রাফি চাবিটা তালায় ঢোকানোর আগে থেমে গেল। তার মাথায় একটা প্রশ্ন ঘুরপাক গেতে লাগলো। চাবিটা যদি দরজা খোলার জন্যই হয়, তাহলে তার গায়ে সংখ্যা কেন?
আর দরজার তালায়ও একই সংখ্যা কেন? সে চাবিটা তালার কাছে নিয়ে গেল। ঠিক তখনই দরজার ওপাশ থেকে মেহরিনের কণ্ঠ শোনা গেল—
“রাফি, দরজা খুলবি না!”
তারপর সাথে সাথে একই কণ্ঠ—
“রাফি, দরজা খোলো!”
দুটো কণ্ঠ, একই স্বর, একই উচ্চারণ। কিন্তু একটা পার্থক্য ছিল সেটা রাফি ধরে ফেলে । প্রথম কণ্ঠের শেষে মেহরিন বলেছিল “খুলবি না”। আর, দ্বিতীয় কণ্ঠ বলেছিল “দরজা খোলো”। রাফির মনে পড়ল মেহরিন ভয় পেলে সে কখনো কাউকে আদেশের মতো করে কথা বলত না।
সে সাধারণত বলত—“এটা করো না, ওটা করো না।”
রাফি চাবি ঢোকাল না বরং বলল, “মেহরিন, তুই যদি সত্যিই বাইরে থাকিস, তাহলে এমন একটা কথা বল যেটা আমি জানি।”
কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর। প্রথম কণ্ঠ বলল—
“তুই ছোটবেলায় ক্যামেরা ভেঙে ফেলেছিলি। কারণ তোর ছবি তুলতে ভালো লাগত না।”
রাফির বুক ধক করে উঠল। কারণ এটা সত্যি, মেহরিন তাকে এই ঘটনা আগেই বলেছিল।
কিন্তু দ্বিতীয় কণ্ঠও সঙ্গে সঙ্গে বলল—
“তুই ছোটবেলায় ক্যামেরা ভেঙেছিলি।”
রাফি চোখ বন্ধ করলো কিছুই বুঝতে পারছিলো না।
দুই কণ্ঠই একই কথা জানে। অর্থাৎ শুধু কথার মাধ্যমে বোঝা যাবে না। সে মেঝেতে পড়ে থাকা ক্যামেরাটা তুলে নিল। ক্যামেরার লেন্সের পাশে একটা ছোট্ট লাল আলো জ্বলছে। রাফি বুঝল—
ক্যামেরাটা এখনও রেকর্ড করছে। সে ক্যামেরাটা দরজার নিচে রেখে দিল। “যে সত্যি মেহরিন, সে ক্যামেরাটা দেখতে পাবে।” তারপর সে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। কয়েক সেকেন্ড পর ক্যামেরার স্ক্রিনে ছবি উঠল। দরজার বাইরে যে দাঁড়িয়ে আছে—মেহরিন একাই, তার সাথে বা পেছনে কেউ নেই।
রাফি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। “মেহরিন সত্যি বাইরে।”
রাফি এপাশ থেকে বলল, কিন্তু তানভীর কোথায়?
