক্ট এ এই বাড়ির কাজ পেয়েছে।
তারপরে নামল তানভীর, বয়স ৩০ বছর। ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার।
আর একজন নামল মেহরিন, বয়স ২৬ বছর। সে ছিলো ফটোগ্রাফার।
একটি নির্মাণ কোম্পানি বাড়িটা কিনেছে, সে পরিত্যক্ত বাড়িটা ভেঙে নতুন বিল্ডিং হবে সেখানে। ভাঙার আগে ভবনটির কাঠামোগত অবস্থা পরীক্ষা করার দায়িত্ব পেয়েছে রাফি।
রাফি সাথে তানভীরকে এনেছে পুরোনো বৈদ্যুতিক সংযোগ পরীক্ষা করতে। লাইট, ফ্যান, সুইচ এগুলো ঠিক করে দেখতে এবং বৈদ্যুতিক লাইনের ব্যাবস্থা আছে কিনা এখানে। আর মেহরিনকে নিয়ে এসেছে পুরো ভবনের ছবি তোলার জন্য। মেহরিন ফটোগ্রাফি করতে ভালোবাসে। এজন্য সে পরিত্যক্ত বাড়ি এবং আশেপাশের জায়গার দৃশ্য ফটোশুট করার জন্য এসেছে। তারা তিনজন বন্ধু ছিলো। তাদের হাতে অনুমতিপত্রও ছিল। অর্থাৎ তারা আইনিভাবে বাড়িতে ঢুকছিল। গাড়ি থেকে নামার সময় রাফি ঘড়ির দিকে তাকাল। এখন রাত ‘১০টা ৪০ বাজে।’
রাফি বলল “দুই ঘণ্টার মধ্যে কাজ শেষ করে বের হব।”
মেহরিন ক্যামেরা’টা চালু করতে করতে বাড়িটার দিকে তাকাল। আর বলল “লোকজন বলছে বাড়িটায় নাকি কেউ রাতে ঢোকে না।”
রাফি হেসে বলল,“লোকজন তো অনেক কিছুই বলে, সব কথা শুনলে কি আর হবে নাকি।”
তারপর তিনজন গেট দিয়ে বাড়ির ভিতরে ঢুকলো। বাড়ির মেইন দরজায় তালা ছিল না। দরজাটা ঠেলে খুলতেই ভেতর থেকে একটা ঠান্ডা বাতাস বেরিয়ে এলো। তিনজনই থেমে গেল, বাতাসটা খুবই ঠান্ডা ছিলো। কিন্তু বাইরে তখনও অনেক গরম ও ভাবসি দেওয়া আবহাওয়া।
তানভীর ফোনের টর্চ জ্বালিয়ে বলল,
“দরজা, জানালা বন্ধ। তাহলে বাতাস আসছে কোথা থেকে?”
রাফি তার ফোনের টর্চ জ্বালিয়ে মেঝের দিকে আলো ফেলল। ধুলোর ওপর কয়েকটা স্পষ্ট দাগ। জুতোর ছাপ এখনকার, হালকা ভেজা। দেখে মনে হচ্ছে কেউ মাত্রই ঘরের ভেতরে হেঁটেছে।
রাফি নিচু হয়ে ছাপগুলো দেখল। ছাপগুলো দরজার কাছ থেকে সোজা ভেতরের করিডোরের দিকে গেছে। তারপর বাঁদিকে মোড় নিয়েছে।
রাফি বলল “মেহরিন, তুমি এই পায়ের ছাপের ছবি নাও।”
মেহরিন ক্যামেরার শাটার চাপল। ক্লিক।
তারা তিনজন ধীরে ধীরে করিডোরের দিকে এগোলো।
বাড়ির ভেতরের গন্ধটা পুরোনো কাঠ আর স্যাঁতসেঁতে দেয়ালের মতো ছিল। কিন্তু মেঝেতে খুব বেশি ধুলো নেই।
রাফি সেটা খেয়াল করল। পুরো বাড়ি পরিত্যক্ত হলে এত পরিষ্কার মেঝে থাকার কথা তো না। সিঁড়ির কাছে গিয়ে সে দেয়ালে হাত রাখল। ধুলো জমে আছে। কিন্তু সিঁড়ির মাঝখানের কাঠের অংশে ধুলো কম। দেখে মনে হয় যেনো কেউ নিয়মিত এই সিড়ি দিয়ে ওঠানামা করে।
হঠাৎ পিছন দিক থেকে একটা হেটে যাওয়ার শব্দ এলো।
তানভীর সঙ্গে সঙ্গে পেছনে তাকাল। কেউ নেই, তেমন একটা পাত্তা দিলো না
মেহরিন ক্যামেরা ওন করে চারপাশের ছবি তুলতে লাগল।
ঠিক তখনই উপরতলা থেকে একটা শব্দ এলো।
ঠক, ঠক!
তিনজন একসঙ্গে তাকাল উপরের দিক। কয়েক সেকেন্ড চুপ তার একটু পর আবার—ঠক!
এবার শব্দটা যেন কোনো ভারী জিনিস মেঝেতে পড়ার মতো শোনা গেলো।
তানভীর বলল,“উপরে কেউ আছে মনে হয়।”
রাফি টর্চটা শক্ত করে ধরে বলল “চল।”
তারা সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠল।
দোতলার করিডোরে পৌঁছাতেই শব্দটা আবার হলো।
কিন্তু এবার তারা বুঝতে পারল—শব্দটা উপরে নয়।
দেয়ালের ভেতর থেকে আসছে। রাফি দেয়ালে কান রাখল।
তারপর—ঠক, ঠক। সরাসরি দেয়ালের ওপাশ থেকে ভেসে আসছে। তানভীর দেয়ালটা পরীক্ষা করে বলল,
“এখানে ফাঁপা জায়গা আছে।”
রাফি মেঝের নকশা বের করে দেখতে লাগলো।
বাড়ির মূল নকশায় এই দেয়ালের পেছনে কোনো ঘর থাকার কথা নেই।