ফোনের ওপাশ থেকে কথাটা আসার পর গোপন ঘরের ভিতরে বাতাস যেন আরও ভারী হয়ে গেল।
রাফি টেলিফোনটা কানে ধরে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
তার সামনে মেহরিন আর তানভীর। দুজনেই তার দিকে তাকিয়ে আছে। ফোনের ওপাশ থেকে আবার বলে উঠল
“রাফি…”
রাফি এবার কোনো উত্তর দিল না।
কণ্ঠটা আবার বলে উঠল—
“দরজাটা খুলে দাও।”
রাফি ধীরে টেলিফোনটা নামিয়ে রাখলো। তানভীর ফিসফিস করে বলল,“তুইও কি ফোনে তোর নিজের কণ্ঠ শুনলি?”
রাফি মাথা নাড়িয়ে বলল “হ্যাঁ।”
তানভীর বলল “এটা কীভাবে সম্ভব হয়?”
রাফি বললো “আমিও বুঝতে পারছি না।”
মেহরিন এতক্ষণে ক্যামেরাটা তুলে নিল। তার চোখ তখনও আগের ছবির ওপর।
মেহরিন বলল “একটা জিনিস দেখো…”
সে ছবিটা রাফির সামনে ধরে বলল,
“ছবিতে যে রাফিটা দাঁড়িয়ে আছে, তার পায়ের নিচে ছায়া আছে।”
রাফি ছবিটা ভালো করে দেখে বলল, হ্যা আছে তো।
মেহরিন বলল,
- ছবির ভেতরে রাফির ছায়া আছে। তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আমার আর তানভীরের ছায়াও আছে। তিনজনেরই ছায়া আছে কিন্তু, শুধু একটা পার্থক্য—
ছবির রাফি যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে গোপন ঘরের দেয়াল নেই। কিন্তু সেখানে তো কেউ দাঁড়াতে পারবে না। কারণ ওই জায়গায় তো দেওয়াল আছে।
তানভীর বলল,
-ছবিটা যদি সত্যি হয়, তাহলে ক্যামেরা এমন একটা জায়গা থেকে ছবিটা তুলেছে যেখান থেকে দাঁড়ানোর জায়গাই নেই।”
রাফি উত্তর দিল না। সে গোপন ঘরের দেয়ালের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে বলল,
“ছবিটা আবার তোল।”
মেহরিন ক্যামেরা হাতে নিয়ে ছবিটা সেরকম ভাবে আবার তুললো, ক্লিক। তিনজনই এবার ছবির দিকে তাকাল।
কিছুই তো নেই। শুধু পুরোনো দেয়ালই রয়েছে। রাফি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। কিন্তু, মেহরিন ছবিটা জুম করে বলল,
“এখানে কিছু একটা আছে, দেয়ালের নিচের দিকে ছোট্ট একটা কালো দাগ।”
সে ছবিটা আরও বড় করল। দাগটা আসলে একটা লেখা ছিলো। খুব ছোট করে আঁচড় কেটে লেখা—০৩:১৭
তানভীর ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল “ ১২টা ০৩ বাজে। আর তিন ঘণ্টা চৌদ্দ মিনিট বাকি।”
রাফি বলল, “কিসের?”
তানভীর উত্তর দিল, “জানি না।”
তারা গোপন ঘরটা ভালোভাবে ঘুরে ফিরে দেখতে লাগলো।
রাফি ডায়েরিটা আবার খুলল। সালেহা রহমানের লেখা পাতাগুলো পড়তে লাগল। প্রথম দিকের পাতাগুলোয় আছে বাড়ির খরচের হিসাব করা। স্বামীর সঙ্গে ঝগড়া করার পর লেখা। ছেলের স্কুলের খরচ। বাড়ির মেরামত খরচ।
কিন্তু শেষের দিকে একটা পাতায় লেখা—
“রাতে দেয়ালের ভেতর শব্দ হয়।”
পরের পাতায়—“শব্দটা পাইপের নয়। আমি খেয়াল করেছি।”
তারপর পরের পৃষ্টায় লেখা—“আজ দরজার সামনে ভেজা পায়ের ছাপ পেয়েছি।”
আরও কয়েক পাতা পরে লেখা—“যে মানুষটাকে ছবিতে দেখি, সে আসলে বাস্তবে নেই।”
রাফি থেমে গিয়ে বলল,
“এখানে একটা ব্যাপার খেয়াল কর।”
মেহরিন এগিয়ে এলো, “কী?”
রাফি বলল, “সালেহা প্রথমে শব্দ শুনেছে। তারপর পায়ের ছাপ দেখেছে। তারপর ছবিতে মানুষটাকে দেখেছে।”
তানভীর বলল,“মানে ঘটনাগুলো ধাপে ধাপে ঘটেছে।”
রাফি মাথা নাড়িয়ে বলল “হ্যাঁ। আর এর মানে হতে পারে যে…..!”
হঠাৎ তাদের পিছন দিক থেকে ধাতব শব্দ হলো। ঘ্যাং….!
তিনজনই ঘুরে তাকাল। গোপন ঘরের দরজা বন্ধ হয়ে গেলো। দরজার ওপাশ থেকে কারও পায়ের শব্দ শোনা যাচ্ছে, ধীর ধীরে হাঁটছে।
এক পা
দুই পা
তিন পা
তারপর থেমে গেল। তানভীর দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
রাফি হাত টান দিয়ে তাকে থামিয়ে বলল
“দরজা খুলিস না।”
তানভীর বলল “কেন?”
রাফি বলল “কারণ কেউ যদি সত্যিই বাইরে থাকে তাহলে।”
রাফি টর্চের আলো দরজার নিচের দিক ধরলো। নিচের ফাঁক দিয়ে আলো বাইরে গেল। সেখানে কারও পা নেই। কিন্তু—এক জোড়া ভেজা পায়ের ছাপ দরজার সামনের দিক আসছে। আর সেগুলো ধীরে ধীরে—
দরজার নিচ দিয়ে ভেতরের দিকে এগিয়ে আসছে। মেহরিন পিছিয়ে গেল। তানভীর নিচু হয়ে ছাপগুলো দেখে বলল,
“এটা তো অসম্ভব।”
রাফি বলল, “কী?”
তানভীর বলল দেখ “এগুলো তো বাইরে থেকে ভেতরে আসেনি।” সে ছাপের দিক দেখিয়ে বললো পায়ের আঙুলগুলো আমাদের দিকে।”
রাফি বলল “মানে, বুঝলাম না তো?”
তানভীর বলল “যার পায়ের ছাপ, সে আমাদের দিকে মুখ করে হাঁটছিল, মানে উল্টো দিক হাটছিলো।”
রাফি দরজার দিকে তাকিয়ে বলল “কিন্তু বাইরে তো কেউ নেই।”
_________