মেহরিন ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে হাত নাড়ল। তারপর মাটিতে আঙুল দিয়ে লিখল—“তানভীর নিচে আছে।”
রাফি বুঝল, দরজার ওপাশে যে দ্বিতীয় কণ্ঠ ছিল—সে মেহরিন নয়।
রাফি এবার চাবিটা তালায় ঢোকাল।
০
৩
৭
দরজা খুলে গেলো। ভেতরে কেউ নেই শুধু একটা ছোট ঘর।
ঘরের মাঝখানে একটা পুরোনো টেবিল রাখা। টেবিলের ওপর তিনটা ফাইল। প্রথমটায় লেখা—সালেহা রহমান।
দ্বিতীয়টায়—রাফি রহমান। তৃতীয়টায়—০৩৭।
রাফি তৃতীয় ফাইলটা খুলল। প্রথম পাতায় লেখা—প্রকল্প ০৩৭। নিচে একটা পুরোনো গবেষণাগারের নাম। রাফি নামটা চিনল না। কিন্তু পরের লাইনে তার চোখ আটকে গেল—“মানব স্মৃতি ও পরিচয় পুনর্গঠন পরীক্ষা।” রাফি কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে রইল। তারপর সবকিছু ধীরে ধীরে পরিষ্কার হতে শুরু করল। তার ভাইয়ের বিরল রোগ গবেষক বলেছিলো।
বাবার গোপনীয়তা, ২০০৯ সালের আগুন, হাসপাতালের নথি, সবকিছুর কেন্দ্র ছিল এই প্রকল্প। ফাইলের পরের পাতায় লেখা—
“পরীক্ষার উদ্দেশ্য: একজন শিশুর স্মৃতি অন্য শিশুর মধ্যে স্থানান্তর করা নয়; বরং স্মৃতির নির্দিষ্ট অংশকে কৃত্রিমভাবে মুছে দিয়ে নতুন পরিচয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য তৈরি করা।”
রাফি ফাইলটা নামিয়ে রাখল। সে বুঝল—তার বাবা তাকে ভুলিয়ে দিয়েছিলেন।
কিন্তু কেন?
শেষ পাতায় উত্তর ছিল। “পরীক্ষাধীন শিশু: রাফি রহমান।”
তার নিচে লাল কালিতে লেখা—“পরীক্ষা ব্যর্থ।”
আর তার নিচে—“দ্বিতীয় শিশু: জীবিত।” রাফির শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল। তার যমজ ভাই বেঁচে ছিল। ঠিক তখনই গোপন ঘরের বাইরে থেকে তানভীরের কণ্ঠ শোনা গেল।
“রাফি!”
রাফি দরজা খুলে বেরিয়ে এসে দেখলো তানভীর সিঁড়ির কাছে দাঁড়িয়ে আছে তার জামায় ধুলো। রাফি বলল,
“তুই কোথায় ছিলি?”
তানভীর বলল, “নিচের ঘরে আটকে পড়েছিলাম। দরজাটা বাইরে থেকে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।”
মেহরিনও এসে দাঁড়িয়ে বলল “তুই ঠিক আছিস?”
রাফি মাথা নাড়ল।
“হ্যাঁ।”
তারপর সে ফাইলটা দেখাল। “আমি আমার ভাইয়ের বিষয়ে জানতে পেরেছি।”
মেহরিন চুপ করে গেল। তানভীর বলল,
“আর গবেষকটা?”
রাফি উত্তর দিল, “এই বাড়িতেই ছিল।”
“ছিল মানে?”
রাফি মাথা নাড়িয়ে নলল “এখন নেই।”
তিনজন আবার উত্তর ঘরের দিকে তাকাল। কিন্তু ঘরটা এখন খালি। গবেষক কোথাও নেই। মেঝেতে শুধু একটা পুরোনো রেকর্ডার। রাফি সেটা চালু করল
-যদি তুমি এটা শুনে থাকো, তাহলে তুমি সবকিছু জেনে গেছ। তোমার বাবা আমাকে বলেছিল, তোমার ভাইকে বাঁচাতে হলে তোমার পরিচয় মুছে দিতে হবে। আমিও রাজি হয়েছিলাম। কিন্তু পরীক্ষার সেই রাতেই আগুন লাগে। তোমার ভাই মারা যায়নি। সে পালিয়ে যায়। আর তোমার বাবা তাকে খুঁজে বের করতে পারেনি। রেকর্ডিং থেমে গেল।
তারপর শেষ আরেকটা বাক্য বলল—“সে জানত তুমি বেঁচে আছো। কিন্তু সে তোমাকে কাছে আসতে দেয়নি।”
রাফি বলল, বেচে যেহেতু আছে তাহলে কেন আর খোজ নেয়নি?”
মেহরিন ধীরে উত্তর দিল, “হয়তো তোকে রক্ষা করার জন্য পরে কোনে বিপদে যেনো না পড়েস।”
কিন্তু রাফি মাথা নাড়িয়ে বলল “না।” সে ফাইলের একটা পৃষ্ঠা দেখাল। সেখানে একটা পুরোনো ছবি। ছবিতে দুই শিশু একজন রাফি অন্যজন তার যমজ ভাই। ছবির পেছনে লেখা—“দুজনের স্মৃতি একে অপরের সঙ্গে মিশে গেছে।”
রাফি বুঝল তার ভাই শুধু তার মতো দেখতে ছিল না।
তাদের দুজনের স্মৃতির কিছু অংশ পরীক্ষার কারণে একে অপরের সঙ্গে মিশে গিয়েছিল। এই কারণেই রাফির শৈশবের কিছু ঘটনা সে নিজের বলে মনে করতে পারে না।
এই কারণেই সে এমন কিছু জিনিস মনে করতে পারে যা আসলে তার ভাইয়ের স্মৃতি। আর—এই কারণেই কালো দরজার ওপাশ থেকে শিশুটার কণ্ঠ তাকে “ভাইয়া” বলে ডাকছিল। রাত ৩টা ৩২ বাজে, তারা বাড়ি থেকে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল বৃষ্টিও থেমে গেছে। সবকিছু শেষ মনে হচ্ছিল। কিন্তু রাফি গাড়িতে ওঠার আগে থেমে গেল।
রাফি বের হওয়ার সময় সেই লাল খেলনা গাড়িটি সাথেই নিয়ে আসে। সে গাড়িটার নিচে খেয়াল করল ছোট্ট একটা ধাতব প্লেট। তাতেও খোদাই করা ছিলো—০৩৭। এটা দেখে আবার তারা বাড়ির ভেতরে গেলো। রাফি সোজা গোপন ঘরের কাছে আসলো রাফি লাল গাড়ির প্লেটটা ঘুরিয়ে দেখল পেছনে একটা ছোট চুম্বক। সে খেলনাটা গোপন ঘরের দেয়ালের কাছে ধরতেই—ঠক। দেয়ালের একটা অংশ নড়ে গেল।
তানভীর বলল, “এখানে আরেকটা জায়গা আছে দেখছি।”
দেয়াল সরিয়ে গেলো একটা বড় তাক পাওয়া গেল। সেখানে ছিল—একটা পুরোনো ভয়েস রেকর্ডার। রাফি সেটা চালু করল কিছুক্ষণ শিশুর শ্বাসের শব্দ তারপর একটা কণ্ঠ।
শিশুর, কিন্তু এবার কণ্ঠটা পরিষ্কার ভাবে শোনা গেলো।
-আমি পালাইনি। বাবা আমাকে নিয়ে গিয়েছিল। সে বলেছিল, তুই যদি আমার সঙ্গে থাকিস, তাহলে যারা পরীক্ষা করেছিল তারা আমাদের দুজনকেই খুঁজে পাবে।
তাই আমাকে লুকিয়ে রেখেছিল। আমি অনেক বছর ধরে তোকে খুঁজেছি। কিন্তু তুই আমাকে চিনতে পারবি না। কারণ তোর মনে আমার কিছু স্মৃতি জমা আছে। আর কালো রঙের দরজাটা ভয়ানক কোনো দরজা নয়। এটা একটা নিরাপদ ঘর ছিল। বাবা আমাকে এখানে লুকিয়ে রাখত।
আর ০৩৭ হলো সেই ঘরের কোড। রেকর্ডিং থেমে গেল।
রাফি বুঝল—বছরের পর বছর যে বাড়িটাকে সবাই ভূতের বাড়ি বলেছে, তার আসল রহস্য ছিল মানুষের ভয়, গোপন গবেষণা আর লুকানো পরিচয় যেনো কেউ না জানতে পারে।
এখন রাফির মাথায় এখন একটাই প্রশ্ন তার ভাই এখন কোথায়?
তারা বাড়ির বাইরে বের হলো, ভোরের আলো আসতে শুরু করেছে, মেহরিন গাড়ির দরজা খুলল। ঠিক তখনই রাফির ফোনে একটা মেসেজ এলো। অচেনা নম্বর থেকে একটি ছবি পাঠিয়েছে কেউ। রাফি ছবিটা খুলল। একজন মধ্যবয়সী মানুষ জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। চেহারাটা রাফির সঙ্গে মিলে যায়। ছবির নিচে লেখা—“তুই আমাকে খুঁজছিলি।”
তারপর আরেকটা মেসেজ—“এবার আমার পালা।”
রাফি চারপাশে তাকাল রাস্তা ফাঁকা।
মেহরিন জিজ্ঞেস করল, “কে?”
রাফি ফোনটা নামিয়ে বলল,“আমার ভাই।”
তানভীর বলল, “ও কোথায় এখন?”
রাফি ছবিটা আবার ভালোভাবে দেখল ছবির পেছনের জানালার বাইরের দিকে দেখতে পেলো একটা সাইনবোর্ডে লেখা শালবাগান রেলস্টেশন।
মেহরিন ছবিটা হাতে নিয়ে আরও কাছে এনে বলল
“এই ছবিটা কখন তোলা?”
ফাইলের ভেতরে ছবির তথ্য দেখে রাফি বলল,
“আজ রাত ২টা ৫৮।”
তানভীর অবাক হয়ে বলল,
“এটা তো সম্ভব না। ওই সময় আমরা সবাই এই বাড়ির ভেতরে ছিলাম।”
রাফি ছবিটা আবার দেখে বলল
“তাহলে ছবিটা কি ইডিট করেছে হয়তো।”
মেহরিন সঙ্গে সঙ্গে বলল, “ছবির পেছনে স্টেশন আছে।”
রাফি মাথা তুলে বলল।
“হুম, চল যাওয়া যাক আগে।”
ভোর রাত তখন ৩টা ০২ বাজে। তিনজন গাড়িতে উঠল।
শালবাগান রেলস্টেশন খুব বেশি দূরে নয়। কিন্তু রাস্তার শেষ দিকে খুবই অন্ধকার। স্টেশনে পৌঁছাতে সাত মিনিট সময় লাগল। গাড়ি থামতেই রাফি দেখতে পেল পুরো স্টেশন ফাঁকা, একটা পুরোনো বাতি জ্বলছে।
প্ল্যাটফর্মের ঘড়িতে সময়—৩টা ০৫। তানভীর গাড়ি থেকে নেমে চারপাশ দেখে বলল। “এখানে তো আমরা ছাড়া আর কেউ নেই।”
মেহরিন তার ক্যামেরা চালু করে রাফিকে দিলো রাফি ছবিটা বের করতে করতে “এই ছবিতে যে জায়গাটা দেখা যাচ্ছে, সেটা খুঁজতে হবে।”
তারা প্ল্যাটফর্ম ধরে এগোতে লাগল। কিছু দূর গিয়ে রাফি থেমে গেল। ছবির পেছনে থাকা সাইনবোর্ডটা পেয়ে গেছি। কিন্তু ছবিতে সাইনবোর্ডের পাশে একটা পুরোনো বেঞ্চ ছিল।
এখানে তে বেঞ্চটা নেই। তার বদলে একটা নতুন লোহার বেঞ্চ। তানভীর আশেপাশে ভালোভাবে খেয়াল করল।
“ওখানে কিছু একটা জিনিস পড়ে আছে।”
পুরোনো বেঞ্চ যেখানে ছিল, সেখানে মাটিতে একটা ধাতব ঢাকনা। ঢাকনাটা সরাতেই নিচে ছোট একটা বাক্স। রাফি বাক্সটা খুলল। ভেতরে—একটা ক্যাসেট, একটা চাবি, আর একটা কাগজ। কাগজে লেখা ছিলো—
“তোমরা কালো দরজা খুলেছ। এবার তোমরা জানবে কেনো ওই দরজা বানানো হয়েছিল।”
রাফি চাবিটা হাতে নিল। এই চাবির গায়েও একই সংখ্যা—০৩৭।
মেহরিন বলল, “এটা বাড়ির চাবি না।”
রাফি চাবিটা উল্টে দেখল। পেছনে ছোট করে লেখা—
“সিগন্যাল রুম।”